অশোক দাশগুপ্ত
ট্যাংরার চোখে আগুন৷ সেই আংরাটি ঠিকরে যায় রতনের দিকে, রত্না— শত্রুকে ভালমতো জানতে পারলে তবেই তাকে হাপিস করে দিতে সুবিধে হয়৷
রতনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ৷ সন্দেহে ভরা৷ মদে জিভ না ভেজালে তার জিভের জড়তা কাটে না৷ তাই সে নিজেকে সংবরণ করে ঠোঁটের টেপায় শুধু একটা বিড়ি গুঁজে দিল,— তারপর হিন্দুমতে অগ্নিসংযোগের মতো একটি হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস৷
কথা বলা হয়ে গেলে স্বল্প নীরবতা পালন করে ট্যাংরা৷ এটা তার ধাত— চরিত্র৷ কখনও বুঝে কখনও বা না বুঝেও নীরব হয়ে যায়৷ যেন পিছনপানে হাঁটতে শুরু করবে এইবার৷
ছোট মফসসল শহর৷ সন্ধ্যায় আদিম রহস্য এসে একটি জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো লাগে তার গায়ে-মাথায়৷ অল্প ভোল্টেজের নিষ্প্রভ বাল্ব ঝুলছে লাইটপোস্টের নাকে— বেশ কাঁপা কাঁপা আলো হাওয়ায় সেই নাকছাবি হরেক ইঙ্গিত হানে৷ এই আলো-আঁধারি কেটে শাঁ শাঁ পৌঁছে গেল অখিলের সাইকেল৷
শ্লা এসে গেল,— কেতরেবেতরে হাসে ট্যাংরা৷ সুপ সুপ করে চা খায়৷
অল্প কয়েকটি রিকশা দাঁড়িয়ে৷ চা দোকানের সামনে জটলা৷ দু-একটি মাতাল৷ ফড়ে৷ দালাল৷ বচসা চলতে থাকে খুচরো কথায়৷ যে যার সে তার, কারও মাথাব্যথা নেই৷
অখিল হাঁফ ছাড়ে, ম্যাটিনি শোতে একটা ট্রিপ মেরে এলাম৷ শ্লা সিটে ছারপোকা৷ — মাঝখানে লোডশেডিং৷ স্ক্রিনে ঢিল পড়ল দু’বার৷ — বৌদি, চা লাগাও৷
আটপৌরে অভাবী বাঙালি বৌদি এখানে চায়ের দোকান পেতেছে৷ খরিদ্দের বলতে গুণের দেওরেরা৷ আশ্বিনের বাতাসে মেয়েটির কানের পাশে চুলগুলি ফিসফিস করে৷ আদা ছেঁচে সে— তোফা চা বানাতে থাকে৷ আর হাসে৷
বৌদির নাম সরস্বতী৷ গতর ভাল৷ আরে আমার দুষ্টু সরস্বতী! মুখের দাম লাখ টাকা৷
ট্যাংরা বলল, সেনিমাতে গেলি মেয়ে পেলি কোথা?
এতক্ষণে রতন গলাটি একটু ঘড়ঘড় করে, শ্লা ভুলে গেলি নাকি৷ অখিলের তো বউ আছে৷
বউ? অ— এই বলে ট্যাংরা একটি লম্বা পূর্ণচ্ছেদ টানল৷ তারপর তাকিয়ে রইল কলেজ মাঠের দিকে৷
মাঠের দিকে এখন কিছুটা আবছায়া৷ এইখানে লেক্সপো, এক্সপো হয়৷ জ্যোতি বসুর জনসভা হয়৷ নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের পরিচালনায় দশ মাইল দৌড় প্রতিযোগিতা হয়৷ ভরা গ্রীষ্মে ছোটে রোদের তেজ, বর্ষায় হু হু বেড়ে যায় ঘাসের মাথা৷ কাদা ছিটিয়ে ছেলেছোকরারা ফুটবল খেলে আর রাতের গভীরে এক বুক অস্পষ্টতা ধরে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মাঠ৷ ট্যাংরার চোখ এখন সেইদিকেই৷ কিন্তু মনের হয়ত কোনও দিক ঠিকানা নেই৷ কি ভাবছে সে কে জানে৷
হঠাৎ যেন একবুক রক্ত থেকে ভুস করে ভেসে উঠে চোখের সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মোটর সাইকেলটা৷ রয়েল এনফিল্ড— ইংলন্ড৷ ব্যবহার করা সাবানের পিচ্ছিলতা নিয়ে পাকা চেরিফলের রঙ ধরেছে বাইক৷ ছোট তারক নামে৷ ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি৷ বুকে লোম৷ গলায় চেন, সোনা বা ইমিটেশন বোঝার উপায় নেই৷ লাঙলের ফলার মতো তীক্ষ্ণ উদ্ধত নাক৷ চায়ের থেকে এই দোকানটির প্রতি তার আসক্তি বেশি৷ সে ডাক দিল, বৌদি—
সরস্বতী চিনেমাটির প্লেটটি এগিয়ে দিল৷ মুরগির ঠ্যাং আর ধোঁয়া৷ তারপর একটু কংগ্রেস আর সি পি এমের আলোচনা৷ ছোট তারক ইশারায় কাছে ডাকল ট্যাংরাদের৷ তারপর পাঁইটের ছিপি খুলল৷ এখনও রাত ৯টা বাজেনি৷ কিন্তু কে কাকে পরোয়া করে পৃথিবীতে৷ পুলিস মানেই তো ফুলিশ৷ বান্ডিল ধরে দাও— চুপ৷
তারক চোখ কপালে তুলে বলল, মালটার খবর কি? পাত্তা লাগা—
হঠাৎ বচসার স্রোত যেন কয়েক গজ পিছিয়ে গিয়ে পিছন পানে লাইট ফ্যালে৷
নতুন নয়, ছিন্নভিন্ন ইতিহাসগুলি জোড়াতালি লাগিয়ে অন্তত দু-একশো বছরের ইতিহাস আছে এই শহরের৷ পোড়োবাড়ি, মন্দির, প্রাচীন বটগাছই শুধু নয়— জটিলকুটিল ক্ষমতালোভী মানুষদের গল্প আছে, হিংসা আছে৷ ভালবাসাবাসির দৃষ্টান্ত আছে৷ স্বপ্ন, কান্না, প্রার্থনা, থাপ্পড়, জাঁতাকল আর লখিন্দরের যাত্রা এই নিয়েই তো জনপদের জীবন৷ তার কি কোনও বিরাম আছে৷ সেই প্রাচীন জীবনরীতি শুধু যা একটু ঝকঝকে হয়েছে৷
ট্যাংরা বলল, গুরু খতরনক আদমি আছে৷
তারক হিন্দি শুনে প্রথমে থ৷ তারপর বলল, শতকরা পাঁচজনও ওর সঙ্গে নেই তা জানিস৷
জানি—
তবে?
হাই হাই লোকদের সঙ্গে র্যাপো আছে৷
কিন্তু ওই শ্লা মার্কেটে থাকলে আর ব্যবসা করে খেতে হবে না চাঁদু৷
ওরা গল্প করছিল যে বিষয়ে সেখানেই ওদের চলল লড়াই৷ এর সঙ্গে কিছুটা অর্থনীতি ও রাজনীতিও বুঝি জড়িয়ে আছে৷ লোকটার নাম মধুসূদন আঢ্য৷ থাকে সিপাইবাজারে৷ মাছের আড়ত আছে, হোলসেল ডিলার৷ সাদা খদ্দরের কুর্তা-পাজামা পরে মাঝে মাঝে দিল্লি যাতায়াত করে৷ আর সঙ্গে এই ছোট ভাই তারকের কেমন যেন একটা অবাধ্য খাড়াখাড়ি আছে৷ —ভারতীয় কমিউনিস্টদের এ এক ধরন৷ অঙ্ক কষে উদ্ধার করা যাবে না৷
সরস্বতী বৌদির হাঁড়িতে তখন রাতের ভাত আছে৷
শহরের যে ড্রেনটা সটান কাঁসাই নদীতে গিয়ে গা সেঁদিয়েছে তার পরনে কালো কাপড়৷ ঘিঞ্জি শহর৷ বাড়ি, খাটা পায়খানা, নোংরা আবর্জনা বয়ে বয়ে সে ড্রেন চরিত্রটি একেবারে খুইয়ে বসে আছে৷ একটা নোংরা নদীর মতো তার দুই পারে বসতি৷ আস্তানা৷ বেশ্যাপল্লী৷ ভাটিখানা৷ অস্বাভাবিক সব কাণ্ড৷
তারকের কথার জবাবে প্রস্রাব পেয়ে যায় ট্যাংরার৷ অবশ চোখে উঠে গিয়ে দাঁড়ায় এই দরজার আড়ালে৷ এবং ফিরে আসে তাজা হয়ে৷ একটা আর্দ্রতার সৃষ্টি হয়৷
রত্না বলে, ছোকরা বহুৎ ক্যাওড়া—
গল্পের গরু গাছে ছিল মুহূর্তে সে লাফ দিয়ে ডালে এসে দাঁড়ায়৷ এবং প্রসঙ্গ পাল্টে যায়৷ তারকের চোখ বিড়ালের মতো জ্বলে উঠে স্থির হয়ে যায়৷ দূরে ট্রেনলাইন থেকে হাতিয়া এক্সপ্রেসের ডাক ভেসে আসে৷ আর ঢক ঢক করে খায় অখিল৷
অসময় আকাশে মানুষের আশার মতো শীর্ণ একটুখানি চাঁদ ওঠে৷ তাওয়ায় ভাজা নানা বর্ণের পোস্তবড়ার মতো সেই চাঁদের আলো৷ দেখলেই মনে হবে কোথায় গিয়ে স্খলন ফিরে এল৷
আকাশ কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে চারদিক৷ দেখা যায় মাঠে নির্মীয়মাণ দুর্গাপূজার প্যান্ডেলের কাঠামো৷ বাঁশের ডিজাইনে ম্যারাপ পড়তে শুরু করেছে৷
অখিল ঢোক গিলে বলল, তুমি তাকে বিয়ে করবে গুরু? নাকি খালি মস্তি মারবে?
ট্যাংরা তারককে চোখ টিপে কোনও ইঙ্গিত করে৷ তারক সায় জানায়৷ এটা আর কেউ বোঝে না, সঙ্গোপনে ঘটে যায়৷
লাল চোখে এইবার তাকায় তারক৷ যেন তার চোখের ডালপালায় রক্তজবা ফুটে আছে দিব্যি৷ — লক্ষ্য অখিল৷
এ অঞ্চলের সবাই জানে ছোট তারকের মনে একটি গোপন দুঃখ লুকিয়ে আছে বহুকাল৷ তার বাবা খারাপ লোক৷ মা মারা গিয়েছে শৈশবে— অনেকটা ফিল্মের হিরোদের মতো সে জন্মবঞ্চিত৷ কিন্তু দুর্দান্ত৷ অচল পয়সা কিন্তু ভালবাসার কাঙাল৷ আবার স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে দহরম আছে ভাল৷ শুধুমাত্র তাসের আড্ডাতেই বহুৎ টাকা লড়িয়ে দিতে পারে৷
রক্তহীরের মতো চোখ দেখে অখিল প্রায় নিরুপায় হয়েই একপ্রস্থ হেসে ফেলল৷ অর্থাৎ সঙ্গী সমান সমান৷
— তা অবশ্য৷ তারকদা তোমার দিল আছে বটে৷ অনুপের খোঁড়া বোনটার বিয়েতে তুমি যে একবাক্যে দশ হাজার টাকা দিয়েছিলে কে না জানে! এমন কি তুমি এত দাও-থোও অথচ ক্লাবের কোনও পোস্টে থাক না—
এদের ক্লাবের নাম ‘সর্বউন্নয়নীসভা’৷ তারই পরিচালনায় এই শহরে মাঝে মাঝে টিকিট কেটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়৷ লতা মুঙ্গেশকর নাইট হয়৷ পথের ধারে বৃক্ষরোপণ উৎসব হয়৷ নিরক্ষরতা মোচনের অভিযান চলে৷ শহরের বহু মান্যগণ্য ব্যক্তি এর পৃষ্ঠপোষক৷ সদস্য৷ ট্যাংরা এই কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি৷ বাকি সবাই প্রাথমিক সদস্য৷ শহরের পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা তুলে একটাই মাত্র দুর্গাপূজা হত এখানে৷ তা চলত এই সর্বউন্নয়নীসভার পরিচালনায়৷ গেল দু’বছর ধরে আক্রামবাজার আর সুলতানপাড়া এই দুই সাইডে পুজো হচ্ছে৷ তাতে অবশ্য খুব খুশি নয় এই ক্লাবের মেম্বাররা৷ সময় পেলে তারা জবাব দেবে এমন একটা প্রতিজ্ঞা তাদের মনে মনে৷ তাদেরই পুজোর প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলেছে ওই কলেজের মাঠে৷ এখনও মাসখানেক দেরি আছে৷ তা থাক, প্যান্ডেল হবে জেলার সেরা৷
একটু থামে অখিল৷ যেন বা কিছুটা প্রচ্ছন্নে রেখে দেয়৷ কিন্তু নিঝুম সন্ধ্যার আচ্ছন্নতাকে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে দেয় অন্য এক নীরবতা৷ দেখা যায় দিব্যি রাস্তা বরাবর দুটিতে গল্প করতে করতে আসছে—৷
চকিতে চা দোকানের আটচালা থেকে চারজন বেরিয়ে গিয়ে বোবা রাত্রির মতো দাঁড়িয়ে পড়ে রাস্তার ধারে৷ অমনি মেয়েটির টসটসে মুখ গোমড়া একটি মরা গাছের মতো স্তব্ধ হয়ে যায়৷
পাশের ছেলেটি কী যেন তাকে বলে— কী হল৷
মেয়েটি হরিয়াল পাখির মতো চোখে চোখে ভয় খায়৷
দুজনের সমস্ত সৌন্দর্য হঠাৎ উবে যায় একদল চোয়াড়ের মুখোমুখি হতে৷
কিন্তু কেউ কোনও কথা বলে না৷ চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল তারা৷ তারা দুজন৷
এইবার, এই চোয়াড়ে ছেলেছোকরাদের দলটি যেন নিজেদের অস্তিত্ব কাপাস তুলোর মতো ছড়িয়ে দিল ব্রহ্মাণ্ডে৷
তারাভরা আকাশে তবু কেন মৌন রাতের লীলা৷ কেউ কোনও কথা বলল না কিছুক্ষণ৷ কিন্তু প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের বিনিময় চলতে লাগল৷ সেয়ানা বয়স— এই বয়সে মানুষের মনে কত না খেয়াল উপস্থিত হয়৷ তারা নড়েচড়ে দাঁড়ায়৷ তাকায় পরস্পরের দিকে৷ ভাবে ভাব লাগায়৷
কী যেন এক হঠাৎ নৈঃশব্দ্যে শহরের রাতটা ঘুম থেকে জেগে উঠল অতর্কিতে৷
তারক বলল, ছেলেটা থাকে কোথায়?
অনুক্ষণ সতর্ক থাকে ট্যাংরা, গলায় সেই আলাপ৷ তার আঙুল চলে যায় দক্ষিণ দিকে৷ গোল দিঘির ধারে৷ ওই চ্যাটার্জিবাড়িতে—
মেসে?
হ্যাঁ৷
আর মেয়েটা?
কোতোয়ালি বাজারের হারাধন দাসের মেয়ে৷ ওর বাপ সেই যে মিউনিসিপ্যালিটির ভোটে দাঁড়িয়ে হেরেছিল— সিমেন্টের ব্যবসা—
পাকা বিলাতি বেগুনের মতো জ্বলছে বাল্বগুলি লাইট পোস্টের মাথায়৷ পথেঘাটে কুকুরের ছোটাছুটি— শালাদের ইয়ে এসেছে৷ অখিল আর রতনের বুক ধকধক করে যুক্তিহীনতায়৷ ওরা তাকিয়ে দেখে আকাশে উড়তে থাকা পাশাপাশি দুটি ঘুড়ির মতোই সেই ছেলেটি আর মেয়েটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়৷ যেন ফুলকপিটি পাতার আড়াল গড়ে লুকিয়ে নিল নিজেকে৷ (—অন্ধকারের এমনই পক্ষপাত)৷
ওরা বুমেরাং ফিরে এল চা দোকানে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তখন দোকান অনেকটা ফাঁকা হয়ে এসেছে৷
বৌদি সরস্বতী একটু ছেনালি হেসে তারকের দিকে তাকাল৷ বলল, যাই বল ভাই মেয়েটিকে সত্যি দেখতে ভাল৷ একটা ঢলঢলে ভাব আছে৷
আলগা বুকের পলি যেন ছুটে আসতে চায় তোড়ভাঙা টানে, সরস্বতী কোমর দোলায়৷ ছমকছলি ছন্দে৷ কপালে সিঁদুর নেই৷ কোথাও কোলাহল নেই৷ খুব সরু কোমরের গড়নে মিহি শুধু তার চোখের চাউনি৷ আর পাবদা মাছের ডুমো পেটিটির মতো পেটটি দেখা যায়৷
সরস্বতী দেখতে পায় নর্দমাতে একটা শুয়োর যেন ঘোঁত ঘোঁত করে ঘাঁটছে৷ সে বলে ওঠে,— হ্যাট৷ — যা৷ — পালা—
রতন বলে, ওই মেয়ের পানে অনেকের চোখ গেছে৷ সাবধানে বাবা—
সরস্বতী একবার চোখ বুলিয়ে নিল সামনে, গলায় কোনও সুর নেই তবু আওয়াজ— তোমরা তো ভাই একেবারে মরা৷
কেন, কি হল যে মরা মনে হল৷ দেখবে নাকি একবার৷ চল, ঘরে খিল তুলে দেখাই৷ ট্যাংরার খর জবাব৷
আমাদের দেখিয়ে কি লাভ, মেয়েটা সামনে দিয়ে গেলেই সব শিয়ালের মতো হ্যা হ্যা কর৷ কেন ছেলেটাকে কলার ধরে ধমকানি মারতে মুরোদ নেই৷
নেশা করে ঝুম হয়ে বসে আছে ভদ্রলোকের ছেলে ছোট তারক৷ তার বাবা এই কলেজের একজন প্রফেসর৷ চাঁদের আলোয় তারকের গায়ের রঙ এখন পাকা বাতাবি লেবুর খোসার মতো পুরু দেখায়৷ তাকেই খুশি করার মতলবে বৌদি সরস্বতী এমন ছেনালি গায়৷ অমনি তারক ফের ছিপি খুলে গলায় ঢালল৷
কিছুক্ষণ চুপ থেকে গলা তুলে অখিল বলল, চমকাব বলছ? পুলিস কেস হলে কে মাল্লু জোগাবে?
রতন আঙুল তুলে তারককে দেখিয়ে দেয়, লাগে নোট গৌরী সেন দেবে৷ আছেই তো—
আ মরণ, মশায় কাটে যে,— নিজের পিঠেই ঠাস করে থাপ্পড় মেরে মশা তাড়ায় সরস্বতী৷ আর আড় চোখে চোখে দেখে৷— পাঁচটা মানুষকে যেন বড়সড় পাঁচটা পাথর বলে মনে হয়৷
চুপ ছিল ট্যাংরা৷ এইবার ছোট তারকের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে৷ চিন্তা মৎ কর৷ হয়ে যাবে৷ সব ঠিক হো যায়ে গা৷
এই বলে একটা হাঁটু প্রায় সরস্বতীর পাছার দিকে গুঁজে দেয়৷ যেন ঠ্যাঙের তলায়৷ মাগীটা রাঁঢ়৷ — কবেই তো বর ছেড়ে পালিয়ে গেছে৷ ভাগ্যিস গেছে৷
হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে যেতে দেখা গেল টিম টিম করে জ্বলছে কুপি৷ বড় মিঠে আলো তার৷
একটু হেসে অখিল বলল, মাখো মাখো, ভাই৷ — ভাল করে মাখো৷ আমি যাই রাত হল৷ বউ আবার খিল খুললে বাঁচি৷
এই অস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য কিছুটা দায়ী আনন্দ নিজেই৷ এক ধরনের জেদ তার শরীরের আষ্টেপৃষ্ঠে বোনা৷ মেসে থাকে৷ সুস্থ মাথার ছেলে সে নয়৷ মনিঅর্ডার করে বাড়ি থেকে টাকা এলে সে ফিরিয়ে দেয়৷ টিকে থাকার একটা জটিল প্রবণতা তাকে একের পর এক টিউশন জোগাড় করে দেয়৷ তবে তার মনে হয়, এ সংসারে যারা টাকার বাজনা বাজিয়ে জগৎটাকে চালায় তাদের কোনওদিনই জয় হবে না৷ তাই ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে মাসের শেষে কটা টাকা উপায় করতে গিয়ে তাকে মাঝে মাঝেই অপমানিত হতে হয়৷ এক ধরনের হতাশা তৈরি হয় সাময়িক, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তা অসাফল্যের মতো দেহ থেকে ঝরে যায়৷ তখন মুগ্ধ নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে আনন্দ৷
সকালটি এই শহরে দেখার মতো৷
আজ মেসের বাজারটি ভাল হয়েছে৷ ঢেঁড়স আর আলু কেনা হয়েছে ঢালা৷ একটা ঘণ্ট হবে৷ রেশনের পোকায় খাওয়া চাল— নইলে দিয়ে জোগানো যাবে না৷ বিউলির ডাল হবে পিছলে— মুখে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে হড়কে ভেতরে ঢুকে যাবে৷
পেস্ট ব্রাশ দাঁতে গুঁজে নিয়ে আনন্দ গিয়ে পায়খানার লাইনে দাঁড়াল৷ একটাই মাত্র পায়খানা ঘর— বহুকালের পুরনো খাটা পায়খানা৷ আলো ঢোকে না৷ দুটি ধ্বস্ত ইট পাতা৷ — নিচে গুড়ের খালি টিন পাতা৷ মেসের মোট মেম্বার ১০৷ লাইনে দাঁড়িয়ে পজিশন পেতে পেতে দাঁত মাজা হয়ে যায়৷ মগ বালতি কাছেই৷ মুখ ধোয় আনন্দ৷ ফের এসে লাইনে দাঁড়ায়৷
বহুকালের পুরনো পোড়োবাড়িটি মেরামত করে এই মেস৷ মালিক যিনি তিনি গত হয়েছেন৷ তাঁর ছোট পুত্র এখন মেস দেখে৷ মদ খায়৷ আর জুয়ার আড্ডায় যায় নিয়মিত৷
দেওয়াল ফেটে বটগাছ উঠে যাচ্ছে ঊর্ধ্বে, স্যাঁতসেঁতে ঘর৷ এই ছবি থেকে মধ্যবিত্ত বাঙালির চেহারাটা পরিষ্কার নিজেকে জাহির করে৷ দিনে দিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে আনন্দ৷ লাইট আছে, ফ্যান নেই৷ সময় মতো ভাতও সুসেদ্ধ হয় না৷
মানুষের জীবন নিয়ে এই যে যত্রতত্র খেলা তার কোনও প্রতিকার খুঁজে পাওয়া যায় না৷ একটি আটপৌরে ঘরের ছেলে আনন্দ গতরাতের ভেজানো ছোলা গুড় দিয়ে খেয়ে স্টেশন রোডের উদ্দেশে রওনা দেয়৷ ৮টা থেকে ১০টা এই দু ঘণ্টা পড়াতে হবে৷ —মেয়েটিকে অঙ্ক শেখানো যে কি কাজ!
সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নিচে নামতে গিয়ে আনন্দের গায়ে এসে লাগল কাঁচা হলুদের মতো এক গুচ্ছ রোদ৷ এই রোদ মনে করিয়ে দেয় পুজো আসছে৷ হঠাৎ ভাল লেগে যায়৷ কোনও গানের কলি সে গুনগুন করে গাইতে গাইতে নিচে নামে৷ সামনের চায়ের দোকানে চা খেয়ে দেবে হন্টন৷
বৌদি চা দাও তো—
সরস্বতীর এখন অন্য চেহারা৷ সকাল সকাল স্নান সেরে— ভিজে চকচক করছে৷ দুধ ফুটছে কড়ায়৷ কেউ টোস্ট খাচ্ছে৷ কেউ পেপার পড়ছে৷
এই যে—
সন্ধেবেলায় এই চা দোকানে ঢোকা দায়৷ রাজ্যের বাউন্ডুলে এসে ভিড় করে৷ হাঁফ ছেড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল আনন্দ৷ সরস্বতী বলল, দাঁড়িয়ে কেন— বোস—
না, তাড়া আছে—৷ এমনিতেই দেরি করে ঘুম ভেঙেছে আজ—
কোথায় চললে?
কোথাও আর, পড়াতে৷ আজ পয়সা নেই বৌদি৷ পরে নিও, এখন তুমি খাতায় লিখে রাখ৷
এই বলে কাপটি নামিয়ে রেখে দ্রুত হাঁটা দেয় আনন্দ৷ ১০টায় উঠে মেসে ফিরে স্নান করে কলেজ—৷ তারপর শান্তির সঙ্গে আড্ডা৷
দোকানেই বেঞ্চের একধারে বসে ছিল রতন৷ রোজ সকালে চা খেতে সে এখানেই আসে৷ চা খেয়ে বিড়িটি কানের কাছে টিপে টিপে তামাকের সড়সড় শুনছিল সে, এই ধরাবে ধরাবে— এমন সময় ছেলেটি এল৷ ধরানো হল না— ছোকরার রকম দেখতে লাগল৷ দিব্যি কার্তিক ঠাকুরের মতো দেখতে৷ চুলে টেরি কাটে৷ গাঁ থেকে এসে সে আবার ধরেছে জিনসের প্যান্ট৷ এই ভদ্র ভদ্র চেহারাগুলিকে রতনের ভারি অবিশ্বাস লাগে৷ সে বিড়িটি ধরিয়ে প্রথমে সুখটান মারে৷ তারপর বলে, কি বৌদি খুব যে পিরিত৷
সরস্বতী এদিক ওদিক তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নিষেধনামা দেয়৷ এখন সকাল— দোকানে সব ভদ্র ভদ্র লোকজনেরা বসে চা খাচ্ছেন আর পেপার পড়ছেন৷ ঠোঁটে সরস্বতীর হাসি আর কটাক্ষ৷ অমনি রতনের মাথায় বুদ্ধি এল৷
একটু পরে এল বিশু, অমিয়, অখিলকাকা আর ট্যাংরা৷ ওরা রসিদ বই হাতে পুজোর কালেকশনে বেরিয়ে পড়ল৷
ছাত্রীর বাড়িতে এসে আনন্দ জানল ছাত্রী অসুস্থ৷ জ্বর উঠেছিল কাল রতে৷ আজ ভাতও খাবে না, পড়বেও না৷ চটজলদি ফিরে এসে মেসে দেখল স্নানের লাইন প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে৷ মাথায় নারকেল তেল আর গায়ে সর্ষের তেল লাগিয়ে চৌবাচ্চার কাছে এসে দাঁড়ায় আনন্দ৷
পৈতেটিকে কানের কাছে তুলে দিয়ে প্লাস্টিকের বালতিতে জল ভরে ভরে গায় ঢালল৷ গামছায় ডলে ডলে মুখ গা মুছল৷ ঘরে ফিরে গিয়ে রামকৃষ্ণদেবের সামনে ধূপ জ্বালাল৷ তারপর দ্রুত প্যান্টজামা পরে ঠাকুরের কাছে গিয়ে বলল, ঠাকুর খেতে দাও৷ এইবার সে খেতে দেখল ওয়েটিং ক্যাম্পাসে কে একটি মেয়ে কোন বোর্ডারের জন্য অপেক্ষা করছে৷ — বেশ ভাল দেখতে তো৷ তাকিয়ে তাকিয়ে দু- একবার দেখল আনন্দ৷
তারপর ভাত খেয়ে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে বালিশের তলা থেকে চারমিনার সিগারেট প্যাকেটটি নিয়ে বুক পকেটে রাখল আনন্দ৷ এবং ছোট ডায়েরিটি আর কলমটি হাতে নিয়ে কলেজে যাবে বলে বেরিয়ে এল৷
কলেজের গেটেই নিমতলা— তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল শান্তি৷ বাসন্তী রঙের শালোয়ার কামিজ, চুলে শ্যাম্পু দিয়েছে৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে চিবচ্ছে বাবুলগাম— ফোলাচ্ছে জিভের কাছে বেলুনের মতো৷ চোখে একটি দুষ্টুমিষ্টি আলো৷ একুশ বছরের মেয়েদের শরীরে সাধারণত এই আলো জ্বলতে দেখা যায়৷ আর দেখা যায় নিকট গাঁয়ের কোনও সন্ধ্যায় প্রদীপের শিখায়৷
চোখ নাচিয়ে হাসে শান্তি, যেন শুভদৃষ্টি হচ্ছে৷
ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখে কেন অপাঙ্গে দৃষ্টি দেয় আনন্দ৷ কোথায় শিখল কে জানে৷
জল খাই চল—
ক্লাস আছে যে—
ছাড় তো ক্লাস— লিমকা খাব চল—
খুব তেষ্টা?
আনন্দ চোখ ফেরাতে পারে না৷ মনে তার কেবলই একটি প্রশ্ন (—নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?)
স্ট্র দিয়ে টেনে লিমকার বোতল থেকে দুটো সিপ নিয়ে শান্তি বলল, ক্লাসে যখনও গেলামই না চল সিনেমা যাই৷ রেখার ছবি৷ তোমার ভাল লাগবে৷
ইজাজত? টিকিট পাবে?
চলই না, লাইনে যারা দাঁড়ায় সেইসব ছেলেদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে টিকিট কেটে দিতে বললেই কেটে দেবে—
আনডিউ অ্যাডভান্টেজ—
কে নেয় না বল তো—
একটি রিকশায় দুজন চড়ল৷ এই মফসসলে, যেখানে প্রায় প্রত্যেকেই প্রত্যেককে চেনে সেখানে এটা বাড়াবাড়ি বইকি৷ কিন্তু বয়েসটার দিকেও তো তাকিয়ে দেখতে হবে৷ এই সময়ই তো মানুষ সবচেয়ে বেশি ডেসপারেট হয়ে ওঠে৷ — ওরা কিন্তু বসল খুব সংযত৷ এদিক ওদিক করল না৷ শুধু একটি গোপন আড়াল তৈরি করে হাতে হাত রাখল৷
শান্তি বলল, এই জানো তো থার্ড ইয়ারের মুকুন্দদা কালকে আমাকে ডেকে বলছিল এস এফ আই থেকে ক্লাস ক্যান্ডিডেট হতে৷
কোনও দরকার নেই, পাঁচ ঝামেলায় গিয়ে কি লাভ?
ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভ হলে ক্লাসে একটা গ্ল্যামার থাকে৷ ম্যানেজ করতে জানলে বেতনটা দিতে হয় না৷ হাঁদা গঙ্গারাম ছেলেদের পটিয়ে খাওয়া যায়৷ সিনেমা দেখা যায়৷— এই জানো, বেশ কিছুটা উল কিনে সোয়েটার বুনতে শুরু করে দিয়েছি৷ এবার শীতে তুমি পরবে—
তুমি বুনবে আর আমি পরব? সে কি ইহজনমে হবে?
কেন তুমি আমাকে ঢেঁড়স ভাব নাকি—
একথার জবাবে আনন্দ কোনও শব্দ করল না, শুধু মেয়েলি আঙুলগুলি নিজের মুঠির মধ্যে নিয়ে চটকাতে লাগল৷ বরং শব্দ করতে লাগল রিকশার চাকা, চেন আর হুইলে দেওয়া মোবিল৷
সিনেমা হলের অন্ধকারের গভীরে একের পর এক বর্ণালী দৃশ্যাবলি— অকথিত হাসিগুলি শুধু বেঁকে বেঁকে গড়িয়ে পড়ে৷ সভ্যতা-অসভ্যতার তর্ক চলে নিচু স্বরে৷ রাগ ভাঙাতে হাতুড়ির বদলে এক ধরনের রক্তবর্ণের জাঁতি ব্যবহার করতে হয় আনন্দকে৷ আবার কেটে যায় যদি সেই ভয়ে সতর্ক থাকতে হয়৷
তখনই দুপুরের খেলা এই শহরে৷ লোকজনের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিষয়-আশয়, হিসেব-নিকেশ নিয়ে মেতে আছে৷ তালাচাবি সারানোর ফেরিওয়ালা বাড়ি বাড়ি হেঁকে যায়৷ ছাদে টাঙিয়ে রাখা তারে শাড়ি, সায়া, জাঙ্গিয়া শুকোয়৷ কেউ তৃপ্তি করে ভাত খেয়ে নিদ্রামগ্ন৷ কেউ ছোটে, শুধুই ছোটে৷ পথে ক্লান্ত কুকুর পথের ধারে কুঁকড়ে একটি কাজুবাদামের মতো পড়ে থাকে৷ অফিস চলে অফিস ঘরে৷ মাঠে কোমল আচ্ছাদিত ঘাসের মাথায় রোদ পড়ে সব নম্রতাকে পুড়িয়ে দেয়৷
সিনেমা দেখে ফিরছিল ওরা দুজন৷ এখন রিকশায় নয়৷ হাঁটতে হাঁটতে৷
শান্তি বলল, তোমাকে না বলেছি স্টেটসম্যান পড়তে৷ অ্যাপয়েন্টমেন্ট কলমটাও পড়তে হবে, ইংরেজিটাও শেখা হবে৷
কেন, আমি ইংরেজি জানি না নাকি?
ওরকম জানাতে আজকাল কিছু হয় না৷ — কথায় একটু বিরক্তির আভাস দেখা যায় কিন্তু তাকে খাঁটি বিরক্তি বলা যাবে না৷ বরং ওটাকে একধরনের আত্মীয়তা বলাই শ্রেয়৷ কলেজ মাঠের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ে বিবেকানন্দর পাগড়ির মতো গেরুয়া রঙের প্যান্ডেলটা৷ আনন্দ বলে উঠল, মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে হবে—
তুমি পুজোয় এখানে থাকবে না? দেশে যাবে ভেবেছ?
সপ্তমী অষ্টমী এখানে৷ তোমার সঙ্গে৷ আর নবমী দশমী দেশে যাব৷ প্লিজ—৷ মা কষ্ট পাবে নিলে৷ — এমনিতেই তো বোনেরা চিঠিতে লেখে—, কি হল অমনি মুখ ভার!
সন্ধ্যা নামছিল গুটি গুটি পায়ে৷ লাইট জ্বলল৷ একটা অচিন পাখি শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে খেয়ে ঘুরেফিরে কোথায় চলে গেল৷ চা দোকানের সামনাসামনি চলে এল ওরা৷— এখানেই শান্তি একটু জড়োসড়ো হয়ে ওঠে৷ শোনা যায় চায়ের দোকানের সেই অ্যান্টিসোশ্যালদের আড্ডা থেকে কে একজন ঠোঁটের ভেতর দুই আঙুল ভরে ট্যাঁ ট্যাঁ— ট্যাঁ-আ-আ’ করে আওয়াজ করে৷
শান্তি বলল, দেখছ কি অসভ্য—
ওদিকে তাকিও না—
একজন বলে উঠল, শুতে পারলে হত—
আরেকজন—, শ্লা বানচোৎ৷
মাইরি, পাছাটা সাংঘাতিক৷
এমন সময় রাগে গরগর করে ছুটতে ছুটতে একটা ষাঁড়ের মতো এসে দাঁড়াল ছোট তারকের মোটরবাইক৷ আড়চোখে দেখল শান্তি৷
ট্যাংরা নামে একটা জানোয়ার আছে এদের মধ্যে৷ সে দৌড়ে এসে দাঁড়াল দুজনের সামনে, এই যে—
শান্তি তাকাল৷
আপনাকে নয়৷ এই আনন্দ—
কিছু বলবে?
দুর্গাপূজার চাঁদাটা—
আজকে তো নেই৷ পরশু সন্ধ্যায় এস৷
মেসের আর সবাইকে বলে দিও৷
এ কি জনে জনে দিতে হবে নাকি?
তা হবে না? দশটা পাঁচটা নয়, একটাই মাত্র দুর্গাপূজা হয় বছরে৷ সবাই মিলে হাতে হাত না মেলালে উৎসব হবে কেমন করে?
আমি কেন, তোমরাই এসে চাঁদার কথাটা বোল—
তুমিও তো আমাদেরই একজন নাকি? বন্ধু ভাবলেই বন্ধু৷ না ভাবলে—
ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে!
আচ্ছা৷ আচ্ছা৷ পুজোটা তো এগিয়ে আসছে তাই বলছিলাম আর কি?— এই বলে ট্যাংরা বোবা চোখে শান্তির দিকে তাকিয়ে রইল৷ চায়ের দোকান থেকে ছুটে ছুটে আসছিল কটু কথার ঝাঁঝ৷ শান্তি বা আনন্দ কেউ সেদিকে কর্ণপাত না করে কৌশলে ভদ্রভাবে পালিয়ে বাঁচল৷
আশ্বিনের আকাশ৷ মহালয়ার পর সেই আকাশে সাদা দুধের সর উথলে ওঠে৷ নীলচে সাদায় একটু ভাব নেমে এলে অল্প অল্প করে ঠান্ডা টের পাওয়া যায় হাওয়ায়৷ তবে উৎসবের আগমনী সঙ্কেত মানুষের ভয়ভীতি একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়৷ এই ছোট মফসসল শহর; এখানে মানুষ জন্মায়, বাঁচে এবং পরিশেষে মরে যায়৷ মাঝের সময়ে খেলা করে প্রতিযোগিতার সুরে৷ কিন্তু অস্তমিত শরতের এই আলোয় যেন মানুষের জন্ম রহস্যটিই বারবার ফুটে ফুটে ওঠে৷ মানুষের উৎসব চলে লোকশিক্ষার জন্য৷ দিন যত যায় মানুষ শুধুই শিক্ষিত হয়৷ লজ্জিত হয়৷ আধুনিক হয়৷ ঢাকের মাথায় কাঠি পড়ে৷ সরস্বতী খলখলিয়ে হাসে৷ বাতাস গান গায়৷
এটা বোঝা দায় এ পৃথিবীতে কার সঙ্গে কার কি সম্পর্ক!
লড়াইয়ের সূত্রটাও ঠিক ঠিক আবিষ্কৃত হওয়ার অনেক আগেই লড়াইটা থেমে যায়৷ আর অনেক সময় লড়াই চোরা স্রোতের মতো এমন ভাবে বইতে থাকে যে দেখে বোঝা যায় না এটা আসলে একটি লড়াই৷
মধুসূদন আঢ্য বনাম ছোট তারক— এটা চলতেই থাকে৷ কিন্তু কোনও সুরাহা হয় না৷
তারক হাসল, শ্লা দুনিয়াটাই তাজ্জব— চল,—
ট্যাংরা একটা দেশলাই কাঠি নিয়ে কান চুলকাচ্ছিল,— মতলব?
আজ আড্ডায় গুণধর এসেছে৷ অনেকদিন বাদে তার আবার আবির্ভাব আড্ডায় অন্য মাত্রা নিয়ে এসেছে৷ সে বয়ে আনল একটা বড় কলাগাছ৷
আরে এ গুণাই—
কি হল—
এত বড় কলাগাছ দিয়ে কি হবে?
কেন, কলাবৌ— কস্তা পাড়ের শাড়ি পরিয়ে ষষ্ঠী বরণ—
এই বৃক্ষকে কাপড় দিতে গেলে ক্লাব ঘরটিকেও বিকরি করতে হয় রে—
অখিল আর গুণধর কথা বলছিল৷ কলেজ মাঠের প্যান্ডেলটি অনেকটা দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের আদলে৷ গুণধর পাজামার কষি আলগা করে পয়সা বের করল৷ তারপর ফেরত দিয়ে বলল, ভাঁড় পাওয়া গেল না—
দোকানে না পেলি তো শালা কুমোর ঘর ছুটলি না কেন?
নিত্য বাসের চলাচল অব্যাহত ছিল৷ এখান থেকে বাস চলে যায় খTপুর, ঘাটাল, আরামবাগ৷ কলিকাতা পরিবহণ৷ পুজোর কেনাকাটার ভিড় লেগেছে শহরে৷ মেয়েরা সেজেগুজে বুক ফুলিয়ে— আর ছেলেরা সেই ফোলানো বুকের মুখোমুখি৷ অবিরত হাসি চলছে৷ কে কি বলছে অন্যজন শুনতে পাচ্ছে না৷ যে যার নিজেদের নিয়ে মেতে আছে৷
সেই ‘চল’ বলে মোটরবাইকে ট্যাংরাকে তুলে নিয়ে ছোট তারক চলে গিয়েছিল সে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল৷ হর্ন বাজল৷
সপ্তমী অষ্টমী নবমী দশমী চারদিনই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে৷ নাটক, কবিতা, গান— তারও একটা তোড়জোড় চলছে৷ পরিচালকদের নিত্য ব্যস্ততা৷
সরস্বতী বৌদির দিকে তাকিয়ে ট্যাংরা ইঙ্গিত হানতেই মেয়েলি মিষ্টি গলা আবদারে গেয়ে উঠল, খচ্চর—
ছোট তারক ফুট কাটে,— আজ থেকেই নতুন শাড়ি?
প্যান্টের হিপ পকেট থেকে রসিদ বই বের করে রতন এসে ট্যাংরাকে বলল, বসুধা-পল্লীটা এখনও ঠিকমতো কালেকশন হয়নি৷ ওখানে সি পি এম-এর দাদা রুহিদাস ঘোষ— সে বলে দিয়েছে এ পাড়ায় কেউ চাঁদা দেবে না—
এ ব্যাপারে কেউ আজ আর কোনওরকম মাথা গরম করল না৷ মুখ ফিরিয়ে তারক বলল, সে দেখা যাবে— রুহিদাসদা তো লোক খারাপ না—
রতন বলল, তোমরা যেও দাদা৷ গুরুদেব লোক৷
সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে ছোট তারক মৃদু স্বরে শুধায়— কি, চিকেন ভোগ রাঁধা রেডি তো?
সরস্বতী ঘাড় নাড়ে ষোলো বছরের খুকির মতো৷
দোকান ঘরের ভেতরের দিকে যে আবছা খুপরি মতো জায়গা আছে সেখানে গিয়ে বসে যায় তারক, ট্যাংরা, রতন আর অখিল৷ এদের দেখাদেখি গুণধরও এসে ঢোকে৷
তারক বলল, দেখ শ্লা— মাল খাবে খাও, কিন্তু এই পুজোর কদিন বেলেল্লেপনা চলবে না৷ মনে রেখে খাও৷ কমিটির পয়সায় মাল-মাংস৷
গুণধর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সরস্বতীর চেহারাটা দেখছিল৷ ওর ভেতর থেকে মনটা আদর করে বলে উঠল,— হারামজাদি৷ আর মুখে বলল, মাতলামি করি নাকি আমি?
সে তোদের সবাইকে দেখা আছে৷ মাল কে কত খেতে শিখেছ৷ পাঁইট খুলতে না খুলতে শ্লাদের নেশা ধরে যায়৷
ঢুক ঢুক করে খেলা চলছিল৷ কাঁচা পেঁয়াজ, আদা কুচি, চিকেন ভাজা, কাঁচা লঙ্কা৷ এমন সময় ভট ভট করে জেনারেটর প্যান্ডেলের চারদিকে স্পেশাল লাইট ছড়িয়ে দিল৷ মাইকে রেকর্ড চাপানো হল— কে যেন আবির ছড়িয়ে দিল ভোরের আকাশে—
ট্যাংরা বলল, ভোর আবার কখন হল রে৷ এই তো সবে সন্ধ্যা—৷
ছোট একটা জানলা বরাবর সামনের রাস্তাটি দেখা যায়৷ দেখা যাচ্ছিল কীভাবে দিনের আলো আস্তে আস্তে রাস্তাপথে নিভে গেল৷ সন্ধ্যার পরিবেশ, যেন চুপিচুপি ফিসফিসিয়ে কথা বলছে কেউ৷ দেখা গেল, নাতির হাত ধরে ঘুরতে বেরিয়েছে বুড়ো চৌধুরি৷ এই বয়সেও লোকটার চেহারা দেখার মতো৷ প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন টিপতে টিপতে চলে যাচ্ছে,— খালি রিকশা, ভর্তি রিকশা৷ দোড়াদৌড়ি কামড়াকামড়ি করছে অল্পবয়সী ছেলেছোকরারা৷ একসঙ্গে দুটি কিংবা তিনটি মেয়ের রেখা রাস্তা ধরে হাঁটছে কখনও৷ কেউ কারও গায়ে ঢলে পড়ে হাসছে৷ কেউ একা একা৷ নিরীহ মানুষদের চালচলন যেমন হয়৷
এমন সময় দেখা গেল আনন্দ আর শান্তি হাঁটতে হাঁটতে বাজার থেকে ফিরছে৷
অখিলের গলা নেতিয়ে পড়ছে, তবু কথা বলা চাই৷ সে ফুর্তির চোখে তাকাল জানলা বরাবর৷ তারপর ছোট তারকের দিকে চেয়ে বলল, গুরু তোমার মালটা—
মেয়েটির কথা ছোট তারক প্রায় ভুলেই গিয়েছিল৷ যখন চোখে পড়ে তারপর বড়জোর একদিন জের থাকে৷ সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ চলে গেল ট্যাংরার দিকে৷ দক্ষিণহস্ত ট্যাংরা অমনি নড়ে উঠল৷
কতই তো করার চেষ্টা করল— এ মেয়ে যে পয়সা বা মোটরবাইকও পছন্দ করে না৷ ট্যাংরা প্রথমে ভেবেছিল ছেলেটার সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্ব করা যাক, পরে জবাই করতে সুবিধে হবে৷ কি ছেলে,— শ্লা শেয়ানা পার্টি৷ হাসে, কথা বলে৷ ব্যস, ওই পর্যন্তই৷ এদিকে এইসব ক্ষেত্রগুলিতে ছোট তারক কিছুই বোঝে না, একেবারে ছেলেমানুষের মতো করে৷ বাপধন, এ কি হাতের মোয়া৷ যে চাইলেই পাওয়া যায়! হাতে এনে দেওয়া যায়?
যারা বসে বসে মদ গিলছিল সবাই উঠে এসে দাঁড়াল রাস্তায়৷ চোখ লাল৷ একেবারে চুর হয়ে আছে৷ রতন বলল,— অখিল, মাইরি একেবারে কবিতার মতো৷
ওরা সবাই পিছু নিল৷
ছেলেটি আর মেয়েটি কি বলাবলি করে দুজন দুদিকে হাঁটতে লাগল৷ মেয়েটি বাড়ি যাবে৷ আর ছেলেটি মেসে৷
ট্যাংরা বলল, তারক— গুরু তুমি মাইরি অখিলকে সঙ্গে নাও৷ মাগীটার পিছনে পিছনে যাও৷ আজকে কথা বলতেই হবে৷ দেখ,— শ্লা একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে এত ন্যাকড়াবাজি৷ যাও তো গুরু, যদি দেখ— গাড়িতে তুলে নিও—৷
ছোট তারক মদের গুণে এখন আপাদমস্তক লাল৷ ফর্সা রঙ হলে এক দোষ— মদে আর রোদে গায়ের রঙ লাল হয়ে যায়৷ সে তাকাল ট্যাংরার দিকে, চোখে ছোট জিজ্ঞাসা—
ট্যাংরা বলল, অখিলই এই শালা ছেলেটাকে খেলে৷ — মারব ধমক৷ আর চাঁদাটা— শালারা বেশ কজন থাকে৷ ভাবছে খুব বেঁচে গেছি৷
ওরা দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়ে যে যার পথে এগতে লাগল৷ পায়ের তলার মাটি টলোমলো৷ তার ওপর পড়েছে এলোপাথাড়ি লাইটের আলো৷ গান ধরল কেউ৷ কেউ শিস দিচ্ছে খেয়ালে৷ বড় রাস্তা থেকে গলি৷ গলি থেকে সিঁড়ি৷ সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে আনন্দ নামের ছেলেটি বলে উঠল, কি চাই—?
পকেটের মধ্যে মোড়া একটি নতুন শাড়ি ছিল৷ লাল পাড়, কস্তা৷ ওরা সবাই মিলে ছেলেটির গলায় ফাঁস পরাল৷ দরজাটা বন্ধ করে— মত্ত অবস্থাতেও সতর্ক ওরা৷ একটা অস্পষ্ট বাঁক আছে ছেলেটির গলার কাছে৷ মাথার ওপর দিকটা তুলতে দেখা গেল চোখ দুটি,— ঠেলতে ঠেলতে একেবারে বেরিয়ে এসেছে৷ তাড়াহুড়ো আর অস্থিরতা চলছিল ওদের মধ্যে৷ গভীর তোলপাড় চলছিল৷
অখিল বলল, শালাকে মেরে ফেললি—৷
ট্যাংরা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নিষেধনামা দেয়,— চুপ৷ শ্লাকে মারব এক পাছায় লাথি৷— আয় ধরে বেঁধে এই ফ্যানের হুকে শাড়িটা গলিয়ে টাঙিয়ে দিই৷
ধরাধরি করে দীর্ঘ চেহারাটাকে ওরা প্রথমে খাটের ওপর দাঁড় করাল৷ কিন্তু সে কি দাঁড়াতে চায়, শুধু যে ধসে যাবার প্রবণতা৷
ঘাম দিতে লাগল সবার৷ এবার তারা পালিয়ে বাঁচতে চায়৷
রতন বলল, লোকে ভাববে গলায় দড়ি কেন—
অখিল বুদ্ধি জোগায়, দেখতে দেখতে দিন দুই বয়ে যাবে৷ মেসে তো শ্লা আর কেউ নেই৷ পূজার ছুটিতে দেশে গেছে৷
ট্যাংরা একটু আশ্বস্ত চোখে অখিলের দিকে তাকাল৷ তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল কজন৷
কি করেছিল আনন্দ?— কিছুই না৷ মত্ত অবস্থায় ওরা জিজ্ঞেস করে, ‘সব শালাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছ, চাঁদা শালা দেবে কোন জামাই৷’ আনন্দ কোনও জবাব দেয়নি৷ ওরা বলেছিল, ‘শ্লা তোকেই সব টাকা দিতে হবে৷’ আনন্দ বলেছিল, ‘এই নাও—’ বলে ১০ টাকার নোট বের করেছিল পকেট থেকে৷ ওরা বলেছিল— ‘১০ টাকা, — এ কি মাগনা নাকি রে বানচোৎ৷’ তারও প্রতিবাদ করেনি আনন্দ৷ বলেছিল ‘তবে কত দিতে হবে?’ জবাবে ওরা বলেছিল— ‘কত আবার৷ ৭ জনের ৭০০৷’ আনন্দ একটু বিরক্ত হয়েছিল, ‘এত টাকা কোথায় পাব৷’ ওরা দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিল, ‘কোথায় পাবে তা আমরা কি জানি চাঁদু৷ তোমার ওই মাগীটাকে খাটিয়ে জোগাড় কর৷’ এইবার আনন্দ বলে উঠেছিল, ‘মুখ সামলে কথা বলবে’, ‘আমি যদি না বলি’, ‘কি করে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে হয় শিখিয়ে দেব’, ‘তাই নাকি’ এই বলে ওরা আনন্দর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, বিশেষত দস্যুর শক্তিতে ট্যাংরা৷ ধস্তাধস্তি চলে কিছুক্ষণ তারপর মায়ের জন্য আনন্দর কেনা লাল পাড়ের তাঁতের শাড়িটা দিয়েই ঝুলিয়ে দিয়েছিল ওরা৷
পরের দিন সপ্তমীর সকাল৷ শান্তি এসে দাঁড়িয়ে আছে মণ্ডপের সামনে— আর ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে৷
মণ্ডপের সামনে ক্লাবের কুশীলবেরা৷
তারক, ট্যাংরা, অখিল, রতন, গুণধর— সবাই আজ সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে৷ মাথা নিচু করে বসে৷
ওরা তো আর সত্যি সত্যি খুন করে ফেলতে চায়নি৷
রোদের রঙে হলুদ মিশেছিল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ফিকে হচ্ছিল৷ মেয়েটি অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে৷
— কিন্তু ওরা কি করবে, এখন ওরা তো অসহায়— ওরা তো জানত না ছেলেটা সত্যি সত্যি মরে যাবে৷ এবং মেয়েটাকে তুলে এনে অলটিমেট কোনও সর্বনাশ ঘটিয়ে দেওয়ার কোনও অভিপ্রায় বা অভিসন্ধিও ওদের ছিল না৷ তা থাকলে অনেকদিন আগেই তা পারত৷ ওরা তো আর পাঁচটা ভদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারেরই সন্তান৷ ওরা কি কখনও প্রকৃতিস্থ অবস্থায় চাইতে পারে— একটা আস্ত লোককে সত্যি সত্যি মেরে ফেলতে৷ ফুলের মতো তরতাজা একটা সুন্দর যুবককে৷ বেঁচে থাকলে আজকে যার ওদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা পরে উৎসবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল৷
পঞ্চপ্রদীপে আরতি শুরু হল৷ ঢাকের তালে তালে পুরোহিতের হাতে প্রদীপ— দেবীর পা থেকে মুখ পর্যন্ত আলোকিত করতে লাগল৷
মেয়েটি এখনও দাঁড়িয়ে— সর্বনাশের কথা জানেনি, তবু মুখ উপোসি—৷ একটু শুকনো৷
পুজোর সময় পবিত্র চেহারা বলতে মানুষ যা বোঝে৷
ওরা নিচু মুখ উঁচু করে দেবী পূজার আরতি দেখতে গেল৷ কিন্তু দেখতে পেল ঢাকের শব্দে শব্দে প্রদীপের আলোয় দুলছে দেবী মূর্তির বদলে লাল কস্তা পাড়ে বাঁধা দুটি পা৷
এবং তা ক্রমে রক্তে সঞ্চারিত হতে লাগল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন