পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার

অশোক দাশগুপ্ত

ড্রইং রুমে হাত পা ছড়িয়ে সোফায় হেলান দিয়ে পড়ে আছি৷ বাড়িতে আমি একা৷ হরি গেছে রেশন তুলতে৷ রেখা ইস্কুলে৷ ঝিমলিকে নিয়ে আসতে৷

অফিসের কাজে সিন্ধ্রি-ধানবাদ গিয়েছিলাম৷ দিন চারেকের মতো জোর ব্যস্ততার শেষে আজই কলকাতা ফিরছি৷ ভোরের এক্সপ্রেস ট্রেনে৷ সাড়ে চার ঘণ্টার জার্নি৷ তারপর হাওড়া পৌঁছে সোজা ডালহৌসির হেড অফিসে৷ রিপোর্ট ইত্যাদি জমা দিয়ে বাড়িতে পৌঁছতে বেলা আড়াইটে৷ অবেলায় স্নানাহার৷ শরীর আর বইছে না৷ ক্লান্তিতে দু’চোখের পাতা ভারী৷ তবু ঘুমুতে পারছি না৷ রাস্তার ঠিক উল্টোদিকে চায়ের দোকানের লাগোয়া লালবাড়ির খোলা রোয়াকে বখাটে ছেলে-ছোকরাদের জটলা৷ থেকে থেকে বিকট চিৎকারে কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম৷

এ পাড়ায় এসেছি তা বছরখানেক হয়ে গেছে৷ রাস্তার গা ঘেঁষে দোতলায় আট স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাট৷ স্টেশনের পশ্চিমদিকে বলে, কিছুটা সস্তায় পেয়েছি৷ স্কোয়্যার ফুট সাড়ে পাঁচশো টাকা৷ বাসরাস্তা থেকে খানিকটা দূরে হলেও রেলস্টেশন বাজার দোকানপাট সব হাতের কাছে৷ রেখা দেখেশুনে সামনের দিকের এই ফ্ল্যাটটা পছন্দ করেছিল৷ দক্ষিণ-পুব খোলা৷ আলোবাতাসের অভাব নেই৷ সব মিলিয়ে আদর্শ ফ্ল্যাট৷ তবু ওর অঙ্কে ছোট একটা ভুল থেকে গিয়েছিল৷ তার জন্য অবশ্য রেখাকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না৷ ও-ই বা চট করে বুঝবে কেমন করে৷ পুরনো পাড়া বলে এদিকে একটা গ্রাম্য ভাব রয়ে গেছে৷ অন্যের ব্যাপারে ভীষণ কৌতূহল এখানকার মানুষজনের৷ গায়ে পড়ে আলাপ জমানোর চেষ্টা৷ নির্লিপ্ত থাকার উপায় নেই৷ যেচে ভাব জমাবে৷ তার ওপর বেকার ছেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় নিশ্চিন্ত থাকা যায় না৷ সকাল দুপুর সন্ধে সময় অসময় নেই কলিং বেল টিপবে৷ বারো মাসে তেরো পার্বণের হিড়িক৷ হাতে চাঁদার বিল৷ নয়ত অমুক বাড়ির দুঃস্থ মেয়ের বিয়ে, ক্লাবের বার্ষিক আবৃত্তি সঙ্গীত প্রতিযোগিতা, পাড়ায় মিনি জলসা— এমনি হরেক কিসিমের ছুতো করে হানা দেবে৷ এ নিয়ে প্রতিবাদ-তর্ক বৃথা৷ এ পাড়ার দস্তুরই এটা৷ ওদের মনপসন্দ না হলে সরাসরি মুখ খারাপ করবে৷ কিংবা রাস্তায় নামলে ঠারে-ঠোরে হজম করতে হবে অশ্রাব্য গালিগালাজ৷ ট্যুরের চাকরি আমার৷ মাসের মধ্যে পনেরো দিনই বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়৷ ঘরে রেখা আর ঝিমলি৷ তায় ঝিমলি পনেরোয় পা দিয়েছে৷ দেখতেও রীতিমতো ভাল, ডাগর ডোগর৷ ফলে যতটা সম্ভব সমঝে চলার চেষ্টা করি৷

এ জাতীয় উপদ্রব সামাল দেওয়া গেলেও রাস্তার ওধারের রোয়াকে গজল্লা৷ তাকে থামাব কী করে৷ ছোকরাগুলো অহেতুক চেঁচিয়ে কথা বলে, মুখ খিস্তি করে, হিন্দি গানের কদর্য কলি আওড়ায়৷ পথচারীদের রেয়াত করে না৷ সুযোগ পেলেই নানা কুৎসিত মন্তব্য করে৷ রাস্তা দিয়ে রেখা-ঝিমলিকেও চলতে হয়৷ আমি সবসময় বাড়ি থাকি না৷ এ কথা নিশ্চয়ই অজানা নয় ওদের৷ সুতরাং ওদেরও কি ছেড়ে কথা কয়, মোটেই না৷ কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই৷ কেউ প্রতিবাদ করে না৷ আর আমি তো এ পাড়ার নতুন বাসিন্দা৷ তাই না-দেখা না-শোনার ভান করে চলাফেরা করি৷

ঝিমলিকে নিয়ে রেখার ফিরতে বেলা পাঁচটা গড়িয়ে যায়৷ ততক্ষণে ব্যালকনি থেকে রোদ ওপরের দিকে উঠে গেছে৷ ঝিমলির ইস্কুল ছুটি হয় চারটেয়৷ বাস রাস্তার ওধারের ইস্কুল থেকে আমাদের ফ্ল্যাট, হাঁটাপথে বড় জোর মিনিট দশেকের মতো সময় লাগে৷ দরজা খুলে শুধোই, ‘এত দেরি হল যে!’

রেখার হাতে একটা বিগ-শপার৷ সেটা ভর্তি স্টেশনারি জিনিসপত্র৷ আমূল হোলমিল্কের কৌটো সাবান পেস্ট মাখনের প্যাকেট পাউডার ক্রিম থেকে ফিনাইল— কী নেই৷

‘দেরি হবে না তো কী৷’— বিগ-শপারটা মেঝেয় নামিয়ে রেখে শাড়ির আঁচল দিয়ে গলা ঘাড় কপাল মুছতে মুছতে খরখরে গলায় বলে রেখা, ‘এসব মাস-কাবারি মাল কে আনবে শুনি৷’

আমি ওকে শান্ত করার জন্য হালকা গলায় বলি, ‘কেন হরিকে দিয়ে আনালেই তো পার৷’ হরি ভোর ভোর ট্রেন ধরে চম্পাহাটি না পিয়ালি কোত্থেকে যেন আসে৷ থাকে সন্ধে সাতটা অবধি৷ এমনিতে খুবই বিশ্বস্ত৷ বেদম খাটতেও পারে৷ কিন্তু বুদ্ধিতে খাটো৷

আমার কথা শেষ হতে না হতেই ফের রাস্তার ওধারের চায়ের দোকানের লাগোয়া রোয়াক থেকে একটা উৎকট সমবেত উল্লাস ফণা তোলে৷ রেখার মুখে বিরক্তির ছায়া নামে৷ সঙ্গে সঙ্গে ও ব্যালকনির দিকে ছুটে গিয়ে কাচের পেল্লায় শার্শিজোড়া সশব্দে বন্ধ করে দেয়৷ তারপর ফিরে এসে বলে, ‘এসব কাজ কি চাকরবাকর দিয়ে করানো যায়৷ তায় হরির যা বুদ্ধিভাষ্যি৷ তুমি বুঝবে কোত্থেকে৷ দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ—’

রেখার অনুযোগটা মিথ্যে নয়৷ আমার কাজ শুধু মাসের শুরুতে মাইনের টাকাটা ওর হাতে তুলে দেওয়া৷ ঘরে বাইরের যাবতীয় হ্যাপা বলতে গেলে ওকে সামলাতে হয়৷ তবু আজ ওর কণ্ঠস্বর কেমন যেন বেসুরো ঠেকল৷ একটা চাপা ক্রোধে ওর দু’চোখের সাদা জমি আরক্তিম৷ এতটা রেগে যেতে ওকে কদাচিৎ দেখেছি৷

আমি রা কাড়ি না৷ কথার পিঠে কথা চাপালে অনর্থ বাড়বে বই কমবে না৷ বিশেষ করে এ ব্যাপারে যখন আমি কম জোরি৷ আমি ঝিমলির দিকে অর্থপূর্ণ তাকাই৷ এরকম পরিস্থিতিতে ঝিমলি চোরা হেসে রেখার রাগের ওজন কতখানি তা বুঝিয়ে দেয় আমাকে৷

ঝিমলির কঠিন মুখে হাসি ফোটে না৷ বুঝতে অসুবিধে হয় না, কেস গড়বড়ে৷

রেখা হনহন করে ড্রইং রুম থেকে কিচেনের দিকে চলে যায়৷ আমি একটা সিগারেট ধরাই৷ ঝিমলি পড়ার টেবিলের দিকে এগোয়৷ ব্যাগ খুলে বইখাতা যথাস্থানে রাখে৷ ওর পরনে সাদা ধপধপে স্কুল ইউনিফর্ম৷ কোমরে চওড়া সবুজ রঙের কাপড়ের বেল্ট৷ পায়ে কালো জুতো ফুল মোজা৷ মাথায় মস্ত এক ফিতের ফুল৷ ঝিমলি ক্লাস টেনে পড়ে৷ ওর মায়াকাড়া মুখের দিকে চোখ পড়তে মুহূর্তে আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়৷ আমি আদুরে গলায় ডাকি, ‘ঝিম, এদিকে আয় মা—’

ঝিমলি আমার একমাত্র সন্তান৷ আমার মেয়ে৷ আমার বন্ধু৷ আমার মাও বটে৷ বাড়িতে যতক্ষণ থাকি বেশিরভাগ সময় ওর সঙ্গে নানান খুনসুটিতে কেটে যায় আমার৷

ঝিমলি এগিয়ে আসে৷ আমার গা-ঘেঁষে চুপ করে সোফায় বসে পড়ে৷ আমি অভ্যাসমতো ওর দিকে মাথাটা এলিয়ে দিই৷ ও আমার চুলের ভেতর আঙুল চালায়৷ ওর শরীরের বয়ঃসন্ধির সদ্য ফুটে ওঠা চাপা গন্ধটা আমাকে আবিষ্ট করে৷

‘পড়াশুনো কেমন হচ্ছে?’ শুধোই৷

ঝিম ঝুম ঝুমঝুমি ঝিমলি— আমি ওকে নানা নামে ডাকি৷

‘মোটামুটি৷ — সংক্ষিপ্ত উত্তর ঝিমলির৷

‘মাস্টারমশাইরা ঠিকমতো আসছেন তো?’

‘হ্যাঁ’৷ — দায়সারা জবাব ঝিমলির৷

বুঝতে পারি, ইস্কুলে টানা ছ’ঘণ্টা ক্লাস করার পর এসব কথা ভাল লাগছে না ওর৷ সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দিতে চাই৷ শুধোই, ‘তারপর বল, তোর স্কুলের বন্ধুদের খবর কী? মণিদীপা, সুদেষ্ণা, পারমিতা— সবাই কেমন আছে?’

অন্যদিন হলে বন্ধুদের কথা তুললেই ও প্রগলভ হয়ে ওঠে৷ কে কেমন আছে সাতকাহন সবিস্তারে বলতে শুরু করে৷ কিন্তু আজ ও উষ্ণ হয়ে ওঠে না৷ তাপহীন গলায় বলে, ‘কেমন আবার, ভালই আছে৷’

ইচ্ছে করলে দু-চারটে উল্টোপাল্টা বেয়াড়া প্রশ্ন করে আমি ওকে তাতিয়ে তুলতে পারি৷ ও রেগে গেলে মজা পাই আমি৷ ভীষণ অন্যরকম, সপ্রাণ লাগে ওকে৷ কিন্তু আজকে আর সে পথে গেলাম না৷ একেই রেখা উগ্রচণ্ডা হয়ে আছে৷ তার ওপর ওকে খেপিয়ে তুললে সুন্দর বিকেলটাই মাটি হয়ে যাবে৷ তাই ওকে বাগে আনবার জন্য বলি, ‘এবার জন্মদিনে তুই কী নিবি বল৷ টাইটান ঘড়ি না ট্রেজার আইল্যান্ডের দামি ফ্রক৷’

ঝিমলি উত্তর করে না৷ নিঃশব্দে চুলে আঙুল চালাতে থাকে৷

‘এর মধ্যে একদিন নিউমার্কেট গিয়েছিলাম৷ দুর্দান্ত সব জাপানি ডল দেখে এসেছি৷ তার একটা নিবি?’

‘না’,— নড়ে উঠে বলে ঝিমলি, ‘এখন আর আমার ডল ফল ভাল্লাগে না৷’

‘তাহলে ভাবছি, এবার তোকে একটা ভাল কলম দেব৷ সেফার্স কিংবা মন্টব্ল্যাঙ্ক, যেটা চাস তুই—’

‘পেন! পেন দিয়ে আমি কী করব৷ এখন আর কালিতে লিখি না আমি৷ তাছাড়া এই তো সেদিন কুট্টিমামা একটা জাপানি পাইলট দিয়ে গেল৷’

বরফ গলছে দেখে উৎসাহ বোধ করি৷ বলি, ‘ঠিক আছে৷ এবার তোকে না হয় হাওয়াইয়ান গিটার কিনে দেব৷ যা টাকা লাগে লাগুক৷ কুছ পরোয়া নেই৷’

ঝিমলির বন্ধু শিঞ্জিনী গিটার বাজায়৷ একবার টিভিতে বাজাবার চান্সও পেয়েছে৷ তাই দেখে ঝিমলিরও গিটার শেখার শখ৷ বাদ সেধেছে রেখা৷ বলেছে: গিটার ফিটার চলবে না৷ সামনের বছরের শুরুতেই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা৷ একে পড়াশুনোয় মন নেই তাতে আবার ধুনোর ধোঁয়া—৷

ঝিমলি কিছু বলার আগেই কিচেন থেকে রেখার তীক্ষ্ণ গলায় আওয়াজ ভেসে আসে ‘কইরে ঝিমলি, আসবি না! কতক্ষণ খাবার নিয়ে বসে থাকব৷’

কথোপকথন ভেস্তে যায়৷ ঝিমলি উঠে বাথরুমের দিকে চলে যায়৷ ফের একটা সিগারেট ধরাই৷ বুকটা শুকিয়ে খসখসে হয়ে আছে৷ ব্যালকনির জোড়াশার্শিতে তখন ছোকরাদের চিৎকার আঁচড় কেটে চলেছে৷

একসময়ে কফির কাপ হাতে রেখা ড্রইংরুমে ঢোকে৷ সামনের ছোট টেবিলে কাপটা রাখতে রাখতে বলে, ‘যতসব ছোটলোক ইতরের বাস এখানে—’

আমি কাপটা তুলে নিই, ‘কেন, আজ আবার কী হয়েছে?’

রেখা ফুঁসে ওঠে, ‘হবে আবার কী৷ এখানে কোনও ভদ্রলোক থাকে! কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলি, ‘হেঁয়ালি রাখো৷ কী হয়েছে বলবে তো৷’ আমার ধৈর্যে চিড় ধরে৷

‘ওই যে লালবাড়ির রোয়াকে ছেলেগুলো বসে থাকে সব জানোয়ারের বাচ্চা—’

‘ওরা তোমার আবার কী করল৷’ সশব্দে খানিকটা কফি গলায় চালান করে দিয়ে বলি৷

‘আমার কী করবে৷ আমি কি কচি খুকি৷’ — রেখা ঝাঁঝিয়ে ওঠে৷

‘তা হলে—’ কফির কাপ শূন্য করি৷

‘ঝিমলিকে একলা পেলেই বিশ্রী ইঙ্গিত করে, শিস দেয়৷’ — বলে রেখা৷ এতক্ষণে বিষয়টা মগজে ঢোকে, কেন আজ এতটা তিরিক্ষে হয়ে আছে রেখা৷ আমি হেসে বলি, ‘দূর, তোমার যত আজে বাজে কথা৷ ঝিমলি বাচ্চা মেয়ে৷ ওকে বলতে যাবে কেন?’

রেখা এবার নিজ মূর্তি ধারণ করে৷ গলা সপ্তমে চড়ায়, ‘যে জেগে ঘুমোয়, তাকে আর কি বলব৷ তুমি ভাব তোমার মেয়ে এখনও কচি খুকিটি আছে, তাই না?’

ভেতরে ভেতরে নিভে যাই৷ রেখার অনুমান বা দুশ্চিন্তা যে একেবারে অমূলক নয় এ কথা অস্বীকার করি কী করে৷ মুখটা বিস্বাদ লাগছে৷ রেখাকে নিরস্ত করার জন্য কপট ধমকের সুরে বলি, ‘যাও, বাজে বোকো না৷ ক’দিন বাদে এলাম৷ কোথায় একটু শান্তিতে—’

‘আমি বাজে বকছি? ঠিক আছে, ঝিমলিকে ডাকছি৷ ও-ই বলুক৷’ —রেখা আরও তেরিয়া হয়ে ওঠে৷

বিব্রত বোধ করি৷ গলার স্বর নামাই৷ যাতে ঝিমলি শুনতে না পায়, ‘ওকে ডাকছ কেন৷ কী হয়েছে তুমিই বলো না৷’

‘কী আবার হবে৷ ছোঁড়াদের এতবড় আস্পর্ধা৷ আমি সঙ্গে আছি৷ আমার সামনেই কি না ঝিমলিকে—’

‘থাক থাক, আর বলতে হবে না৷ বুঝেছি—’ বলেই উঠে দাঁড়াই৷ ওয়ার্ডরোব খুলে একটা শার্ট বের করে গায়ে গলাই৷

‘একী তুমি কোথায় চললে?’ —চেরা গলায় রেখা প্রশ্ন করে৷

ভারি গলায় উত্তর করি, ‘যাই একবার৷ আজ একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব৷’

‘ কী বলবে তুমি?’— পথরোধ করে দাঁড়ায় রেখা৷

‘দেখি কী বলি৷’—শার্টের বোতাম আটকাই৷

‘বাহাদুরি দেখাতে হবে না৷ ওরা ডেঞ্জারাস৷’—রেখার গলায় ভয় চলকে ওঠে৷

‘পথ ছাড়ো’৷ ভয় যে আমিও পাচ্ছি না তা নয়৷ তবু বলি৷

‘না, তুমি যাবে না তার চেয়ে বরং অন্য কোথাও বাড়ি দ্যাখো৷ এ ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যাব আমরা৷’

‘কোথায় যাবে৷’ — আমি স্মিত হেসে উঠি, ‘সব জায়গাতেই তো লোফার ছেলের দল আছে?’ — রেখাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি ওকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷

নিচে নেমে সামনের দিকে তাকাতে দেখি রাস্তার ওধারের লালবাড়ির রোয়াকে ছেলে ছোকরাদের জটলা৷ ধরাচূড়া আজকাল যেমন হয়ে থাকে৷ ব্যাগী প্যান্ট৷ স্ট্রাইপ গেঞ্জি বা চক্করবক্কর ছিটের শার্ট৷ একমাথা চুল৷ লম্বা জুলপি৷ হিংস্র চোখ মুখ৷ বয়স আঠারো থেকে বাইশের মধ্যে৷ সবক’টি মুখই আমার পরিচিত৷ আসা যাওয়ার পথে অষ্টপ্রহর দেখি ওদের৷ হল্লাগুল্লায় ব্যস্ত৷

চড়া মেজাজ নিয়ে রাস্তা পার হই৷ কিন্তু ওদের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎই চুপসে যাই৷ আমাকে এগিয়ে আসতে দেখে কিছু একটা আঁচ করে ওরা৷ সেই মতো নড়ে চড়ে টানটান দাঁড়িয়ে পড়ে৷

এক ছোকরা সিগারেট ফুঁকছিল৷ আমাকে দেখে সজোরে একটা টান মেরে সিগারেটটা পাশের ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ‘নে শালা ন্যাপলা, ধর—৷’

তাই দেখে আমি ওদের একটু তফাতে থাকতে দাঁড়িয়ে পড়ি৷ তারপর হাত নেড়ে ইশারায় ছোকরাকে ডাকি৷ এই ছেলেটার সঙ্গে পথ-চলতি কয়েকবার বাক্যালাপ হয়েছিল৷ ফ্ল্যাটেও মাঝে মাঝে হানা দেয় চাঁদা নিতে৷ গলায় জড়ানো নীল সিল্কের রুমালটা পাকাতে পাকাতে ছোকরা এগিয়ে আসে আমার দিকে৷ বলে ‘কিছু বলবেন?’

‘হ্যাঁ একবার তুমি যদি আমার ফ্ল্যাটে আসো—’৷

গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে নিতে চেষ্টা করি৷

ছোকরা কিছু বলার আগেই ওর পেছন থেকে আরেকজন বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মাইরি, শালার কপাল ফেটেছে৷ লটকে পড় শিবু৷’

‘এখনই?’ ভ্রূক্ষেপগীন শিবু জিজ্ঞেস করে আমাকে৷

‘হ্যাঁ, যদি একবার৷ বেশি সময় নেবো না৷’ — ঘৃণায় আমার সারা শরীর রি রি করে ওঠে৷

‘এখানেই বলুন না৷ এরা সবাই আমার বুজম ফ্রেন্ড৷’— হাতের চেটো দিয়ে চুলের কেয়ারি ঠিক করে নিয়ে শিবু বলে৷

‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলেই ফেলুন৷’— পেছনের সমবেত কণ্ঠস্বর শিবুর প্রস্তাবে সায় জানায়৷

আমি নিরুপায়৷ খানিকটা হতভম্বও৷ এই সব ইতর ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে প্রবৃত্তি হচ্ছিল না আমার৷ তবু বলতে হয়, ‘দ্যাখো, তোমরা সবাই জানো৷ আর তোমাদের ভরসাতেই তো এপাড়ায় এসেছি৷’ আমার কথাগুলো ক্রমাগত জড়িয়ে যায়৷ আমি তোৎলাতে থাকি৷

ন্যাপলা নিঃশেষে সিগারেটটা রাস্তায় ছুঁড়ে দিয়ে বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলে, ‘বটে বটে—’

আমি ওকে আমল দিই না৷ শিবুর চোখে চোখ রেখে বলি, ‘আমার ট্যুরের চাকরি৷ প্রায়ই বাইরে যেতে হয়৷ বাড়িতে আমার ওয়াইফ আর মেয়ে একলা—’

‘ওয়াইফ আর মেয়ে! তাহলে একলা হল কি করে?’ — একজন ফুট কাটে৷

ন্যাপলা এবার আমার দিকে এগিয়ে আসে৷ ফ্যাসফেসে গলায় বলে, ‘ওয়াইফ বুঝি বাড়িতে গিয়ে আপনার কানে কিছু লাগিয়েছে!’

আমি অবাক হবার ভান করি৷ ‘আমার ওয়াইফ! না তো—’

শিবুর পেছন থেকে আরেক ছোকরা বুক চিতিয়ে এগিয়ে আসে, ‘আপনার ওয়াইফকে একটু সমঝে চলতে বলবেন মশাই৷ এই তো কিছুক্ষণ আগে আমাদের খামোকা যা-তা বলে চলে গেল৷’

বোঝা গেল রেখার সঙ্গে ওদের কথা কাটাকাটি হয়েছে৷ আমি প্রশ্ন করি, ‘কি বলেছে?’

ন্যাপলা বিশ্রীভাবে হাত নেড়ে উত্তর করে, ‘সে অনেক কিছু৷ আমাদের কী কোনও প্রেস্টিজ নেই!’

ফের একটা বিকট সমর্থনধ্বনি জেগে ওঠে৷

শিবু ঘুরে দাঁড়িয়ে মাস্তানের ভঙ্গিতে দু’হাত তুলে বলে, ‘আহ, হচ্ছে কি? চুপ করবি তোরা!’— তারপর আমার দিকে ফিরে বলে, ‘তুচ্ছ কারণে আপনার ওয়াইফ মাথা গরম করেছিলেন৷ এরা তো সব ছেলেছোকরা তাই তেতে গেছে৷ যাই হোক আপনি চলে যান৷ আমি ওদের ম্যানেজ করছি৷’

ম্যানেজ! এইসব বখাটে অসভ্য ছেলেদের! কেন? কি দোষ আমার কিংবা রেখার? ভদ্রভাবে কলকাতায় কি আর বাস করা যাবে না? আমি অপমানে, ক্ষোভে কাঁপতে শুরু করি৷

ফিরে আসার সময় মুখ তুলে তাকাতে দেখি, রেখা আর ঝিমলি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে৷

রাতে সাড়ে ন’টা অবধি ড্রইংরুমে গুম মেরে বসেছিলাম৷ মাঝে, ওধারে শোবার ঘরে রেখার চাপা গর্জন শুনতে পেয়েছিলাম৷ রেখা নাগাড়ে বলেই যাচ্ছিল: এতেও শিক্ষা হল না তোর মুখপুড়ি! তোর বাবাকে ইতরগুলো কীভাবে অপমান করল স্বচক্ষে তো দেখলি৷

‘আঃ মা, ছাড়ো বলছি, লাগছে৷’ — ঝিমলির কাতরোক্তি শোনা গেল৷

‘এর চেয়ে তোর মরে যাওয়া ভাল’— রেখা বলেই যাচ্ছিল৷

‘আমি কি দোষ করেছি মা৷ আমাকে তুমি এসব বলছ কেন?’ ঝিমলির কণ্ঠস্বর ঝাপসা লাগছিল৷

খাবার পাট চুকতে শোবার ঘরে ঢুকি৷ ঘরে নীল ডুম আলোটা জ্বলছে৷ লম্বালম্বি দুটো খাট৷ শিয়রের দিকে রাখা স্টিলের আলমারিটা খাটদুটোর মাঝখানে ব্যবধান সৃষ্টি করেছে৷ বড় খাটে রেখা ঝিমলি শোয়৷ ছোটটায় আমি৷ আমি খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে টিউব আলোটা জ্বালি৷ হালকা নীল আলো অসহ্য লাগছিল৷ ঝিমলি বড় খাটে উপুড় হয়ে পড়েছিল৷ টিউব আলো জ্বালতে জ্বালতে নড়ে চড়ে ওঠে৷ বুঝি, মুখ গুঁজে পড়ে থাকলেও ঝিমলি ঘুমোয়নি৷

রেখা ডাইনিং রুমে৷ পাশের ফ্ল্যাটের টিভিতে বাংলা খবর সবে শেষ হয়েছে৷ রেখা এঁটো বাসন ডাঁই করে রাখতে ব্যস্ত৷ এরপর যাবে পাশের ঘরে৷ ওটা ফাঁকাই থাকে৷ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধে৷ মুখে হালকা করে নাইট ক্রিম ডলবে৷ তারপর কিচেন, ডাইনিং রুম, ড্রইংরুমের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না দেখে এ ঘরে আসতে আরও কম করে আধঘণ্টার মতো সময় লাগবে৷ অন্যদিন এই সময়টুকু ঝিমলি আমার খাটে এসে আমার গা ঘেঁষে আধশোয়া হয়ে রাজ্যের কথা বলে৷

একটা সিগারেট ধরাই৷ তারপর নিজের খাটে এসে বসি৷ উত্তেজনা অবসাদে শরীর-মন বিধ্বস্ত৷ তবু অপেক্ষা করি৷ যদি ঝিমলি ও খাট থেকে উঠে আমার কাছে চলে আসে৷

কিন্তু তেমন কোনও গতিক না দেখে আদরকাড়া গলায় নরম করে ডাকি ‘ঝিমলি’—

সাড়া মেলে না৷ ঝিমলি তেমনই বিছানায় মুখগুঁজে পড়ে থাকে৷

ফের ডাকি, ‘ঝিম মা আমার—’

ঝিমলি ফের নড়েচড়ে ওঠে, ‘কি বলছ৷’

‘এদিকে আয় একবার’— গলার স্বর কেঁপে যায়৷

ঝিমলি দুহাতে ভর রেখে উঠে বসে৷ তারপর হঠাৎ চেরা-চেরা গলায় বলে ওঠে, ‘ওরা আমাকে নিয়ে মজা করল, ধমকাল, অপমান করল— আর তুমি ওদের কিছু না বলে চুপচাপ চলে এলে বাপি৷’

‘কি বলব বল৷ ওদের তো জানিস৷ বলে লাভ হত কিছু!’ বোঝাতে চেষ্টা করি ঝিমলিকে৷

এবার ঝিমলি টানটান হয়ে বসে৷ ক্রুদ্ধ আক্রোশে ওর শরীর ফুলে ওঠে৷ বলে, ‘ওরা যা-ই হোক, তাই বলে যা মুখে আসবে তা-ই মাথা নিচু করে সহ্য করতে হবে! অন্যায় ওরা করবে, আর ভয়ে পালিয়ে আসব আমরা—’

ক্রমশ ঝিমলির সুন্দর চোখের দৃষ্টি আগুনের মতো ঝলসে উঠতে থাকে৷ উত্তরে আমার কিছু বলা উচিত৷ কিন্তু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না৷

না, সময় আমার বড় আদরের মেয়ে আমার ঝুম ঝুমঝুমি ঝিমলির শরীরটাকে হঠাৎ টালমাটাল করে তুলেছে বলে নয়, ওর ভরন্ত বুক, মুখে ব্রণর বুটি, ধারালো চিবুক, পিঠ ছাপিয়ে নামা চুলের ঢল, সুগোল শুভ্র দুখানি পা, গম্ভীর কণ্ঠস্বরের জন্যেও নয়; ও যে কীভাবে এবং কখন চারদিকের দূষিত আবহাওয়ায় ইতর লোভীদের সঙ্গে যুঝবার মতো শক্তি অর্জন করে ফেলেছে আমি জানি না৷ হঠাৎ সেই সত্য আবিষ্কার করায় আমি অবাক বিস্ময়ে শুধুই ওকে দেখতে থাকি৷ □

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%