অশোক দাশগুপ্ত
গতকালই অরূপরতন রায় সাংবাদিক সম্মেলন করলেন৷ আজ আবার সাংবাদিকদের ডাকলেন দেখে সোনালি একটু অবাকই হল৷ কী এমন ঘটল! অর্থমন্ত্রী তো রোজ রোজ সাংবাদিক সম্মেলন ডাকার মানুষ নন৷ খবরের কাগজে নাম ওঠানোর জন্য যে-সব মন্ত্রী সুযোগ খোঁজেন, তাঁরা কথায় কথায় প্রেস কনফারেন্স ডাকেন৷ অক্ষয়বাবুকে নিয়ে তাই সাংবাদিক মহলে একটা রসিকতা চালু আছে৷ অক্ষয় সরকার, খাদ্যমন্ত্রী৷ দিল্লিতে মিটিং করে সেখানে একদফা সাংবাদিক সম্মেলন করেন৷ আবার কলকাতায় এসে সাংবাদিকদের একই কথা শোনানোর জন্য ডাকেন৷ অক্ষয়বাবু অবশ্য বুঝদার মানুষ৷ ঠিক বোঝেন কীরকম কথা বললে প্রথম পাতায় আসা যাবে৷ বোঝেন কবে প্রেস কনফারেন্স করলে রিপোর্টাররা লিখবে, খবরের কাগজ ছাপবে, আর কবে নয়৷ রিপোর্টারদের সঙ্গে ওঠা বসা করে তিনি তাদের ভাষাও জেনে গেছেন৷ কাগজে কোন স্টোরি খায়, খায় না— এ-সব রিপোর্টার মহলের ভাষা তিনিও ব্যবহার করে ফেলেন মাঝেমধ্যে৷ অক্ষয়বাবুর প্রেস রিলিজের ঠেলায় তিতিবিরক্ত রিপোর্টাররা৷ তখন ঋতেশই অক্ষয়বাবুকে নিয়ে প্রেস কর্নারে রসিকতাটা চালু করেছিল৷
— অক্ষয়বাবু এবার থেকে রেশন দোকানে চাল-ডালের সঙ্গে একটা করে প্রেস রিলিজ বিলি করবেন৷
অরূপরতন রায় অবশ্য অন্য অনেক মন্ত্রীর থেকেই আলাদা৷ তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলে প্রেস কনফারেন্স ডাকার লোক নন তিনি৷ সে-সব নিয়েই সোনালি অন্য কাগজের রিপোর্টারদের সঙ্গে জল্পনা করছিল৷ যথাসময়ে তাঁর ঘরে ঢুকতে তিনি জানিয়ে দিলেন, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের মিটিংয়ে পশ্চিমবঙ্গ যাবে না৷ আজই দিল্লি থেকে চিঠি এসেছে৷ কাল মিটিং৷ এত কম সময়ে পেপার তৈরি করা যাবে না! অন্য অ-কংগ্রেসি, অ-বি জে পি সরকারের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে৷ তাঁরাও বয়কটে রাজি৷
সোনালি সোজাসুজি প্রশ্নটা করে বসল,
— তামিলনাড়ু সরকার এন ডি সি মিটিংয়ে যাবে বলে তাদের কাগজপত্র তৈরি করছে৷ আজ পি টি আই এ-খবর ক্রিড করেছে৷ আপনার বয়কটের ডাক কি সব অ-কংগ্রেসি, অ-বি জে পি সরকার মেনে নিচ্ছে না? কয়েক সেকেন্ড চুপ করে অরূপরতন বললেন,
— আমরা তামিলনাড়ুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি৷ আজই চিঠি পেয়েছি৷ সবার সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি৷ পাশ থেকে দেবতনু ঝট করে বলে উঠল
— তাহলে অ-কংগ্রেসি, অ-বি জে পি সরকারগুলো সবাই রাজি এ কথা নিশ্চয়ই বলা চলে না৷
অরূপরতন রায় মিলিতভাবে বয়কটের প্রশ্ন এড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই এরপর সীমিত রইলেন৷
— আমরা কেন্দ্রের খাস গোলাম নই, যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে৷ ওঁরা ইচ্ছে করেই আমাদের সময় দিচ্ছেন না৷ কারণ, আমরা কাগজপত্র নিয়ে তৈরি হয়ে গেলে ওঁদের অসুবিধে হবে৷
রিপোর্টাররা সব বেরিয়ে এল৷ কিছুক্ষণ বাদেই তাঁর একান্ত সচিব সুদীপ বসু প্রেস কর্নারে এসে সোনালিকে ডাকলেন৷
— মন্ত্রী ডাকছেন৷
সোনালি একটু অবাক হল৷ অরূপরতন রায় বেশ বড় দরের মন্ত্রী৷ তিনি নিজে থেকে ডাকছেন৷ ব্যাপারটা বেশ বিস্ময়ের৷ সোনালি মনে মনে খুশিই হল৷ রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যদি অন্য রিপোর্টারদের থেকে একটু বেশি ঘনিষ্ঠতা থাকে, তাহলে এই রোজকার প্রতিযোগিতার বাজারে একটু এগিয়ে থাকা যায়৷ সোনালি মন্ত্রীর ঘরে ঢুকতে তিনি সোনালি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন— কোথায় পড়েছেন, কী পড়েছেন, কতদিন চাকরি করছেন ইত্যাদি৷ সুযোগ বুঝে সোনালি বলল,
— আমার যদি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে, তাহলে কিন্তু মাঝে মাঝে আপনাকে বিরক্ত করব৷
সেদিন অফিস যাওয়ার পথে সোনালির মনটা খুব ফুরফুরে লাগছিল৷ বছর তিনেক হল ও একটা কাগজে জয়েন করেছে৷
উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে৷ জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দিনাজপুরে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১৬৷ ক্ষতিগ্রস্ত ৬ লক্ষ৷ কতজন নিখোঁজ তার এখনও হিসেব নেই৷ ত্রাণ শিবিরে ঠাঁই পেয়েছেন ৭০,০০০৷ কাগজ থেকে সোনালিকে বন্যা কভার করার জন্য পাঠানো হল৷ এত চ্যালেঞ্জিং অ্যাসাইনমেন্ট এর আগে আর কখনও সোনালি পায়নি৷
মা শুনে বললেন
— সে কী রে টুটুল! তুই যাবি বন্যা কভার করতে? ওখানে আর্মি নেমেছে, এমনি মানুষ যেতে পারছে না৷ তুই একটা মেয়ে হয়ে যাবি কী করে? তোদের ছেলেরা যেতে পারে না?
