অশোক দাশগুপ্ত
বেলটাতে ঢ-অ-অং করে একটা লম্বা প্রতিধ্বনিময় আওয়াজ হল৷ ঠিক কতটা লম্বা আর কতটা প্রতিধ্বনিময় তা দরজার বাইরে থেকে বোঝা গেল না৷ গির্জায় ওরকম ঘণ্টাধ্বনি হয়৷ তার মানে বিজু খুব গির্জায় গির্জায় ঘণ্টা শুনে বেড়ায়, তা নয়৷ সিনেমায় দেখেছে— গির্জায় এরকম ঘণ্টা বাজে৷ টিভিতেও দেখা যায়, এখন, প্রায়ই৷ ঘণ্টাটা মিলিয়ে যাবার পর সন্দেহ হয়, সত্যি বেজেছে তো, নাকি বাইরের কলিং বেলের বোতামে হাত দেওয়া আর ওই ধ্বনি হওয়া নেহাতই সংযোগহীন৷ তাহলে আর একবার বাজিয়ে দেখতে হয়৷ কিন্তু এত দীর্ঘ, গম্ভীর, ঠান্ডা ধ্বনি এত ঘন ঘন দ্বিতীয়বার তৈরি করা যায় না৷ এসব ঘণ্টার মধ্যে কেমন নিষেধ আছে৷ সেই সাবেকি ক্রি-ইং , ক্রি-ইং বাজানো বেল হলে ঘন ঘন বাজানো যেত৷ তার চাইতে দরজার ওপরে লাগানো এই কাঠের কাজটা দেখা যাক৷ কাঠখোদাইয়ের নকশা, দরজার ওপর আলগা করে বসানো, কালো রঙ, প্রথমে নকশাটা বোঝা যায় না, একটা মুখোশের মুখ মনে হয়৷
দরজার লকে কেউ হাত দিয়েছে, বোঝা যায়৷
দরজাটা খোলা হয়, কিন্তু পাল্লা দুটো মাত্র একটু ফাঁক হয় আর তার ভেতর থেকে একটা মুখের খানিকটা কপাল, খানিকটা চুল, দু চোখের কিছু কিছু, নাক আর ঠোঁট-চিবুক দেখা যায়৷ বিজু বুঝতে পারে না, কী বলবে৷
তখন ভেতর থেকেই প্রশ্ন আসে, ‘কী চাই?’
বিজু জিজ্ঞাসা করে, ‘সৌম্যেন্দ্রকাকু আছেন?
ভিতর থেকে আবারও জিজ্ঞাসা আসে, ‘কী চাইছেন?’ এবার বেশ জোরে, দরজা বন্ধ করে দেওয়ার আগে যেরকম জোরে সাধারণত কথা বলা হয়ে থাকে৷
বিজু ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হয়েই ছিল, তাছাড়া এমন বিশ্ববিখ্যাত লোককে ‘কাকু’ বলায় নিজেই নিজের কাছে লজ্জা পাচ্ছিল৷ তাকে যদি দেখা করতে না হয় সে বেঁচে যায়৷ বাবাকে গিয়ে বলবে, দেখা হয়নি, ব্যস্ত ছিলেন৷ তারপর সৌম্যেন্দ্র কর-এর যদি দরকার হয়, যাবেন তাঁদের বাড়িতে৷ দরজার আরও ভিতর থেকে জোর গলায় শুনতে পাওয়া যায়, ‘কে এসেছে? এতক্ষণ কী করছ?’
দরজার ফ্রেমে আঁটা মুখটা একটু সরে যায়, তারপর সেখান থেকে চিৎকার করে বলে, ‘আপনাকে চাইছে বোধহয়—’
‘কে? নাম জিজ্ঞাসা করছ না কেন? বলে দাও, পরে আসতে—’ বিজু দরজার ওপার থেকে শুনতে পায় গলাটা, ভারী নয় কিন্তু খুব আত্মবিশ্বাসী, একটু অস্থিরও হয়ত৷
দরজার মুখটা ‘পরে আসবেন’ বলে সরে যাবার আগেই বিজু তার গলাটা একটু চড়িয়ে বলে, ‘শুনুন, আমি পরে-টরে আসতে পারব না, উনিই আসতে বলেছিলেন, আমার নাম বিজু, চলে যাচ্ছি—৷’
দরজার ওপাশের লোকটা হঠাৎ হাসে, তারপর হাত তুলে দাঁড়াতে বলে, ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, আরে রাগছেন কেন, সিনেমায় নামার জন্যে কত লোক আসে, বুঝলেন না? কী বললেন, বিজু?’
দরজাটা আবজে রেখে লোকটা অদৃশ্য হয়৷ সেই আবজানো দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরটাকে বাইরের চেয়ে উজ্জ্বলতর দেখায়৷ সেটা আলো জ্বালানোর কারণেও মনে হতে পারে৷ বিজু শুনতে পায় ভিতর থেকে একটা গলার অস্বস্তি, ‘বিজু’? বিজু কে?’ খুব রাগের গলা নয়, বরং একটু অনিশ্চয়তা আছে, যেন বিজু নামে কেউ থাকতেও পারে, কিন্তু একটু অধৈর্য আছে গলায়— আজকাল সফল লোকদের এরকম অধৈর্য এসে যায় গলায়, তাদের স্যারের মতো, রোগী তার কষ্টের কথা বেশি সময় ধরে বললেই মনে মনে রেগে যান, সময় নষ্ট হওয়া মানেই তো টাকা নষ্ট হওয়া, কিন্তু রোগীই বা সব না বলে টাকা দেবে কেন? এক একদিন রেগে স্যার বলেন, ‘এরপর থেকে আগে হিস্ট্রি লিখে সেই কাগজটা দিয়ে আমার কাছে পাঠাবে৷’ অনিমেষ বলেছিল—’তাতে স্যার ডবল সময় লাগবে, একবার হিস্ট্রি লেখাবে, একবার বলবে৷’ স্যারের হিসেব জ্ঞান এত টনটনে যে সেটা ঠিক বুঝে যান৷
ভিতরে চটিজুতোর ছ্যাঁচড়ানোর আওয়াজে যেন সেরকমই একটা সেয়ানা হিসেব জ্ঞান শুনতে পায় বিজু৷ সৌম্যেন্দ্রকাকু নিজেই আসছেন৷ নিজেকে সংশোধন করে নেয়, এটা তো ওঁর ভদ্রতাই বলতে হবে৷
দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে সৌম্যেন্দ্রই দাঁড়ান, ‘হ্যাঁ, কে, কী, আপনি?’
সৌম্যেন্দ্র যেন বুঝে উঠতে পারেন না, কী জিজ্ঞাসা করবেন, বা বিজুকে কথাটা শুরু করতে দেওয়ার জন্যই কতকগুলি আওয়াজ উচ্চারণ করছেন মাত্র৷ বিজু মুখে সামান্য একটু হাসি এনে বলে, ‘আমার নাম বিজু—’
সৌম্যেন্দ্রও একটু হাসি এনে অপ্রস্তুতের মতো বলেন, ‘হ্যাঁ, কী’, কিছু অর্থহীন আওয়াজই হয়ে থাকে৷
বিজু স্মিত হেসে বলে, ‘আমার বাবার নাম বিমানবিহারী—’
কথাটা শেষ করতে দেন না সৌম্যেন্দ্র, ‘বিমানবিহারী?’ বলেই একগাল হেসে একটু সরে গিয়ে আপাদমস্তক দেখে নেন বিজুকে, ‘বাঃ তুমি এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন’, বলেও কিন্তু সৌম্যেন্দ্র পুরো দরজাটা ছাড়েন না, ‘তোমার নামটা বলবে তো?’ বলে দরজা ছেড়ে, ভিতর দিকে দু পা পেছিয়ে যান দু পায়ের ওপর শরীর দুলিয়ে, টিভিতে টেনিস খেলায় এরকম নাচন দেখা যায়৷ ‘এসো, ভেতরে এসো, আরে নাম বলবে তো?’ বলে যে ভদ্রলোক দরজা খুলেছিলেন তাঁকে বললেন, ‘নামটা জিজ্ঞাসা করবে তো?’ এই কথাগুলো ছাড়াও সৌম্যেন্দ্র কিছু আওয়াজ করেছিলেন মুখ দিয়ে৷
বিজু ভেতরে ঢোকে৷ দরজার পাশে তার স্যান্ডেলটা খোলে, ডান পাশে ঘর ভর্তি লোক৷ সে একটু সঙ্কোচ করতেই পেছন থেকে সৌম্যেন্দ্র হাতের ইঙ্গিতে তাকে বলেন, ‘যাও, ভেতরে যাও’৷ তারপর সেই দূরত্ব থেকেই বিজুর ভেতরে যাওয়াটা দেখেন৷
যাঁরা ভেতরে ছিলেন তাঁরা একটু সরে বিজুকে বসতে দেন, কিন্তু এমন জায়গায় যেখান থেকে সেই বাইরের দরজার কাছ থেকে সৌম্যেন্দ্র বিজুকে দেখতে পান৷ সৌম্যেন্দ্র সোজাসুজি বিজুর দিকে তাকিয়ে ডাকেন, ‘মণিকা, মণিকা’, একটু থেমে আবার বিজুর দিকে তাকিয়ে তাঁকে ডাকতে হয়, ‘মণিকা’৷
বিজু অস্বস্তি কাটাতে ঘরের দেওয়ালে চোখ বোলায়৷ অনেক ছবি টাঙানো৷ সবই সিনেমার, সৌম্যেন্দ্রকাকুর তোলা ফিল্মের ছবি৷ কিন্তু দেওয়ালে ছবিগুলোকে কেমন অচেনা ঠেকে৷ মাঝে মাঝে সৌম্যেন্দ্রকাকুরও ছবি আছে— প্রাইজ নিচ্ছেন নাকি প্রাইজ দিচ্ছেন৷ মেঝের ওপর প্রচুর বইপত্র৷ এই ঘরটাকে কেউ গোছানো বলবে না, কিন্তু খুব সুন্দর করে গোছানোই আসলে৷
‘এই যে বিজু, আমাদের বিমানবিহারীর ছেলে, তোমাকে বললাম যে, বিমানবিহারীর ছেলেকে আসতে বলেছি— বিজু, আমরা তোমার বাবার সঙ্গে পড়তাম৷’
‘বা বা, বিমানবাবুর ছেলে এত বড় হয়ে গেছে—’ মণিকা একটু বিস্মিত হন৷ বিজু উঠে গিয়ে তাকে প্রণাম করে৷ তখন তার খেয়াল হওয়া সত্ত্বেও সৌম্যেন্দ্রকে আর প্রণাম করে না৷ কিন্তু সৌম্যেন্দ্র ইতিমধ্যেই বলে ফেলেন, ‘আরে, থাক থাক৷’
মণিকা বিজুর পিঠে হাত দিয়ে বলেন, ‘শোনো, তোমার কাকার সঙ্গে কথা শেষ করে চলে যেও না, ভেতরে এসো’, তারপর ঘরের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এখানে ও বসবে কোথায়? এ তো শুম্ভ-নিশুম্ভরা সব, ও বরং ওঘরে গিয়ে বসুক৷’
ভিতরের দলটা হই হই করে ওঠে, ‘না বৌদি, না, ওকেও শুম্ভ-নিশুম্ভরা দলে নিয়ে নিচ্ছি—’
মণিকা হেসে ওঠেন, ‘ও তোমাদের চেয়ে অনেক ছোট৷’
‘আমরাও তো ছোট বৌদি’, ভিতর থেকে একজন চিৎকার করে৷
‘না, না, ও এখন এখানেই বসুক, ছোট কেন হবে, ও তো বড় হচ্ছে, গ্রোয়িং ইয়ং ম্যান, বসো, বসো বিজু, বসো’, যেন বিজুর কাজ ঠিক হয়ে গেছে এমনভাবে সৌম্যেন্দ্র বিজুর পিঠে হাত দেয়৷
বিজুর পিঠে হাত রেখেই চারিদিকে তাকায়, পিঠে হাত নিয়ে বিজুকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়৷ বড় জানলার নিচে থেকে একজন বলে ওঠে, ‘দাদা, সানসেটে একটা রিফ্লেক্টার বসালেই হবে, পেয়ে যাবেন৷’
সারা ঘরের সবাই হো হো করে হেসে ওঠে৷ সৌম্যেন্দ্র বিজুর পিঠে হাত রেখে বিজুর দিকে তাকিয়ে শব্দ না করে হেসে ওঠেন৷ ঘরের হাসি একটু থামলে আস্তে করে সেই জানলার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কী, অ্যাপ্রুভড তো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, দাদা অ্যাপ্রুভড, এই সর, পা টানটান করব’, দুই স্বরে এই কথা কটি উচ্চারিত হয়৷ তারপর আর এক কোণ থেকে কেউ বলে, ‘ও আপনি যতই করুন, আমরা ঠিক সময়ে ফ্রেমের বাইরে বুড়িকে রেখে দেব৷’
আবার এক রোল হাসি উঠল— এটা সৌম্যেন্দ্রর পুরনো কোনও ছবি নিয়ে রসিকতা৷
সৌম্যেন্দ্র তখন বিজুকে যেন কিছু যত্ন নিয়েই একটা জায়গায় বসাচ্ছেন, ‘হ্যাঁ, তুমি এখানে বসো, বিজু, আমরা একটা কাজের প্রোগ্রাম করছিলাম, এখুনি শেষ হয়ে যাবে, তারপর তোমার সঙ্গে কথা বলব৷ তুমি বরং এই কাগজগুলো দেখো৷’ ম্যাগাজিন-ভর্তি একটা ছোট টেবিল পা দিয়ে সৌম্যেন্দ্র বিজুর দিকে এগিয়ে দেন৷ বিজু বলে ‘দেওয়ালেই তো কত ছবি—’
‘তুমি এসব ছবি চিনতে পারছ?’ সৌম্যেন্দ্র বেশ খুশি হয়ে বলেন৷
‘হ্যাঁ—’, বিজু দেওয়ালের দিকে তাকায়৷ সৌম্যেন্দ্র ঠিক তার বিপরীত দিকে গিয়ে বসেন৷
এতক্ষণে বিজু টের পায় ওই জায়গাটা খালিই ছিল৷ পাশে দুটো দু-রঙের ফোন, মোটা মোটা অনেকগুলি ফোন ডাইরেক্টরি৷ তার একটার শিরদাঁড়ায় ‘প্যারিস’, আর একটার শিরদাঁড়ায় ‘বম্বে’ পড়ে বিজু৷
‘আরে সন্তুর দোষ দিয়ে হবে কী? সৌমেনদার কাণ্ডই তো ওরকম৷ সন্তুকে বলবেন বুড়িকে ফ্রেমে রাখিস, তা না, ওকে উল্টোপাল্টা কী সব বোঝালেন, গ্রিক নাটক, কোরাস, কীসব, ব্যস, সন্তু দিল বুড়িকে আউট করে’— দরজার কাছ থেকে এরকম একটা বর্ণনা আসে৷
‘হ্যাঁ, সোমেনদা, কাজের সময় এইসব গ্রিক নাটক-ফাটক বলবেন না৷ খুব ভয় করে—’ সৌম্যেন্দ্রর পাশ থেকে একজন বলে৷
‘ফের পাকামো হচ্ছে? সন্তু বুড়িকে ফ্রেমে রাখতে ভুলে গেল, আর দোষ হল আমার গ্রিক নাটকের?’
‘আরে এই সৌম্যদা, সন্তু বলল তো, মনে নেই আপনার, র্যাশ দেখতে দেখতে কে জিজ্ঞাসা করল, সন্তু, বুড়ি কোথায়, আর সন্তু নার্ভাস হয়ে বলল, কেন, দাদা যে বললেন, গ্রিক নাটক—’
আবার এক রোল হাসি৷ সৌম্যেন্দ্রও মুচকি মুচকি হাসেন আর বিজুর দিকে তাকান৷
‘তোমরা তো ভাই গ্রিক নাটক করেই খালাস৷ সোমেনদা মুখ হাঁড়ি করে আমাকে বললেন, বুড়ি জোগাড় করে ক্লোজ আপে একটা শট নিন, আর আমি বুড়ি পাই কোথায়— কবে আউটডোর হয়ে গেছে, সে শালার বুড়ি বেঁচে আছে কিনা তাই ডাউট৷ এ বুড়ি আনি— সোমেনদা বলেন নো, আর এক বুড়ি আনি— নো, আগে ভাবতাম বুড়ি মানে বুড়ি৷ সেই প্রথম জানলাম ছুঁড়িদের মতো বুড়িদেরও কত ভেরিয়েশন৷ লে শালা, সে ভাই যে দিন গেছে, কোনও ডবকা মেয়ে দেখলেই চোখ সরিয়ে নিই, আমার তখন বুড়ি চাই, বুড়ি৷’
প্রশ্রয়ের হাসির সঙ্গে সৌম্যেন্দ্র শুনছিলেন৷ বিজুও৷ আর সৌম্যেন্দ্র যেন বিজুর সঙ্গে শোনার আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন এমনভাবে মাঝে মাঝে বিজুর দিকে তাকাচ্ছিলেন৷ এতক্ষণে বিজু আন্দাজ করতে পারে, ‘হুঁ’, ‘হ্যাঁ’, ‘অ্যাঁ’ এই ধরনের কিছু আওয়াজ নাক দিয়ে বের করাটা সৌম্যেন্দ্রর অভ্যেসই বুঝি৷
‘কিন্তু সেই শট কী হয়ে দাঁড়াল, বলো, কার্লোভি ভেরিতে তো ওই শেষ শটের পর লোকজন চেয়ার ছেড়ে নড়ছিল না ভাই, আমার নিজের দেখা৷ ওই বিরাট পর্দায় হঠাৎ কাট, মাথা নেই৷ কাট, পা নেই৷ কাট, জুম ফরোয়ার্ড, দুটো মাই ঝুলছে, ঝুলছে তো ঝুলছেই, দেখতে দেখতে আমারই সন্দেহ হচ্ছিল, এ শট কি আমাদেরই তোলা, আর প্রথমে তো বোঝা যায় না কী হচ্ছে, জাম্প কাট, জাম্প কাট, গলার কণ্ঠার হাড় দুটোতে ফ্রেম করে ক্যামেরা যখন সেকেন্ড টাইম নামে তখন বোঝা যায় এক বুড়ির ঝুলে পড়া মাই৷ তারপর শেষে ওই বোঁটার ওপর ক্লোজ আপ ব্লো করা৷ শালা, অডিয়েন্স ভিরমি খেয়ে গেল৷ সাধে কি আর প্রাইজটা দিল! যতই বলো ভাই, ওই শট আমি এখানে কতবার দেখলাম কিন্তু ওই ইফেক্টই হল না৷ চারপাশে ফরাসি, জার্মানিতে কথা হচ্ছে, টেম্পো টেম্পো মেমসাহেব, মাঝে-মাঝেই বিয়ার, একটু আধটু হার্ড ড্রিঙ্কস— তার মধ্যেই ওই ইন্ডিয়ার বুড়ির ইন্ডিয়ান মাইয়ের ইফেক্টই আলাদা৷ তারপর প্রেসের কাছে সৌম্যেনদা জরতী-টরতী কীসব বললেন— গুলটুল মেরে—’
‘ধুত বেটা, গুল কীরে, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে অন্নপূর্ণার জরতী বেশ নেই?’
‘এই তো দাদা৷ আমাদের বোঝালেন গ্রিক নাটক, সন্তু দিল বুড়িকে আউট করে৷ আর সাহেবদের বোঝালেন অন্নপূর্ণা, ব্যস, সাহেবরা দিল বুড়ির মাইকে ইন করে—’
এক দমকা হাসির মধ্যে কেউ একজন গলা চড়িয়ে বলল— ‘কিন্তু কার্লোভি ভেরির প্রাইজটা সোমেনদার সন্তুকে দেওয়া উচিত ছিল৷ ও যদি গ্রিক নাটক না করত তাহলে তো আর ওহ সিকোয়েন্স আসত না—
এই সব কথাবার্তার মধ্যে ঘরের ভিতরের দলটা ভেঙে যাচ্ছিল৷ ঘরটায় জনা বারো-চোদ্দো নানা জায়গায় নানাভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল৷ কেউ পিছনের দেওয়ালে গা ঘেঁষে আধশোয়া, কেউ পা-টা ছড়িয়ে হাতের ওপর ভর দিয়ে, সামনের সারিতে যারা তারা হাঁটুর ওপর হাত রেখে, দু-একটা আলগা চেয়ারও ছিল৷ সবাই খুব আরামে বসে ছিল, এমন নয়, কিন্তু এভাবে বসতে দলটা অভ্যস্ত— বোঝাই যায়৷ বোধহয় স্বস্তির অভাবেই এবার আড্ডার সুযোগে দু-চারজন উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছাড়িয়ে নিচ্ছিল৷ কিন্তু দেখতে দেখতে প্রায় সবাই-ই দাঁড়িয়ে ওঠে— মনে হয় সবাই চলে যাবে৷ সৌম্যেন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন, ‘হঠাৎ সোজা হয়ে বসে তোমরা সব উঠে পড়লে যে!’
‘আমরা উঠেই পড়ি, আপনি বরং নতুন কেসটাতে, সরি ফেসটাতে, একটু বেশি টাইম দিন৷ প্রোগ্রাম ঠিক হয়ে থাকল৷ আপনার অ্যাক্টরদের সাইডটা ফাইনাল হয়ে গেলে সোমকে ডেকে সিডিউল করে নেবেন৷ ব্যস, তারপর শুরু হয়ে যাবে৷’ একজন বলে, তারপর বাকিরা সবাই একে একে ঘরের বাইরে চলে যেতে থাকে, জুতো পরে দরজা দিয়ে বাইরে যেতে একটু সময় লাগে, যেন কোনও হল থেকে বেরচ্ছে৷ সৌম্যেন ওদের পেছন-পেছন একটু এগোন, ঘরের দরজা পর্যন্তই৷ মাঝে মাঝে ‘হ্যাঁ’, ‘হুঁ’, ‘অ্যাঁ’ এসব আওয়াজ বিজু শুনতে পাচ্ছিল, যেন সৌম্যেন যখন চুপ করে থাকেন, তখনও একটা সংলাপ চলতে থাকে৷
সৌম্যেন ওই গুঞ্জনের মধ্যে গলা চড়িয়ে বলেন, ‘সন্তু, পার্টিকুলারলি একটু ভেবো, নতুন মিডিয়াম, দুটো একটা বই দেখতে পারো— স্মল স্ক্রিনে কালার ডিস্ট্রিবিউশনের প্রবলেম নিয়ে৷’
বাইরে থেকে সন্তুর গলা শোনা গেল, ‘আপনি তো দিয়েছিলেন একটা বই, সেটাই দেখছি, উপকারে লাগছে খুব৷’
‘ও তোমাকে দিয়েছিলাম না, স্প্রানস্কির বইটা?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, পোল্যান্ডের’
‘এমিগ্রি পোল, দারুণ লেখা, কিন্তু একেবারে পণ্ডিতিয়ানা নেই৷ আমি এইবার আথেন্স এয়ারপোর্টে হঠাৎ পেয়ে গেলাম, একেবারে নতুন বই, এ দেশে দূরের কথা ইউরোপেরও সব দেশে এখনও পৌঁছয়নি৷ হাইজ্যাকিংয়ের ফলে এই একটা সুবিধে হয়েছে৷ এতক্ষণ বসিয়ে রাখে যে বই দেখা যায় অনেক৷ আর, লিবিয়ার ওপর রেগনের অ্যাগ্রেশনের পর আথেন্স, রোম এসব এয়ারপোর্ট মনে হয় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প৷ যাক, তোমার ভাগ্যেই নিশ্চয়ই বইটা পাওয়া গেছে, ভাল করে পড়, একদিন ফোন করে বইটা নিয়ে চলে এসো, কথা বলা যাবে৷’
‘দাদা, আবার এসব এথেন্স-টেথেন্সের মধ্যে কেন যাচ্ছেন—’ এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে হাসির হুল্লোড় আর বাইরের দরজাটাও খালি৷ সিঁড়ি দিয়ে অনেকগুলো পায়ের অগোছালো আওয়াজের ওপর সৌম্যেন্দ্র তাঁর সদর দরজাটা বেশ জোর আওয়াজ তুলে বন্ধ করে দেন৷ দরজা থেকে সৌম্যেন্দ্র ঘরে ঢোকেন না— ভিতরের দিকে যান৷ বিজু দেওয়ালের ছবিগুলো আবার দেখতে শুরু করে আর দু-একটা দেখে আচমকা সামনের ছোট টেবিলটার ওপর এতগুলো পত্র-পত্রিকার ওপর নজর নামিয়ে এনে সে প্রথম একটু বিহ্বল হয়ে ভাবে— আমাকে ইনি ডাকলেন কেন৷ এমনকী, এই নিভৃতিতে তাঁকে ‘কাকা’ বলে মনে মনে ভাবতেও লজ্জা করছে৷ বাবার সঙ্গে পড়তেন, বাবার বেশ ভাল বন্ধু ছিলেন, মানুষ খুবই ভাল, বাবার কাছে ওঁদের দুজনের অনেক গল্প শুনেছে— সৌম্যেন-মণিকার, কিন্তু তাকে, বিজুকে, কেন৷ বাবা বলেছিলেন, আসলে বোধহয় বিজুকে দেখতে চায়, মানে, বাবার ছেলেকে দেখতে চায়, দেখার ইচ্ছে হয়েছে অথচ নিজে জানেন কোনওদিনই মধ্যমগ্রামে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা হবে না৷ বিজু এত নামকরা মানুষের বাড়িতে যেতে রাজি হত না কিন্তু বাবা যেন কেমন করে বললেন, এত পুরনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাবার ছেলেকে দেখতেই চেয়েছে শুধু, যে, বিজু না এসে পারল না৷
সৌম্যেন্দ্র ঢুকে আলো জ্বেলে দিতেই ঘরটা কেমন বদলে গেল৷ এতক্ষণ ঘরের দেওয়াল, বইপত্র, ফটো ইত্যাদি কেমন মিশে ছিল, আলো জ্বালতেই চারদিকের দেওয়াল যেন দূরে সরে যায়, ছবিগুলোর ফ্রেমের কৌণিক ছায়া পড়ে সাদা দেওয়ালে, একটু অগোছালো ঘরের টিক প্লাই-এর ফার্নিচারগুলো স্পষ্ট আকারে যেন ঘরের ভিতর জেগে ওঠে৷
সৌম্যেন্দ্র গিয়ে তাঁর নির্দিষ্ট জায়গাটিতে বসেন৷ তারপর, আবার বিজুর দিকে তাকান ও হাসেন৷ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করেন, ‘বিজু, কিছু খাবে তো? কী খাবে, বল৷’
সৌম্যেনের মুখে নিজের নামটা শুনতে মজা পায় বিজু, তা হলে তার নামটা সৌম্যেন্দ্রকাকুর মনে থেকে গেছে৷
‘না, না, খাব কেন, আমি তাহলে এখন উঠি—’, বিজু সোজা হয়ে বসে বলে৷
‘আরে, আরে, উঠবে কি, তোমার সঙ্গে তো কথাই হল না’, সৌম্যেন্দ্র হঠাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, তারপরই ডাকলেন, ‘মণিকা, মণিকা৷’
মণিকা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে দরজায় দাঁড়ান, তারপর ভিতরে ঢোকেন, কিন্তু বসেন না৷
‘আরে বিজুর সঙ্গে তো কোনও কথাই হল না, ও বলছে চলে যাবে—’ তখন মণিকারই কথা বলার কথা৷
‘তা তো ওকে যেতে হবেই, কোথায় যেন?’ মণিকা জিজ্ঞাসা করেন৷
‘মধ্যমগ্রাম’, বিজু মনে করিয়ে দেয়৷
‘হ্যাঁ৷ রাত হয়ে যাবে না? এখান থেকে তো আর একটা বাস পাবে না?? মণিকা এটাও জিজ্ঞাসাই করেন৷
বিজুকে একটু ভাবতে হয়, যেন মণিকাই মনে করিয়ে দিলেন৷ তারপর বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, একটা বাস তো আছে, গোলপার্ক থেকে একেবারে দু-নম্বর গেট পর্যন্ত যায়—’
‘দু-নম্বর গেট মানে?’ সৌম্যেন জিজ্ঞাসা করেন৷
‘এয়ার পোর্টের৷ সেখান থেকে মধ্যমগ্রামের বাস তো সব সময়ই পাওয়া যায়—’
‘সব সময় মানে? রাত কটা পর্যন্ত?’ মণিকা জিজ্ঞাসা করেন৷
‘নটা-সাড়ে নটা তো বটেই—’, বিজুই মণিকাকে আশ্বস্ত করে৷
‘তা হলে আর তোমরা কথা বলবে কতক্ষণ? এখান থেকে এখন রওনা দিলেই তো এয়ারপোর্ট পৌঁছুতে আটটা-সাড়ে আটটা হয়ে যাবে৷’ মণিকা দুজনকেই বলেন, দুজনের দিকে তাকিয়ে৷
‘তাহলে আমি বরং এখনই উঠি’, বিজু উঠে দাঁড়ায়৷ মণিকা হেসে বলেন, ‘দাঁড়াও, অন্তত এককাপ চা খেয়ে যাও, তাতে তোমার দেরি হয়ে যাবে না৷’
মণিকা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করতেই সৌম্যেন্দ্র ছটফট করে দাঁড়িয়ে ওঠেন, ‘সে কী কথা৷ আজ ওদের সঙ্গে কথা হয়ে গেল, প্রোগ্রাম জানিয়ে দেব, সেই অনুযায়ী সিডিউল তৈরি হবে, আর বিজুর সঙ্গে কথাই হল না—৷’
মণিকা বেরিয়ে যেতে যেতে বলেন, ‘তা হলে ওকে কাল আসতে বল৷’
বিজু বলে ‘কাল তো আসতে পারব না৷’
মণিকা ঠিক যখন দরজাটা পেরোয়, সৌম্যেন্দ্র হাত তুলে বলে ওঠেন, ‘আরে বস তো! মণিকা, বিজুকে তো পাত্র ছেড়ে আসতে পারে—’
‘হ্যাঁ৷ তা পারে৷ তা হলে পাত্রকে আবার বলে দিতে হয় যাতে বেরিয়ে না যায়—’
‘হ্যাঁ৷ তাই বলে দাও৷ বস বিজু, এখন আমরা মনের সুখে গল্প করতে পারব৷ তুমি একেবারে রাতে খেয়ে যাবে, গাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে, ব্যস—’
‘না, না, গাড়ি লাগবে না, ও বাস পেয়ে যাবে’, বিজু বসে৷
‘আচ্ছা কাকু আপনার নাম কি ইংরেজি আর বাংলায় আলাদা’, বসেই বিজু জিজ্ঞাসা করে৷
সৌম্যেন্দ্র জোরে হেসে ওঠেন, ‘সাহেবরা বদলে দিয়েছে জানো? ওরা সৌম্যেন্দ্র বলতে ঠেকে যায়, কিন্তু ফার্স্ট সিলেবলে জোর দিয়ে সোমেন দিব্যি বলে৷ তো নে বাবা, তোরা যা বলে ডাকিস, তাই লিখে দিচ্ছি৷’
সৌম্যেন্দ্র দেওয়ালে কাঠের প্যানেলটার ওপর একটা তাকিয়া ঠেস দিয়ে প্রথমে পা দুটো সামনে ছড়িয়ে দেন, কিন্তু পরমুহূর্তেই গুটিয়ে নেন৷
‘শোনো বিজু, তোমাকে একটা দরকারে ডেকেছি ভাই৷ আমি একটা টিভি সিরিয়্যালে হাত দিয়েছি৷ মোট চোদ্দোটা ছবি হবে৷ পনেরোটাও হতে পারে৷ তেরোটাও হতে পারে, মানে সেটা কনক্লুডিং ছবি কী করব, তার ওপর নির্ভর করছে৷ কিন্তু এটা কিন্তু সিরিয়্যালই, মানে, আলাদা আলাদা ছোট ফিল্ম না’, সৌম্যেন্দ্র থামেন একটু৷ সেই ফাঁকে বিজু জিজ্ঞাসা করে, ‘মানে, তের পার্বণ-এর মতো?’
সৌম্যেন্দ্র যেন প্রশ্নটাতে তার কথার খেই হারিয়ে ফেলেন, ‘তের পার্বণ, সেটা কী?’
‘টিভি সিরিয়াল৷ মানে, আপনারটা সত্যজিৎ রায়ের মতো হবে না—?’
সৌমেন্দ্র যেন কথা খুঁজে পান, ‘না, সন্দীপেরটার মতো হবে না—৷ ওগুলো তো টেলিফিল্ম৷ আমার ক্ষেত্রে সিরিয়্যালিটিটা মোস্ট ইম্পর্টান্ট৷’
‘আচ্ছা৷ আমি টিভির এইটা ঠিক বুঝি না৷ একটা লোককে নিয়ে নতুন নতুন ফিল্ম দেখালে তো আর সিরিয়্যালিটি থাকে না—’
বিজুর প্রশ্নে একটু অবাক হয়েই যায় যেন সৌম্যেন্দ্র৷ ঠিক এ আলোচনাটা তিনি এখানে আশা করেননি৷ বিজুর এত জটিল প্রশ্নের সরল উত্তর তার জানা৷
‘কেন? ক্যারেক্টারের?’
বিজু একটু থেমে বলে, ‘তা বটে৷ কিন্তু সে তো এপিসোডস—’
সৌম্যেন্দ্র একটু চমকে তাকান, ‘কী বললে? এপিসোডস? না?’
‘হ্যাঁ, টুকরো গল্প৷ সিরিয়্যাল মানে তো একটা গল্প একদিনে বলা হচ্ছে না, কয়েকদিন ধরে বলা হচ্ছে৷ করমচাঁদের কয়েকটা গল্প এরকম ছিল৷’
সৌম্যেন্দ্রর মুখে আবারও ছায়া ঘনায়, ‘কী বললে? এপিসোডস, না? করমচাঁদ কী?’
‘করমচাঁদ, মানে টিভি সিরিয়্যাল করমচাঁদ’, বিজু মনে করায়৷
‘শোনো বিজু, আমাকে একটু বলতে দাও৷ তোমার এই কথাটা থেকে আমার সিরিয়্যালটার নাম পেয়ে গেলাম যেন৷ হয়ত সিরিয়্যালটাকে আমি বলতে চাইব— এপিসোডস ফ্রম ওয়ান ডে ইন দ্য লাইফ অব বিজু, বা, ধর, শুধুই, ডেজ ইন দ্য লাইফ অব বিজু, আমি অন্যরকমও ভাবছিলাম, এপিসোডস অব গ্রোথ, বা ধর, এ গ্রোয়িং ইয়ংম্যান, কিন্তু এগুলো কী রকম বিজ্ঞাপন-বিজ্ঞাপন শোনায়, ইনট্রিগ নেই কিছু৷ যা হোক, সে নাম যা হওয়ার হবে, ব্যাপারটা হচ্ছে—’, সৌম্যেন্দ্র নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে থাকেন আর বিজু জিজ্ঞাসা করে, ‘ইংরেজিতে হবে ছবিগুলো?’
‘না, না বাংলাতে৷ সে পরে বাইরে বিক্রি হলে সাব-টাইটেল করে দেব৷ বাংলায় হবে, বাংলায়৷ আসলে আমি এখনকার একটা ছেলেকে, মানে ধর, তোমাকে ফলো করব৷ তুমি সারাদিনে কত কিছু কর তো, বাড়িতে, বন্ধুদের সঙ্গে, কফি হাউসে, লাইব্রেরিতে’, সৌম্যেন্দ্র একটু হেসে বলেন, ‘হয়ত প্রেমিকাও আছেন তোমার, থিয়েটার দেখ, ফিল্ম দেখ, একাডেমিতে যাও, কলকাতার রাস্তায় বৃষ্টির জল জমে গেলে হাঁটো, বা ধর, ইন্দিরা গান্ধী মারা গেলে বা ওরকম কিছু হলে বাস-ট্রাম বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন হাঁটো, বা, প্রতিদিন মিছিল দেখ, কত মিছিল তোমার পাশ দিয়ে চলে যায়, তুমি তার কিছু বোঝ, কিছু বুঝতে চাও বা কিছু বুঝতে পার না, কাগজ পড়— কিন্তু খবরগুলোর সঙ্গে কোনও আত্মীয়তা বোধ করো না৷ বা, ধর রাত জেগে খেলা দেখ, ওয়ার্ল্ড কাপ, কিন্তু নিজে খেল না৷ মানে, ধর, তুমি ক’ঘণ্টা ঘুমোও, সাত-আট ঘণ্টা, বাকি ষোলো-সতেরো ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্তই আমার ফিল্মের বিষয় হতে পারে, আমার ছবির ডিউরেশন তো মাত্র আধঘণ্টা, সুতরাং, তোমার ষোলো-সতেরো ঘণ্টা থেকে আমার ত্রিশ-বত্রিশটা ফিল্ম হয়ে যাবে—’
‘এ তো বেশ ভাল হবে৷ কিন্তু আমি কী করব?’
‘সেই জায়গাতেই আমি একটা ফর্ম্যাল এক্সপেরিমেন্ট করব৷ মানে, এই ফিল্মের কোনও শুটিং স্ক্রিপ্ট থাকবে না৷ কোনও অভিনেতা থাকবে না৷ কোনও লেখা ডায়ালগ থাকবে না৷ তুমি যেমন রোজ দিন কাটাও, তেমনি কাটাবে, আমরা সেটাকে ধরে রাখব শুধু৷ মানে, ডকুমেন্ট করব৷ কথাবার্তা এমনি অন্য টেপরেকর্ডারে তখন ধরে রাখা হবে৷ আসলে, এটি ডকুমেন্টেশন অব এ ডে ইন দি লাইফ অব বিজু— এরকম একটা নামও ভেবেছিলাম৷ কিন্তু একটু পম্পাস শোনায়৷ যা হোক, আমার ছবির মেজর কন্ট্রিবিউশনই হবে এই ডকুমেন্টেশন৷ কিন্তু তার মানে ডকুমেন্টারি নয়, বা ইনস্ট্যান্ট মুভি নয়৷ পরে, আমরা একটা এডিটিং স্ক্রিপ্ট করব— সে সবটা তুলে ফেলার পর, মানে, আমরা যখন জেনেছি যে আমাদের ক্যানে কী র্যাশ আছে, তখন আমরা এপিসোডগুলোকে আলাদা করে করে স্ক্রিপ্ট বানাব৷ সেই স্টেজেই ডায়ালগ আসবে৷ দুটো একটা গ্যাপ যদি থাকে সেগুলো শুট করে নেওয়া হবে৷ সেখানেই আমাদের রিয়্যাল টেস্ট৷ তা তুমি রাজি তো?’
‘আমার রাজি-অরাজির কথা কোত্থেকে আসছে? আমি কোনওদিন অভিনয়ই করিনি—’
‘সেজন্যেই তো তোমাকে খবর দিলাম৷ কোনও অ্যাক্টিং চলবে না৷ নো অ্যাক্টিং—’
‘তার মানে, আপনার আমাদের বয়সী একটা ছেলে দরকার৷ আমাকেই দরকার, তা তো নয়, আমি আপনাকে ভাল ছেলে জোগাড় করে দেব৷’
‘তুমি আমাকে জোগাড় করে দেবে কী? আমার কি ছেলে কম আছে? কিন্তু আমি তোমাকেই চাই’ সৌম্যেন্দ্র পা নামিয়ে জোর দিয়ে বলেন যেন তারপরে আর কোনও কথা হতেই পারে না৷
‘আপনি তো আর আমাকে আগে কখনও দেখেননি, তাহলে আমাকে না হলে আর চলবে না কেন?’ বিজু একটু কৌতুকের সঙ্গেই বলে৷
‘কিন্তু, এখন তো দেখেছি৷ এখন আর তোমাকে ছাড়া চলবে না৷ আসলে, আমি মাসখানেক ধরে এই ছেলেটিকেই খুঁজে ফিরছি৷ কিন্তু, আমাদের অসুবিধা হল যে কাউকে বলতেও পারি না৷’
‘কেন?’
‘ওই দেখলে না, তুমি যখন এলে, তোমাকে ঢুকতে দিচ্ছিল না৷ প্রতিদিন অন্তত জনা বিশেক ছেলে-মেয়ে আসে ফিল্মে নামার জন্যে?’—
‘আপনার কাছেও? মানে, আপনাদের কাছেও? এ তো জানা কথাই যে আপনারা সেরকম ফিল্ম করেন না?’
‘সেটাও তো একটা অতিরিক্ত আকর্ষণ হতে পারে৷ বা বলতে পার, বিপদ৷ অমিতাভ বচ্চন মার্কা ফিল্মে অভিনয় করার লোভে যে ছেলে ডিরেক্টরের বাড়িতে যায়, তাকে তো তুমি দারোয়ান দিয়ে তাড়াতে পার, বা দরকার হলে, দরজায় পুলিসও বসাতে পার৷ কিন্তু মানিকবাবু, মৃণালবাবু বা আমার কাছে যারা আসে তারা তো ভাল ছেলেমেয়ে৷ দেখতে-শুনতে সুন্দর, অভিনয়ও করে ভাল, পড়াশোনায় ভাল, ফিল্মের সবশেষ খবর রাখে৷ তাদের সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগে৷ সে ছেলেমেয়েকে তো তুমি দারোয়ান দিয়ে তাড়াতে পার না৷ তার ওপর যদি শোনে, আমি সত্যি অভিনেতা খুঁজছি, তাহলে তো আর কলকাতায় থাকতে পারব না৷ আমার দরকার ছিল একটা গ্রিন চেহারা, কিন্তু নাগরিক চেহারা, মানে, অপু চাই না, শহরের ছেলে আটঘাট জানে, তার ডেইলি কনফ্লিক্ট, যাতে, আমাদের এই সময়টাকে ধরতে পারি, ছবিটার নাম ধর এপিসোডস ফ্রম আওয়ার টাইমসও হতে পারে৷ এমন একটা অ্যাভারেজ চেহারা যার সঙ্গে প্রত্যেকে আইডেনটিফাই করতে পারে, দেখা মাত্র, আরে এটা তো আমি—’
‘আপনি তো আর শুধু আমাদের বয়সীদের জন্যেই ফিল্মটা করছেন না?’
‘না, তা কেন, কিন্তু, রাস্তাঘাটে যে ছেলেদের দেখেছ তাদের একটা অংশের সঙ্গে আইডেনটিফাই করতে পারলেই ছবিটার সঙ্গে আইডেনটিফিকেশন হয়ে যাবে৷ আর একটা ব্যাপার৷ দেখ, আমাদের ছেলেদের জীবনে ড্রামা বা টেনশন খুঁজতে গেলেই কিছু স্ল্যাং আর কিছু মাস্তানি দেখানো হয়, যেন, এই স্ল্যাং ছাড়া কোনও ভাষা নেই যৌবনের, বা মাস্তানরা ছাড়া কোনও প্রটাগেনিস্ট নেই, যৌবনের৷ আমরা তার বদলে ঠিক বিপরীতটা প্রজেক্ট করব৷ আমাদের ছেলেরা এখন অনেক বড় ভোকাবুলারি থেকে কথা শেখে, এখন সারা দুনিয়ার কাছে তারা এক্সপোজড— ফিজিক্যালি অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালি৷ তারকেশ্বরের মাথায় জল দিতে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে যায়— সেই কথাটাকে ধরে অপসংস্কৃতি আর অবক্ষয় বলে চিৎকার করলে তো চলবে না৷ যারা তারকেশ্বরে যায়, তাদেরই একটা অংশ স্টুডেন্টস হেলথ হোমের পদযাত্রায় যায়, বা আফ্রিকার দৌড়ে দৌড়য়৷ আমার তো মনে হয়, তারকেশ্বরের একটা বড় অংশই যায় শারীরিক কষ্টের লোভ, স্পিরিট অব অ্যাডভেঞ্চার থেকে৷’
‘ফিল্মিক্যালি এটা অবিশ্যি দারুণ হয়৷ ধরুন, তারকেশ্বরের বাঁক নিয়ে কলকাতার মোড়ে মোড়ে মাইক বাজানো৷ তারপর এক-একটা ব্যাচকে ফলো করা, শেষে তো একটা সাংঘাতিক চেহারা নেয়, সারা রাস্তা জুড়ে শুধু মানুষ ছুটছে, দেখতে, ফিল্মিক্যালি, দারুণ লাগবে, বিদেশে তো আমাদের এসব রিচুয়্যালসের নাকি দর্শক অনেক, তার সঙ্গে স্পিরিট অব অ্যাডভেঞ্চার যা বললেন, সেও তো খুব ভাল টেনশন তৈরি করতে পারবে৷ একই সঙ্গে আপনি এক তারকেশ্বর দিয়েই স্বদেশ-বিদেশের দর্শক ধরে ফেলতে পারবেন৷ আপনি ঠিকই ধরেছেন৷ তারকেশ্বরের পটেনশিয়ালিটি আছে৷
সৌম্যেন্দ্র হেসে ওঠেন, ‘তোমরা খুব ফিল্ম দেখ, না?’
‘তোমরা মানে?’
‘তুমি ও তোমাদের বন্ধু-বান্ধবেরা, মানে আজকালকার ছেলেমেয়েরা৷’
‘কেন৷ এ-রকম মনে হল কেন আপনার?’
‘এই যে কী সুন্দর বললে ফিল্মিক্যালি পটেনশিয়াল, এসব চোখ তোমাদের তৈরি হয়ে গেছে এখন কেমন৷ শুনলেই প্রায় ভিজুয়ালাইজ করে ফেলতে পার তোমরা৷’
‘আপনি আবারও তোমরা বলছেন৷ আমাদের একটা অ্যাভারেজ চেহারা ধরতে চাইছেন কেন৷ আমি শুধু আমার কথাই বললাম৷ আর, আমার কোনও ফিল্ম দেখার দলও নেই৷
আজকাল যারা দেখে তারা জেনেশুনেই দেখে৷’
‘এটা তুমি ঠিক বলেছ৷ আমাদের সময় দেখে-দেখে জানতে হত, বুঝতে হত, এত বই-ই ছিল না, তোমরা এখন তো সারা দুনিয়ার বই পেয়ে যাচ্ছ—৷’
‘সারা দুনিয়ার বলবেন না—’
‘কেন? জানো, ‘মাইট অ্যান্ড সাউন্ড’-এর একটা প্রবন্ধ পড়ার জন্যে আমাদের ছ-মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে আর তোমরা তো প্রত্যেক সংখ্যা ব্রিটিশ কাউন্সিলে পেয়ে যাও, তাছাড়া আমেরিকান লাইব্রেরি আছে, ম্যাক্সমুয়েলার আছে, গোর্কিসদন তো সিনেমা হলই হয়ে উঠেছে—’
‘সেটা ঠিকই৷ কিন্তু ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনও ভাষার কাজ তো আমরা কলকাতায় বসে জানতে পারি না, মানে চিন্তার কাজ—’
‘অ্যাঁ? হ্যাঁ, এটা অবিশ্যি ঠিক—’
‘আর, ইংরেজিভাষীদের বাইরেই তো ফিল্মের কাজ হচ্ছে এখন—’
‘সবই তো তাই, সবই তো তাই, কী ছবি তুলছে টার্কিশরা, এবার তো গ্রিসের এক ছোকরার ছবি দেখে আমি হাঁ৷ কিন্তু ওসব খবরও তো তোমরা জেনে যাচ্ছ কলকাতায় বসেই, দেখেও ফেলছ ঠিক, তোমাদের চোখ মন কত তৈরি!’
‘আপনি আবারও কিন্তু একটা ভুল করছেন সৌম্যেনকাকু৷ আবার একটা অ্যাভারেজ কষতে চাইছেন৷ ফিল্ম দেখার চোখ-কান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, এমনকী আমরা জানিই না একটা ফিল্মে কী দেখতে চাই, আর কী দেখতে চাই না৷ ধরুন, এর ভিতর মৃণালবাবুর ‘খণ্ডহর’ এর মতো ছবি তো এখানে চলল না—, বা পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মালঞ্চ’, মাধবী ফিল্ম-অ্যাকটিংয়ের যে-হাইটে গেলেন!’
‘কেন, গৌতমের ‘পার’?
‘হ্যাঁ৷ একমাত্র ব্যতিক্রম৷ ভাল ছবি অথচ লোকে দুহাতে নিয়েছে৷’
‘আসলে জানো, এটার কোনও অ্যাভারেজ কষা যায় না— কোনটা লোকে নেবে, আর কোনটা নেবে না, সব দেশেই এক ব্যাপার—’
‘ফিল্মের ব্যাপারে একটা অসুবিধে বোধহয় যে আপনি লোকে কী নেবে এ-রকম একটা আন্দাজ ছাড়া ফিল্মটাতে হাতই দিতে পারবেন না, একটা হিসেব আপনাকে করতে হবেই৷ ধরুন, একজন কবির যেমন স্বাধীনতা আছে— লোকে বুঝবে না এ-রকম একটা কবিতা লেখার, একজন ফিল্মমেকারের সে-রকম কোনও স্বাধীনতা থিয়োরিটিক্যালিও নেই যে আমি একটা ছবি তুলব যা কেউ বুঝবে না—’
সৌম্যেন্দ্র মৃদু মৃদু হাসছিলেন৷ তাঁর কপালে দু-তিনটে ভাঁজ পড়ে৷ এমন হতে পারে যে তিনি বিজুর কথাগুলো শুনতে মজা পাচ্ছিলেন, মনে মনে তারিফও করছিলেন৷ আবার এমনও হতে পারে, তিনি ফিল্মে এমনই আপাদমস্তক প্রাোথিত যে, এসব তত্ত্ব তাঁর কাছে অবান্তর৷ অথবা, তাঁর অভিজ্ঞতায় জানেন যে ফিল্ম দেখা ও ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার ফলে বিজুর মনে অনেক কথা জমে আছে, সৌম্যেন্দ্রর সামনে সেসব কথা বলে না-ফেলা পর্যন্ত সে আত্মস্থ হতে পারছে না৷
তখন, বিজু বলছে, ‘আসলে ফিল্ম তো এমন একটা আর্টফর্ম যা ইন্ডাস্ট্রি ছাড়া প্রডিউস করাই সম্ভব না৷ যেখানে আপনি লোকের কথা, খদ্দেরের কথা না-ভেবে, মানে, ট্রেডের কথা না-ভেবে কোনও আর্ট করতেই পারবেন না৷ আসলে, আমার আপত্তিটা সেজন্যেই’, বিজু খুব ধীরে থেমে যায়৷ তার থামা দেখে বোঝা যায়, যা-যা বলার ছিল, সে বেশ গুছিয়ে বলতে পেরেছে৷ আর, সে থেমেছে কিনা এটা বুঝতে না পেরে সৌম্যেন্দ্র তাঁর ভঙ্গি অপরিবর্তিতই রাখেন৷ একটু পরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মানে, তোমার আপত্তি কি ফিল্ম অ্যাজ আর্টফর্মে, নাকি ফিল্ম অ্যাজ ইন্ডাস্ট্রিতে?’ সৌম্যেন্দ্রর কথায় কোনও একটা অস্পষ্ট অনুমোদন ছিল যে ইচ্ছে করলে বিজু ওই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে পারে৷
বিজু খুব সুন্দর হাসে৷ আর কোনও কথা বলে না৷ একটু সময় দিয়ে সৌম্যেন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন, ‘ফিল্মে আপত্তি, বললে না?’ সৌম্যেন্দ্রর জিজ্ঞাসার ধরনে মনে হচ্ছিল, তাদের কথা শেষ হয়ে গেছে, বিজু এখন চলেও যেতে পারে৷
একটা বইয়ের পাতা উল্টোতে-উল্টোতে বিজু বলল, ‘না, ওসবে আপত্তি করার আমি কে? আপনি যা বললেন, তাতেই আমার আপত্তি—’
‘মানে, কী বললাম?’
‘ওই যে টিভি সিরিয়্যালে পার্ট করতে৷’
মণিকা নিজেই দু-কাপ চা নিয়ে এসেছিলেন৷ বিজুর সামনে ম্যাগাজিন ভর্তি টেবিলটার ওপর একটা নামান, আর-একটা সৌম্যেন্দ্রের হাতে দেন৷
‘খুব তর্ক জমেছে, মনে হচ্ছে’, বলে বেরিয়ে যান, একটু তাড়াতাড়ি৷
তাঁর পেছনে পেছনে সৌম্যেন্দ্রের গলা ওঠে, ‘আরে এ দারুণ তার্কিক ছেলে, আমাকে মেরে ফেলেছে৷ তুমি এসে বস না৷ দেখ, একেবারে সেই ইউনিভার্সিটির বিমানের মতো কথা বলে, আস্তে আস্তে, থেমে থেমে, দেখে যাও৷’
দুটো ডিশ নিয়ে মণিকা ঢোকেন— ‘ও তো আমি প্রথম দেখেই বুঝেছি, তিরিশ বছর আগের বিমানবাবু৷ তোমাকে এতক্ষণ চুপ করিয়ে রেখেছে, মানে কথার জোর আছে৷’
‘জোর আছে মানে কী, বসে শোনই না, বস’, সৌম্যেন্দ্রের কথায় মণিকা বিজুর পাশে বসে পড়ে৷
সৌম্যেন্দ্র চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, ‘বল৷’ যেন কোনও পার্ট বিজুকে মুখস্থ করানো আছে, বিজু এখন বলবে৷ বা, বিজু খুব ছোট ছেলে, মুখস্থ কবিতা বলবে৷
বিজু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে, ‘কী বলব? বললাম তো—’ তারপর চায়ে এক চুমুক দেয়৷ একটু সময় নিয়ে ডাইনে তাকিয়ে বলে, ‘আচ্ছা কাকিমা, আপনারা তো একসঙ্গে পড়তেন, আপনি, কাকু, বাবা এঁরা—’
মণিকা হেসে মাথা নাড়ে, ‘হ্যাঁ৷’
‘আপনিও কি বাবার মতো বা কাকুর মতো?’ কথাটা বিজু একটু ভেঙে বলে যেন তার সঙ্কোচ ছিল কথাটা এভাবে তোলা যায় কি না৷
‘কী রকম? বাবা আর কাকু কী রকম?’ মণিকা পায়ের ওপর পা তুলে বিজুর দিকে ঘুরে বসে, হাঁটুর ওপর কনুইয়ের ভর দিয়ে হাতে চিবুক রেখে, তার বাঁ হাতটা কোলের ওপর পড়ে থাকে৷ বিজুকেও একটু ফিরতে হয়— মণিকার দিকে৷
‘কাকু আমাদের মতো ছেলেদের নিয়ে একটা ছবি করবেন৷ আমি তো অভিনয় করতে পারি না, কাকু বলছেন, সেজন্যেই নাকি আমাকে দরকার, এটা অভিনয়ের ফিল্ম হবে না, ডকুমেন্টারি ধরনের হবে—’
বিজুর কথার মাঝখানে, ‘এ্যাঁ’, বলে সৌম্যেন্দ্র কিছু শুনতে চান৷ তারপর হঠাৎ নিজের বসার জায়গা থেকে পিছলে একেবারে বিজু মণিকার সামনে মেঝের ওপর এসে বসে পড়েন৷ ম্যাগাজিনঠাসা ছোট টেবিলটাকে পা দিয়ে সরাতে গেলে মণিকা বলে ওঠেন, ‘আরে, কেকটা তো খাবে ছেলেটা৷’
সৌম্যেন্দ্র তাড়াতাড়ি কেকের ডিশটা বিজুর সামনে ধরেন, তারপর পাশে রাখেন৷
‘আসলে বাবা বা কাকুর একটা ভুল ধারণা আছে যে বোধহয় আমাদের সময়ের প্রত্যেকটা ছেলেই এক একটা ঘটনা, বা আমাদের প্রত্যেকটা দিনেই নানা ঘটনা ঘটছে৷’
‘না, আমি তো তা বলিনি, আমি বলেছি তোমাদের যে-কারও যে কোনওদিন—’ মেঝেতে সৌম্যেন্দ্র তাঁর বসার ভঙ্গি বদলে বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তুলে নেন৷
‘তা বলেছেন মানে তো আপনি ধরে নিয়েছেন আমাদের সবার জীবনের একটা গড় আছে, আমাদের দিনগুলোরও একটা গড় আছে৷’ বিজু প্রশ্নটা শুরু করে সৌম্যেন্দ্রর মুখের ওপর, শেষ করে মণিকার মুখের ওপর৷
‘তা তো হল৷ কিন্তু তুমি বলতে চাইছটা কী? তোমাদের কোনও জীবন নেই, তাহলে সেটাই ফিল্ম হবে—’ মণিকা হাসিমুখে বলেন৷ সৌম্যেন্দ্র তাকিয়ে মণিকার কথা শোনেন এমন ভঙ্গিতে যেন তাঁর কথা মণিকাই ভাল বলে দেবেন৷
‘তা তো হবে না কাকিমা, কারণ, কাকুর মাথায় একটা ফিল্ম অলরেডি আছে, সে উনি যতই বলুন ইনস্ট্যান্ট ফিল্ম, নো স্ক্রিপ্ট ফিল্ম, নো অ্যাক্টর ফিল্ম৷ তা হলে তো উনি যে কোনও রাস্তা থেকে যে কোনওদিন ফিল্ম তুলতে পারতেন৷ মধ্যমগ্রাম থেকে আমাকে আনাবেন কেন? ওঁর মাথায় একটা ফিল্ম আছে, সেটা আমাদের সময়ের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, সেটার বিক্রির ব্যাপারটাও ভাবা আছে, আমাকে শুধু তার সঙ্গে কনফর্ম করতে হবে, ওই কনফর্ম করানোর জন্যে, মেলানোর জন্যে, ওঁর আমার মতো অ্যাভারেজ মুখ দরকার, যাতে দর্শকেরা সহজে আইডেনটিফাই করতে পারে— আরে এ ছেলেটা তো অমুকের মতো দেখতে, বা পাড়ার বা কলেজের অমুক ছেলের মতো দেখতে৷’
‘হ্যাঁ৷ একজ্যাক্টলি৷ না হলে আমার মেজর পয়েন্টটাই নষ্ট হয়ে যাবে’, সৌম্যেন্দ্র জোর দিয়ে বলেন৷
একগাল হেসে বিজু মণিকার দিকে তাকায়, ‘দেখলেন তো কাকিমা, কাকুর মাথায় একটা ফিল্ম আছে, সেটা বের করবার কাজে আমাকে ইনস্ট্রুমেন্টাল হতে হবে৷ বাবাও মনে করেন, আমাকে নিয়ে তাঁর সব প্ল্যান ঠিক করা আছে, সেটা একজিকিউট করার দায়টুকু শুধু আমার৷ আসলে আমার বাবার মতো নিরীহ সাধারণ ভদ্রলোক আর কাকুর মতো বিখ্যাত লোক একটু ভুল করছেন৷ শুধু ভুল করছেন না, সেই ভুলের সমর্থন চাইছেন— বাবা আমার কাছ থেকে, তাঁর ছেলের কাছ থেকে, কাকু তাঁর ফিল্মের কাছ থেকে৷ অথচ আমাদের সবকিছু আগে থেকে ঠিক করা আছে, আমাদের জীবনের কোথাও কোনও অনিশ্চয়তা বা নাটকীয়তা নেই৷ আপনারা কখনও শুনেছেন আপনাদের ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় পাস করবে কি না এই নিয়ে চিন্তা হচ্ছে কারও৷ আজকাল আমরা কেউ পরীক্ষায় ফেল পর্যন্ত করি না৷’
‘যারা পরীক্ষা দেয়, তারা সবাই পাস করে নাকি?’ মণিকা জিজ্ঞাসা করেন৷
‘কত নতুন নতুন ইস্কুল হয়েছে, গ্রামে-ট্রামে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা ফেল করে, কোনও ভদ্রলোকের ছেলেমেয়ে এখন পরীক্ষা ফেল করে না—’ বিজু বেশ জোর দিয়ে বলে৷
‘তাতে কী হল?’ সৌম্যেন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন৷
‘না, কিছু হল না৷ আমিও তো তাই বলছি, আমাদের কিছু হয় না৷ সব ঠিক হয়ে থাকে৷ আর, আপনি বানাতে চাইছেন যেন আমাদের প্রত্যেকটা দিন বা কাজই একটা খুব নাটকীয় ব্যাপার৷ মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার-টার পাওয়ার পর আমাদের আসল পরীক্ষা শুরু হয় জয়েন্ট এন্ট্রান্স, আই আই টি, আই এস আই, জে সি বি এন টি এস—’
‘সেটা আবার কী?’
‘জগদীশ বোস ন্যাশনাল ট্যালেন্ট সার্চ৷ এরকম আরও কত! আমাদের একটা মিনিমাম অ্যাভারেজে পৌঁছতেই হয়— তারপর সব ট্র্যাক খোলা, স্ট্যাটিসটিকস থেকে এয়ারোনটিক্স বায়োকেমিস্ট্রি৷ দৌড়ে জিতে নাও৷ মাধ্যমিকের পর এইসব পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে আমাদের ট্র্যাক ঠিক করে নিতে হয়৷ ট্র্যাক ঠিক থাকা চাই, কোনও অবস্থাতেই পেছনে যাওয়া চলবে না৷ আপনি এই নিয়ে কী ফিল্ম করবেন? আপনারা আমাদের সম্পর্কে কতগুলো ধারণা করে রেখেছেন মাত্র—’
‘বয়৷ তুমি এসব কী বলছ? তোমরা লিটল ম্যাগাজিন বার কর না? গ্রুপ থিয়েটার কর না? ছবি আঁক না?’ মণিকা এমনভাবে প্রশ্ন করেন, যেন তিনি আরও অনেক কিছু জানেন৷ সৌম্যেন্দ্র মণিকার কথা খুব মন দিয়ে শোনেন৷ মণিকার কথা শেষ হয়ে গেলেও তাঁর চোখ সরাতে দেরি হয়৷
বিজু একটু হাসে, খুব সুন্দর চাপা হাসি৷ প্রথমে দেখে একটু পাকা-পাকা লাগে, পরে বোঝা যায়, ও বেশ গুছিয়ে নিয়ে ঠোঁট খোলে৷
‘আসলে কাকিমা, এখানেই ব্যাপারটা বদলে গেছে৷ আপনারা যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁরাই লিখতেন৷ যাঁরা খেলতেন, তাঁরাই নাটক করতেন৷ যাঁরা গান গাইতেন, তাঁরাই ছবি আঁকতেন৷ আপনারা সবাই একসঙ্গে ছিলেন৷ বাবার কাছে শুনেছি, আপনাদের দুই বন্ধু খুব গান শোনাতেন আপনাদের, ক্লাসের পরে ক্লাসঘরে, লনে, গোলদিঘিতে, প্রেসিডেন্সির মাঠে?
‘হ্যাঁ, জয়শ্রী আর মানসী৷’ সৌম্যেন্দ্রই জবাব দেয়৷
‘তাঁরা কেউ পরে গায়িকা হয়েছিলেন?’
‘আমাদের সময় ওই গান শোনানোকেই গায়িকা বলত’, মণিকা বলে৷
‘মনোরঞ্জন একদিন প্রেসিডেন্সির মাঠে গেয়েছিল, মনে আছে মণিকা, ‘কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না’, সুবোধের তো নামই ছিল ‘অখণ্ড গীতবিতান’ সৌম্যেন্দ্র একটু স্মৃতিমুখর হয়ে ওঠেন৷
‘ওঁরা কী করেন এখন, কাকু’, বিজু জিজ্ঞাসা করে৷
‘মনোরঞ্জন রাজনীতি করে৷ একদিন আমি ব্রিগেডে কয়েকটা শট নিচ্ছিলাম, ব্যাটা পেছন থেকে এসে পাঞ্জাবি টানছে৷ বৌ, দুই বাচ্চা নিয়ে মিছিলে এসেছে৷ কলকাতাতেই থাকে৷ কী দুটো বই লিখেছে বলল— সৌম্যেন্দ্র মণিকার দিকে তাকিয়ে হাসেন৷
এই জায়গাটাতেই আমরা একেবারে আলাদা হয়ে গেছি৷ আপনারা সেটা কিছুতেই বুঝতে চান না৷ আমরা যদি গান করি, আমাদের গায়ক হতে হবে, পেশাগতভাবে সফল গায়ক৷ কেউ যদি লেখে, তাকে পেশাগত লেখক হতেই হবে— জার্নালিস্ট বা ওরকম কিছু৷ কেউ যদি খেলি, তাকে খেলোয়াড় হতে হবে’, একটু থেমে হেসে বিজু বলেছিল, ‘আমরা মিছিমিছি কিছু করি না৷ আপনি যদি আমাদের নিয়ে ছবি করতে চান, তাহলে করতে পারেন, কী করে একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হয়, কী করে একজন স্ট্যাটিসটিশিয়ান হয়, কী করে একজন খেলোয়াড় হয়, কিন্তু সে তো ফিল্ম ডিভিশনের ডকুমেন্টারি হয়ে যাবে, কাকুর তো তাতে চলবে না, বলে বিজু এমন একটা স্বরে হেসে ওঠে, যা তখন পর্যন্ত একবারও শোনা যায়নি৷ কিন্তু সে হাসিটা এতই স্বল্পস্থায়ী যে বোঝা যায় না সে কৌতুকবশে সৌম্যেন্দ্রকে একটু ঠাট্টা করে নিল কি না!
‘এখন স্বাধীন দেশে যারা চাকরি দেয়, তারা এক ঘণ্টায় দশ ঘণ্টার কাজ করিয়ে নেয়৷ কত কম সময়ে আমরা আমাদের লাইনে পৌঁছতে পারব সেটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে জরুরি৷ আপনারা স্বাধীন হলেন, কাকু, আর, আমরা স্বাধীনতা হারালাম’, বলে বিজু হেসে জানিয়ে দেয় কথাটা সে ঠাট্টা করে বলছে৷
বিজু গলাটা একটু নামিয়ে বলে, ‘আপনাদের দুজনকে আমি প্রথম কোথায় দেখেছিলাম, মনে আছে?’
মণিকা বলে, ‘তাই নাকি? তুমি আলাপ করেছিলে?’
বিজু একটু হাসে, ‘না৷ একাডেমিতে শম্ভুবাবুর অয়দিপউসে৷’
‘তুমি দেখতে গিয়েছিলে?’ সৌম্যেন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন৷
‘হ্যাঁ৷ মাধ্যমিকের পরে৷ বাবা তখন প্রোগ্রাম নিয়েছিলেন, ওঁদের সব ভাল ভাল জিনিসগুলো আমাকে দেখিয়ে দেবেন— শম্ভু মিত্র, সুচিত্রা মিত্র, উৎপল দত্ত, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, সলিল চৌধুরি, পূর্ণদাস বাউল, যোগেশ দত্ত, ঋত্বিক ঘটক—’
বিজু তালিকাটা বাড়াতে পারে না মণিকা ও সৌম্যেন্দ্রের সমবেত হাসিতে৷
‘বিমানের কাণ্ডই আলাদা৷ তখন তোমাকে নিয়ে এইসব দেখে দেখে বেড়িয়েছে?’ মণিকা আর সৌম্যেন্দ্র আবার একসঙ্গে হেসে ওঠেন৷ হাসির শেষে সৌম্যেন্দ্র বলে ওঠেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিমান তো একবার ফোন করেছিল কোনও এক টিকিটের জন্য৷’
‘শম্ভু মিত্রের নাটক৷ আমি বাবাকে না করেছিলাম আপনাকে ফোন করতে৷ আমি বলেছিলাম, আমি সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটব৷ বাবার তো তাতেও দুশ্চিন্তা৷ আর, টিকিট না পেলেও দুর্ভাবনা৷ আপনি তো পাঠিয়েছিলেন টিকিট৷’
‘পেয়ে গেলাম, পাঠিয়ে দিলাম৷ তা কেমন লাগত তোমার আমাদের শম্ভু মিত্র, সুচিত্রা মিত্র৷ এইসব—?’
‘কিছু ভাল, কিছু খারাপ৷’ একটু হেসে বিজু জিজ্ঞাসা করে, ‘একটা সত্যি কথা বলব, কাকু?’
‘হ্যাঁ, বলবে না কেন?’
‘বাবাকে বললে রেগে যান৷’
‘আমি রাগব না৷ তুমি বল৷ আমার ভাল লাগছে তোমার কথা শুনতে—’ বিজু একটু সময় নিয়ে যোগ করে, ‘আপনারা বড় ইতিহাস ইতিহাস করেন৷ অনেকের যেমন দেশের বাড়ি থাকে, বেড়াতে যায় মাঝে মাঝে, নস্ট্যালজিয়া থাকে, আপনাদের তেমনি ইতিহাস আছে, আপনাদের সময়ের ইতিহাস৷ শম্ভু মিত্র দেখার আগে মধুবংশীর গলি, কাবুকি, উলুখাগড়া এসব আমার বাবার কাছে শোনা৷ বাবা শম্ভু মিত্র দেখেন আর আহা-আহা করেন আর আমার মনে হল শম্ভু মিত্র সারাক্ষণ যেন কাকে ঠাট্টা করে গেলেন—’
‘কী করে গেলেন’, মণিকা একটু ঝুঁকে পড়ে৷
‘ঠাট্টা৷ অনুপস্থিত কাউকে—’
‘কি সে? কোনও কাউকে?’ মণিকা যেন আরও জানতে চান৷
‘না৷ কোনও একটা কাউকে নয়৷ মানে ওঁর গলায় বাবা শুনছিলেন ইতিহাস, আমি শুনছিলাম ঠাট্টা৷ বাবা দেখছিলেন সাতান্নতে ভোটের দিন রাস্তায় উৎপল দত্তের নাটক৷ আমি দেখছিলাম— ‘যে কোনও একটা ভাল প্রাোডাকশন কিন্তু অর্থহীন৷ বাবা দেখছিলেন— মিছিলে বেণী-বাঁধা সুচিত্রা মিত্রের গান৷ আমি শুনছিলাম— যে কোনও একজন ভাল আর্টিস্টের ভাল গান৷ সলিল চৌধুরি, নির্মলেন্দু, পূর্ণদাস তো আরও কেলেঙ্কারি—’
মণিকা সৌম্যেন্দ্র হেসে ওঠায় বিজু থেমে যায়৷ পরে, হাসিতে যোগ দেয়৷
‘সে তো হতেই পারে৷ এ নিয়ে তোমার এত রাগ কেন?’ সৌম্যেন্দ্র বলেন৷
‘আপনারা বড় ইতিহাস ইতিহাস করেন৷ দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, এইসব৷ কিন্তু আপনাদের দেখলে সেসব মনে হয় না৷
‘কী মনে হয় না— দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ-দেশভাগ এসব হয়নি?’
‘না৷ সেসব তো নিশ্চয়ই হয়েছে৷ প্রমাণই আছে যে হয়েছে৷ কিন্তু আপনারা এসব নিয়ে যেরকম গল্প করেন তাতে ততটা মনে হয় না—’
‘কী মনে হয় না? যে আমরা এসব দেখেছি৷’
‘দেখেছেন হয়ত৷ হয়ত কেন, নিশ্চয়ই৷ আপনাদের যা বয়স, তাতে তো দেখতেই হবে৷ কিন্তু এসব না দেখলেও আপনারা যা, তাই থাকতেন—’
‘মানে, বলছ, এসব দেখেও আমরা বদলাইনি কিছু?’
‘কী বদলেছেন? আপনারা যে-গল্প করেন যুদ্ধের দাঙ্গার দুর্ভিক্ষের তাতে আপনাদের চোখ-মুখ তো চিতার আগুনে ঝলসে যাওয়ার কথা, আপনাদের সারা শরীরে তো শ্মশানের ছাই লেগে থাকার কথা৷ কিন্তু তাও নেই৷ আপনারা তো বেশ থিতু হয়ে আছেন, বেশ সুখী, তৃপ্ত৷ কোনও অভাব নেই তো আপনাদের৷ বাড়ি-ঘর ভাল, খাবার-দাবার ভাল, দেওয়ালে আপনাদের সাফল্যের ছবি৷ আপনাদের ইতিহাস ভাঙিয়ে আপনারা তো বেশ গুছিয়ে নিয়েছেন৷ কিন্তু আমাদের তো কোনও ইতিহাসও নেই— যুদ্ধ নেই, অথচ মৃত্যু আছে, দাঙ্গা নেই অথচ খুন আছে, দেশভাগ নেই অথচ উদ্বাস্তু আছে, দুর্ভিক্ষ নেই অথচ লোকে না-খেতে পেয়ে মারা যায়৷ আপনাদের দেখা মৃত্যু-দুর্ভিক্ষ এই সবই, একটা ইতিহাসের আশ্রয়ে আছে৷ আর আমাদের দেখা, প্রতিদিন দেখা, প্রত্যেকটা দিন কলকাতার ফুটপাথে দেখা বা রাস্তায় দেখা বা খবরের কাগজের পাতায় দেখা মৃত্যুর, মরে যাওয়ার, মেরে ফেলার— কোনও ইতিহাসের আশ্রয়ও নেই৷ আপনাদের নিজেদের ইতিহাস ভাঙিয়ে আপনারা দিব্যি সুখ কিনেছেন, স্বাচ্ছন্দ্য কিনেছেন, খ্যাতি কিনেছেন৷ এখন, আমাদের জন্যেই ওই রকমই একটা মিথ্যা ইতিহাস বানাতে চাইছেন৷ না, আমাদের কোনও দিন নেই, কোনও এপিসোড নেই, কোনও সিরিয়্যাল নেই৷ আপনার টিভি সিরিয়্যালে আমি নেই৷’
বিজুর ডায়েরি থেকে:
বালিগঞ্জ থেকে মধ্যমগ্রাম একা একটা গাড়িতে, অত রাতে, অত আলোর নিচ দিয়ে অতটা রাস্তার ভিতর দিয়ে আসতে যে এমন লাগে, আগে জানা ছিল না৷ গাড়ি করে বাড়িতে পৌঁছনোয় একটু হই-হই৷ মণিকা কাকিমা ড্রাইভারের হাতে বাড়ির জন্য একহাঁড়ি মিষ্টি পাঠিয়েছিলেন৷ বন্ধুগর্বে বাবার বোধহয় বাকি রাতটা ঘুম হয়নি৷
সৌম্যেন্দ্রের ডায়েরি থেকে
(ইংরেজি রপ্ত রাখার জন্য সৌম্যেন্দ্র ডায়েরি ইংরেজিতে লেখেন)
অনুবাদ:
জানতাম, রাজি হবেই৷ না করার হলে, না বলে চলে যেত৷ অত কথা যখন বলেছে, তখনই বুঝেছিলাম রাজি হওয়ার পক্ষেও অত কথাই সাজাতে পারবে৷ কিন্তু খবর না-পাওয়া পর্যন্ত অস্বস্তি ছিল! আজকালকার ছেলেমেয়েদের তো কিছুই বুঝি না৷ হয়ত সত্যিই রাজি হবে না৷ ছোকরার চোখে-মুখে একটা চাপা-হিংসা আছে যা আমি কিছুতেই ছাড়তে পারছিলাম না— ক্যামেরাতে ওই মুখটাকে যতদূর শোষা যাবে, ফিল্ম ততদূর গ্রাহ্য বা প্রামাণিক হবে— বিদেশে তো নিশ্চয়ই৷ ঠোঁটে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে৷ হাতটা লম্বা, ফলে শরীরের সমকোণে ভাল খেলানো যাবে৷ তবে, এ দেশে বাঁ হাতটা সবাই-ই একটু কম চালায়৷ বাঁ হাত চালালে অদ্ভুত ফল আসে৷ বিজুকে বলে দিতে হবে, এখন বাঁ হাত নাড়িয়ে কথা বলা অভ্যেস করতে৷ ভেবেছিলাম, দাড়ি লাগাব, চাপা দাড়ি৷ তাতে মুখটা লম্বাটে দেখায়— পর্দায় ভাল লাগে৷ কিন্তু সেদিন ওর অত কথা শুনতে শুনতে দেখছিলাম চিবুকের ভাঁজে ভাল কাজ আসে৷ দাড়ি দিলে সেটা চাপা পড়ে যাবে৷ আর-একটা শট বিজুর মুখে ভাল আসবে— পেছন থেকে ঘাড়ের৷ কানের পাশ দিয়ে৷ তাতে চোয়ালের হাড় আর কণ্ঠার হাড়ের মাঝখানে গলার অংশটাতে আলো নানাভাবে ফেলে, নানারকম দেখানো যায়— নরম থেকে শক্ত৷ দাড়ি লাগালে এ সুযোগ থাকবে না৷ আমি এই প্রথম টিভি সিরিয়্যাল করছি৷ দেশে তো এখন সিরিয়্যালের বাজার বেশ চড়া৷ কিন্তু বিদেশেও তো এই নিয়ে প্রত্যাশা আছে, আমার কাছে৷ নিজের পছন্দমতো মুখ একখানা যখন পেয়েছি, তখন আর ছাড়াছাড়ি নেই— সমস্তটা, ওই মুখের সমস্তটা একেবারে শুষে নেব৷ সমস্তটা৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন