অশোক দাশগুপ্ত
দুপুরে পারঘাটাটা একেবারে নিঝুম হয়ে যায়৷ আর তখনই জমজমাট আসর বসিয়ে ফেলে কেষ্টপদ আর তার একনম্বর সাকরেদ নাটকা৷ আজও তার হেরফের হল না৷
এপারে নবীগঞ্জ, ওপারে মুকুন্দপুর৷ মাঝখানে বিরাট চওড়া নদীটা কাস্তের বাঁকানো ফলার মতো পড়ে আছে৷
রোজ হাজার দুই মানুষ নদীর ওপর দিয়ে যাতায়াত করে থাকে৷ পারাপারের জন্য আগে ছিল এক জোড়া নৌকো, মাঝি৷ তাতে মাইল দেড়েক চওড়া এই জলস্রোতটি পেরুতে ঘণ্টাখানেক লেগে যেত৷ দু’ধারের মানুষের হাতে অপচয় করার মতো পর্যাপ্ত সময় নেই৷ তাই নৌকোর জায়গায় এসেছে দুটো ভটভটি, অর্থাৎ কিনা মোটর বোট৷
নবীগঞ্জের দিকটায় জল ঘেঁষে কাঠের জেটি৷ ভটভটি থেকে নেমে জেটি পেরুলেই গাছের গুঁড়ির উঁচু উঁচু ধাপ৷ সেগুলো ভেঙে প্রায় তিরিশ ফুট ওপরে উঠলে ফুটিফাটা টিনের চালের কিছু দোকানপাট৷ কোনওটা চা-বিস্কুট আর সস্তা পাউরুটির, কোনওটা পান-বিড়ি-সিগারেটের, কোনওটা চাল-ডাল-তেল-মশলার৷
পারঘাটের এই দোকানগুলোর সামনে দিয়ে মান্ধাতার বাপের আমলের একটা খোয়াওঠা রাস্তা চলে গেছে৷ রাস্তার ওধারে দোকানগুলোর মুখোমুখি ঝাঁকড়া-মাথা বিশাল ক’টা শিশুগাছ৷ গাছগুলোর ছায়ায় সারাক্ষণই ক’টা সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে৷
খোয়ার রাস্তা ধরে উত্তর দিকে বরাবর খানিকটা হাঁটলে প্রথমেই পড়বে অনেকগুলো করাতকল, ধানকল, লেদ মেশিনের ছোটখাটো কারখানা আর অগুনতি গুদাম৷ এরই ভেতর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে নিয়ে খাপরার ছাউনির তলায় দুনিয়ার সবচেয়ে ওঁচা একটা বেশ্যাপাড়া৷
এ সবের পর সিকি কিলোমিটারের মতো জায়গা জুড়ে আগাছার জঙ্গল৷ জঙ্গল পেরিয়ে কয়েক পা গেলেই আসল শহর শুরু৷ নবীগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট টাউন হলেও রীতিমতো গমগমে শহর৷ এখানে প্রচুর মানুষ, রাস্তায় রাস্তায় থিকথিকে ভিড়৷ দেশভাগের পর নবীগঞ্জে পপুলেশন এক্সপ্লোশন, মানে প্রচণ্ড জনবিস্ফোরণ ঘটে গেছে৷
জেটিটা যেখানে তার ডানদিকে নদীর কোলে শ্মশানঘাট৷ মস্ত ছড়ানো এক বটগাছের মাথায় সারাদিন ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন বসে থাকে, নিচে ভাঙাচোরা টিন আর কাঠকুটো দিয়ে তৈরি ভগা ডোমের ঘর৷
এই মুহূর্তে সূর্য খাড়া মাথার ওপর উঠে এসেছে৷ নদীতে এখন ভাটার টান৷ জ্যৈষ্ঠের গনগনে রোদে কাচের মতো স্বচ্ছ নীলাভ জল যেন ঝলকাতে থাকে৷ কোথাও এক ফোঁটা মেঘ নেই৷ অনেক উঁচুতে আকাশের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক’টা চিল ডানা মেলে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে৷
ওপারে মুকুন্দপুর শহরটাকে আবছা ছবির মতো মনে হয়৷ ওখানে নদীর ধার ঘেঁষে প্রচুর ইটভাটা৷ সেগুলোর ঢ্যাঙা চিমনি সটান আকাশে গিয়ে বিঁধেছে৷
নদীর জলস্রোত ছাড়া গোটা চরাচর আচ্ছন্নের মতো পড়ে আছে৷ সমস্ত কিছু স্তব্ধ, অনড়৷ ভরদুপুরে নেমে এসেছে ঘোর নিশুতি৷ এই সময়টা ঘণ্টা দুই নদী পারাপার বন্ধ থাকে৷ বেলা পড়ে এলে ফের ভটভটি চালু হবে৷
অন্যদিনের মতো এই ঝিম-ধরা দুপুরে পারঘাটের মাথায় দোকানপাটের উল্টোদিকে শিশুগাছগুলোর ঠান্ডা ছায়ায় আসর জমাবার জন্য নাটকাকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে কেষ্টপদ৷ রাস্তার ওধারে পান-বিড়ির দোকানটা তার, নাটকা তার ওখানে বিড়ি বাঁধে৷
কেষ্টপদ ছটফটে মানুষ, হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা তার ধাতে নেই৷ দুপুরবেলা যখন খদ্দেরপত্তর থাকে না, সময়টা যাতে আলুনি না কাটে, ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে গাঁটে যাতে বাত না ধরে যায়, সেই উদ্দেশ্যে দু’ঘণ্টার জন্য দোকান ফেলে নাটকাকে নিয়ে রাস্তার ওধারে চলে যায়৷ প্রায় শুনশান পারঘাটে তখনও যারা থেকে যায়, তাদের সামনেই আসর বসিয়ে দেয়৷
কেষ্টপদর বয়স তিরিশের কাছাকাছি৷ চেহারাটা হল বাজে-পোড়া তালগাছের মতো আখাম্বা ধরনের৷ পরনে খেলো কাপড়ের বেঢপ চাপা ফুলপ্যান্ট, তার ওপর সবুজে ডোরাকাটা লাল ফতুয়া৷ নাটকা হল বেজায় বেঁটে, তার মাথায় চুল কম৷ ছোট ছোট, পিটপিটে চোখ দুটো দেখলে বোঝা যায় সে একটি মিচকে শয়তান৷ কেষ্টপদর মতোই তারও পরনে একরকমের ফুলপ্যান্ট এবং ফতুয়া৷
রোজই কেষ্টপদ নবীগঞ্জের এক-একটি লোককে নিয়ে তার হাবভাব, হাঁটাচলা নকল করে দর্শকদের মাতিয়ে দেয়৷ এই তামাশাতে কথা থাকে না, থাকে শুধু শব্দহীন অঙ্গভঙ্গি আর মুখচোখের নানা মজাদার খেলা৷
আজ শিশুগাছের তলায় দাঁড়িয়ে চারপাশ একবার দেখে নেয় কেষ্টপদ৷ দর্শকদের ভেতর রয়েছে দোকানদারেরা, সাইকেল রিকশাওলারা৷ করাতকল আর ধানকলের ছুটকো ছাটকা কিছু ঠিকে মজুর যারা আজ কাজ জোগাড় করতে পারেনি, তারাও জুটে গেছে৷ শ্মশান থেকে এসেছে ভগা ডোম৷ আজ তার হাতে পোড়াবার মতো মড়া নেই৷ দোকানদাররা তাদের দোকান ফেলে চলে এলেও একজন কিন্তু আসেনি৷ সে হল নিশি৷ রাস্তার ওপারে একমাত্র চায়ের দোকানটা তার৷
নিশির বয়স পঁচিশ,ছাব্বিশ,মাজা মাজা রঙ, ডাঁটো চেহারা, গোল মুখে দু-চারটে বসন্তের দাগ৷ শক্ত গড়নের শরীরটি জুড়ে তার অঢেল স্বাস্থ্য৷ দেখতে-শুনতে মোটামুটি ভালই৷
বছর তিনেক আগে বিধবা হওয়ার পর পেট চালাতে পারঘাটায় চায়ের দোকান দিয়ে বসেছে, নতুন করে বিয়ে করেনি৷ পুরুষ খদ্দেরদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি, হাসিঠাট্টা যে না করে এমন নয় কিন্তু ওই পর্যন্তই৷ তার বেশি এগুলে কিংবা গায়ে হাত-টাত দিতে চাইলে নিশির খর চোখ দপ করে জ্বলে ওঠে৷ হাতের কাছে সবসময় একটা ধারালো দা মজুত থাকে তার ধাঁ করে সেটা তুলে বাগিয়ে ধরে৷ সেই সঙ্গে মুখ থেকে তোড়ে বেরিয়ে আসে চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করা গালাগাল এবং খিস্তি৷ তবু তার দোকানে দুপুরবেলাটা ছাড়া সর্বক্ষণ ভনভনে মাছির ঝাঁকের মতো ভিড় লেগে থাকে৷ অন্যদের সম্বন্ধে নিশির শুচিবাই যত উগ্রই থাক, কেষ্টপদ গায়ে গায়ে বসলে সরে যায় না, দা-ও তোলে না৷ শুধু চোখ কুঁচকে আড়ে আড়ে পুরুষটাকে দেখতে দেখতে ঠোঁট কামড়ে চাপা গলায় শুধু বলে, ‘আঃ, মরণ—’
নিশি কোনওদিনই গাছতলায় আসে না৷ আজও সে নিজের দোকানে বসে রাস্তার এধারে তাকিয়ে আছে৷ তার দোকানের সামনে খদ্দেরদের জন্য গোটা দুই বাঁশের বেঞ্চি পাতা৷ একটা বেঞ্চিতে জুত করে বসে হাতে কাচের গেলাসে চা নিয়ে কেষ্টপদকে একদৃষ্টে দেখছে হরেন৷ বেঁটেখাটো মুগুরের মতো নিরেট চেহারার মধ্যবয়সী এই লোকটা অতি বজ্জাত, পয়লা নম্বরের ধুরন্ধর৷ গোটা নবীগঞ্জের মানুষ হরেনকে চেনে এবং এড়িয়ে চলে৷ তাকে আগে কোনওদিন দুপুরে পারঘাটায় দেখা যায়নি৷ আজ সে কোন মতলবে এখানে, বিশেষ করে নিশির চায়ের দোকানে হানা দিয়েছে, কে জানে!
দর্শকদের দেখতে দেখতে কেষ্টপদর চোখ কিছুক্ষণ হরেনের দিকে আটকে থাকে৷ তারপর নজরটা সরিয়ে নিয়ে বলে, ‘আজ তুমাদের অ্যামন একজনারে নকল কইরে দেখাব যারে তুমরা সক্কলে চেনো৷ নামটা তার আগে কইবনি৷ লোকটা কে, দেখি তুমরা ধরতে পার কিনা৷’ বলে নাটকার দিকে ফেরে, ‘ওঠ রে পাটনার৷’ পাটনার অর্থাৎ পার্টনার৷ দু-চারটে ইংরেজি বুলি শুনে শুনে মনে করে রেখেছে কেষ্টপদ, আখছার সেগুলো সে কথার ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দেয়৷
‘ঠিক হ্যায় গুরু’— নাটকা বসে ছিল, উঠে পড়ে৷ বোম্বাই ছবি আর টিভির কারণে কলকাতা থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে এই নবীগঞ্জে হিন্দিটা চোরা বানের মতো ঢুকে পড়েছে৷ নাটকার দশটা কথায় দুটো হিন্দি থাকবেই৷
এর পর শুরু হয়ে যায় তামাশা৷ মোটামুটি ব্যাপারটা এইরকম৷ একটা লোক অন্ধকার রাতে শুঁড়িখানায় গিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলে প্রচণ্ড মাতাল হয়ে টলতে টলতে ড্রেনের ধারে হুড়মুড় করে ঘাড় গুঁজে পড়ে যাবে৷ তারপর তার সতীসাধ্ব স্ত্রী লণ্ঠন হাতে উদ্বিগ্ন মুখে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত স্বামীকে পেয়ে যাবে৷ স্বামীর সারা গা ড্রেনের ময়লায় মাখামাখি৷ টেনেহিঁচড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পতিদেবতাকে বাড়ি নিয়ে যাবে সে৷
এখানে স্বামীর ভূমিকাট বাঁটকুল নাটকার, স্ত্রী হয়েছে ঢ্যাঙা কেষ্টপদ৷
গোটা তামাশাটায় একটি কথা নেই৷ নানারকম অঙ্গভঙ্গি, হাঁটার কায়দা, তাকানো, মুখের হাবভাব দিয়ে হাস্যকর দৃশ্যগুলি ফুটিয়ে তুলতে থাকে কেষ্টপদ আর নাটকা৷
আসলে ব্যাপারটা হল বিশুদ্ধ মূকাভিনয়, যদিও এই শব্দটা মাসখানেক আগেও ছিল তাদের কাছে একেবারেই অজানা৷ অমলেশ সান্যাল কীভাবে, কার কাছ থেকে যেন কেষ্টপদ আর নাটকার এই গুণটার খবর পেয়ে বাড়িতে ডাকিয়ে নিয়ে তাদের অভিনয় দেখেছিলেন৷ অমলেশ নবীগঞ্জের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ, বিদ্যার জাহাজ, কলকাতার বড় কলেজে পড়ান, ছুটিছাটায় বাড়ি আসেন৷ প্রথমটা তাঁর সামনে এসব দেখাতে রাজি হয়নি কেষ্টপদরা৷ সঙ্কোচে জড়সড় হয়ে বলেছে, ‘পারবনি৷ আপনারে কি এই লক্কড় লোংরা জিনিস দেখানো যায়?’ কিন্তু অমলেশ কোনও কথা শোনেননি৷ শেষ পর্যন্ত শব্দহীন মজার তামাশা দেখাতে হয়েছিল৷ অমলেশ এককথায় চমৎকৃত৷ বলেছিলেন, তোমরা জিনিয়াস হে৷ এমন মূকাভিনয় জীবনে দেখিনি৷ মূকাভিনয় এবং জিনিয়াস শব্দ দুটো কেষ্টপদরা সেই প্রথম শুনেছিল৷ জিনিয়াস কথাটার মানে তারা এখনও জানে না, তবে সেটা যে ভাল কিছু আন্দাজ করতে অসুবিধা হয়নি৷ অবশ্য মূকাভিনয় ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অমলেশ৷ তিনি আরও বলেছিলেন, কলকাতায় ওদের নিয়ে গিয়ে একটা বড় ‘শো’ করবেন, টিভিতেও ওদের মূকাভিনয় দেখানোর ব্যবস্থা করে দেবেন৷ কেষ্টপদরা, শুধু তারাই বা কেন, সারা নবীগঞ্জ জানে, মিথ্যে স্তোক দেওয়ার মানুষ নন অমলেশ৷ তবে কলকাতায় যেতে পারবে সেই আশায় দিন গুনে চলেছে তারা৷
যাই হোক, মাতাল স্বামী আর পতিব্রতা স্ত্রীর দৃশ্যগুলো ক্রমশ জমে উঠতে থাকে৷ কেষ্টপদ আর নাটকার অভিনয় এমনই মজাদার যে পেটের ভেতর থেকে হাসি গবগবিয়ে বেরিয়ে আসে৷ দর্শকরা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল আর বলছিল, ‘শালা কেষ্টা আর নাটকা কী খজড়ামোটাই না জানে! হেসিয়ে পেট ফাইটে (ফাটিয়ে) ফেলবে রে বাপ!’