মা-র কথা শুনে সোনালির রাগ হল,
— তুমি ছেলে মেয়ে এ-সব কোরো না তো৷ ওরা পারলে আমি পারব না কেন? রিলিফের নৌকায় উঠে বা ডি এম এ-র টিমে ঢুকে যাব৷ ছেলেরা বন্যার জলে নেমে সাঁতরে কভার করে নাকি? ও-সব তুমি ভেব না৷ অফিসের দেওয়া ট্র্যাভেলস্টাইলে দুটো জিনস, কয়েকটা শার্ট, খুচখাচ দরকারি জিনিস, ওষুধপত্র গুছিয়ে নিল৷ কলকাতা থেকেই হ্যালোজেন নিয়ে গেল৷ সঙ্গে হাতসম্বল কিছু ড্রাই ফ্রুটস আর বিস্কিট৷
ট্রেনে যেতে যেতেই সোনালি ভেবেছিল অন্য রিপোর্টারদের থেকে আলাদা কিছু করতে হবে৷ যেমন হার্ড নিউজ পাঠানোর তা তো পাঠাবই৷ কতজন মারা গেল, কত নিরাশ্রয়, প্রশাসনের বক্তব্য, রিলিফের অব্যবস্থা (ভয়াবহ বন্যায় রিলিফ আর কবে সুষ্ঠু হয়েছে!) ইত্যাদি৷ মানুষের দুঃখকষ্টের বর্ণনা তো থাকবেই৷ তার মধ্যে নতুন কিছু৷ প্রথমদিন পৌঁছে তেমন কিছু সন্ধান পায়নি৷ ভাষা আর ডিটেল বর্ণনা দিয়ে সেদিনের স্টোরি পাঠাল৷ তাও খবর পাঠাতে পাঠাতে রাত প্রায় সাড়ে ন’টা হয়ে গেল৷ তারপর ক্যাম্পে ফিরে আসা৷ ডি এম-এরই ব্যবস্থা করা৷ সব রিপোর্টারের এক জায়গায় থাকার ব্যবস্থা৷ সোনালি ফিরে এসে রণজয়ের সঙ্গে ডেথ-টোল মিলিয়ে নিল৷
রণজয় মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল,
— রণজয়দা বলবি৷ তারপর অন্য জবাব৷ কত বছর প্রফেশনে আছি জানিস?
এই এক বদ অভ্যেস সোনালির৷ নেহাত চুল পেকে বিশ-বাইশ বছর প্রফেশনে কেউ না থাকলে সোনালির আর তাকে দাদা বলতে ভাল লাগে না৷ বন্ধুর মতো পাশাপাশি কাজ করে, তাই দাদা বলাটা রপ্ত করতে পারে না৷ মুখে মজা করে বলল,
— চেহারাটা ফার্স্ট ইয়ারে পড়া ছেলেদের মতো করে রাখলে দাদা বলি কী করে বল৷
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সোনালি৷ ভেবেছিল একা মেয়ে এসেছে, আর সব ছেলে৷ কাজে অসুবিধে হবে৷ ছেলেরা হয় পাত্তা দেবে না, না হলে মেয়ে বলে বাধা দেবে৷ সে-সব কিছুই হয়নি৷ ছেলেগুলো বেশ ভাল ভেবে সোনালি সত্যিই একটা মানসিক আরাম পেল৷ সারাদিন জলে ভেজার পরও শরীরে ক্লান্তি যেন বসতে পেল না৷ পরদিন ভোর চারটেয় একটা রিলিফ টিম যাবে৷ পরেরটা ঘণ্টা দেড়-দুই বাদে৷ সোনালি ঠিক করল প্রথমটাতেই যাবে৷ অন্যরা বলল,
— সোনালি প্রথম এসেছে, বেশি উৎসাহ৷ আমরা দ্বিতীয়টায় যাব৷
সোনালি কলকাতায় ফোন করেছিল৷ ওর কভারেজ ভাল হচ্ছে৷ শুভম জানাল,
— ভালই তো করছিস৷ তোর মানুষের গল্প স্টোরিটা খুব খেয়েছে৷ এত মৃত্যুর মধ্যে এক বন্যাক্লিষ্ট পরিবারকে বাঁচিয়েছে এক বন্যার্ত কিশোর৷
সেদিনই সন্ধেবেলা কলকাতা থেকে খবর এল, অর্থমন্ত্রী আরও তিন মন্ত্রীকে নিয়ে বন্যা দেখতে আসছেন৷ মন্ত্রীরা এলেন, ঘুরলেন৷ জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসে অন্যদের সঙ্গে অরূপরতন রায় সাংবাদিক সম্মেলন করলেন৷ সোনালিকে দেখে বললেন,
— আপনার কভার করতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?
ডি এম-কে বলে দিলেন, একটা মেয়ে এসেছে ওকে একটু দেখবেন৷ নিছক ভদ্রতা কিংবা শিভালরি৷ সোনালির মধ্যে একটা চাপা খুশি খেলে গেল৷
সেদিন খবর-টবর পাঠিয়ে সোনালি সার্কিট হাউসে অরূপরতন রায়ের সঙ্গে একা দেখা করতে গেল৷ উনি তখন ডিনার খেতে বসেছেন৷ মন্ত্রী নীলেশ সেনও ছিলেন তাঁর সঙ্গে৷ নীলেশ সেন জলপাইগুড়ির বিধায়ক৷ সেই সূত্রে মন্ত্রীদের টিমে এসেছেন৷ অন্য দুই মন্ত্রী সেচবাংলোয় আছেন৷ অরূপরতন রায় সোনালিকে ডিনার না খাইয়ে ছাড়লেন না৷ সামান্যই ডাল, ভাত, তরকারি আয়োজন করা গেছে৷ তাই খেতে খেতে টুকটাক গল্প চলছিল৷ সোনালি খেয়াল করল ওঁরা দু’জন দু’জনকে তুই-তোকারি করেন৷ সোনালির দিকে ফিরে অরূপরতন বললেন,
— নীলু আমার ছোটবেলার বন্ধু৷ আমরা এক স্কুলে পড়তাম৷ ও পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল৷
নীলেশ সেন বললেন,
— অরূপ তুই আর আমাকে ওই সার্টিফিকেট দিস না৷ তুই তো ফার্স্ট হতিস৷
— সব সময়ে তো তোকে বিট করতে পারতাম না৷
এ-সব গল্পের মধ্যেই অরূপরতন জানালেন, প্রধানমন্ত্রী আসবেন উত্তরবঙ্গে, একটু আগে খবর এসেছে৷ সোনালি সার্কিট হাউস থেকেই ফোন করে খবরটা দিয়ে দিল৷ পরদিন ওদের কাগজে এক্সক্লুসিভ৷
কলকাতায় ফিরে এসে সোনালি ভেবেছিল সম্পাদক বোধহয় ওর বেশ প্রশংসা করবেন৷ কিন্তু উনি কিছুই বললেন না৷ আসলে উনি কখনই কোনও রিপোর্টারকে ভাল বলেন না, পাছে তার মাথা ঘুরে যায়৷ কিন্তু রিপোর্টিংয়ে অনেকেই সোনালিকে বলল, দুর্দান্ত কভারেজ হয়েছে৷ ডেস্কের অভিষেকও বলল সবরকম অ্যাঙ্গল থেকে ধরা হয়েছে৷
দু-দুটো খবর এক্সক্লুসিভ হয়েছে বলে সোনালি মনে মনে অরূপরতন রায়কে ধন্যবাদ জানাল৷ এ এমন কৃতজ্ঞতা যা কারও কাছে কোনওদিন প্রকাশ করা যাবে না৷ ভেবেছিল রাইটার্সে গিয়ে ধন্যবাদ জানাবে একান্তে৷
কিন্তু সোনালি কলকাতায় ফিরে যেদিন রাইটার্সে গেল, সেদিন ওঁর সঙ্গে দেখা হল না৷ শরীর খারাপ হয়েছে বলে উনি অফিসে এসেই বাড়ি ফিরে গেছেন৷ বাড়ি ফিরে গেছেন? অরূপরতন রায় প্রচণ্ড পরিশ্রমী, দিনে বারো-চোদ্দো ঘণ্টা কাজ করেন৷ সব ফাইল খুঁটিয়ে পড়েন৷ অরূপরতন রায়ের কাঁচাপাকা চুল৷ দারুণ ফিটফাট৷ নিভাঁজ ধুতি, পাঞ্জাবি আর পা ঢাকা কালো চকচকে জুতোয় নির্ভেজাল বাঙালি৷ তাঁর জ্যাভেরিয়ান ব্যাক গ্রাউন্ডের সঙ্গে যেন খাপ খায় না৷ উনি আংটি পরেন না৷ বদলে দু আঙুলের ফাঁকে সিগারেট৷ অরূপরতনের এই একটা জিনিস সোনালি পছন্দ করে না৷ এমনিতে চশমা পরেন না৷ কিন্তু পড়াশুনো, ফাইল দেখার সময়ে একটা স্লি ক রিডিং গ্লাস ঝুলিয়ে নেন৷ লোকে বলে এরর-ফাইন্ডিং গ্লাস৷ কোন ফাইলে কী ত্রুটি আছে, ওঁর চোখ ঠিক সেখানে গিয়ে আটকে যাবে৷ আর যাঁরা ওঁকে পছন্দ করেন না, তাঁরা বলেন, আসলে উনি জ্যাভেরিয়ান তো, সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্র৷ তারপর দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিকস, সেখান থেকে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস৷ তাই নাক উঁচু৷ আর কাউকে তাঁর লেভেলের বলে মনেই করতে পারেন না৷ এই সব মন্ত্রীর সঙ্গে সোনালি যখন কথাবার্তা বলে কৃতজ্ঞতায় ভরা সোনালির মনটা হু-হু করে ওঠে৷ কিন্তু বেচারা সোনালি অরূপরতনের পক্ষে ওঁদের কাছে একটা কথাও উচ্চারণ করে না৷ পাছে ওঁরা আবার ভেবে বসেন সোনালি অরূপরতন রায়ের লবির লোক৷
রাতে অফিস থেকে ফোন করে সোনালি শুনল অরূপরতন রায়কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ হাসপাতালের সুপার ডাঃ দাসের সঙ্গে কথা বলে জানল, ওঁর নিউমোনিয়া হয়েছে৷ বেশ বাড়াবাড়ি৷ কিছুদিন ভালই ভোগাবে৷ কাল সব টেস্ট হবে৷ খবরটা লিখে দিল৷
মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল সোনালির৷ সপ্তাহ খানেক অরূপরতন রায়ের সঙ্গে ডাঃ দাস দেখাই করতে দিলেন না৷ সোনালি রোজ খবর নিত৷ আটদিনের মাথায় দেখা করতে পারল৷ কিন্তু তখন ধন্যবাদ আর দেওয়া হল না৷ বড্ড পেশাদারি হয়ে যায়৷ অরূপরতন রায় বললেন কতদিনে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবেন তার ঠিক নেই৷ ডাঃ দাসের কাছ থেকে সকালের দিকে ঘণ্টা দুয়েক অফিসারদের সঙ্গে মিটিং-টিটিং করা, ফাইল দেখার অনুমতি পাওয়া গিয়েছে৷ বই-টই অল্পস্বল্প পড়বেন৷ সোনালি দেখল অরূপরতন রায়ের পাশে খোলা রয়েছে কুইক ক্রসওয়ার্ডের পাতাটা৷ সোনালি বলল আমি দিল্লি থেকে কয়েকটা ক্রসওয়ার্ডের বই আনিয়েছি, একটা আপনাকে দেব৷ আমার কাছে রোয়াল্ড ডালের শর্ট স্টোরিজ আছে৷ পড়বেন?
অরূপরতন সোনালিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী করে জানলেন আমি রোয়াল্ড ডালের ভক্ত?
সোনালি কী বলবে ভেবে পেল না৷ সত্যিই তো ও জানে না৷ ও শুধু ভেবেছে সোনালির রোয়াল্ড ডাল যখন এত প্রিয় তখন ওনারও নিশ্চয়ই তা ভাল লাগবে৷ কিন্তু এ কথা তো সোনালি মুখ ফুটে বলতে পারে না৷ ওর থেকে প্রায় বিশ বছরের বড় একজন মন্ত্রী৷ যিনি হলেও হতে পারতেন সোনালির অধ্যাপক৷
অরূপরতন রায় যখন পড়াতেন, তখন ওঁর ক্লাসে খুব ভিড় হত৷ পূর্বা ওঁর দারুণ ফ্যান ছিল৷ পূর্বা ভাল ছাত্রী ছিল বলে উনিও পূর্বাকে বেশ পছন্দ করতেন৷ পূর্বা সোনালির অন্তরঙ্গ বন্ধু৷ ও এখন সাউথ পয়েন্টে পড়াচ্ছে৷ অরূপরতন পূর্বাকে পছন্দ করতেন শুনে সোনালির বুকটা হঠাৎ চিনচিন করে উঠল৷ ওর কি একটু হিংসে হল৷
বইটা নিয়ে সোনালি অরূপরতনকে দেখতে গেল৷ উনি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন৷ সোনালির নাম শুনেই ওঁর স্ত্রী বললেন, তোমাকে তুমিই বলছি৷ তুমি আমার থেকে অনেক ছোট৷ তোমার কথা ওঁর মুখে শুনেছি৷ তুমি বন্যা কভার করতে গিয়েছিলে৷ আবার সেই গোপন কৌটো থেকে কৃতজ্ঞতা বেরিয়ে আসতে চাইল৷ সোনালি শুধু একটু হাসল৷ যাওয়ার সময়ে অরূপরতন রায় নিজে থেকে সোনালির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন৷ সোনালি স্মার্ট৷ তাই তো সবাই বলে৷ হাত ধরে সোনালি বলল, গেট ওয়েল, সুন৷ সোনালির মনটা আনন্দের পাপড়ি হয়ে গেল৷
সোনালির নিজেরই অবাক লাগে৷ সাতাশ বছরে ওর বুকের মধ্যে এমন তোলপাড় কখনও করেনি৷ সামান্য একটা সৌজন্য বিনিময়৷ ওর বুকের রক্ত তাতেই যেন ছলাৎ ছলাৎ করে উঠেছিল৷ উনি শুধু সোনালির থেকে অনেকটা বড় তাই নন, উনি মন্ত্রী, ওঁর একটা পার্টি আছে৷ আর মন্ত্রী মানেই সারাক্ষণ লাইমলাইটে৷ যাকে বলে এক্সপোজড টু মিডিয়া৷ আর সোনালি কিনা সেই কাগজেরই এক রিপোর্টার৷
সোনালি নিজের কাজ নিয়ে আগের মতোই মেতে রইল৷ এরই মধ্যে একটা নামকরা ইংরেজি ম্যাগাজিনে অরূপরতন রায়ের একটা প্রবন্ধ বেরল৷ ওরা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল ম্যাগাজিন প্রকাশের আগেই৷ যেদিন বেরল, সেদিনই সোনালি সেটা কিনে গোগ্রাসে গিলে ফেলল৷ ক্রিকেট নিয়ে এক দারুণ অন্যরকম লেখা৷ কেন কালো ক্রিকেটাররা ওঁর প্রিয়, কেন কালো ক্রিকেটাররা আজ ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করছে৷ এর আগেও ওঁর লেখা পড়েছে সোনালি৷ যেমন বাংলা তেমন ইংরেজি লেখেন তিনি৷ তত্ত্বের কচকচি নয় বা শুধু কাঠখোট্টা অর্থনীতি নয়৷ এত বিষয় নিয়ে তিনি ভাবেন, এমন অ্যাঙ্গেলে ভাবেন যে, সোনালি বারে বারে শুধু মুগ্ধই হয়৷ রাজনীতি করার পরও উনি বিদেশে সেমিনারে পেপার পড়ার আমন্ত্রণ পান৷ এবারের লেখাটা পেয়ে সোনালি বারে বারে পড়ল৷ এই ম্যাগাজিনটা সোনালি কোনওদিন ফেলে দেবে না৷ — আপনার লেখা বেরবে জানলে অপেক্ষা করি৷ খুব ভাল লাগে৷ আপনি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে কেমন সুন্দর করে চলে যান, আর বিষয়ের সঙ্গে পাল্টে ফেলেন আপনার ভাষাও৷
সোনালি ভেবেছিল এই সব বলবে৷ কিন্তু এত সব কথা বলতেই পারল না৷ অরূপরতন রায়ের চেম্বারে ঢুকতেই সোনালির গলা যেন কে চেপে ধরে৷ যা যা বলবে ভেবেছিল তার সে-সব বলা হল না৷ সবই সত্যি৷ কিন্তু সব সত্যি কথা তো বলা হয়ে ওঠে না সোনালির৷ আজও সে-সব বলতে পারল না৷ বরং বলল,
— আপনার মতো আমি লিখতে পারলে অনেক উন্নতি হত৷
বলেই সোনালি নিজের ওপর বিরক্ত হল৷ ধুৎ, ওর কী যে হয়৷ সেই ঘুরে ফিরে পেশা-সংক্রান্ত কথা৷ এবার বলল,
— আপনার লেখার ওই জায়গাটা খুব ভাল: আ গ্রেট লাই ইজ সাইলেন্সড ফর এভার৷
অরূপরতন রায় বললেন, লাইনগুলো বার্নার্ড শ’য়ের ৷
— জানি সেন্ট জোন৷ আপনার সব থেকে প্রিয় বুঝি বার্নার্ড শ’৷
— টি এস এলিয়ট৷ অ্যান্ড ইউথ ইজ ক্রুয়েল অ্যান্ড হ্যাজ নো রিসোর্স/অ্যান্ড স্মাইলস অ্যাট সিচুয়েশন ইট ক্যান নট সি৷
পারছে না৷ সোনালি নিজেকে বেঁধে রাখতে পারছে না৷ উনি টি এস এলিয়টের ঠিক ওই লাইনগুলোই কেন বললেন৷
আরও কত লাইন আছে৷ এলিয়টের মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল বিখ্যাত৷ কেন বললেন ইউথ ইজ ক্রুয়েল৷ তবে কি উনিও...৷ সোনালি কখনও কি অজান্তে ওঁর মন ছুঁয়ে ফেলেছে৷ এক অদ্ভুত আনন্দ সোনালিকে ঘিরে ধরল৷ কী এক সুখের পরশ৷ সোনালি আর ভাবতে পারে না৷
একজন ডেপুটি সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করবে বলে সোনালি ভাষা আকাদেমির অফিসে গিয়েছিল৷ উনি শিক্ষা দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি, ভাষা আকাদেমির কাজটাও দেখেন৷ ভাষা আকাদেমির চেয়ারম্যান অরূপরতন রায় নিজেই৷ পার্টি সোর্সেই সোনালি শুনেছিল ভাষা আকাদেমি সম্পর্কে অরূপরতন রায় নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেন৷ বছর চারেক আগে ক্ষমতায় আসার পর পার্টি ঠিক করে বাংলা ভাষার ওপর আর একটু জোর দিতে হবে৷ তাই ভাষা আকাদেমি করা হল৷ প্রথমে ঠিক ছিল শিক্ষামন্ত্রী নীলেশ সেনই চেয়ারম্যান হবেন৷ তিনি বাংলার শিক্ষকও ছিলেন৷ কিন্তু ভেবেচিন্তে পার্টি অরূপরতন রায়কে চেয়ারম্যান করে৷ তিনি অর্থ দপ্তরের কাজের ফাঁকে এ কাজটাও দেখেন৷ ইংরেজি প্রতিশব্দ তৈরির কাজে তিনিও নাকি দু-একটা নতুন বাংলা শব্দ ঢুকিয়েছেন৷ শব্দ নিয়ে খেলা করাটা তাঁর নেশা৷
ডেপুটি সেক্রেটারি অমিয় সরকারের ঘরে যেতে গেলে চেয়ারম্যানের চেম্বার পেরিয়ে যেতে হয়৷ সেদিন সোমবার৷ অরূপরতন রায় ভাষা আকাদেমির অফিসে আসেন শুধু বৃহস্পতিবার৷ কিন্তু চেয়ারম্যানের চেম্বার পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে দেখল নীলেশ সেন অরূপরতনের ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন৷ নীলেশ সেন সোনালিকে দেখতে পাননি৷ সোনালির মনে স্বাভাবিক প্রশ্নটাই উঠে এল— উনি এখানে কেন? অমিয় সরকারের ঘরে যাওয়ার আগে অরূপরতনের কাছে গেল উত্তরের খোঁজে৷ পাকা রাজনীতিকের মতো আসল কথায় না গিয়ে উনি আর নীলু কত বন্ধু ছিলেন, নীলুর মা’কে নিয়ে ওঁদের খুনসুটির কথা এই সব বললেন৷ দুই বন্ধু মিলে হঠাৎ সোমবার সকালে স্মৃতি হাতড়াতে বসেছিলেন! এটা সোনালির বিশ্বাস হল না৷ বরং আড়চোখে দেখে নিল শিক্ষা দপ্তরের একগোছা ফাইল অরূপরতনের টেবিলে৷
অখুশি মন নিয়ে অমিয় সরকারের ঘরে গেল৷
— কী ব্যাপার বলুন তো? নীলেশ সেনের সঙ্গে অরূপরতন রায় মিটিং করছিলেন৷ তারপর আবার রাইটার্স ছেড়ে এখানে?
অমিয় সরকারের সঙ্গে সোনালির যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা৷ উনি বললেন,
— ছেলেমেয়েদের স্কুলে সেশন শুরু হয়ে যাবে বলে নীলেশ সেন তাড়াহুড়ো করে সরকারি স্কুলের জন্য বই কেনান৷ সাধারণত যে-সব পদ্ধতি মানা হয় তা উনি মানেননি৷
— দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছি যেন৷
— না না৷ নীলেশ সেন সেরকম মানুষ নন৷ আমি তো ফাইল দেখেছি৷
— তাহলে?
— অর্থমন্ত্রী বোধহয় দেখছেন-টেখছেন কীরকম বেনিয়ম হয়েছে৷ সবটা তো আমাদের কাছে আসে না, বলতে পারব না৷
— তবে কিছুই হবে না৷ প্রবোধ দাসের বিরুদ্ধে তো পার্টি কোনও ব্যবস্থা নেয়নি৷ — সে তো ঘোরতর অনিয়ম ছিল৷ তবুও তাঁর মন্ত্রিত্ব যায়নি৷ তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধেও তো কোনও তদন্ত হয়নি৷
— আমরা সরকারি অফিসার৷ অতসব খবর রাখতে নেই৷
সোনালি এখানে এসেছিল সরকারি উদ্যোগে বাংলা প্রতিশব্দ নিয়ে একটা নতুন ধরনের স্টোরি করবে বলে৷ কিন্তু নীলেশ সেনের ব্যাপারটা তার মনে এমন খোঁচা দিয়ে গেল যে ওই স্টোরিটার দিকে আর মন দিতে পারল না সোনালি৷ অথচ নীলেশ সেনের স্টোরিটাও জমল না৷ একটা ভাল কাজ তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে৷ এ আর এমন কী খবর৷
কিন্তু খোঁচাটা সোনালির মন থেকে সরতে চায় না৷ ক’দিন ধরে এখানে-ওখানে-সেখানে খোঁজ নিল৷ শেষ পর্যন্ত অরূপরতন রায়ের ঘনিষ্ঠ এক ছোটখাটো পার্টির নেতার সঙ্গে যোগাযোগ হল৷ জয়ন্ত ঘোষ একটু অন্য ধরনের মানুষ৷ পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী৷ কিন্তু পার্টিতে এখন অনেক রকম কাজ কারবার চলে সে-সব পছন্দ করেন না৷ পার্টিতে আগে যত গোপনীয়তা রক্ষা করা হত এখন আর তা হয় না৷ সামনে বলেন না, কিন্তু একান্তে জয়ন্ত ঘোষ সেটাকে ‘হিউম্যান ফেস অফ দি পার্টি’ বলেন৷
সোনালি ওঁর বাড়ি গিয়ে হাজির৷ এটা ওটা বলার পর সরাসরি জিজ্ঞেস করল নীলেশ সেনকে নিয়ে পার্টিতে কি কোনও গোলমাল হয়েছে?
— কেন জিজ্ঞেস করছেন?
সোনালি সংক্ষেপে বলল যা দেখেছে, যা জেনেছে৷ তিনিও সংক্ষেপে বললেন,
— আমি সরকারে কী হচ্ছে তা বলতে পারব না৷ তবে জানি পার্টির সর্বোচ্চ মহল আর মুখ্যমন্ত্রী একজোট হয়ে নীলেশ সেনকে এবার নির্বাচন থেকে বাদ দিতে চান৷
— তার সঙ্গে অরূপরতন রায়ের কী সম্পর্ক?
— সেটা সরকারি ব্যাপার৷ আমি সত্যিই জানি না, বিশ্বাস করুন৷
সাতসকালেই সোনালির বাড়িতে ফোন৷ অরূপরতন বললেন, সোনালি আপনি আজ একটু ভাষা আকাদেমির অফিসে আসবেন?
— আজ তো শনিবার৷ ভাষা আকাদেমির অফিসে ছুটি না?
— আমি যাব৷ আপনি আসুন বেলা তিনটেয়৷
— কিন্তু আপনার গলাটা এরকম লাগছে কেন? শরীর খারাপ৷
— ও কিছু নয়৷ আপনি আসুন বলেই ফোন কেটে দিলেন৷
তিনটের একটু আগেই পৌঁছে গেল সোনালি৷ দোতলায় উঠে দেখে সব শুনশান৷ এই বাড়িটা সোনালির খুব ভাল লাগে৷ একদম সরকারি বাড়ির মতো দেখতে নয়৷ কাঠের চওড়া সিঁড়ি, কাঠের মেঝে৷ পুরনো দিনের বিরাট বাড়ি৷ সেটাকেই অফিসের চেহারা দেওয়া হয়েছে৷
একজন কেয়ারটেকার বেরিয়ে এল৷ সোনালি জিজ্ঞেস করল, অর্থমন্ত্রী এসেছেন? আসেননি শুনে সোনালি নিচে নেমে এল৷ গাড়ি বারান্দায় একটুখানি দাঁড়াতেই একটা নীল মারুতি সামনে এসে দাঁড়াল৷ অরূপরতন রায় নামলেন৷ সোনালির চোখ কুঁচকে উঠল৷ সরকারি সাদা অ্যাম্বাসাডরের বদলে নীল মারুতি!
অরূপরতন রায়ের কাঁচাপাকা চুল অবিন্যস্ত৷ চাপা ব্যথার চোখে সোনালির দিকে তাকালেন৷ সোনালি বুঝেছে ওঁর মধ্যে ঝড় বইছে৷
ভাষা আকাদেমির চেয়ারম্যানের ঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি৷ পেছনে সোনালি৷ মিনিট খানেকের স্তব্ধতা৷ উনি কিছু বলতে চান৷ কিন্তু কীভাবে বলবেন তা নিয়ে নিশ্চয়ই দ্বিধায় আছেন৷
সোনালিই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল,
— আপনার সরকারি গাড়ি কী হল?
— ছেড়ে দিয়েছি৷
— মানে?
— আমি পার্টির কাছে আমার রেজিগনেশন লেটার দিয়েছি৷
সোনালির চোখ বিস্ফারিত৷ অরূপরতন সংক্ষেপে বললেন, তাঁর ওপর নীলেশ সেনকে নিয়ে কীভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল৷ দুর্নীতির কথা তুলে পার্টির ওপর মহল নীলেশ সেনকে বাদ দিতে চায়৷
— আর সে কাজটা আমাকে দিয়েই করাতে চায় পার্টি৷ কারণটা সোজা, আমি অর্থমন্ত্রী, সব ফাইল আমার কাছে আসে৷
— আপনি কী দেখলেন?
— আমি নীলুকে জানি৷ ওর মনটা দামি মেহগনির মতো৷ তাতে আমি ধুলো লাগাবার কে? এর থেকে বেরনোর রাস্তা আমি পাইনি৷ পার্টির ওপর মহলের নেতারা আমার থেকে অনেক বেশি শক্তিমান৷ তা ছাড়া আমার সঙ্গে এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কথা কাটাকাটি হয়েছে৷ উনিও আমার দিকে নেই৷
অরূপরতনের গলা আবেগে থরথর করে কাঁপছে৷ সোনালি বুঝল এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন৷
— মন্ত্রিত্ব থেকে রেজিগনেশন দিয়েছেন শুধু, না পার্টি থেকেও?
— পার্টির কর্মী হিসেবে থাকব৷
— তার পর?
— জানি না৷
— আপনি জানেন এ খবর বেরলে আপনার কত বড় ক্ষতি হবে৷
— জানি৷
— আপনাকে পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ওঁরা চাপ দেবেন৷ তার পর পার্টি থেকে বলবে, ওরকম কোনও ঘটনাই ঘটেনি, খবর মিথ্যে৷
— আপনি ভাবছেন আপনার খবর ভুল প্রমাণিত হবে! আপনি পেশা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না? সোনালি আপনি আমাকে একটুও চেনেননি৷ আমি আপনাকে বিপদে ফেলব না৷
— অ্যায়াম স্যরি৷ কিন্তু তা যদি নাও হয় আমি আবারও বলছি এ খবর বেরলে আপনার চরম ক্ষতি হবে৷ আপনাদের পার্টিকে আমি চিনি৷ খবর বেরিয়ে যাওয়ার থেকে বড় অপরাধ আপনাদের পার্টিতে আর নেই৷
— আমি সব ভেবেছি৷ আমি প্রতিনিয়ত ঘা খাচ্ছি৷
এক কাপ চাপ খেয়ে সোনালি উঠে পড়ল৷ ভাষা আকাদেমির অফিসে আসবে সে কথা অফিসের ড্রাইভারকেও জানাতে চায়নি বলে গাড়িটাকে নন্দনে দাঁড় করিয়ে একটা মিনিবাসে চলে এসেছিল৷ নন্দন থেকে গাড়িটা নেওয়ার সময়ে সোনালির আর মিনিবাসে উঠতে ইচ্ছে করল না৷ মিনিবাসে উঠলেই তো এক মিনিটে পৌঁছে যাবে৷ থিয়েটার রোড থেকে নন্দন কতটুকু আর পথ৷ মাথায় একরাশ ভাবনা৷ ও একটু ভাবতে চায়৷ একা৷ তাই হাঁটতে শুরু করল৷
ওর সেই আগের কথা মনে পড়ল৷ ওর মনের গোপন কৌটোয়, যেখানে কৃতজ্ঞতা ভরা থাকে৷ সেই কৌটোর ঢাকনা খুলে কৃতজ্ঞতা বার বার বেরিয়ে পড়তে চায়৷ এই সামান্য এক বছরে ও কতগুলো এক্সক্লুসিভ করেছে৷ তার ক’টা অরূপরতন রায়ের কাছ থেকে পাওয়া তার হিসেব করছিল৷ ও যে একজন সিরিয়াস রিপোর্টার বলে ওর সহকর্মী বন্ধুরা কেউ মুখে, কেউ মনে মনে স্বীকার করে, তার কতভাগ অরূপরতনের দেওয়া! সোনালির মাথার মধ্যে বাজতে থাকে অরূপরতনের ওই কথাগুলো— আপনি পেশা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না! ওঁর গলায় তখন যেন এক নিরীহ, অভিমানী মানুষের স্বর৷ একটা চাপা মিষ্টি বকুনি যেন৷
পরদিন রবিবার৷ সোনালির ছুটির দিন৷ ও জানত সকালেই ফোন আসবে৷ তাই নিজেই ধরেছিল৷
— আমি বলছি৷
এর আগে অরূপরতন রায় সোনালিকে দু’বার ফোন করেছিলেন৷ দু’বারই পুরো নাম বলেছিলেন৷ এবার — ‘আমি বলছি’ — কী সুন্দর স্টাইলটা৷ কত কী যেন বলা হয়ে যায়, মনে মনে ভাবল সোনালি৷
— আমি এখন একটু বেরচ্ছি৷ আপনি ঘণ্টা দুয়েক বাদে ভাষা আকাদেমির অফিসেই আসুন৷
এই প্রথম সোনালি অফিসের কাজে বেরনোর সময় জিনস আর শার্ট ছেড়ে শাড়ি পরল৷ ওয়ার্ডরোব খুলে ওর সব থেকে পছন্দের সাদা-কালো সিল্কের শাড়িটা বের করল৷ একটা ছোট মুক্তোর দুল আর সরু মুক্তোর হার৷ দুই ভ্রূর মাঝে যত্ন করে একটা টিপ বসাল৷
— টুটুল কোথায় যাচ্ছিস, আজ তো রবিবার৷ মা বললেন৷
— একটু ঘুরে আসছি৷ ঘণ্টা দুয়েক পর ফিরে আসব৷
ভাষা আকাদেমির অফিসে ওর আসার আগেই অরূপরতন এসে গেছেন৷ কেয়ারটেকার দরজা খুলে রেখেছিল৷ সোনালি ঢুকতেই তিনি বললেন,
— আপনাকে চেনাই যাচ্ছে না৷
— আমাকে আগেও কি চিনতেন?
— আজ আমাকে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন৷ ওনার বাড়ি গিয়েছিলাম৷ আধ ঘণ্টা ধরে উনি আমাকে অনেক কথা বললেন, বোঝালেন৷ সব মিটে গেছে৷
— খবরটা আজ বেরিয়ে গেলে মিটত না, উনিও ডাকতেন না৷
— সত্যিই খবরটা আপনি না লিখে ভাল করেছেন৷
— অত আবেগ থাকলে রাজনীতি করা যায় না বুঝলেন? রাজনীতি করবেন আর মারপ্যাঁচ, কৌশল করবেন না, তা হয় না৷ সোনালি একটু জ্ঞান দিল৷
— আপনি দেশবিদেশ ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছেন৷ আমি তো জানি রাজনীতি ছাড়তে আপনার কত কষ্ট হত৷
— আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ সোনালি৷
এই প্রথম অরূপরতন সোনালিকে ‘তুমি’ বললেন৷ অস্ফুটে সোনালি ‘আমিও’ বলতে চাইল৷ পারল না৷ মনে মনে এর আগে সোনালি যে কতবার অরূপরতনের কাছ থেকে ‘তুমি’ শুনেছে! আজ সত্যিই শুনল৷ বড় খবর লেখার আনন্দের থেকেও আজ সোনালির এটাই বড় পাওনা৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন