মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে

অশোক দাশগুপ্ত

শীত এখনও পড়েনি৷ ভোর রাতে চাদর লাগে বিছানায়৷ পাখার রেগুলেটর নেই৷ না চালালে গরম লাগে৷ চালালে শীত করে৷ তাই অখিল একবার উঠে চালায়৷ চালিয়ে ঘণ্টাখানেক ঘুমোয়! শীত করলে উঠে নিভিয়ে দেয়৷ দিয়ে আবার ঘণ্টাখানেক ঘুমোয়৷ এইভাবে রাত এগারোটা থেকে পরদিনের ভোর সাতটায় পৌঁছে তবে উঠে বসে সকালের বেড-টি খেল৷

বেড-টি দিল তার সাতান্ন বছরের বউ৷ খুকু অখিলের চেয়ে তিন বছরের ছোট৷ দুই ছেলেমেয়ে৷ ছেলেরা চাকরি নিয়ে দূরে দূরে৷ সেখানে যে যার সংসার.... অফিস, অফিসের বন্ধু, বন্ধুদের সঙ্গে ফ্যামিলি নিয়ে পিকনিক নয়ত এল টি সি নিয়ে বেড়াতে যেতে মেতে থাকে৷ তবে দুজনই বিজয়ার পর পোস্টকার্ড দেয়৷ শ্রীচরণকমলেষু মা ও বাবা৷ আশা করি তোমরা ভাল আছ৷ তোমরা আমাদের ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিও৷ পূজায় পাঠানো টাকা দিয়া তোমরা গায়ে দেবার চাদর কিনিয়াছ তো? এখন আর জমাইয়া কি করিবে?

এই দুই ছেলেকে নিয়ে অখিল আর খুকু তাদের জীবনের চব্বিশ-পঁচিশ বছর খুব ব্যস্ত ছিল৷ দাঁত ওঠা, দুধের দাঁত পড়া, হাতে খড়ি, হাতের লেখা লেখানো, ভর্তি, টনসিল, হুপিং কাফ, অ্যানুয়াল এগজামিন, কলেজ, ইন্টারভিউ, প্রথম চাকরিতে জয়েন, বিয়ে, বাচ্চা হলে তাদের খানিক খানিক বড় করে দেওয়া— এইসব করতে করতেই অখিলের মাথার চুল পিছিয়ে গেল৷ খুকুর এলো খোঁপায় এখন অনেকটাই সাদার প্যাচ৷ ঠিক যেন নদীর কালচে-সাদা ঘূর্ণি ঢেউ৷

বেড-টি খেয়ে অখিল বিছানার দিকে তাকাল৷ একটা পাশ বালিশের ওপাশেই সারা রাত খুকু শুয়ে ছিল৷ কোনও দাগ নেই বিছানায়৷ কালীপুজোর পরেকার রোদ৷ বেশ চকচকে৷ সে আলোয় খুকুর মুখখানিও ঝকমক করছে৷ খুব গম্ভীর হয়ে খাবার টেবিলে চা নিয়ে বসেছে৷ এই সময় ওর মুখখানি দেখে অখিলের মনে হল— নিশ্চয় মনে মনে হিসেব কষে দেখছে— জীবনে কী হল? কিংবা নিজের জীবনটাই খুকু, এখন বাতাসের ভেতর দেখতে পায়৷ দেখে মনে মনে হয়ত বলে— জীবনে কিছুই তো হল না৷ কত কী করার ছিল৷ এইসব ভাবে খুকু আর এক সিপ করে চা খায়৷

কাছেই বাজার৷ থলেটা হাতে নিয়ে গায়ে জামা গলিয়ে অখিল বলে, কী আনব?

তোমার যা ইচ্ছে৷

কাঁচালঙ্কা আছে?

হুঁ৷ পঞ্চাশ এনো৷ আর এক প্যাকেট নুন৷

কালকের মাছ আছে না?

তিনটে পারশে আছে৷ গরম করে দেখি ঠিক আছে কিনা৷

অখিলের মনে পড়ল, দশ বারো বছর আগেও, বাজার করে ফেরার সময় একটা জয়ের আনন্দে তার বুক ভরে থাকত৷ বড় খোকনের জন্যে কাটা পোনা৷ ছোটজনের জন্যে অসময়ের দামি ফুলকপি, খুকুর জন্যে নতুন ওঠা জলপাই— কত কী নিয়ে সে ফিরত৷ এখন সে জানে শরীরের ভেতর কঙ্কালটার কাঠামোর ওপর বেশি বেশি মাংসের চাপান রাখা ভাল নয়৷ তাতে বুকের ভেতর বাঁ-দিকের ছোট পাম্পসেটের ওপর চাপ পড়ে৷ সেই কবে থেকে পাম্প করে আসছে সেটটা৷ একদম জিরোয়নি৷ তাছাড়া যে ভাত-রুটি নিয়ে এত চাষবাস, আন্দোলন, ইকনমিক্স— সেই ভাত-রুটিই এই শরীরটাকে অযথা ঢ্যাপঢেবে করে তোলে৷ মাছ মাংসে যতই শক্তি থাক না কেন— সমান ঘাম ঝরানো খাটুনি না খাটলে— তাই-ই নাকি মুখে— এখানে সেখানে থপথপে মেদ লেপে দেয় শরীরে৷ তার চেয়ে হালকা সবজি, দই শরীরটাকে হালকা-পলকা সতেজ রাখে৷

তবু বাজারে বেরোবার সময় অখিল জানতে চাইল, কোন মাছ আনব?

যা-ই আনো— কাটিয়ে আনবে৷ বঁটিতে ধার নেই৷

কেন? নেপালের মা কুটে দেবে—

আজ আসবে না নেপালের মা৷

কোন মাছ বললে না তো? না, মাংস আনি৷ মুরগির?

আমার কোনও পছন্দ নেই৷

এ কি রকম বৌ-রে বাবা!— মনে মনে এ কথা বলে অখিল এগোল৷ তার মনে হল, বিয়ের বত্রিশ বছর পরেও শ্বশুরবাড়ি, স্বামী, সংসার হয়ত পছন্দ হয়নি খুকুর৷ কোনও কোনওদিন অখিলের আগে ঘুম থেকে উঠে খুকু স্যান্ডেল পায়ে হাঁটতে বেরোয়৷ ফেরার সময় ঝরা শিউলি কুড়িয়ে এনে খাবার টেবিলে একটা প্লেটে রেখে তাতে সামান্য জল দেয়৷ পাছে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়৷

এ পাড়ায় মাসখানেক হল এসেছে ওরা৷ জায়গাটায় ফোন, ইলেকট্রিক, ডাক্তারখানা থাকলেও গুচ্ছের পুকুর, সূর্যের অঢেল আলো, মশা, আসশেওড়ার জঙ্গল আছে৷ গ্রিল কারখানা ছাড়া আর কোনও কারখানা নেই৷ বাতাস পরিষ্কার৷ ভোটের সুবিধার জন্যে কয়েকটা পিচ আর কয়েকটা খোয়ার রাস্তাসমেত জায়গাটাকে বছর পাঁচেক হল কলকাতা কর্পোরেশনে ঢোকানো হয়েছে৷ অটোতে পাতাল রেল মিনিট পনেরো মাত্র৷ পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে অখিল বলল, মাজার ব্যথাটা কমেছে?

অনেক কম৷

তাহলে তো হোমিওপ্যাথিতে কাজ হয়েছে—

বোলো— মাথা ঝিমঝিম করে৷ ঘুম আসে না৷

আমারও ওষুধটা আনব৷ ফের বুকে সর্দি জমে ঘড়ঘড় করছে৷

আজ কি থাকবেন সরকারমশাই?

বেস্পতিবার দক্ষিণ বারাসাত না কোথায় দেশ— সেখানে ফ্যামিলি— চলে যান৷ শনিবার শনিবার সবজির ফার্স্ট ট্রেনে ফিরে আসেন৷ পশার তো ভালই জমিয়ে ফেলেছেন৷

খুকু বলল, ভাগ্যিস ওর কারখানা আজ ছ’বছর বন্ধ৷ শুনলাম চাকরি নট হওয়াতে সরকারমশাই হোমোপ্যাথির বই আর বাক্সো নিয়ে বসে যান!

আমাদেরও ভাগ্যি বল!

কেন? কেন?

আগে আগে এমন সর্দি জমলে প্রায় পঞ্চাশ টাকার এক কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক খেতাম৷ এখন দেখছি তিন থেকে ছ’টাকার হোমোপ্যাথি করলে বুক বিলকুল পরিষ্কার৷

ভালই তো! দু-মাস মাইনে পাও না৷ কবে পাবে— তাও জানো না৷

কীভাবে চলবে তাও জানি না৷ বাড়ি বদলে এখানে উঠে এলাম— আর অমনি অফিসে এই দশা৷ কবে যে নর্মাল হবে জানি না৷ ভাগ্যিস কিছু জমানো ছিল৷ কিন্তু তাই বা কতদিন চলবে? বাড়িভাড়া আছে— ইলেকট্রিক বিল৷ নেপালের মায়ের মাইনে৷ কেরোসিন৷ কাঁচা বাজার—

সব অঙ্ক একসঙ্গে মনে মনে যোগ দিতে গিয়ে মাথাটা ঘুরে উঠল অখিলের৷ বছর পাঁচেক আগে প্রথম যেদিন এভাবে মাথা ঘুরে ওঠে— তখন তখনই ডাক্তার দেখিয়ে, ঘাড়ের ছবি তুলে জানা যায় অখিলের স্পনডিলোসিস হয়েছে৷ ওজন চাপিয়ে ঘাড়ে টানা দেওয়া থেকে বিশেষ বিশেষ ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম করে সে ফের চাঙ্গা হয়ে ওঠে৷ কিন্তু এই ঝিমঝিম করে মাথা ঘুরে যাওয়া তো কোনও ব্যায়ামেই সারার নয়৷ একে বলে সংসার-চিন্তামণি! চাল চিনি নিয়ে চিন্তা করতে করতে তলিয়ে যাওয়া৷ তবে ভরসা এই— এখন খুকু বা অখিল— কেউই খুব একটা ভাত খায় না৷ চায়ে চিনিও নেয় আধ চামচেরও কম৷ কিন্তু ডাল? চোদ্দো টাকা! পটল? দশ টাকা! আলু? তিন টাকা চল্লিশ৷ আড়াইশো মাছ? পনেরো টাকা! তেল? চৌত্রিশ টাকা!

অখিল বলল, কী যে হল অফিসটার বুঝি না৷ এত ভাল অফিস ছিল৷

তোমরা সবাই মিলে বুড়োকে ধর৷

চার পুরুষের কোম্পানি৷ বুড়ো তো দ্বিতীয় পুরুষ৷ বয়স বলে নব্বই ৷ আসলে একশো পেরিয়ে গেছে৷ কিন্তু জ্ঞান টনটনে৷ ইউনিয়ন মামলা করে কোর্টে তুলেছিল বুড়োকে৷ কাঠগড়ায় গিয়ে বুড়ো বলেছে— আমি কিছু জানি না— বোঝ খুকু!

খুকু চটেমটে বলল, বাঃ! আব্দার? তুমি ম্যানেজিং ডিরেক্টর— এত বড় একশো বছরের পুরনো কোম্পানির তুমি ম্যানেজিং ডিরেক্টর৷ তুমি কিছু জানো না বললেই ছেড়ে দেওয়া হবে? এতগুলো লোকের মাইনে দাওনি৷ পি এফ, গ্র্যাচুইটি, এল আই সি-র টাকা তলে তলে সরিয়েছ— ব্যাঙ্ক থেকে সরিয়েছ৷ মেশিনপত্তর বেচে দিয়েছ— ডাক্তার সঙ্গে নিয়ে কাঠগড়ায় গিয়ে বুড়ো চেয়ার চাইল৷ বলল, ধর্মাবতার! আমার হাত-পা কাঁপে৷ বসার জন্যে একটা চেয়ার পেতে পারি? জজ তো ভয় পেলেন৷ এই বুঝি হার্টফেল করে বুড়ো৷ চেয়ার দিতে, বসেই বুড়ো বলল, বছর দশেক হল কিছুই মনে রাখতে পারি না ধর্মাবতার৷ এই মাত্তর যা শুনলাম— খানিকবাদে তাই ভুলে যাই৷ জজ তাড়াতাড়ি উঠে এসে বললেন, আপনি বাড়ি যান৷ বুড়ো চলে এল৷

খুকু বেশ দেমাকি গলায় বলল, ওসব খোকাপনার কথা তোমাদের যেন বলে বুড়ো৷ অ্যাতো তো সম্পত্তি আছে— কে খাবে? মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে? এত জায়গা জমি, বাড়ি-ঘর-বাগান— কতদিন আর উনি বাঁচবেন৷ সব বেচে ব্যাঙ্কের দায় শোধ দিলেই তো তোমাদের অফিস ফের ভাল করে চলে৷

একটু আগে মাথাটা ঘুরছিল অখিলের৷ সেই ঘূর্ণির ভেতর খুকুর একটা কথা তীরের মতো অখিলের মাথার ভেতরে গিয়ে বিঁধে গেল৷ মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে? সে খুকুকে বলল, জানো রিটায়ারের পর ছাব্বিশজন মরে গেছেন৷ তাঁরা পি এফ পাননি৷ গ্র্যাচুইটি পাননি৷ অনেকে রিটায়ার করে এল আই সি-র টাকা পাচ্ছে না৷

কেন?

মাইনে থেকে কেটে নিয়ে সে-টাকা জমা দেয়নি৷ ব্যাঙ্কের লোন নিয়ে আসল, সুদ— কোনওটাই ফেরত দেয়নি৷ পাওনাদারদের টাকা দেয়নি৷ কয়েক লাখ টাকা ইলেকট্রিক আর টেলিফোনের বিল বাকি করে ফেলেছে৷

গুণের আর ঘাট নেই কোনও৷

ইলকট্রিক লাইন মাঝে মাঝে কেটে দেয়৷

তখন?

তখন গিয়ে কয়েক হাজার টাকা জমা দিয়ে বলে— এই দিয়ে দিচ্ছি৷ তখন আবার অফিসে আলো আসে৷

খুকু রায় দিল৷ গম্ভীর গলায়৷ বুড়োকে তোমরা সবাই গিয়ে বল— আপনি আর কতদিনই বা বাঁচবেন? আপনার বাবার প্রতিষ্ঠান আপনার হাতে বড় হয়েছে৷ আপনার হাতেই মরে যাবে— এই চান? তিন পুরুষের পাছার কাপড় তুলে টিকের আগুন ঘষে নিতে হয়!

কোম্পানির নতুন বিল্ডিংটা বানাল পেল্লায়— দশতলা—

সেটা ভাড়া দিলেও তো তোমাদের মাস মাইনে হয়ে যায়৷

তা দেবে না৷ ফিনিশ না করে ফেলে রেখেছে৷ লিফট বসায়নি৷ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে দম বেরিয়ে যায়৷

উঠেও তো স্বস্তি নেই৷ ওপরে উঠে নিজের চেয়ারে বসে শুনতে হয়— মাইনে কবে হবে কেউ জানে না৷

আমি ভাবি খুকু, একটা লোকের কত টাকা লাগে?

একটা বলছ কেন? বল তিনটে৷ বুড়ো তার সত্তর বছরের ছেলে— আর বছর পঁয়তাল্লিশের নাতি৷ তিনজনের—

বুড়োকে বাদ দাও৷ কলকাতার বাইরে বিশাল বাগানবাড়িতেই পাখির ডাক শুনে দিন কাটান৷ সেখানেই প্রাইভেট সেক্রেটারিকে সঙ্গে নিয়ে সকাল বিকেল নিয়ম করে মাইল দুই ঘুরে ঘুরে হাঁটেন৷ আতস কাচ দিয়ে চিঠিপত্তর দেখেন৷ আর খাবার বলতে কাঁচাকলার ঝোল আর মাগুর মাছ৷ তাহলে ছেলে আর নাতির অন্য গুণ আছে নিশ্চয়৷

তা তো আছেই৷ দুজনেরই আছে৷ কিন্তু সেজন্যে এত টাকা সরাতে হবে? সেজন্যে এত টাকা লাগে? ওসবে একজন পুরুষের কতই বা লাগতে পারে?

খুকু অখিলকে শুধরে দিল৷ একজন নয়৷ দুজন৷

দুজনেরটাই ধর৷ ছেলে আর নাতি— দুজনের ওসবে এত কোটি টাকা লাগে? না লাগতে পারে! অ্যাতো তো জাহাঙ্গীর বাদশারও লাগত না৷ একজন দিল্লিতে বসে থাকেন৷ আরেকজন কলকাতায়— বোম্বেতে নানান ফ্ল্যাটে৷

বুড়োর ছেলেই বা আর কতদিন বাঁচতে পারে?

তারও সত্তর হল৷ কিংবা কিছু বেশি৷ দু-চার বছর হাতে রেখেছে হয়ত৷

খুকু বলল, এই বয়সে কত আর সুখ আহ্লাদ করতে পারে একজন মানুষ৷

নিয়মে থেকে এখন অখিলের ব্লাডপ্রেশার কোলেস্টেরল, ব্লাড-সুগার একদম কপিবুকের সুস্থ মানুষের মতোই বলা যায়৷ সে মনে মনে বলল, ইচ্ছে থাকলে অনেকদিন পারে৷ মুখে বলল, পয়সার তো অভাব নেই—

খুকু খেপে উঠল৷ বলল, তোমাদের মাস মাইনের মেরে দেওয়া পয়সা তো৷ তাই কোনও অভাব নেই৷

যে-পয়সাই হোক! বছর দুই আগে একবার অফিসে এসেছিল বুড়োর ছেলে৷ ব্যাঙ্কে এত কোটি দেনা— বাজার পাওনাদারে ভর্তি— আমাদের অ্যাতো টাকা গায়েব— হাঁটছে যেন অমিতাভ বচ্চন৷ মাথায় তিন থাক অ্যালবার্ট৷ পরনে চুড়িদার৷ ভাবখানা— অফিসে যেন সেট পড়েছে— শুটিং করতে এসেছেন!

তা হিরোকে তোমরা ঘিরে ধরলে না কেন?

তখনও তো পিকচারটা অ্যাতো ঘোলাটে হয়ে পড়েনি৷ তখনও তো আমাদের দিচ্ছি, দেব বলে চলেছেন৷ কী চেহারা— বছর তিরিশেকের ছোকরার চলাফেরা৷ আর লম্বাও তো অনেকটা৷ বেশ দেখতে—

দ্যাখো গিয়ে বিলেত থেকে অপারেশন করে এসেছেন হয়ত৷ ওঁদের তো ইন্টারন্যাশনাল যোগাযোগ৷ আজারবাইজানের পাহাড় থেকে শেকড়-বাকড় আনিয়েও বেটে খেতে পারেন৷

খেলে কী হয়!

দেড়শো, পৌনে দুশো বছর বাঁচে৷ প্রথম বউয়ের বয়স হয়ে গেলে দিব্যি একশো, সওয়া শো বছর বয়সে ফের বে করে— ছেলে মেয়েও হয়৷ যতদিন বাঁচতে পারে— তার চেয়ে বেশিই তো বাঁচতে চায় মানুষ! বুড়োর ছেলে কলকাতায় এলে কিছু শেকড়-বাকড় চেয়ে নেব৷

বকেয়া মাইনে— দু’বছরের বোনাস পাওনি— সে সব চাইবে না?

নাঃ! ও সব চাইলে তো পাব না৷ তার চেয়ে কিছু শেকড় যদি—

কী করবে?

দেখি যদি ফের ছেলে-পিলে হয়৷ বেশি বয়সে তারাই আমাদের দেখবে৷

আমায় দিয়ে হবে না কিন্তু৷ অন্য জায়গায় চেষ্টা করো৷

বাজারের ব্যাগ হাতে খাবার টেবিলেই চেয়ার টেনে বসে পড়ল অখিল৷ বসে বলল, কতদিন বাঁচব কে জানে! পি এফ, গ্র্যাচুইটিও গায়েব৷ ক’মাস পরে কী হবে বলতে পার খুকু?

কী আর হবে! অন্য জায়গায় চাকরি নাও৷

এই বয়সে কে নেবে আমাকে? এখনও প্রায় দু’বছর কাজ ছিল৷ সার্টিফিকেটে বাইশ মাস বয়স কমানো ছিল৷

তাহলে তো প্রায় ঠিক বয়সেই চাকরি গেল! পি এফ গ্র্যাচুইটি নিয়ে যদি অফিস বন্ধ হত তো আপত্তি ছিল না৷ পেনশন নেই আমাদের৷ এই অবস্থায়, এতগুলো টাকা গায়েব৷ ভাব তো৷ খালি হাতে বসে খাব? তাহলে চল বড়খোকনের ওখানে গিয়ে উঠি আমরা৷

তা পারব না খুকু৷

আমি চলে যাই৷ একজনের খরচ তো কমে যাবে৷

আমি একা থাকতে পারি না৷ তোমারও গিয়ে ভাল লাগবে না৷ বড়খোকনের বাচ্চার ঠাকুমা হয়ে গিয়ে উঠবে৷ শেষে বেবি সিটার হয়ে যাবে৷ যাই বাজারটা সেরে ফেলি৷

এখানে একটা মুন্ডুকাটা বটগাছের নিচে বাজার বসে একবেলা৷ সবাই বলে বটতলার বাজার৷ সেখানে গুলকয়লা থেকে ব্লাডপ্রেশারের ডায়টাইড বড়ি, দর্জি থেকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, জমির দালালের ঘাঁটি থেকে লোকাল পার্টি অফিস সবই গোলকধামের কোর্টের মতোই সাজানো৷ পুরো ভিউটার ওপর একটা রুরাল ধুলো৷ তার দখল নিতে পনেরো মিনিটের ডিসট্যান্স থেকে একটা পুরোদস্তুর আরবান থাবা এসে মাথার ওপর ঝুলছে৷ কেন না পাঁচ বছর আগের বাঁশ বাগানেও এখন প্রাোমোটার৷ ছ’তলা ফ্ল্যাটবাড়ি৷

সেদিকে তাকিয়ে বাজে লাগল অখিলের৷ সেই একই মাছ৷ একই ঝিঙে৷ কাঁচালঙ্কা৷ টমেটো৷ শসা৷ একই পথ দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে একই পথ দিয়ে বের করে দেওয়া৷ এই করে দিনের পর দিন জঠরের আগুন শান্ত করা৷ একইভাবে৷ তিনশো পটল৷ দুশো চারাপোনা৷ পঞ্চাশ লঙ্কা৷ দেড়শো টমেটো৷ ভীষণ বাজে লাগল অখিলের৷ এই করে করে পুষ্টি, আয়ু, প্রভা, তেজ— কত কী! এসব ডান দিকে৷

বাঁ দিকের রাস্তা ধরে এগোলে কাঠের মিস্ত্রি, মুদিখানা, সঙ্গীত শিক্ষায়তন৷ তার পরেই সরকার ফার্মেসি৷ সরকার ডাক্তার টালির চালের নিচে টেবিল ফ্যান আর একডুমের আলো নিয়ে বাক্স খুলে বসে গেছেন ভোর ভোর৷ দেশে এত লোক৷ তাদের সবাইকে ধরে ফেলার মতো খবরের কাগজ, ট্রানজিস্টার, টিভি, সিনেমা, মদের দোকান কিংবা ফার্মেসি নেই৷

শীতের শুরুতে সর্দি ঘড়ঘড় রোগীই বেশি৷ একটা আধটা কালীপুজোর তারাবাজির বার্নিং কেস৷ দুটো ভয়ঙ্কর বুড়ো৷ তাদের একজনের একদম দাঁত নেই৷ অন্যজনের ওপর পাটিতে মাত্র তিনটি৷ তারাই জড়ানো কথাবার্তায় আউ আউ করে সিমেন্টের মেঝেতে চ্যাটাই বেড়ার ভেতর কাঠের বেঞ্চে বসে, মানুষের এই মিউজিয়াম সকালবেলাই মাত করে রেখেছে৷

সরকার ডাক্তার অখিলের নাড়ি হাতে নিয়ে প্রথমেই জানতে চাইলেন, বাহ্যে হয়েছে? এই তো আপনার ওষুধ নিয়ে বাজার করে ফিরব৷ আর এক কাপ চা খেলে তবে—

বাহ্যেটা হওয়া দরকার৷ ওই পথ দিয়েই তো সর্দির সিক্সটি পারসেন্ট বেরবে৷

বাকি ফর্টি পারসেন্টের দশ পারসেন্টও তো গলা দিয়ে বেরোচ্ছে না ডাক্তারবাবু৷

বেরয়, আপনি দেখতে পান না৷

তর্ক করল না অখিল৷ সরকার ডাক্তার তাকে দিনে একবার করে খেতে বলেছিলেন৷ আটটি করে গুলি৷ কাশির ঘং ঘং— বুকের ভেতর শোঁ শোঁ থামানোর জন্যে সে মাঝরাতে উঠে আরও দু-একবার খেয়ে তবে রিলিফ পেয়েছে৷

সরকার ডাক্তার খুদে শিশিতে খুদে গুলিগুলোকে একটা তরল ঢেলে শুষিয়ে নিচ্ছিলেন৷ অখিল ঠিক তখনই কথাটা পাড়ল৷ সরকার জ্ঞানের কথা খুব ভালবাসেন৷

আচ্ছা, মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে?

এই একটা প্রশ্নের মতো প্রশ্ন করলেন! দেখুন এক সময় তো মানুষ হাজার হাজার বছরও বাঁচত শুনেছি—

হাজার?— বলে চুপ করে গেল অখিল৷ যে কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরকারবাবু হোমিওপ্যাথিতে নামেন— রোগী দেখতে দেখতে তা দখলে এনে ফেলতে পেরেছেন— সেই কারখানায় কী করতেন তিনি? কোনও তর্কে গেল না অখিল৷ মানুষ কি হাজার বছর বাঁচতে পারে? কী দরকার কোশ্চেন তুলে৷ সরকার ডাক্তারের খুদে খুদে গুলিতে পুরিয়ায় যখন সর্দিটা সল হচ্ছে— খুকুর কোমরের ব্যথাটা যখন নরম হচ্ছে৷ কী শুনছে কে জানে! হাজার হাজার বছরের কথাটা তা হলে শোনা৷

সরকার ডাক্তার লম্বা পজ দিয়ে খুব অর্ডিনারি কথা বলেন৷ এই যেমন: বাহ্যে হয়েছে? বুকটা কেমন বুঝছেন? একটু পরিষ্কার লাগছে না? এই সব কথার ফি শব্দের মাঝখানে অন্তত দশ সেকেন্ডের গ্যাপ থাকে৷ সেই সব গ্যাপের মাঝখানে সর্দি ঘড়ঘড়, পোড়া তারাবাজির গরম কাঠি মাড়িয়ে ফেলার বার্নিং কেস, কনস্টিপেশনের রোগীরা চোখের পলক না ফেলে এমনভাবেই তাকিয়ে থাকে যেন কোনও অবতারের বাণী শুনছে৷ যেমন কিনা: পেঁয়াজ খাবেন না কিন্তুক৷ এই সব শূন্যস্থান দশ সেকেন্ডের এক একটি চুপ করে থাকা দিয়ে ভরানো৷ ওই সব চুপ করে থাকার ভেতর আবছা মতো ফার্মেসির ঝাপসা আলোয় শিশির গুলিগুলোকে তিনি তরল ওষুধে সোক করিয়ে নেন৷ শিশিটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে৷

তখন অখিলের মনে হয়— সরকার ডাক্তার তো আমার চেয়ে বছর দশেকের ছোট৷ ইট চাপা ঘাসের মতো গায়ের রঙ৷ মৃদু গলা৷ ক্ষীণ শরীর৷ হপ্তায় একবার দক্ষিণ বারাসতে ফ্যামিলির কাছে কাটিয়ে আসেন৷ আর হপ্তাভর এখানে পসার জমান৷ কতদিন বা বাঁচবেন মানুষটি৷ কতদিন বাঁচতে পারেন? বটতলা বাজারের হোটেলের ভাত৷ তার সঙ্গে নরম হয়ে আসা চারাপোনা মাছের ঝোল৷ তাই দিয়ে লাঞ্চ৷ জলখাবার খেতে তো দেখি না কখনও৷

শুনেছি আমার ঠাকুর্দার যৌবনে (সে কতদিন আগে? একশো বছর?) রামায়ণের দারা সিংয়ের মতো একটা তাগড়া লোক এসেছিল দক্ষিণ বারাসতে— (টিভিতে হনুমানের রোলে দারা সিং)

তার একটা লেজ ছিল—

(যা ভেবেছি—)

লোকটা এসেই দক্ষিণ বারাসতের রেল প্ল্যাটফর্মে একটা চড় মারে৷ সঙ্গে সঙ্গে সিমেন্ট করা প্ল্যাটফর্ম ফেটে যায়—

(তখন কি সিমেন্ট আবিষ্কার হয়েছিল?)

তাই বলছিলাম—

প্রতিটি শব্দের মাঝখানে দশ সেকেন্ডের গ্যাপ৷ সে সব অদৃশ্য গ্যাপের দিকে রোগীরা সব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে৷ এরাই গত কর্পোরেশনের ভোটে একবগগা ভোট দিয়েছে৷ কারণ, রাস্তা সারাই হবে বলে একটি রোড রোলার ও দশ লরি ঝামা বটতলায় এনে ফেলা হয়৷ ভোটের মাসখানেক আগেই৷

বলছিলাম কি— খুকুর মাথা ঝিমঝিম করে— ঘুম হয় না একদম৷

আপনার মিসাসের?

হ্যাঁ৷ আমার মিসাসের—৷

তা মানুষের আয়ু সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে কমে এল৷ সেই কমা আয়ু অ্যালোপ্যাথি এসে আরও—

তবু একজন মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে?

ওবেলাও মরতে পারে৷ আবার টিকে থাকল তো—

টিকে থাকল?

ধরুন ঠিক ঠিক ডায়গনসিস হলে— ঠিক জায়গায় ঠিক ব্রায়োনিয়া কি সাইলেসিয়া— কিংবা নাক্স ভোমিকা— বা এক পুরিয়া লাগদার ক্যালি ফসেই টাটুঘোড়া হয়ে উঠে দাঁড়াল৷

তবু? কতদিন বাঁচতে পারে?

এ প্রশ্ন কেন করছেন?

অখিল বলল, ধরুন একজন লোক অনেক দিন বাঁচতে চায়৷ কিন্তু তার টাকা ফুরিয়ে গেল৷ তখন সে কী করবে? হাতে আর টাকা নেই তার৷ অথচ বাড়িভাড়া-মুদিখানা৷

ওঃ! এটা কোনও মেডিক্যাল কোশ্চেন নয়৷

কিংবা ধরুন ব্যাঙ্কে একজন লোকের অনেক টাকা৷ বাড়িতে তার মিসাস খুব ভাল রাঁধেন৷ লোকটা ফট করে মরে গেল৷ তার মিসাস পায়ের ওপর পা দিয়ে সেই টাকা ভোগ করবেন৷

ব্যাপার কি জানেন— আয়ু বা টাকা কোনটা আগে ফুরোবে কেউ জানে না৷ তাই যদি জানা থাকত— একজন মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে?

সরকার ডাক্তার একগাল হেসে বলল, আপনি চাইছেন— আয়ু আর টাকা একসঙ্গে ফুরোক! এটাও কোনও মেডিক্যাল কোশ্চেন নয়৷

আসলে আমি চাইছি— মানুষ অনেক দিন বাঁচুক— নীরোগ শরীরে—

কতদিন?

এই ধরুন— দেড়শো বছর৷

ওরে বাবা! নীরোগ দেহে দেড়শো বছর? তাহলে তো ফার্মেসিতে আমাদের মাছি তাড়াতে হবে৷

আর ওই দেড়শো বছর হাতে টাকাও যেন না ফুরোয় মানুষের৷

এটাও কোনও মেডিক্যাল কোশ্চেন নয়৷ এই নিন আপনার মিসাসের ওষুধ৷ ভোরে খালি পেটে এক পুরিয়া৷

চা খেয়ে?

খেতে পারেন৷ আর রাতে শোয়ার সময় এক পুরিয়া৷ আপনি কি খুব স্বপ্ন দেখেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে?

তা হয়ত দেখি৷ তবে এই সর্দির ওষুধটা খাবার পর থেকে কোনও স্বপ্ন টপ্ন আর দেখি না৷ কাশতে কাশতে জেগে উঠতে হয় তো৷ স্বপ্ন দেখতে থাকলেও তা ওই ঘং ঘং কাশিতে ছিঁড়ে ফর্দাফাই হয়ে যায়৷

এই কোর্সটা শেষ হোক৷ আপনাকে দু’হপ্তার ওষুধ দেব৷ কোনও স্বপ্ন আর দেখবেন না তা হলে৷

অ৷

আর নন মেডিক্যাল হলেও আপনার প্রশ্নের একটা জবাব দিতে পারি৷ কোনও কাগজে পড়ে থাকব— প্রতি পনেরো ষোলো বছর অন্তর আমাদের দেহের সব কোষ আগাগোড়া পাল্টে যায়৷ পশ্চিম পুটিয়ারি থেকে বালিগঞ্জে বাসা বদল করে আসার মতো৷

আমিই তো দু’তিন বছর অন্তর বাড়ি বদলাই৷ এই আছি পাইকপাড়ায় তো চলে গেলাম বেহালার শকুন্তলা পার্কে৷

ধরুন তাই৷ এই পনেরো ষোলো বছর অন্তর আমাদের দেহের এক একটা গাঁট৷ এই গাঁটেই বিপদ ওৎ পেতে থাকে৷ কোষ বদলের সময় মৃত্যু এসে হানা দেয়৷ একটা গাঁটের শেষে— আরেকটা গাঁট শুরু হওয়ার ঠিক আগে৷

তা হলে যে যটা গাঁট পেরোতে পারে— সে পনেরো ষোলো বছরের ততটা করে আয়ু পায়?

এই তো৷ ঠিক ধরেছেন৷

তাহলে দশটা গাঁট পেরোলে একশো পঞ্চাশ ষাট বছর বাঁচতে পারি৷

রাইট৷

ওষুধ নিয়ে বাজারের দিকে চলল অখিল৷ আমি তাহলে জীবনের চারটে গাঁট পেরিয়ে এসেছি প্রায়৷ আর একটা পেরোলেই পঁচাত্তর ক্রস করব? অথচ দু’মাস হল মাইনে পাই না৷ ব্যাঙ্কের টাকা তো গোনাগাঁথা৷ জীবনের পঞ্চম গাঁটে পৌঁছবার আগেই যদি টাকা ফুরিয়ে যায়?

বাজারের কাছাকাছি সে এসে পড়ল৷ চল্লিশ টাকা কেজির খোকা ভেটকিরা তাকে ডাকছে৷ আয় অখিল৷ আয়— আমাকে কিনে নিয়ে যা! আমি চারশো৷ মোট ষোলো টাকা পড়বে৷ বেশি না৷ মাঝখান থেকে দুফালি করলে লেজা খাবে তোর মিসাস৷ তুই মাথা৷ আমার শরীরে শুধু শিরদাঁড়াতেই কাঁটা৷

দূর থেকেই থমকে দাঁড়াল অখিল৷ মহেঞ্জোদড়োতেও তো এইভাবেই হাট বসত৷ এখন অবধি পৃথিবীর ইতিহাসে বিজ্ঞানীদের হিসেবে মোট ৬ হাজার কোটি মানুষ জন্মে মারা গেছে৷ তাদের ছাই— তাদের হাড় এই মাটিতে মিশে আছে৷ তাদের আরও বেঁচে থাকার ইচ্ছে এই বাতাসে কেমিক্যালি অক্সিজেন হয়ে আছে৷ আমরা খালি চোখে রাতের আকাশে মাত্র ছ’হাজার পর্যন্ত তারা দেখতে পাই৷ বিজ্ঞানীরা বলছেন— ওখানে ছ’হাজার কোটি তারা আছে৷ সারা ইন্ডিয়ায় ছ’হাজার রেল স্টেশন— দু’হাজার সিনেমা হল— ছ’হাজার পোস্ট অফিস আছে৷ ফি গাঁট পনেরো ষোলো বছর ধরলে আমি কি আয়ুর ছটা গাঁট পেরোতে পারব?

বাজারে ঢুকে অখিল কোনওরকমে ছশো ভোলা ভেটকি কিনল৷ তিনটে সবুজ শসা৷ চারটে মুলো৷ আর পঞ্চাশ লঙ্কা৷ আরও কী কিনত৷ কিন্তু সেই সিক্সটি পারসেন্ট সর্দির কথা মনে পড়ল৷ সেই সর্দিও একই পুরনো পথ দিয়ে বেরোয়৷ আর কিছু কিনতে পারল না৷ বাড়ি ফিরছিল তাড়াতাড়ি৷

সরু রাস্তার গায়ে ঢোল কলমির অগোছালো বেড়ার ভেতর একখানি টালির ঘর৷ অখিল জানে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমস্ত ইয়াঙ্কি সোলজাররা এই অমর আগাছাকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইন্ডিয়ায় সঙ্গে করে এনেছিল৷ বেড়া দেওয়ার জন্যে৷ এদের কেটে মেরে ফেললেও আবার জন্মায়৷ আসলে এরা কতদিন বাঁচতে পারে— তার কোনও আন্দাজ নেই কারও৷

কে যেন ডাকল৷ অখিলদা— এই অখিলদা— ফিরে দেখল অখিল৷ মাঝবয়সী প্রায় ছেচল্লিশ সাতচল্লিশ বছর বয়সের একজন সুঠাম কালো পুরুষ— চোখে চশমা— খালি গা— পাজামা গুটিয়ে ধারালো দায়ে ঢোলকলমির ডালগুলো কচকচ করে কাটছে৷

চিনতে পারলাম না তো৷

প্রায় চল্লিশ বছর আগে কাশীপুরে গঙ্গার ধারে আপনাদের বাড়ির পাশে থাকতাম৷ আমি কুণাল৷ আমার ছোটভাই কিন্নর৷ আমরা আপনার ছোট ভাইদের সঙ্গে নেতাজি সংঘের ক্লাবঘরে ক্যারম খেলতাম৷ মনে পড়ছে?

স্মৃতির পাতালে কুণালকে খুঁজে পেল অখিল৷ তুমি তো বড়ভাই কুণাল৷ সি এ পড়তে৷

হ্যাঁ৷ দুটো পাস করে আর পড়িনি৷ এই তো আমার বাড়ি৷

ওঃ! এই টালির ঘর তোমার?

হ্যাঁ৷ ইচ্ছে করেই পাকা বাড়ি তুলিনি৷ ইচ্ছে করলেই পারি৷ আসুন না—

ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অখিল বলল, কতটা জায়গা? এখন তো এখানে লাখ টাকা কাঠা৷

চার কাঠা৷ প্রাোমোটার বলছে— জমিটা দিন৷ রাস্তার গায়ের জমি তো৷ বারোটা ফ্ল্যাট বানিয়ে দুটো আমায় ফ্রি দেবে৷

নিয়ে নাও৷ ভালই তো৷

নাঃ! ভাবছি নিজেই বাড়ি তুলব৷ তুলে ভাড়া দেব৷ আমি কিনেছি এইট্টি ওয়ানে৷ এগারোশো টাকা কাঠা৷

তাই নাকি! বাঃ! বলে অখিল নিজের মনে বলল, এইট্টি ওয়ানে কত এগারোশো টাকা হাত দিয়ে গেছে৷ তখন যদি জানতাম৷ তখন যদি কিনতাম৷ তাহলে আমি দুটো না হোক একটা ফ্ল্যাট তো ফ্রি পেতাম! এই বাচ্চাটি কার? একটি বছর খানেকের মেয়ে মেঝেতে হামা দিচ্ছে৷ তাকে ধরতে অল্পবয়সী একটি বউ পাশের রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল৷

আমার৷ এই আমার বউ অখিলদা৷

অখিল অবাক হয়ে তাকাল৷ কুণালের এত বাচ্চা বউ? এত কচি মেয়ে? তার মুখে তাকিয়ে কুণাল একগাল হাসল৷ আপনি অবাক হচ্ছেন তো! ও আমার শালী ছিল আগে৷ এখন বউ৷ আমার স্ত্রী মারা গেছেন৷

কিসে?

ক্যান্সারে৷ আধুনিক হোমিওপ্যাথির কোনও চিকিৎসাই বাকি রাখিনি৷ ওই দেখুন৷

অখিল কুণালের আঙুল বরাবর চ্যাটাই বেড়ার দেওয়ালে তাকাল৷ সেখানে বড় একখানা অয়েল পেইন্টিং৷ কপালে ডগডগে সিঁদুর৷ বাচ্চা বউটি বলল, আমার দিদি—

বউটির দিদি সর্বক্ষণ তার ছোটবোনের এই সংসারের দিকে তাকিয়ে আছে৷

অখিল জানতে চাইল, কোনও বাচ্চা টাচ্চা?

না৷ হয়নি৷ ইউরেটাসে ক্যান্সার৷ বিয়ের দু’বছরের মাথায় ধরা পড়ল৷ শেষদিকে সরকার ডাক্তারের পুরিয়া এনে দিলাম৷ ভাল হয়ে যাচ্ছিল মনে হয়৷ কিন্তু ফট করে মরে গেল৷

অখিল জানে না শালীকে বিয়ে করলে কেমন লাগে৷ ক্যান্সারে শেষ পর্যন্ত সরকারকে? আশ্চর্য! সে বাজারের থলি হাতে বাড়ি ফিরে এল৷ আসার সময় জানতে চাইল, তোমাদের অফিস কোথায়?

কুণাল একটা বড় নামী কোম্পানির নাম বলে জানাল, ওদের অ্যাকাউন্টস সবটাই আমায় দেখতে হয়৷ ব্যালান্স শিট আমারই হাতে৷ ফিরতে ফিরতে রাত আটটা-নটা হয়ে যায়৷ বাচ্চা বউটি নালিশ জানাল অখিলকে, দেখুন না দাদা— বাড়ি ফিরেও অন্য সব অফিসের খাতা লেখে— খাতা ঠিক করে দেয়৷ ভাত নিয়ে বসে থাকতে থাকতে ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসে৷ এক একদিন রাত একটা দেড়টা হয়ে যায়৷ আপনি ওকে একটু সকাল সকাল খেয়ে নিতে বলুন তো৷

খেয়ে নিলেই পারো কুণাল৷

নেব৷ নেব৷ কিন্তু এই খাতা লিখেই তো সোনারপুর স্টেশনের গায়ে ছ’কাঠা কিনি সেভেন্টিনাইনে৷ ছশো টাকা করে কাঠা৷ সেখানে এখন পার কাঠা পঞ্চাশ হাজার হয়েছে৷ আরও বাড়বে— সোনারপুরের ওপর দিয়ে সত্তরখানা ট্রেন যায়৷ আসেও রোজ সত্তরখানা ট্রেন৷

তাই নাকি?

বলেন কেন! আরও দশ কাঠা কেনা আছে বেহালার গোড়াগাছায়৷ সাড়ে তিনশো টাকা করে কাঠা৷ এখন বেড়ে কাঠা দশ হাজার৷ লাইট গেলেই ডবল হয়ে যাবে৷ অটো দৌড়চ্ছে দিন-রাত৷

তাহলে কোথায় তুমি বাড়ি করবে?

সেটাই ভাবছি৷ কোনটা কোথায় শেষ পর্যন্ত কত টাকার কাঠায় গিয়ে ঠেকে— তাই বুঝে একটা ডিসিশন নিতে হবে৷ সামনের বছর ঠিক এই সময় নিয়ে ফেলব৷

তাড়াতাড়ি নাও৷ ল্যান্ড সিলিং আইন কিন্তু কলকাতার বাইরেও আরও কড়া হয়ে যাবে৷

কবে থেকে বলুন তো?—

তা জানে না অখিল৷ বেরিয়ে আসার সময় দেখল, কুণালের মুখে বেশ উদ্বেগ৷ সেদিনই অনেক রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বারান্দায় বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরাল অখিল৷ ধরিয়ে দেখতে পেল, কুণালের ঘরের চ্যাটাই বেড়ার দেওয়াল দিয়ে বাইরের শীতের নিশুতি রাতে আলো এসে পড়েছে৷ নিশ্চয় খাতা লিখছে ও এখন৷ আর অয়েল পেইন্টিংয়ের বউ চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে৷ ঘুপচি মতো রান্নাঘরে ভাতের থালা ঢাকা দিয়ে বাচ্চা বউটি বসে ঢুলছে৷ তার দিদির নিশ্চয় আরও বাঁচার ইচ্ছে ছিল৷ আরও বাঁচতে পারত৷ যদি অ্যালোপ্যাথি হত৷ আচ্ছা মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%