ওদিকে নিশির দোকানের বেঞ্চিতে আর বসে থাকতে পারছিল না হরেন৷ হাসতে হাসতে সে ঠিকরে পড়ে যায়৷ ফের উঠে বসতে বসতে বলে, ‘শালোরা একেবারে বাপের ব্রেষোকাঠ (বৃষকাঠ)! মেরে ফেলবি নাকিন রে?’
নিশির কিন্তু অত উচ্ছ্বাস বা বাড়াবাড়ি নেই৷ ঠোঁট টিপে মুখ মচকে সে নিঃশব্দে হাসে আর বলে, ‘মরণ! মড়াখেগো দুটো করচে দ্যাখো!’
কেষ্টপদ আর নাটকার কিন্তু কোনওদিকেই নজর নেই৷ তামাশাটা এখন এই জায়গায় পৌঁছেছে৷ ড্রেনের ময়লা মেখে পড়ে আছে স্বামীরূপী নাটকা৷ আর স্ত্রী কেষ্টপদ লণ্ঠন তুলে স্বামীর মুখ দেখে চিনতে পেরে প্রথমে কপাল চাপড়ে কান্নার ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে৷ নিঃশব্দে কিছুক্ষণ বিলাপ করার পর কাল্পনিক আঁচল দিয়ে স্বামীর গা থেকে ড্রেনের ময়লা মুছে তাকে টেনে টেনে নিজেদের বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে যেতে আচমকা দর্শকদের উদ্দেশে বলে ওঠে, ‘তুমরা চিনতে পেরেচ কার মাগ (স্ত্রী) কোন শালো মালখোর মাতালকে টেনে নে চলেচে?’
সবাই সমস্বরে জানায়— পেরেছে৷ মাতালটা হল করাতকলের মালিক কামাখ্যা কুণ্ডু৷ প্রায় রোজ রাতেই সে আর তার ধর্মপত্নী এইরকম কাণ্ড করে থাকে৷
যারা এই তামাশার নায়ক-নায়িকা তাদের যখন চেনা গেছে তখন সার্থকতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই৷ পরিতৃপ্ত কেষ্টপদ বাকি অংশটুকু সুচারুভাবে সম্পন্ন করে বসে পড়ে৷ তারপরও অনেকটা সময় নবীগঞ্জের নিঝুম পারঘাটা দমফাটা হাসিতে তোলপাড় হয়ে যেতে থাকে৷
হাসির তোড় একটু কমলে নিশির চায়ের দোকান থেকে উঠে সোজা গাছতলায় চলে আসে হরেন৷ মুরুব্বিয়ানা চালে কেষ্টপদকে বলে, ‘জবর জমিয়ে দিয়েছিলি রে ব্যাটাচ্ছেলে! তোর আর এই নাটকা হারামিটার পেটের ভেতর এত সব মাল রয়েছে, আগে তো মালুম পাইনি৷ তা তোর সনগে এট্টা জরুরি কথা ছেল৷’
হরেন কোন উদ্দেশে এখানে হাজির হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে না৷ লোকটা একসময় ছিল মারাত্মক ক্রিমিনাল৷ তার বিরুদ্ধে কত যে খুন আর ডাকাতির কেস ছিল তার ঠিকঠিকানা নেই৷ দু-চারবার পুলিস টানাটানি করে হাজতেও ঢুকিয়েছে কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি, অদৃশ্য কারও ইঙ্গিতে সব মামলা চাপা পড়ে গেছে৷
হরেন অবশ্য আজকাল ভদ্রলোক হয়েছে৷ খুনখারাপি মাস্তানির লাইনে আর নেই৷ পলিটিক্যাল পার্টির নেতাদের সঙ্গে এখন তার সারাক্ষণ ঘোরাফেরা৷ তাদের হয়ে কী সব কাজ টাজ করে দেয়৷ নিজের হাতে ছোরা কি পিস্তল টিস্তল না চালালেও, যারা ওসব চালায় তারা তার কথায় ওঠে, বসে৷ অতএব নবীগঞ্জের মানুষ পারতপক্ষে তার ধারেকাছে ঘেঁষে না৷ সেই হরেনের তার কাছে কী দরকার থাকতে পারে বুঝতে না পেরে ভীষণ ঘাবড়ে যায় কেষ্টপদ৷ উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কী কথা হরেনবাবু?’
হরেন কেষ্টপদর কাঁধে একখানা হাত রেখে খানিকদূরে তাকে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘সবার সামনে কওয়া যাবে নি, তাই এখেনে লিয়ে এলাম৷ শোন, কাল সনঝে বেলা ঝামেলা রাখবি নি৷ আমি এইসে তুকে এক জায়গায় লিয়ে যাব৷’
‘কুথায়?’
‘সে গেলেই বুজতে পারবি৷’
‘কিন্তুক—’
হরেন যা বলবে চোখকান বুজে সেটা তামিল করাই নবীগঞ্জে নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে৷ কেউ তার মুখের ওপর কথা বলে না৷ কাজেই হরেনের কপাল কুঁচকে যায়৷ বিরক্ত গলায় সে বলে, ‘কিন্তুকটা আবার কী?’
ঢোক গিলে কেষ্টপদ বলে, ‘সনঝে বেলায় অনেক খদ্দের আসে৷ দু-চারটে পয়সা ত্যাখন রোজগার হয়৷ বুঝতেই পারচেন, আমি গরিব লোক—’
‘এই কথা!’ হেসে সস্নেহে কেষ্টপদর ঘাড়ে গোটাকয়েক চাপড় মেরে হরেন বলে, ‘বিড়ি বেচে ক’পয়সা আর পাবি! আমার সনগে গেলে এক সনঝেতে তোর একমাসের রোজগার হয়ে যাবে রে শালো! তৈরি হয়ে থাকিস৷ কাল সনঝেয় আসচি৷ আর হ্যাঁ, ওই নাটকা খজড়াটাকেও সনগে লিবি৷ আমি যে তোকে লিয়ে যাব, কোনও শালা য্যানো টের না পায়৷’ বলে আর দাঁড়ায় না হরেন, একটা সাইকেল রিকশাওলাকে ডেকে তার রিকশায় চেপে চলে যায়৷
হরেন কেন এসেছিল সেটা জানার জন্য গাছতলায় সবাই দম আটকে বসেছিল৷ সে ফিরে আসতেই তারা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ ‘ত্যামন কিছু লয়, এমনি ডেকে নে গেছল হরেনবাবু—’ এইরকম ভাসা ভাসা জবাব দিয়ে এড়িয়ে যায় কেষ্টপদ৷ হরেন যখন বারণ করে গেছে, আসল কথাটা গলা দিয়ে বার করা যাবে না৷
বিকেলে ভটভটি চালু হবার পর ফের যখন কেনাবেচা শুরু হয়, এক ফাঁকে দোকানের দায়িত্ব নাটকাকে দিয়ে নিশির কাছে চলে আসে কেষ্টপদ৷ চায়ের দোকানটা এখন মোটামুটি ফাঁকাই রয়েছে৷ নিশির কাছ ঘেঁষে বসে চাপা গলায় সে বলে, ‘তুমার সনগে এট্টা পরামশশো আচে গ মেয়েমানুষ—’
কেষ্টপদ যে পরামর্শের জন্য তার কাছে আসবে, তা যেন জানাই ছিল নিশির৷ হরেন যখন কেষ্টপদকে দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে গুজগুজ করছিল তখন সে আন্দাজ করেছিল লোকটা কোনও অভিসন্ধি নিয়ে এসেছে৷ হরেন চলে যাবার পর সবাই যখন হামড়ে পড়েছিল, নিশি চুপচাপ তার দোকানে বসে ছিল৷ কোনওরকম কৌতূহল যে তখন দেখায়নি তার কারণ একটা অদৃশ্য বঁড়শি সে অনেক আগেই কেষ্টপদর নাকে আটকে রেখেছে৷ তাকে না জানিয়ে কিছু করে, সাধ্য কী ওই আখাম্বা লোকটার?
নিশি চোখের কোণ দিয়ে কেষ্টপদকে দেখতে দেখতে বলে, ‘কী কইল মড়াখেগোটা?’ মড়াখেগো তার কথার মাত্রা৷
কোন উদ্দেশ্যে হরেনের আগমন, জানিয়ে দেয় কেষ্টপদ৷
নিশির কপালে ভাঁজ পড়ে৷ বোঝা যায় সে বেশ চিন্তিত৷ বলে, ‘যমের অরুচিটা য্যাখন যেতে বুলেচে, যেতেই হবে৷ কিন্তুন হুঁইশার (হুঁশিয়ার)৷ তুমারে য্যানো ফেঁসিয়ে না দ্যায়৷’
‘হুঁ৷’ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে কেষ্টপদ৷ বলে, ‘হুঁইশার তো থাকতেই হবে৷’
পরদিন সন্ধেবেলায় দোকান যখন খদ্দেরে খদ্দেরে সরগরম, বিকিকিনি রীতিমতো জমে উঠেছে, সেই সময় জিপ নিয়ে আসে হরেন৷ অগত্যা দোকানের ঝাঁপ ফেলে নাটকাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়৷ দূর থেকে চোখের ইশারায় নিশি কেষ্টপদকে নতুন করে সতর্ক করে দেয়৷
কেষ্টপদদের নিয়ে হরেনের জিপ একসময় নবীগঞ্জের আরেক মাথায় ভবেশ্বর চৌধুরিদের বাড়ি পৌঁছে যায়৷ বিশ বিঘে জমির মাঝখানে থামওলা সাবেক আমলের তেতলাটা দূর থেকে এতকাল দেখেছে কেষ্টপদরা৷ এই প্রথম ভেতরে ঢুকল৷ সামনের দিকে মস্ত ফুলের বাগান, নকল পাহাড়, ফোয়ারা, টেনিস খেলার কোর্ট— কী নেই?
হরেনের পেছনে পেছনে কেষ্টপদ আর নাটকা যেখানে গিয়ে হাজিক হল, তেমন জায়গায় কস্মিনকালেও যাওয়া তো দূরের কথা, স্বপ্নেও ভাবেনি ওরা৷ এটা একটা বিশাল হলঘর৷ প্রায় বিশ হাত উঁচু সিলিং থেকে দুই সারিতে দশটা করে বিশটা একই মাপের একই চেহারার ঝাড়বাতি, মাঝখানে রয়েছে ওগুলোর তিনগুণ আরও একটা৷ সবগুলোতেই নানারঙের আলো জ্বলছে৷ মস্ত মস্ত জানালায় খড়খড়ি আর রঙিন কাচের পাল্লা৷ দেওয়ালে দেওয়ালে বাঘ আর হরিণের শিংসুদ্ধু মাথা আটকানো৷ সেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অয়েল পেন্টিং৷ মেঝেতে দামি লাল কার্পেট পাতা৷ চারিদিকে কত যে ভেলভেটে মোড়া সিংহাসনের ধরনের সোফা সাজানো রয়েছে, গুনে শেষ করা যায় না৷ আর রয়েছে একদিকের গোটা দেওয়ালটা জুড়ে গদি-মোড়া ফরাস৷ মাথার ওপর শুধু ঝাড়লণ্ঠনই নেই, কম করে দশ বারোটা ঝকঝকে নতুন ফ্যানও ঝুলছে৷
দেখতে দেখতে চোখের তারা কপালে উঠে গিয়েছিল কেষ্টপদ আর নাটকার৷
ভবেশ্বর চৌধুরিরা ছিলেন এই জেলার সবচেয়ে বড় জমিদার, সবচেয়ে বড়লোক৷ জমিদারি আর নেই, আইন করে তুলে দেওয়া হয়েছে৷ তবু এখনও তাদের হাতে কত পয়সা রয়েছে, সেটা এ বাড়িতে না ঢুকলে টের পাওয়া যায় না৷ কেষ্টপদরা শুনেছে, জমিদারি উঠে যাবার পর ইদানীং কী সব ব্যবসা ট্যাবসা করছেন ভবেশ্বরবাবুরা৷ হলঘরটা ফাঁকা নেই৷ ফরাসের ওপর তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে কাত হয়ে আছেন স্বয়ং ভবেশ্বর চৌধুরি৷ বয়স ষাট বাষট্টি৷ টকটকে গায়ের রঙ৷ অঢেল আরামে থাকা চেহারা৷ এই বয়সেও দু-একটার বেশি চুল পাকেনি৷ মাথার মাঝখান দিয়ে সিঁথি৷ পরনে ফিনফিনে ধুতি আর পুরনো ধাঁচের সিল্কের বেনিয়ান৷ পোশাকের দিক থেকে সাবেক চালটি বজায় রেখেছেন ভবেশ্বর চৌধুরি৷
ভবেশ্বরকে এতকাল দূর থেকে দেখেছে কেষ্টপদরা, এই প্রথম এত কাছে এল৷
ভবেশ্বর ছাড়াও নবীগঞ্জের বেশ কিছু গণমান্য মানুষকেও সোফায় বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে৷ এঁরা হলেন নবীগঞ্জ জয়তারা উইমেন্স কলেজের প্রিন্সিপাল তারকনাথ রাহা, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হরিপদ তরফদার, বড় উকিল সহায়রাম পুততুণ্ড, ইত্যাদি৷ এঁদের সবাইকেই চেনে কেষ্টপদরা৷
হরেন সোজা ফরাসের সামনে নিয়ে আসে কেষ্টপদদের৷ ভবেশ্বরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়৷ দুজনে কোমর অনেকখানি ঝুঁকিয়ে সসম্ভ্রমে নমস্কার করে৷
কেষ্টপদদের বিনয়ে খুশিই হন ভবেশ্বর৷ বলেন, ‘বসো বসো’—
কেষ্টপদ আর নাটকা নিচে কার্পেটের ওপর বসে পড়ে৷
ভবেশ্বর বলেন, ‘আরে আরে, ওখানে কেন? ওপরে উঠে বসো৷’
কেষ্টপদরা হাতজোড় করে জানায়, ভবেশ্বরের মতো এত বড় একজন মানুষের সামনে উঁচুতে বসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷
এ নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করেন না ভবেশ্বর৷ বলেন, ‘শুনলাম তোমরা নাকিন বড় আর্টিস্ট হে৷ কী সব মজার মজার ব্যাপার অ্যাক্টিং করে দেখাও৷’ তাঁর কথায় আঞ্চলিক একটু টান আছে৷
কেষ্টপদ আর নাটকা চমকে ওঠে৷ আর্টিস্ট কথাটা তারা জানে কিন্তু অ্যাক্টিং শব্দটা এই প্রথম শুনল৷ তবে ভবেশ্বর যে তাদের মূকাভিনয়ের কথা বলছেন সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না৷ কেষ্টপদ মুখ নিচু করে বলে, ‘ও কিচু লয়৷ দুকুরবেলা সময় কাটানোর তরে (জন্য) এই এট্টু— কথা শেষ না করেই সে থেমে যায়৷
‘কিছু নয় বললেই তো হবে না৷ তোমাদের কথা আমি অনেক শুনেছি৷ তা হরেনকে দিয়ে তোমাদের কেন ডাকিয়ে এনেছি জানো?’
‘এজ্ঞে না’৷
‘তোমার অ্যাক্টিং দেখাতে হবে৷’
মাথা আরও নিচু হয়ে যায় কেষ্টপদর৷ সেদিন অমলেশ সান্যাল খাতির করে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের তামাশা দেখেছেন৷ আজ ডাকিয়ে আনলেন ভবেশ্বর চৌধুরি৷ এই সব মান্যগণ্য লোকেরা হঠাৎ তাদের মধ্যে পেলেনটা কী? ভরদুপুরে শিশুগাছের তলায় তারা যা করে তা কি ভদ্রলোকদের দেখানোর জিনিস? মুখ আরও নামিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে সে সমানে ‘না না’ করতে থাকে৷
কিন্তু অমলেশের মতো ভবেশ্বর চৌধুরিও ঘোর নাছোড়বান্দা৷ অগত্যা নিরুপায় হয়েই রাজি হতে হয় কেষ্টপদকে৷ বড় মানুষের খেয়ালকে তার মতো গরিবেরা কতক্ষণ আর ঠেকিয়ে রাখতে পারে! সে বলে, ‘কী দেখাব বুইলে দ্যান—’
ভবেশ্বর বলেন, ‘ব্যোমকেশ মজুমদারকে চেনো?’
এবার মুখ তোলে কেষ্টপদ৷ নবীগঞ্জে বেশ কয়েকজন ব্যোমকেশ মজুমদার আছে৷ এদের মধ্যে সবচেয়ে যিনি বিখ্যাত তিনি সাত আটটা ধানকল, অনেকগুলো লেদ মেশিনের কারখানা আর ডজনখানেক বিরাট বিরাট আড়তের মালিক, ভবেশ্বর তাঁর কথাই বলছেন কিনা জানার জন্য জিজ্ঞেস করে, ‘কোন ব্যোমকেশ মজুমদার? ওই যার আড়ত, কারখানা— এই সব আচে?’
‘হ্যাঁ৷’ আস্তে মাথা দোলাতে দোলাতে ভবেশ্বর বলেন, ‘ওই আড়তওলার কথাই কইচি৷ ওকে নিজের চোখে দেখেচ?’
‘অনেক বার৷’
‘চেহারাটা কেমন?’
‘মোন্দ লয়৷ এট্টু মোটা— এই যা৷ আর ডান পা’টা বাঁ পায়ের চাইতে খাটো৷’
ভবেশ্বর দুই হাতের তালু উল্টে দিয়ে গলা সামান্য চড়িয়ে বলেন, ‘অত ভাল ভাল কথা কইতে হবে না৷ বল ল্যাংড়া ব্যোমকেশ৷’ পরক্ষণে কণ্ঠস্বর ঝপ করে অনেকখানি নামিয়ে বলে ওঠেন, ‘লোকটার খুব বদনাম জানো কী? সারা শহরে তার নামে ঢি ঢি পড়ে গেছে?’
কেষ্টপদ কিছু জবাব দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই ফের ভবেশ্বর বলতে থাকেন, ‘মেইন বাজারের ওধারে একটা ফ্ল্যাটে রক্ষিতা রেখেছে ল্যাংড়াটা৷ রোজ রাত্তিরে সেজেগুজে লুকিয়ে লুকিয়ে সে মেয়েমানুষটার কাছে যায়৷ বাড়ি ফেরে ভোরবেলায়৷ এ খবরটা রাখো?’
কেষ্টপদ হকচকিয়ে যায়৷ ভবেশ্বর যা বললেন, সেটা নবীগঞ্জের অনেকেই জানে৷ সে কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বসে থাকে৷ তার সামনে ভবেশ্বর চৌধুরির মতো একজন মানুষ যে এ জাতীয় আলোচনা করতে পারেন, শুনেও যেন বিশ্বাস হয় না৷
ভবেশ্বর এবার বলেন, ‘নেংচে নেংচে, কাছাকোঁচা সামলাতে সামলাতে রক্ষিতার বাড়ি গিয়ে মজা লোটে এবার সেটা দেখাবে৷ হরেনের সঙ্গে যাও, তুমি আর নাটকা ড্রেসটা পালটে এসো৷’
কেষ্টপদদের উঠতেই হল৷ হরেনের সঙ্গে পাশের ঘরে গিয়ে মিনিট পনেরো বাদে যখন তারা ফিরে এল, নাটকার গায়ে সিল্কের শাড়ি আর ব্লাউজ, চোখে কাজল, সারা শরীর থেকে ভুরভুর করে গন্ধ বেরুচ্ছে৷ কেষ্টপদ পরে এসেছে চুনোট করা ধুতি, গিলে-করা ধবধবে পাঞ্জাবি, পায়ে দামি চটি৷ এই সাজসজ্জাতেই সারাক্ষণ ব্যোমকেশকে দেখা যায়৷
এরপর ঝুঁকে ঝুঁকে, খাটো পা নেংচে নেংচে, থুতনিটা সামনের দিকে অনেকটা বাড়িয়ে চোরের মতো কিভাবে রক্ষিতার কাছে যায় ব্যোমকেশ এবং মেয়েমানুষটি কেমন করে তার সঙ্গে খুনসুটি করে, কোন প্রক্রিয়ায় ছেনালপনা করে সোনার গয়না আদায় করে— মনে মনে এসব এঁকে নিয়ে অভিনয় করে দেখায় কেষ্টপদ আর নাটকা৷
বাঞ্ছিত ফলটি হাতে-হাতেই পাওয়া যায়৷ হাসতে হাসতে ভবেশ্বর এবং নবীগঞ্জের গণ্যমান্য মানুষগুলির ফরাস আর সোফা থেকে উল্টে পড়ে যাবার জোগাড়৷ তাঁদের গলার ভেতর থেকে হিক্কার মতো আওয়াজ বেরুতে থাকে৷ সবাই প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে, ‘ফার্স্ট ক্লাস৷ কিন্তু হেসে হেসে একেবারে মরে গেলাম৷’
খানিক ধাতস্থ হয়ে ভবেশ্বর, কলেজের প্রিন্সিপাল, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ইত্যাদি বিশিষ্ট অতিথিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘কী মনে হচ্ছে? — চলবে?’
প্রিন্সিপাল তারকনাথ বলেন, ‘চলবে মানে? অপোনেন্টকে কাত করার জন্যে এর চেয়ে পাওয়ারফুল অস্ত্র আর হয় না৷ হাসতে হাসতে ছুরি চালানো যাকে বলে, সেটা এই মাইম আর্টিস্টদের দিয়েই হবে৷’
ভবেশ্বর বলেন, ‘যা বলেছেন৷ এদের দিয়ে শুরুতেই গোড়া মেরে দিতে চাই৷’
মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হরিপদ চাকলাদার বলেন, ‘সেটা পারবেন চৌধুরিমশায়৷’
কেষ্টপদর দিকে ফিরে ভবেশ্বর বলেন, ‘আমরা খুব খুশি হয়েচি৷ আজ অনেক খেটেচ দুজনে৷ এবার ছুটি৷ যে জামাকাপড় পরে অ্যাক্টিং দেখালে ওগুলো তোমাদের দিলাম৷ যত্ন করে রেখো, পরে দরকার হবে৷ শিগগিরই তোমাদের হরেনকে দিয়ে খবর দেব, চলে এসো৷’
একবার তামাশা দেখিয়ে তা হলে নিস্তার নেই! ঢোক গিলে কেষ্টপদ বলে, ‘ফের আসতে হবে?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, একবার নাকি? অনেকবার৷ তোমাকে দিয়ে বহু জরুরি কাজ করিয়ে নেবার প্ল্যান করেছি যে৷’
নিজের অজান্তেই, যেন কেষ্টপদ জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কী কাজ?’
ভুরু কুঁচকে রহস্যময় হেসে ভবেশ্বর বলেন, ‘দেশের কাজ৷ এই ধর—’ বলে পকেট থেকে একশো টাকার দু-খানা নোট বার করে কেষ্টপদর দিকে বাড়িয়ে দেন৷
বিমূঢ়ের মতো কেষ্টপদ বলে, ‘কিসের টাকা?’
বড় উকিল সহায়রাম পুততুণ্ড বলেন, ‘আমাদের কম আনন্দটা দিলে নাকি হে৷ তার একটা মজুরি নেই?’
আধঘণ্টা তামাশা দেখানোর জন্য? কড়কড়ে দু-শো টাকা! কেষ্টপদর চোদ্দ পুরুষে কেউ এটা ভাবতেও পারে না৷
ভবেশ্বর আদরের গলায় বলেন, ‘নাও হে, নাও— বিহ্বলের মতো কেষ্টপদ টাকাটা নিলে ফের বলেন, ‘এখন যাও৷ হরেন তোমাদের পৌঁচে দিয়ে আসবে৷’
হরেন যখন জিপে করে পারঘাটায় কেষ্টপদদের নামিয়ে দিয়ে যায় তখন অনেক রাত৷ ভটভটি বন্ধ হয়ে গেছে৷ নিশির চায়ের দোকানটা ছাড়া আর কোনও দোকান খোলা নেই৷
রাতে ভটভটি বন্ধ হলে নিশি এক মুহূর্তও পারঘাটে থাকে না, সাইকেল রিকশা ডেকে শহরে চলে যায়৷ সেখানে সে আর তার বুড়ি মা থাকে৷ ওই মা ছাড়া জগৎসংসারে তার আর কেউ নেই৷ আজ যে সে নিঝুম পারঘাটায় একা বসে আছে তার কারণ কেষ্টপদ আর নাটকা৷ হরেনের মতো একটা প্রাক্তন খুনি ওদের জিপে করে তুলে নিয়ে গেছে, এটা সাংঘাতিক দুশ্চিন্তার ব্যাপার৷ কেষ্টপদরা ফিরে এসে সব না বলা পর্যন্ত সে শহরে যায় কী করে? তা ছাড়া রাতে কেষ্টপদ আর নাটকা পারঘাটা ছেড়ে কোথাও যায় না৷ আসলে তাদের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই৷ কেষ্টপদ তার দোকানেই রাতে পড়ে থাকে৷ আর নাটকা শোয় নিশির দোকানে৷ নাটকার হাতে দোকানের চাবিটাও তো দিতে হবে৷
কেষ্টপদর মুখে সব শুনে দুর্ভাবনাটা বেড়েই যায় নিশির৷ সে বলে, ‘আমার মন বড্ড কু গাইছে গ৷ মড়াখেগোরা কী ফেরে ফেলে দেবে, কে জানে?’
কেষ্টপদ অন্যমনস্কর মতো বলে, ‘হ্যাঁ, সে ভয়টা তো রয়েচেই৷ তবে কিনা ভাল জামাকাপড় আর দুশো ট্যাকা দেছে৷ দু’মাস খাটলেও অতগুলো ট্যাকা রোজকার করতে পারবনি৷’
নিশি ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘ওগুলোন ধুয়ে ধুয়ে জল খাও৷’ একটু চিন্তা করে আবার বলে, ‘দু-চারদিন দেখা যাক, হরেন ঢ্যামনা আর আসে কিনা৷ তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে হবে৷ তবে ফের হুঁইশার করে দিচ্চি৷’ বলতে বলতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে, ‘ঢের রাত হল৷ এখন উঠি৷ আমাকে এট্টু এইগে (এগিয়ে) দে এসো৷’
ধানকল করাত কলের দিকটা নির্জন হয়ে গেছে৷ তবে বেশ্যাপাড়া এখন জমজমাট৷ যত রাজ্যের খুনি, মাতাল, চোর, ছ্যাঁচড়া মিলে জায়গাটাকে একেবারে নরকের খাসমহল বানিয়ে ফেলেছে৷
নিশির দুর্দান্ত সাহস, তা ছাড়া কোমরে একখানা দা না গুঁজে সে পথে বেরোয় না৷ তবু এটা তো ঠিক, সে একটা মেয়েমানুষ৷ একা একা ওই রকম জঘন্য একটা এলাকার ভেতর দিয়ে যাওয়াটা ঠিক না৷ কেষ্টপদ আর নাটকা তাকে বেশ্যাপাড়া পার করে নবীগঞ্জের বড় রাস্তায় একটা সাইকেল রিকশায় তুলে দিয়ে আসে৷
সেই যে হরেন এসেছিল, তারপর দিনকয়েক আর তার পাত্তা নেই৷ কাজেই কেষ্টপদদের, বিশেষ করে নিশির দুশ্চিন্তাটা অনেক ফিকে হয়ে এসেছে৷ ওদের মনে হয়েছে, হঠাৎ বড়লোকের মাথায় খেয়াল চেপেছিল, তাই ডেকে নিয়ে তামাশা দেখেছিল৷ পরে ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেছেন ভবেশ্বর চৌধুরিরা৷
কিন্তু দিন সাতেক কাটতে না কাটতেই আরেকটা মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যায়৷ রাতে নদী পারাপার আর পারঘাটার দোকানপাট তখন বন্ধ হয়ে গেছে, খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে বিড়ি টানছে কেষ্টপদ আর নাটকা, বিড়িটা শেষ হলেই ওরা শুয়ে পড়বে৷ এই সময় একটা টকটকে লাল রঙের মোটর এসে থামে ওদের সামনে৷ গাড়ি থেকে নামে নবীগঞ্জের চার মস্তান— ঝন্টে, লেটো, গাল-কাটা মজিদ আর পল্টা৷
হরেন হল প্রাচীন কালের খুনি৷ আর ঝন্টেরা এখনকার সুপারস্টার৷ ওদের দেখে আঁতকে ওঠে কেষ্টপদ আর নাটকা৷ তাদের হাত থেকে বিড়ি খসে পড়ে৷
ঝন্টেরা কিন্তু কোনওরকম ঝামেলা বাধায় না৷ ছোরাছুরি বা রিভলভারও বার করে না৷ উল্টে ভারি নরম গলায় বলে, এই যে মহালায়কেরা, কষ্ট করে তুমাদের একবার যেতে হচ্চে যে৷ তুমাদের জন্যে গাড়ি লিয়ে এইচি৷ উঠে পড়৷’
হরেনের মতো ঝন্টেদের হুকুমও অমান্য করা অসম্ভব৷ তবু সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘কুথায় নে যাবে?’
‘আরে বাবা, খারাপ জায়গায় লয়৷’ তর্জনীতে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ঠেকিয়ে টাকা বাজাবার মুদ্রা ফুটিয়ে তোলে ঝন্টে, ‘গেলে এইটি মিলবে৷ লাও ভাই, জলদি কর৷’
‘সারাটা দিন জব্বর খাটনি গেছে, বড্ড ঘুম পাচ্ছে৷ কখন ফিরতে পারব?’
‘যত জলদি গাড়িতে চড়বে, তত তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে যাব৷’
সুতরাং দোকান লাগিয়ে ঝন্টেদের সঙ্গে লাল মোটরে উঠে বসতেই হয়৷
কিছুক্ষণের ভেতরে তারা নবীগঞ্জ টাউনের মাঝখানে যে ঝকঝকে বিশাল আনকোরা চারতলা বাড়িটায় এসে পৌঁছয় সেটা কেষ্টপদ আর নাটকার অচেনা নয়৷ বাড়িটা ধানকল, করাত কল ইত্যাদির মালিক ব্যোমকেশ মজুমদারের৷ হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ থমকে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে লাফাতে শুরু করে কেষ্টপদদের৷ ভয়ে তারা এমনই ঘেমে ওঠে যে মুহূর্তে জামা-প্যান্ট ভিজে সপসপে হয়ে যায়৷ কেষ্টপদর কানের কাছে মুখ এনে চাপা, ভীত গলায় নাটকা বলে, ‘আমরা ফিনিশ গুরু৷ ভবেশ্বরবাবুর বাড়ি যে গিয়েছিলাম, শালারা বুঝিন ট্যার পেয়ে গেচে৷ আমাদের জবাই করবে৷’
কেষ্টপদর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরতে চায় না৷ কোনওরকমে সে শুধু বলে ‘হু’৷
ঝন্টেরা কিন্তু যথেষ্ট খাতির টাতির করেই বিরাট একটা ঘরে নিয়ে এল৷ ঘরটা হাল আমলের আসবাব, ল্যাম্প শেড, সোফা, ডিভান ইত্যাদি দিয়ে সাজানো৷ দেওয়ালে দেওয়ালে এয়ারকুলার লাগানো আছে৷
একটা বড় সোফায় ব্যোমকেশ মজুমদার তার লম্বা এবং খাটো দুই পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন৷ তাঁকে ঘিরে নবীগঞ্জের বেশ কিছু বিশিষ্ট মানুষকে দেখা যাচ্ছে৷ ক’দিন আগে ভবেশ্বর চৌধুরির বাড়িতে যা দেখে এসেছিল এখানেও প্রায় একই দৃশ্য৷
ঝন্টেরা পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে করিয়ে দিলে যথেষ্ট তোয়াজ করেই ব্যোমকেশ বলেন ‘তুমাদের কথা আগেই শুনেচি৷ নবীগঞ্জে এমন দুটি শিল্পী আচে, ভাবতেও আনন্দ হয়৷ তুমরা আমাদের গৌরব হে৷ সে যাক, একটা জরুরি কাজে তুমাদের আনাতে হল৷ এই রাত্তিরে কষ্ট করে যে এসেচ, এতে বড্ড খুশি হয়েচি৷ কী জন্যে ডাকিয়েচি, আঁচ করতে পারচ?’
‘এজ্ঞে না—’ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে কেষ্টপদ৷
‘না জানারই কথা৷ ব্যাপারখানা ভীষণ গোপন কিনা৷ তুমাদের আনিয়েচি দেশের কাজের জন্যে৷’
দেখা যাচ্ছে তারা যে ভবেশ্বর চৌধুরির বাড়ি গিয়েছিল এবং তাঁকে নকল করে তামাশা দেখিয়ে এসেছে, সেটা টের পাননি ব্যোমকেশ৷ হৃৎপিণ্ডের লাফালাফিটা থামে ঠিকই, কিন্তু অন্যদিক থেকে বিস্ময় এবং দুর্ভাবনাটা বেড়ে যায়৷ ভবেশ্বর তাদের দিয়ে দেশের কাজ করাতে চায়৷ তাজ্জবের ব্যাপার, ব্যোমকেশের উদ্দেশ্যও অবিকল এক৷ হতভম্বের মতো কেষ্টপদ বলে, ‘দেশের কাজ!’
‘হ্যাঁ৷ তুমরা তো পারঘাটায় নবীগঞ্জের নানান জনাকে নকল করে অ্যাক্টো কর, শুনেচি৷’
‘ওগুলোন আপনাদের কাচে বলার মতোন লয়৷’
‘আরে বাবা, অত লজ্জাটা কীসের! যা কর, তা তো ভাল জিনিস, যাকে বলে আর্ট— শিল্প৷ তা হ্যাঁ, হে, ভবেশ্বর চৌধুরিকে নিশ্চয়ই তুমরা চেনো৷’
ভবেশ্বর চৌধুরির কথায় স্থানীয় টান সামান্যই আছে৷ তার কারণ ফি মাসে অনেকগুলো দিন তিনি কলকাতায় কাটান৷ কিন্তু ব্যোমকেশ মজুমদার এ শহর ছেড়ে ক্বচিৎ বাইরে বেরোন, তাই কথা বলার ভঙ্গিতে আঞ্চলিক ছাপটা স্থায়ীভাবে পড়ে গেছে৷
কেষ্টপদর বুকের ধড়ফড়ানি ফের বেড়ে যায়৷ সে ঝাপসা গলায় বলে, ‘চিনি’৷
ব্যোমকেশ বলেন, ‘এই লোকটার পয়েগা হারামজাদা দুনিয়ায় খুব বেশি জন্মায়নি৷ তুমরা কি জানো, ভবেশ্বর মাস্তান দিয়ে জুলুম করে গরিব লোকজনকে উৎখাত করে দেয়৷ তাদের জমিন, বাড়িঘর দখল করে সেখানে বিরাট বিরাট ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করে লাখ লাখ টাকা লুটচে? তাছাড়া স্মাগলিংটাও চালিয়ে যাচ্ছে?’
এই খবর জানত না কেষ্টপদ৷ সে বিভ্রান্তের মতো তাকিয়ে থাকে৷
ব্যোমকেশ থামেননি, ‘তুমাদের জন্যে ড্রেস করিয়ে রেখিচি৷ ঝন্টের সঙ্গে গিয়ে সেগুলো পরে এসো৷’
পাশের ঘর থেকে ধাক্কাপাড়ের মিহি ধুতি আর সিল্কের বেনিয়ান পরে আসে৷ নাটকার জন্য ব্যবস্থা হয়েছে থান কাপড়ের৷ সে বিধবা সেজে এসেছে৷
ব্যোমকেশ এবার জানিয়ে দেন, কেষ্টপদদের কী করতে হবে৷ মাঝরাতে দলবল নিয়ে বন্দুক হাতে স্বয়ং ভবেশ্বর এক বিধবার বাড়ি চড়াও হবেন এবং অসহায় মহিলাটিকে বার করে দিয়ে বাড়িটার দখল নেবেন, সেটা ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে বিরাট ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করবেন৷ এই মূকাভিনয়ে ভবেশ্বরের চরিত্রটি করতে হবে কেষ্টপদকে, আর বিধবার ভূমিকায় থাকবে নাটকা৷
কাঁদো কাঁদো বিপন্ন মুখে কেষ্টপদ বলে, ‘কিন্তন বাবুমশাই, আমরা তো ভবেশ্বর বাবুমশাইকে কারও ঘর ভাঙতে দেখি লাই৷ নকল করব কী করে?’
ব্যোমকেশ সস্নেহে হেসে হেসে বলেন, ‘আহা তুমরা হলে গে আর্টিস্ট মানুষ৷ মাথা খেটিয়ে, মনে মনে জিনিসটা ভেবে লাও, তারপর করে ফ্যালো৷’
কেষ্টপদ জানে, একবার যখন টেনে এনেছে তখন আর সহজে পার পাওয়া যাবে না৷ নাটকার সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যোমকেশের ফরমাশ মতো অভিনয় করে দেখায় দুজনে৷
ব্যোমকেশ ঘরের অন্য সবাইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী, চলবে?’
সবাই একসঙ্গে বলে ওঠেন, ‘চলবে মানে! এ তো চমৎকার৷ এ জিনিস দু-চারবার দেখাতে পারলে আপনার জিত ঠেকায় কে?’
পকেট থেকে তিনখানা একশো টাকার নোট বার করে কেষ্টপদকে দিতে দিতে ব্যোমকেশ বলেন, ‘তুমাদের আমার খুব দরকার কেষ্টপদ৷ পরে আবার ঝন্টেদের পাঠাব, চলে এসো৷ অনেক রাত হয়েছে, এখন গিয়ে শুয়ে পড়৷ আর আজ এখানে যা করলে সেটা ভারি গোপন ব্যাপার, কাকপক্ষীতে য্যানো টের না পায়৷’
ভবেশ্বর দিয়েছিলেন দুশো, ব্যোমকেশ দিলেন তিনশো৷ তাদের ঘিরে যে কড়কড়ে নোটের হরির লুট শুরু হয়েছে, তাতে কেষ্টপদরা খুব একটা খুশি না, উল্টে তাদের দুর্ভাবনা বেড়েই চলেছে৷ ভবেশ্বর এবং ব্যোমকেশ যে পরস্পরের ঘোর শত্রু সেটা আন্দাজ করে নিয়েছে কেষ্টপদরা৷ দুজনেরই অঢেল পয়সা এবং হাতে প্রচুর মস্তান৷ এদের মাঝখানে উলুখাগড়ার মতো প্রাণটা না চলে যায় তাদের৷
পরদিন নিশিকে ব্যোমকেশের ব্যাপারটা জানাতে সে ভীষণ ঘাবড়ে যায়৷ বলে, ‘খুব বিপদ৷ এক কাজ কর বেটাছেইলে—’
কেষ্টপদ জিজ্ঞেস করে, ‘কী?’
‘সেই কলেজে পড়ায় অমলেশবাবু, বড্ড ভাল মানুষ, তেনার পরামশশো লাও৷ তেনি যা কইবেন সেই মতোন চল৷’
সত্যিই তো, অমলেশের কথাটা আগেই মাথায় আনা উচিত ছিল৷ কেষ্টপদ দোকানপাট ফেলে তৎক্ষণাৎ নবীগঞ্জে অমলেশের বাড়ি চলে যায়৷ সেখানে যা খবর পাওয়া গেল তাতে বুকের ভেতরটা ভীষণ দমে যায়৷ অমলেশবাবু নবীগঞ্জে নেই, কলকাতা থেকে ফিরবেন দিন পনেরো বাদে৷ ততদিন হরেন আর ঝন্টেদের মিঠে কথায় ঠেকিয়ে রাখা ছাড়া উপায় নেই৷
দেখতে দেখতে আরও কদিন কেটে যায়৷
এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ঝন্টেরা আর হরেন এসে কেষ্টপদদের সঙ্গে গল্পসল্প করে গেছে৷ একই সময়ে এসে যে হাজির হয়নি, এই যা রক্ষে৷ দু’পক্ষই তার আর নাটকার অভিনয়ের তারিফ করেছে৷ ওদের যাঁরা পোষেন সেই ভবেশ্বর আর ব্যোমকেশ যখন তাকে আর নাটকাকে এত খাতির করছেন, তখন ওরা তো করবেই৷
কথায় কথায় কায়দা করে কেষ্টপদ এত খাতিরের কারণটা হরেনদের কাছে একদিন বার করে ফেলে৷ মাসকয়েক বাদে ভোট আসছে৷ ব্যোমকেশ আর ভবেশ্বর এবার নির্বাচনে টিকিট পেয়েছেন৷ দুজনেই চান জিতে বিধানসভায় যাবেন৷ বিরুদ্ধ পক্ষকে খতম করার জন্য তাঁরা যে রণকৌশল ঠিক করেছেন তা এইরকম৷ নির্বাচনী মিটিংয়ে বক্তৃতা-বক্তৃতার আগে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে৷ সেই ফাংশানে নাটকা আর কেষ্টপদকে দিয়ে মূকাভিনয় করিয়ে ভবেশ্বর ভোটারদের বুঝিয়ে দেবেন ব্যোমকেশ কী জঘন্য চরিত্রের মানুষ, ব্যোমকেশের উদ্দেশ্যও হুবহু এক৷ অর্থাৎ কিনা প্রতিপক্ষের চরিত্রহননের জন্য কেষ্টপদদের দিয়ে কাদা ছেটানো৷
দিন পনেরো আকণ্ঠ উদ্বেগে কাটানোর পর অমলেশের সঙ্গে দেখা হয় কেষ্টপদর৷ সমস্ত শোনার পর মুখ শক্ত হয়ে ওঠে তাঁর; বলেন, ‘ওই দুটো বদমাশ৷ ওদের মতো অসৎ লোক নির্বাচনে জিতলে দেশের ক্ষতি৷ তুমি আপাতত ওদের এড়িয়ে চল৷ আমি তোমাকে অন্যভাবে কাজে লাগাব৷’
ভীরু গলায় কেষ্টপদ জানতে চায়, ‘কীভাবে?’
‘এবার এখান থেকে নারায়ণ সেন ভোটে দাঁড়াচ্ছে৷ খুব পরোপকারী সৎ মানুষ৷’
‘জানি৷ মানুষের তরে খুব করেন৷’
‘ওকে জেতাতে হবে৷ ওর হয়ে কাজ করার জন্যে মাস দুয়েকের ছুটি নিয়ে এসেছি৷ আসচে সপ্তাহে নারায়ণের প্রথম নির্বাচনী মিটিং হবে৷ আমার কাছে খবর আছে ভবেশ্বর কি ব্যোমকেশ এখনও মিটিং টিটিংয়ের কথা ভাবেনি৷ ওরা শুরু করার আগে আমরা আরম্ভ করে দেব৷ সেখানে তোমাকে দিয়ে মূকাভিনয় করাব৷ দুজনের স্বরূপ নবীগঞ্জের লোককে তুমি দেখিয়ে দেবে৷’
কেষ্টপদ চমকে ওঠে, ‘কিন্তু ওদের হাতে ঢের মস্তান আচে৷’
অমলেশ বলেন, ‘কোনও ভয় নেই৷ দেশটা এখনও মগের মুলুক হয়ে যায়নি৷’
‘ওরা যে ট্যাকা দিয়েছে—’
‘তুমি তো আর ভিক্ষে চাইতে যাওনি৷ যদি ফেরত চায় দিয়ে দেবে৷ নারায়ণের মতো মানুষের পাশে আমাদের সবার থাকা উচিত৷’
নারায়ণ সেনের নির্বাচনী জনসভায় কেষ্টপদ আর নাটকা নিঃশব্দ অভিনয়ে বুঝিয়ে দেয় ভবেশ্বর আর ব্যোমকেশ কী সাংঘাতিক চরিত্রের মানুষ৷
দেখতে দেখতে জনতা একেবারে চমৎকৃত৷ তাদের হাততালি আর থামতে চায় না৷
এরপর তিনটে দিনও কাটে না৷ হঠাৎ মাঝরাতে আগুন লেগে পারঘাটের দুটো দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়৷ ও দুটোর ভেতর ঘুমিয়ে ছিল কেষ্টপদ আর নাটকা৷
দুই মূকাভিনেতাকে যখন ছাইয়ের স্তূপ থেকে বার করা হল তখন আর চেনা যাচ্ছিল না৷
খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন অমলেশ৷ তাঁকে উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল৷ একধারে দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে বলছিলেন, ‘এ আমি ভাবতে পারিনি৷ আমারই জন্যে—’
চারদিকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি মানুষ৷ তার ভেতর নিশি একটানা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে, ‘এ কী হল গ... এ কী হল?’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন