পৃথিবী চিরন্তনী

অশোক দাশগুপ্ত

একটা জরুরি ফোন করার কথা৷ অস্থিরতা রয়েছে রীতার স্বামীর অপারেশনের ব্যাপারে কী হল জানবার জন্যে৷ কিন্তু ফোনটাকে হাতে পাচ্ছে না পারমিতা৷ পান্টি প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে ফোনটাকে কব্জা করে নিয়ে আড্ডা চালিয়ে যাচ্ছে৷ ছাড়বার নাম নেই৷ রিসিভারটাকে ধরে কখনও হাত-বদল করছে, কখনও ঘাড়টাকে ডাইনে-বাঁয়ে দু’দিকে কাত করে-করে ঘাড়ের পেশিদের ঠিক রাখতে চেষ্টা করছে৷ আর তার সঙ্গেই অনর্গল কথা বলে চলার মাঝখানে মাঝখানে হাসির ফুলকি ছিটচ্ছে, যেটা এ-ঘর থেকেও পারমিতার অধৈর্য অবস্থার ওপর এসে পড়ে দাহ ধরাচ্ছে৷

ভেবেছে কী বেপরোয়া মেয়েটা? আড্ডা দিতে বসে কাণ্ডজ্ঞানের বালাই রাখবে না? কার সঙ্গেই বা এত মৌজি আড্ডা? কোনও একটা ছেলেই নিশ্চয়! কোনটা? ডজনখানেক বান্ধব-বান্ধবী নিয়ে তো সর্বদা ঘোরাফেরা মেয়ের!

ধৈর্যের পরীক্ষায় প্রায় ফেল হওয়ার মুখে পান্টির কলকণ্ঠ থামল! রিসিভারটা নামিয়ে রাখার ঠক শব্দটা কানে এল৷

পারমিতা এ-ঘরে চলে এসে চড়া গলায় বলে উঠল, ব্যাপারটা কী পান্টি? কার সঙ্গে এতক্ষণ গল্প চালানো হচ্ছিল?

পান্টি টেলিফোনের সামনের শান্তিনিকেতনী বেতের মোড়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাকে জায়গা দেওয়ার ভঙ্গিতে সরে এসে বলে, মা তোমার এই রাজাসনটি বদলাও তো! একটা চেয়ার-টেয়ারের ব্যবস্থা কর৷ উঃ! ঘাড়টা শূন্যে খাড়া রেখে কথা বলা যে কী অসুবিধে! উঃ ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়৷

কী কথার কী উত্তর৷

পারমিতা রেগে উঠে বলে, ও! ফোনের সামনে একটা আরাম কেদারা দরকার? তাহলে আরও দু’ঘণ্টা চালানো যায় কেমন? ভীষণ একটা দরকারি ফোন করবার জন্যে সেই থেকে অস্থির হচ্ছি— আর তুমি...

মাই গড! সে কথা বলবে তো?

তা আর নয়? তোমাদের কথার মাঝখানে ডিসটার্ব করার জন্যে ফাঁসির হুকুম হয়ে যাক আর কী আমার! কথার জবাবটার কী হল?

মা! তোমার ‘ভীষণ দরকারি’ একটা ফোন করবার কথা!

মেয়ের এই গা-গড়ানে স্বরের কথায় রেগে আগুন হয়ে গিয়ে পারমিতা রিসিভারটা হাতে তুলে নিতে নিতে বলে, ‘আচ্ছা, হচ্ছে পরে৷’ ... তারপর ডায়াল করতে থাকে৷

পান্টি খুব নিরীহ গলায় বলে, তাহলে কী এখন আমার বেরনো চলবে না, মা? জবাব দেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে?

কী? এখুনি আবার বেরনোর চেষ্টা হচ্ছিল?

‘আবার’ কী মা? ‘একবারই’ তো! এই তো মাত্র সকাল হয়েছে৷ মাত্র সকাল মানে অবশ্য নটা বেজে যাওয়া!

ছুটির দিনে পান্টিকে আটটার আগে বিছানা থেকে ওঠানো যায় না!

কিছু একটা বলতে যাওয়ার মুখেই ওদিকে রিং হল!

পারমিতাকে সেদিকে মন দিতে হল!

হ্যালো রীতা? ... ও রীতা বাড়ি নেই? তুমি কে কথা বলছ? নন্দিনী? বুঝেছি৷ কোথায় গেছে তোমার বৌদি? ... কোন হাসপাতালে? নাম জানো না? ... কেউ সঙ্গে গেছে? ... ও, তোমার বৌদির ভাইরা? হুঁ ... হুঁ ... ও, দাদাবাবুর অনেক সব আপনজনেরা? ঠিক আছে৷ পরে ফোন করব৷ বাড়িতে আর কে আছে? ... কেউ না? তুমি একা? ... বৌদিরা কখন ফিরবে বলে গেছে? ... বলেনি? আচ্ছা রাখছি৷ রিসিভারটা নামিয়ে রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল পারমিতা, পান্টি গরুড় অবতারের ভঙ্গিতে দু’হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে৷

এর মানে?

মানে? মানে আর কী? সওয়ালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি৷

পান্টি! আমি তোমার ইয়ার বন্ধু নই!

ও-মা! সে কথা কে বলছে? ওদের সামনে কী আমি এমন করজোড়ে দাঁড়াই? গাঁট্টা মেরে ভিন্ন কথা বলি না!

পারমিতা ক্রুদ্ধ এবং প্রায় রুদ্ধ গলায় বলে ওঠে, সেটা আমার ক্ষেত্রেও! আমার সঙ্গেও কী গাঁট্টা মেরে ছাড়া কথা বল তুমি?

পান্টি একটু নরম গলায় বলে, দোহাই তোমার মা, গলার সুর স্যাঁতসেঁতে করে বস না! ‘রৌদ্ররসটাই’ আমার ভাল সহ্য হয়৷ ... তো কী বলছিলে? কার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছিলাম? কেউ না৷ এমনি একটা ছেলের সঙ্গে!

‘ছেলে’, তা তো বুঝতেই পারছিলাম৷ কোনও মেয়ের পক্ষে এতক্ষণ ধরে এক পক্ষের কথাই শুনে যাওয়া সম্ভব নয়৷ মাঝে মাঝে অপর পক্ষকে থামিয়ে ছাড়তই৷ তো ছেলেটা কে?

বললে তুমি চিনবে?

যাতে বললেই চিনতে পারি, সেটাই আমি চাই পান্টি! সেটা জানা আমার দরকার৷

পান্টি এখন সোফায় বসে পড়ে বলে ওঠে, এতজনকে জানতে হলে, সিগারেটের ধোঁয়ায় তোমার যে অ্যাজমা বেড়ে যাবে মা৷ তুমি যে একটা অ্যাজমা পেশেন্ট, সেটা তো আমায় মনে রাখতে হবে? শেষ পর্যন্ত যেটাকে জানা জরুরি, সেটাকে ঠিকই তোমার সামনে ধরে এনে দেব! এমনি আসতে না চাইলে, গলায় গামছা দিয়ে টেনে আনব!

পারমিতাও বসে পড়ে হতাশভাবে বলে, পান্টি! এই জেনারেশনের তোরা কী সবাই এই ভাষায় কথা বলিস?

পান্টি হঠাৎ জিভ কেটে, দু-কানে হাত ছুঁইয়ে বলে, ইস! তাই কখনও হয়? কত-সব ‘গুডি গুডি’ ছেলেমেয়ে রয়েছে, তোমার রীতার মেয়ের মতো, বাপীর মেজমাসি, ছোটমাসির ছেলেমেয়েদের মতো! যারা সব জমার ঘরের হিসেবে পড়বে! আমাদের মতো এই সব উড়নচণ্ডেরা তো খরচের খাতায় গো মা!

পারমিতা গম্ভীর গলায় বলে, পান্টি! তুই আমার একমাত্র সন্তান, সেটা ভুলে যাসনি৷ ওই তো — ওইটিই তো হচ্ছে আমার একমাত্র জ্বালা মা! সেকালের মহিলাদের মতো দশ-বিশটাকে পৃথিবীর আলো দেখাতে, পৃথিবীর মাটিতে নিয়ে এনে ফেললে, উভয়পক্ষেরই এত টেনশন থাকত না৷ তোমাদের মন-প্রাণের যত শখ-সাধ-স্বপ্ন বাসনা একটু শেয়ার হয়ে যেত৷ একটা মাত্তরের ওপর সেই সবগুলো চাপিয়ে চাপিয়ে এই বেচারার জীবনটাকে ধোপার গাধার তুল্য করে ছাড়ত না!

পারমিতা মেয়ের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে, তোমার জীবনটা ধোপার গাধার তুল্য?

আহা, সে তো আমি নিজের প্রাোটেকশনে ততটা হতে দিইনি৷ কিন্তু মা, তোমার মেয়ের মতো এত শক্তি ক’টা ছেলেমেয়ে ধরে? তারা ওই ধোপার গাধা হয়েই মরে, মা-বাবার ইচ্ছের বোঝা বয়ে বয়ে!

পারমিতা অবজ্ঞার গলায় বলে, মা-বাবার ইচ্ছের বোঝা! তোমার ক্ষেত্রে অন্তত, বাবার কথা ওঠে না! তোমার বাবা আবার কবে মেয়ের কেরিয়ার গড়বার চিন্তা করতে বসেছে?

আহা, সে বেচারী ভদ্রলোক তেমন সময়টা পেল কখন, বল তো? নিজের কেরিয়ার গড়ে তোলার তালে তালকানা হয়ে ছুটে বেড়িয়ে অবশেষে দিকনির্ণয় করে ফেলে, তবেই না একখানা মন্ত্রী হয়ে বসেছে? মেয়ে নিয়ে মাথা ঘামাতে বসলে হত?

পারমিতা বেজার গলায় বলে, তা জানি! আমাদের দিকে কোনওদিন তাকিয়েও দেখেনি ও! আমিই একা নিজের চেষ্টায় তোমায় গড়ে তুলেছি!

তা হয়ত তুলেছ! তবে সেই যে কী বলে — শিব গড়তে বাঁদর, তাই গড়ে বসেছ, এই আর কী!

পারমিতা এখন প্রতিবাদী গলায় বলে ওঠে, বটে? সে কথা কেউ বলুক দেখি? কোন বিষয়ে তুই কম? লেখাপড়ায়, নাচে-গানে, খেলাধুলোয়, ছবি আঁকায়—

পান্টি হতাশভাবে বলে, ওই তো! ওইখানেই তো আমায় ‘kpal’ মানতে বাধ্য হতে হয় মা! ছেলেবেলা থেকে কেবলই সঙ্কল্পে কঠোর হয়েছি, তোমায় জব্দ করতে সবকিছুতে ফেল হয়ে ছাড়ব৷ কিন্তু কী করেই যে উল্টো হয়ে হয়ে বসেছে, সেটাই রহস্য! শেষে রেগেমেগে ওই ‘কপাল’-কেই মানতে বাধ্য হতে হয়েছে৷ আর ধরে নিয়েছি কপাল দোষেই আমায় ‘মন্ত্রীকন্যে’-র টিকিট কপালে সেঁটে সমাজে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে!

কপালদোষে?

পারমিতা হঠাৎ হেসে ফেলে বলে, তা কথাটা সেই মন্ত্রী-পিতার সামনে বলতে যেতে পারিস না? তার বেলা তো ভয়, যত তড়পানি মায়ের কাছে৷

ভয়? নাঃ৷ ভয়-টয় কিছু না, মা! বরং অন্য কিছুই৷ তা সে আর তোমার সামনে বলে ফেলে তোমায় আহত করতে চাই না বাবা! তাই ভদ্রলোককে আমি অ্যাভয়েড করে চলাটাই সুবিধের বলে মনে করি৷

পারমিতা একটু ব্যঙ্গের গলায় বলে, তবু সেই লোকটার দৌলতেই তো তোমার বন্ধুসমাজে এত মান্যি বাবা!

পান্টি ছিটকে ওঠে! বলে, কী? ওই জন্যে বন্ধুসমাজে আমার মান্যি৷ আমার বন্ধুদের তুমি এইরকম হ্যাংলা ভাব? তারা নিজেরাও কেউ কিছু কম নয়, বুঝলে? তোমাদের ওই সব পদমর্যাদা-টর্যাদাকে তারা ‘হ্যাটা’ করে! আমাদের দলটি হচ্ছে একটা কী বলে, তোমাদের খবরের কাগজের ভাষায়? হ্যাঁ, ‘বিক্ষুব্ধ-গোষ্ঠী’! আমরা নিজেদের মতো করে বাঁচতে চাই!

পান্টি!

কী? কী হল? হঠাৎ গভীরে নেমে এলে কেন?

পান্টি, তোদের নিজেদের মতো করে বাঁচাটা কী, তাই বল তো? বললে তুমি বুঝবে?

বোঝবার চেষ্টা করব৷ করতেই হবে!

তাহলে একটু সময় দিতে হবে! সেটা হচ্ছে—

ঠিক এই মোক্ষম সময়েই রান্নার মেয়েটা এসে দাঁড়াল!

কী! কী বলছিস গীতা? এখন আবার কী দরকার হল?

বলছি— কাল বেশি রাতে কারা যেন সেই যে অনেকগুলো বড় বড় চিংড়িমাছ দিয়ে গেছল, সেগুলি কি ফ্রিজ থেকে বার করে রাখব? পান্টি হেসে বলে, যাও মা ডিউটি পালন কর-গে৷ যাদের ‘নিজের মতো করে বাঁচবার’ অধিকার নেই, জাল ফেলে ধরে এনে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে, ফ্রিজের মধ্যে ভরে ফেলা হয়— ভবিষ্যতে তারিয়ে তারিয়ে খাবার জন্যে, তাদের সদগতি করবার চেষ্টা কর-গে৷

বাধ্য হয়েই চলে যেতে হয় পারমিতাকে৷ সময়ে-অসময়ে এমন বিবিধ উপঢৌকন তো আসেই, স্রেফ ‘ভক্তের পূজা’ বা ‘ভালবাসার নিদর্শন’ হিসেবে৷ জিনিসগুলো নিয়ে পারমিতার জ্বালা বই সুখ নেই! সেই তাদেরকে যথাযথ রূপে বিন্যাস করিয়ে পারমিতাকেও আবার উপঢৌকনস্বরূপ বিলি করতে হয় উপযুক্ত-উপযুক্ত জায়গায়!

চলে আসে রান্নাঘরে৷ ব্যবস্থাপত্র দেয় গীতাকে৷ গীতা চৌকস মেয়ে, বেশি শেখাতে হয় না৷ ... তাই মনের মধ্যে ব্যঙ্গোক্তিটা পারমিতার পাক খেতে থাকে, ‘‘যাদের নিজের মতো করে বাঁচবার অধিকার নেই, তাদের জাল ফেলে ধরে এনে ... আর ফ্রিজের মধ্যে ভরে ফেলে—’’

পান্টি কী সত্যিই শুধু ওই ভেড়ির চিংড়িগুলোর কথাই বলল? না কী পান্টির কথার মধ্যে অন্য ব্যঞ্জনা ছিল?

আর একবার রীতার বাড়িতে ফোন করতেই সর্বাঙ্গ ঠান্ডা হয়ে গেল পারমিতার! খবর খারাপ! খুব খারাপ৷ রীতার বর নিখিলেশের অপারেশনের আগেই বাড়ি থেকে বেরোবার পরই গাড়িতেই হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে শেষ৷ হাসপাতাল ‘মৃত’ বলে রায় দিয়েছে৷

কী ভয়ানক! এমন কী করে হল? ভয়ে না কী? মানুষটা কী এত নার্ভাস ছিল? ... দেখে তো তা মনে হত না! বরং বেশ আত্মস্থ, আর খাঁটি মানুষ বলেই মনে করে তাকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতেই দেখে থাকে পারমিতা!... এই তো কিছুদিন আগে কবে যেন রীতা হাসতে হাসতে বলেছিল, এই পারমিতা, তোর মন্ত্রীকর্তার হাতেই তো চাবিকাঠি, তাকে ধরে আমাদের একটা ফ্ল্যাট পাইয়ে দে না বাবা!

নিখিলেশ তাড়াতাড়ি বলেছিল, ধরাধরি করার কী আছে? দরখাস্ত তো করে রাখা আছে৷ সময় হলেই—

আমার জীবদ্দশায় পেয়ে যাব, এমন আশা আছে তোমার? ও বরকে একটু ধরলেই—

নিখিলেশ রাজি হয়নি৷ বলেছিল, ‘পাইয়ে দেওয়া’ আর ‘পেয়ে যাওয়া’ এ দুটোতেই আমার অশ্রদ্ধা রীতা, তা তো জানো তুমি!

রীতা বলেছিল, জানি মশাই জানি৷ ঠাট্টা করে ওকে একটু বাজিয়ে নিচ্ছিলাম৷

না না, ঠাট্টারই বা দরকার কী? বাজানোরই বা মানে কী? উনি তো সত্যি ভেবে একটা দায়বদ্ধতায় পড়ে যেতে পারেন!

পারমিতার দিকে কটাক্ষ হেনে রীতা বলেছিল, দেখছিস তো, এই কট্টর বুদ্ধু লোকটাকে নিয়ে ঘর করতে হয় আমায়৷

পারমিতার বলে উঠতে ইচ্ছে হয়েছিল, সেটা ভাগ্যি বলে মেনে নে! বলেনি অবশ্য! শুধু একটু হাসি দিয়ে কাজ সেরেছিল৷ এই একটি অমোঘ অস্ত্র অথবা মহৌষধ আছে সকল পরিস্থিতি সামাল দেবার! বহুবিধ ব্যঞ্জনাময় হালকা একটু হাসি!

বিশেষ করেই একটু শ্রদ্ধা এসেছিল সেদিন পারমিতার মানুষটার ওপর! এ যুগে কাউকে শ্রদ্ধা করতে পাওয়াও তো একটা দুর্লভ প্রাপ্তি!

সেই মানুষটা মারা গেল?

অথচ সামান্যই একটা অপারেশনের কথা ছিল৷ জীবনমরণ সমস্যার মতো নয়! ... এমনি এমনিই মারা গেল! কী আশ্চর্য৷

রীতার কী হবে?

রীতার কী হবে ভাবতেই মনে হল এক্ষুনি তো তার যাওয়া দরকার৷

অবনীশের কাছে এসে দাঁড়াল৷ ছুটির দিন তাই পেল৷ তবে ছুটি বলেই যে সহজে পাওয়া যায় তা নয়৷ সর্বদাই তো অবনীশ লোকবেষ্টিত থাকে! নানারকম লোক! তাদের বেষ্টনী ভেদ করে স্বামীকে পাওয়া ভার৷ ভাগ্যক্রমেই আজ পেল!

কিন্তু পারমিতার আবেদনকে একেবারে নাকচ করে দিলেন ‘স্বামী অবনীশ’ এবং ‘মন্ত্রী অবনীশ৷’

না না, এখন ওই একটা বিশ্রী ভিড়ভাট্টার মধ্যে— তুমি কোথায় যাবে? একটা সাধারণ হসপিটালে, আজেবাজে কত লোক সর্বক্ষণ মারা যাচ্ছে— সেখানে তাদের মধ্যেই তো—

পারমিতা একবার বলল, আমি তো তোমার গাড়ি নিয়ে যেতে চাইছি না! ভাবছিলাম একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিমাইয়ের সঙ্গে চলে যাব! কে চিনবে?

চমৎকার! সেটা তো আরোই অদ্ভুত হবে! নিমাই আমার লোক এটা কে না চেনে জানে?

কী যে বল? নিমাইকে সবাই চিনে রেখেছে?

রাখেনি? হা হা! বলে নিমাইকে ধরেই কত লোক বৈতরণী পার হবার চেষ্টা করে! তা জানো?

কিন্তু এই খবর পেয়েও একবার গেলাম না, এতে রীতা কী মনে করবে?

মনে করার আবার কী আছে? তুমি তো আর তাঁর নিকটাত্মীয় নও যে শোনামাত্রই ছুটতে হবে?

‘আত্মীয়তা’ আর ‘নিকটত্ব’ কী কেবলমাত্র রক্তের সম্পর্ক দিয়েই বিচার হয়?

অবনীশ চট করে গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে ওঠে, তর্ক করে যদি নিজের বিবেচনাকেই শ্রেষ্ঠ মনে কর, যেতে পার! কিন্তু নিমাইকে নিয়ে নয়৷ আর কাউকে জোগাড় করতে পার তো দ্যাখো! তবে আমার বিবেচনায় মনে হচ্ছে— ওইসব আত্মীয়স্বজনদের কান্নাকাটির মধ্যে গিয়ে পড়ে নিজেই অকোয়ার্ড পজিশনে পড়ে যাবে!... তাও যদি একটা ভাল নার্সিংহোম-টোমে হত! ওই বাজে মার্কা একটা হসপিটালে—! রাবিশ!

অগত্যাই নিবৃত্ত হতে হল পারমিতাকে!

ভাবল — তা সত্যি! কান্নাকাটির মধ্যে একটা অপর লোক গিয়ে পড়ে হয়ত তাদের অসুবিধেই ঘটানো হবে!

এইভাবে মেনে নিয়ে আর মনকে মানিয়ে নিয়ে চলাতেই অভ্যস্ত হয়ে যেতে হয়েছে! এখন অবনীশের মেজাজের পারা বড় চট করে চড়ে ওঠে! এককথায় রেগে আগুন হয়ে যায়!

সেই রাগের ভয়ে নয়, অপমানিত হবার ভয়েই মেনে নেওয়ার অভ্যাসে দুরস্ত হয়ে যেতে হয়েছে পারমিতাকে৷

কাজেই ‘রীতার কী হবে?’ ভাবতে ভাবতেই রাত্রে খাওয়ার টেবিলে অবনীশের বিশেষ প্রিয় বড় গলদাচিংড়ি পরিবেশন করবার সময় বলতেও হল ‘মাছগুলো দারুণ!’... আর তার সঙ্গেই একটু ক্ষুব্ধ অনুযোগও শুনতে হল, এমন মাছগুলো রান্নার মেয়ে গীতার হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে!... মস্ত একটা শ্বেত পাথরের টেবিল, তার ওপর থরে থরে খাদ্যবস্তু সাজানো৷

তবে হাঁপানিরুগী পারমিতার চিংড়ি বারণ!

পান্টিও খেল না দেখে অবনীশ বলেন, তুই খেলি না যে?

পান্টি তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, আমার তো চিরকালই চিংড়িতে অ্যালার্জি৷ চিংড়ি, কাঁকড়া, ডিম!

তোরাই দুঃখী বাবা!

বলে অবনীশ চামচ করে আর একটা মাছ তুলে নেয়৷

পান্টি মুচকি হেসে বলে, আমাদের মতো কিছু দুঃখী লোক আছে বলেই তো আপনাদের মতো কিছু লোক সুখী হবার সুযোগ পাচ্ছে স্যার!

অবনীশ কপাল কুঁচকে বলেন, হঠাৎ হঠাৎ আমায় ‘আপনি, আজ্ঞে, স্যার’ এসব বলিস কেন বল তো?

সবাই ‘স্যার স্যার’ করে দেখে, দারুণ মহিমা-মহিমা লাগে কিনা৷ তাই বলতে ইচ্ছে করে!

অদ্ভুত!

বলে অবনীশ নিজের কাজে মন দেন৷

মেয়েটাকে বিশেষ ঘাঁটাতে চান না৷ ওর যেন কেমন প্রতিপক্ষ-প্রতিপক্ষ ভাব অবনীশের প্রতি৷... কেন? কিসের অভাব রেখেছেন অবনীশ ওর? অবনীশের সর্বস্ব তো ওরই ভোগে লাগবে৷ এ খেয়াল রাখে না? যাকগে — ও নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই অবনীশের৷ ... তবে মনে মনে একটা ছেলেকে মেয়ের জন্যে পাত্র হিসেবে ঠিক করে রেখেছেন অবনীশ এবং সেই ছেলের বাবার সঙ্গে দহরম মহরম রেখেছেন৷ কোটি কোটিপতি লোক! তবু মাঝে মাঝে মন্ত্রীর দ্বারস্থ হতেও আসতে হয়! তার সেই ছেলেটা এখন বিদেশে গেছে পড়তে৷ ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, রাজপুত্তুরের মতো চেহারা! অবনীশ তাই তার বাপটাকে হাতে রাখেন এবং মাঝে মাঝে ইশারা ইঙ্গিতে নিজের ইচ্ছেটি ব্যক্ত করেন যেন কৌতুক ছলে৷

তার মানে পারমিতা যে বলে, অবনীশ স্ত্রী কন্যার কথা একেবারেই মাথায় রাখে না, সেটা পারমিতার ভুল ধারণা৷

পাশাপাশি দুখানা সরু খাট দু দেওয়ালের ধারে৷ পারমিতা একখানায় শুয়ে পড়েছে, পান্টি তখনও শোয়ার প্রস্তুতি সারছে৷ এই রাত্তিরেই তো তার খাটো করে ছাঁটা চুলগুলো বিনুনির গড়নে বাঁধা পড়ে৷... হাতে মুখে এটা ওটা কীসব মাখে৷ দিনের পোশাক ছেড়ে রাতের পোশাক পরে৷

পারমিতার এত সব কিছু অভ্যাস নেই! পারমিতা চির অভ্যাস মতো যা শাড়ি জামা পরা ছিল তাই পরেই শুয়ে পড়েছে৷

ঘরে হালকা নীল আলো জ্বালা৷

আধুনিক বিলাস-ব্যসনের ঘাটতি কিছু নেই৷

তবে পান্টি একথা বলে না, ‘এসব চাই না৷’ পান্টি যেন সবকিছু নিয়ে ভোগ করে তার মা বাপকে কৃতার্থ করে!

পান্টি নিত্য অভ্যাস মতো শুয়ে পড়বার আগে মায়ের বিছানায় একবার বসে পড়ে, মায়ের গায়ের ওপর একটু গড়িয়ে নিয়ে ‘শুভ রাত্রি’ জানাতে গিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে, আচ্ছা মা! তোমার যখন বিয়ে হয়েছিল, তোমার বর খুব গরিব ছিল না?

আমার বর! আচ্ছা পান্টি, তোর কী কোনও কালেই কথায় ভব্যতা-সভ্যতা আসবে না? আমার বর! তোর বাবা না?

আহা তখন তো আর আমার বাবা হয়নি?... তো যাকগে বল না? খুব গরিব ছিল?

পারমিতা বলে, তা গরিব তো ছিলই৷ ওর বাবা বরাবর চরকা কেটেছেন, আর জেল খেটেছেন, একা মা-ই সংসার চালিয়েছেন, ছেলেকে মানুষ করেছেন৷

মানুষ করেছেন৷ ও হ্যাঁ — তারপর? মানে তাহলে তো —

পারমিতা বলে তবে আমার বিয়ের সময় অত গরিব ছিলেন না শ্বশুর৷ ওই চরকা কাটা আর জেল খাটার দৌলতে তখন ‘স্বরাজ’ পাওয়া দেশে একটু থিতু হয়ে বসে দুধে-ভাতে আছেন৷ কিন্তু— গিন্নিটি গত হয়েছেন৷ তাই তাড়াতাড়ি ছেলের বিয়ে৷ তো বাদ সাধল ছেলে! যেচে দারিদ্র্য ডেকে আনল৷ ‘আরাম আয়েশ খাওয়া মাখা’-কে ঘৃণ্য বোধে ত্যাগ করল৷... বাবার সুখ-সুখ সংসারে বসে কৃচ্ছ্রসাধন৷... পার্টির তাই নির্দেশ৷ বাবা রেগে বললেন, ‘আমার বাড়িতে বসে, তোমার এসব পার্টি-ফার্টি চলবে না৷ ওসব ছাড়৷’ ছেলে বলল, ‘ওসব তো ছাড়া সম্ভব নয়৷ তাহলে তোমার বাড়িটাকেই ছাড়ছি৷’

বাঃ৷ এ তো রীতিমতো আদর্শবাদীর কথা!

পারমিতা একটু নিঃশ্বাস ফেলে বলে, ওই কথার মোহেই তো —! যাক শ্বশুর বললেন, ‘ওই লক্ষ্মীছাড়াটার সঙ্গে তুমিও যেতে চাইছ বৌমা! তাহলে কী আর ওর মতিগতি ফিরবে? বাড়ির গৃহিণী চলে গেছেন, সব শূন্য৷ তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী, তুমি থাক!’... বললাম, ‘তা কী করে হয় বাবা?’

‘ওর সঙ্গে গিয়ে তোমার হাঁড়ির হাল হবে বৌমা! ও তোমায় উপোস করিয়ে মারবে!’... দেখে কষ্ট হচ্ছিল খুবই৷ তবু বললাম, ‘সেটাই মেনে নিতে হবে বাবা৷’... তিনি রেগে উঠে ছেলেকে বললেন, ‘যাবে তো যাও৷ তবে জেনে যাও, এ বাড়ির দরজা তোমার কাছে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল৷’... তারপর আর কী? সত্যিই হাঁড়ির হাল৷... সবদিন পুরো খাওয়া জোটে না৷ একখানা টিনের চালাঘরে বাস৷ বিছানা মানে একটা মাদুর আর কিছু পুরনো খবরের কাগজের বান্ডিলের বালিশ৷... খবরের কাগজ বিছিয়ে রুটি খাওয়া, মুড়ি খাওয়া৷ বাসন তো নেই! জুটলে, মাঝে মধ্যে পাইস হোটেলে ভাত খেয়ে আসা৷

সত্যি? সত্যি বলছ মা? এত গরিব ছিলে তোমরা?

পান্টি অভিভূত হয়ে তাকায়!

পারমিতা আস্তে বলে, সত্যিই৷ তবু মাঝে মাঝে কী প্রশ্ন আসে জানিস? তখন বেশি গরিব ছিলাম, না এখন বেশি গরিব হয়ে গেছি!

ঠিক! আমিও তাই ভাবছি৷

অথচ পান্টির চোখের সামনে ভেসে উঠেছে মস্ত এক শ্বেতপাথরের টেবিল, তার ওপর থরে থরে নানান খাদ্য সাজানো৷ হঠাৎ যেন ‘বাবা’ নামের লোকটার ওপর একটা করুণা আসে পান্টির৷ একটু বুঝি মমতাও৷

গিয়ে শুয়ে পড়ে নিজের খাটে!

কিছুক্ষণ ঘর স্তব্ধ৷ শুধু পাখার ব্লেডগুলোর হাওয়া কাটার শন-শন শব্দ!...

মনের মধ্যে কার কী কথার ঝড় বইছে কে জানে!

পান্টির বলে উঠতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু আমি? আমি কখন এসে গেলাম? সেই ছেঁড়া মাদুরের বিছানা, আর খবরের কাগজের বান্ডিলের বালিশে? না কী তখন তোমাদের অবস্থা ফিরে গেছে?

কিন্তু বলে উঠতে পারছে না!

মনে হচ্ছে মা যেন আজ বড় ক্লিষ্ট!

তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল দুপুরে বেরবার সময় একটা মস্ত দুর্ঘটনার খবর শুনে গেছল৷ ... মা বলেছিল, ‘আমি এক্ষুনি যাই৷’

এসে জিজ্ঞেস করা হয়নি৷ ধ্যাৎ! আমি যে একটা কী?

হঠাৎ বলে ওঠে, মা! রীতামাসি খুব ইয়ে হয়ে গেছে? মানে খুব ভেঙে পড়েছে?

পারমিতা আস্তে বলে, কী জানি৷ পড়তেই পারে৷ সেটাই স্বাভাবিক৷ মাথার ওপর কেউ তো রইল না! বাড়িটা ভাড়াটে, ছেলেটা নাবালক, মেয়েটা বিয়ের যুগ্যি৷

তা ‘কী জানি’ বলছ কেন? দেখে কী মনে হল?

দেখলাম আবার কখন? যাওয়াই হয়নি তো৷

যাওয়াই হয়নি? তখন যে বললে তক্ষুনি যাচ্ছ!

বলেছিলাম তো৷ তো — তোর বাবা বলল, আজ আর ওই ভিড়ের মধ্যে আর কান্নাকাটির মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই! কাল কোনও একসময় গেলেই হবে৷

ওঃ৷ বুঝেছি৷ স্যারের হুকুম মেলেনি!

হুকুম আবার কী? জিজ্ঞেস করায় বলল — এখন এসময় — না গেলেই ভাল!

তোমার কি ধারণা ছিল ওকথা ছাড়া আর কিছু বলবেন বাবা?

তা জানি না৷ জিজ্ঞেস তো করতেই হবে একবার?

করতেই হবে? জিজ্ঞেস না করে এক পা বেরনো চলবে না? তুমি কী জেলখানার কয়েদি?

কী যে আজেবাজে বলিস৷ এ কী মার্কেটে কেনাকাটা করতে যাওয়া যে ইচ্ছে হল বেরিয়ে পড়লাম৷ তাও সেটুকুও বাড়িতে থাকলে — না বলে বেরোই না কী? আর এ তো একটা বিশেষ জায়গায়! জিজ্ঞেস না করে যাওয়া যায়?

যায় না? আচ্ছা কেন যায় না বলতো মা? বাবা তোমায় বলে সব করে?

কী যে বলিস৷ ও যে কী করে আর না করে আমি কী কিছুই জানি? তবে আমার ওটাই অভ্যাস৷

অভ্যাসটা ছাড়বার চেষ্টা করে দেখেছ কখনও? করনি নিশ্চয়!

ছাড়বার কথা ভাবনাতেই আসেনি৷

তার মানে আষ্টেপৃষ্ঠে দাসত্বের মনোভাবের শৃঙ্খল৷ কিন্তু কেন বলতো?

পান্টি উঠে বসে! শক্ত গলায় বলে, কেন একজন অন্য একজনের দাস হয়ে থাকবে? ‘তুমি’ তোমার নিজের মালিক হবে না? অন্য একজন তোমার মালিক হবে? কেন? কেন? কীসের জন্যে নিজেকে এত খাটো করে রাখা?... এই জন্যেই আমরা ‘নিজের মতো করে বাঁচা’র আন্দোলন গড়ে তুলতে একটা অ্যাসোসিয়েশন করেছি মা! ‘মুক্ত হাওয়ার বারান্দা!’

পারমিতা আস্তে বলে, এই পৃথিবীতে সত্যিই কী কারও নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে রে পান্টি? প্রতিপদেই তো নিজেকে বিসর্জন দিতে দিতে চলা! আইনের শাসন, সমাজের শাসন — নিজের অভ্যাসের শাসন!

ওইসব পচা পুরনো হিসেব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমরা নতুন পৃথিবী গড়ব মা!

নতুন পৃথিবী!

হ্যাঁ৷ নতুন পৃথিবী! যে পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ হবে নিজেই নিজের মালিক৷ তাদের অন্য কোনও মালিক থাকবে না৷ থাকবে না খবরদারি করবার কেউ!

ঘর আবছা আলোয় ছায়া-ছায়া মায়া-মায়া৷ মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবু মেয়ের আত্মবিশ্বাসে ভরা গলার স্বরটি শুনতে পেয়ে অনুমান করতে পারে পারমিতা, তার চোখে প্রত্যয়ের আলো!

মনে মনে একটু করুণার হাসি হাসল পারমিতা৷

যুগে যুগে এই একই লীলা চলে আসছে! কিছুজন তাদের ধ্যানধারণা আর বিশ্বাসের মশালটি জ্বালিয়ে ডাক দেয়, ‘এস সবাই৷ চলে এস! আমার আলোয় পথ চেনো৷ দ্যাখো আমরা পচা পুরনো পৃথিবীকে আমূল বদলে ফেলে, ‘নতুন পৃথিবী’ গড়ব! সেখানে কারও কোনও অভাব থাকবে না, দুঃখ থাকবে না৷ সবাই সমান হয়ে যাবে!’

তা সে ধর্মের জিগির দিয়েই হোক আর কোনও রঙিন মতবাদের জিগির দিয়েই হোক৷ আর সেই পরমা শান্তি আনার জন্যে কী চরম মূল্যই ধার্য করা হয়!... শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে রক্তের বন্যা বয়, অসংখ্য প্রাণ বিনষ্ট হয়৷ রক্তের বিনিময়ে মুক্তি কিনে ফেলার দুরন্ত নেশা! পৃথিবীর বদল ঘটিয়ে ছাড়বে তারা!

কিন্তু দুনিয়া বদলায়৷ পৃথিবীর বদল ঘটে না!

পৃথিবী নিজের নিয়মে চলে!

মনুষ্য ধর্মের চিরন্তন শিকার মানুষ, ক্ষণিক উন্মাদনার শেষে আবার মনুষ্য ধর্ম পালন করে চলে! পঞ্চ ভূতের তৈরি মানুষের মধ্যে পাঁচ ভুতুড়ে কাণ্ড!

পারমিতাও কী একদিন ‘নতুন পৃথিবীর’ হাতছানিতে মোহগ্রস্ত হয়ে, ‘পুরনো পৃথিবীকে’ ছেড়ে চলে আসেনি? কলেজ পালিয়ে পালিয়ে, সেই একজন ‘নতুন পৃথিবী’ গড়ে তোলার ফর্মুলা বানানেওলার কাছে ধর্না দিয়ে পড়ে থাকেনি?... তারপর একটি জ্বলন্ত মশালের পিছু পিছু চলে আসেনি পুরনো পৃথিবীর ঘর ছেড়ে?

‘নতুন পৃথিবী’ হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ‘কিন্তু এখন গড়ার সময়, দুঃখ দুর্দশা অভাব অনটন, অনাহার, মৃত্যু!’

পারমিতা হেসে বলেছিল, ‘মৃত্যু’ তো অবধারিত পরিণতি! তার বেশি কিছু তো হতে পারবে না?

পুরনো পৃথিবী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল — নিজের সর্বনাশ নিজে ডেকে আনছ, তা মনে রেখ!

পারমিতা হেসে বলেছিল, সর্বই নেই তা তার ‘নাশ’৷ আমরা তো সর্বহারার দলে!’ চলে এসেছিল একটা জ্বলন্ত মশালের আলোয় চোখ ফেলে ফেলে!

কিন্তু তখন কী টের পেয়েছিল মশালটা রংমশাল? যার মধ্যে বারুদের সম্বল সামান্যই! খানিকক্ষণ কিছু রঙিন আলোর ফুলকি ছড়িয়ে নিভে ঠান্ডা হয়ে যাবে?

ধীরে ধীরে টের পেতে লাগল!

প্রথম প্রথম অবাক হয়েছে পারমিতা, তারপর আহত! মর্মাহত! অতঃপর ক্ষুব্ধ ধিক্কারে উত্তাল হয়েছে! ক্রমশ আবার থিতিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে মেনে আর মানিয়ে নিয়ে নিয়ে চলেও চলেছে! তখন তো পান্টি এসে গেছে৷ পারমিতার চোখেই আর এক বস্তুকে গড়ে তোলার স্বপ্ন৷

এই মেনে আর মানিয়ে নেবার শক্তির জোগানদার কে?

ভালবাসা?... না শুধু অভ্যাস?

কে জানে৷ এখন আর উত্তর খোঁজে না পারমিতা! তবু জানে মোহভঙ্গের মতো যন্ত্রণা আর কিছু নেই!

পারমিতার মেয়েটাকেও কী সেই যন্ত্রণার শিকার হতে হবে একদিন?

নাঃ৷ পারমিতাকে দেখতেই হবে কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে পান্টি৷ কেমন তাদের রীতিনীতি? সাবধান করে দিতে হবে!

পান্টি তাকে জ্বালাতন করবার জন্যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের অভিনয় করলেও, চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেতে পারে না তো পারমিতা! মান অভিমান করে মেয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না৷

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আস্তে বলে ওঠে, পান্টি, ঘুমিয়ে পড়লি?

না তো! কেন?

না, এমনি!

রীতামাসির কথা ভেবে মন খারাপ লাগছে মা?

কথাটা শুনে হঠাৎ চোখে জল এসে যায় পারমিতার৷ অবনীশের একথা মনে পড়েনি৷ মনে পড়েনি আবাল্যের বন্ধুর এই ভাগ্য বিপর্যয়ে পারমিতার মন খারাপ হতে পারে! তা ওদের ‘নীতিপাঠে’ তো আবার ‘মন’ বলে বস্তুটা থাকার কথা নয়৷ সব ‘পাঠ’ বিসর্জন দিয়ে বসেছে, ওইটুকু মনে রেখেছে! কোনওখানে একটু মমতার প্রকাশ দেখতে পাওয়া যাবে না৷

তবু অবনীশের মেয়ের মধ্যে রয়েছে একটু৷

আস্তে বলে, তাই ভাবছি৷ কী হয়ে গেল!

কী আর করবে বল? মনকে শান্ত করে ঘুমোবার চেষ্টা কর!

একটু চুপ করে থাকে পারমিতা!

আবার হঠাৎই বলে ওঠে, পান্টি! একদিন তোর বন্ধুদের বাড়িতে ডাকবি?

পান্টি চমকে উঠে বলে, বন্ধুদের এ বাড়িতে? হঠাৎ একথা বলছ যে?

এমনি৷ ইচ্ছে হয়, কাদের সঙ্গে তোর এত ভাব? কারা নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার শপথ নিয়ে বসেছে? তাদের দেখি৷

ওঃ৷ গোয়েন্দাগিরি করতে চাও?

ছিঃ পান্টি৷

তবে? ঠাট্টা করছ?

নারে না৷ ঠাট্টা নয়! ভাবনা হয়!

ভাবনাটা কিসের? সন্দেহ হচ্ছে আমরা বোমা বানাচ্ছি, না ব্যাঙ্ক ডাকাতির পথ ধরেছি?... ওসবকে আমরা ঘেন্না করি মা! আমরা শুধু প্রত্যেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে চাই! সে তুমি বুঝবে না বাবা!

বুঝতে পারছি না বলেই তো তাদের দেখতে চাই!... ভাবছি পাছে ঠকে যাস৷

তা ঠকতে হয়ত পারি! ভুল করে ফেলে ঠকা অসম্ভব নয়৷ তবে জেনো, ঠকলে নিজেরাই ঠকব৷ অন্যকে ঠকাতে বসব না — ‘স্বর্গের ধোঁকা’ দিয়ে, ‘বৈকুণ্ঠের ধোঁকা’ দিয়ে!... কিন্তু রাত দুপুরে কী হল তোমার? ভূতে পেল? ঘুমোও তো!

তখন পান্টির গলায় ধমকের সুর!

আচ্ছা বাবা ঘুমোচ্ছি৷ তবে ডাকিস বাপু একদিন তাদের৷ দেখতে ইচ্ছে আছে৷

তাদের ‘এই বাড়িতে’ আসতে দায় পড়েছে৷

আসবে না?

বললাম তো দায় পড়েছে৷ কিন্তু তুমি ঘুমোবে কী ঘুমোবে না? মাথায় ঠান্ডা জল ঢেলে দেব?

আচ্ছা বাবা আচ্ছা, এই ঘুমোলাম৷

... কিন্তু ঘুমোতে কী পারল?...

আর পান্টির অহঙ্কার কী টিকল?

আসতেই হল না কি তাদের মধ্যের দুজনকে এই ধিক্কৃত বাড়িটায়?

ঝনঝন করে টেলিফোনটা বেজে উঠল পাশের ঘরে৷

যে ঘরের অপর পাশে অবনীশ৷ তিনিই উঠলেন৷

ফোনটা ধরে প্রথমটা অলস গাম্ভীর্যে ঘুমজড়ানো গলার ভঙ্গিতে বলেন, হ্যালো৷ কাকে চাই?...

তারপরই প্রায় ঠিকরে উঠে তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠেন, কী? এই রাতে পান্টিকে? স্টুপিড৷ রাস্কেল! বদমাশ! হারামজাদা!

হঠাৎ ঝড়ের বেগে ছুটে আসে পান্টি, অবনীশের হাত থেকে রিসিভারটাকে ফস করে ছিনিয়ে নিয়ে বলে ওঠে, কে? কী বলছিস৷ অ্যাঁ? কার অ্যাক্সিডেন্ট? কার কী হল, লাট্টু আর জোজো? কে আসছিস আমায় নিতে? ঠিক আছে৷ এক্ষুনি যাচ্ছি, চলে আয়!’

ফোনটা হাত থেকে ফেলে ছুটে ঘরে চলে যায়৷ চেঁচিয়ে ওঠে, ওগো মাগো! লাট্টু আর জোজো দু’জনে — মরে গেছে! ওমা আমি কী করব মা?

কোনওমতে একটা শাড়ি জড়িয়ে নেমে যেতে যায় নিচের দিকে! কিন্তু কোলাপসিবলে তালা লাগানো৷

বাবা! তালা খুলে দাও!

না!

কী বললে? না? অ্যাঁ? না? না মানে?

নিচে ট্যাক্সির হর্ন শোনা যায়৷ অসহিষ্ণু অস্থির৷ বাবা! খুলে দাও বলছি! ওরা এসে গেছে৷

আমি বলছি এসব হচ্ছে বদমাইশি! ষড়যন্ত্র৷

আঃ৷ বলছি ওরা আমার চেনা! খুব চেনা!

অবনীশ কঠোর গলায় বলেন, চেনা হলেও, এই রাত্রে তোমায় ওদের সঙ্গে যেতে দিতে পারি না আমি! কত রাত হয়েছে জানো?

জানি! সাড়ে বারোটা!... কিন্তু এখন না গেলে যে ওদের দেখতে পাব না বাবা! বলছে, ডেডবডি মর্গে নিয়ে চলে যাবে৷ তোমার পায়ে পড়ছি বাবা!

পান্টি! আমি বলছি, ওসব মিথ্যে কথা৷ সাজানো কথা! আমি এক্ষুনি ফোন করে পুলিস ডেকে ওদের অ্যারেস্ট করাচ্ছি৷

কথাটা অবাস্তব৷ তবু জেনেও বলেন৷

কিন্তু পান্টি ফুঁসে ওঠে, কী? তুমি ওদের অ্যারেস্ট করাবে? বলছি ওরা আমার বন্ধু! খুলে দাও বলছি গেট৷ নইলে চেঁচিয়ে পাড়ার লোক জড়ো করব!

কী? তুমি আমায় শাসাচ্ছ?... লোক তো ইতিমধ্যে জড়ো হয়েই গেছে জানলায় জানলায়৷ বেশ যত চেঁচাতে পার চেঁচাও৷

আমি ছাত থেকে লাফিযে পড়ব৷ দেখি তুমি কী কর!

পান্টি! কী হচ্ছে কী? থাম! চুপ কর৷

নেমে এসেছে পারমিতা৷ শান্ত গলায় বলছে, পাগলামি করছ কেন?...

অবনীশ যেন ধড়ে প্রাণ পান৷ যাক পারমিতাও হাল ধরতে এসেছে৷ তাকিয়ে দেখলেন নিমাই আর গীতাও একপাশে দাঁড়িয়ে! সবটাই অবনীশের পক্ষে বুকের বল৷

কিন্তু এটা কী হল? পারমিতা তেমনই শান্ত দৃঢ় গলায় বলে উঠলে, নিমাই! চাবি তো তোর কাছে৷ খুলে দে তালা৷

কী? খুলে দেবে?

দেবে৷ দিতেই হবে! নিমাই —

নিমাই তার স্যারের মুখের দিকে না তাকিয়ে খুলে দেয় সদরের কোলাপসিবলের তালা৷... বাইরের গেটের তালা৷ সঙ্গে সঙ্গে পান্টি গিয়ে ঝাঁপিয়ে গাড়িতে চাপে৷

অবনীশ খাঁচায় বন্দী বাঘের মতো গর্জন করে ওঠেন, তোমার মেয়েকে জানিয়ে দাও, এ গেটে যেন আর না মাথা গলাতে আসে!

পারমিতা স্থির ভাবে বলে, সেটা তাহলে শুধু ওকেই নয়, নিজেকেও বলতে হবে!

তার মানে? তা-তার মানে?

পারমিতা হাতের ইশারায় গাড়িটাকে জানান দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বলে, তার মানে হচ্ছে পাগল ছাগল যাই হোক আমি তো আর মেয়েটাকে ‘দূর হয়ে যা’ বলে, একা রাস্তায় ছেড়ে দিতে পারি না৷

হঠাৎ অবনীশ শরীরে একটা মোচড় দিয়ে, শুধু পায়জামা আর হাতকাটা গেঞ্জি পরা অবস্থায় লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে বলে ওঠেন, এই নিমাই৷ উল্লুকের মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেন? চাবিটাবি বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে যা! আর শোন! পাড়ার লোক তো মুখিয়ে আছে, জিজ্ঞেস করলে বলবি, দুটো ডাকাত গাড়ি চড়ে এসে গেট ভাঙতে চেষ্টা করছিল, তাদের ধরে ফেলে থানায় জমা দিতে যাওয়া হয়েছে৷

গাড়ি স্টার্ট দেয়৷

ছেলে দুটো ইস্পাত-ইস্পাত গলায় বলে ওঠে, স্যার কী আমাদের থানায় নিয়ে যাবার মতলব করছেন৷ সেটা করলে কিন্তু ভাল কাজ হবে না৷

অবনীশ অগ্রাহ্যের গলায় বলেন, ভাল তো সবই হচ্ছে৷ পরিস্থিতি দেখে তাই সন্দেহ হচ্ছে তোমাদের? বাঃ৷ পান্টি, তোর বন্ধুরা তো খুব বুদ্ধিমান৷

পান্টি অবশ্য ফুলে ফুলে কেঁদে চলেছে৷

কিন্তু পান্টির মা?

হায়া লজ্জা হারিয়ে তাঁর কেন মনে হচ্ছে, বুকের মধ্যে আচমকা এসে চেপে বসা ভারী পাথরের চাঁইখানা নেমে গেল! সেই ফাঁকা জায়গাটা দখল করে বসল অনেকখানি বল, ভরসা, নিশ্চিন্ততা৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%