কুসুমা

অশোক দাশগুপ্ত

খামের ওপরে প্রেরকের নাম ছিল, বিমল ওরাওঁ, সাং কুসুমা, ডাক- বিশপাহাড়ি VIA মইষানী, থানা- মানবাজার, জেলা- পুরুলিয়া৷ চিঠিটা আসতে বেশ দেরি হয়, কেন না বিমল লিখেছিল ‘মাধব দস্তিদার স্ট্রিট’, হবে ‘মাধব পোদ্দার স্ট্রিট’৷ কলকাতা-৯ সঠিক লেখা ছিল৷ তারপর ওর নামের নিচে ‘সাংবাদিক— অগ্রগতি’ লেখা ছিল৷ ‘অগ্রগতি’ কাগজের সাংবাদিক হিসেবেই ও প্রথমবার মানবাজার-টু অঞ্চলে গিয়েছিল৷ শুধু সাংবাদিক নয়, চিত্র-সাংবাদিক৷ ‘গ্রুপ’ ক্লাবের প্রদর্শনীতে ওর ফটোগুলি খুব প্রশংসা পায়৷ কলকাতার পথের দৃশ্য ওর ছবিতে একটা নতুন ডাইমেনশন পেয়ে যায়৷ তারপর শুরু করে ফটো-জার্নালিজম৷ এখন ও তিনটি কাগজে লেখে সচিত্র-সংবাদ (দুটি বাংলা, একটি ইংরেজি)৷ তবে ‘অগ্রগতি’-ই ওকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, এবং দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন সচিত্র-সংবাদে ওকে প্রভূত সস্নেহ মদত দেয়৷ ‘অগ্রগতি’কে ও বলে আমার প্রথম ভালবাসা৷ বউ এ নিয়ে অজস্র খুনসুটি করে৷ করতেই পারে৷ প্রেম পুরনো, বিয়ে টাটকা৷ দুজনে দুজনের মধ্যে খুব নিমজ্জিত এখনও৷

— তোমার কুসুমার চিঠি এসেছে৷

— দেখি৷

এ সময়ে ‘কুসুমা’ নামটি ওর মনে অস্বস্তি জাগায়৷ মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে, মুর্শিদাবাদে এক মরা নদীর সোঁতা থেকে যে বৃহৎ পাথুরে গণেশ মূর্তি মিলেছে, যা গ্রামবাসীরা পুজো করতে শুরু করেছে, তার পাদপীঠে ‘রাজা কর্ণদেব’ লেখাটি বিষয়ে ও সহৃদয় সচিত্র-সংবাদ লিখবে৷ এই গণেশের চার হাতে অস্ত্র, গজচক্ষু অতি নির্মম এবং দেবতার যোদ্ধা মূর্তি৷ প্রত্নতত্ত্ব কিছুদূর পড়েছিল৷ অতএব ওই যোগ্যতম হবে৷

দেখেছিল, ও দেখেছিল কাগজে সংক্ষিপ্ত সংবাদ৷ গ্রামের খবর বড় কাগজ তেমন বিশদ দেয় না৷ গ্রামের জীবনমরণ সংবাদ বড় কাগজে বড় খবরের নিচে স্যান্ডুইচ হয়ে যায়৷ কাগজে সংক্ষেপে লিখেছিল, ‘মইষানী গ্রামের সমাজসেবী অর্জন মহান্তিকে হত্যার পর সমাজবিরোধী দুষ্কৃতী খেলন সিং সর্দার ও আগন কিসকু পুলিসের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে নিহত৷ অঞ্চলটি বিক্ষুব্ধ৷ আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মইষানীতে মইষানীতে অস্থায়ী পুলিস চৌকি বসেছে৷’ এ সব খবর পুরুলিয়াতে বসে দেবদত্ত মাস্টারই দেয় বলে ওর বিশ্বাস৷ ক’টা বড় কাগজ আর জেলা শহরে শহরে নিজস্ব প্রতিনিধি রাখে? দেবদত্ত মাস্টার স্থানীয় সংবাদ দেয় একটি কাগজে৷ মাস্টারি করে, চাষবাস ও সারের ব্যবসা আছে৷ মানবাজার-টু অঞ্চলে ও যায় না৷ খবরাখবর আনার জন্যে থানায় থানায় ওর যোগাযোগ আছে৷ দেবদত্তের খবরে নিহত লোকেরা সাধারণত ‘উগ্রপন্থী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সমাজবিরোধী বা দুষ্কৃতী’ হয়ে থাকে৷ এভাবে খবর দিলে স্থানীয় অঞ্চলে নিজের নিরাপত্তা থাকে৷

ও খবরটা দেখেই বুঝেছিল, কুসুমা আবার কলকাতার কাছে আসবে৷ ওর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়বে, সেটা ও চাইছিল না৷ কিন্তু চাওয়া-পাওয়া তো মেলে না আজকাল৷ এখন একটা উত্তম-সুচিত্রায় আগ্রহ দেখা যাচ্ছে৷ ‘চাওয়া-পাওয়া’ ছবিটি, সুযোগ পেলেই ও বউকে দেখিয়ে আনবে৷ ওর বউ মাত্র আটষট্টি সালে জন্মেছে৷ ও বড় হতে হতে বাংলা ছবির উজ্জ্বল দিনগুলি অস্ত গেছে৷ বউয়ের জন্যে ওর কষ্ট হয়, মমতা হয়৷ ভাবা যায়, সাতাত্তরে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এল যখন, ও বেচারা ক্লাস থ্রি-তে পড়ছে? শালপাতার ঠোঙায় শিঙাড়া বেচতেও দেখেনি৷

চিঠিটা হাতে নিয়ে ও বউকে বলে, কুসুমা গ্রাম থেকে লোক আসবে৷ ওদেরকে যত্ন করো, জানলে? আমাকে ওরা খুব যত্ন করেছিল৷

— ক’দিন থাকবে?

— দু-একদিন তো থাকতেই পারে৷

— কলকাতা বেড়াতে আসছে?

— না...বেড়াতে নয়...

— তোমার কাছে? সেই তুমি ওদের কথা লিখেছিলে, তাই না? আবার যেতে বলবে৷

— তাই মনে হয়৷ দেখা যাক৷

— বড় বাসন বলতে নেই৷ ভাতের হাঁড়িটা...

— মাসিমার কাছে চেয়ে নাও৷

— শোবে কোথায়?

— এখানেই৷ বেতের সোফা ঠেলে ঠুলে...

না৷ সব কিছু বড্ডদু’জনার মাপে এ বাড়িতে৷ একটি শোবার ঘর, একফালি বসার ঘর, এতটুকু বাথরুম৷ কিন্তু চারশো টাকায় এ বাড়ি তো এখন পাওয়া যাবে না৷ ও দশ বছর আগে ঢুকে পড়েছিল বলে বেঁচে গেছে৷ তখন বয়স ছিল একুশ, এখন একত্রিশ৷

কুসুমা কলকাতা থেকে অনেক, অনেক দূরে৷

প্রথমবার ও কুসুমা গিয়েছিল শীর্ণকায়া ক্ষীণস্রোতা চাকা ও কুমারী নদী সঙ্গমে টুসু পরব দেখতে৷ পুরুলিয়া শহরে ও কলেজের বন্ধু, শহরে ওষুধ দোকানি সুদীপ্তর বাড়িতে মাংস-ভাত খাচ্ছিল৷ ক্যাসেটে টুসু ও ভাদু শুনছিল৷ সায়েন্স সেন্টারে টুসু-ক্যাসেট দেখছিল৷ সুদীপ্ত বলল, পুরুলিয়া দেখতে চাও তো মানবাজার-টু যাও৷ ঠাকুরদাস রাজোয়াড় মইষানী যাবে, ওর সঙ্গে যাও৷

— খুব সুন্দর?

— স্বচক্ষে দেখ৷

ঠাকুরদাস রাজোয়াড় বলেছিল, মানবাজার-টু জিলার ম্যাপে নাই৷ আর কুসুমা, দাড়কা, বরাকাটা, মানবাজার-টু’র ম্যাপে নাই৷ সদরে কেউ আমাদের আমল দেয় না৷ আমরা তো নাই-মানুষ৷

ওর মনে হয়েছিল এটা কথার কথা৷ কিন্তু মানবাজার পেরোবার পর ওর সন্দেহ থাকেনি যে, এ জায়গা ভূগোলের বাইরে৷ পথ বলতে প্রান্তর, হাওয়ার নাম তীব্র শীত, ছোট ছোট পাহাড়, ডুংরি, কিছু গাছ৷ সবটাই ধু-ধু৷ দোকান, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শ্যালো-সেবিত খেত, গ্রাম, কিছুই চোখে পড়ে না৷

ঠাকুরদাস রাজোয়াড় ওকে কুসুমা নিয়ে যায়৷ ওরাংদের গ্রাম বটে৷ ওরাং পাড়াটাই বড়৷ ঠাকুরদাসের বাবা রক্তপত্র কুসুম গাছের বন দেখেছে৷ তখন এখানে লাক্ষা চাষ হত৷ কুসুম গাছ থেকে প্রাপ্ত লাক্ষা খুব উঁচুমানের৷ পলাশ গাছের লাক্ষা সে তুলনায় নিরেস৷ ঠাকুরদাস যখন কিশোর বালক, তখনি ‘জমিদারি চলে যাবে’ জেনে জমিদার ও রাজারা বন-কে-বন কেটে গাছ ও জমি বেচে দেয়৷ এ কুসুমা এখন কঙ্কাল হয়ে গেছে৷ মাটির হাড় বেরিয়ে গেছে৷ দেখুন কেন? মইষানী মায়ের মাহাত্ম্যও আর নেই৷ পঞ্চায়েত করল বটে গরমেন, মইষানী মা-ও পঞ্চায়েতের হাতে জব্দ৷

রাজোয়াড় বলে৷ মহিষ বলি যদি বন্ধ, তবে মইষানী মা-র পেট ভরে কীসে?

রাজোয়াড়ের গায়ে টেরিকটের দীর্ঘ না-কাচা দুর্গন্ধ পাঞ্জাবি, পায়ে টাটার মুচির তৈরি মোশিনদার জুতো, হাতের ঘড়ি দেখে ওর মনে যদি-বা সন্দেহ উঁকি দিয়ে থাকে, রাজোয়াড় তা ধরে ফেলে৷ তিন পুরুষে এক ব্যবসা৷ জঙ্গল ডাকো, গাছ কাটো৷ এখন জঙ্গল নেই, ধানের ব্যবসায় আছে ও৷ কিন্তু কাগজের লোক এসেছেন যখন, তখন দেখে যান, লিখুন৷

কুসুমা মানবাজারে নাই, মানবাজার পুরুলিয়ায় নাই, পুরুলিয়া রাজ্যে নাই, তবে আমরা নাই-মানুষ বটে?

চাকা ও কুমারী নদীর সঙ্গমে টুসু ভাসান ছিল আশ্চর্য রমণীয়৷ নিচু পাহাড়, শীর্ণ নদী, মাঝে মাঝে গাছ৷ এ জায়গা যে কোনও অরণ্যভূম হতে পারত৷ রাজোয়াড় ওর আসার উদ্দেশ্য বিবৃতি করে৷ বলে, শহর হতে মানুষ এলেই মন্দ হয় না৷ মন্দ হলে সুদীপ্তবাবু পাঠাত না৷ লে বিমল! কি করবি কর৷ দেখে নিন৷ এটা হয় বিমল ওরাং, এটা ওর বোন সুনীতি! ইনি উত্তম সিং সর্দার, ভূমিজ বটেন৷ তা কাকা! খেলনটার সংবাদ পেলে কি বা?

শীর্ণ দেহে, মাথায় পগ বাঁধা উত্তম মাথা নেড়েছিল৷

— আর সে ঘরে থাকে? যায় আসে, আসে যায়৷

বিমল ওরাংয়ের চুল কটাশে, মুখ সলজ্জ হাসি মাখা৷ রাজোয়াড় বলেছিল, ইস্কুল একটা চালাচ্ছে, তা সরকার মজুরি দেয় না৷ ওর ঘরেই থাকবেন আজ্ঞা৷ বিমল রে! আমি চাল, গুড়, আলু দিয়ে যাব৷ বাবুকে খাওয়াস৷

বিমল ওকে অবাক করে বলেছিল, চাষজমিতে ইটভাটা আপনি লিখেছিলেন, আমি পড়েছি৷ সে বীরভূমে, নয়?

মানবাজার-টু অঞ্চলে দুটি প্রাচীন জলধারার সঙ্গমে, তীব্র ও হা হা বাতাস ও টুসু বিদায়ের সঙ্গীত শুনতে শুনতে ‘আমি পড়েছি’ কথাটি ওর মনের দরজায় ঘা দেয়৷ নিমেষে ওদের মধ্যে তখনকার মতো গভীর কামারাদোরি স্থাপিত হয়৷ সুনীতি, বিমলের বোন বলেছিল, ফটো তুলুন৷

সুনীতির হাসি মুখ, বিমলের মতোই কটাশে চুল৷ পরে ও দেখে, কুসুমার মানুষজন, বিশেষ করে তিপ্পান্ন ঘর ওরাংদের চুল পিংলা৷ বিমল বলেছিল, ইটভাটায় কাজ, চুল জ্বলে যায়৷ — তারপর মাচায় রক্ষিত টিনের বাক্স থেকে তাড়াবন্দী কাগজ বের করে কুণ্ঠিত গলায় বলেছিল, ‘সব আমাদের৷ ভূমিজদের, রাজোয়াড়দের, তিন ঘর মাহাতোদের জমি, জানেন? সবই আপার কাস্ট লোকরা, নিয়ে নিয়েছে৷ আইন করেছে সরকার, কিছু তো হয় না৷

‘মূল দাতা, মূল গ্রহীতা, দাখিল কোবালা, দাগ নং, পূর্বাধিকার বশে, রায়তী’, এমন সব অচেনা শব্দে হারিয়ে যায় ও৷ সবিনয় অস্বস্তিতে বলেছিল, ‘জমির ব্যাপার আমি কিছু বুঝি না৷ সুদীপ্তকে জিজ্ঞেস করব,— তারপর জানাব৷ কলকাতায় এলে বরং...’

জমি তো পুরুলিয়ার৷

— দেখব জিজ্ঞেস করে৷

বিমল ঈষৎ হেসে বলেছিল, হবার নয়, জানলেন?

ও বুঝিয়েছিল, আইনের পথেই যেতে হয়৷ প্রশাসনকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হয়৷ সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা অতীব পচা, ঘুণ ধরা৷ তবু সিস্টেমকে ব্যবহার করা ছাড়া কি উপায় আছে? এ সব নিয়ে তো কোনও আন্দোলন নেই...

বিমল তৃষিত আগ্রহে ওর কথাগুলি শুনেছিল৷ নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিল, লেখাপড়া সামান্য আমার আছে, বুদ্ধি দেওয়ার লোক নেই৷ তেমন হলে রাজোয়াড়ের কাছে যাই৷ ওই বা কী করবে৷

পঞ্চায়েত সদস্য বটে, তবে বিরোধী রাজনীতি করত, কেউ বিশ্বাস করে না৷

— কুসুমার কথা মনে থাকবে আমার৷

বিমল ওর দিকে চেয়ে অসীম মমতায় বলেছিল, আপনারা গ্রাম দেখেন না, দেখলে কষ্ট পান৷ কুসুমার কথা কেউ শোনে না৷ কুসুমা যেন মানবাজারে নয়৷ মানবাজার-টু যেন পুরুলিয়ায় নয়৷ পুরুলিয়া যে এই রাজ্যে, তাও তো সরকার ভুলে আছে৷ নইলে গ্রামের পর গ্রাম৷ একটা কুয়া দেয় না!

সুনীতি বলেছিল, এবার তোরা খা দাদা৷ আমার ঘুম লেগেছে৷ রাত কত হল দেখিস না?

পরদিন ও চলে আসে৷ সুনীতি বলেছিল, মাঘ মাসে আসবেন, পিঠা খাওয়াব৷ মুড়ির চাকা!

— আসব৷

কিন্তু সামনে থাকলে বড় বেদনার মতো প্রাণে বাজে কুসুমা৷ কলকাতা চলে এলে সব অলীক হয়ে যায়৷ পথ নেই, জল নেই, পাহাড় ডুংরি, দুটি প্রাচীন জলধারার সঙ্গম, টুসু ভাসান, একদা কুসুম গাছের বন ছিল, এখন শ্মশান যেন, অবাস্তব মনে হয়৷ পশ্চিমবঙ্গ নয় ওটা৷ নাই-মানুষদের দেশ৷

কলকাতা, আরও আরও অ্যাসাইনমেন্ট৷ এর মধ্যে বন্ধুর বোনকে বিয়ে করে ফেলল৷ প্রেম আগে, বিয়ে পরে৷ আর ওর বউ যখন গানের দলের সঙ্গে রেডিওতে গাইছে, চির নূতনেরে দিল ডাক, সে সময়েই বিমলের চিঠি আসে, একবার দেখে না লিখলে কিছু হবার নয়৷

আজ মনে পড়ে, সে চিঠিতে বিমল ‘মাধব দস্তিদার স্ট্রিট’ লিখেছিল৷ এবার ভুল করল কেন কি ভাবে? সম্ভবত মন অস্থির ছিল৷ বিমলের হাতের লেখা খুব সুন্দর৷ ‘বাংলায় কপি লিখুন’ বই থেকে ও সযত্নে মকশ করে করে হাতের লেখা উন্নত করেছিল৷

বউয়ের গান শুনে, বউকে বাপের বাড়ি রেখে ও পুরুলিয়া চলে আসে৷ ঝাড়গ্রাম-ঝিলিমিলি-রামায়ণ-মিনিবাস-বিশপাহাড়ি ঘুরে তবে কুসুমা৷ প্রখর তপন তাপে খুবই কষ্ট হয়৷ পুড়তে পুড়তে আসা৷ সিনেমায় দেখা অদ্ভুত যোগাযোগের মতো বিশপাহাড়িতে আবার ঠাকুরদাস রাজোয়াড়ের সঙ্গে দেখা হয়৷ ঠাকুরদাস ওকে মুদির বাড়ি নিয়ে যায়৷ আমার কুটুম্ব বটে! সেখানে ইঁদারার জলে স্নান করে, গুড়ের শরবত খায়৷ তারপর ডাল ও পোস্তবড়া দিয়ে মুড়ি৷ ঠাকুরদাসই ওকে বিশপাহাড়িতে আটকে রাখে৷ খরাপোড়া অঞ্চলে রাতে চলাফেরা করা নিরাপদ নয়, কে ডাং মেরে সাইকেল, ঝোলা নিয়ে নেবে৷

বিশপাহাড়ির নাকি ব্যবসায়িক গুরুত্ব আছে৷ বিশ বা ততোধিক নাতিউচ্চ পাহাড়ে অত্যুৎকৃষ্ট পাথর মেলে৷ সেগুলি লিজ নিয়ে যশপাল কোম্পানি (রাঁচি-কেন্দ্রিক) পাথর কাটায়, লরিতে নিয়ে যায়৷ এ জন্য পথ যোগাযোগও আছে৷ বাইরের লোক আসে যায়৷ ডাং মেরে লুটতরাজ খুব বেড়েছে৷

রাজোয়াড় বলে, ফাঁড়ি নেই, থানা নেই৷ চোর-ডাকাতের চাষ খুব৷ হবে না কেন? মানবাজার-টু তো জেলার ম্যাপে নেই৷ আর জেলাটা রাজ্যের ম্যাপে ঢুকাতেই পারল না কেউ৷ শুনছি, এ বছর কত কোটি টাকা জেলায় এসেছে, জল দেবে৷ কে দেবে?

ওর কুটুম্ব মুদি বলে, ঘুম যান৷ এ সময়ে কথা থেকে আগুন লাগে বেশি৷ মইষানী মা গো! বলে ও ঘুমিয়ে পড়ে৷

গতবার এক কুসুমা দেখেছিল, সেও উৎসবের শেষ প্রহরে৷ এবার যে কুসুমায় প্রত্যুষে ঢোকে ও, তার গা থেকে সবুজের সব চিহ্ন নিঃশেষ৷ পাহাড়ডুংরির চেহারা আদিম৷ গাছগুলি নিষ্পত্র কঙ্কাল৷ রাজোয়াড় বলে, খরা বছর বছর৷ এমন খরা...

ছোট ছোট খেতে কিছু ধানগাছ খড় হয়ে আছে৷ বিমল ঘর থেকে বেরিয়ে আসে৷ বলে, চলেন, ওঠান ছবি৷ — বিমলের ঘরেই বসে অর্গানাইজিং স্কুল৷ ঘরের ফাটা-চটা-দেওয়ালে পরিবার পরিকল্পনার পোস্টার সাঁটা, ছবি তুলুন৷ প্রাথমিক অননুমোদিত বিদ্যালয় (১৯৭৪) ছবি তুলুন৷ ওই দেখুন, চাকা আর কুমারীর মিলন ওটা৷ মেয়েরা বালি কেটে জল নিচ্ছে৷ আর দেখুন মেয়ে পুরুষ সব জল নিয়ে আসছে৷ ফটো উঠান৷ আসুন৷ টিলায় উঠুন৷

টিলায় উঠে ও মরীচিকা দেখেছিল৷ শেষ বৈশাখের সূর্য জ্বলতে জ্বলতে পুব আকাশে উঠছে৷ প্রান্তরের ওপারে এক কাকচক্ষু দিঘি৷ শ্যালো-সেবিত সবুজ ধানখেত৷ এক ইউক্যালিপটাস বাগান৷ ফাঁকে ফাঁকে কাঁচা পাকা ঘর৷ মন্দিরের চূড়া৷ আরও দূরে পশ্চিমে ইটভাটা, গ্রাম থেকে দূরে৷

— ফটো উঠান৷ ওই বাগান পর্জন্যবাবুর৷ ওটা মইষানী৷ ওই দিঘি তার নিজের৷ ওতে ভূমিজ-ওরাং সাত জাতের দু’পয়সা থেকে সওয়া চার আনা অংশ আছে৷ উনি মানে না৷ দিঘির জল... ধরতে দেয় না৷ শেষ প্রহরে মেয়েমানুষ জল আনে৷ আর রাতে যেয়ে চোরের মতো স্নান করে৷

— ওই জলে...

— খাই৷ রাঁধি৷ বালির বুকেও এ বছর... নামুন৷

নেমো ওরা চাকা ও কুমারীর ‘মেলন’ থেকে কিছু দূরে শুকনো কাঁসি ঘাসের ঝোপ দেখেছিল৷ একটি ফলক৷ বিধানসভার সদস্য ১৯৮৪ সালে সেতু নির্মাণ সূচনা করলেন৷

— ফটো উঠান৷ গরমে শুকনা, বর্ষায় ঢলকা বান, এপার-ওপার করা যায় না৷ লিখে দেবেন এই সেতু এগারো লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়ে গেছে৷

— কোথায় সেতু?

— হাতই পড়েনি৷

তারপর সনিঃশ্বাসে বলে, বিশপাহাড়িতে আরেকটা প্রাইমারি করে দিল৷ কুসুমার স্কুলটা অনুমোদন করল না৷

রাজোয়াড় বলল, পর্জন্যবাবুর খেলা!

— পর্জন্যবাবু কি এম এল এ?

বিমল শুকনো গলায় বলে, এমেলে, এম পি, মানবাজার টু-তে ঢুকে না৷ ক্ষমতাও রাখে না৷ মন্ত্রীও ঢুকে না, কোনও ক্ষমতাও রাখে না৷ পর্জন্যবাবু প্রাইমারি পাস করে নাই, স্কুলের কথা শুনে না৷ সে পঞ্চায়েত প্রধান ছিল, বর্তমান অঞ্চল প্রধান শশধরবাবু ওরই জ্ঞাতি৷ সে শিখণ্ডী৷ ছড়ি পর্জন্যবাবুর হাতে৷

— চলুন... সব লিখে নিই৷

— আর কী লিখবেন?

রাজোয়াড় বলে৷ পর্জন্যবাবু পনেরো বছরে চারবার দল বদল করল৷ এখানকার মানুষ বলে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী দূরে থাক৷ আমাদের রাজাবাদশা পর্জন্যবাবু৷ ঠিকই বলে৷খুন-জখম— পরের জমি দখল— পঞ্চায়েতের টাকা লুট, কী করে না সে? থানা যার বশে, তার ক্ষমতা....

ও নোট নিচ্ছিল৷ ছবি তুলছিল৷ তারপর গ্রামের পাঁচজনকে ডেকে সব শুনবে, কেউ আসছিল না৷ বিমল বলল, সন্ধ্যার পর আসবে৷

সন্ধের পর আরও পাঁচ-সাত জনই এল৷ সকলে উত্তম সিং সর্দারের দিকে বারবার চাইছিল৷ বিমলই কথা বলল৷

— কুয়া নাই, খাবার জল মিলে না৷

জমি তো সকলেরই গিয়েছে৷ যাও বা কিছু আছে, চাষের জন্য বাঁধ (পুকুর) দিত, কুয়া দিত...

— মইষানী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার থাকে না৷ বিশপাহাড়িতে যেতে হয়, তা ডাক্তার আছে তো ওষুধ নাই৷ এই খরার পর বর্ষা নামলে খালখন্দের জল খাবে আর পেটের রোগ৷

রোগা, অসহায়, বিপন্ন মানুষগুলি৷ সুনীতি এক সময়ে একটি কলসি ও ঘটি রেখে যায়৷ উত্তম সিং সর্দার এখন বলে, কুসুমাকে কিছু দিতে দিবে না পর্জন্যবাবু৷

ভীষণ কোনও দুঃসংবাদ দিচ্ছে, এমন গলায় বৃদ্ধ হলদেটে চোখ দুটি ওর চোখে রেখে উত্তম বলে৷ নাই-নাই-নাই আর চাই-চাই-চাই, এত অধজ্জ হঞে হামার বেটা খেলনটো বিশপাহাড়ির আগন কিসকুর সাথকে যেঞে সবুজ ঝান্ডাটা উঠাইন দিল, তা আর কিছু দেয় গরমেন? একান্ন ঘর ওরাং, সাত ঘর ভূমিজ, তিন ঘর রাজোয়াড়৷ তিন ঘর মাহাতো, চার ঘর মাহালি, আটষট্টি ঘর হামরা, পজ্জন্যবাবুর চক্ষে হরা ঝান্ডা হঞে আছি৷ ভুট উনদের দিই৷ তবুও...

বিমল বলল, খেলন তো গ্রামে আসে না৷ সে যখন ঝাড়খণ্ড করে নাই, তখন ক’টা কুয়া দিল? পঞ্চায়েত হতে কাকে কাজ দেয়?

— আরেলিজিপিতে কাজ দেয় না?

— না৷ ওর ইটভাটা৷ ওর খেত, সেখানে খাটি৷

— আপনিও?

বিমল নিরানন্দ হেসেছিল৷

— স্কুল করতে যেয়ে আমি ওর বিষচক্ষে আছি৷ কাজ দিলে করি৷ নইলে বিশপাহাড়ি যাই৷

— পর্জন্যবাবু... কাল যাব একবার৷

— এখন ডরায়৷ খেলন ওর ইউক্যালিপটাস বাগান কেটে দেবে৷ আগনরা তো বন্দোয়ানে যেয়ে ‘জঙ্গল বাঁচাও’ কমিটি করেছে৷ এসবই ওর কথা৷

রাজোয়াড় বলল, লিখে কিছু হবে?

ও বলতে পারেনি, ‘কলম তরবারির চেয়ে ক্ষমতা ধরে’৷ বুঝেছিল, পঞ্চায়েত গ্রামে গ্রামে ক্ষমতা ও অর্থের ফোর্টনকস তৈরি করে ফেলছে৷ তবু, তার হাতিয়ার তো ক্যামেরা ও কলম৷ তাছাড়া, প্রশাসনিক প্রতিকার চাওয়া ছাড়া কী উপায় আছে?

— চেষ্টা তো করতে হবে৷

রাতে সুনীতির বেড়ে দেওয়া ভাত ও খেসারি চচ্চড়ি খেতে ওর মাথা কাটা যাচ্ছিল৷ বিমল বলল, ভাববেন না৷ আমিও কাজ করি, বিশপাহাড়িতে ডাকঘরের সামনে বসি৷ আজকাল লোনের ফর্ম ভর্তি করার কাজ পাই৷ সুনীতিও রোজগার করে৷

— ইটভাটায়?

— হ্যাঁ, ওরা বহেলা৷ মাটি বয়৷

— বাড়িতে আপনারা দু’জন?

— আপাতত তাই৷ সুনীতির বিয়ে হয়ে গেলে.... চটপট খেয়ে নিন৷ কেরোসিনের লন্ঠন বেশিক্ষণ জ্বালানো... তেল পোড়ানো... আমরা কোথায় আছি তাই ভাবি! স্নান করবেন?

— কোথায়?

— চুরি করে, ওই বাঁধে৷

রাতে ক্ষেত্রপাল ওরাংকে ডেকে নিয়ে তাকে ঝোলা পাহারায় রেখে গামছা পরে স্নান করার স্মৃতি এখনও সজীব৷ চিত সাঁতার দিতে আকাশ যেন নেমে এসেছিল তারা ছেটানো চাদর উড়িয়ে৷ আর বাড়ি ফিরতে সুনীতি ওকে অবাক করে দিয়েছিল খোঁপায় একটি সাদা পদ্ম দেখিয়ে৷

— পদ্মফুল?

— ভাটা হতে আসতে চানটা করে নিলাম, পদ্ম তুলে আনলাম তখনই৷

— এখন তো পদ্ম ফোটে না?

বিমল বলেছিল, এখানে ফোটে৷ গরম কালে এমন ছোট ছোট পদ্ম ফোটে৷ গেঁড় থেকে হয়ত৷ একটা গেঁড় কোনও মতে বাঁধে পড়ল তো বাঁধ যতদিন, পদ্ম ততদিন৷

সকালে পর্জন্যবাবুর বাড়ি, সে আরেক অভিজ্ঞতা৷ ঘরে দোরে বর্বর ঐশ্বর্যের সব নিদর্শনই ছিল৷ দেওয়ালে লেনিন মার্কসের সঙ্গে তারকেশ্বরের শিব ও দিল্লির পার্লামেন্ট ভবনের ছবি৷ টেবিলে টেলিভিশনের খোল৷ পাশের ঘরে নানা মাপের বস্তা, সব মাল বোঝাই৷ কিন্তু দরজাটি কাঠখোদাই৷ নানা নকশা উৎকীর্ণ, অতি সুন্দর৷

বিমল আর ঠাকুরদাসকে পর্জন্যবাবু বলে, কলকাতার রিপোটার, রাখলে কোথা, খাওয়ালে কী! তোমরা আমার কত বেইজ্জত করবে তাই ভাবি৷ বসুন৷ তোমরাও.... বোস৷

ও কুসুমার কথা বলতে শুরু করতে পর্জন্যবাবু ওকে চমকে দিয়ে গর্জে ওঠে, ব্রিজ করার আমি কংরেস করতাম, বলতে পারব না৷ আর ওসব কথা আমি জানি... এখানে আমি ছাড়া কেউ কাজের গতি বোঝে না৷

— আর এল ই জি পি-র কাজ এরা পায় না কেন?

— ওই যে ভামভেকুড় অর্জনটা অঞ্চল প্রধান হয়েছে৷ তাও কুসুমাকে ভুলিনি আমি৷ এবারে কুয়ো একটা কেন, দুটো দেব৷ আর চাকা নদীর জোড়বাঁধটা.....

বিমল বলে, সার! আপনি তো সেদিনও ছিলেন...

— আমি তো পাবলিকের কাজ করি৷ দাড়কা, বরাকাটা, কুসুমবনি, পেঁড়ারা, এসব গ্রামকে দিয়ে থুয়ে... আর বিমল! ইস্কুল ইস্কুল করে মেতে রইলে, চৌকিদারি কাজ তোমাকে দিতে চাইনি? তুমি বললে, বোন একলা থাকবে৷ সব্বনাশটি করল খেলন! ও হো হো হো! আমার কাছে ধান বাড়ি নিয়ে তোর বাপ খায়৷ আর তুই!

— উত্তমের জমিটা যে থাকল না৷

— সে উত্তম আদালতে যাক৷

ও তাড়াতাড়ি বলে, মইষানী তো বড় গ্রাম৷

— হ্যাঁ, হ্যাঁ, পাহাড় ক’টা লিজ নিতে পারলে মইষানী টাউন হয়ে যাবে৷ ভেরি ব্যাকওয়াড যাকে বলে৷

— মন্দিরটাও সুন্দর৷

— পাঁচ সাত হাজার বছরের মন্দির! মা মইষানী বুনো মোষ চেপে ঘুরত৷ সাক্ষাৎ দুর্গা৷ এখানে যে যা চায়... আগে মহিষ বলি হত, এখন অষ্টমীতে পঞ্চাশটা পাঁঠা পড়ে৷ আমরা সেবাইত বটি৷ আমাদের যা, সবই ওঁয়ার৷ নিন৷ চা খান৷ বিমল নে, খাও হে রাজোয়াড়৷ রাজোয়াড় কি কম ভেকুড়? একসঙ্গে কংরেস করেছি৷ আমি এলাম তাও দু’বছর পড়ে থাকল, তা বাদে ওর দাদা কাটা পড়তে তবে...

— আপনার দরজাটার একটা ছবি নেব৷ বাড়িটাও পুরনো, ছবি নিলে আপত্তি আছে?

এতাবধি সব ঠিক ছিল৷ কিন্তু হঠাৎ বাটিকছাপ লুঙ্গি গুটিয়ে বেরিয়ে আসে বান্টি মহান্তি, পিতৃদত্ত নাম যার উৎসব৷ লাল চোখ কড়কে বলে৷ ফটো লিবেল নাই৷ বর্জুয়া কাগজে ফটো দিব না৷ — বাপকে বলে বর্জুয়া পাট্টি করতে এখনও পীরিত ছাড় নাই৷ বর্জুয়া কাগজের রিপোট আমরা মানি না৷ কুসুমা! ঝাড়খণ্ড হয়েছে, হঞে যাক৷

রাজোয়াড় বলে, একা খেলন!

— উ শালোই সভেরে টানব্যেক৷

বিমল বলে, চলুন৷

— মন্দিরটার একটা ছবি তুলি৷

— তুলুন৷ পর্জন্যবাবুর সম্পত্তির হিসেব আমি দিয়ে দিব৷

— সব যে লিখব ভাই, আপনাদের কোনও.....

— এটাই সময়৷ খরা দেখতে মন্ত্রী আসছে৷

ফেরার সময় সুনীতি বলেছিল, আবার আসবেন৷ বউদিকে আনবেন৷ ভুলবেন না৷

বিমল বলেছিল, বিয়ে হলে ক্ষেত্রপাল আর সুনীতিকে বড় ঘরটা লিখে দেব৷ বাড়িতে লোক বাড়বে৷

— আপনি বিয়ে করবেন না?

— হয় তো করব৷

ফেরে ও মানবাজার হয়ে৷ কলকাতায় ফিরে ‘মানব সৃষ্ট খরা’ বলে কুসুমা-সহ কয়েকটি গ্রামের রিপোর্ট খুব মর্মগ্রাহী ভাষায় লেখে৷ দুই কিস্তিতে লেখা বেরয়৷ শেষে লেখে কুসুমা মানবাজারের ম্যাপে, মানবাজার-টু পুরুলিয়ার ম্যাপে, এবং পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে না এলে অঞ্চলটি থেকে মধ্য যুগ কাটবে না৷ জলের ব্যাপারটার ওপর খুব জোর দেয় এবং ফলাফল জানার জন্যে ব্যস্ত থাকে৷

বিমল সানন্দে লেখে, লেখাটি জেরক্স করে আমরা সদরে ডেপুটেশন দেই৷ অবশেষে কুসুমাতে একটি কুয়া ও একটি বাঁধ হচ্ছে৷ শুনছি জোড় বাঁধের কাজও শুরু হবে৷ বলা দরকার এই জোড় বাঁধ হলে চারপাশে বহু গরিব চাষী উপকার পাবে৷ ১৯৭৩ সালে এই জোড় বাঁধ প্রকল্প মঞ্জুর হয় এবং কাজ শুরু হয়৷ কিন্তু কাজের প্রথম অবস্থাতেই তৎকালীন এমেলে, যাঁর চেষ্টায় কাজ শুরু হয় তিনি হৃদরোগে মারা যান৷ কাজটি পরিত্যক্ত ছিল৷ কাগজে বের হয়েছে বলে কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে৷

ও বিমলের চিঠি বার্তা সম্পাদককে দেখায়৷ বার্তা সম্পাদক বলেন, রাজনীতিতে জড়িয়ে পোড়ো না যেন৷

ও তো জানত না৷ পর্জন্য মহান্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসেব, পর্জন্যর ঘন ঘন ঝান্ডা বদল৷ এসব লিখে ও কুসুমাকে খুব বিপন্ন করেছে৷ ওর মনে হয়েছিল, সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে ওই নাই-মানুষের দেশের দূরত্ব ঘুচছে না বলেই উত্তমের ছেলেটি সবুজ ঝান্ডা তুলে নিয়ে আগন কিসকুর কাছে চলে গেল৷ নাই-নাই-নাই আর চাই-চাই-চাই, কিছুই যখন শুনতে রাজি নয় কেউ, তখন আগনরা মরিয়া হয়ে উঠতেই পারে৷

এরপর কুসুমা গ্রাম ওর মন থেকে দূরে চলে যায়, হারিয়ে যায় না৷ ও বউকে বলেছিল, যাক, কুসুমা মানবাজার-টু-র ম্যাপে উঠল৷ এখন মানবাজার পুরুলিয়ার ম্যাপে আসুক, পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপে উঠুক, সবই তো দরকার৷ একজন ফ্রি-লানস ফটো-সাংবাদিক আর কতটুকু ক্ষমতা ধরে!

ওর রিপোর্টের অন্যান্য প্রতিক্রিয়াও হয়৷ মহিষমর্দিনী না মইষানী, এই নিয়ে একজন উদাত্ত প্রবন্ধ লেখেন৷ ‘সামার ভ্যারাইটি লোটাস’ নিয়ে চিঠি বেরোয়৷ বিমল পোস্টকার্ডে লেখে, মইষানী দেখতে মাঝে মাঝে লোক আসছে৷ সম্ভবত কাছে একটি মৃগদাব হবে৷

তারপর সংবাদপত্রে খেলন ও আগনের...

কাগজের কাটিংটি ও আবার পড়ে৷ একা বিমল আসছে, না নিহত খেলন ও আগনকেও নিয়ে আসছে? বাঁকুড়ার ঘোড়া, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ, বেলেতোড়ের মনসাঘট, ইত্যাদিতে ঠাসা ওর ঘরে কতজনের জায়গা হবে? উত্তম সিং সর্দাররা বৈশাখী পদ্মের সামিয়ানা করে একবার ভূমিজ বিদ্রোহী নেতা গঙ্গানারায়ণ সিং-কে স্মরণ করেছিল৷ খেলন ভীষণ ক্রোধে বলেছিল, সব জুলাইন দিতে হবে৷ মাঙলে কেও ভিখ দিবে না হে৷ আর কিসকুরা তো আদিম অরণ্য বাঁচাতে হবে বলে জঙ্গলের পেটে ঢুকে যায়৷ আদিম অরণ্য বাঁচানো সরকারি নীতি কিন্তু অরণ্যের অধিকার যে চেয়েছে সেই বড় চিহ্নিত হয়ে যায়৷ জমিভূমি-জল-পথ-স্কুল-চিকিৎসা ব্যবস্থা— পঞ্চায়েতের নিরপেক্ষ সুবিচার৷ কিছু পায় না বলেই কি নাই-মানুষেরা ‘আছি-মানুষ’ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়?

বিমল ও রাজোয়াড় যখন ঢোকে ওর ঘরে, বোঝা যায় ওরা কোন সংবাদের শব বয়ে এনেছে৷ বিমল জ্বলে গেছে আগাগোড়া৷ সলাজ মিতভাষিতা, মৃদুকথা, সবই দাহ করে এসেছে ও৷ জ্বলাপোড়া, গম্ভীর, সন্ধিগ্ধ বিমল, চুল ও চোখ যেন জ্বলছে৷ রাজোয়াড় ওর দিকে একবার চায়, মাথা নাড়ে, স্বগত বলে, মইষানী মা গো! — তারপর বলে, জল খাব একটু৷

ওর বউ জগে জল ও একটি গেলাস রেখে যায়৷

— আমার বউ৷

— নমস্কার বউমা৷

— নমস্কার৷ আপনারা বসুন৷ জিরোন৷ তারপর স্নান করবেন৷ রান্না আমার হয়েই গেছে৷

বিমল যেন ঈষৎ বিস্ময়ে সব দেখতে থাকে৷ দেখতে দেখতে বলে,

— নিজের কোঠা?

— না, ভাড়া বাড়ি৷

— ভাড়া কত?

— চারশো টাকা৷

রাজোয়াড় বলে, হতে পারে৷ পয়সা তো কলকাতায়৷

— চল চল স্নান করবে৷ আমার আজ বেরনো নেই৷ খেয়েদেয়ে কথা বলা যাবে৷

— আর কথা! মইষানী মা গো!

বিমল হঠাৎ যেন জেগে ওঠে ও বলে, হ্যাঁ রাজোয়াড়৷ ঝটপট না হলে ট্রেন ধরা যাবে না৷

— আজকেই ফিরবে বিমল?

— আজই৷

স্নান করে ওরা, শোবার ঘরের মেঝেতেই খেতে বসে৷ ওরা আসছে বলে ও কাটা মাছ এনেছিল৷ দুর্মূল্য পটল৷ বিমল খুব অন্যমনে খায়৷ ও বোঝে, বিমল বারবার খুব দূরে চলে যাচ্ছে, ফিরে আসছে৷ আবার চলে যাচ্ছে৷ কুসুমায় কি হয়েছিল? বউ বলে, আর একটু ভাত দিই?... বিমল জবাব দেয় না৷ রাজোয়াড় পাঁচ জাতের সঙ্গে ওঠে বসে৷ কলকাতায় এসেছে মিছিল- মিটিংয়ে৷ সে বলে, খুব খেলাম বউমা৷ এমন মাছ আমরা খাই না৷

খেয়ে উঠে ওরা বাইরের ঘরে বসে৷

— সুনীতি কেমন আছে?

— উয়ার ফটো লিব একটা৷

বিমল সাধু বাংলা বলছে না এখন৷

— ছি ছি৷ ছবিগুলো পাঠানোই হয়নি... দিচ্ছি৷ কি হয়েছিল বল তো? সব বলো৷

— আপনি কাগজে লিখলেন...

— হ্যাঁ৷ কাজও তো হয়েছে কিছু জানালে৷

— আকামটো বেশি হঞে গেল৷

— কি রকম?

— সুনীতিটোরে... আগে মরাইন দিল... তা বাদে...

— কে? কে?

ও সাদা হয়ে যায়৷ ওর ঘর এখন ধুলো গুঁড়া, মাটি ফাটা কুসুমা হয়ে যায়৷

— আপনার দোষ কি! কুসুমা তো দেশের মধ্যে নাই৷

বিমল এখন সামনে চেয়ে থেকে সংবাদ পড়ে যায়৷

কাগজে লেখা বেরোতে পর্জন্যবাবুর রাগ বেড়ে যায়৷ পঞ্চায়েতে নামে অর্জনবাবু, কাজে পর্জন্য৷ ওর সম্পত্তির হিসেব দেখেই ওর ক্রোধ৷ রহস্যজনকভাবে কুয়ার কাজ বন্ধ হয়ে যায়৷ খেলন খুব ক্ষেপে যায়৷ কিন্তু বিমল ওদের আইনের পথে চলতে বলে৷ পঞ্চায়েত থেকে ব্লক, ব্লক থেকে মহকুমা হাকিম৷ কিন্তু কুসুমার লোকরা খুব বিক্ষোভ দেখায়৷ ক্ষেত্রপাল বলে, পুরুলিয়ার জন্য এত কোটি টাকা৷ কুসুমায় কুয়া, বাঁধ হয় না?

বিমল বলে, কুসুমা তো নাই উয়াদের হিসাবে৷

রাজোয়াড় বলে৷ গ্রামটা, নাই-গ্রাম৷ মানুষ, নাই-মানুষ৷

আসা-যাওয়া চলছিল৷ চলছিল৷ এর মধ্যে অর্জনবাবু, যিনি নামে প্রধান ও কাজে ভাটা দেখে, তিনি ঘন ঘন সাইকেল চেপে কুসুমা আসছিল, মেয়েদের পান-সুপারি বিলাচ্ছিল৷ পান পরাগ... মাথায় দেবার তেল... বলছিল ভাটার কাজ যখন বন্ধ হবে বর্ষায় মেয়েরা কাপড় পাবে, পুরুষরা ধুতি৷

এখন ওর মনে ‘অর্জন মহান্তিকে হত্যার’ পর শব্দগুলি লাফালাফি করতে থাকে৷

— তিনিই তো খুন হয়েছেন?

সুনীতিকে বলেছিল, ইটভাটা বন্ধ হলে তোর কী? তোকে, ভুবনীকে, অষ্টমীকে, কয়েকজনকে পঞ্চায়েত থেকে কাজ দেব৷ আর সুনীতিরা ভয় পাচ্ছিল৷ এভাবে অর্জনবাবু কখনও কথা বলেনি আগে৷ মেয়ে খুঁজতে সে অন্যত্র যেত, কিন্তু এখন প্রধান পদটি তার অন্তরায়৷ কিছুদিন আগে কুসুমা ও মইষানীর মাঝামাঝি ওরাং পাড়ার কাছে এক শুকনো ডোবায় তার দা-কাটা মৃতদেহ, সাইকেল, পকেটে টাকা-খুচরো-বিড়ি-লাইটার-টর্চ পাওয়া যায়৷

— তারপর?

— পর্জন্যবাবু বলল, ইয়ার শোধটো লিব৷

— খেলনদের তো মেরেছে পুলিস...

— তুমি শুন, আমি বলি৷

কুসুমা কাহিনীতে আগের সঙ্গে পরে মেলে না৷ অর্জনবাবু হত্যা কালে যদিও খেলন গ্রামে ছিল না৷ এ সময়ে সেই হয়ে যায় ‘হত্যা করে পলাতক প্রধান আসামি’৷ বারিচাঁচারি গ্রামে মিটিং করছিল খেলন ও আগন৷ অর্জনবাবু কান্ত ওরাংয়ের বউকে দিনের শেষে চেপে ধরে৷ ভুবনী আর্ত চেঁচায়৷ তবু হত্যার কারণ হয় ‘ইটভাটায় হপ্তা সংক্রান্ত গোলযোগ’৷ অর্জনবাবু খুন হওয়ার চতুর্থ দিনে অপঘাত মৃত্যু কারণে শ্রাদ্ধ হয়৷ পঞ্চম দিনে পর্জন্যবাবু, বান্টি ও দলবল, তিনটে বন্দুক নিয়ে একান্ন ঘর ওরাংকে গ্রামছাড়া করে৷

মানবাজার থানা বিমলদের ডায়েরি নেয় না৷ কুন-অ দিন ল্যিল নাই, আমরা নাই-মানুষ বটি৷ চারদিন বাদে বিমলরা পর্জন্যবাবুর কাছে অনেক দরবার করে৷ পর্জন্যবাবু বলে, ফিরবে যদি, ঘর পিছু গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি জরিমানা লিবে মইষানী মা! মায়ের সেবাইতকে মরাইন দিলি৷ বম্ভ পাতকী হলি৷ অর্জনের দেহাধার শুদ্ধ ছিল, উয়ার পরে মায়ের ভর উঠত৷... বিমলরা দেখছিল প্রশাসনিক পথ বড় ঘোরাল৷ সিস্টেমকে ব্যবহার করা খুব কঠিন৷ ওরা ক্ষমতাসীন বড় দলের ভোটার৷ তবে হয়ত তেমন কিছু হবে না, এই মনে করে ওরা ফিরে আসে৷ এ ক’দিন যেসব গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানেই গরু-ছাগল রেখে আসে৷

এটাকে পর্জন্যবাবু অসীম ঔদ্ধত্য মনে করে৷ সে সন্ধ্যাতেই দিঘিতে স্নান করে উঠে আসার কালে পর্জন্যবাবু, বান্টি ও আট-দশ জন সুনীতি, ভুবনী ও অষ্টমীকে তুলে নিয়ে যায় ইটভাটার পিছনে৷ এটা প্রমাণ করার পথ নেই৷ থানায় লেখা আছে ওরা সেদিন পুরুলিয়া শহরে ছিল৷ বিমলরা অবশ্য রাত ন’টা নাগাদই সমবেত হয়ে দৌড়য়৷ ভাটার পিছনে লাগাতার ধর্ষিত অষ্টমী ও ভুবনীকে পাওয়া যায়, সুনীতিকে নয়৷ ঘটনাক্রমে সে রাতেই খেলন, আগনকে নিয়ে গ্রামে আসে৷ তারাও দৌড়য়৷ খেলন চেঁচায় একান্ন ঘর কি মরে গিছে? উ পরধান কি গরমেন হইন গিছে?

— সুনীতি?

— দিঘিতে ঝাঁপ দিয়েছিল পায়ে কাপড় বেঁধে৷

— তারপর?

সুনীতির শবদেহ নিয়ে ওরা আগে পর্জন্যবাবুর কাছে যায়৷ তারা তখন থানাতে৷ তারপর থানা৷ খেলন ও আগন লিড দিয়েছিল৷ পর্জন্যবাবুর মাথায় লাঠি মেরেছিল৷ তাকে বাঁচাতে যেয়ে মেজবাবু চোট খায়৷ নিমেষে ব্যাপারটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্তৃক দুঃসাহসিক থানা আক্রমণ’ হয়ে যায় এবং বড়বাবু খেলন ও আগনকে গুলি করে৷

কলকাতার এই ছোট ঘরে কুসুমা... দিঘি... সুনীতির শব... ইটভাটা... থানা

— এত সব হয়ে গেছে...

— আখুন, বাবু?

— এ তো ভয়ানক ব্যাপার৷ না লিখলে... কিন্তু লিখলে আবার কিছু... দেখ! সে লোক কি বাঁচতে দেবে কাউকে? গ্রামে এভাবে কায়েমি স্বার্থের খুঁটি... এত দূরে...

বিমল ঈষৎ হাসে৷

— বাঁচি তো গিছে কিছু? ওই গরু-ছাগল-হাঁস? মইষানী মার জরিমানা দিল সুনীতি, খেলন, আগন! আর কিছু হারাবার ভয় করি না বাবু! (‘বাবু’ সম্বোধনও এই প্রথম) উয়াদের মরাইন দিল৷ একান্ন ঘর ভুট দেয়, তা আসামি করাইন দিল৷ এই লাও, অষ্টমী, ভুবনী জবানবন্দী দিচ্ছে, টিপা দিছে... আমাদের জবানবন্দী টিপা দিঞে সহি দিঞে, এই লাও৷ যদি ভাব লিখব কি না, তবে সিবার বা লিখলে কেনে?

বিমল নিঃশ্বাস ফেলে৷

— ভয় নাই, সাহস নাই, মন যা বলে তাই করি৷ সুনীতিটো... ক্ষেতা বলে শোধ লিয়ে করব৷ খেলন আর আগনরে লিতে... বাপ রে! কত মানুষ ডিপটিশান দিছি, হাকিম জানে৷ সবাই ববা৷ মইষানী পূজা নয় বয়কট দিলাম৷ কিন্তু বিচারটো হবেইক নাই? পর্জন্যবাবুর উপর দেশে কেউ লাই রে?

— হ্যাঁ...

এখন রাইটার্সে জানানো... তারা কিছু করে কি না... তারা জানালেও থানা নড়ে কি না...

বিমল দাঁত পিষে বলে, সরকার বলে দিক আমরা নাই-দেশে না আছি-দেশে! নাই-মানুষ, না আছি-মানুষ! আমাদের তরে নাই-সরকার, না আছে-সরকার! কুসুমা কি নাই? তুমি দেখনাই? কাগজে লিখনাই? খেলনদের নাম কাগজে উঠে নাই? আইনের পথে কুসুমা চলে কি করবে বাবু? আইন তো ও বিবশ, পরাস্ত৷

— হ্যাঁ বিমল... চেষ্টা করব...

এখন বিমল এ ঘরে ফিরে আসে৷

— গা তুল হে রাজোয়াড়! তারা জানে মোরা সদরে গিছি৷ না ফিরলে কুসুমা একা পড়ে৷ আগন... খেলন... জাহানটো দিঞে গেল, আমরা কুন ধর্মে কলকাতায় থাকি?

সুনীতির ছবিটি নিয়ে বিমল চলে যায়, রাজোয়াড়৷

ঘরে ও, কিছু কাগজপত্র, এবং কুসুমা৷

ও বুঝতে পারে, কর্তব্য আছে, কর্তব্য থাকে, করতে হয়৷ মস্ত বড় কাজ, ও বড় সামান্য মানুষ৷

একলা, একলা, একলা কি?

ঘরে কেন আদিম অরণ্য গন্ধ, যা নাকে ধরা পড়ে না৷ ঘরের বাতাসের শূন্যস্থান কারা ভরে ফেলছে?

ও বোঝে, কুসুমা ওর বিবেকে থাকতে এসেছে, যেতে আসেনি৷

এটা অরণ্যপর্ব!

ও কাগজগুলো গোছাতে থাকে৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%