অশোক দাশগুপ্ত
আমি প্রথমে বলেছিলাম, যাব না৷ আমি সাধারণ এলেবেলে মানুষ৷ আপিস করি, বাড়ি যাই৷ ছুটি-ছাটার দিনে বউকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ভিজিট করি৷ ওরা চা খাওয়ায়, বিস্কুট-চানাচুর দেয়৷ ভাজাভুজি, মিষ্টান্ন ছুঁই না আজকাল৷ ইনটেলেকচুয়ালদের আড্ডায় গেলে মুশকিলে পড়ে যাব৷ তোমারই অসম্মান হবে৷
সত্রাজিৎ ছাড়ে না৷ বলে, চল চল৷ ভারি তো সব ইনটেলেকচুয়াল! বাইরে থেকে ওইরকম মনে হয়৷
কী বল ভাই, কাগজে ওদের ছবি বেরয়৷ নিত্য নাম ছাপা হয়৷ সংবর্ধনা হয়৷ ওদের কত ফ্যান! বইমেলায় দেখিনি?
টমলিন কোম্পানির সিনিয়র পি আর ও সত্রাজিৎ বলল, আমরাই ওদের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রাখি৷ শুধু ফিল্মস্টার দিয়ে সবরকম প্রাোডাক্ট কভার করা যায় না৷ লোকে জানতে চায়, প্রতিভাবান ব্যক্তিরা কী বলছে৷ পুরস্কৃত সাহিত্যিক কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খায়৷ অর্ধশিক্ষিত লোকের সংখ্যা যে-হারে বাড়ছে৷ বুঝিস তো৷
সেই অর্থে আমিও অর্ধশিক্ষিত৷ খবরের কাগজ ছাড়া আর কিছু পড়ি না৷ টিভি দেখি৷ টিভির প্রোগ্রাম থেকেও অনেক কিছু শিখি৷ তবে, যাকে বলে গ্রন্থ পাঠ করা, সাহিত্যরস আস্বাদন করা, তত ধৈর্য আমার নেই৷ বই খুলে বসলেই ঘুম পেয়ে যায়৷ তার মানে এই নয় যে, যাঁরা কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার— তাঁদের প্রতি আমার অশ্রদ্ধা আছে৷ বরং উল্টোটাই৷ তাঁদের প্রতি মনে মনে আমার গভীর সম্ভ্রম৷ আমি যা পড়ে উঠতে পারি না, তাঁরা কষ্ট করে তাই লিখে চলেছেন, ভাবলে মাথা নুয়ে আসে৷ তাঁরা জীবনকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখেন, মানুষের মন নিয়ে গবেষণা করেন৷ কতখানি অন্তর্দৃষ্টি আর একাগ্রতা থাকলে এই সব কাজ করা সম্ভব, আমি অনুমান করতে পারি৷ আর পারি বলেই বুঝি, আমি নিজে এ সব ব্যাপার থেকে কত দূরে৷ কত নিচে৷
তাই সত্রাজিৎকে বলেছিলাম, তোমার ওই ককটেল পার্টিতে আমায় টেনো না৷ কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি জবাব দিতে পারব না৷ তখন তোমারই অসম্মান হবে৷ লোকে বলবে, কোত্থেকে একটা ছাগল ধরে এনেছ৷ কুম্ভীলক মানে কি, তা জানে না৷ ম্রিয়মাণ আর মুমূর্ষু বলে একই শোচনীয় অবস্থা!
সত্রাজিৎ বলল, চাল মারিস না৷ ঘুসি মেরে তোর নাক ফাটিয়ে দেব৷
এর কোনও উত্তর হয়! এই কথা শুনে ওর বউ চিনু খিলখিল করে হেসে উঠল৷ আমি তখন বললাম, আমার ড্রেসও ঠিক সভায় যাওয়ার মতন নয়৷ তুমি আগে বললে একটু সেজেগুজে আসতাম৷ ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর, চোখে চশমা তো আছেই— অন্তত বুদ্ধিজীবীর মতন দেখাত আমায়৷
ও বলল, এখন কবিরাও বুশ-শার্ট, প্যান্ট পরে৷ তুই এক কোণে বসে কাবাব, ফিশ-ফিঙ্গার সাঁটিয়ে যাবি৷ স্কচ প্যাঁদাবি৷ কেউ গায়ে পড়ে গলাগলি করতে এলে, শুনে যাবি চুপচাপ৷ মাথা নাড়বি৷ আর মাঝে মাঝে বলবি ‘আমি বিশ্বাস করি না’, ‘আমি আপনার সঙ্গে একমত নই, মাপ করবেন৷’ ব্যস, তাতেই মাতাল পার্টি হড়কে যাবে৷
ওর জিদ চেপে গেছে৷ অগত্যা আমি চিনুকেই জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার বল তো? আমাকে নিয়ে পড়েছে কেন?
চিনুর কথায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হল৷
মিস্টার আর মিসেস-এর নেমন্তন্ন৷ চিনু যেতে পারছে না, ওর পা মচকেছে৷ অথচ বাবুর একজন সঙ্গী চাই৷ যার মাথা ঠান্ডা৷ যে ফেরার সময় গাড়ি ড্রাইভ করবে৷ আপনাকে ও আমার প্রক্সি হিসেবে নির্বাচন করেছে, চিনু বলল৷ আর খিলখিল করে হাসতে লাগল আবার৷ আমি সঙ্গে না গেলে সত্রাজিৎ ককটেল পার্টিতে যেতে সাহস পাচ্ছে না৷ অথচ যাওয়ার খুব ইচ্ছে ওর৷ এক বিখ্যাত পত্রিকার রজত জয়ন্তী৷ কলকাতার গণ্যমান্যদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আসবে না৷ ঢালাও ব্যবস্থা থাকবে, সুন্দরীরা থাকবে৷ এ কনসুলেটের চিপ্পুস ককটেল নয়৷ চিনু হাসতে হাসতে বলল, যান না৷ আপনার গাড়ি এখানে নিরাপদ৷ ওকে গেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে আপনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবেন৷ আমি, এখন নয়, নটা নাগাদ ফোন করে আপনার গিন্নিকে জানিয়ে দেব, বাবুর ফিরতে একটু দেরি হতে পারে আজ, তিনি যেন উদ্বিগ্ন না হন৷
এইখানে চিনুর সঙ্গে আমার বউয়ের তফাত৷ বরাবরই ও বরকে মদত দিয়ে গেছে৷ ওরা দুজনেই জীবন উপভোগ করতে ভালবাসে৷ হাই সোসাইটিতে ওদের নিবিড় মেলামেশা৷ তাই তো সত্রাজিৎ চাকরিতে এত উন্নতি করতে পারল৷ একটার পর একটা চাকরি বদলে বদলে আজ ও টমলিন কোম্পানির সিনিয়র পি আর ও৷ সুপুরুষ চেহারা, দারুণ বলিয়ে-কইয়ে৷ ড্রিংক হোলড করতে পারে৷ সম্প্রতি ওর এক সহকর্মী মোটর দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর থেকে ওই গাড়ি চালানোর ব্যাপারে একটু নার্ভাস, এই যা৷
আমরা তো যথাসময়ে— না, যথাসময়ের এক ঘণ্টা পরে আটটা নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম৷ বড় ব্যাঙ্কোয়েট হল৷ ততক্ষণে তিনভাগের একভাগ ভর্তি হয়েছে৷
ঢোকার মুখেই পত্রিকার স্থানীয় অধিকর্তা তার হেড আপিসের বড়কর্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছে, তার আগেই সে-ভদ্রলোক উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, হাই জিৎ৷ তারপর হাত ঝাঁকিয়ে বলল, একা? চিনু কই?
আমি চিনুর প্রক্সি একটু সিঁটিয়ে গেছি, সত্রাজিৎ ভ্রূক্ষেপ না করে লোকটিতে বলল, ওঃ, কতদিন পর দেখা! এডিটর হয়ে তুমি কাগজকে কোথায় তুলে দিয়েছ!
লোকটি, সাফারি স্যুটপরা এক ছোকরা বলা যায়, যে উঠতি সম্পাদক দিলীপ ধুমে, ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরে গেছি৷ একসময় কলকাতায় কাজ করত৷ এখন কলকাতার সঙ্গে ওর পুরনো বন্ধুত্ব ঝালিয়ে নিতে এসেছে৷
ও বলল, ইমেজ৷ আদর্শ৷ আমাদের পত্রিকা আগে ছিল করমুক্ত ছবির মতো৷ ভাল, কিন্তু হল ফাঁকা যায়৷ আমি সেইটা বদলে দিয়েছি৷ জানো তো, এখন সব কিছুরই হালকা হাওয়ার দিকে ঝোঁক৷ জানো তো, এখন আমার সুনামের চেয়ে দুর্নাম বেশি৷ লোকে কাড়াকাড়ি করে আমার কাগজ কেনে, হাপুশ-হুপুশ শব্দ করে পড়ে ফেলে, তারপর ছিঃ ছিঃ করে৷ কী ছিল আর কী হয়েছে!
সত্রাজিৎ বেশ গুছিয়ে বলল, তুমি পাঠককে বোরডম থেকে মুক্তি দিয়েছ৷
গ্যাসটা খেয়ে গেল দিলীপ ধুমে৷ আমরা সেই ফাঁকে ব্যাঙ্কোয়েট হলে ঢুকে পড়লাম৷ সেখানেও শোরগোল পড়ে যায়৷ হ্যালো জিৎ, হ্যালো জিতু৷ চিনু কই? চিনু কই? তারপর নতুন অভ্যাগত আসতে না আসতে সেই শোরগোল মিলিয়ে যায়৷ আমরা দুই বন্ধুতে একটা কোণে গিয়ে দাঁড়াই৷
ঠান্ডা মেশিনের আরাম, সিগারেট আর অ্যালকোহলের মৃদু সুঘ্রাণ, তার সঙ্গে আহ্লাদজনিত গুঞ্জরনে পার্টি জমে ওঠে৷
ফুটবল মাঠের গ্যালারিতে বসে লোকে যেমন করে খেলোয়াড়দের চিনিয়ে দেয়, সত্রাজিৎ সেইরকমভাবে দূর থেকে আমার সঙ্গে বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক-সাংবাদিকদের পরিচয় করিয়ে দিল৷ ওদের নামেই চিনতাম৷
ওই যে কুমুদ বিশ্বাস, দৈনিক অর্ধসত্যর নিউজ এডিটর৷ ওই সূর্যকুমার বসু৷ বেস্ট সেলার৷ এক নম্বরের ফেরেব্বাজ৷ ওই দ্যাখ, তিনজন মহিলা ঘিরে রয়েছে যাকে— ওদের কারুর বয়েস পঁয়তাল্লিশের কম নয়, বিউটি পার্লার থেকে খুকি সেজে এসে ন্যাকামি করছে— মুখে সিগারেট, লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছে যে, সে হল রূপকমল চৌধুরি৷ ওকে টিভিতে দেখিস তো৷ দ্যাখ দ্যাখ, ওই যে ঢকঢক করে গেলাস খালি করে ঠক করে নামিয়ে রাখল— একমাথা পাকা চুল, চিনতে পেরেছিস নিশ্চয়৷
আমি বলি, কবি রঞ্জন মুস্তাফি তো?
রাইট৷ ওর ওই স্বভাব৷ যা করে, এক নিঃশ্বাসে করে৷
একসময় সত্রাজিৎ বলল, মেঘনাদ রায়কে দেখছি না? ও কি এখন বিদেশে? না, তা হলে কাগজে পড়তাম৷ তৃষ্ণা বসুরায় বিদেশ গেছে আমি জানি, শিকাগোয় তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য বিষয়ে সেমিনার হচ্ছে৷ কিন্তু মেঘনাদ, মেঘনাদ— বলতে বলতে ওর নজর পড়ল আর একজনের ওপর৷ সে হল প্রতীক নন্দী৷ বিখ্যাত, কিন্তু জনপ্রিয় নয়৷ ভেরি পাওয়ারফুল৷ অফবিট নভেলিস্ট৷
সত্রাজিৎ বলল, লেখকদের লেখক৷ দিলীপ ধুমে ওর চারখানা গল্প ইংরেজি করে ছাপিয়েছে৷ ও মাল চেনে৷ মেঘনাদের ইন্টারভিউও ছেপেছে দিলীপ, যাতে ও বলেছিল, কার্ল মার্কস পাঁচশো বছর আগে জন্মালে মানবসমাজ অনেক দুর্গতি থেকে রক্ষা পেত৷ কী একখানা স্টেটমেন্ট, ভেবে দ্যাখ!’ মেঘনাদ পারে৷ ওকে ভাবতে হয় না৷ না হলে একাধারে ডাকসাইটে গ্রন্থকার এবং সাপ্তাহিক কল্পলতার সম্পাদক হতে পারে?
বলতে বলতে প্রতীক নন্দী আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়৷ হাতে গেলাস৷ নিরন্তর দুষ্ট মানুষের প্রতি ঘেন্না পুষে-পুষে ওর মুখ বাঁকা হয়ে গেছে৷ রোগা চেহারা৷ ভেতরের দিকে দু-একটা দাঁত ভাঙা হতেও পারে৷ এক ধরনের লোক থাকে না, সব জায়গায় অন্যায় অনাচার দেখছে, তার প্রতিকার করতে পারে না, না পেরে কেবল কলম ঘষে৷ তাদের কণ্ঠস্বর আস্তে আস্তে ফ্যাসফেসে হয়ে যায়৷ রস শুকিয়ে গেলে যা হয় আর কি৷ প্রতীক নন্দী তাই৷
এসেই বলল, টেরাকোটাকে দেখছি না? টেরাকোটা হল মেঘনাদ রায়ের কোডনাম৷ সত্রাজিৎ জানে৷ আসলে পোড়ামাটির পুতুল, খেলনাপাতি সাহেবরা দুর্মূল্য শিল্পবস্তু বলে কিনে নিয়ে যায়, এই শ্লেষ আছে ওই নামকরণে৷ ওদের দুজনের মধ্যে ভীষণ রেষারেষি৷
প্রতীক নন্দী এক চোখ বুজে ব্লেডের মতো ধারাল হাসি হাসল৷
ওর পাঞ্জাবির পকেটে একটা পাঁইট টের পেয়ে সত্রাজিৎ বলল, এখানে এলাহি ব্যাপার দেখছেন তো৷ পকেটে ভরে মাল আনার দরকার ছিল? তার ওপর স্বয়ং এডিটর আপনার ফ্যান৷ চান তো, এখানে শোয়ার ব্যবস্থাও করে দেবে৷
আমি লেখকের দিকে তাকিয়ে আছি৷ ওর বাঁ হাত পাঞ্জবির পকেটে৷
সত্রাজিতের কানের কাছে মুখ নামিয়ে ও ফিসফিস করে বলল, মাল না, ওতে সায়ানাইড আছে৷
আমি শুনতে পেলাম৷
সায়ানাইড?
— হুঁ, হুঁ৷
কেন?
টেরাকোটার গেলাসে যাবে৷ ব্লেডের ফাঁক দিয়ে ও বলল, আজ দেখব, ওর মধ্যে কতখানি সোনা আর কতখানি খাদ৷ সায়ানাইড ছাড়া এ পরীক্ষা হয় না৷
বলতে বলতে সূর্যকুমারের দিকে এগিয়ে গেল প্রতীক নন্দী৷
আমি বললাম, আজ একটা কেলো হবে এখানে৷ চল, আমরা পালাই৷
সত্রাজিৎ বলল, ধুর! এরা মুখে অনেক কিছু বলে৷
তারপর এক ঢোঁকে গেলাস খালি করে আর একটা তুলে নিল বেয়ারার ট্রে থেকে৷ ককটেল সসেজ ছিল গরম-গরম, আমরা দুজনে টুথপিক বিঁধিয়ে কয়েকটা তুলে নিলাম৷
সত্রাজিৎ বলল, মেঘনাদ আজ আসবে না৷ এখনও যখন এল না৷
আমি বিশ্বাস করি না৷ আমি তোমার সঙ্গে একমত নই৷
আমি মনে মনে বলি, ভয় তুমিও পেয়েছ বন্ধু৷ এখন প্রার্থনা করছ, ও যেন না আসে৷ ও যেন প্রাণে বেঁচে যায়৷
কিন্তু তা বোধহয় হবার নয়৷ একটু পরেই দেখি, পাখির মতো ফিনফিনে বউকে সঙ্গে নিয়ে মেঘনাদ রায় হেলতে-দুলতে ঢুকছে৷ মেয়েদের দল অমনি ছুটে এসে কিচির-মিচির শুরু করে দেয়, এ কী! এত দেরি কেন? আমরা ভাবছি— ও বুঝতে পেরেছি, তোমরা আর কোথাও গিয়েছিলে!
মেঘনাদ ধীরে ধীরে কিন্তু অব্যর্থভাবে হল-এর কেন্দ্রস্থলে গিয়ে দাঁড়ায়৷
রঞ্জন মুস্তাফি ততক্ষণে কয়েক গেলাস গিলেছে৷ ও গিয়ে মেঘনাদকে জড়িয়ে ধরল৷ একটু কি টলে গেল টেরাকোটা? আমি ভাবি৷ কার্ল মার্কস যদি আরও পাঁচশো বছর আগে জন্মাতেন, আমি ভাবি৷ প্রতীক নন্দী গেল কোথায়? ওকে দেখছি না কেন? একসময় সত্রাজিৎও আমার কাছছাড়া হয়ে যায়৷ ও কি খবরটা দিলীপ ধুমেকে জানাতে গেল?
ব্যাঙ্কোয়েট হলে কোলাহলের শব্দমাত্রা ক্রমে ক্রমে ষাট, সত্তর ছাপিয়ে আশি ডেসিবেলে পৌঁছে গেছে৷ ঘড়ি দেখলাম, দশটা পঁচিশ৷ মন্থর মেঘের মতো আড়াই ঘণ্টা সময় কোথা দিয়ে ভেসে চলে গেছে, টের পাইনি৷
আমি ভিড়ের মধ্যে ঘুরতে লাগলাম৷ অনেকেই কোনায়-কোনায় রাখা সোফায় বসে পড়েছে ততক্ষণে৷ ছোট ছোট দলে আড্ডা দিচ্ছে৷ কারুর কারুর সঙ্গে আমার ধাক্কাও লাগল৷ কেন ঘুরছি? কী খুঁজছি, নিজেই মনে করতে পারছি না৷
হঠাৎ সাদা ঢাকনা দেওয়া টেবিলের ওপর কতকগুলো খালি, আধাখালি গেলাসের মাঝখানে একটা পাঁইট দেখতে পেলাম৷ তুলে নিয়ে দেখি তার মধ্যে কিচ্ছু নেই৷ ছিপি খোলা৷ ওদিকে বেয়ারার ট্রে থেকে একটার পর একটা সোনালি রঙের গেলাস নিয়েই যাচ্ছে টেরাকোটা৷ ভ্রূক্ষেপ নেই৷
প্রথমে মাথা ঘোরে, তারপর গা গুলোয়৷ সায়ানাইডের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমি শুনেছিলাম, তারপর বমি হয়ে গেলে ভাল৷ না হলে আস্তে আস্তে জ্ঞান হারিয়ে যাবে৷ অজ্ঞান অবস্থাতেই হার্টের কাজ বন্ধ হয়ে যায়৷ আমি ক্রমাগত ভিড়ের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকি৷ দিলীপ ধুমে গেল কোথায়? ও কি পুলিসে খবর দিতে গেল? আমি দেখতে পাই, প্রতীক নন্দী হাত নেড়ে নেড়ে কুমুদ বিশ্বাসকে বোঝাচ্ছে, ‘সাপ নির্বোধ আর অনুভূতিপ্রবণ৷ সাপ স্মৃতিশক্তিহীন৷ সে বেশিদূর দৌড়তে বা তাড়া করতে পারে না৷ বিপদসঙ্কেত পেলে সে আক্রমণ করে৷ সাপ পোষ মানে না৷ প্রতিহিংসাপরায়ণ হবার ক্ষমতা সাপের নেই৷ এই সব হল বৈজ্ঞানিক সত্য৷ ভুল মিথ্যা প্রচার করে যারা সাহিত্য করে, তারা ধোঁকাবাজ৷’
রূপকমল চৌধুরি বলছে, না, আজ সে গান গাইতে পারবে না৷ এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে, তারপর চোখে পড়ল একটা সোফায় দেহ এলিয়ে মেঘনাদ রায় ঘুমোচ্ছে৷ তার পাশের সোফায় বসে ওর পাখির মতন ফিনফিনে বউটা আর দুজন মহিলার সঙ্গে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে— আমি না, আমি না... পেলেই কিনব৷ কেউ মেঘনাদকে দেখছে না৷
ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মেঘনাদবাবুর কী হয়েছে?
ও বলল, ওইরকম হয়৷ মাঝে মাঝে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে৷ আর খুব টায়ার্ড৷ একটু পরেই জেগে উঠবে৷
তারপর আবার সঙ্গিনীদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল৷ ও একটা কথার শিশি৷
সত্যি, কী পরিশ্রম করতে হয় ব্যস্ত লেখকদের৷ কী অন্তর্দৃষ্টি আর একাগ্রতা নিয়ে মানুষের মন খুঁড়ে খুঁড়ে কাহিনী বুনতে হয়৷ নিজেদের ভেতরটা ঝাঁঝরা হয়ে যায় না! ওর বৌটা কিছু বোঝে? লোকে বলে, ও নাকি ভারি অহঙ্কারী৷ আমি ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম৷ কই, অহঙ্কারের কোনও চিহ্ন নেই৷ আসলে, আমি হয়ত অহঙ্কার না, ওর ঠোঁটের কোণে ফেনা আছে কিনা খুঁজছি— মনে হতেই চোখ সরিয়ে নিই৷
আমি বিপন্ন বোধ করলাম৷ ইচ্ছে হচ্ছিল, দু হাত তুলে চিৎকার করি, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, আপনারা কি জানেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যে এখানে একটি হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে? এবং সেই খুনিকে আমি চিনি? আপনারা তুরীয় জগৎ থেকে একবার বাস্তবে অবতরণ করবেন দয়া করে, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন? এর প্রতিবিধান করবেন?’ কিন্তু কে শুনবে?
কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে নবকুমারকে তার সঙ্গীরা যখন পরিত্যাগ করে চলে যায়, তখন নদীতীর ত্যাগ করে সে বহুক্ষণ বালুকাস্তূপের চতুঃপার্শ্বে ভ্রমণ করেছিল অন্ধকার রাত্রে৷ শেষে তাকে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, শীত, সমুদ্রগর্জন ও হিংস্র পশুর ভয় থেকে উদ্ধার করে কাপালিক বলেছিল, মমানুসর৷ নাকি, মামনুসর৷ আমাকে অনুসরণ কর৷
ঠিক তাই ঘটল আমার বেলাতেও৷ এতক্ষণ পর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল সত্রাজিতের৷ কনুই দিয়ে পিঠে খোঁচা মেরে বলল, এখানে হাঁ করে কী দেখছিস? চটপট একটা প্লেট নিয়ে আয়৷ খেয়ে নে৷ দেখলাম, তার হাতে খাবার ভর্তি প্লেট৷ কাঁটায় আটকানো মাংসের টুকরো৷ মামনুসর৷
আর অমনি ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে উঠে বসল মেঘনাদ রায়৷ ওর চোখ দুটো টকটকে লাল৷ পাশে বসা বউকে ডেকে বলল, এই, আমায় খেতে দাও, খিদে পেয়েছে৷ দেখে তো আমি হতভম্ব৷
আমি খেতে খেতে ওর খাওয়াও দেখতে লাগলাম৷ বেশ স্টেডি৷ ভাবলাম, আশ্চর্য, হুইস্কির সঙ্গে সায়ানাইড কি হজম করে ফেলল? খাঁটি সোনা নাকি, সম্পাদক-কাম-বিখ্যাত সাহিত্যিক বিদেশ থেকে লিভারে স্টিল জ্যাকেট পরিয়ে এনেছে?
ফেরার পথে আমার হাতে স্টিয়ারিং৷ বেশ রাত হয়েছে৷ রাস্তা ফাঁকা৷ পাশে বসে সত্রাজিৎ কী সব বিড়বিড় করছে, বোঝা যায় না৷ আমার মাথায় একফোঁটা নেশা নেই৷ — ব্যাপারটা কী হল, বল তো? আমি জানতে চাই৷
— কীসের ব্যাপার?
— ওই যে সায়ানাইড? প্রতীক নন্দী পকেটে করে এনেছিল?
— ব্লাফ! ও শালা একের নম্বরের গুলবাজ৷
সত্রাজিৎ জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, অবচেতন কাকে বলে জানিস? অবচেতন? ও শালা সবসময় অবচেতনে থাকে৷ ওকে বিশ বছর ধরে চিনি আমি৷ ও একটা অসুখ৷ ওই অসুখ ভাঙিয়ে লেখে শালা৷ কী যেন একটা ইংরেজি নাম আছে অসুখটার৷ তুই জানিস?
আমি বলি, স্কিজোফ্রেনিয়া?
উত্তর না দিয়ে ও আবার বিড়বিড় করতে থাকে৷ করুক গে৷ ভালয় ভালয় এখন ওকে গেটে ঢুকিয়ে দিতে পারলে আমি বাঁচি৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন