অশোক দাশগুপ্ত
তাঁকে একবার দেখলে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব৷ আমিও পারিনি৷ হাজার জনের ভিড়েও তিনি চারপাশের একান্ত মনোযোগ কেড়ে নেবেনই৷ এমনই তাঁর চেহারার বিশেষত্ব৷
আমি তাঁকে প্রথম দেখেছিলুম আমার এক বন্ধু মনোতোষের বাড়িতে৷ মনোতোষের ছোট্ট ড্রয়িং রুমখানা একেবারে ভরে গিয়েছিল তাঁর উপস্থিতিতে৷
খুব যে রূপবান, তা নয়৷ শরীর থেকে যে গলিত মোমের মতো লাবণ্য ঝরে ঝরে পড়ছে, তাও নয়৷ বরং সারা শরীর জুড়ে এক ধরনের লুকানো কাঠিন্য৷ লম্বায় সাড়ে পাঁচ কিংবা সামান্য বেশি৷ গায়ের রঙ উজ্জ্বল তামাটে৷ পেটানো শরীর৷ সব মিলিয়ে চার আনা৷ বারো আনা ওঁর মুখে৷ ঈষৎ লম্বাটে তে-কোনা মুখ৷ প্রশস্ত ললাট, দুপাশ থেকে সাঁড়াশি-আক্রমণ চালিয়ে কেশভূমির দখল নিতে নিতে এগোচ্ছে৷ বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ নাক, বলিষ্ঠ ধারালো ঠোঁট, ভাঙা গালের ওপরে ঠেলে ওঠা চোয়াল, এবং ঈষৎ উদ্ধত চিবুক জুড়ে একটি ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি— পরিপাটি করে ছাঁটা৷ সব জিনিস সবাইকে মানায় না৷ আবার কিছু কিছু আছে, এক একজনকে ভীষণ মানিয়ে যায়৷ ওঁরও তেমনি৷ চিবুকের ওই ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িখানি৷ লম্বাটে তে-কোনা মুখখানিতে যা মানিয়েছে না! ওঁকে দেখামাত্রই আমি নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম ফ্রেঞ্চ-কাট ছাড়া আর কোনও কিছুই মানাত না ওই মুখে৷ এবং তিনি যখন পাইপ ছোঁয়ালেন ঠোঁটে, আমার মনে হল, ওই ঠোঁটে, আর যাই হোক, সিগারেট চুরুট নিতান্তই বেমানান হত৷ ছেলেমানুষী হলেও, আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবনা, গবেষণা করলুম মনে মনে৷ এবং অবশেষে, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলুম যে, চুল কিংবা গোঁফদাড়ি কিংবা পোশাক-আশাক কিংবা ফ্যাশন-ট্যাশনের যে নতুন নতুন ডিজাইন বেরয়, তা প্রতি ক্ষেত্রেই প্রাথমিকভাবে জন্ম নেয় একটি মনোমতো শরীরের কথা ভেবে৷ পরে, বালখিল্য প্রয়োগে তা বারভোগ্য হয়ে ওঠে৷ আমার কোনও সন্দেহ নেই, ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি চালু হয়েছিল ঠিক এই ধরনের মুখগুলোর জন্য৷ পরে রামা-শ্যামা-ভীমা তাদের গোল- চৌকানো-চ্যাপ্টা মুখেও তা রাখতে শুরু করে৷ আমি বুঝতে পারছি, এই জন্যই ইদানীং কোনও কোনও পোশাক বা চুল-দাড়ি কাটবার ধরন-ধারণ কিংবা প্রসাধন-অলঙ্কার এত অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে৷ খারাপ ওগুলো নয়ই, ছিল না, শুধু অপাত্রে পড়ে মান খুইয়ে বসেছে৷
প্রথম দিকে তো আমি হাঁ করে দেখছিলুম ওঁকে৷ কিছুতেই ওঁর দিক থেকে নজর সরাতে পারছিলুম না৷ ঘিয়ে রঙের প্যান্টের সঙ্গে উজ্জ্বল নস্যিরঙের বুশ শার্ট, সবার ওপরে, ওই তামাটে উজ্জ্বল মুখে মেহেন্দির রঙ লাগানো ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িটি৷ ঠোঁটের ডগায় চেপে ধরা জ্বলন্ত পাইপ৷ উনি মৃদু হাসছেন, কথা বলছেন, একটা কি দুটো৷ রি-অ্যাক্ট করছেন খুব মৌলিক নিজস্ব ভঙ্গিতে৷ স্বীকার করতে একটুও লজ্জা নেই, আমি ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছি ওঁকে সারাক্ষণ, ওঁর প্রতি শব্দ শুনছি, ওঁর প্রতিটি মুদ্রা ও অভিব্যক্তিতে রোমাঞ্চিত হচ্ছি৷ কী করেন ভদ্রলোক? আমাদের মতো হেঁজিপেঁজি কেরানি নয় নিশ্চয়ই৷ অবশ্যই কোনও উঁচু পদে বসে রয়েছেন৷ সব কিছুতে যেভাবে অ্যাসার্ট করছেন, খুব সিনিয়র এগজিকিউটিভ না হয়ে যান না৷ এবং সেটাও কোনও জবরদস্ত প্রাইভেট কোম্পানিতে৷ সরকারি চাকরিতে নিশ্চয় নয়৷ রাজ্য সরকারে তো নয়ই৷ এককালে নেশা ছিল৷ একটা মজার নেশা৷ গ্রুপ-ফটো পেলেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা৷ মুখগুলোকে স্টাডি করে করে সরকারি কর্মচারীদের শনাক্ত করা৷ অপুষ্টিতে শুঁটকি মাছ৷ খেতে পেলে আবার, সুষম খাদ্যের অভাবে, মূলত কার্বো হাইড্রেট ও ফ্যাট খেয়ে খেয়ে, গোলগাল, থলথলে৷ চোখ দুটি মরা কাতলার মতো ঘোলাটে স্থির৷ গ্রুপ ফটোগ্রাফ থেকে ঠিক বেছে বেছে আলাদা করে নিই মুখগুলোকে৷ দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সরকারি কর্মচারী ইনি নন৷ সরকারি কর্মচারীরা অতখানি স্মার্ট আর অ্যাট্রাক্টিভ হয় না৷ হলেও থাকে না৷ কিছুদিন বাদেই প্রতিমার গায়ে ধুলো জমতে শুরু করে৷ তারপর দুটো বাজলেই মুড়ি-বাদাম৷ গোল-গোল বড় সাইজের মুড়ি৷ মুড়ি বেশি, বাদাম কম৷
এক্সকিউজ মি, আপনি কি আমাকে কখনও দেখেছেন আগে?
ঘন ঘন তাকিয়েছি ওঁর দিকে৷ এই কারণেই বোধ করি উনি ভেবেছেন, আমি স্মৃতিতে আটকে থাকা কোনও পরিচিত মুখের সঙ্গে ওঁকে মেলাবার চেষ্টা করছি৷ মৃদু হেসে বললুম, ‘কই, না তো৷’ খুব বোকা বোকা শোনাল আমার জবাবখানা৷ নিজের কানেই বাজল৷ এমনি সময়ে মনোতোষই বাঁচাল আমায়৷
‘আলাপ করিয়ে দিই৷ পঙ্কজ দত্ত৷ আমার পিসতুতো ভাই৷ আর এ হল প্রণবেশ৷ আমার বন্ধু৷
নমস্কার বিনিময়ের পর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম৷ পঙ্কজ বললেন, ‘সত্যিই তো, আমরা একঘরে পাশাপাশি বসে আছি, আলাপ করিনি কেন এতক্ষণ? আসলে আমরা ব্রিটিশ লিগ্যাসি বইছি৷ জাহাজ ডুবি থেকে বেঁচে এক নির্জন দ্বীপে উঠেছে দুজন মাত্র ইংরেজ৷ দুজনেরই জীবন-মরণ সমস্যা৷ কিন্তু পাশাপাশি থেকেও কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছে না৷ কারণ, আলাপ করিয়ে দেওয়ার তৃতীয় ব্যক্তিটি অনুপস্থিত৷ চওড়া হাসি হাসলেন পঙ্কজ৷ এবং এরপর থেকে আমি ওঁর ভক্ত হয়ে গেলুম৷ আমাদের ঘন ঘন দেখা হতে থাকল৷ পঙ্কজের প্রতিটি কথাই আমার আশ্চর্য রকমের নতুন মনে হয়৷ প্রতিটি উচ্চারণ আশ্চর্য রকমের আধুনিক৷ যদিও তদ্দিনে আমি জেনে গেছি, পঙ্কজ কোনও নামী কোম্পানির দামি এগজিকিউটিভ নন৷ একটি মাঝারি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন মাত্র৷ এবং পদটি যা, বিশ্লেষণ করলে, একজন ভদ্রগোছের শ্রমিক ছাড়া কিছুই নয়৷
মনোতোষ বলে, পঙ্কজটা এরকমই৷ ধোপ দুরস্ত, ফিটফাট৷ দেখে বোঝার উপায় নেই৷ এককালে খেলাধুলোয় দুর্ধর্ষ ছিল৷ ফুটবল ক্রিকেট দুটোতেই তুখোড়৷ মেয়েরা দেখলেই ওর প্রেমে পড়ে যেত৷ তখন তো ওর গাল এমন তোবড়ায়নি৷ চোয়ালও ঠেলে ওঠেনি আকাশের দিকে৷ পাড়ার ক্লাবের হিরো ছিল ও৷ সব মিলিয়ে পড়াশুনোটা তেমন হল না৷ পিসেমশাই মারা গেলেন অকালে৷ প্রভুসেবা করে নাম কিনেছিলেন যথেষ্ট৷ তার পুরস্কারটা, পসথুমাস, পঙ্কজ পেল হাতে হাতে৷ স্কুল ফাইনাল পাস না করেও চাকরি পেল পিসেমশাইয়ের কারখানায়৷ অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার৷ লেবারদের হাজিরা নেওয়া, কাজকর্মের তদারকি, দরকারে নিজেকেও হাত লাগাতে হয় প্রাোডাকশনে৷ বিস্মিত আমি আবার পঙ্কজের মুখখানি নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করি৷ এবং কিছুদিনের মধ্যেই, ওই লম্বাটে ধারালো তে-কোনা মুখখানা থেকে চেঁচে চেঁচে ফেলে দিই যাবতীয় আমলা-সুলভ অহং, প্রভুত্ব ইত্যাদি৷ তার বদলে ওই ঠেলে ওঠা চোয়াল এবং তোবড়ানো গাল-সহ পুরো মুখখানিকে আমার দারুণ লড়াকু মনে হয়৷ শরীরখানা, যেন লড়াইয়ের আগুনে পুড়ে পুড়ে নিখাদ৷ চামড়া, ঝলসে গিয়ে অমন তামাটে৷ পঙ্কজের পুরো মুখখানা, তার ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি-সহ, আমার কাছে অন্য ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়৷ কারণ ততদিনে আমি জেনে গেছি, পঙ্কজ ওদের কারখানার ঝিমিয়ে পড়া শ্রমিক-সংগঠনটিকে প্রায় একক প্রচেষ্টায় অনেকখানি চাঙ্গা করে ফেলেছে৷ শুনে আমি নড়ে-চড়ে বসি৷ কশেরুকা টানটান করে শুনতে থাকি ওর বিগত তিন বছরের লড়াইয়ের গল্প৷ চড়াই-উতরাই, খোয়াইতে ভরা সে পথ৷ পদে পদে সমস্যা, অনিশ্চয়তা, মালিকপক্ষের ভীরু আক্রমণ আর সহযোদ্ধাদের বিশ্বাসঘাতকতার ঝুঁকি সেখানে৷ সেটাও ভারি অভিপ্রেত মনে হয়৷ সমস্যা আর অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নেই যেখানে, পঙ্কজকে সেখানে মানায় না৷
‘আসলে, ছেলেবেলা থেকে বাবার মালিক-তোষণের এত অভিনব পন্থা স্বচক্ষে দেখেছি যে, এক ধরনের হীনমন্যতায় দগ্ধ হতে হতে বড় হয়েছি আমি৷’ পঙ্কজের মুখে ম্রিয়মাণ হাসি, যেন শেষ বিকেলের ম্লান বিষণ্ণ আলো, ‘বাবার চিরকাল নুয়ে পড়া শরীরখানি দেখতে দেখতে নিজের প্রতি ঘেন্নাই শুধু বাড়ছিল তিলতিল৷ সুযোগ পেয়েই তাই মনের ওই গ্লানিটুকু ঘসে ঘসে তুলে ফেলতে চাইছি৷ এটাকে এক ধরনের প্রায়শ্চিত্ত বলতে পার৷ পূর্বপুরুষের পাপের৷’
আজ দিনভর ভারি গুমোট৷ হাওয়া নেই একতিল৷ গাছের পাতা নড়ছে না একটুও৷
মনোতোষ বলল, ‘জানিস তো, পঙ্কজের খুব বিপদ৷’
আমি চমকে উঠি৷ ‘বিপদ! কী বিপদ?’
‘ওকে বদলি করে দিয়েছে ওদের নাগপুরের কারখানায়৷ ওই তো মাইনে৷ নিজের বাড়িতে এক অন্নে সবাই আছে বলে সামলে নিচ্ছে কোনওরকমে৷’
‘কে কে আছে পঙ্কজের বাড়িতে?’
‘বউ, দুটো বাচ্চা, বুড়ি মা আর এক বেকার ভাই৷ মা তো একেবারেই শয্যাশায়ী৷ হরেক কিসিমের ব্যাধি বাসা বেঁধেছে ওঁর শরীরে৷ বাচ্চা দুটো পড়াশুনো করছে স্কুলে৷’
‘খুবই মুশকিল হল তো৷’
‘হ্যাঁ, খুব মুশকিল৷ সবকিছু তুলে নিয়ে নাগপুর রওনা দেওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব৷ পিসিমা ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবেন না৷ আবার পিসিমাকে ছোট ভাইয়ের জিম্মায় রেখে চলে যাওয়াও সম্ভব নয়৷ মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি রকমের অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি৷ তখন ডাক্তার-বদ্যি, ওষুধ-পথ্য, সেবা-শুশ্রূষা, রাতজাগা— একেবারে নাজেহাল অবস্থা৷ তাছাড়া খরচের ব্যাপারটাও রয়েছে৷ ওই মাইনে দিয়ে দু’জায়গায় দুটো এসটাবলিশমেন্ট করা—৷ চালাবে কী করে পঙ্কজ?’
শুনতে শুনতে মনে মনে ব্যাকুল হয়ে উঠি, পঙ্কজের জন্য৷
বলি, ‘হঠাৎ বদলি করল কেন?’
‘শুধু ওকেই নয়, আরও জনাকয়কে করেছে৷ তবে মনে হয় ওকে করেছে টাইট দেবার জন্যই৷ ম্যানেজমেন্টকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছিল না তো৷’
পঙ্কজ কাল এসেছিল মনোতোষের বাড়িতে৷ খবর পেয়ে গেলুম৷ থমথম করছিল ওর মুখ৷ চোখের কোলে কালি জমেছে৷ রাতে বোধকরি ঘুম-টুম হচ্ছে না তেমন৷ চোখে-মুখে শান্ত দেখালেও, বুঝতে পারি, একটা ঝড় চলেছে ওর ভেতরে৷ মনে হল, খুবই ভেঙে পড়েছে বেচারা৷
বললুম, ‘তুমি জানাও ওদের৷ বদলি রদ করবার জন্য রিপ্রেজেন্টেশন দাও৷’
পঙ্কজ ধীর গলায় বলে, ‘দিয়েছিলাম৷ লাভ হয়নি কিছু৷’
‘ইউনিয়নকে বল৷ তারা ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিক৷ ওদের জন্যই তো এত দুর্ভোগ তোমার৷’
‘ইউনিয়ন ডেপুটেশন দিয়েছিল৷ ও পক্ষ মানেনি৷’ একটুক্ষণ চুপ করে থাকে পঙ্কজ৷ পাইপখানা অকারণে নাড়াচাড়া করতে থাকে, আসলে প্রতিটি ইউনিয়নেই কিছু সুবিধেবাদী লোক থাকে৷ তারা মুখে যতই তড়পাক, ক্রাইসিসের সময় পিঠটান দেয়৷ এক্ষেত্রেও তাই ঘটছে৷ মালিকপক্ষের কিছু চামচে তো আছেই বর্ণচোরা হয়ে৷ অন্যরাও ভয় পাচ্ছে, পাছে বেশি সোচ্চার হলে, তাদেরও বদলি করে দেয়৷ সব মিলিয়ে ইউনিয়নের যতখানি জ্বলে ওঠার কথা ছিল, পারেনি৷’
কথাগুলো ধীরে ধীরে বলছিল পঙ্কজ৷ ওর অসহায় অবস্থাখানা বুঝতে পারছিলুম৷
মনোতোষ বলল, ‘তাছাড়া, বেশি জ্বলে ওঠার অন্য অসুবিধেও রয়েছে৷ পঙ্কজ তার নিজের ব্যাপার বলে তেমন করে চাপ দিতেও পারছে না ইউনিয়নকে৷ বিরোধীরা রটাবে, পঙ্কজ নিজের স্বার্থে ইউনিয়নকে লড়িয়ে দিচ্ছে৷’ খুবই ডেলিকেট অবস্থা ওর৷ বুঝতে পারি আমি৷ সান্ত্বনা দেবার ভাষাও খুঁজে পাইনে৷ এমন মানুষকে কী বলে সান্ত্বনা দেব! তেতো মনখানা নিয়ে ফিরে আসি৷ কীভাবে সাহায্য করতে পারি মানুষটাকে, এই দুঃসময়ে, সেটাই ভাবতে থাকি মনে মনে৷
দিন কয়েক বাদে কী অদ্ভুত যোগাযোগ! পঙ্কজের চেয়ে ওটাকে আমারই সৌভাগ্য বলে মনে হয়৷ আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, স্কুল ও কলেজের সহপাঠী, বিভূতি সান্যাল ওদের কারখানার অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার৷ আমি হঠাৎই জানতে পারলাম, বলতেই, ওকে চিনল পঙ্কজ৷
‘বিভূতি সান্যাল মানুষটি ভাল৷ অন্যদের মতো অত ইয়ে নয়৷’ পঙ্কজ বলে, ‘তবে এইসব প্রাইভেট কনসার্নে প্রায় সবাই অল্পবিস্তর ক্যারিয়ারিস্ট৷ সান্যালও ম্যানেজমেন্টকে খুব মানিয়ে চলে, তবে এমনিতে লোক খারাপ নয়৷’
সটান চলে গেলুম বিভূতির বাড়ি৷ সব খুলে বললুম ওকে৷
বললুম, ‘ম্যানেজমেন্টকে পটাও৷ এ বদলি রদ করতেই হবে৷ যেভাবেই হোক৷’
দেখলুম, উঁচু পদে থাকলেও বিভূতি এখনও বেশ সাদাসিধে, খোলামেলা৷ পঙ্কজ বলে, কাজে-কর্মে নাকি খুবই এফিসিয়েন্ট৷ খুব মেথডিক্যাল আর বেশ ঠান্ডা মাথার মানুষ৷
সব শুনে বিভূতি বলল, ‘সমস্যাটা হল, পঙ্কজবাবু গত তিন বছরে ম্যানেজমেন্টকে এত চটিয়েছেন যে, ওঁর ব্যাপারে কেউই সিমপ্যাথি দেখাতে নারাজ৷’
ব্যাকুল গলায় বললুম, ‘তবু তুই একটু দ্যাখ ভাই৷ ওর সংসারটা এক্কেবারে ভেসে যাবে৷ ওর মা’টা বিনে চিকিৎসায় মারা যাবে৷’
খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল বিভূতিকে৷ বলল, ‘দেখি, কী করা যায়৷’
বিকেলের দিকে বিভূতির ফোন৷
‘চলে আয়৷’
অফিস-ফেরতা গেলুম ওর বাড়ি৷
খুব গম্ভীর লাগছিল বিভূতিকে৷ মুখ খুলতে একটু সময় নিল৷ চা বানাতে বলল ভেতরে গিয়ে৷ চা খেতে খেতে বলল, ‘কথা বলেছি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে৷ রাজি হচ্ছিল না কিছুতেই৷ খুব চেপে ধরতে নিমরাজি হয়েছে৷’
‘বলিস কী?’ আমি উচ্ছ্বসিত, ‘রাজি হয়েছে!’ ‘তবে শর্ত আছে৷ পঙ্কজবাবুকে ওঁর বিগত সমস্ত আচরণের জন্য ম্যানেজমেন্টের কাছে লিখিত ক্ষমা চাইতে হবে৷ এবং ভবিষ্যতে ইউনিয়নের হয়ে আর কখনই ম্যানেজমেন্টকে বিব্রত করবেন না, এই মর্মে মুচলেকা দিতে হবে৷’
শুনতে শুনতে অর্ধেক অসাড় হয়ে গেছি আমি৷ এ যেন নিজের মৃত্যুদণ্ডে সই করবার সামিল! এটা কোনও শর্ত হল! পঙ্কজের মতো মানুষের পক্ষে এমন শর্ত মানা সম্ভব!
বিভূতি খুব পরিষ্কার কথা বলে৷
বলল, ‘কোথাও কোনও অ্যামবিগুইটি না রেখেই বলছি ভাই, এটা করলে তবেই ম্যানেজমেন্ট ওর বদলির অর্ডার রদ করবে, নচেৎ নয়৷ এ ব্যাপারে কোনও দর কষাকষির অবকাশ নেই৷’
অন্ধকার রাস্তা ধরে নির্বাক হাঁটছি আমি৷ হাঁটছি, আর গভীর ভাবনায় তলিয়ে যাচ্ছি৷ এ কী অপমানজনক শর্ত! মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার অধিকারটুকু কেড়ে নেবে, তার দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে! এ কী জুলুম! সবচেয়ে বড় কথা, পঙ্কজকে এমন প্রস্তাব আমি দেব কী করে? ব্যাপারটা ও কীভাবে নেবে? এমন মানুষকে এমন হীন প্রস্তাব দেওয়া যায়?
লোডশেডিং চলছিল৷
মনোতোষের ড্রইংরুমে বসে আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে পঙ্কজ জানাল, সে দুটো শর্তেই রাজি৷ তবে তারও একটা অনুরোধ আছে৷ ম্যানেজমেন্টকে পুরো ব্যাপারটা গোপন রাখতে হবে ওর সহকর্মীদের কাছে৷ যাতে সবার কাছে ও ছোট না হয়ে যায়৷
টিম টিম করে জ্বলছিল কেরোসিনের টেবিল ল্যাম্প৷ তার ছায়াখানা নাচছিল পঙ্কজের মুখের ওপর৷ আমি পঙ্কজকে নিষ্পলক দেখছিলুম৷ এমন শর্তেও রাজি হয়ে গেল ও! এর চেয়ে, আমার মতে, ওর নাগপুর যাওয়াই শ্রেয় ছিল৷ যত ক্ষতিই হোক, ওর উচিত ছিল৷ এর চেয়ে মায়ের পা দুটো জাপটে ধরা ওর পক্ষে অনেক সম্মানের ছিল বলে মনে হল আমার৷ মা-গো, তুমি চল আমার সঙ্গে৷ আমায় বাঁচাও৷ ছোটভাই না হয় থাকত একখানা ঘর নিয়ে৷ বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে দিত৷ ওই টাকায় চলে যেত ছোট ভাইয়ের খরচ৷ আর বাচ্চা দুটোর লেখাপড়া? এটা তেমন কোনও ব্যাপারই নয়৷ অল ইন্ডিয়া সার্ভিসে যারা রয়েছে, তাদের ছেলেমেয়েরা হর-হামেশা এমন অসুবিধের সম্মুখীন হয়৷
‘তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না৷’ খুব ঠান্ডা বিষণ্ণ গলায় বলেছিল পঙ্কজ, ‘তুমি ব্যাপারটাকে ইমোশনালি দেখছ৷ ভাড়াটে যে বসিয়ে দেব, আর যদি না ওঠে? ছোটভাইটা, কোনওদিন একলা থাকেনি, যদি গোল্লায় যায়? যদি প্রেম করে? ড্রাগ ধরে?’
‘ঘরে তালা ঝুলিয়ে, ছোটভাইকে নিয়ে চলে যাও৷’ আমি ওকে যুক্তি দেখাই৷
‘বাহ! তার কার্ড রয়েছে লোকাল এক্সচেঞ্জে৷ এই হল তার চাকরি-বাকরি পাওয়ার বয়স৷ আমি তাকে নিয়ে চলে যাব? তা ছাড়া, মা কী করে থাকবে?’
‘মা-কে বোঝাও৷ বোঝালেই তিনি রাজি হবেন৷’
‘বললাম না, মা-কে এখন শিফট করা কিছুতেই সম্ভব নয়৷ এই ভিটেতে বাবার মৃত্যুর পর, মা-কে স্রেফ সাইকোলজিক্যাল কারণে ভিটে ছাড়া করা যাবে না৷’
হাল ছেড়ে দিলুম আমি৷ অনেকগুলো সমস্যার ফাঁস গলায় নিয়ে হাঁসফাঁস করছে পঙ্কজ৷ আমি আর ওর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাই নে৷
বললুম, ‘ঠিক আছে৷ বলছি বিভূতিকে৷ মুচলেকা দেবার দিনক্ষণ ঠিক করুক৷’
গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারটা ম্যানেজমেন্ট মেনে নিয়েছে৷ এ খবরটা আমার কাছে পেয়ে অনেকখানি নিশ্চিন্ত হল পঙ্কজ৷ মনের ওপর থেকে একটা পাষাণভার নেমে গেছে যেন৷ অনেকখানি হালকা আর ফুরফুরে লাগছে৷
বললুম, ‘কিন্তু আরও একখানা শর্ত দিয়েছে বিভূতি সান্যাল৷’
‘আবার শর্ত!’ মনোতোষ হতাশ চোখে তাকায়৷
‘পঙ্কজকে ওর দাড়িখানা কামিয়ে ফেলতে হবে৷’
‘কেন?’ ঝাঁঝিয়ে উঠল মনোতোষ৷
‘তা বলতে পারব না৷’ বললুম আমি, ‘ম্যানেজমেন্ট হয়ত চায় না, ওরকম লেবার শ্রেণীর একটা লোকের এমন উদ্ধত, মেহেন্দি মাখানো ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি থাকুক৷’
চায়ের কাপখানি মাঝপথে থেমে গিয়েছিল পঙ্কজের৷ চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছিল৷ আমাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে, ফের মুখ নামাল ও৷
‘এ কী বেয়াড়া আবদার৷’ মনোতোষ চিল্লিয়ে ড্রইং রুম ফাটিয়ে ফেলতে চায়, ‘গোঁফ দাড়ি মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ এটা একটা বাজে জুলুম৷ একদম মানা যায় না৷’
আমি নির্বাক অপেক্ষা করি৷ পঙ্কজই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার মালিক৷ আমি কেবল সেই সিদ্ধান্ত বিভূতির কাছে বয়ে নিয়ে যাব৷
সোফার ওপর অধোবদনে বসেছিল পঙ্কজ৷ কথা বলছিল না৷ মাথার ওপর বনবনিয়ে পাখা ঘুরছিল৷ তার ছায়া আমাদের তিনজনকেই ছিন্নভিন্ন করছিল অবিরাম৷ পঙ্কজ ভাবছে৷ তার বাঁ-হাতখানা অজান্তে উঠে এসেছে চিবুকের কাছাকাছি৷ আঙুলগুলো আলতো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে হালকা কফিরঙের দাড়িতে৷ দুচোখে ঈষৎ ঢুলুনি৷ ভেতরে অবিরাম রক্তক্ষরণ চলছে তার, বুঝতে পারছিলুম আমি৷
সামনের বাড়ির টিনের চালে একটা কাক তারস্বরে ডেকে চলেছে৷ একটা হুলো বেড়াল নর্দমা পার হচ্ছে সন্তর্পণে...৷ সন্ধে হয়ে আসছে৷ মনোতোষের ড্রইং রুমের কম-পাওয়ারের বাল্বখানাকে আরও বিষণ্ণ লাগছে৷
অনেকক্ষণ বাদে মুখ তুলল পঙ্কজ৷ মুখ খুলল আরও খানিক বাদে৷
‘আমি রাজি৷’
‘ওই যে মডার্ন সেলুন৷’ আমি আঙুল তাক করে দেখিয়ে দিলুম, ’রাস্তার উল্টোদিকে৷’
দাড়ি-গোঁফ কেটে আসবার পর যেন আমূল বদলে গেল পঙ্কজের মুখখানি৷ অতি সাধারণ মামুলি সে মুখ৷ গাল তোবড়ানো, চোয়াল উঁচু, এক ক্লান্ত অপুষ্ট শ্রমিক৷ মালিকপক্ষের সামনে পঙ্কজের নতজানু হওয়ার বিরুদ্ধে আমার সেই তাপ-উত্তাপ যেন একটু একটু করে উবে যাচ্ছিল৷
মনোতোষ তখনও গুমরাচ্ছিল৷ কোনও মালিক যে এমন অশিষ্ট জুলুম চালাতে পারে, তা যেন ওর কল্পনার অতীত৷
‘এই জন্যেই এত লেবার-আনরেস্ট৷ এরা শ্রমিকদের সত্যি সত্যিই দাস ভাবে৷’
ওকে বলিনি, পঙ্কজকেও না, কোনও দিনও বলব না, ওই শর্তটা আদপেই মালিকপক্ষের ছিল না৷ ওটা ছিল নিতান্তই আমার৷ আমারই স্বরচিত ওই শর্ত৷
কারণ একটাই৷ ওইরকম একখানা দাড়ি নিয়ে আমি কাউকেই তার মালিকের সামনে নতজানু হতে দিতে পারি নে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন