অশোক দাশগুপ্ত
বাড়ি ফিরে আরতি পরপর দুটো অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট খেয়ে নিয়েছিল৷ এত মাথা ধরলে মানুষ পারে! দুদিন যদি ভাল থাকল তিনদিনের দিন হয়ত সকাল থেকে, না হয় দুপুরে কলেজে থাকতে থাকতেই, বা সন্ধের গোড়ায় মাথাটা ধরে উঠল৷ প্রথমে অতটা যন্ত্রণা দেখা দেয় না, ধরা ধরা ভাব থাকে, তারপর আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে৷ কপাল ছিঁড়ে যায় যেন, দুপাশের রগ দপদপ করে, মাথা ঘাড় টনটন করতে করতে একসময় অসহ্য যন্ত্রণায় আরতির মনে হয় তার মাথা বলে কিছু নেই— শুধু এক প্রচণ্ড যন্ত্রণা ঘাড়ের ওপর বসে আছে৷ আর তখন বমি বমি লাগে, চোখ খুলে তাকাতেও পারে না৷
আরতির মাথা ধরার কারণ জানতে একের পর এক ডাক্তার দেখিয়েছে৷ সাধারণ ডাক্তার, চোখের ডাক্তার, নাক-কান গলার ডাক্তার, মায় গাইনি৷ পুরুষ গাইনি নয়, মেয়ে গাইনি৷ সুজাতাদি ব্যবস্থা করে দিয়েছিল৷ তার চেনাজানা৷ মাঝারি বয়েস৷ আরতিদের কলেজের অনেককেই মহিলা দেখেন৷
যে যা বলেছে আরতি করেছে৷ ওষুধপত্র খেয়েছে৷ কিছুতেই কিছু হয়নি৷ বরং দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে উপসর্গটা৷ এখন তো এক একদিন মাথার যন্ত্রণা তাকে পাগলের মতন করে দেয়৷
আজ কলেজে একটা স্টাফ মিটিং ছিল৷ শুরু হবার কথা চারটেয়, শুরু হল প্রায় পাঁচটায়৷ এসব মিটিংয়ের কোনও মাথামুন্ডু নেই৷ বাজে গল্প করেই সময় কেটে যায়, না হয় ঝগড়া করে৷ মেয়েদের রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে তো টিচারদের দোষ দিয়ে কী লাভ! টিচাররা কি মাথার ঘিলু তৈরি করে দেবে৷ মফসসলের মেয়ে কলেজ৷ একরাশ মেয়েই শুধু কলেজে আসে যায়, ঘুরে বেড়ায়, পড়াশোনা করার মতন মগজই নেই চোদ্দআনা মেয়ের৷
মিটিং সেরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছটা৷ তখন জোর বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে৷ সাইকেল রিকশা থেকে নেমে মাথা বাঁচিয়ে যাও বাড়িতে ঢোকা গেল, পায়ের দিকের শাড়ি জলে কাদায় মাখামাখি, চটি জোড়া ন্যাতা৷ বাড়ির সামনে জলকাদা জমেছে৷
মিছরির মা বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করছিল৷ সকালে আসে বিকেলে যায়৷ তার হাতেই সংসার৷
বৃষ্টিবাদলার জন্যে ছটা বাজতেই অন্ধকার৷ মিছরির মা দাঁড়াল না৷ তার ছাতা টেনে নিয়ে পা বাড়াল দরজার দিকে৷ ‘আমি যাই দিদিমণি, যা বৃষ্টি নামল৷’
মিছরির মা চলে গেল৷
কাপড় ছাড়তে যেটুকু সময় গেল, তারপরই আরতি দু-দুটো অ্যাসপিরিন বড়ি খেয়ে ফেলল টপ টপ করে৷ কলেজে স্টাফ মিটিংয়ের সময় থেকেই সে বুঝতে পারছিল তার মাথা টিপটিপ করছে৷ বাদলা হাওয়া, বৃষ্টি— এসব যেন আর ধাতে সইছে না৷ যখন তখন মাথা ধরে যায়৷
একটু ধাতস্থ হয়ে আরতি চায়ের জল বসাল৷ খিদে পেয়ে গিয়েছে৷ খালি পেটে অ্যাসপিরিন খাওয়া খারাপ৷ ডাক্তার বারণ করে দিয়েছে৷ এমনকী বলেছে, এই অ্যাসপিরিন খাবার অভ্যাসটা ছেড়ে দিন৷ ভাল নয়৷
ভাল নয়— সে আরতিও বোঝে৷ কিন্তু মাথা ধরার সময় তার আর তর সয় না৷ খালি পেটেও খেয়ে ফেলতে হয়৷ অস্বস্তিও হয়৷ উপায় কি৷ মাথা ধরার গোড়ার দিকে ওষুধটা খেয়ে ফেললে তবু খানিকটা বাঁচা যায়, নয়ত একবার বাড়তে শুরু করলে বেড়েই যায় মাথার যন্ত্রণা৷
মিছরির মা জলখাবার করে রেখে গিয়েছিল৷ সুজি, চিঁড়ে ভাজা৷
খাবার আর চা গুছিয়ে নিয়ে ঘরে এল আরতি৷ বাইরে বৃষ্টি পড়ছে তখনও৷ জোর ভাবটা কেটে গিয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি৷ মেঘ ডাকছে৷ আজ সারারাতই এইরকম চলতে পারে৷
বিছানায় বসে আরতি চা জলখাবার খেতে শুরু করল৷ মাঝে মাঝে মাথা টিপে ধরছিল৷ কষ্ট হচ্ছে৷ কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না৷ যদি এই অবস্থায় থাকে এখন ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিতে পারলে হয়ত আরাম পেতেও পারে৷ ঠিক নেই কিছু৷
আরতির এই ঘরটা মন্দ নয়৷ মাঝারি মাপের৷ দুটো জানলা৷ দেওয়াল অবশ্য খরখরে, বর্ষায় একটু সেঁতিয়ে থাকে, তাহলেও তার খারাপ লাগে না৷ একটা খাট, ছোট একটা আলমারি, আলনা, এমনকী ড্রেসিং টেবিল পর্যন্ত গুছিয়ে গাছিয়ে রেখে দিয়েছে৷ এইসব আসবাবপত্রের মধ্যে দুটো সে কলকাতা থেকে আনতে পেরেছিল, খাট আর আলমারি৷ বাকি এখানে থাকতে থাকতে কিনে নিতে হয়েছে৷ না কিনলে চলবে কেন? এ তো বদলির চাকরি নয়৷ আরতিকে কতকাল এখানে পড়ে থাকতে হবে কে জানে! হয়ত রিটায়ার করার সময় পর্যন্ত৷ মানে এখনও বছর আটাশ৷ একমাথা পাকা চুল, বাঁধানো দাঁত, বাত, হার্টের রোগ— কত কী সঙ্গে নিয়ে তবে না বিদায় নিতে পারবে এখান থেকে৷
চা খাওয়া শেষ হয়েছে কি বাইরে কে দরজায় ধাক্কা দিল৷
সামান্য অবাক হল আরতি৷ নিচের তলায় থাকে উপাধ্যায়৷ তার পরিবার বলতে স্ত্রী, দুটো ছেলেমেয়ে৷ উপাধ্যায় ব্যবসাপত্র করে৷ বাজারে তার দোকান৷ স্টেশনারি৷ বড় দোকান৷ উপাধ্যায়ের বউ আর ছেলেমেয়ে গিয়েছে রাঁচিতে৷ বউয়ের দাদার কাছে৷ দিন কয়েক থাকার কথা৷ নিচে এখন উপাধ্যায়ের এক বুড়ি কাজের লোক ছাড়া কারও থাকার কথা নয়৷ বুড়ি আবার রাতকানা গোছের৷ উপাধ্যায়ের ফিরতে ফিরতে রাত নটা দশটা৷
‘কে?’ আরতি বলল৷
কোনও সাড়া নেই প্রথমে৷ তারপর আবার দরজায় ধাক্কা৷ ধীরে ধীরে৷
‘কে?’ আরতি সদরের কাছে এসে দাঁড়াল৷
‘আমি৷’
গলার স্বরটা চেনা না গেলেও মনে হল— লাইব্রেরির যোগেনবাবুর মতন৷ যোগেনবাবু এখানকার কলেজের লাইব্রেরিয়ান৷ কাছাকাছি পাড়াতেই থাকেন৷ আরতির ভাল লাগে যোগেনবাবুকে৷ মিশুকে নম্র স্বভাবের মানুষ৷
‘যোগেনবাবু?’ আরতি দরজা খুলে দিল৷ বলতে যাচ্ছিল— এই বৃষ্টির মধ্যে? মুখের কথা মুখেই থেকে গেল, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে যে লোকটা পা বাড়াল ভেতরে, তাকে চিনতে পারল না আরতি৷ ভয় পেয়ে গেল৷ উটকো, অচেনা লোক৷
‘আমি সলিল৷ চিনতে পারছ না?’
সলিল! আরতি সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পেরে গেল৷ আদলে চিনল, নামে চিনল— কিন্তু মানুষটার চেহারা দেখে চট করে তাকে সলিল বুঝে নেওয়া মুশকিল৷
আরতি কিছু বলার আগে সলিল দরজা ভেজিয়ে দিল৷
প্রথম দিককার চমকানি কেটে যাবার পর আরতি যত অবাক হল, ততই ভয় পেয়ে গেল৷ সলিল এখানে? হঠাৎ? কী মনে করে হাজির হয়েছে এখানে? ভয় পেয়ে গেল; তার ওপর বিরক্তিও লাগছিল আরতির৷
‘যেন চিনতেই পারছ না?’ সলিল বলল৷
‘তুমি এখানে কেন?’
‘তোমার কাছে৷’
‘আমার কাছে?’
সলিল আশপাশ তাকাল৷ প্যাসেজ, রান্নাঘর, বাথরুম৷ একটা বোধহয় এক চিলতে ভাঁড়ার ঘর, বা অন্য কিছু৷ প্যাসেজে বাতি জ্বলছিল৷ আলোয় জোর নেই৷
‘এক গ্লাস জল খাওয়াবে?’
আরতির মনে হল বলে দেয়, না৷ কিন্তু জল খেতে চাইলে কাউকে না বলা যায় না৷ লোকটা ভিজেছে৷ মাথায় জল৷ গায়ের জামা স্যাঁতস্যাঁতে৷ পায়ের চটিও কাদায় মাখামাখি৷ অবশ্য এসব তার দেখার কথা নয়৷
আরতি বাধ্য হয়েই জল আনতে গেল৷
রান্নাঘর থেকে জন নিয়ে ফিরে এসে দেখল, সলিল পায়ের বাঁধা চটি খুলে একপাশে সরিয়ে রেখে দু-চার পা এগিয়ে এসেছে৷
জলের গ্লাস এগিয়ে দিল আরতি৷
প্রায় এক চুমুকে জল শেষ করে সলিল বড় করে শ্বাস ফেলল৷ বলল ‘তোমার এই বাড়ি খুঁজতে আমার ঘণ্টাখানেকের বেশি লেগে গেল৷ আট টাকা রিকশা ভাড়া বেরিয়ে গেল পকেট থেকে৷ কত দূরে থাক তুমি!’
আরতি বিরক্ত হয়ে উঠেছিল৷ লোকটা এখানে এল কেমন করে? কী মতলবে এসেছে ও?
শক্ত গলায় আরতি বলল, ‘আমার বাড়ি খুঁজে আসার দরকার কী হল তোমার?’
সলিল গায়ে মাখল না কথাটা৷ তাকিয়ে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল৷ যেন বোঝাতে চাইল, তোমায় খুঁজে বার করেছি কেমন দেখলে তো!
আরতির বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না সলিলকে দেখার৷ তবু দেখছিল৷ সামনে একজন দাঁড়িয়ে থাকলে চোখ বন্ধ করে থাকা যায় না৷ সস্তা জামা, বোধহয় হ্যান্ডলুমের, চেক কাটা৷ প্যান্টটার রঙ খয়েরি না কালো বোঝা যাচ্ছে না৷ সলিলের মুখ বসে গেছে৷ গালের হাড় ফুটে উঠেছে ধারালো ভাবে৷ মুখ আধ-কামানো দাড়ি৷ চোখ দুটো সামান্য লালচে৷ দাঁত বের করে হাসছে লোকটা৷ এখনও সেইরকম বড় বড় চুল৷
কী বলতে গিয়ে সলিল থেমে গেল৷ তারপর হাঁচল৷ পরপর৷ পকেট থেকে ছিটকাটা রুমাল বের করে নাক মুখ মুছল৷ মুছে রুমালটা মাথায় ছোঁয়াল৷ ‘তখন থেকে ভিজছি৷ কী বৃষ্টি শুরু হল বল তো! বাইরে যা অবস্থা, হোল নাইট চলবে৷’ বলে এদিক ওদিক তাকাল৷
‘তোমার বাথরুম কোনটা বল তো পা দুটো ধুয়ে নিই৷ জলকাদায় একেবারে মাখামাখি হয়ে গেছে৷’ বলে পায়ের দিকটা দেখাল৷
আরতির মাথার মধ্যে যেন একটা শিরাটিরা ছিঁড়ে গিয়ে টনটন করে উঠল৷ রেগে উঠছিল সে৷ ‘পা ধোবার দরকার নেই৷ বৃষ্টিতে জলকাদা লাগেই৷’
‘আরে, শুধু ধোব কেন— ইয়ে একটু—’ বলে পেটের দিকে দেখাল, ‘ফেটে যাবার যোগাড়৷’
আরতির মাথা গরম হয়ে উঠল৷ ‘তুমি কি এখানে খুঁজে খুঁজে বাথরুম করতে এসেছ৷ যাও, রাস্তাঘাট পড়ে আছে৷’
সলিল একই রকম মুখ করে হাসল৷ যেন বোঝাতে চাইল, আরতি যে কী আজেবাজে কথা বলছে৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়াল৷ ‘ওইটে বাথরুম না! মনে হচ্ছে...!’
সলিল একেবারে সোজা বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল৷
আরতি একেবারে থ দাঁড়িয়ে থাকল৷ ছুটে গিয়ে লোকটাকে ধরে টেনে হিঁচড়ে খামচে দরজার কাছে এনে ঘাড় ধরে বাইরে বার করে দেবে নাকি! এমন অসভ্য জানোয়ারকে আর কী করা যেতে পারে!
বাথরুমের দরজা আধ-ভেজানো ছিল৷ দরজা খুলে ভেতরে পা বাড়াবার আগে সলিল ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘আলোটা জ্বেলে দাও প্লিজ!’
আরতি লোকটার স্পর্ধা দেখছিল৷ বলা নেই কওয়া নেই— অন্যের বাড়িতে ঢুকে এমন ভাব করছে যেন এটা তার নিজের বাড়ি৷ এমন নির্লজ্জ, বেহায়া, ইতর আর দেখা যায় না৷ বরাবরই এইরকম ছিল৷ গোড়ায় বোঝা যায়নি এমন করে, পরে বোঝা গিয়েছিল৷
সুইচটা অন করে দিল আরতি৷ কথা বাড়িয়ে লাভ নেই৷ একটা বেহায়ার সঙ্গে চেঁচামেচি করে কী লাভ!
সলিল ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল৷
আরতি বুঝতে পারছিল না— কী করবে! সদর ভেজানো, ছিটকিনি তোলা নেই৷ মানুষটা যে বাথরুম থেকে ফিরে এসে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে তাও মনে হয় না৷ খুঁজে পেতে আট টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে এসেছে যখন— তখন অত সহজে যাবার পাত্র ও নয়৷
এখন আরতি কী করতে পারে? এইভাবে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না বাথরুমের দিকে তাকিয়ে৷ বিশ্রী দেখায়! লোকটাকে তাড়াবেই বা কেমন করে? নিচে উপাধ্যায়ের বউ বাচ্চা নেই, যে বুড়িটা আছে সেটা রাতকানা৷ নয়ত বাড়িতে ঢোকার সদরটাই বন্ধ করে রাখত৷ অবশ্য এত সাত তাড়াতাড়ি নিচের সদর বন্ধ হয় না৷
আরতি এখন কিছুই করতে পারে না৷ নিচে নেমে গিয়ে পাশাপাশি কোনও বাড়ি বা দোকান থেকে লোক ডেকে আনতে পারে না এই বলে যে, আমার বাড়িতে একটা বাজে লোক ঢুকেছে, বার করে দাও৷ না না, তাতে অসুবিধা আছে!
প্যাসেজে না দাঁড়িয়ে আরতি তার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল৷ মাথায় যন্ত্রণা যাও বা কমের দিকে যাচ্ছিল আবার বাড়তে শুরু করল৷ ভুরুর ওপর দপদপ করছিল৷ কী ঝঞ্ঝাটে পড়া গেল৷
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল সলিল৷ গায়ের জামা খোলা৷ এক হাতে তোয়ালে৷ মাথাটা মুছে নিচ্ছে৷ অন্য হাতে জামা৷ ‘তোমাদের বাথরুমের কলে এখন জল থাকে না?... বালতিতে জল!... এখানে জল রাখার সেই পাওয়া যায় না—? প্লাস্টিকের বালতির চেয়ে বড় বড় ড্রামের মতন বালতি বেরিয়েছে— তাই কিনে নিও৷... জামাটা শুকিয়ে নি৷ আমার আবার চট করে বুকে পিঠে ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে আজকাল৷ লাগলেই ফ্লু, ব্রঙ্কাইটিস!’ বলতে বলতে সলিল এগিয়ে এসে তোয়ালেটা গায়ে জড়িয়ে আবার খুলে ফেলল৷ যেন গা মুছে নিতে গিয়ে খেয়াল হল, আগেই গা মুছে নিয়েছে৷ তোয়ালেটা কোথায় রাখবে দেখে নিয়ে প্যাসেজে টাঙানো প্লাস্টিকের দড়িতে রেখে দিল৷
আরতি তাকিয়ে থাকল৷ সলিলের গায়ে গেঞ্জি নেই৷ খোলা বুকপিঠ! বুকে একটাও লোম নেই৷ কোনওদিনই ছিল না৷ তবে খানিকটা মাংসমেদ ছিল, পাতলা করে৷ এখন একেবারে হাড়৷
‘কই চা বসিয়েছ?’ সলিল বলল৷
‘চা?’ আরতি থ হয়ে গেল৷
‘বাঃ! বৃষ্টিতে ভিজে কাদা৷ চা খাব না! তুমি যেন কেমন বাজে ব্যবহার করছ৷ কেউ বাড়িতে এলে এক কাপ চা খেতেও তো মানুষ বলে৷ অন্য কিছু না খাওয়ালে৷ এক কাপ চা যে কোনও ভদ্রলোকের প্রাপ্য!’
‘তুমি ভদ্রলোক?’
‘না হলে ছোটলোক! তবে ছোটলোকও এক কাপ চা পেতে পারে৷’
‘না৷ আমার শরীর খারাপ৷ মাথার যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি৷ তুমি যাও৷ আমায় জ্বালিও না আর৷’
সলিল হাসল৷ ধূর্তের মতন হাসি৷ ‘বেশ, তুমি তাহলে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়৷ আমি চা তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছি৷ দু-কাপ৷ চা আমি ভালই করতে পারি, তুমি জানো! যদি বলো তোমার মাথাও টিপে দিতে পারি৷... কই তোমার পাখা কোথায়! ঘরে! প্লিজ সরো৷ জামাটা শুকিয়ে নি৷ ভিজে একেবারে সপসপ করছে৷’
আরতি সরল না৷ ‘আমার ঘরে তুমি ঢুকবে না৷’
সলিল একটু হাসল৷ ‘কী ছেলেমানুষি করছ! তোমার ঘরে আমি নতুন ঢুকছি না৷’
আরতি আর মাথা ঠিক রাখতে পারল না৷ গলা চড়িয়ে রুক্ষভাবে বলল— ‘তুমি যাবে? না আমি লোক ডাকব?’
সলিল যেন কতই অবাক হয়েছে, ক’মুহূর্ত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল আরতিকে৷ বলল, ‘লোক ডাকবে? কেন? আমি তোমার কী করেছি! বাড়িতে দেখা করতে এসেছি এটা দোষের হল?’
‘কে তোমায় দেখা করতে বলেছে?’
‘আমি নিজেই এসেছি৷’
‘কেন?’
‘ধর তোমায় দেখতে৷’
‘নাটক করো না৷’
‘তুমি আরও বেশি করছ!... নাটক নয়, যাত্রা৷ শোনো আরতি, তুমি জোর করলে আমি চলে যাব৷ কিন্তু কাল তোমার কলেজে যাব দেখা করতে৷’
আরতি চমকে গেল৷ বলে কী লোকটা! কলেজে যাবে দেখা করতে!
‘আমি তোমার কলেজে যাব দেখা করতে—’ সলিল বলল, ‘তোমাদের অফিসে কিংবা প্রিন্সিপালের ঘরে স্লিপ পাঠাব৷ তাতে নিজের নামের তলায় একটি পরিচয় তো লিখতেই হবে৷ যা সত্যি তাই লিখব৷’
আরতি একেবারে পাথর হয়ে গেল! ক’মুহূর্ত যেন চোখেও কিছু দেখতে পেল না৷ মাথার মধ্যে টলমল ভাব এল৷ লোকটা শয়তান৷ বরাবরের শয়তান৷
নিজেকে সামলে নিতে চাইছিল আরতি— তার আগেই সলিল তার পাশ কাটিয়ে সামান্য সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকল৷ ঢুকে গায়ের জামাটা শুকোতে দিল৷ পাখা চলছিল৷ বাড়িয়ে দিল পাখাটা৷
আরতির যেন আর কিছু করার ছিল না৷ সলিলের কথা তাকে শুনতেই হবে৷ না শুনলে ক্ষতি যদি নাই হয়— তাকে লজ্জায় পড়তে হবে৷ মুখ নিচু করে মাথা হেঁট করে থাকতে হবে এখন৷ কতদিন তা সে জানে না৷ তাছাড়া বলাও যায় না, এই মফসসলের মেয়ে কলেজের কর্তারা, প্রিন্সিপাল, অন্য অন্য টিচাররা কী ভাববে৷ হয়ত তার আর চাকরি করাও চলবে না৷
কিছু বলল না আরতি, চা করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল৷
চা নিয়ে ফিরে এসে, আরতি দেখল, সলিল আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে৷ নিজের প্যান্ট খুলে পাখার তলায় ছড়িয়ে দিয়েছে৷ দিয়ে আরতির একটা শাড়ি দু-পাট করে পরে খালি গায়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাচ্ছে৷
আরতিকে আসতে দেখে সলিল উঠে বসল৷ সিগারেটটা জানলার দিকে ছুঁড়ে দিল৷ ‘বৃষ্টিতে নেতিয়ে গিয়েছে৷ ...শুধু চা?’
‘ঘরে এখন কিছু নেই৷ বিস্কিটও নেই৷’
'দাও চা-টাই দাও৷’
আরতি চা এগিয়ে দিল৷ ‘তুমি বাড়াবাড়ি শুরু করেছ৷ খেতে পেলে শুতে চায়...৷ আমায় ভয় দেখাতে এসেছ তুমি?’
‘না৷ বাই নো মিনস!....খাওয়াই দিলে না তো শোওয়া! তুমি ভেব না৷ তোমার শাড়ি খুলে রেখে যাব৷ প্যান্টটা একটু শুকিয়ে যাক৷...বাঃ! বেশ চা করেছ!’
‘তুমি এখানে কেন এসেছ?’
‘কাজে৷ আমি এখন মোটরগাড়ির টায়ারের ব্যবসা করছি৷ টায়ার বেচার ব্যবস্থা করতে এসেছি৷ কলকাতায় আমাদের কারখানা আছে৷ আধপুরনো টায়ার সারিয়ে একেবারে নতুনের মতন করেছি৷ নতুন টায়ারের এখন অনেক দাম৷ বাস মিনিবাসের মালিকরা রিট্রেডিং টায়ার কিনতে চায়৷ দামে সস্তা পড়ে৷... আরে তুমি বসো না৷’
আরতি বসল৷ মন জুগিয়ে চললে যদি আপদ বিদেয় হয়৷
‘তুমি নিজে কারখানা খুলেছ?’
‘না৷ পার্টনার আছে৷ তিনজনে খুলেছি৷’
‘টাকা পেলে কোথায়?’
সলিল হাসল৷ শব্দ করে নয়৷ বলল, ‘আবার একটা বিয়ে করেছি৷ একটু বয়েস হয়েছে৷ দেখতে কালো৷ কিন্তু চেহারা মন্দ নয়৷ দারুণ বউ৷ এক্সপার্ট৷ তার গয়নাগাটি খুলে দিল৷ বলল, করো ব্যবসা৷ তবে টাকা উড়োবে না৷’
আরতি যেন বেঁকা করে হাসল৷ ‘তোমার মনের মতন বউ!’
‘ভাল বউ৷ আমরা এখন বেলগাছিয়ায় থাকি৷ ভীষণ সামলে থাকি! যত পারি খরচ বাঁচাই৷ টাকাটা তুলতে হবে৷ ...তাছাড়া—’
‘তাছাড়া?’
‘ওর বাচ্চাকাচ্চা হবে৷ আর মাস দুই...৷’
আরতি তাকিয়ে থাকল৷ পলক পড়ছিল না চোখের৷
চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল সলিল৷ আরতিকে দেখতে লাগল৷ খুব তীক্ষ্ণভাবে৷ শেষে একটু হাসল৷ ‘আমি বিয়ে করেছি বছর দুই৷ বউয়ের এখন এইটথ মান্থ৷... আমি তোমায় একটা কথা বলতে এসেছি৷ তুমি বলতে আমি— আমার ফিজিক্যাল গোলমাল আছে৷ বাচ্চাকাচ্চার বাবা আমি হতে পারব না৷ বলতে কিনা!’
আরতির যেন বুকের মধ্যে কেমন অস্বস্তি হতে লাগল৷ শুকনো গলায় বলল, ‘ডাক্তাররা তাই বলেছিল৷’
‘তোমার ডাক্তার৷’
‘আমার ডাক্তার কেন! তোমার ডাক্তারও৷’
‘সব শালা বাজে মাল! ফালতু!... তারা ধাপ্পা মেরেছিল৷ তুমি তাদের দিয়ে ধাপ্পা মারিয়েছ কিনা কে জানে!’
‘সলিল—!’
‘তুমি আমাকে বিয়ে করার পর এক বছরের মধ্যেই খেপামি শুরু করলে৷ গাছ লাগালেই ফল৷ আসলে... আমাকে তোমার পছন্দ হচ্ছিল না৷ আমার নোংরা বাড়ি, বুড়ি মা, আমার সামান্য রোজগার,...ও কে, সবই বুঝি৷ তুমি একটা বাজে ছুতো বার করে বিয়ে ভাঙলে৷ ভাঙলে তো বয়েই গেল৷ কিন্তু তুমি, আমার যে দোষ দেখিয়ে এলে সেটা সাংঘাতিক৷ এই আমি— সলিল লাহিড়ী— আমার একটা ছেলেপুলে থাক— এটা আমি তোমার চেয়েও বেশি করে চাইতাম৷ কে কোন জিনিস বেশি ভালবাসে— ভালবাসতে চায়— তুমি কি বুঝবে!’
আরতি কিছু বলতে যাচ্ছিল, বলতে পারল না৷
সলিল উঠে পড়ল খাট ছেড়ে৷ প্যান্টটা দেখল৷ জামাটাও দেখে নিল৷ ‘তুমি আমাকে বেজায়গায় মেরেছিলে আরতি৷ আমাকে তোমার ভাল না লাগতে পারে৷ আমার সম্পর্কে তোমার ঝোঁক কেটে যেতে পারে৷ স্বাভাবিক৷ একসময় লাগত বলে বরাবর লাগবে— এমন কথা নেই৷ আমাদের বাড়ি, আমার মা, আমার রোজগার...’
আরতি বাধা দিল৷ বলল, ‘তুমি ঝগড়া করতে এসেছ?’
‘না৷ আমি বলতে এসেছি, তুমি মিথ্যে মামলা...’
‘মামলা?’
‘একই হল৷ ... মিথ্যে কথা৷ যে কোনও পুরুষ মানুষের কাছে ব্যাপারটা লজ্জার৷ ওটা তুমি ঠিক বুঝবে না, ভেতরের একরকম নেকেডনেস৷ তার পৌরুষকে তামাশা করা৷’
আরতির ইচ্ছে হল বলে, আমি মিথ্যে কথা বলিনি৷ যা জেনেছি বলেছি৷ তুমি আমি না-না করেও তিন চারজন ডাক্তার দেখিয়েছি৷ সবাই কি আমাদের ধাপ্পা দিয়েছিল৷ আমি বিশ্বাস করি না৷
সলিল প্যান্টটা তুলে নিল৷ নিয়ে জানলার দিকে সরে গেল৷ তার পিঠ আরতির দিকে৷
‘তুমি আজ রাত্তিরে আমায় থাকতে বলতে পার৷ বলবে নাকি?’
আরতি শিউরে উঠল! লোকটার কি মাথা খারাপ!
প্যান্ট পরার জন্যে তৈরি হতে হতে সলিল বলল, ‘লজ্জা করলে ঘরের বাইরে যেতে পার৷ অবশ্য তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত নয়৷ তুমি...’
‘আমি আসছি৷’
বাইরে এল আরতি৷ সলিল যা বলছে, ঠিক নয়৷ তার সত্যিই মাথায় গন্ডগোল আছে৷ এতগুলো ডাক্তার ভুল বলবে? তারা ভুল বলেনি৷ তবে হতে পারে, সলিলের দোষ শুধরে গিয়েছে৷ যদিও কেমন করে কে জানে! জগতে কতরকম আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে৷ অদ্ভুত কিছু হতে পারে সলিলের৷ কে বলতে পারে!
সলিল ডাকল না, নিজেই বাইরে এসে দাঁড়াল৷ ‘তুমি এখানে আছ, কলেজে কাজ করছ, জগবন্ধু আমায় বলেছিল৷ আমাকেও কাজে এখানে এসে পড়তে হল৷ ভাবলাম, যাই দেখা করে সুখবরটা দিয়ে যাই৷ তুমি ভেবেছিলে তোমার কাছ থেকে কিছু হাতাতে এসেছি৷’ হাসতে লাগল সলিল৷ ‘তোমার কাছ থেকে হাতাবার নতুন কী আছে!’
আরতি সলিলকে দেখছিল৷ গায়ের জামা এখনও শুকোয়নি৷ প্যান্ট ভিজেই আছে৷
‘আমাকে দেখে তুমি একেবারে ভয়ে সাদা ছাই হয়ে গিয়েছিল, তাই না?’
জবাব দিল না আরতি৷
‘তুমি কলেজে কী নামে আছ?’
‘আগের নামে৷’
‘লাহিড়ী বাদ দিয়েছ৷ ভালই করেছ! চলি৷’
সলিল দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে কাদামাখা চটিটা পায়ে গলিয়ে পরে নিল৷
‘তোমাকে যথাসময়ে সুখবরটা দেব৷’
‘সুখবর! ও!’
‘প্রভাকে দেখতে, এখন বড় ভাল লাগে৷’
‘ও৷’ বলেই আরতির কেমন খেয়াল হল— প্রভা! পাড়ার সেই বিধবা মেয়েটা! যাকে সবাই ঠাট্টা করে বলত, ‘রসবিধবা’৷
সলিল দরজা খুলল৷ ‘চলি৷ আমি পরশু দিন কলকাতায় ফিরে যাচ্ছি৷ ... তবে ভেব না, আবার উৎপাত করতে আসব! আসি৷’
চলে গেল সলিল৷
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল আরতি৷ সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়েছে লোকটা৷ বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে এখনও! আবার যদি ফিরে আসে!
দরজা বন্ধ করল আরতি৷
সলিল কি এখানে নাটক করতে এসেছিল৷ তার আসা-যাওয়া নাটকের মতনই৷ সে বলল, সুখবর জানাতে এসেছে৷ কিসের সুখবর? তার বউয়ের বাচ্চাকাচ্চা হবে৷ মানে সলিল বাবা হতে যাচ্ছে৷ সে পৌরুষহীন নয়৷
আরতির মনে হল, সলিলের পক্ষে এটা যে সুখবর নয়, সে জানে না৷ পিতৃত্ব অর্জনের ক্ষমতা তার নেই৷ অন্তত থাকার কথা নয়৷ অবশ্য সে অন্যের ধনে ধনী হতে পারে৷ প্রভা মেয়েটাকে আরতি জানে৷ দেখেছে৷ নিজের গায়ের গয়না খুলে স্বামীর ব্যবসায় দিয়েছে যখন তখন নিশ্চয় স্বামীঅন্ত প্রাণ৷ সতী লক্ষ্মী বিধবা৷ স্বামীর সুখের জন্যে সবই করতে পারে৷ হয়ত, কে বলবে, স্বামীকে সন্তান দেবার জন্যে সে আরও কত কী দিতে জানে! বা নিজে নিতে চায় বলে দিতে পারে৷
ঘরে ফিরে এল আরতি৷ পাখা চলছে৷ বৃষ্টির মিহি শব্দ৷ আরতির শাড়িটা মেঝেয় পড়ে৷ সলিল পরেছিল৷
বিছানায় বসার আগে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল আরতি৷ প্রভাকে তার স্পষ্ট করে মনে পড়তে লাগল৷ সলিলদের পাড়ার বাহান্ন কি তিপ্পান্ন নম্বর বাড়ির মেয়ে৷ বিধবা হয়ে বাপের বাড়িতে এসে থাকত৷ তার বাবার সোনার দোকান ছিল কোথায় যেন৷ বোধহয় গরানহাটায়৷ প্রভা পাড়ার পুরুষ মানুষদের কাছে ছিল ‘রসবিধবা’৷ তার খ্যাতি ছিল নানারকম৷ প্রভার মা আধ পাগলা তায় এক অঙ্গ অসাড়৷
আরতি বুঝতে পারছিল না, সলিল এই প্রভাকে কেমন করে বিশ্বাস করল? আরতির যে সলিলকে, তাদের বাড়ির ব্যাপারস্যাপার, তার মা, অভাব, টানাটানি ভাল লাগেনি শেষ পর্যন্ত এটা সত্যি কথা৷ কিন্তু সলিলের ভেতরের দোষ সম্পর্কে সে মিথ্যে বলেনি৷
তাহলে?
ব্যাপারটা ভোজবাজি, না প্রভার চালাকি, না স্বামীকে সুখী করার জন্যে কোনও ছলনা— আরতি বুঝতে পারছিল না৷
পায়ে করে শাড়িটা মেঝে থেকে সরিয়ে একপাশে ফেলে রেখে আরতি বিছানায় বসল৷
বসে বুঝতে পারল, তার মাথার এখন যা অবস্থা তাতে আবার দুটো অ্যাসপিরিন খাওয়া দরকার৷
কিন্তু ও জিনিস বেশি খাওয়া উচিত নয়৷ খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন