জন্মরোধ কেন

অশোক দাশগুপ্ত

আজ আমার ইন্টারভিউ— চাকরির নয়, প্রেমের৷ ইন্টারভিউ-এর কথা শুনে প্রথমে একটু সম্মানে লেগেছিল৷ এ কি, প্রেমেরও পরীক্ষা দিতে হবে? ভেবেছিলাম, পৃথাকে বলব, প্রকৃত প্রেমে সন্দেহের জায়গা নেই৷ কিন্তু এরকম বোকা বোকা সংলাপ আওড়ালে পৃথা ভাববে, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখি৷ অতএব নিজেকে বোঝালাম, সব কিছু সহজভাবে নিতে হয়৷ ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সময় ভাবতে হবে, কোনও বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি৷ আমি খুব চটপটে— বুদ্ধিমান তা প্রমাণ করর জন্য বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই, আবার ঘাবড়াবার দরকারও নেই৷ সব ঠিক আছে কিন্তু পৃথার মা-বাবা থাকতে আমার সঙ্গে পৃথার জীবন যুক্ত হলে তার দশা কি হবে তা যাচাই করার ভার ওর মাসি-মেসোর ওপর পড়ল কেন? ঠিক আছে, মেসো নিঃসন্তান, পৃথাকে তিনি মেয়ের মতো দেখেন, তবু? একটা কারণ হতে পারে, পৃথার মেসোর বার্ষিক আয় ওর বাবার বার্ষিক আযের চাইতে অনেক বেশি৷ ফলে তার মতামতের গুরুত্বও বেশি৷

সে না হয় হল, ওদের পারিবারিক দাঁড়িপাল্লায় যে বাটখারার ওপর যাই হোক আমাকে আবার ওজনটোজন করা কেন? পৃথাই বা কিরকম কেমন নিরীহ মুখ করে বলল, তুমি রোববার মাসির বাড়ি আসবে, মাসি তোমাকে দেখতে চেয়েছে৷ সত্যি আসবে কিন্তু৷ আর মাসি-মেসো যাই বলুক আমার ওপর রাগ করতে পারবে না কিন্তু?

কেন রাগ করব না শুনি? আমাকে যদি বেশি কঠিন কঠিন প্রশ্ন করা হয় আমি কিন্তু সত্যি রেগে যাব৷ আমার প্রশ্নমালার সামনে দাঁড়াতে একদম ভাল লাগে না৷ আমি কেন আমার মতো, আমি কেন অন্যরকম নই— এসব কৈফিয়ত দেওয়া আমার একেবারে পছন্দ নয়৷

আচ্ছা সত্যি, আমি উত্তর জানি না কেউ এরকম প্রশ্ন যদি আমাকে করেন? সে বড় লজ্জার ব্যাপার হবে৷ কত প্রশ্নের উত্তরই তো আমি জানি না৷ আমায় যদি জিজ্ঞেস করেন, তোমার নাম ধ্রুব কেন?

সত্যিই তো আমার নাম বিপিনচন্দ্র বা কৃষ্ণকান্ত, রামমোহন বা রবীন্দ্রনাথ এমনকী গোপাল হতে পারত৷ হল না কেন— দেখুন, আমার নাম আমি তো রাখিনি৷ শুনেছি, আমার বাবার এক মামা আমার নাম রেখেছিলেন৷ মামামশাই নাকি খুব ভাল এসরাজ বাজাতেন৷ বিয়ে-থা করেননি৷

হয়ত ধ্রুপদ-ধামার ভালবাসতেন, ধ্রুপদ থেকে ধ্রুব? কি জানি৷ ভদ্রলোক হয়ত আমসত্ত্বও ভালবাসতেন, আমসত্ত্ব থেকে আমার নাম আমকুমার কিংবা রাম, বলরাম, হরেরাম যা খুশি নাম রাখতে পারতেন৷ ধ্যুত— অপ্রাসঙ্গিক কথা এসে যাচ্ছে৷ কিন্তু দেখুন, আমার নাম আমার এত প্রিয়, বলতে গেলে নামটা আমার অস্তিত্বের অংশ হযে গেছে তবু আমার নামের ব্যাপারে আমার কোনও দায়িত্ব নেই৷ যেমন আমার চেহারা, তা যে রকমই হোক আমায় জিজ্ঞেস করে তো আমার নাক-চোখ-মুখ-শরীর তৈরি করা হয়নি! আমার চেহারার ব্যাপারেও আমার কোনও দায়িত্ব নেই৷ অথচ যে দুটোর ওপর আমার কোনও হাত নেই সেই নাম আর দেহ আমি পরম আহ্লাদে বয়ে চলেছি৷ এ দুটোই আমার সব চাইতে প্রিয় জিনিস— আশ্চর্য দুটোই কিন্তু আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে৷

আর এই যে পৃথা যাকে দেখলে আমার ‘ঢলঢল কাঁচা অঙ্গের লাবনি অবনী বহিয়া যায়’ মনে পড়ে, এত যার অহঙ্কার চেহারার জন্য, নামের জন্য, ওর কিন্তু গর্ব করার কোনও কারণ নেই৷ ওর নাম বিদগ্ধবালা বা তারাসুন্দরী বা তৃষিতা হলেও বলার কিছু ছিল না৷ ওর বড় বড় চোখ, জ্যান্ত উন্মুখ স্তন, সরস ঠোঁট, গোল ঊরু বা ভারী নিতম্বের জন্য ওর প্রশংসা করার কোনও মানে হয় না৷ তাহলে মাসি মহাশয়া এবং মেসো মহাশয়, ব্যাপারটা কি দাঁড়াচ্ছে! তাহলে আপনাদের পৃথা অকারণে গরবিনী৷ আমারও সঙ্কোচের কারণ নেই৷ নেই? তবে আমি যে দু-পায়ের ওপর আমার মাথা-বুক-পেট-হাত-রক্তমাংস বয়ে বেড়াচ্ছি, পৃথিবীর সন্ধিগ্ধ বা সপ্রশ্ন দৃষ্টির সামনে দাঁড়াচ্ছি তার কার্য-কারণ— দূর ছাই৷

না, পৃথা এসব ফাজলামির কোনও মানে হয় না৷ তোমার মেসো যদি জিজ্ঞেস করেন, ছোকরা তুই হিন্দু, কেন রে? তুই বাঙালিই বা হতে গেলি কেন? কেন হতে গেলাম? কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল? আমি আন্দামানের নরখাদক ওঙ্গিদের মধ্যে জন্ম নিলেই বা কে বাধা দিত? আচ্ছা আমি হিন্দু! আমি বাঙালি কেন? না মশাই, উত্তর দিতে পারব না৷ আমার নাম আর চেহারার মতো এসব ব্যাপারেও আমার মতামত নেওয়া হয়নি৷ যেমন আমি মেয়ে না হয়ে পুরুষ কেন তাও বলতে পারব না৷ আমি আরও আগে বা পরে না জন্মে আমার জন্মের তারিখেই বা কেন জন্মালাম? — জানি না৷ পৃথা, মাইরি আমাকে ছেড়ে দাও৷

পৃথা বলল, তোমার মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে?

এখনও হয়নি৷ তবে—

এসব অদ্ভুত প্রশ্ন কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে?

করে না, যদি করে?

কখনও না৷ আমার মেসো-মাসিকে তুমি ভাব কী?

তোমার মেসোমাসি আচ্ছা, এই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা তোমার মেসো এবং মাসি না হয়ে তোমার মামা-মামি বা খুড়ো-খুড়ি আবার তোমার কেউ না হতে পারতেন?

কী বকছ আবোল-তাবোল?

আচ্ছা ধর, এঁরা তোমার না হয়ে রমলার মাসি-মেসো হতে পারত?

কে রমলা?

আমাদের অফিসে চাকরি করে৷

ও, আমার না হয়ে মেসো-মাসি রমলার হলে তোমার বুঝি সুবিধে হত?

সুবিধে! সুবিধের কথা আসছে কোথা থেকে?

আসছেই তো৷ এরপর তো বলবে আমার সঙ্গে না হয়ে রমলার সঙ্গে তোমার ইয়ে হতে পারত৷

ঠিক বলেছে পৃথা৷ ওর সঙ্গে না হয়ে রমলার সঙ্গে আমার দৈহিক, মানসিক ইত্যাদি ইত্যাদি সম্পর্ক অনায়াসে হতে পারত৷ আবার রমলার সঙ্গে না হয়ে কমলা বিমলা অবলা লালা লা যে কোনও মেয়ের সঙ্গে আমি বিয়ের মুখে এসে দাঁড়াতে পারতাম৷ পৃথার দিকে হাত বাড়িয়েছি তার একমাত্র ব্যাখ্যা: যোগাযোগ৷ অন্য কারও সঙ্গে একইরকম যোগাযোগ হলে আমি এরকম গম্ভীর বিষয় নিয়ে এখন পৃথার সঙ্গে বাক্যালাপ করতাম না৷ পৃথা বলল, কি চুপ করে আছ কেন বল, আমার চাইতে রমলাকে তোমার বেশি পছন্দ?

কি জ্বালা৷ কোথাকার কে রমলা এত আলোচ্য হয়ে উঠল কেন? রাগ দেখিয়ে বললাম, কি রমলা-কমলা করছ? আমি এসব কখন বললাম?

বললে তো, এই তো বললে, আমার না হয়ে রমলার মেসো-মাসি হলে—

আহ থামবে? কি উল্টোপাল্টা বকছ? কথার মানে বোঝ না—

হ্যাঁ, আমি উল্টোপাল্টা বলছি! বিয়ের আগেই এই, পরে তুমি না জানি কি করবে৷

বুঝলাম, মেজাজ দেখিয়ে এখন কাজ হবে না৷ পৃথার সুন্দর হাত দুটো ধরলাম৷ পৃথা রেগে বলল, হাত ছাড়৷

কিন্তু হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার বিশেষ চেষ্টা করল না৷ তার মানে একটু সাধতে হবে, জোর করে আদরটাদর করতে হবে৷

শান্ত হলে আমার কাঁধের ওপর হাত দুটোকে বিশ্রাম দিতে দিতে পৃথা জিজ্ঞেস করল, তুমি বিশ্বাস কর না, আমার জন্য তোমার আর তোমার জন্যই আমার জন্ম হয়েছে?

আমি চুপ করে থাকি৷ পৃথা আবার আবেগের সঙ্গে প্রশ্ন করে, আগের জন্ম থেকে তোমার আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, মানো তো, না কি মানো না?

আমি বলি, আগের জন্মের কথা জানি না তবে এ জন্মেই তো দেখতে পাচ্ছি অনেক বাধা৷

তীক্ষ্ণ গলায় পৃথা জানতে চায়, কি বাধা?

এই যে আমি তোমার উপযুক্ত কিনা তার পরীক্ষা দিতে হবে৷ তোমার মেসো-মাসি যাচাই করে দেখবেন, আমার বিদ্যে-বুদ্ধির ওজন কত?

হতাশ গলায় পৃথা বলে, তুমি একে পরীক্ষা বলছ? ছিঃ, ওরা গুরুজন, তোমাকে একটু দেখতে চেয়েছেন৷ একটু কথাবার্তা বলবেন—৷

পৃথা, একজনকে দেখে দু-একটা কথা শুনে কিছু বোঝা যায়? আচ্ছা, পৃথা মনে আছে, তুমি আমাকে যখন প্রথম দেখেছিলে তুমি আমার সঙ্গে কি রকম খারাপ ব্যবহার করেছিলে?

পৃথা হাসে কিন্তু তার দুই চোখ ছল ছল করে৷ উৎসাহ পেয়ে বলতে থাকি, আমি জানি আমি একরকম, আমার চেহারা থেকে মনে হয় একেবারে অন্যরকম৷ তাছাড়া আমি খুব ভাল কথা বলতেও পারি না৷ আমার দু-একটা কথা শুনে আমাকে কারও ভাল লেগে যাবে তাও নয়— ধর, আমাকে দেখে ওদের যদি পছন্দ না হয় তখন কি হবে?

‘তখন কি হবে’-র উত্তর না দিয়ে পৃথা জেদ করে বলে, নিশ্চয় পছন্দ হবে, কেন হবে না? মাসির তো তোমাকে এর মধ্যেই পছন্দ হয়েছে৷ মেসো মুখে কিছু বলেননি কিন্তু, তুমি আমার মেসোকে জানো না৷ এত ভাল আর এত ভালবাসে আমাকে৷

তোমার মাসির আমাকে পছন্দ হয়েছে?

হুঁ৷

কি করে হল?

কি করে আবার? আমি তোমার কথা মাসিকে বলেছি৷ মাসিও জিজ্ঞেস করেছেন৷

কি কথা তুমি বলেছ, কি কথা মাসি জিজ্ঞেস করেছেন?

কি আবার— যা সবাই বলে৷

যা সবাই বলে! চাকরির দরখাস্তে যা যা লিখতে হয়, নাম, বাবার নাম, বয়েস কত, কোথায় থাকা হয়, লেখাপড়া কদ্দুর, অভিজ্ঞতা-টতা আছে কিনা, থাকলে কত বছর কত মাস কত দিনের? তারপর কোন ধর্মের লোক, কোন লিঙ্গ—

আমি মজা করে বলিনি তবু মজা পেয়ে পৃথা বলল, সবটা না হলেও প্রায় এরকমই৷

পৃথা শোনো, সত্যি বলছি এসব শুনে তোমার মাসি আমার সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারবেন না৷

তবে কি বললে জানতে পারবেন? এই যে আমি বারণ করা সত্ত্বেও তুমি মাঝে মাঝে মদ খাও, এখন আবার নতুন উপসর্গ জুটেছে, কে রমলা না কমলা তার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব হয়েছে কিনা এসব জানতে হবে৷

হায় ভগবান, এই মেয়েটাকে আমি কী করে বোঝাই? কিন্তু হাল ছাড়লেও চলবে না৷ ওকে কাছে টেনে আনি৷ আমার কোলের ওপর বসিয়ে ওর মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে যেন অবুঝ মেয়েকে শান্ত করতে করতে বলি, তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ না পৃথা৷

পৃথা মুখ তুলে ধরে৷ আমার ঠোঁটের পাঁচ সেন্টিমিটার দূরে ওর ভেজা দুই ঠোঁট, আমার বুকের এত কাছে ওর পুষ্ট বুক৷ ওর চুল থেকে আঙুল বের করে নাকে, গালে, ঠোঁটের কাছে আলতোভাবে ঘষতে থাকি৷ শেষে অস্থির আঙুলগুলোকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য ওর একটা জ্যান্ত স্তনের ওপর আমার হাত রাখতে হয়৷ পৃথা আচ্ছন্ন চোখ তুলে তাকায়৷ ওর চোখের মণি আরও কালো হয়ে উঠেছে৷ ওকে আমি কী বোঝাব? আমার নিজেরই এখন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে, পৃথার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়৷

পৃথাদের বাড়ি থেকে যখন বেরিয়ে এলাম সূর্য তখনও মাথার ওপর আসেনি৷ রাস্তার ওপর আমার পা পড়ছে, প্রথমে ডান পা তারপর বাঁ৷ আমার পায়ে পায়ে চলেছে আমার ছায়া৷ আমি থামলে ছায়া থামে, আমি চললে চলে৷ ছায়ার রক্তমাংস নেই, হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড নেই৷ আমি ছায়ার কথা মনে রাখি না তবু ছায়া আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে৷ আমি চাই বা না চাই ছায়া আমার সঙ্গ ছাড়ে না৷ কেন?

ফুটপাতের পাশে চওড়া কালো রাস্তা, রাস্তা দিয়ে চলেছে ছোট-বড় নানারকম গাড়ি, তার মধ্যে একটা ডবল-ডেকার গর্জন করতে করতে পাড়া কাঁপিয়ে চলেছে৷ ডবল-ডেকারের পাশে পাশে অসহায় একটা স্কুটার যেন ভয়ে ভয়ে চলেছে৷ আমার আগে চলেছেন এক সুন্দরী৷ তাঁর খোলা পিঠ, খোলা কোমরের খাঁজ আর কম্পমান গুরু নিতম্ব নিয়ে তিনিও পাড়া কাঁপিয়ে চলেছেন— ওই ডবল-ডেকারের মতো৷ আমার ছায়া নিয়ে দ্রুত মেয়েটির পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করি৷ পারি না৷ সুন্দরীর নরম মাংসল শরীর এঁকে-বেঁকে একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে আমার পথ রোধ করে সরে সরে যাচ্ছে৷ কী বিপদ৷ ঠিক আছে, তুমি খুব সুন্দরী কিন্তু আমার কি দোষ? আমাকে কষ্ট দেওয়ার কোনও মানে হয়?

লাল-হলুদ-সবুজ ট্রাফিক সিগনাল জ্বলছে নিভছে৷ সুন্দরীদের থামানোর জন্য শহরে কোনও ট্রাফিক সঙ্কেতের ব্যবস্থা নেই কেন? কোনও দৈনিকের সম্পাদককে একটা চিঠি লিখলে হয়৷

শাড়ির দোকানে শো-কেসে ভারি সুন্দর শাড়িতে সেজে ডামি-রূপসী থমকে দাঁড়িয়ে আছে৷ মুখে সলজ্জ হাসি৷ আমার আগে আগে যিনি চলেছেন এখনও তার মুখ দেখিনি৷ কিন্তু তার মুখে যে অহঙ্কার লেগে আছে, আমি না দেখেও বলে দিতে পারি৷ ওকে বলব, ডেকে বলব, ওই ডামির মতোই তোমার চেহারার জন্য তুমি কোনও কৃতিত্ব দাবি করতে পার না? তোমাকে জিজ্ঞেস করে তোমাকে তৈরি করা হয়নি৷ যেমন, ওই ডামি, যেমন এই আমি ধ্রুবজ্যোতি দত্ত কোনওরকম দায়িত্ব বা কৃতিত্ব ছাড়াই ছায়া সমেত আমার শরীর বয়ে নিয়ে চলেছি৷ আমার তথাকথিত পরিচয় বয়ে নিয়ে যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি?

জানি, পৃথা রেগে যাবে— ও খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়বে, তবু বিকেলে ওর মেসো-মাসির বাড়িতে গেলাম না৷ তারপর পাঁচ-ছদিন কেটে গেল কিন্তু পৃথার কোনও খবর নেই৷ আশা করেছিলাম, ও না আসুক, অন্তত একবার ফোন করবে৷ ফোন করে জানতে চাইবে, আমি কেন যাইনি? রাগ এবং অভিমান প্রকাশ করবে৷ পৃথার ক্রুদ্ধ মুখ মাঝে মাঝে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল৷ ক্রুদ্ধ এবং কামার্ত এই দুই পৃথার মুখের পার্থক্য কী? পার্থক্য আছে কিনা জানি না৷ কিন্তু যত দিন যাচ্ছে আমার প্রেমিকার আরক্ত মুখ সরে গিয়ে তার বিব্রত-ম্লান মুখ যেন দেখতে পাচ্ছি৷ কিন্তু আমি কী করব? আমি যে কী করি?

আমাদের অফিসের পুলকেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে কেন?

এস্টাব্লিশমেন্টের নব-বিবাহিত রাহাবাবু বলেন, কী ব্যাপার দাড়ি কামাননি? আপনি তো এভাবে কখনও অফিসে আসেন না?

আমি কি অনেকদিন আয়নায় মুখ দেখিনি? এই মুখ ধ্রুব নামে এক ব্যক্তিকে এক জীবনের জন্য ভোগ দখলের স্বত্ব দেওয়া হয়েছে৷ এই শরীর ধ্রুবর৷ আবার এই নামটাও এই শরীরকে মৃত্যু পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে৷ জন্মতারিখ, ধর্ম, লিঙ্গ ইত্যাদি তথাকথিত পরিচয় তথাকথিত ধ্রুবকে এক জীবনকালের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে৷ সারা জীবনের বন্দোবস্ত! অতএব আপনার নাম— জাতি— ধর্ম— বর্ণ— লিঙ্গ— আকৃতি-টাকৃতি সবই আকস্মিক, সব বাতিল৷ তুমি তবে কে হে? আকস্মিকভাবে সূর্য থেকে উৎক্ষিপ্ত জ্বলন্ত তরল পদার্থ থেকে তৈরি পৃথিবী নামক ঘুরন্ত গ্রহের পিঠের ওপর বিমূঢ় পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ? আকাশের নিচে তোর পরিচয় কি শালা?

আমি একজন বহনকারী৷ শববাহকের কাঁধে না চাপা পর্যন্ত সমস্ত জীবন ধরে আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়ের বোঝার আমি বাহক৷

পৃথা এসে জিজ্ঞেস করল, ব্যাপারটা কি?

উত্তর খুঁজে না পেয়ে আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করি, ব্যাপারটা কি?

পৃথা জোর দিয়ে বলে, আমি জানতে চাই, তুমি ভেবেছ কি? আমার মানসম্মান বলে কিছু নেই?

তোমার মান— তুমি— তুমি কে? কে গো?

সত্যি বলছি সব কিছু নিয়ে ফাজলামি ভাল লাগে না৷

ফাজলামি তো করিনি৷

করনি? একটা সারাজীবনের ব্যাপার—

কার জীবন? আমার না ধ্রুবর? তোমার না—

পৃথা বিস্মিত হয়ে বড় বড় চোখে আমাকে দেখে৷ তারপর হঠাৎ পেছন ফিরে হন হন করে চলে যায়৷ যাক৷ পৃথা নিশ্চয় গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে না৷

পরের দিন পৃথা দরজা খুলে আমাকে দেখে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে করল না৷ কোনও কথা না বলে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভিতরের দিকে চলে গেল৷ খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ব, না, ফিরে যাব?

না, ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি৷ ঠিক আছে আকস্মিকভাবেই পৃথার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে, তবু পৃথাকে আমার চাই চাই চাই৷ আকস্মিকতা যেমন সত্যি৷ ওর সম্পর্কে আমার আবেগও তো সত্যি— সোনার প্রতিমা জলে ভাসাইও না৷ সবই তো আমি মেনে নিয়েছি৷ তবে?

পৃথা নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে আঙুলে শাড়ির আঁচল জড়াচ্ছে, খুলে ফেলছে আবার জড়াচ্ছে৷ তার মানে ও আমার জন্য অপেক্ষা করছে৷ ওর সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলব, প্রেম দাও, সব ভুলতে দাও, দাও, দেহি?

এখন আমার শরীরের নিচে পৃথার জাগ্রত শরীর৷ এক শরীরের প্রতিটি কোষ অন্য শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে সুখ শুষে নিতে চাইছে৷

বিশ্ব সংসারে কোথাও আর কিছু নেই৷ পৃথার মুখ কিরকম সরল হয়ে উঠছে৷ শক্ত করে চেপে ধরা দুই ঠোঁট, ওর দুই চোখ খোলা, কিন্তু চোখ দিয়ে ও বোধহয় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না৷ আমার বুকের নিচে পৃথার উদার নরম দুই স্তন৷ ও দু-হাতে আমার কাঁধ আঁকড়ে ধরেছে৷ অতীত ভবিষ্যৎ জাহান্নামে যাক শুধু বর্তমান বর্তমান৷ পৃথার শরীর যেন আবেশে গলে যাচ্ছে৷ এক সময় আমি তীব্র সুখে মনে মনে ‘জীবন জীবন’ বলে চিৎকার করে উঠি৷

এক পা ছড়িয়ে আর এক পা ভাঁজ করে হাঁটুতে গাল চেপে পৃথা বসে আছে৷ ওর চোখে অবসাদ, না অপরাধের ছায়া? — হঠাৎ সে এগিয়ে এসে উপুড় হয়ে আমার কপালে চুমু খায়৷ মুখ ঝুঁকিয়ে ধ্রুব নামক ব্যক্তির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভেজা গলায় বলে, এই আমার ভীষণ ভয় করছে, যদি কিছু হয়?

না ভেবেই উত্তর দিই, ভয়ের কি আছে?

পৃথা মুখ সরিয়ে বলে, কি জানি৷ তারপর খাট থেকে নেমে জামা-কাপড়ে শরীর ঢাকে৷ ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বোধহয় বাথরুমে যায়৷ ধড়মড় করে উঠে বসে আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ভয়ের কিছু নেই? — আবার, আবার একজন নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ছাড়া উদাসীন পৃথিবীতে এসে পড়বে৷ তার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী আমি নিজে৷ তার পছন্দ-অপছন্দের কথা না ভেবে তার অবয়ব তৈরি হবে৷ ক চ ট ত প যে কোনও একটা নামের ছাপ দিয়ে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে তাকে আমরা সঁপে দেব৷

বিছানা থেকে নেমে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পর্দার ওপরের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যায়৷ আকাশ অথবা শূন্য৷ শূন্যে আবছা চাঁদ দেখা যাচ্ছে৷ দিনের আলোতে ম্লান ওই চাঁদের চাইতে অনেক দূরে— বহু আলোকবর্ষ দূরে ভাসছে এবং ঘুরছে অসংখ্য চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্র৷ মহাজগতে সামান্য একটি গ্রহ পৃথিবী৷ সেই পৃথিবীর নগণ্য জীব মানুষ৷ মানুষের চাওয়া এবং না-চাওয়ার ওপর মহাজগতের এমনকী এই পৃথিবীর কিছুই নির্ভর করে না৷ কোটি কোটি মানুষের মধ্যে ধ্রুব নামে একজন নির্বিকার-আকাশের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ায়৷ আবার তাকায় মহাকাশের দিকে৷ মহাবিশ্বে নিয়মের রাজত্বে কিছু থেমে নেই৷ সব চলছে, ক্রমাগত ঘুরছে৷ কোনও তারার আলো নিভে যাওয়া নিয়মের বাইরের কোনও কিছু নয়৷ নিরপেক্ষ মহাবিশ্বে তুচ্ছ পৃথিবীগ্রহে অতি তুচ্ছ কীটপতঙ্গের মতো কোনও মানুষের অস্তিত্ব বা বিলোপও কোনও বিশেষ ঘটনা নয়৷ নগণ্য এক গ্রহের কোটি কোটি কোটির মধ্যে ধ্রুবরে—

এই সময় পৃথা ঘরে ঢুকল দাঁত বার করে৷ ওর শরীরের ভেতরে এতক্ষণে শুক্রকীট আর ডিম্বকোষ মিলিত হয়েছে? আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, জলে স্থলে অসংখ্য অসংখ্য পরিচয়হীন কৃমি কীট জীব বংশ বিস্তার করে চলেছে, কেন? অসংখ্য ধূলিকণা অকারণে উড়ছে? চারদিক ঢেকে ফেলছে৷ আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে৷ পৃথা এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরতে তার পিচ্ছিল শরীরের স্পর্শে আমার সমস্ত শরীর কুঁকড়ে যায়৷ আমার গলার ভেতর থেকে অস্বাভাবিক চিৎকার বেরিয়ে আসে, বন্ধ কর, পৃথা, বন্ধ করতে হবে—

বিহ্বল গলায় সে জিজ্ঞেস করে, কি, কেন?

হাত মুঠো করে প্রতিটি শব্দের ওপর জোর দিয়ে বলি, জন্ম বন্ধ করতে হবে—

পৃথার চোখে প্রথমে ভয় তারপর দুশ্চিন্তা ভেসে ওঠে৷ ওর চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে থাকে৷ কৃত্রিম কি অকৃত্রিম জানি না, পৃথা কাঁদছে৷ আমি শুধু নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে থাকি৷ আহ ধ্রুব আমি কাঁদতেও পারি না যে৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%