যে খেলার যা নিয়ম

অশোক দাশগুপ্ত

এই প্রথমবার আমি সত্যি-সত্যি মাঠে বসে ক্রিকেট টেস্ট দেখতে গেলাম৷ বাবা মারা যাওয়ার আগে কথা ছিল এবার আমায় ঠিক মাঠে নিয়ে যাবেন, তিন মাস আগে থেকেই কথাবার্তা পাকা হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু তার পরেই কী-যে হল, কেমন করে হল, কিছুই বোঝা গেল না৷ আপিস থেকে লোক এসে বলল, কাজ করতে-করতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন— হঠাৎ পাওয়ার চলে যায়, আপিসের জেনারেটরও কাজ করছিল না, দরদর করে ঘামছিলেন, ‘পুজোর বোনাস সম্পর্কে হিসেব দেখছিলেন— হঠাৎ টেবিলের ওপরই মাথাটা ঢলে পড়ল, ডান হাতটা তখনও ক্যালকুলেটরের ওপর৷ আপিস থেকেই নার্সিংহোম নিয়ে গেছে, ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’— ডাক্তারদের বয়ান, ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে তিন দিন তিন রাত্রি কোমার মধ্যে থেকে তারপর সব শেষ৷

এটা ঘটল পুজোর আগে৷ কেউ কিছু ভাববারও সময় পায়নি৷ অলক মামা না-থাকলে মা-র একার পক্ষে এত কিছু সামলানো সহজ হত না৷ মৃতদেহটা পুড়িয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর আত্মীয়স্বজন বন্ধু-বান্ধবের ভিড়ে এবং সমবেত শোকে আমি যেন প্রথম খানিকটা টের পেয়েছিলাম কী হল৷ সারা বাড়িটায় ফুলের গন্ধ— সব সাদা ফুল— আর এদিক-ওদিক পাপড়ি ছড়ানো৷ সেটাও যেন কিছু একটার চিহ্ন৷ জন্মদিনের উৎসবে ফুল আসত বাড়িতে, অলক মামা ক’মাস আগে বিয়ে করেছেন, ঠিক এমনতর ফুলের গন্ধে বাড়িটা ম-ম করছিল ক’দিন ধরে, তারপর দেখলাম কারুর মৃত্যু হলেও ফুল আসে অনেক— বাড়িটার গন্ধ পাল্টে যায়— গন্ধ থেকে বোঝবার জো নেই কোনও উৎসব, না শোকের প্রকাশ৷ শুধু লোকজনের ঘন-ঘন যাতায়াত, গম্ভীর মুখ, চাপা স্বরে কথা বলা, অলক মামা আর নতুন মামির ব্যস্ততা— সব মিলিয়ে একটা আন্দাজ হয়ত করা যায় ব্যাপারটা ঠিক সাধারণ নয়— আর এই ফুলটুলেই, তার সবকিছু শেষ হয়ে যাবে না৷

মা চাকরি করে ব্যাঙ্কে৷ পনেরো দিন কেটে যাওয়ার পর মা আবার ব্যাঙ্কে যেতে শুরু করল, আমিও স্কুলে যেতে শুরু করলাম— শুধু সন্ধের পর, দিনের এই বাঁধা রুটিনের ছদ্মবেশী নিরাপত্তা ভেঙে যায়, বাবা টিভি-র সামনে নেই, আমিও স্কুলের পড়া শেষ করে টিভি খুলি না৷ মা বাড়ির ঘরগুলো নতুন করে সাজায়৷ আগে যে ঘরটায় বাবা বসে-বসে কাজ করতেন, সে-ঘরটা আমার পড়ার ঘর হয়ে যায়, বইয়ের শেলফগুলো চলে যায় আমার আগেকার পড়ার ঘরে, বইতে-বইতে ভর্তি— বাবার নানাধরনের বই পড়ার শখ ছিল৷ অলক মামা সন্ধের পর ঘন-ঘন আসেন— আগেও আসতেন, তবে এত ঘন-ঘন নন৷ অলক মামারা থাকে শিবাজি পার্কের কাছে, স্কুলে আমার গুজরাটি বন্ধুরা বলে শিবাজি পার্ক একটা মিনি কলকাতাই হবে— প্রচুর বাঙালি থাকে৷ আমরা থাকি ভিলে পার্লেতে— সেটা সব গুজরাটিদের পাড়া৷

আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম বাবা স্ট্রোক হওয়ার আগে বাবা বলেছিল, এবার আমায় টেস্ট ম্যাচ দেখাতে নিয়ে যাবে— আগে দু-একবার বলেছি বাবাকে, কিন্তু বাবা বলেছিলেন টিভিতেই দ্যাখো, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম বড্ড দূর— যাতায়াতের অসুবিধা হবে— আপিস থেকে যে গাড়িটা দিয়েছিল বাবাকে, সেটা নিয়ে বেরুলেও রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম কাটিয়ে মাঠে পৌঁছুতে ঢের সময় লেগে যাবে— ট্রেনে যা ভিড় হবে, সেটা প্রায় অসহ্য৷ কিন্তু সেদিন ব্রেকফাস্ট খেতে-খেতে বাবা হেসে বলেছিল, ঠিক আছে, এবার তোমায় মাঠে নিয়ে গিয়েই খেলা দেখাব৷ তারপর এই৷

পুজোয় আমরা এর আগে প্রতি বছরই দিন পনেরোর জন্যে কলকাতা যেতুম৷ আমাদের বাৎসরিক বেড়ানো বলতে পুজোর ছুটিতে কলকাতা, গরমের ছুটিতে কখনও গোয়া, কখনও অজন্তা-ইলোরা, একবার সাতদিনের জন্যে আমরা পাহাড়ে গিয়েছিলাম৷ আমার ছুটি থাকলে কী হবে, বাবা-মার তো ছুটি নেই৷ এবার অবশ্য পুজোয় কোথাও যাওয়া হয়নি৷ অনেক রকম ঝামেলা ছিল— আমাদের বাড়িটা বাবা নাকি কিস্তিতে কিনেছিল, এবার জীবনবিমার টাকা থেকে পুরোটা শোধ করে দিতে হবে৷ কোনও কারণে সময়মতো টাকা দেওয়া না-হলে এ-বাড়ি ছেড়ে আমাদের উঠে যেতে হবে— আর উঠে যাওয়া মানে মা-র ব্যাঙ্কের চাকরিতে সেরিভেলি ছাড়িয়েও দূরে কোথাও৷ বোম্বাইতে কেউ সহজে বাড়ি পায় না৷

আমার সঙ্গে অবশ্য কেউ কোনও আলোচনা করে না৷ ছেলেমানুষদের সব বিষয়ে মাথা ঘামাতে নেই৷ কিন্তু অলক মামাদের কথাবার্তার টুকরো-টাকরা শুনে শুনে এই বাড়ির ব্যাপারটা আমি বুঝে গিয়েছি৷ এমনিতে আমার আর কোনও বদল হয়নি৷ সেই স্কুলের গাড়ি আসে, একই স্কুলে যাই, বন্ধুরা গোড়ার দিকে একটু-আধটু সমবেদনা জানাত, এরাও শেষটায় অভ্যস্ত হয়ে যায় যে অংশুর বাবা হঠাৎ মারা গেছেন— অনেকদিন রোগে ভুগে মারা গেলে মৃত্যুটা এমন আকস্মিক বা অপ্রস্তুত লাগে না— কোনও কিছু আচমকা হলেই তার ধাক্কাটা বিষণ্ণ হয়৷ কিন্তু সব অপ্রত্যাশিত ঝাঁকুনিও কিছু দিন কেটে গেলে কেমন যেন আর অপ্রত্যাশিত থাকে না— স্বাভাবিকের ফেরে এসে পড়ে৷ ফলে আমিও বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি, চেষ্টা করেছি কব্জির মোচড় দিয়ে চেটোর পেছন থেকে লেংথ আর নিশানা-মাফিক বল ফেলতে, প্র্যাকটিস করেছি ফরোয়ার্ড পুশ, কি কভার ড্রাইভের৷ হোম টাস্ক করেছি, আগে যেটা আমার ঘর ছিল, এখন সেটা বইয়ের ঘর৷ সেখান থেকে বই নিয়ে এসে পড়েছি— বাবার বাতিক ছিল ক্রিকেট-বই কেনা— আর পুরনো ক্রিকেট-বই পড়ার মতো মজা আর কিছুতে নেই৷

এমনভাবেই চলছিল, তারপর ক্রিসমাসের ছুটি— পরীক্ষার পর প্রায় দু-হপ্তা ছুটি পাই আমরা, তারপর নতুন বছরে ফল বেরুলে নতুন ক্লাস৷ এর মধ্যে একটা নতুন সফর শুরু হয়ে গেছে৷ ইংল্যান্ড থেকে একটা দল এসেছে— তারা বোর্ড প্রেসিডেন্ট একাদশের সঙ্গে হায়দরাবাদে, আন্ডার টোয়েন্টি থ্রি-র সঙ্গে দিল্লিতে, রনজি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন বাংলার সঙ্গে কলকাতায় খেলেছে৷ তিন দিনের খেলাগুলি সবাই প্র্যাকটিস হিসেবে নেয়, কাগজগুলো বলেছে, কিন্তু এই ইংল্যান্ড দল প্র্যাকটিস করবার খুব-একটা সুযোগ পায়নি— বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হারতে-হারতে বেঁচে গিয়েছে, স্পিন খেলতে গিয়ে নাজেহাল৷ খেলা শেষ হওয়ার সময় তাদের দ্বিতীয় দফায় আটটা উইকেট পড়ে গিয়েছিল, তখনও একশো সাত রান করতে বাকি৷ আন্ডার টোয়েন্টি থ্রি-র খেলায় দ্বিতীয় দফায় একটি সতেরো বছরের ছেলে নীরেন গুহ ২০১ করেছিল৷ কলকাতায় নীরেন গুহ আর একটি সেঞ্চুরি করল ১৫৭, রনজি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন বাংলা চার উইকেটে হারাল ইংল্যান্ডকে— প্রধানত তার ওই সেঞ্চুরির জন্যই৷ তারপর বোম্বাইতে প্রথম টেস্ট৷

টেস্টের আগের দিন অলক মামা এসে বললে, ভোরবেলাতেই চানটান করে তৈরি হয়ে থাকবি— তোকে টেস্টম্যাচ দেখিয়ে আনব— টিভি-র সামনে বসে-বসে তোকে আর এবার খেলা দেখতে হবে না৷

এই ইংল্যান্ড দলটা এসে পৌঁছুবার আগে থেইে কাগজগুলোয় নানারকম লেখালেখি হচ্ছিল৷ ইংল্যান্ড নাকি তাদের সেরা দলটা পাঠায়নি৷ কয়েকজন খেলোয়াড়ের ওপর নাকি নির্বাচকরা খাপ্পা— তারা নাকি ভেবেছে টেস্ট খেলায় তাদের মৌরসি পাট্টা লিখে দেওয়া হয়েছে— ফলে তারা গা লাগিয়ে খেলে না৷ তাছাড়া ভারত থেকে ফিরে গেলেই অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদের ছ-টেস্টের অ্যাসেজ লড়াই৷ ফলে যতই তারা কারণ দেখাক যে অভিজ্ঞ ভাল খেলোয়াড়দের তারা অ্যাসেজ সিরিজের আগে বিশ্রাম দিচ্ছে (কেমনতর বিশ্রাম কে জানে? কারণ তাদের সবাই তো এখন অস্ট্রেলিয়ায় শেফিল্ড শিল্ড খেলতে চলে গিয়েছে৷) আর ভারতের সঙ্গে সিরিজে নতুন খেলোয়াড়দের পরখ করে দেখার সেরা সুযোগ, কাগজগুলো কিন্তু বলছে এ শুধু কিছু খেলোয়াড়কে ডেকে ধমকে হুমকি দিয়ে বলা, তোমরা বাপু দলে অপরিহার্য নও— নো ওয়ান ইজ ইনডিসপেন্সিবল— তোমাদের বাদ দিয়েই আমরা অ্যাসেজ সিরিজে দল গড়ব৷ একটা কাগজ বলে বসল, এইসব বুলি যদি সত্যি হয়, তবে ভারতের উচিত তাদের সবগুলো টেস্টে হারানো৷ মানে কী— এই কৈফিয়তের? ভারতের সঙ্গে টেস্ট খেলা তাহলে কি টেস্ট খেলা নয়? ভারতকে তোমরা দল হিসেবে পাত্তাই দিচ্ছ না? উচিত হবে তো কোনও বিশেষ সিরিজ খেলবার সময় শুধু তার কথাই ভাবা— পরের সিরিজের জন্যে এই সিরিজটা ফালতু এলেবেলে ছেলেখেলা হয়ে যাবে— তোমাদের ম্যাচ প্র্যাকটিস হবে শুধু? এমন অহঙ্কারের সমুচিত ফলাফল দিতেই হবে— ভারতের আত্মসম্মান থাকলে উচিত হবে তাদের গোবেড়েন দেওয়া৷ আর সেটা যে অসম্ভব নয়, তিনটে ফার্স্টক্লাস ম্যাচেই সেটা দেখিয়েছে— একটাতে হারতে-হারতে বেঁচে গিয়েছে, বৃষ্টি না-হলে দিল্লির খেলাও ম্যাড়মেড়ে ড্র হত না— আর রনজি ট্রফি চ্যাম্পিয়নরা তাদের চার উইকেটে হারিয়ে দিয়ে তো বুঝিয়েই দিয়েছে কত ধানে কত চাল৷ তবে টেস্ট হচ্ছে টেস্ট— ভারতীয় দল যেন সেই একই ভুল না-করে, ইংল্যান্ড যা করেছে৷ তাদের যে উচিত হবে সেরা দলটাকেই মাঠে নামানো৷ শুধু তা-ই নয়, প্রথম থেকেই চাপ সৃষ্টি করে তাদের একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা৷ ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের পিচ ভাঙবেই— হয়ত দ্বিতীয় দিন থেকেই৷ টসে জিতে ব্যাট করে বড় রান করলে ইংল্যান্ড সেটা টপকাতে গিয়ে ভিরমি খাবে৷ আর টসে হেরে যদি ফিল্ড করতে হয় তাহলে দেখতে হবে ইংল্যান্ড যেন কিছুতেই ভাল রান না-করতে পারে৷

খেলাগুলোর ফলাফল লক্ষ্য করে, কাগজগুলোর সবজান্তা বিশ্লেষণ পড়ে, এমনকী খেলার কাগজগুলোর হাঁড়ির খবর হাটে ভেঙে দেওয়া দেখে আমরা জানতুম চোখে যা দেখা যায়, শুধু তা-ই সত্যি নয়, আড়ালেও কিছু একটা আছে— আর ওই আড়ালে কী আছে জানতে হলে বাইরের কতগুলো চিহ্নকেও লক্ষ্য করতে হয়৷ অন্তত আমরা নিজেরা খেলার মাঠে এইসব কথা নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা করেছি৷

এই ইংল্যান্ড দলটার গড়নটাই আশ্চর্য৷ ষোলোজনের মধ্যে পাঁচজনই কালো৷ তিনজন পশ্চিম ইন্ডিজের— যদিও তারা ছেলেবেলা থেকেই ইংল্যান্ডে থাকে৷ একজন বাংলাদেশের, তার জন্ম লন্ডনে, সারেতে খেলে৷ আর তাদের কাপ্তেন আনোয়ার হুসেন কেনিয়া থেকে আসা ভারতীয়৷ মাইক অ্যান্টনি আর আসমত খান (দুজনেই ত্রিনিদাদের— বাবা-মার সঙ্গে ইংল্যান্ড গিয়েছিল যখন তাদের বয়েস তিন কি চার, কিন্তু তাদের খেলার ধরন মোটেই ত্রিনিদাদের মতো নয়— কারণ দুজনেই জোরে বল করে)— এই দুজনকে লিলি-হ্যাডলি-কপিল দেব মার্কা বোলার মনে করা হয়— দুজনেই টেস্টে দুশোর ওপর উইকেট পেয়েছে৷ বাধ পার্কার মারকুটে ওপেনিং ব্যাট৷ বাংলাদেশের ছেলেটি (কেন যে সে বাংলাদেশের বলে পরিচিত, কেউ জানে না— তার তো জন্মই লন্ডনে৷ কলিন কাউড্রেকে কেউ কি ভারতীয় বা বাঙ্গালোরের ছেলে বলে? শহিদ আখতার ছ-নম্বরে ব্যাট করে, দলে নতুন৷ আনোয়ার আলি পাঁচ নম্বরে ব্যাট করে, ২৭টা টেস্টে সে আটটা সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে, প্রায় দু হাজারের কাছাকাছি রান৷ এই প্রথম কোনও কালো ইংল্যান্ডের কাপ্তেন হয়েছে— অবশ্য কতটা কালো, কে জানে— কারণ কেনিয়া থেকে যখন তার বাবা-মা ইংল্যান্ডে দেশান্তরী হন, তখন তাঁদের ব্যবসা করে এতই টাকা যে ছেলেকে পাবলিক স্কুলে— উইনচেস্টারে— পড়িয়েছেন, তারপর সে গেছে কেমব্রিজে— আর ফেনের্সর শানবাঁধানো উইকেটে তার খেলা দিন-দিন খুলেছে৷ সে কেমব্রিজের ব্লু, দ্বিতীয় বারে সে কেমব্রিজের কাপ্তেন ছিল— অনেকদিন পর তারই নেতৃত্বে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি ম্যাচে অক্সফোর্ডকে হারায়— ফলে ডিনার খেতে যে লোকটা এসেছিল তার মতো সেও প্রায় চুনকাম করা কালো— অর্থাৎ কালো চামড়া বটে৷ তবে অর্থে-বিত্তে-জ্ঞানে-বিদ্যায় সে সাদার চাইতেও সাদা— পুরো সাদা বলে মনে যদি নাও হয় ধরে নাও যে সে সাদা মুখোশ পরে আছে৷ বাকিদের মধ্যে দুজনের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়, তারা সাদাই৷ ব্যাট করে— অ্যালান বুল আর নোভল স্মিথ৷ বাকিরা সবাই প্রায় নতুনই— দু-একজন একটা দুটো টেস্ট খেলেছে— কাউন্টিতে মস্ত রান হাঁকায়, কিন্তু যে ক’বার টেস্ট খেলেছে ধেড়িয়েছে৷ উইকেটকিপার দুজনই আনকোরা, একজন আবার বাঁ হাতে ব্যাট করে৷ ভারতে খেলতে এসেছে বলে একজন অফস্পিনার আছে, তার বয়স ৩৪, লেফট আর্ম অর্থোডক্স স্পিনারটির বয়েস আরও বেশি— ৩৮; সে হয়ত আগেই টেস্ট খেলত, কিন্তু মাঝখানে দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে গিয়েছিল বলে তিন বছর তাকে আন্তর্জাতিক খেলায় নেওয়া হয়নি৷ বাকিরা সবাই কাউন্টিতে ভাল খেলে— কিন্তু কখনও নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ পায়নি— কারণ টেস্টে তাদের ‘পারফরমেন্স নট আপ টু দি মার্ক’৷ দলে ষোলোজনের মধ্যে সাতজন আছে যারা একবারও টেস্ট খেলেনি৷

কেউ তো আর অভিমন্যুর মতো মায়ের পেট থেকে টেস্ট খেলার সব হালহকিকৎ জেনে মাঠে নামে না— সকলকেই একদিন-না-একদিন প্রথম টেস্ট খেলতে হয়— তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ইত্যাদি৷ আর তারা যে সফরে এসেছে, সে তো নির্বাচকরা তাদের বেছেছে বলেই৷ বিলিতি কাগজগুলোর মতে (তারা বেশিরভাগই টি বি সি বি-র ধামাধরা) ভারত সফর যে কোনও নতুন খেলোয়াড়ের পক্ষেই নিজেকে প্রমাণ করবার সেরা সুযোগ৷ প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এমনকী পাকিস্তানও নয়৷ ও-সব দেশে প্রথম সফরে যাওয়া মানেই নিজের কবর খোঁড়া৷ ভারতবর্ষে বরং তুমি দাঁড়িয়ে যাবার বিস্তর সুযোগ পাবে৷

এত সব আমরা জেনেছি, শুনেছি, পড়েছি— আর আমাদের নিজেদের খেলার ফাঁকে-ফাঁকে আলোচনাও করেছি৷ ভারতীয় নির্বাচকরাও আহামরি বা ধোয়া তুলসী পাতা নয়— তাঁরা কখন কী করেন দেবতাদেরও জানা দুঃসাধ্য— মানুষ তো কোন ছার৷ অদ্ভুত সব তত্ত্ব তাদের চালায়, অদ্ভুতভাবে তারা খেলোয়াড়দের বাদ দেয়, কাউকে দলে আনে— আর খেলোয়াড়রা যখন থেকে একটা অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তাদের দাবিদাওয়া জানাচ্ছে, সেদিন থেকে তাদের সিদ্ধান্তগুলোও ঠিক ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার মতোই ‘ফ্রিকল অ্যান্ড আনপ্রেডিকটেবল’ হয়ে উঠেছে৷ ফলত খবরকাগজগুলো যতই চিল্লাক, এবার ইংল্যান্ডকে সজুত করার একটা ভাল মওকা পাওয়া গিয়েছে, এমন মওকা খুব সহজে আসে না৷ ভারতীয় নির্বাচকরাও আস্তিনে দু-একটা চমক তুলে রেখেছিলেন৷ চোদ্দো জনের দলে তিনজন সিনিয়র ক্রিকেটার নেই, তারা অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা, কিন্তু দুরাত্মার যেমন ছলের অভাব হয় না তেমনি ৩৩/৩৪ বছরের এই খেলোয়াড়দের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তাদের বয়েস বড্ড বেশি হয়ে গেছে, আগের মতো পাঁচ দিন ধরে খেলার স্ট্যামিনা আর নেই৷ ফলে বাদ গেছে একজন ওপেনিং ব্যাট, যার টেস্ট রান তিন হাজারের ওপর, একজন ওপেনিং বোলার— যার টেস্ট উইকেটের সংখ্যা ২৮৭, আর উইকেটকিপারটি— যে দলের বিপদের সময় অনেকবার ব্যাট হাতে দলকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে৷ অবশ্য আশার কথা, নীরেন গুহর নাম চোদ্দোজনে আছে— সে খেলবে কি না কে জানে৷

কিন্তু, সে যা-ই হোক, আমি যখন সত্যি-সত্যি মাঠে খেলা দেখতে যাব কি না এ নিয়ে কোনওরকম মাথাই ঘামাচ্ছি না, তখন অলকমামা এসে বললে, কাল সকাল-সকাল তৈরি হয়ে থাকিস, তোকে মাঠে নিয়ে যাব খেলা দেখতে৷ আর তাই এই প্রথমবার আমি সত্যি-সত্যি মাঠে বসে ক্রিকেট টেস্ট দেখতে গেলাম৷ টিভি-র পর্দায় দেখা নয়, রেডিওর বল ধরে-ধরে বর্ণনা শুনে খেলাটাকে ছকে নিয়ে মনে-মনে দেখার চেষ্টা নয়— সত্যি-সত্যি গ্যালারিতে বসে সবুজ ঘাসের ওপর পাগলা কুকুর, ইংরেজ ও সাদা ফ্লানেল-পরা হাবাদের দেখতে পাব৷

সত্যি, যারা কোনও দিন কখনও একবারও খেলেনি বা খেলার মাঠে যায়নি তারা খেলোয়াড়দের নিয়ে কত কী বিচ্ছিরি কথা মুখ বেঁকিয়ে বলে— আর নিজের বুদ্ধি আর কৌতুকবোধকে নিজে-নিজেই তারিফ করে৷ নিজের পিঠ নিজে চাপড়ানোর বোধহয় আলাদা একটা তৃপ্তি আর আমোদ আছে৷

অলকমামার যত ইলাহি কাণ্ডকারখানা৷ ঢাউশ একটা টিফিনবাক্স, একটা মস্ত ফ্লাক্সে চা আর প্লাস্টিকের গোটাকয় গেলাস আর গোটা পাঁচেক মিনারেল ওয়াটারের প্লাস্টিকের বোতল একটা মস্ত আডিডাসের ব্যাগে করে নিয়ে হাজির হলেন, তখন সবে আমি স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়েছি৷ তারপর কেমনতর জামা পরতে হবে— ‘না না, ওগুলো নয়, গরমে মরে যাবি— সুতির জামা, সুতির প্যান্ট পরলেই দেখবি অস্থির-অস্থির লাগছে—’ ইত্যাদি থেকে শুরু করে ব্রেকফাস্টে কী খাব তাই নিয়েই একটা মস্ত শোরগোল লাগিয়ে দিলেন৷ অনেকদিন পর বাড়ির আবহাওয়া কেমন হালকা লাগল, অনেকটা পুরনো দিনের মতো, বাবাও সব ব্যাপার নিয়ে অনর্গল কথা বলতে পারতেন— আর ছুটির দিনগুলোয় তো হইহই পড়ে যেত বাড়িতে৷

তারপর এখন মাঠে৷ টস হয়ে গেছে, ভারত টসে জিতে ব্যাট করবে বলে ঠিক করেছে, স্কোরবোর্ডে ওপেনিং ব্যাট দুজন— পদ্মনাভ রাজু আর ফারুখ আহমেদের নাম তোলা হয়ে গেছে, আসমত খান রান আপে গিয়ে তৈরি, আম্পায়ার হাত দিয়ে আটকে রেখে ঘড়ি দেখছেন, তিনটে স্লিপ দুটো গালি তৈরি, উইকেটকিপার প্যাড পরে কয়েকবার লাফিয়ে নিয়েছে, ফরোয়ার্ড শর্ট লেগের ছেলেটি মাথায় হেলমেট পরে আছে— ফারুখ আহমেদ দু’তিনবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিলে বোলারের দিকে, পদ্মনাভ রাজু স্টান্স নিয়ে একটু ঝুঁকে আছে ব্যাটের ওপর— সব মিলিয়ে দৃশ্যটার মধ্যে কেমন একটা নাটকীয়তা আছে— কিছুই হচ্ছে না, সব যেন কেউ সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো খেলাবে, কিন্তু হাওয়ায় কেমন একটা প্রত্যাশা, যেন এক্ষুনি কিছু একটা ঘটে যাবে৷ যে-সব দর্শক তখনও মাঠে ঢুকছে তারাও এক নজরে দৃশ্যটা দেখে তড়িঘড়ি নিজের আসন খুঁজে বার করে বসে পড়বার চেষ্টা করছে৷

আম্পায়ার হাত নামিয়ে ঝুঁকে একাগ্র হয়ে তাকালেন৷ আসমত খান দৌড় শুরু করেছে, উইকেটের কাছে এল, একটা লাফ, বল গেল রাজুর দিকে, সে বাঁ পা বাড়িয়ে অফ স্টাম্পের একটু বাইরের বলটাকে আস্তে ঠেলে দিল গালির দিকে৷ মাঠ থেকে একটা সমবেত দম ছাড়ার হুউশ শব্দ উঠল৷ সব নাটকীয় প্রত্যাশার পর দ্বিতীয় গালি যখন বলটা তুলে নিয়ে নিজের ফ্লানেলে দু’বার ঘষল, মনে হল কেমন যেন একটা অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স— যে-নাটকটা হবার কথা ছিল, সেটা আর যেন হল না৷ কিংবা হয়ত-বা হলও৷ কেন না আবার ফিল্ডাররা যে যার জায়গায় ফিরে গিয়েছে৷ আসমত খান ফিরে গিয়েছে, তার রান-আপে, কভার থেকে তার কাছে বল ফিরে এল, আসমত খান দৌড় শুরু করেছে, আম্পায়ার ঝুঁকে পড়েছে, লোকজন সব চুপ— যেন দম বন্ধ করে আছে সবাই, পুরো লেংথে বল পড়ে বলটা অফস্টাম্পের বাইরে হঠাৎ বাঁক নিল, পদ্মনাভ রাজু প্রায় শেষ মুহূর্তে ব্যাটটা সরিয়ে নিল— কিপারের দস্তানায় বল গিয়ে পড়ল৷ আর পরমুহূর্তেই একটা গুঞ্জন— দেরিতে বাঁক নেওয়া বল, আর শেষমুহূর্তে যেন তড়িদাহতের মতো পদ্মনাভ রাজুর ব্যাট সরিয়ে নেওয়া— কোনটার মধ্যে কার মধ্যে খেলার কৌশল বেশি ভালভাবে ফুটে উঠেছে সে নিয়ে দু-একটা মন্তব্য৷ এখনও কেউ কেউ মাঠে আসছে— আসমত খান রান-আপে যাবার সময় তারা তাড়াতাড়ি জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ছে, যারা সেই সুযোগটায় বসতে পারেনি, তারা ফের দাঁড়িয়ে পড়ে দুই সারের মধ্যকার গলিটায়— অপেক্ষা করে কখন নতুন বলটা আসে— তারপর ফাঁক বুঝে তারা বসবার চেষ্টা করবে৷

টিভির পর্দায় খেলা দেখার চাইতে একেবারেই অন্যরকম পুরো ব্যাপারটা৷ কেউ যদি জিজ্ঞেস করে তা কেন হবে— এই খেলাটাই তো টিভিতে দেখাচ্ছে— এখন তুমি মাঠে বসে যা দেখছ, অংশু, তাই তুমি ঘরে বসে টিভির সামনে দেখতে পেতে, তাহলে আমি বলব, তা ঠিক, একই ম্যাচ বটে, একই খেলা— কিন্তু তবু এক নয়, টিভিতে দেখা, আর মাঠে বসে দেখা— দুটোই আলাদা জিনিস৷ কেন আমার আলাদা মনে হচ্ছে, তা আমি গুছিয়ে ভাববার চেষ্টা করলাম৷ এক তো এটা যে এর মধ্যেই ভাষ্যকার বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সমেত একটা মোড়কে পুরো খেলাটা তার কাছে পৌঁছুত৷ খোলাখুলি দেখা যেত না— অন্য কারু টীকাটিপ্পনী ব্যাখ্যা খেলাটাকে এর মধ্যেই বদলে দিত আগাগোড়া৷ আসমত খানের এই দ্বিতীয় বলটা অন্তত তিনবার তিন কোণ থেকে দেখানো হত, লেট আউটস্যুইঙ্গারকে তারিফ করা হত, আবার হয়ত পদ্মনাভ রাজুরও জাজমেন্টকে পিঠ চাপড়ানো হত— সে যে দেখেশুনে ছেড়ে দিয়েছে, সে যে জানে তার অফস্টাম্প কোথায়, সে যে মাঠের সঙ্গে মানিয়ে নেবার আগে হাত খুলতে চাচ্ছে না— এ-সব মন্তব্য প্রায় যান্ত্রিকভাবেই অনর্গল বেরিয়ে আসত৷ এখানে বলটা একবারই দেখছি, যেমন আমরা যখন মাঠে খেলি, তখনও একবারই দেখি: ছোট্ট একটা মুহূর্তের মধ্যে আমাদের চাক্ষুষ স্মৃতি কাজ করে যেত৷ আর তারই ভিত্তিতে তক্ষুনি আমাদের ঠিক করে ফেলতে হত কীরকম বল হল, কীরকম ব্যাট করা হল, পরের বল কোথায় ফেলতে হবে ইত্যাদি৷ ওই তিনবার পর পর একই জিনিস আমরা ফিরে দেখতে পেতাম না৷ কোনও কিছুরই পুনরাবৃত্তি হয় না, সেদিন ক্লাসে বলছিলেন ইংরেজির পারিখ সার, বলছিলেন একই জলে দু’বার তুমি হাত ডোবাতে পার না— স্নান করতে পার না— এমনকী তথাকথিত বদ্ধ জলেও না— কারণ যেই তুমি আবার জলে হাত ডোবাতে গেছ, একটা বা দুটো মুহূর্ত কেটে গিয়েছে, জলের বয়সের সঙ্গে সেই দুটো মুহূর্ত যোগ হয়েছে, তোমারও হাতের বয়স আর সমান নেই৷ অতএব টিভি যা বারে বারে দেখায়, স্লো-মোশনে দেখানো তো পুরোটাই বিকৃতি, তা কিন্তু বারে বারে ঘটেনি৷ তার বরং অন্য জরুরি চাহিদা আছে৷ খেলার কৃৎকৌশল শেখবার সময় কিংবা এমনকী বিপক্ষের ত্রুটি, দুর্বলতা বা শক্তি জানবার জন্যেও, পরে হয়ত ভিডিও ক্যাসেটে এটা বারে বারে দেখা জরুরি৷ কিন্তু, সত্যি, মাঠে গিয়ে খেলা দেখা— আর বাড়িতে একটা টিভিতে খেলা দেখা— দুটো নিশ্চয়ই ভিন্ন ব্যাপার৷ কিন্তু আরও একটা জিনিস ভেবে দেখবার৷ সেটা হল দর্শক৷ আর এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল৷ এত লোক খেলা দেখতে এসেছে৷ অন্তত হাজার পঞ্চাশ তো হবেই৷ আর তাইতেই খেলার চরিত্রটাই বদলে গিয়েছে৷ দর্শকের সামনে খেলা আর নিজে অনুশীলন করা, বা স্কুলে দল গড়ে খেলা— পুরোপুরি অন্যরকম৷ একটা সূক্ষ্ম কিন্তু স্পষ্ট বদল সহজেই চোখে পড়ে৷ তুমিই খেলছ, তুমিই একা বলের সামনে দাঁড়াচ্ছ, উইকেট সামলাচ্ছ— এটা ঠিক৷ কিন্তু তুমি একা নও— এই যে এত লোক এসেছে, যারা খেলে না, কিন্তু দ্যাখে, যারা খেলে না কিন্তু উপভোগ করে, খেলার গতির সঙ্গে সঙ্গে যাদের মনোভাব পাল্টে যায়, কখনও যারা তোমার সঙ্গে তোমায় মাথায় তুলছে, কখনও তোমার ওপর রাগ করে তোমাকে ধুলোয় ছুঁড়ে ফেলছে— এই ব্যাপারটা ঠিক দায়িত্বের বোধ নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু, সবসময় তোমার সঙ্গে সঙ্গে আছে, চেতনে বা অবচেতনে, আর তাও কিন্তু তোমার খেলার ওপর ছাপ ফেলে যাচ্ছে৷ এটাও ঠিক টিভির পর্দায় বোঝবার জো নেই— কিংবা ধারাভাষ্য শুনেও আন্দাজ করা যায় না৷ পঞ্চাশ হাজার লোক, ষাট হাজার দর্শক— এসব মাত্র নীরক্ত সংখ্যা হয়ে থাকে৷ মাঠে না এলে বোঝা যায় না এই দর্শকের মানে কী? খেলা কি শুধু একজনের? কিংবা এগারো জনের? মাঠে এলেই বোঝা যায় এই ব্যাপারটা তার চাইতেও বেশি কিছু৷

সারাদিন ধরে খেলা দেখতে দেখতে এমনি নানা কথাই অগোছালো এলোমেলো ভাবে আমার মনে হচ্ছিল৷ ঠিক যে একবারে বিশ্লেষণ করে বিচার করে আমি বুঝতে পারছিলাম তা নয়৷ কিন্তু মাঠের মাঝখানে যা হচ্ছে, মাঠের চারপাশে লোকজনের মধ্যে তার যে সাড়া দেখা যাচ্ছে— কোথায় যেন তা এক সুতোয় বাঁধা৷ আমি একটু একটু করে টের পাচ্ছিলাম চাপটা৷

চাপটার শুরু দ্বিতীয় ওভারের গোড়াতেই— প্রথম বলেই৷ পদ্মনাভ রাজু প্রথম ওভারে কোনও রান করেনি, বলগুলো শেষমুহূর্ত অবধি দেখেছে, কখনও ব্যাট দিয়ে আস্তে ঠেলে দিয়ে আটকেছে, কখনও বা ছেড়ে দিয়েছে৷ কিন্তু মাইকেল অ্যান্টনির প্রথম বলটাই যখন ফারুখ আহমেদের হাফ কক খেলবার চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করে ব্যাটপ্যাডের মাঝখান দিয়ে গলে গিয়ে উইকেট ভেঙে দিল, তখন যে শোরটা উঠল সেটা এতই অতর্কিত আর স্বতঃস্ফূর্ত যে মাঠে না গেলে সেটা বোঝাই যেত না৷ উত্তেজনা টিভির সামনেও হয়— কিন্তু সেটা দু’চারজনের— এখানে সমবেতভাবে এতজনের সাড়া সেই উত্তেজনার চরিত্রটাকেই যেন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে৷ আর নাটকটা জমে উঠল৷

আমার প্রিয় খেলোয়াড় ইন্দর সিং সন্ধু তিন নম্বরে খেলে৷ মারকুটে খেলোয়াড়৷ সহজে তাকে আটকে রাখা যায় না৷ পিচ বা বিপক্ষের আক্রমণের সঙ্গে একটু ধাতস্থ হয়ে গেলেই তার মার শুরু হয়ে যায়— আর তার ফলে এমনও হয় যে চমৎকার বিশ-ত্রিশ রান করে সে হঠাৎ, যখন মনে হয় বড় ইনিংস খেলবে, তখন আউট হয়ে যায়৷ অনেকেই বলে যে তার বড় ম্যাচ খেলার মানসিক ধাত নেই— না হলে হাতে অমন চমৎকার স্ট্রোক থাকতে, খেলার গড়ন ব্যাকরণ অনুযায়ী হওয়া সত্ত্বেও, সেট হয়ে যাবার পর সে বার বার ওভাবে আউট হয়ে যায় কেন৷ অনেকেই তাকে বাদ দেবার পক্ষপাতী— আমি নই৷ কিন্তু সে মাঠে নামামাত্র নাটকের মধ্যে আরও একটা নাটক শুরু হয়ে গেল৷ তাকে প্রমাণ করতে হবে যে বড় ইনিংস খেলবার মতো মনের গড়ন তার আছে, এও প্রমাণ করতে হবে যে বিশ-ত্রিশ রানের হাততালির পর সে যাতে হাততালির লোভে ভেসে না-যায়, চটকদার সব মার মারতে গিয়ে আউট হয়ে না-যায়, প্রমাণ করতে হবে যে সে দলের কথা ভেবে খেলে— শুধু আহামরি মারের মোহে দলের বিপদের কথা ভুলে যায় না৷ স্কোরবোর্ডে রান শূন্য, সাতটি বল মাত্র খেলা হয়েছে, এক অর্থে তাকেই ইনিংস ওপেন করতে হচ্ছে— গোড়াপত্তন ভাল না-হলে পরের খেলোয়াড়রা তাদের স্বাভাবিক খেলা খেলবে কী করে?

ইন্দর সিং সন্ধু অন্যদিন যেমন খেলে মোটেই তেমন খেলল না৷ প্রতিটি বল দেখেশুনে সে ডিফেন্সের সঙ্গে অ্যাটাকিং স্ট্রোক মেশাল— তাড়াহুড়ো করে রান করার ঝোঁক তার মধ্যে নেই৷ পদ্মনাভ রাজু এমনিতেই ডিফেন্সিভ খেলে, তার খেলার বাঁধুনি ধ্রুপদী৷ সুতরাং তারপর প্রায় একশো মিনিট একটা টান টান লড়াই চলল৷ তারপর যখন দলের রান ৬১, লাঞ্চের বাকি উনিশ মিনিট, পদ্মনাভ রাজু ২৩ রান করে বোল্ড হয়ে ফিরে গেল৷ ঠিক যখন লোকে ভাবছে অবস্থাটা সামলে আনা গেছে, তখনই মাইকেল অ্যান্টনির বলে তার ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ পুশ বলটাকে ঠেকাতে ব্যর্থ হল, ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে লেগস্টাম্পে গিয়ে বল পড়ল৷ ইন্দর সিং সন্ধুর রান তখন ২৭, বাকি রানগুলো অতিরিক্ত৷

অলকমামা মাঝে মাঝেই বলছেন, লক্ষণ ঠিক সুবিধের নয়— সন্ধুও যদি বোলারদের চেপে বসতে দেয়, তাহলে হাত খুলে মারবে কে? এই ২৭ রানের মধ্যে শুধু একটা চার মেরেছে সন্ধু৷ যে হুক করার জন্যে সে বিখ্যাত, সেই হুক একটাও নেই— প্রতিটি বাউন্সার সে শেষমুহূর্ত অবধি দেখে ছেড়ে দিয়েছে৷ অধিনায়ক সঞ্জয় শর্মা নেমেই অ্যান্টনির বলেই খোঁচা দিয়েছিল— ভাগ্যিস স্লিপ তিনজন পেছিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের কাছে যায়নি৷ ঠিক চান্স নয়, তবে বলটা ঠিক বুঝতে পারেনি৷ লাঞ্চের সময় রান দু উইকেটে ৭২৷ সঞ্জয় শর্মা এক রানও করেনি— সন্ধু লাঞ্চের সময় ৩৫৷

লাঞ্চের পরেই, কোনও রান না করেই সঞ্জয় শর্মা স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে এল৷ আর তখন নামল নীরেন গুহ— এটা তার প্রথম টেস্ট— দলের রান টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে ৩ উইকেটে ৭৫৷ তৃতীয় উইকেট নিয়েছে আসমত খান৷ ইংল্যান্ড এখনও বোলার বদল করেনি— খান আর অ্যান্টনিই সমানে বল করে চলেছে৷

একটু পরেই অবিশ্যি দু’দিক থেকে বোলার বদল হল৷ টেস্টে প্রথম বলটাই নীরেন গুহর ব্যাকফুটে কভার ড্রাইভ— এবং চার৷ এটা ঠিক যে উইকেটের সামনে শর্ট কভারে মাত্র একজন ছিল৷ ভারত কোণঠাসা বলে আর নীরেন গুহ নতুন বলে তাকে ঘিরে ধরেছিল ইংল্যান্ড৷ ওপাশে এবার সন্ধুও এক ওভারে তিনটে চার নিল৷ যেন গুহর একটি কভার ড্রাইভই হঠাৎ পুরো খেলার চেহারাটা পাল্টে দিয়েছে৷

পাল্টেই দিয়েছিল৷ রান এবার ঝড়ের বেগে উঠছে৷ ইংল্যান্ড তিনবার বোলার বদল করল৷ কিন্তু রান আটকাতে পারেনি৷ কিন্তু চায়ের সাত মিনিট আগে, সন্ধু ১০১ রান করে আউট হয়ে গেল৷ পরের খেলোয়াড় উইকেটকিপার অনিল শাস্ত্রী প্রথম বলেই ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে লেগবিফোর৷ দলের রান পাঁচ উইকেটে ১৭৭৷ নীরেন গুহ ৫২ রানে খেলছে৷

চায়ের পর ঝুপঝুপ করে উইকেট পড়ে গেল— পরের খেলোয়াড়রা যখন আউট হল নীরেন গুহ ৮৭ রানে অপরাজিত৷ দিনের খেলা শেষ হবার আধঘণ্টা আগে ২৪৮ রানে ভারত প্রথম দফায় সবাই আউট৷ পিচে কোনও জুজু ছিল না, আবহাওয়া একটু ভ্যাপসা গুমোট ভরা ছিল, কিন্তু লাঞ্চের পর মোটেই সুইং করেনি বল৷ শেষ উইকেটগুলো নিয়েছে স্পিনাররা— বাঁহাতি বোলার তিনটে, আর অফ স্পিনারটি দুটি উইকেট৷ বল স্পিন করেছে বটে, তবে খুবই ঢিমে তেতালায়৷ আসলে উইকেটগুলো খুইয়েছে ফ্লাইটে ঠকে গিয়ে— একজন মিডউইকেটে ক্যাচ, একজন গালিতে, আর একজন স্টাম্পড৷

শোরগোলটা এই জন্যেই বেশি হল যে নীরেন গুহকে কেউ সাহায্য করেনি— একজন কারু দাঁড়ানো উচিত ছিল, যাতে সে সেঞ্চুরি করার সুযোগ পায়৷ বিশেষত অলরাউন্ডার বিশ্বনাথন যেভাবে প্রথম বলটাই লাফিয়ে খেলতে এসে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে স্টাম্পড হয়ে এল, তাতে কেউ কেউ ভাবতেই পারে যে নীরেন গুহর কথা সে একবারও ভাবেনি৷

২০ মিনিট খেলতে হল ইংল্যান্ডকে৷ চার ওভার মিডিয়াম পেসাররা বল করেছে- বিশ্বনাথন দু ওভার, আর নির্মল কোলাটকার দু ওভার৷ বারো রান দিয়েছে৷ শেষ ওভারে বল করতে এল লেগ স্পিনার রাজশেখর৷ আর তার দ্বিতীয় বল— সেটা গুগলি ছিল, কিছুই বুঝতে পারেনি ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়— ব্যাটপ্যাড ক্যাচ দিয়ে আউট হয়ে চলে গেল৷ আর তক্ষুনি দিনের খেলা শেষ৷

বাড়ি ফিরতে ফিরতে অলকমামার সঙ্গে খেলা নিয়ে কথা হল অনেক— কিন্তু অংশুর হঠাৎ মনে হল— কেন মনে হল, তা সে জানে না— তার সামনে যেন একটা দরজা খুলে গিয়েছে— আর তার মধ্য দিয়ে তার কাছে এগিয়ে এসেছে ভবিষ্যৎ৷ যেন কোনও একটা মুহূর্ত, তুমি এখনও ছেলেমানুষই আছ, কিন্তু তুমি ঠিক বুঝতে পারছ ছেলেবেলা বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে, তুমি যেন হঠাৎ জেনে ফেলেছ ভবিষ্যতে তুমি কী হবে৷ অন্তত আমি জানি আমি কী করতে চাই৷ আমি আরও বেশি সময় দিতে চাই খেলার অনুশীলনে৷ না না, হাততালির জন্য নয়, কিন্তু দলের ওই অবস্থায়, সহখেলোয়াড়কে কোনও পাত্তা না দিয়েই, আমি অন্তত ওভাবে যে লাফিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ছক্কা হাঁকাতে চেষ্টা করব না— সেটা বোঝাতেই৷ ক্রিকেটে আমি সাফল্য নাও পেতে পারি, কিন্তু জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও কি ক্রিকেটের সমান্তর কিছু নেই? এটা খেলাও আবার একটা রূপকও তো বটে— খেলার মোড়কের আড়ালে অন্য কিছু ঢেকে রাখেনি কি ক্রিকেট?

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%