বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান

অশোক দাশগুপ্ত

রেল লাইনের ধার দিয়ে বিমলাসুন্দরী হাঁটে৷ কালো লোহার দু ধারে কালো পাথর৷

কালো পাথরের ফাঁকে ফাঁকে ফাঁকা অনামা জংলা ফুল অনন্তকাল ফুটে আছে৷ বিমলা চোখকে বলে দ্যাখ কানকে বলে শোন৷ লাইনের লোহার পাশে পাশে ওর দৃষ্টি চামরের মতো ধায়৷ চকচকে লোহার কোথাও কি লেগে আছে কোনও রক্তের দাগ? সেলুনওলা আদিনাথ বলেছিল দু নম্বর সিগনালের কাছে ডেডবডি আছে, আছে ও নিজে দেখেছে৷ বিমলা শেষ সিগনালের লাল রং ছাড়িয়ে যায়৷ কোনও কিছুই চোখে পড়ে না৷ ছেঁড়া কোনও বস্তার টুকরো-টাকরাও না৷ সেলুনওলা আদিনাথ বলেছিল তোমার সাবিত্রীকে বস্তাবন্দী করে মহিম ঘোষের মেজ ছেলে ওইদিকে নিয়ে গিয়ে ওইখানে, লাইনের ওপরে ফেলে রেখে গেছে৷ ও নিজে দেখেছে৷ একটু পরেই চলে গেছে রাত দশটা ছাপ্পান্নর ট্রেন৷ বিমলাসুন্দরী দুই রেল লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ে সাবি...সাবি...সাবিততিরে...

অফিসের বাবুরা সব রেকসিনের ব্যাগ হাতে আটটা ছত্রিশ ধরবে বলে পাথরের ওপর দিয়ে ছুটছে৷ লাইনের ধারে ধারে ঝুপড়িতে থাকা ঠিকে ঝিরা বাসনমাজা সারা করে ঘরে ফিরবে বলে পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটছে৷ পাথরের ধারে ধারে অজানা অনামা সব ফুল অনন্তকাল ধরে ফুটে আছে৷

লাইন বরাবর একটা রাস্তা৷ রাস্তার ওপর মা মনসা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার৷ মহিম ঘোষের দোকান৷ সাবিত্রী ওখানে ঢুকেছিল৷ সেলুনওলা আদিনাথ বলেছে মহিম ঘোষের মেজ ছেলে বস্তায় ভরে...

অফিসমুখো এক বাবু খবর কাগজের ঝাপোট মেরে বলল ও মাসি, মরবে নাকি৷ ট্রেন আসচে যে৷ বিমলা তখন ঝমরঝম ঝমরঝম শব্দ শোনে৷ লাইনের পাশে সরে যায়৷ তীব্র কঠিন ঝমরঝমকে বলে আমার সাবিত্তিরকে দেকেচিস ভাই, দেকেচিস? ট্রেনের রং দুধারে ঝুপড়ির ধূসরে আর আগাছার সবুজে মিশে গেলে বিমলা দূরে দেখে পাখি৷ বড় ডানার পাখি কিছু উড়াল দিয়ে বসল ফের লাইনের পাশে, দূরে৷ মা মনসা মেঠাই দোকানের মা মরা বয় আকাশে তাকিয়ে দেখছে একটা লাল মুড়ি৷ বিমলা শুধোল হ্যারে আমার সাবিত্তিরি...৷ হাতের চেটোয় নাক মুছে ছেলেটা বলল, ওই কালো বেড়ালটা খুড়ি? ওটা কিন্তু হেবি খচ্চর৷ রোজদিন ছ্যানা খেতে দোকানে আসে৷ কাল রাতে মেজদা ওটাকে কায়দা করে বস্তায় পুরে...

কই, কোথায়?

হুইযি৷ ছেলেটা দূর দেখায়৷ বিমলা দেখে পাখি৷ বোঝে শকুন৷

বিমলার এবার সামনে যেতে হবে৷ পা এগোয় না৷ জল এগোয় না, তৃষ্ণা এগোয়৷ দুটি টান টান লোহার মাঝখান দিয়ে বিমলা এগোয়৷ ক্রমশ মেল ট্রেন হয়ে যায় বিমলাসুন্দরী৷ ক’টা শকুন উড়ে যায়৷ ক’টা শকুন ডেকে ওঠে৷ লাইনের ধারে ছেঁড়া বস্তায় রক্তদাগ৷ আলতা দাগ৷ ওই তো সাবিত্তির৷ সাবিত্রী মা আমার৷ কালো শরীরটা খুবলে খুবলে খাওয়া৷ লেজের কাছে সাদা দাগ৷ এ রূপ আর দেখব না৷

মাথা নিচু করে ফিরে আসে বিমলা৷ পায়ের তলায় কালো রঙ-এর পাথর৷ গর্তে কালো রঙ-এর জল৷ আর হেরিব না কালো রূপ৷

মহিম ঘোষ যেন ওলাওঠায় মরে৷ আজই মরে, এক্ষুনি মরে৷ আস্তে আস্তে পায়ে পায়ে স্টেশনে আসে বিমলা৷ স্টেশনের সিমেন্টে বাঁধানো লাল বেঞ্চিতে এসে বসে৷ একটা আপ ট্রেন দু নম্বরে দাঁড়িয়ে আছে, লাইন কিলিয়ার নেই বোধহয়৷ সমস্ত ট্রেন বন্ধ হয়ে যাক৷ সমস্ত দোকানের ঝাঁপ নেমে যাক৷ হরতাল হয়ে যাক৷ শুষনি কলমির নিস্তব্ধতা হয়ে যাক বাজার-রাস্তা-রেল ইস্টিশন৷

তবু কোলাহল থাকে৷ মুসাম্বি লেবু সল্টেড বাদামের হাঁক থাকে৷ তাজা খবর... মন্ত্রিসভার পরিবর্তন থাকে৷ পৃথিবীর কলশব্দ ঠিকই থাকে, এবং থাকে রেলগাড়িটার একটানা হিসহিস৷ সেই শব্দ ভিড়ের মধ্যে বিমলা শোনে কি গো, চিনতে পারছ? বিমলা দেখে সিমেন্টের কালো বেঞ্চিটার গায়ে এইমাত্র একটা আঙুল চুন মুছল৷ হাতে পানের বোঁটা, ঠোঁট লাল৷ লাল ঠোঁটে থেমে থাকা হাসি৷ এসবেস্টাস শিট ভেদ করে আসা রোদ্দুরের ফালিটাও ওখানে থেমেছে, ওই মুখে৷

হ্যা গো, কেমন আছ গো!...

ওই গো শব্দটা সেই মুহূর্তে বিমলাকে রাইকিশোরী করে দেয়৷ মানুষটার চোখের দিকে দৃষ্টি ফেলে বিমলা৷ পতি হইল রমণীর আদরের ধন৷ বিমলা চেয়েই রইল৷ আস্তে আস্তে বিমলা নদীর মতন হয়ে যায়৷ কুলুকুলু অনেক কথা থাকে৷ বলা হয় না৷ বিমলা চেয়েই থাকে৷ শরীর শুকিয়েছে তাঁর, চুল সাদা-সাদা৷

ভাল আছ? কি গো?

বিমলা কথা বলল না৷

কোথায় থাক? থাকা হয়৷

এখানে৷

এখানে কোথায়?

আচার কারখানার রাস্তায়৷ ভুবন রায়ের বাড়ি৷

ট্রেন ভোঁ দিল৷ তুমুল৷ পলিথিনের পাম্পশু চঞ্চল হল, ট্রেনের কামরাটার কাছে ধেয়ে গেল৷ মেয়েকে পৌঁছে দিতে যাচ্ছি শ্বশুরঘর৷ হাতটা চেপে ধরল ট্রেনের হ্যান্ডেল৷ আমি পরে দেখা করব বিমলা...৷ ট্রেন ছেড়ে দিল৷ কেমন আছ বললে না... তুমুল শব্দের মধ্যে বিমলা চিৎকার করে বলল ভাল আছি, খুব ভাল আছি৷ তারপর ঝপ করে জলটা মুছে নিল চোখ থেকে৷

চোখের জলে সব দুঃখ ধুয়ে যায়৷ কিন্তু লাউশাকের বালি আর অন্তরের কালি শত ধুলেও কি যায়? মনটা তো পুড়তে পুড়তে ছাই হয়েই গিয়েছিল৷ আবার কেন দেখা হল আজ৷ খুব জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে বিমলা৷ ওর দুঃখ মিশিয়ে দেয় চা লিকারের গন্ধের মধ্যে, হকারের শব্দে, স্টেশনের হাওয়ার হাহাকারে৷

তবু ফিরে ফিরে আসে ওই মুখ৷ খুলিলে মনের দ্বার লাগে না কপাট৷

কত বছর পর দেখল ওই মুখ? এর আগেও মাঝে মাঝে ওই মুখ দেখেছে বিমলা চিমনির ধোঁঁয়ায়, মেঘের কুণ্ডলীতে, বিছানায় মিথ্যা স্বপ্নে দেখেছে সে মুখ৷

সেই মুখ বলেছিল বাঁজা মাগী৷

খড় পঁচে খড়কে পঁচে, কথা পঁচে না৷

বিমলা তো বাঁজাই৷ বিয়ের পর ছ বছরেও হল না কিছু৷ তাবিজ-মাদুলি, পিরের দরগায় ঢিল, বাবা তারকনাথ, জলপড়া, হাসপাতালের ডাক্তার৷ সেই মুখ বলেছিল তোমার নাড়িতে গেঁড়ো আছে, ডাক্তার বলেছে৷ বলেছিল আবার বিবাহ হবে৷ হয়েছিল৷ কত বছর হবে? ইস্টিশনের ওই বিরাট বকুল গাছটা ছিল ছোট্ট দু-হাত৷ ডবল লাইন হয়নি৷ সিনেমা হলটার জায়গায় ছিল বাঁশঝাড়৷ কালীবাড়ির রাস্তাটা ছিল মোরামের৷ কালীবাড়ির পিছনে এখন যেখানে বসন্তবিহার নামে তিনতলা বাড়ি, ওখানে ছিল একটা ডোবা৷ ডোবার ধারে দোচালা ঘর৷ ওখানে থাকত বিমলার দিদি কমলাসুন্দরী৷ পতিঘর ছেড়ে দিদির কাছে উঠেছিল বিমলা৷ দিদির মুদি দোকান৷ পিছনের ডোবায় হাঁস চরত৷ আয় আয় আয় চৈ-চৈ৷ কথা সময় বহে গেল৷ কত কথা বহে গেল৷ কত স্মৃতি৷ আয় আয় আয় চৈ-চৈ৷ তোমার অম্বলের বেদনাটা আর আছে গো? তোমার পিঠের দাগটা আরও বড় হয়নি তো? জর্দাটা বড্ড খাও৷ দাঁতগুলো আরও কালো হয়ে গেছে কি না ভাল করে দেখাই হয়নি৷ পুরনো ভালবাসা টুপটাপ বৃষ্টি হয়ে নামে৷

সেই বিয়েতেও ছিল বিমলা৷ উলু দিয়েছিল, কুলোয় প্রদীপ ধরেছিল৷ ফুলশয্যার রাতের দোর বন্ধ হবার শব্দ পর্যন্ত দাঁত চেপে ছিল বিমলা৷ তারপর দরজায় ছিটকিনির আওয়াজের গোঙানি বিমলার বুকের মধ্যে৷ পালিয়ে এসেছিল বিমলা, এক কাপড়ে, লাস্ট ট্রেন ধরে৷ পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে, ওর দিদির বাড়ি৷

দিদি বলেছিল, সতীনের পুত হোক, পড়শীর ভাত হোক৷ কিন্তু সতীন কাঁটা কঠিন কাঁটারে বুন৷ এসেচিস ভালই করিচিস৷ দুখের ভাত সুখ করে খাব৷

দিদি তখন তিন বছরের বেধবা৷ জামাইবাবুর মুদি দোকান দিদি চালায়৷ ছেলে মিলিটেরি৷

আর তো কেউ ছিল না বিমলার৷ বিমলার মা মরেছিল ছোটবেলায়, বিয়ে হবার দু বছরের মধ্যে বাপ৷ দিদির দোচালাই বিমলার নতুন ঘর৷ পিছনে ডোবা৷ শুষনি কলমি ল ল করে৷ হাঁস চরে৷ আয় আয় আয় চৈ-চৈ৷

মানুষটা খোঁজখবর করেছিল৷ সন্ধান নিয়েছিল৷ একদিন খুঁজে খুঁজে এসেছিল দুপুরবেলা৷ দোকান ঘরের সামনে কমলা দিদিকে শুধিয়েছিল ও এখেনে এয়েচে কি?

বিমলার শরীরে গুঁড়ি গুঁড়ি ঘামবিন্দু৷ ঘামবিন্দু অভিমান হয়ে ঝরে পড়ছে৷

এয়েচে৷

ঝাক৷ নিশ্চিন্তি হলাম৷ কোথায় আছে, একবার দেখতুম৷ বিমলার পায়ের গোড়ালিতে অদৃশ্য ঘুঙুরের অভিমান নিঃশব্দে বেজে ওঠে৷ ঝামর ঝামর পায়ে দ্রুত বের হয় ঘর থেকে৷ কালীমন্দিরের অন্ধকারে যায়৷ অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে একটা নারীজন্ম৷ লাল সিঁড়িতে ঘুঘু ডাকে একা৷

একটু পরেই রোদ্দুর পিঠে নিয়ে মানুষটাকে চলে যেতে দেখে৷ ঘাড়টা একটু নিচু৷ চলে যায়৷ নরম মাটিতে হাওয়াই চটির আলপনা রেখে যায়৷

কতকাল হবে? তখন স্টেশনের বকুল গাছটা মাত্র দু হাত৷ আয় আয় আয় চৈ-চৈ...৷

এরপর কত রাত ফর্সা হল৷ কত আশ্বিন কার্তিকে ধানেরা গর্ভ পেল৷ কতবার বকুল ঝরল প্লাটফর্মের সামনে৷ কত টিভি সিরিয়াল শেষ হয়ে গেল৷ বিমলার বয়স বাড়তে লাগল৷

বিমলার দিদি মরল৷ মিলিটারি ছেলে পশ্চিম থেকে এল৷ বিমলা ভেবেছিল ওর বোনপো ওকে ওর কাছে নিয়ে যাবে৷ ওর বৌ-এর হাতের পানসাজা খাবে৷ ওর ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াবে৷ যার যেমন কামনা তেমনি ঢাকী বাজায় না৷ বোনপো বলল, এবার মাসি অন্য ব্যবস্থা দেখ৷ জমিটা বেচব৷ দেরাদুনে সেটল করব ভাবছি৷ বরং তোমায় মাসে কিছু পাঠাবখন৷

তারপর কতবার বাড়ি বদলেছে বিমলা৷ গরুহাটার রসময় হালদারের বাড়িতে রাঁধুনি হয়ে থেকেছে৷ বিপিন চক্কোত্তির বাড়িতে থেকেছে ওর বুড়ো বাবার সেবা করার জন্য৷ রেশন দোকানের পিছনে খুপরি ঘরটায় থেকেছে ক’দিন... এখন আচার কারখানার পিছনে৷ বাড়িওলা ভূপেন রায়৷

দুটো ক্রিম বিস্কুট কিনল বিমলা৷ কাগজে জড়িয়ে নিলে৷ বাবলু খাবে৷ কুকুরটা৷ বড় সরাটা ভেঙে গেছে ছোট সরাটা আছে৷ সাবিত্রী নেই, বাবলু রইল৷ ও পথ চেয়ে আছে৷ বিমলা ওর কাছে যাবে৷ টিপির টিপির বৃষ্টি পড়ছে৷ মটরদানা কেনার ছিল৷ এখন থাক৷ মন ভাল নেই৷ নিতাই পাগলা এই পথ যদি না শেষ হয় থামিয়ে বলল মাসি নমস্কার৷ হারু রিকশাওলা হাঁকলে কী গো মাসি— তোমার ছেলেমেয়ে কেমন আছে? বিমলা কিছু বলল না৷ মন ভাল নেই৷ তোমার নাতি-নাতনি? বিমলা আস্তে আস্তে হাঁটে৷

এই হারুর রিকশা চেপে পুজোর সময় একদিন বিমলা ঘুরেছিল এই মফসসল৷ লাল সিটে বিমলার পাশে বসেছিল সাবিত্রী৷ বিমলার কোলে আঁটুল বাঁটুল৷ পায়ের কাছটাতে জিভ নাড়ছিল বাবলু৷ বিমলা বলছিল দ্যাক দ্যাক নাগরদোলা৷ তোরা কুকুর বেড়াল না হয়ে যদি মানুষ হতিস, তোদের চড়াতাম৷ তোদের আইসকিরিম খাওয়াতাম৷

ঘরে ফিরল বিমলা৷ ঘরের সামনাটাতে জল জমেছে একটু৷ এই জলে সামনের বাড়ির বাগানের কলাবতী ফুলের হলুদ ছায়া৷ ওই ছায়ার মধ্যে ছোট্ট একটা ব্যাঙ লাফাচ্ছে একা একা৷ পৃথিবীর এখানে ওখানে এখনও অনেক টুকরো-টাকরা সুখ পড়ে আছে৷ বাবলু বাঁধা আছে পাটের দড়িতে৷ ঘেউ করল৷ মানে এতক্ষণ? এবার অন্যরকমের আওয়াজ৷ গন্ধ পেয়ে গেছি মা গো৷ শিগগির দাও৷ ল্যাজ নাড়তে লাগল৷ আঁটুল-বাঁটুলরাও বিমলার পায়ের কাছে ঘুরঘুর৷ এবং মিউমিউ৷ আমাদের জন্য কি এনেছ৷ বিমলা বলল থাম মুখপোড়ারা৷ মাখাগী৷ বাবলুর সামনে বিস্কুট দিল ভেঙে৷

পাশের বাড়িতে বি এ পাস বউ কলাবতী ফুলের আড়াল থেকে দেখল আড়চোখে৷

আমার পয়সায় আমি খাওয়াচ্ছি,— তোর কী লো? বিমলা বিড়বিড় করে বলে৷

অন্য কোনও দিন হলে এতক্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ত বিমলা৷ হামানদিস্তার ঢক ঢক আওয়াজ হত৷ ধনেভাজা জিরেভাজার গন্ধ ছড়াত৷ উনুনে ফুটত মটর দানা৷ ভগবতী বালিকা বিদ্যালয়ে টিফিন বেলায় বসে সে৷ ঘুগনি বেচে, আলুকাবলি বেচে৷ আচার কারখানায় কাজ পেতে পারত বিমলা৷ সকাল আটটা থেকে সন্ধে ছটা ডিউটি দিতে হত৷ এত সময় কি ওর আছে? সংসার কে সামলাবে৷ আজ শুয়ে রইল৷ একটু পরে দুটো ফুটিয়ে নেবেখন৷ ভগবানের জীবগুলোর মুখে তো কিছু দিতে হবে৷ টিনের চালায় টিপির টিপির মন খারাপের বাজনা৷

বিমলা-বিমলা করে কে হাঁকে?

বাবুল চেঁচায় ঘেউ-ঘেউ৷ ও বাবলু, চেঁচাসনি বাবুরে, চেঁচাসনি সোনামানিক আমার৷ বাড়িওলার ছোট ছেলে ডাকছে৷ তুই ঘেউ করলে ওদের অপমান হবে নে? বিমলা হুড়মুড়িয়ে ওঠে৷ কি হল বাপধন?

বাবা ডাকছে৷ এক্ষুনি এস৷

যাই৷ এক্ষুনি যাই৷

বিমলা কথা কইবার আগেই ছেলেটা পিছু ঘুরেছে৷ বাড়িওলা ডাকছে কেন? বাড়িভাড়া বাকি ছিল৷ পরশু দিনই তো কিলিয়ার করে দিয়েছে৷ কুকুরটাকেও তো বেঁধে রেখেছে ক’দিন ধরে৷ সাবিও মরেছে৷ তবে! কাপড় ঠিক ঠাক করে বিমলা৷

বাংলাদেশ থেকে এসে ভুবনবাবুরা এখানেই ছিল৷ এই দোচালা ঘরে৷ তারপর ভুবনবাবু বাজারে গমকল দিল৷ পাশের জমিটা কিনল৷ মনিহারী দোকান দিল, কোঠাবাড়ি হল৷ বাড়ি দোতলা হল৷ কাচের জানলা হল, জানলায় পর্দা ঝুলল৷ ওবাড়ি থেকে ঘিয়ের গন্ধ আসে, গানের শব্দ ভাসে৷ বিমলা এখন ওদের ফেলে আসা দোচালায় থাকে৷ তিনটে ঘর৷ একটায় বিমলা, অন্য দুই ধরে বাবুদের বাতিল চেয়ার, বাতিল টেবিল, বাতিল আলমারি৷ ভুবনবাবুর ছেলেরা আগে মাসি বলত৷ বিমলা মাসি৷ আজ ছোট ছেলেটাও নাম ধরে হেঁকে গেল৷ এখন ওদের কাছে যেতে হবে তাকে৷ ঘর ছাড়ার জন্য বলবে আবার? ক্ষমা তো চেয়েই নিয়েছে ও৷ তিন মাস সময়ও চেয়েছে৷ ভুবনবাবু বলেছিল হ৷ ঠিক আছে৷ তিন মাস চাইর মাস কইরো না কিন্তু৷

ভুবনবাবুর ছোট ছেলেটাকে হারামজাদা গাল দিয়েছিল বিমলা৷ রাগ হলে কি মাথা ঠিক থাকে? রাগ হল নেকড়ার আগুন৷ নেভানো কষ্ট৷ ওই ছেলেটা যে এত খচ্চর, বাবলুর ওখানে নুন ছিটিয়ে দিল, সেটা কেউ দেখল না৷ হারামজাদাটাই শুনল শুধু৷

বাবলুটার নতুন যৈবন৷ তার ওপর ভাদ্দর মাস৷ ভুবনবাবুর বাড়ির সামনে একটা মাদী কুকুরের সঙ্গে আটকে গেছে ও, খচ্চর ছেলেটা তখন ওখানে নুন ছিটিয়ে দিলে৷ চিৎকার শুনে বিমলা ছুটে গেল৷ দেখল ওই ছেলেটা আর আরও দুজন দাঁত কেলিয়ে হাসছে আর বেচারা জীব দুটো চিৎকার করছে৷ বিমলা বলেছিল অসভ্য ইতর হারামজাদা৷

তারপর তো হুলুস্থুলু মহাভারত৷ ছেলেটা কোৎ পেড়ে চিল্লাল মা শুনে যাও আমাকে কী যা তা খিস্তি দিল৷ আমাকে হারামজাদা বলল৷ ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে লোহার গেট খুলে বেরিয়ে এল সব৷ বিমলা বলেছিল ভগবানের জীব দুটো একটু লীলা করছিল তখন এ নুন দিয়েছে৷

হারামজাদা বলেছ কিনা বল৷ এত বড় আস্পর্ধা৷ কালই ছেড়ে দাও ঘর৷ মাথা নিচু করে ঘরে ফিরছিল বিমলা৷ পিছন থেকে বেবুশ্যে টেবুশ্যে অনেক কিছুই শুনল সে৷ সামনের বাড়ির বি এ পাস বউ ম্যাক্সি পরে রগড় দেখতে এল৷ বিমলার মাথা নিচু৷ ঘরে ঢুকে যায়৷ একটু পরেই কুকুরটা হাঁপাতে হাঁপাতে এসেছিল বিমলার কাছে৷ বিমলা ওর গায়ে হাত বুলিয়েছিল৷ জল দিয়ে নুনলাগা জায়গাটা ধুয়ে দিয়েছিল৷ তারপর একটু দুধের সর লাগিয়ে দিচ্ছিল ওখানে৷ সরে ঠান্ডা করে৷ তক্ষুনি হাসি শুনেছিল বিমলা৷ বি এ পাস বৌ দেখছে৷ পাশে ওর বর৷ আপিস যায়নি বুঝি৷ বৌ কনুয়ের গুঁতো মারল বরকে৷ ভাতার সোহাগী৷ বর কি একটা ইংরিজি কথা বলল বৌকে৷

সেইদিনই সন্ধেবেলা ভুবনবাবু ডেকে পাঠালেন বিমলাকে৷

— কী সব শুনতাছি, এ্যাঁ?

বিমলার মুখ নিচু৷

— তোমার কুত্তা এসব কী করতাছে?

— ভগবানের জীব৷

— ভগবানের জীব দেখাও৷ খাও ভাত, উগরাও নাটমন্দির৷ ঘরের সামনে এইসব করবে? আমার মেয়ে বড় হচ্ছে৷

— ভাদ্দর মাস৷

— ভাদ্দর মাস তো বাইন্ধ্যা রাখতে পার না?

— এবার থেকে বেঁধেই রাখব৷

আরও কি সব শুনতাছি?

বিমলার মুখে কথা নেই৷ চোখে জিজ্ঞাসা৷

— তুমি নাকি তোমার কুকুরের সঙ্গে নষ্ট? রিপোর্ট আছে৷

বিমলা কিছুই বুঝতে পারে না৷

— তিনদিনের মধ্যে ঘর ছাড়বা তুমি৷ কী আরম্ভ করেছ কি, এ্যাঁ? বিড়াল কুকুর নিয়া অত্যাচার৷ তোমার বিলাই দুধ চুরি কইরা খায়, আমার মাছ খাইয়া পলায়৷ ঘরে হাগে৷ শেষকালে এইসব কদাচার৷ এটা ভদ্রপাড়া৷ তার ওপর এতবড় দুঃসাহস৷ আমার ছেলেকে বল হারামজাদা৷ পোঙায় এত রস? কবে ঘর ছাড়বা?

ক্ষমা চেয়েছিল বিমলা৷ তিনমাস টাইম চেয়েছিল সেদিন৷ একমাসও তো হয়নি এখনও৷

বিমলা তো ঘর খুঁজছে৷ নতুন নতুন কত ঘরবাড়ি উঠছে, দোচালা, চারচালা ভেঙে দোতলা-চারতলা উঠছে৷ ওসব তো বিমলাদের জন্য নয়৷ টিনের ঘর-টালির ঘর কমে আসছে ক্রমশ৷ একদিন গরুহাটা গিয়েছিল৷ রসময় হালদার এখন বুড়ো হয়ে গেছে৷ দেখেই চিনতে পেরেছিল৷ বলেছিল, কী গো কেমন আছ? ও বাড়িতে তিন বছর রাঁধুনি ছিল বিমলা৷ রসময় রসে জড়িয়েছিল৷ বলেছিল তোমায় যদি ইয়ে করি, থাকবা? অন্য বাসা ঠিক করে দেব৷ বিমলা বলেছিল মরণ? রসময় বলেছিল এভাবে উড়িয়ে দিওনে, ফাইনাল বল, বিমলা বলেছিল আমি যে বাঁজা৷ রসময় বলেছিল সেই জন্যই তো বলছি৷ রিকস নেই৷ বিমলার কপাল কুঁচকে উঠেছিল৷ রসময়ের চিটে চোখ তখন বিমলার ভ্রূ কুঞ্চনের দিকে ছিল না৷ রসময় বলেছিল বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি বলেই তো জায়গার জিনিসপত্র জায়গা মতন আছে৷ হে-হে-হে৷ বাসনপত্র ভাল থাকলে ভোজনে সুখ৷ হে-হে-হে৷ বিমলা সেদিনই ওর জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছিল৷ পিছন থেকে বিমলা শুনতে পেয়েছিল যদি কখনও দরকার পড়ে, এস...

বিমলা এখন বাবুবাড়ি যাবে৷ কেন ডাকছে ভূপতি রায়৷ মাধবীলতার সামনে মাথা নিচু করে লোহার দরজার সামনে দাঁড়াল৷ দরজা খোলার ক্যাঁচোর শব্দ বিমলার বুকের মধ্যেই ছিল৷ ফুল নকশা কাটা বারান্দায় পা দিতেই প্রেশারকুকার ফস করল৷ চেয়ারে বসে আছে ভুবন রায়৷ বিমলাকে দেখেই বলে উঠল ঘর ছাড়ার কি করলা?

তিন মাস টাইম...

— ওসব জানি না৷ সাতদিনের মধ্যে ছাড়বা৷ তোমার কালো বিড়ালটা আবার দুধ খেয়ে গেছে৷

— আমার বিড়াল তো কাল রাত্রেই ...

কী করছে রাত্রে?

— মরে গেছে৷

— গুল মারবা না৷ সব্বাই দেখছে ওই বিড়ালটারে৷ সব্বাই চিনে৷ যাও অখন৷

বিমলা আঙুলে আঁচল জড়াতে জড়াতে ফিরে আসে৷ ঘরে ঢুকেই দেখে, একি, সাবিত্রী, গর্ভিণী বিড়ালটা ল্যাজ উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ বিমলাকে দেখে মৃদুস্বরে বলে মিউ৷

হেলে দুলে কাছে আসে৷ বিমলা কোলে তুলে নেয় তাড়াতাড়ি৷ ওর গরম বুকে লাগে৷ বিমলা স্টোভ ধরায়৷

বিমলা হাঁটছে৷ রাইকিশোরীর মতো পা এগুচ্ছে৷ লালপেড়ে শাড়ি, কপালে সিঁদুর৷ আজ আলতাও পরেছে৷ বিমলার লালপাড় পা এগুচ্ছে৷ পিছনে পায়ে পায়ে তিনটে বেড়াল একটা কুকুর৷ সাবিত্রী বেড়াল সবার পিছনে৷ গর্ভভার৷ হেলেদুলে হাঁটছে৷ আঁটুল-বাঁটুল হল সাবিত্রীর আগের গর্ভের৷ সাঁটুলও ছিল৷ ওটাকে হুলোয় মেরেছে৷ এখন শেষ বিকেলের রোদের হলুদ ওদের গায়ে৷ স্টেশনে এসেছে বিমলা ও তার সংসার৷ সাবিত্রীর আবার চায়ের নেশা আছে৷ ভাঁড়ে চা নিয়ে টুকরো পাউরুটি তাতে ডুবিয়ে সাবিত্রীকে দিচ্ছে বিমলা৷ সাদা টুকরোগুলি ছুঁড়ছে আঁটুল-বাঁটুলের দিকে৷ পাউরুটিটার মাথার পোড়া দিকটা বাবলুর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বিমলা বলল, নে কেক খা৷ কুকুরটা একটু শুঁকে বিমলার দিকে তাকাল৷ ইয়ারকি মেরোনা বলছি৷ বিমলা তখন একটা সত্যিকারের কেক নিল৷ কিশমিশটা খুঁটে সাবিত্রীকে দিল৷ পোয়াতী মেয়ে৷ কেকটা বাবলুকে দিল বিমলা৷

একটা আপ ট্রেন এসে থেমেছে৷ মানুষটা যদি আসে, এখানে দাঁড়ায়, বিমলা কথা কইবে না৷ কথা পাথর হয়েই থাকবে৷ লোকটা যদি হাসে, জলের মতোই হাসে, কথা তবু পাথর হয়েই থাকবে৷ জলে পাথর নরম হয় না৷ পাথর নড়ে৷ আপ ট্রেন চলে যায়৷ আসবে৷ লোকটা ঠিকই একদিন আসবে এরকম একটা ট্রেনে৷ বিমলা এগোয়৷ একটা বাচ্চা মেয়ে বিমলাকে বলে, মাসি, ও বেড়াল মাসি, কাল একটু বেশি করে ঝালনুন এনো তো, ফাউ দিও৷ বিমলা মৃদু হাসে৷ এগোয়৷ ওর আলতা পাড় পা এগোয়৷ আর পায়ে পায়ে এগোয় তিনটে বেড়াল, একটা কুকুর৷ পায়ে পায়ে এগোয় বিমলার দিন৷

সক্কালবেলা৷ কাক ডাকছে৷ বুঁচির মা পাঁচির মা-রা সুখের কথা বলাবলি করতে করতে কাজে যাচ্ছে৷ বিমলা পাশ হাতড়ে টের পায় সাবিত্রী নেই৷ বিমলা না উঠলে সাবিত্রী ওঠে না৷ ও বড় সোহাগী মেয়ে৷ গা লেপ্টে শুয়ে থাকে৷ বিমলা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে যায়৷ দরজা বন্ধ জানলা খোলা৷ এদিক ওদিক বাইরে চায়৷ করবী ফুটেছে৷ শিউলি ঝরছে৷ ইলেকট্রিকের তারের গায়ে একসারি জলের ফোঁটা৷ সামনের বাড়ির বি এ পাস বউ হেলেদুলে বাথরুম যাচ্ছে৷ মুখে টুথপেস্টের ফেনা৷ সাবিত্রী আছে কোথাও৷ কাছে পিঠেই আছে৷ বিমলা এদিক চায়, ওদিক চায়৷ মাদার ডেয়ারির লাইন দিতে যাচ্ছে ও বাড়ির বুড়ো কর্তা৷ পাগলা নিতাই বেরিয়ে পড়েছে৷ তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর, হাসি আর গানে ভরে তুলব৷ পরনে হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি৷ সারাদিন গান গাইবে৷ ও বাড়ির বি এ পাস বউ বাথরুম থেকে এল৷ সামনের বারান্দায় বেতের চেয়ার৷ ওখানে বসবে৷ বসতে গিয়েই কেমন চিৎকার করে উঠল৷ চিৎকার শুনে পাজামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ওর স্বামী৷ চেয়ারের দিকে তাকাল৷ বউটা চিৎকার করল বিমলা, ও বিমলা দেখে যাও, তোমার বেড়াল আমাদের চেয়ারের কুশনে হেগে গেছে৷

বিমলা আস্তে আস্তে ও বাড়ির দিকে যায়৷ যেতেই হয়৷ বারান্দায় ওঠে৷ বউটা আর ওর স্বামী বলেই চলেছে, বলেই চলেছে৷ একদিন পিটিয়ে মারবে বলছে৷ আক্কেল নেই বলছে৷ বিমলা কলাবতী গাছেদের পাশ দিয়ে বারান্দায়৷ লাল কুশনে চুপচাপ শুয়ে আছে ছোট্ট একটু গু৷ যে কিচ্ছু জানে না৷ চেনা রঙ৷ চেনা গন্ধ৷ ও তবে আছে কোথাও৷ বিমলা তবু বলে এটা যে আমার বেড়ালের বুঝলে কি করে? কি পোমান? পিরথিবীতে আর বেড়াল নেই?

একদম দেব ইয়ে করে৷ বউটার স্বামী বলে৷ আর কোনও বেড়াল আসে না এখানে৷ বৌটা বলে৷ যাও, এক্ষুনি ওটা পরিষ্কার কর৷ স্বামী বলে, কুশনসুদ্ধু নিয়ে যাও৷ বউটা বলে৷

বিমলা নিয়ে গেল৷ কুশন সমেত৷ লাল কুশনে কেমন চুপচাপ শুয়ে আছে, যেন কিচ্ছু জানে না৷

বউটা বলল শোনো, কুশনটা থাক৷ শুধু কভারটা খুলে নিয়ে যাও৷

বিমলা তাই করল৷ বলল, সাবান কাচা করে ধুয়ে পাঠিয়ে দেব৷ খুব যত্ন করে নিয়ে জড়িয়ে নিয়ে যায়৷ ও তাহলে আছে৷ কাছেই কোথাও আছে৷

বুঁচির মা, পাঁচির মা-রা দুঃখের কথা বলাবলি করতে করতে ফিরে আসে৷ নিতাই পাগলা যে দীপ জ্বালাতে নাহি পারো সমাধি পরে তা জ্বেলে দিও গাইতে গাইতে ফিরে আসে৷ সাবিত্রী ফেরেনি৷ ছায়ারা ছোট হয়ে এল৷ সাবিত্রী ফেরেনি৷ আজ কি একটা ছুটি৷ ইস্কুল বন্ধ৷ ইস্কুল বন্ধ থাকলে বিকেল বিকেল স্টেশনে বসে বিমলা, বিককির হয়ে যায়৷ সাবিত্রীকে কেউ মারল না তো৷ পোয়াতী মেয়েটা৷ কত মার খায় বেচারি৷ নাকে রক্ত মেখে, কানে রক্ত মেখে ফিরে এসেছিল একবার৷ কে জানে কোনও আঁটকুড়োর ব্যাটা কাটারির ঘা মেরেছিল৷

বিকেলে ওর বাবলু কুকুরটাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বেরিয়েছিল বিমলা৷ আসলে খুঁজতে৷ পুকুরের পাশে একটা দোতলা বাড়ি আছে৷ ও বাড়ির একটা বড় লোমওয়ালা মাদী কুকুর বোধহয় বাবলুকে ভালবাসে৷ লোমওয়ালাও এখন বাগানে ঘুরছে৷ বাবলু থমকে দাঁড়ায়৷ লোমওয়ালাটাও লোহার গ্রিল বেড়ার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়াল৷ বাবলু ওর মুখে মুখ লাগাচ্ছে৷ লোমওয়ালাটা বিলিতি না? পিরীতির রাজ্যে জেতের বিচার নেই৷ চ বাবলু এখন চ৷ কে আবার দেখে ফেলবে৷ ওকে ছেড়ে দে৷ হবে নে৷ রুটি দেখিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে আসবখন ঘরে৷ ঘর বন্ধ করে দেব৷ করিস৷

কচুরিপানার নীল ফুল ছিঁড়ে কতগুলি মেয়ে রান্নাবাটি খেলছে৷

বিমলা শুধোল হ্যাঁরে, আমার বেড়ালটাকে দেখেছিস তোরা কেউ?

একটি মেয়ে বলল, কালো বেড়ালটা তো, ল্যাজটায় সাদা?

হ্যাঁ-হ্যাঁ, দেকিচিস?

মেয়েটি ঠোঁট উল্টোল৷

নবনগরের দিকে গেল বিমলা৷ ওটা গয়লাপাড়া৷ ওদিকে যায় বিমলা৷ কোথাও কোনও কানাঘুসো শুনতে পায় না৷

বাসার কাছে ফিরেই দেখে একটু দূরে জটলা৷ নতুন দাড়ি রাখা ক্লাবের ছেলেটা তেড়ে এসে বলল, বল বুড়ি কবে তুমি পাড়া ছাড়বে৷ বাবলু হঠাৎ ঘৌ করে ওঠে৷ ছেলেটা বলে মারব পেটে লাথি৷ বিমলা বলে কি হয়েছে? ছেলেটা বলে যাও, কাকলিদের বাড়ি গিয়ে দেখ তোমার বেড়াল কি করেছে?

বিমলার ঘর থেকে চারটে বাড়ি পরেই কাকলিদের বাড়ি৷ বামুনবাড়ি৷ নিত্যি পুজোর ঘণ্টা ঘরে বসে শুনতে পায় বিমলা৷ হাত জোড় করে তখন৷ ওদের বাড়ির সামনেই লোকজন৷ সাবিত্রী তাহলে ওখানেই দুষ্টুমি করেছে৷ কি করতে পারে? পুজোর ভোগ খেয়েছে? নাকি বমি-টমি করল, নাকি ওদের ঠাকুর ঘরেই বাচ্চা দিয়েছে৷ দুগগা-দুগগা৷

বিমলাকে দেখেই কাকলির মা খিঁচিয়ে উঠল৷ তোমার বেড়াল আমাদের পাতকো নষ্ট করে দিল৷ বল তার কী হবে৷ দেখগে পাতকোর জলে মরে ভেসে রয়েছে তোমার বেড়াল৷ বিমলার বুকে বাজ পড়ল৷ হাওয়ায় দু হাত৷ আঁচল লুটোচ্ছে৷ ছুটে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল কুয়ো পাড়ে৷ দেখল কালো জলে কালো শরীর৷ চোখ বোঁজে৷ ও রূপ আর হেরিব না৷ কুয়ো পাড়ে নিম গাছে কাকরা ডাকছে৷ বিমলা মাথা নিচু করে স্থির৷

কুয়োটা যে নষ্ট হল কে খেসারত দেবে?

বিমলার চোখের জল বসুমতীর গায়ে পড়ে৷

ক’কেজি ব্লিচিং পাউডার ফেলে দিতে হবে৷

ব্লিচিং পাউডার নয়, গ্যামাক্সিন৷

না-না, গ্যামাক্সিন পয়জন৷ ব্লিচিং৷

আরে তার আগে তো ওটা ওঠাতে হবে ট্রাই করছি তো, বালতিতে তো উঠছে না, ফস্কে যাচ্ছে৷ বালতি তোলার কাঁটা নেই? কুয়োর কাঁটা? কে একজন দড়ি জড়ানো কুয়োকাঁটা নিয়ে এল৷ যদি তুলে দি, চা খাওয়াবেন বৌদি৷ কাঁটা নেমে যায়৷ উঠছে উঠছে৷ মানুষের উল্লাস শব্দ৷ কাকের চিৎকার শব্দ৷ উৎসব৷ ছেলেটার হাতের পেশি ফুলে ফুলে উঠছে৷

মাটিতে নামাল৷ ওর গা থেকে জল ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা৷ ওর সারা গা কাঁদছে৷ ওর গায়ের মধ্যে আটকে আছে কাঁটা৷ পেট ফুলে আছে৷ হায় রে গভ্য৷

ও কেন ঝাঁপ দিতে যাবে কুয়োর জলে? ওর তো কোনও দুঃখ রাখেনি বিমলা? কেউ কি ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছে ওকে?

এবার এটা কি হবে, এটা?

পুকুরপাড়ে ফেলে দে৷

তোর যেমন বুদ্ধি৷ পচে গন্ধ হবে না!

তবে লাইনের ধারে৷

সঙ্গে সঙ্গেই দড়ি জোগাড় হয়ে যায়৷ গলায় বাঁধা হয়ে যায়৷ টানতে টানতে নিয়ে চলল৷ বলহরি হরিবোল৷ কাকেরাও চলল৷ রাস্তায় পড়ে রইল জলের দাগ৷ একটু পরেই শুকিয়ে যাবে৷

বিমলা আঁচলে জড়িয়ে নিল সমস্ত কালো৷ ধীর পায়ে ঘরের শূন্যতার মধ্যে নিজেকে মেশাল৷ চারিপাশে সবকিছু ঠিকঠাক৷ সবকিছু নিষ্ঠুর ঠিকঠাক৷ চারিপাশে আই অ্যাম এ কমপ্লান বয়৷ কাকেরা বাসায় ফিরছে৷

লক্ষ্মীর শাঁখ৷ বামুন বাড়ির পুজোর ঘণ্টাও বাজল৷ সাইকেল রিকশার হর্ন, ট্রেনের ভোঁ৷ নিতাই পাগলা গাইছে এক পলকে একটু দেখা আর একটু বেশি হলে ক্ষেতি কি৷ চাঁদও উঠল ঠিকঠাক৷ সন্ধ্যামালতি ফুটল৷ দু একটা জোনাকি উড়তে থাকল এদিক ওদিক৷ পরটা ভাজার ডালডা ঘি-এর গন্ধ ভেসে এল কোনও বাড়ি থেকে৷ মাধবীলতার গন্ধ হল৷ দূরের রাস্তার আলো আর দূরের চাঁদ মিলেমিশে করবী গাছটার ঝিরিঝিরি ছায়া ফেলেছে ঘরের সামনাটায়৷ সেই আলো আঁধারির মধ্যে এসে দাঁড়াল কে?

মিঁয়াও৷

ল্যাজটা উঁচিয়ে রয়েছে৷

বিমলা তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নেয়৷ ওর গরম বিমলার বুকে লাগে৷ বিমলা স্টোভ ধরায়৷

আমি এলাম৷

মানুষটাকে দেখে অবাক হয়ে যায় বিমলা৷ করবীগাছের আলো আঁধারির ছায়া মায়া বিমলার মুখে খেলা করে৷

আসব বলেছিলাম না? এলাম৷

এস৷

অনেক খুঁজেছি, বুঝলে, এক ঘণ্টা খুঁজে তবে পেলাম৷

বস৷

ভুবন রায়ের নামটা মনে ছিল৷ একজন ভুবন রায় পাঠানপুরের দিকে থাকে৷ ওদিকে দেখিয়ে দিয়েছিল৷ পরে আচার কারখানা মনে পড়ল৷ খুশি হওনি৷

খুব৷

এসব কী? এত কুকুর বেড়াল?

আমার কামনা-বাসনা৷

হ্যারিকেনের আলোটা উস্কে দিল বিমলা৷ বড় করে সিঁদুর টিপ পরল৷ মানুষটাকে প্রণাম করল৷

চা দেব৷

না৷ শুধু জল৷ আর শোনো, স্টেশনের সামনেটার দোকান থেকে রুটি মাংস এনিচি৷ ধর৷

বিমলা হ্যারিকেনের কেরোসিন শিখার দিকে চেয়ে বলল রাখ৷ জল দিল৷ আঙুলে আঙুল লাগল৷ কতদিন কতকাল পরে৷ আঙুল মুঠো করে এনে সাবিত্রীবালা বেড়ালটার গায়ে বুলিয়ে দেয় বিমলা৷ আর তখনি সাবিত্রীর গর্ভযন্ত্রণা শুরু হয়৷

বল বিমলা, কেমন আছ?

ভাল আছি৷ এখন সাবির প্রসব হবে৷

সাবি আবার কে?

বেড়ালটার গায়েই হাত রাখা ছিল বিমলার৷ লণ্ঠনটাও উস্কে রাখাই ছিল৷ বিমলার চোখ এবং ভ্রূ যুগল তখন অদ্ভুত এক মায়া খেলা করে৷

ও বুঝিচি৷ তোমার কামনা-বাসনা৷ হে হে৷ এই, বুঝলে, আজ থাকব৷ মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলুম তো, মেয়ে পোয়াতী৷ বাড়ি ফিরছিলাম৷ বাড়িতে অবশ্য জানে আজ মেয়ের বাড়িতেই আছি৷ তোমার এখানে চলে এলাম৷ হে হে৷

হ্যারিকেনের আলোটা একটু কমিয়ে দেয় বিমলা৷ জলের ঘটি সামনে রাখে৷ এক আঁচলা জল নিয়ে হাত ধোয়৷ কেরোসিনের শিখার দিকে চেয়ে বিমলা মৃদুস্বরে বলল প্রসব হছে প্রসব৷

ছায়ারা কাঁপে৷

একটা জোনাকি এল ঘরে৷ এক ঝলক বাতাস এল৷ মাধবীগন্ধ এল৷

তোমায় নিয়ে যাব, বুঝলে যদি অবশ্য তুমি রাজি থাক৷ ও, মানে ও বলছিল যে...

এখন কোনও কথা কয়ো না৷ দোহাই চুপ করে থাক৷ শুনছ না, টিভিরাও থেমে গেছে৷

ও মেয়ে, মেয়ে আমার, কাঁদিস নারে৷ কাঁদিস না৷ এটা তোর নারীজম্মো৷ এটা কিচ্ছু কষ্ট না৷ আর একটু ধৈর্য ধর, ও মেয়ে ও মেয়ে, এটা তোর আনন্দ৷ এটা তোর নিতাই পাগল৷

বিমলা বেড়ালটাকে কোলে তুলে নেয়৷ ওর গরম বিমলার বুকে লাগে৷ বিমলা স্টোভ ধরায়৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%