হাসিনার পুরুষ

অশোক দাশগুপ্ত

হাসিনা সারাক্ষণ খুশি থাকতে চায়৷ তৃপ্তি হোটেল থেকে মাছের ঝোল ভাত খেয়ে বেরতে গিয়ে গান গেয়েছে৷ মালিক সামন্তদা তার মুখের হাসি দেখেছে, গান শুনেছে৷ হাসিনার খুশির বিনিময়ে গা দুলিয়েছে সামন্তদা৷ হাসিনা কাছে এসে, আঁচল থেকে দশ টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দেয়৷ ‘চার টাকা কাটো৷ মাছের সাইজ ছোট ছিল৷’ হাসিনা সামন্তর চোখাচোখি হাসে৷

সামন্ত পাঁচ টাকার বেশি ফেরত দেয় না৷

সামন্তর চোখাচোখি যে হাসল, এতে অন্য কিছু নেই৷ হাসিখুশিতে থাকা ছাড়া অন্য কিছু নেই৷ হাসিনা এইভাবেই খুশি থাকে৷ কতজনের সঙ্গে তার হেসে কথা হয়৷ তার স্বামী নেই৷ তিন বছর হল মারা গেছে৷ এই হাসাহাসির ঘটনায় মনে হতে পারে হাসিনা তাদের সঙ্গে ঢলাঢলি করছে৷ প্রেম চাইছে৷ তাদের ভালবাসাবাসি গড়ে উঠল! ভালবাসা হয় না৷ প্রেম হয় না৷ হাসিখুশি দিয়ে শেষ হয়ে যায়, বাকি থাকে হাসাহাসিই৷ ‘রেডিওটা চালাও না সামন্তদা, এখুন গেঞ্জির নাটকটা হবে৷’ এই হাসাহাসি নিয়েই সে থাকে৷ মনে ভাবে, এই হাসির খুশি নিয়েই কি সে শুধু থাকতে চেয়েছে? স্বামী, ঘরসংসার আর কিছু চায়নি? তা নয়৷ সে কথা আলাদা৷ সে ভাবনা আলাদা৷ সে সাধ আলাদা৷ তাকে বহুর সঙ্গে হাসাহাসির ঘটনায় মিশিয়ে ফেলা ঠিক হবে না৷ সে থাকে গোপনে, অন্য মনে৷ সে পুরুষ তো একজনই হয়৷ বহুর সঙ্গে হাসাহাসি দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা যায় না৷ সেই পুরুষ সঙ্গে থাকার খুশির জীবনের কথা যে ভাবে না তা নয়৷ ভাবে৷ মনের তল থেকে সে সাধ জেগে ওঠে হঠাৎ কখনও৷ সহসা৷ বাদল দিনে রোদ্দুরের মতো৷ সহসা ঝড় অথবা বৃষ্টির মতো৷ স্নিগ্ধ রাতে মরা জ্যোৎস্নায় ঘুম ভেঙে সহসা মনে পড়ার মতো সে সব কথা৷ সে সব সাধ৷

এতখানি কি হাসিখুশির স্বভাব রচনা করতে পারত হাসিনা, আগে? আগে ছিল ঘরে, সংসারে৷ যেদিন থেকে চালের ব্যবসা করছে, সেদিন থেকে এতটা উচ্চকিত হয়ে উঠেছে৷ নিজের পরিশ্রমের ভেতর তার এই লুকিয়ে-থাকা স্বভাব কুসুমের মতো ফুটে উঠেছে৷ তবে যে সে স্নিগ্ধ-বিকশিত, তা নয়৷ সাধ জাগে, নিজস্ব পুরুষকে কাছে পাবার৷ খুব ঘনঘোর বর্ষার দিনে মনের সাধের কথা মনে আসে, অথবা রৌদ্রস্নাত কষ্টকাতরতার ভেতর৷ এই সাধের মনকে সারাক্ষণ সে খুঁজে পায় না৷ হারিয়ে যায়৷ হারিয়ে যায়, নানা মুখের ভিড়ে, হাসিখুশিতে থাকার ভেতর৷ অথচ এই হাসিখুশির ভেতরেই তার সাধ খুঁজে পাবে, এমন কথাটা কখনও নির্জনে মনে আসে তার৷

ঝমঝম রোদের ভেতর পানের গুমটির সামনে দাঁড়ায় হাসিনা৷ ‘এই আকরাম, গেঞ্জির নাটক বেরিয়ে গেল, চালা! যাচ্চলে, হাঁ করে থাকে দ্যাখো৷’

আকরাম মনোযোগ দেয়৷ হেসে ওঠে তার মুখ৷ ‘পান খাবি তো?’

‘পান দে, আর রেডিও চালা৷’

আকরাম পান সাজে আর রেডিও চালিয়ে দেয়৷ রেডিও বাজে৷ গেঞ্জি কোম্পানির বিজ্ঞাপনের নাটক হয়৷ তার ফাঁকে কথা হয় আকরামের সঙ্গে৷ রেডিওর নাটকও চলে, কথাও হয়৷ কোনও কিছুকে সরিয়ে রেখে একটাকে নিভৃত করার জীবন তাদের নয়৷ কথা বললে নাটক না হারিয়ে যায়, নাটক হলে কথা না হারায়৷ এবং দুটির মিশ্রণেই সম্পর্কের মুহূর্ত৷ তাদের কথার মধ্যে রেডিওর মেয়ের কণ্ঠস্বর, রেডিওর পুরুষের কণ্ঠস্বর, যা খুব সুন্দর, মিশিয়ে নেয় তারা৷ তারা যে কথা বলে, তাদেরই কথা, রেডিওর কথা নয়, নাটকের চরিত্রের প্রেম-অপ্রেমের কথা নয়৷ তাদের পাশাপাশি রেডিওর নাটকের চরিত্রের প্রেম-অপ্রেম হেঁটে চলে৷

হাসিনা বলে ‘আমে স্বাদ নেই এখুন৷ তবুও আম খেতে শখ যায়, বল৷ পানি হলে আম মিষ্টি হবে৷ বিকেল থিকে ঝড় চালায়, কিন্তু পানি হচ্ছেনি৷’

‘জষ্টিমাস পড়লে পানি হবে দেখবি৷’ আকরাম পানটা বাড়িয়ে দেয়৷ হাসিনা পান মুখে পুরে বলল, ‘চুন কম দিয়েচিস৷ — জয় বাংলাদেশে নাকি ঝড়ে গাদা গাদা লোক মরে গেছে, বেবির বাপ!’

‘রেডিওতে তো শুনছি রোজ৷’

‘বেদের মেয়ে জোসনা বইয়ে যে মেয়েটা পার্ট করেছে, সে মাগি নাকি মরে গেছে, কথাটা সত্যি?’

‘মেরে ফেলেছে৷’

‘হায় আল্লা! মেছেদায় পাঁচ সপ্তা খেলছে৷ — আমির খানের পার্টের বই এলে বলিস তো বেবির বাপ! বেশ ভাল পার্ট করে বুইলি৷ লম্বু ফুটে গেছে৷ — বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’... আঁচলের গিঁট খুলে দুটো দশ পয়সা ভিজে শ্বেতপাথরের ওপর রাখে হাসিনা৷

আকরাম খপ করে আঁচলটা ধরে ফেলে ডান হাতে, হাসিনার৷ ‘দে, আরও কুড়ি পয়সা৷ শিব জর্দা দিয়েছি৷’

হাসিনা আঁচলের পয়সা চেপে টানাটুনি করে বলে আকরামও টানে৷ হাসিনা হেসে গড়িয়ে পড়ে৷

‘অত পয়সা লাভ করে কী করবি?’

‘মোর বউছেলে রইছে না? — একটা দশ দিলি যে, দুটা দশ দে৷’ আঁচল ছেড়ে দেয় আকরাম৷

পান দোকানের আয়নায় ফুটে ওঠে হাসিনার মুখ৷ সে আয়নার সামনে এতক্ষণ ছিল, অথচ আয়নায় ফুটে ওঠা দেখতে চায়নি বলে, তখন আয়নায় তার মুখ প্রতিবিম্বিত হয়নি৷ এখন দেখতে চেয়েছে বলে আয়নায় তার মুখ আয়ত হয়ে ধরা পড়েছে৷ এবং নিজের হাসিমুখ নিজে দেখে৷ নিজেকে আয়নায় খুঁজে পাওয়ার আলাদা একটা সৌন্দর্যবোধ আছে৷ একান্ত হয়ে ওঠার সৌন্দর্য৷ অথচ সে ভাল শাড়ি জামা পরে নেই৷ হেলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে দেখে৷ আয়নার বুকে একরাশ খুশি ভরে দেয়৷ আয়নায় দেখতে পায় স্টেশনে টিকিটঘরের সামনে সুবলকে৷ ‘এই সুবল৷’ পেছন ফিরে চিৎকার করে ওঠে হাসিনা৷ আয়নার বুক থেকে তার হাসিমুখ খুলে নেয় হাসিনা৷ আঁচলটা ডান হাত দিয়ে ধরে ডান কোমরে গুঁজে নেয়৷ ‘আম খাওয়াবি?’

দূর থেকে সুবলের সঙ্গে চোখাচোখি হাসিনার৷ ‘সুবল!’ চিৎকারে হাসিনার মুখের ওপর এক পৌরুষ কুঁদে ওঠে৷ টিপ টিপ ঘাম ছেয়ে যায়৷ সে সুবলকেই এতক্ষণ খুঁজছিল৷ চালের বস্তা সে সুবলের মাথায় তুলে দেয়, তার মাথায় সুবল তুলে দেয়৷ দুজনে দুজনকে এমন প্রতিদিন খোঁজে তারা৷ ডাউনের লোকাল এসে চলে গেলেও খোঁজে, আপের লোকাল এসে চলে গেলেও খোঁজে৷ আপের লোকাল লেট করলেও খোঁজে, ডাউনের লোকাল লেট করলেও খোঁজে৷ ট্রেনের জন্যে যাত্রীদের অপেক্ষা থাকে৷ লেট করলে অধীরতা বাড়ে, কিন্তু প্রতীক্ষায় থাকতে হয়৷ সুবলের জন্যে তাকেও প্রতীক্ষায় থাকতে হয়, সুবলকেও তার জন্যে প্রতীক্ষায় থাকতে হয়৷ তার নানা জনের সঙ্গে কথায় কথায় হাসিখুশি থাকলেও অপেক্ষা থাকে৷ অপেক্ষা থাকলেও হাসিখুশি থাকে৷ একে অপরের মাথায় বস্তা তুলে দেওয়ার স্বচ্ছন্দ বোঝাপড়া তারা খুঁজে পায়৷

সুবলের কাছে গিয়ে, সুবলের গামছা ধরে টানল, ‘আম খাওয়াবি?’

সুবল তার চালের বস্তার ওপর বসে ছিল৷ গায়ে বোতাম-খোলা এক নীল শার্ট, পরনে লুঙ্গি৷ লুঙ্গি দু-পাট করে কোমরের কাছে গিঁট দিয়ে বাঁধা৷ ‘আম ভাল নয়৷’

‘খাওয়াবি নি বল৷’

‘আজ লোকালে লিচু উঠলে খাওয়াব৷’

‘বাজারে লিচু এসে গেছে, লোকালে পেলে তো৷’

‘পান খাচ্ছিস?’

‘আকরামের পান৷’

‘আকরাম খাওয়াল৷’

‘উ বোঁচামুখো খাওয়াবে? পয়সা ফেলে খেনু৷ একটু গাল থিকে ব্যার করে দুবো, খাবি নাকি?’

‘মারব নাথি৷’

সুবল বস্তায় আধশোয়া অবস্থায় কাছে দাঁড়ানো হাসিনার একটা হাত টেনে ধরে তার দিকে নোয়ায়৷

‘কী করছিস কি সুবল, পড়ে যাব যে৷ ভাল লাগে না বাবু৷’ মুখে বিরক্তি এনে সুবলের সামনে বসে পড়ে হাসিনা৷ কোমর থেকে গামছা টেনে মুখ মোছে৷

সুবল তার হাত ছেড়ে দিয়েছে৷ হাসিনা জানে, সুবল তার একান্ত পুরুষ নয়৷ একান্ত প্রেমিক নয়৷ সুবলের হাতে হামলে পড়ে হাসিনা৷ ‘তোর কি ঘামাচি হয়েচেরে সুবল৷ এ মা আঁড়কেলের গতর৷’ সুবলের ঘামাচি মারতে বসে৷ সুবল আরাম পায় তাতে৷ ‘কুন পার্টির কাছ থিকে আজ চাল নিলিরে সুবল? সেই গেঁড়ি বউয়ের কাছ থিকে লিয়েচিস?’

‘গেঁড়ি বউয়ের চাল নেই৷’ ঘামাচি মারার আরাম খাচ্ছে সুবল, প্রায় চোখ বুজে৷

সুবলের হাত ছেড়ে দেয় হাসিনা৷ ‘কি গরম পাচ্ছে৷’ হাই তোলে ‘ঘুম পায়৷’

আর বস্তা দুয়েক চাল ইস্টিশানের পার্টির কাছে সংগ্রহ করে, বস্তার মুখ সেলাই করে, লোকাল ধরবে সেই ছটার৷ তারপর মাল বইতে হবে৷ লাইনে ঝাঁপিয়ে তুলে নামিয়ে, তুলে নামিয়ে সেই চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে হবে৷ সুবলের মালে সাহায্য করবে সে, তাকে সুবল সাহায্য করবে৷ এমন পঞ্চাশ-ষাটজন মেয়ে-পুরুষ চালের ব্যবসা করে তাদের মধ্যেও এক একটা দল তৈরি হয়৷ একক-বিচ্ছিন্ন হয়ে মাল তোলা-নামা করা মুশকিল৷ একজন মাল আনতে গেলে মাল আগলাবার জন্য আর একজনকে থাকতে হয়৷ সারা দুপুর বিকেল সন্ধে জুড়ে স্টেশনে তাদের আয়োজন চলে৷ ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারা থাকে৷ দ্বৈতে, সঙ্ঘে৷ সকলে সকলের চেনা৷ সকলে সকলের জীবনেতিহাস জানে৷ কার ক’টা মেয়ে, কার ক’টা ছেলে৷ কার বাপের ঘরের সংসারের লোকজন কে কী করে৷ কার স্বামী নরম না কড়া৷ কারও স্বামী থেকেও না থাকার মতো৷ কার স্বামীর অসুখ৷ কার শাশুড়ি জ্বালায়৷ এ লাইনে মেয়েরাই বেশি৷ দু-চারজন পুরুষ৷ মেয়েরা নানা কারণে নিজেদের ভেতর চুলোচুলি করে৷ ঝগড়া বিবাদ বিসম্বাদ হয়েই থাকে৷

হাসিনার চোখে ঘুম এসে ছেয়ে যায়৷

সুবল চালের বস্তার ওপর জেগে থেকে পড়ে পড়ে কাঠবেড়ালির মতো কুটুস কুটুস নড়ে-চড়ে৷ এদিকে কাত হয়, ওদিকে কাত হয়৷ গামছা পুঁটলি করে মাথায় দেয়৷ লুঙ্গির ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে একতাড়া নোট বের করে এনে ফের পকেটে চালান করে দেয়৷

হাসিনা বসে বসে ঘুমোয়৷ বাঁ-দিকে মাথাটা ঢুলে পড়ছে৷ আবার তোলে৷ আবার ঢলে৷ রৌদ্রদগ্ধ চারপাশ৷ চালা গুমটি দোকানপসারি, রিকশা, রিকশাভ্যান, সাইকেল, অটো, বাস, ট্যাক্সি৷ কত মানুষ যায়, কত মানুষ আসে৷ কাকেরা ক্লান্তিহীন ওড়াউড়ি করে৷ এ চালা থেকে ও চালায় যায়৷ ‘কা-কা’ করেই চলে৷ মাঝে মাঝে রিকশার প্যাঁক প্যাঁক ওঠে৷ হাসিনা ঘুমোচ্ছে৷ এই শব্দের ভেতরই৷ হাসিনা যে ঘুমোয় ঘুমের ভেতর সে সচেতনতা আছে৷ কারণ মাথাটা বাঁদিকে খানিকটা নেমে এলেই তাকে তুলে নিতে হয়৷ গামছা বিছিয়ে সহজে ঘুমিয়ে পড়তে পারে৷ সেভাবে ঘুমোতে চায় না বলে এভাবে ঘুমোয়৷ খাওয়ার পর চোখে মেঘের ছায়া নেমে আসার মতো হালকা ঘুম বড় ঝরঝরে করে৷ মাথা হালকা হয়৷ শরীরের পেশি স্নায়ু এক সজলতায় ভরে ওঠে৷

ঘুম ভাঙিয়ে সুবলের পাছায় চাপড় মেরে উঠল হাসিনা৷

সুবল চমকে ওঠে৷

‘তুই থাক, আমি কুসুমকে খুঁজি৷ দশটা টাকা পাব৷ আজ ন-দিন হল৷ না চাইলে দেবে না৷’ উঠে দাঁড়িয়ে, প্রতীক্ষার শ্রমসঙ্গীকে মুহূর্তে ছাড়ে হাসিনা৷ এতক্ষণ তারই কাছে থাকার অচ্ছেদ্য যতিহীনতার চিকন যতিতে প্রকাশমান হাসিনা৷ শ্রমসঙ্গে থাকার যে প্রতীক্ষা তার, তাতে তার বিরহ নেই যেন৷ ছেড়ে চলে গেলেও জৈবনিকতার চেয়েও বুঝি বহু গাঢ় এই শ্রমসম্পর্কের সঙ্গ, ফিরে পাবে, এই নিশ্চয়তার সম্পর্ক-বন্ধন তাদের আছে৷ সুবল একদিন না এলে তার চলে না৷ সে একদিন না এলে সুবলের চলে না৷ অথচ সুবল তার একান্ত জীবনের কেউ নয়৷ প্রেমিক নয়, নিজস্ব পুরুষ নয়৷ রাতে ছোট চালার দোর খুললে হাট হয়ে যায় আকাশের গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথ৷ সেই আকাশের পিঠে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায় না এই পুরুষ৷ তার গৃহের পুরুষ নয়৷ তার পুরুষের গৃহ নেই৷ সুবলের জন্যে তার বিরহ হয় না, পুরুষের জন্যে তার বিরহ হয়৷ তাহলে কি সুবল পুরুষ নয়? অন্যের পুরুষ৷ তার মনের কাছে পুরুষ হয়ে নিবেদন করেনি কখনও সুবল৷ সুবল তার ঘরের দোরে গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথের পিঠে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতে চায়নি৷

লাফিয়ে হাসিনার কোমরের গামছা ধরে ফেলে সুবল৷ ‘এই যাবি না৷’

‘আ ছাড় লাগছে৷ ছিঁড়ে যাবে৷ কেন যাব না কেন?’

‘আমার ঘামাচি মেরে দে৷’

‘ঘামাচি মারার টেইম নেই৷ যা, ভাগ দিকি৷’ সুবলের বুকে ঠেলা মেরে গামছা ছিনিয়ে নেয়৷

কুসুমকে পেল না৷ ফতিমা, রত্না আর কাশ্মীরা আছে৷ বালিচক স্টেশন বেশ বড়৷ কে কোথায় আছে, খুঁজে পাওয়া মুশকিল৷ কেউ হয়ত মাল এখনও কিনছে৷ অথবা বস্তা সেলাই করছে৷ হয়ত-বা চা-দোকানে রুটি দিয়ে ঘুগনি খাচ্ছে৷

‘এই কাশ্মীরা, কুসুমকে দেখলি? উটকপালিটা গেল কোথা?’

কাশ্মীরা পা ছড়িয়ে হাসে, ‘কেন টাকা নিয়েছে? সে আর পাবি?’

‘পাব না! চুল ছিঁড়ে আদায় করব৷’

রত্নাবউ বলে, ‘আজ তো মাল অনেক তুলেছিস, হাসিনা৷’

‘কই, বেশি নয়, পাঁচ ব্যাগ৷ তিরিশ কিলো করে৷ আর একটার জন্যে অপিক্ষা করছি৷ না পেলে ইস্টিশানের মাল নিয়ে পালাব৷ ছটার লোকালের অপিক্ষা না করে পাঁচটা পঁচিশ ধরে চলে যাব৷ বাগনানে নেবে গোলাঅলার ঘরে পোমছে ঘর যেতে পারলে বাঁচি!’

ফতিমা বলে, ‘কেন লো, ঘর যাবার জন্যে এত ছটফটানি?’

হাসিনা ফুঁসে উঠল, ‘ঘরে ভাতার নেই বলে কি তাড়াতাড়ি যেতে নেই? দুটো মেয়ে আছে, কতখান তাদের কাছে যাই, তবে বাঁচি৷ তোদের ভাতার আছে, তোরা ভাতার-সুহাগী৷’

‘কেন একটা বে কর না৷’ কাশ্মীরা মিটিমিটি হাসে৷

হাসিনা একটা খিস্তি করে৷ সকলে হো হো করে হাসে৷

হাসিনার গা জ্বলে যায়৷ অন্তর জ্বলে যায়৷

ফতিমা— ‘তুই কিন্তু বিয়ে করতে পারিস৷’

কাশ্মীরা আন্তরিক হতে চায় ‘উ বে করবার মন করলে এখনই বে হয়ে যায়৷’

তাদের সামনে থপ করে বসে পড়ে হাসিনা৷ সত্যি সে বিয়ে করবে, এই মনের কথা কাউকে জানতে দেয়নি৷ সেজন্যে সকলে ধরে নেয়, সে বিয়ের মন করেনি৷ বিয়ে করবার মন আঁচলে বেঁধে তো ঘোরেনি৷ সে কথা গোপন মনে থাকে৷ লুকিয়ে থাকে৷ সারাদিনের পরিশ্রমের ভেতর লুকিয়ে থাকে, হারিয়ে থাকে৷ তাকে সহসা খুঁজে পাওয়া যায়, একা ঘরের ভেতর৷ ঘরের একটু কুপির আলোর রঙের ভেতর মন খুঁজে পায়৷ ওরা যে মনটা খুঁজে পায় না, তার যে বিয়ে করার মন নেই, এই প্রত্যাখ্যান বড় কষ্ট দেয় হাসিনাকে৷ তিন বছর হল লোকটা মরেছে৷ তিন বছর স্বামীসোহাগের সংসার নেই তার৷ তার বিয়ে করার মন নেই, লোকের প্রচারের গতিতে সে সমর্পিত হয়ে যায়৷ এই প্রচারের বিরুদ্ধে সে কতখানি যেতে পারে৷ যারা যারা তাকে বিয়ে করতে পারে, তারাই তো এই প্রচারকের একজন হয়ে উঠছে৷ বড় ব্যথা৷ বড় লজ্জা৷ মুখ ফুটে বলাও যায় না৷

সেই লোকটা৷ বউ মারা যাওয়া রিকশাওয়ালাটার কথা তার মনে পড়ে যায় এখনই৷ খুব সাধ হয়েছিল সালাম তাকে বিয়ে করুক৷ আজ দশ-বারো দিন, সে লোকটা কোথায়, তার হদিশ নেই৷ তার রিকশায় প্রতিদিন চড়ত৷ কোথায় গেল সালাম? সালাম কি মনে করত আর রিকশাওয়ালা, আর ভ্যান-রিকশাওয়ালা, ফলওয়ালা, গুমটিওয়ালা, চালপার্টি, সকলের সঙ্গে যেমন হাসিখুশিতে কথা বলে, তারও সঙ্গে একই হাসিখুশির সম্পর্ক চেয়েছিল হাসিনা? হাসিনার বিয়ে করবার মন নেই, এটা যদি ধরে নিয়ে থাকে, তাহলে সালামের হাসিনাকে বিয়ে করার ইচ্ছে বা প্রেম জাগলেও বলতে পারবে না৷ সালামকে দশ-বারো দিন না দেখার কথা সহসা মনে পড়ে যাওয়ায় বড় বেদনা হয় হাসিনার৷ ওদের সঙ্গে হাসি মশকরা করতে করতেই বেদনা দাঁতে পেষে৷ মকদুম এসে আঁচল ধরে ইয়ার্কি করে টানলে, হাসিনা ‘ঘুরে ঘুরে নাচ’ ভঙ্গিতে একপাক নাচলে একপাক শাড়ি খুলে গেলেও, পাকে পাকে বেদনা জড়িয়ে থাকে৷ তার হাসির ভেতর মিশে থাকে বেদনা, তার চটুলতার ভেতর, তার কৌতুকে, গুনগুন দু-কলি গান গাওয়ার ভেতর৷ সালাম দশ-বারো দিন নেই, এই বেদনা সহসা এসে তাকে পাকে পাকে জড়িয়েছে৷ মকদুমের হাত থেকে জামরুল নিয়ে যখন সে দাঁতে কামড়ায়, তখন সে তার অন্তরে কামড় বসায়৷ সালামের ঘর সংসার ছিল না৷ দুটো কাঁসার থালা আর একটা স্টিলের জামবাটি, আর একটা ভাঙা রেডিও একটা পুঁটুলিতে করে তার কাছে রাখতে দিয়েছে৷ সংসার পাতলে সেগুলো নিয়ে যাবে৷ এত নির্দয়? সেগুলো তো নিয়ে চলে যেতে পারে! দশ-বারো দিন রেখে কোথায় চলে গেল, সালামের পুঁটুলির জিনিসপত্র হাসিনাকে কুরে কুরে খায়৷ অন্তর ছ্যাঁদা করে ঘুণপোকার মতো৷ সালাম চলে যাওয়ার বেদনা হাসিনাকে সহসা এসে জড়িয়েছে৷ সালামের না থাকার বেদনা হাসিনাকে সহসা এসে জড়িয়েছে৷ মানুষের মন নেই৷ পুঁটুলিতে মন রাখে মানুষ? না৷ পুঁটুলির মধ্যে কয়েকটা জিনিসপত্র৷ সেগুলো আগলে রাখার কী দরকার? তাতে মনের স্পর্শ নেই৷ যদি কোনওদিন সালাম ফিরে আসে, তাকে ওগুলো ফিরিয়ে দেবে৷ ওগুলো পাথরের মতো বুকে লাগে৷

হাসিনার মন বলল, বাগনানে নেমে আজ আম কিনব৷ আম খাওয়ার আজ খুব শখ পেয়েছে৷ একটা গোটা আম, ছাল ছাড়িয়ে খাবে, আঁটি চুষে চুষে খাবে৷ টক যদি হয়, নুন মাখিয়ে খাবে৷ মিষ্টি যদি হয়, ছালসুদ্ধ খেয়ে নেবে৷ বৃষ্টি যদি রাতে হয়, দরজা খুলে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবে৷ গায়ের ঘামাচি মরবে৷ দেহ শীতল হবে৷ মনে মনে কতকগুলো সাধ ও সঙ্কল্প তৈরি করে ফেলে সে৷

স্টেশনে মাল নিয়ে এসে, সুবলকে খুঁজে না পাওয়ার অপেক্ষায় তাকে থাকতে হয়৷ সুবলের প্রতি অধীরতা এখন এই মুহূর্তে নেই৷ বরং সুবল অবহেলায় থাকে৷ যতক্ষণ না আসে, ততক্ষণ অপেক্ষা অধীরতা৷ এসে গেলে মিটে যায়৷ শ্রমসঙ্গের পরিপূরক নির্ভরতার প্রশ্ন৷ জীবিকার প্রশ্ন৷ জীবনের প্রশ্ন অন্যখানে৷ সুবল তার নিভৃত জীবনের বুঝি কেউ নয়৷

হাসিনা গাড়ির ওপর৷ প্ল্যাটফর্মে সুবল৷ সুবল বস্তা তুলে ধরে হাসিনার দিকে, হাসিনা বস্তা টেনে তোলে৷ সুবলের একটা ভারী বস্তা সুবল তুলতে পারছে না৷ হাসিনা খেঁকিয়ে ওঠে, ‘তোল না, তোল, গায়ে কি খ্যামতা নেই বোঁচামুখো?’ নিজেই গায়ের জোর লাগিয়ে সেটা তোলে৷ হাসিনার হাতে চুড়ি নেই যে বস্তার ঘষটানিতে চুড়ি ভাঙবে৷ তার স্বামী মারা গেছে, তার হাতে তাই চুড়ি নেই৷ চুড়ি পরার কী শখ ছিল! নিত্য নতুন চুড়ি পরত৷ চুড়ি না ভাঙলে নতুন চুড়ি পরা যেত না৷ তখন নিজের থেকে ভেঙে ফেলত৷ হাতদিয়ে চেপে যে ভাঙত, তা নয়৷ ভরা জলের কলসি কাঁখে তোলার সময় চুড়িতে ঝনকা মারত৷ অথবা কলসির কানায় চুড়িভরা হাতের চাপ রাখত৷ তাতে কখনও ভাঙত, কখনও ভাঙত না৷ নতুন পরা চুড়ি এভাবে আচম্বিতে ভেঙে গেলে আপশোস হত৷ ভীষণ৷ বাটনা বাটায় ভেঙে যেত৷

শেষ মালটা তুলে দিতে দিতে গাড়ি ছেড়ে দেয়৷ সুবল গামছায় গা ঝেড়ে ছুটছে ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে৷ হাসিনা বাঁ-হাতে দরজার হ্যান্ডেল ধরে সুবলকে দেখছে৷ সুবলের প্রতিদিনের খেলা৷ প্রতিদিনের এই দৌড়, আর ট্রেনে ওঠার মৃত্যু-মৃত্যু খেলা দেখে আসছে হাসিনা৷ হাসিনা এই মুহূর্তে একটু শঙ্কিত হয়ে পড়ে৷ আজও হয়েছে৷ বুক ঢিপ ঢিপ করে ওঠে৷ যদি গাড়িতে উঠতে গিয়ে পা পিছলে গাড়ির চাকায় পড়ে যায় সুবল? তার চোখের সামনে? এমন মৃত্যু-মৃত্যু খেলে কেন সুবল? না খেলে উপায়ও থাকে না৷ লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সুবল হাসিনার একেবারে গায়ের পাশে৷

সুবলের ছিপছিপে শরীর৷ পাতলা গোঁফ৷ বাবরি চুল৷ নীল শার্টটা ঘামে ভিজে গেছে৷ সুবল ওঠার পর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল৷ তাকে টেনে ভেতরে আনে হাসিনা৷ ‘ভেতরে আয়, ভয় করে৷’

‘ভয় কীসের?’

পুরুষের এই মৃত্যু-মৃত্যু খেলা পছন্দ করে না হাসিনা৷ নিজে বস্তার ওপর বসে, সুবলকে বস্তার ওপর পাশে বসায়৷

এই ট্রেন থেকে পড়েই চাকার তলায় চলে যায় কাসেম৷ দু-টুকরো হয়ে যায়৷ তাকে আর চেনা যায়নি৷ কাসেম তার স্বামী ছিল৷ তিন বছর আগের ঘটনা৷ সুবলের মতোই এরকম করে চলন্ত গাড়িতে উঠত৷ সুবলের থেকে বেশি ফর্সা ছিল৷ সুবলের মতো অতখানি রোগা ছিল না৷ সুন্দর নাক ছিল৷ কাসেমই চাল আনত৷ হাসিনা সংসারে থাকত৷ রাতে ফিরত কাসেম, গভীর রাতে, ডেকে ডেকে হাসিনাকে ঘুন থেকে তুলত৷ ঘুম ছিল হাসিনার পাহাড়ের মতো৷ সুবল বিড়ি ধরিয়েছে৷ ‘গাড়ির চা খাবি?’

হাসিনা বলল, ‘না’৷

সে ঘুম আর ঘুমোতে পারে না হাসিনা৷ দিনে দিনে কাসেমকে না-দেখতে পাওয়ায় কাসেমের মুখ ভুলে যাচ্ছে হাসিনা৷ এ-এক জ্বালা, স্বামীর মুখ ভুলে যাওয়ায় এক নির্মম কৌতুকে মাঝে মাঝে হেসে ফেলে হাসিনা৷ সব হাসি যে আনন্দের হয় না, এ থেকে জেনেছে হাসিনা৷ কাসেমের জন্য অনেক কেঁদেছে, অনেক কষ্ট পেয়েছে৷ আর কাঁদে না, আর কষ্ট পায় না৷

আচম্বিতে তার মনে বড় বেদনা হয়, জয় বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে পাঁচ লক্ষেরও বেশি লোকের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যাওয়ায়৷ একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু বড় ভয়ঙ্কর৷ মানুষের মৃত্যু বড় কঠিন জিনিস৷ বুকের ভেতরটা আঁকপাঁক করে ওঠে৷ এত মানুষ একসঙ্গে? অসুখ-বিসুখ নেই, এমনিতেই মরে গেল৷ বড় বেদনা আসে হাসিনার৷ সে অশিক্ষিতা রমণী, তার অত জ্ঞান নেই৷ কিন্তু অত মানুষের মৃত্যু নিয়ে তার বেদনা কম নয়৷ কতদূর জয়বাংলা, বাংলাদেশ, সে জানে না৷ ওদেশ থেকে কেউ আসে, ওদেশে কেউ যায়, তাদের দেখেছে৷ নিশ্চয় উড়ে উড়ে পাখি ওদেশে যায়, পাখি ওদেশ থেকে এদেশে আসে৷ অন্ধকারের নদীর জলও ওদেশ থেকে এদেশে আসে৷ ওদেশে যায় এদেশ থেকে৷ চেনা মানুষ যখন যায় আসে, অচেনা মানুষ এলে, চেনা হয়ে ওঠে, তখন মনে হয় দেশটায় মানুষেরই বসবাস৷ কত মানুষ মরে গেল৷ আহা! কত মানুষ কত কষ্ট পেয়ে মরেছে! এই মুহূর্তে চা খেতে ইচ্ছে করে না তার৷ গাড়ির পরিচিত চাওয়ালা হেঁকে হেঁকে চলে যায়৷ মুখে হাওয়ার ঝাপট নিয়ে শূন্যপানে তাকিয়ে ভাবে হাসিনা৷ ভেবে ভেবে যেন ছোট নুড়ি পাকিয়ে যায়৷

সেই যে মনে পড়ে গেছে সহসা, সালাম দশ-বারো দিন কোথায় গেছে, ফেরেনি, এই মনে পড়াটাকে আঁচলে যেন বেঁধে রেখেছে হাসিনা৷ হারিয়ে ফেলছে না৷ শূন্যপানে তাকিয়ে আনমনা স্নিগ্ধ হয়ে সুবলের হাঁটুতে তার বাঁ-হাতটা হালকাভাবে রাখে হাসিনা৷ স্পর্শ দিয়ে যেন সুবলকে ভালবাসে৷ সালাম অন্য কোনও জেলায়, অন্য কোনও ইস্টিশান শহরে বোধহয় রিকশা টানছে৷ গাড়িটা সঙ্গে নিয়েই গেছে সে৷ তার হাসিনার জীবন নিয়ে কোনও সাধ ছিল না, তাই অন্য কোনও জেলায়, অন্য কোনও ইস্টিশান শহরে অন্য মানুষদের মধ্যে রিকশা টানে৷ তার কাছে কিছু গচ্ছিত না রেখেই যেতে পারত সালাম৷ রাতে, পুঁটুলিতে হাত পড়ে গিয়ে, সালামকে মনে পড়লে, পুঁটুলির জিনিসপত্তর পাথরের মতো বুকে চেপে বসে৷ গহিন রাতে৷ নিভৃত জীবনে৷ কেন যে সালাম তার কাছে জিনিসপত্তরগুলো রাখতে গেল! রাখল যদি, কেনই যে কোথায়, চলে গেল! চলে গেল রেখে গেল না কিছু যদি! রাখল, চলে গেল না যদি! রেখে, কোথায় চলে গেল! তাহলে এত মনে পড়ত না সালামকে৷

হাসিনা সুবলকে ঠেলা মেরে ঝেঝিয়ে ওঠে, ‘কী অত খাচ্ছিস বল তো?’

‘কেন তুই খাবি? পান পরাগ৷’

‘একটা গোটা প্যাকেট বসে বসে একা খাচ্ছিস নাকি?’

‘কালকের কেনা৷’

‘কালকেও দিলি না একটুও৷’

সুবল হাসে৷

হাসিনা রেগে যায়৷ দাঁত কিড়মিড় খায়৷ ‘মুয়ে ঝাঁটার বাড়ি দিই, দাঁত কেলিয়ে বোঁচামুখো হাসছে!’

সুবল প্যাকেট নাড়িয়ে হাসিনার করতলে একটু পান পরাগ দেয়৷

‘এই বেশি করে দে৷’ চোখ পাকায় হাসিনা৷

আরও একটু দেয় সুবল৷

‘আরও একটু দে৷’

‘আর কত দোব!’

‘য়ু, প্যাকেট ফুরিয়ে ফেলে ঢঙ হচ্ছে৷’ পান পরাগ আর একটু নিয়ে, সুবলের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল৷ যেন তার কত মনের কথা সুবলের মুখের ওপর নিয়ে খেলা করছে৷ সুবলের দিকে তাকিয়েই থাকে৷ তাকানো তার ফুরোয় না৷ তার ভালও লাগে তাকিয়ে থাকতে৷ তার ভাল লাগাটা সুবলের কাছ থেকে চাহনির ভেতর দিয়ে নিয়ে নিতে পারে৷

সুবল নিজে তাকিয়ে অস্বস্তি পায়, ‘কি, কিছু বলবি?’

‘না৷’ হাসিনা কিছু বলে না৷ কিছু বলতে পারে না৷ সুবলের ভরা সংসার৷ কিন্তু সুবল তেমন তাকে টানে না৷ যেমন রকম টানে সালাম, তেমন কেউ নয়৷ সুবল কি বুঝতে পারে, সে সালামের প্রতি কাতর হয়ে তার দিকে এমন তাকাচ্ছে? সুবল জানে না, সুবল বুঝতে পারে না৷ সুবলের দিকে তাকিয়ে সালামের প্রতি আকুল হয়৷ সালাম কেন দিয়ে গেল পাথর!

সুবল হাসিনার বাঁ-হাতটা তার ডান হাতের ভেতর নিয়ে চাপ দেয়৷ হাসিনার ভাল লাগে৷ সে সুবলকেই দেখে, কিন্তু সালামের প্রতি তার প্রেম৷ মন কেমন করে৷ দুলতে দুলতে ট্রেন চলছে৷ হৃদয় দুলতে থাকে৷ হাওয়া যেন শরীরে ঝড় নামায়৷ শরীর কাঁপে৷ মন নিভৃত কাঁপুনিতে মরে থাকে৷

‘কুথাও ঘুরে আসবি সুবল?’

‘বেড়াতে?’

‘এমনি বেড়াতে৷’

‘কোথায়?’

‘আমি কি অত নাম জানি?’

সকালে কোথাও বেড়াতে যাবে, সন্ধ্যায় ফিরে আসবে, তার মেয়ে দুটোর কাছে, এমন হয় না? দশ বছরের বোনটা তার সংসারে থাকে৷ তার ভরসায় কোথাও বেশিক্ষণ থাকা যায় না৷ মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে৷ কি দুর্বল লাগে তার৷

সুবল হাসিনার করতলে কুটুস করে চিমটি কেটে নেয়৷ ‘ওই তো লিচু উঠেছে৷’ ঝটিতি সুবলের কোমরে লুঙ্গির কশি চেপে ধরে হাসিনা৷ ‘কেন, খাওয়া৷’

‘তুই খাওয়াবি বলেছিস তো৷’

‘আমি খাওয়াব, হ্যারে বোঁচামুখো!’ কোমরের কশি ছেড়ে সুবলের গলার গামছাটা ছিনিয়ে নেয় হাসিনা৷

সুবল চুল ধরে হাসিনাকে নিজের দিকে টানে৷ সুবলের বুকের কাছে মাথাটা কাত হয়ে পড়ে হাসিনার৷ হাসিনা হাসিখুশিতে, হিহি করে হাসছে৷ সুবল তার চুল ধরে টানছে বলে, সুবলের বুকে তার শরীর নুয়ে পড়ছে৷ এলিয়ে পড়ছে৷ ‘এই সুবল, ভাল হবে না কিন্তু!’ হাসিনার চোখদুটিতে প্রসন্ন হাসি খেলে বেড়াচ্ছে৷ চমৎকার হাওয়ার মতো খুশিতে থাকা বয়ে বেড়াচ্ছে৷ ভিজে ঠোঁটে দাঁত কামড়ে ধরলে সেটার প্রকাশ পায়৷৷ ছদ্ম রাগ দেখিয়ে পরমুহূর্তে হেসে ফেললে সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে৷ খোঁপার চুল এলিয়ে যায়৷ চোখ বুজে আসতে চায়৷ সুবলের বুকের ওপর চিৎ হয়ে মাথা রেখে, সুবলের মুখ ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে দেখতে চায়৷ সুবলকে দেখতে চায়৷ সে জানে, সুবল সালাম নয়৷ সালামও সুবল নয়৷ কাসেমও সালাম হতে পারেনি৷

রাত অনেক হল৷ গোলায় মাল দিয়ে এটা ওটা কেনাকাটা করা ও চা-পানি খেতে খেতে রাত সাড়ে দশটা বেজে যায়৷ প্রতিদিনই এইরকম৷

রিকশার লাইনে ঘোরে ফেরে হাসিনা৷ কুদ্দুস ভাবে যে তার রিকশায় হাসিনা যাবে, সে রিকশা টেনে বের করে৷ তাকে না করে দেয় হাসিনা৷ রজবও টেনে বার করে রিকশা৷ তাকেও না করে দেয় হাসিনা৷

হানিফ বলল, ‘কি রে যাবিনি?’

‘যাব, সেই বেদোর জাতটাকে দেখেচিস?’

‘কে বলবি তো?’

‘সালাম৷’

‘কেন, তোর কিছু লিয়ে গেছে বুঝি? কী লিয়েছে?’

‘কিছু একটা লিয়েছে৷ তোকে বলব কেন?’

‘না বলিস তো বয়েই গেল৷ তবু আদায় করতে পারি কিনা দেখতাম৷’ হানিফ পাশ ফেরে, ‘হ্যারে কুদ্দুস, সালামকে দেখতে পাইনি, গেছে কুথা?’

কুদ্দুস বলল, ‘উ শালা বে করবে বলে হুগলি গেছে৷ খানাকুল৷’

‘এদিকে আর মেয়ে পেল না, হুগলি ছুটতে হল?’ হানিফ হাসিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার রিকশায় যাবি মনে করিস তো বল, পিছুনে হাওয়া, শনশন নিয়ে চলে যাব৷ যাবি তো চল৷ কিরে হাসিনা, যাবি?’

‘যাব বৈকি, দু-দশ মিনিট আগে-পরে যাওয়া নিয়ে তো কথা! কিন্তু মানুষটার লিট খবর লিচ্ছি৷ মানুষটার বিয়ে হল কি বিয়ে হল না, ফিরল কি ফিরল না— এসব কথা!’

হানিফ কুদ্দুসের দিকে পাশ ফেরে৷ ‘সত্যি সালাম বিয়ে করতে খানাকুল গেছে?’

কুদ্দুস পেছন ফেরে৷ ‘এই নারানদা, সালাম বে করতে গেচ্ছে বলছিলে না?’

নারান হাঁকে ‘সে তো আট দশ দিন হল বে করতে চলে গেছে৷’

‘ফিরেছে৷’ আরও দূর থেকে কে যেন বলল৷

নারান পেছনে মুখ ফেরায় ‘কখনো ফিরল?’

‘সকাল দশটায় দেখেচি৷’

‘কেমন বে হল, কিছু জানলি?’

‘তা জানিনি৷ তবে সেই রিকশাটাই চালাচ্ছিল৷’

‘এদ্দিন গেছল যখন বিয়ে করেই ফিরেছে৷’

‘হ্যারে স্ট্যান্ডে এসেছিল জাকির?’

‘না, সে স্ট্যান্ডে আসেনি৷’ পাড়ার ভাড়া খেটেছে বোধহয়৷ কাল আসবে৷’

হানিফ হাঁকে, ‘এই জাকির, তোর সনে তো দোস্তি ছিল, বউ দেখে আয় না৷ বাঁধে ছোটবুনের ঘরে তুলেছে দ্যাখ৷ নিজের তো ঘর নেই৷ ফর্সা বউ কিনা অন্তত দেখে আয়৷’ হানিফ হাসিনার দিকে তাকায় ‘ওই তো খবর পেলি৷ যাবি মনে করিস?’

হানিফের রিকশায় উঠে বসে হাসিনা৷ ‘ওই বেদোর কথা বাদ দে৷’

‘তুইই তো শুনতে চাইলি৷’

‘শুনতে চাইনু বলে তার আমি কেউ হয়ে গেনু নাকি? তার রিকশায় যেতাম বলে জানতে চাওয়া৷’ তিনটে বড় বড় আম কিনেছে হাসিনা৷ একটা একা চুষে চুষে খাবে৷ ব্যাগে আরও বাজার আছে৷ ব্যাগ ভরে আছে৷ রিকশায়, পায়ের তলায় রেখে, ব্যাগের ডান্ডি ধরে একটু ওপরের দিকে তুলে ধরে ব্যাগটা৷

এই ভঙ্গির ভেতর থেকে, কুদ্দুস লাফিয়ে পড়ার উৎসাহ পায়৷ হাসিনার ব্যাগের ওপর হামলায়৷ ‘কী এত কিনেছিস হাসিনা— পাকা আম দেখছি যে৷’

‘এই একটা আম লিয়েচ তো, কেটে ফেলব৷’

একটা আম নিয়ে শূন্যে লোফে কুদ্দুস৷ ‘আরও তো আম আছে৷’

‘না৷ হায় করে দ্যাখো কাঁচারিপাড়ার লোক!’

কুদ্দুস আম হাতে নিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচে৷

হি হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে হাসিনা৷ ‘বেদো, করে দ্যাখো৷’ রিকশা থেকে হাসিনা নেমে কুদ্দুসের লুঙ্গি ধরে টেনে কাছে আনে৷ রিকশায় উঠে বসে লুঙ্গির কশি ধরে থাকে কুদ্দুসের৷ হাসিখুশি হাসিনা উছলে ওঠে৷ কুদ্দুস ওই অবস্থাতেই নাচে৷

কুদ্দুস গান গায় ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে...’

সহসা কুদ্দুসের গানের সঙ্গে হাসিনা গলা মেলায় ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে...’

কুদ্দুস নাচে৷ হাসিনা নাচতে পারে না৷ কিন্তু এই ঘটনায়, গানে তার মন নাচে৷ চোখ নাচে৷ তার খুশি নাচে চোখে, মনে দেহে৷ এই ঘটনাকে এড়াতে পারে না, এই গানকে এড়াতে পারে না৷ দূরের ইলেকট্রিকের আলো চুঁইয়ে পড়েছে৷ চারপাশে রিকশা ও রিকশাওয়ালার জটলা৷ নন্দ সটান হাসিনার পাশের সিটে উঠে পড়েছে৷ নন্দর গায়ে ঢলে ঢলে পড়ে হাসিনা৷ কনুইয়ের গোঁতা মারে৷ নাচের একটা আদল পায় তাতে৷ সুরের সঙ্গে সুর মেশায়, কথার সঙ্গে কথা মেশায়৷

ট্রেন ভিড়তে, মুহূর্তে ঘটনাটা থমকে গেল৷ যে যার রিকশায় চলে গেল৷ অবস্থাটা এক মুহূর্তে বদলে যায়৷

কুদ্দুস আমটা বাড়িয়ে দেয়৷

হানিফ রিকশা আগায়৷

রিকশা চলছে৷ কিছুটা হাওয়া পায় হাসিনা৷ ‘হানিফদা, তোর সন্ধানে তিনশো পুরনো টালি থাকলে বলিস তো৷ ঘর ছাইব৷ খড় আর রাখবনি৷ বিষ্টিবাদলের দিন এসচে৷’

‘আচ্ছা দেখব৷’

‘পরশু যে খুন হল, খুনিকে ধরতে পেরেছে, হানিফদা?’

‘ধরেচে শুননু৷’

‘মানুষের কি মন দ্যাখ, মানুষ মানুষকে খুন করে? এই যে জয় বাংলাদেশে ঝড়ে পাঁচ লাখ লোক মরে গেল— বল হানিফদা, এমন করে লোক মরতে আছে!’

হাসিনার মন ভাল নেই৷ ব্যথায় যে কঁকিয়ে উঠছে, তা নয়৷ একটু উদাস হলে একটু একটু ব্যথা লাগবে৷ সালাম বিয়ে করেছে, এই শোকে সে মরে যাচ্ছে না৷ মন উতলা হয়ে উঠবে, রাতের বেলা, নিভৃত-একায়৷ সালামের পুঁটুলিটার কথা মনে পড়লে৷ পুঁটুলিটা হাতে ঠেকলে৷ আবজাল সুবল কুদ্দুস হানিফদের এমন মনে পড়ে না৷ তারা কোনও কিছু তাকে রাখতে দেয়নি৷ সালাম রাখতে দিয়েছে বলে, সালামের জন্যে মন কেমন করে৷ পুঁটুলিটার একটা অবয়ব আছে, হাতে ঠেকে গিয়ে মনে পড়ায়, চোখে পড়ে গিয়ে মনে পড়ায়৷ যখন চোখে পড়ে, স্পর্শে ধরা পড়ে, তখন সে ঘরে থাকে, নিভৃত একার ভেতর৷ তখনই সালামকে তার বেদনার সঙ্গে মনে পড়ে, আর সারাদিন ভুলে থাকে৷ হারিয়ে থাকে৷ গভীর রাতে পুঁটুলি ধরে সালামকে খুঁজে পায় হাসিনা৷ তখন বেশি মন উতলা হয়, মন কেমন করে৷ এখন তেমন মন কেমন করে না হাসিনার৷ সালাম বিয়ে করেছে, সে তার বিয়ে করেছে৷

হাসিনা বলল, ‘দেয়ালে আঁকছে শুধু৷ শুধু কেস্তে হাতুড়ি আর হাত৷ — মিটিন হচ্ছে শুধু৷ বুঝলে হানিফদা, মিটিন একদিন শুনব৷ বেশ কাছাকাছি কুথাও হয়, শুনব৷ — হানিফদা, আমার দুটো কেন ভোট বলত? বাপের ঘরে একটা, এখেনে একটা৷ দুটো ভোট কেন বল না?

রিকশা চলে শনশন৷ তারায় ভরা আকাশ৷ অসংখ্য তারা৷ আকাশটা নীল দেখায় তারার আলোয়৷ নরম বাতাস বইছে৷ কখনও দমকা হয়ে আসে৷ কখনও হালকা হয়ে আসে৷ মিহি অথবা ভারী বাতাস৷ রিকশার কিট কিট শব্দ৷ প্যাডেলের ঘটাস ঘটাস শব্দ৷ হানিফের শরীর নুইছে, উঠছে৷ দু’পাশে মাঠ, গাছপালা, গ্রাম, ঘরবাড়ি৷ ছবির মতো হয় কখনও হাসিনার চোখে৷ নীরব হয়ে উঠলে তার এমন মনে হয়৷ তখন তার এসব দেখতে ইচ্ছা করে৷ পেছন থেকে হানিফকে দেখে৷ হানিফের পিঠে খোঁচা মারে৷ ‘জোরে চালাতে পারিস না!’ হেসে গড়িয়ে পড়ে হাসিনা৷ হানিফের পিঠে খোঁচা মারছে বলে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে বলে, হানিফের সঙ্গে হাসিনার কোনও গোপন সম্পর্ক নেই৷ একটু হাসিখুশিতে থাকতে চাইছে সে৷ এমন করে সে খুশি থাকে৷ হাসে৷ যার সঙ্গে সম্পর্ক পাতাতে চেয়েছিল, সে এখন বিয়ে করেছে৷

হানিফ তাকে নামিয়ে দেয়৷

রাস্তার ধারেই হাসিনার ঘর৷ সরকারি জমিতে ঘর বানিয়েছে৷ কাছে দূরে এমন ঘর আরও কয়েকটা৷ হানিফ টাকা পেয়ে চলে যায়৷ কেমন শ্লথ হাঁটে হাসিনা৷ নিজের শরীরই নিজের ভার লাগে৷ টেনে নিয়ে যেতে হয় যেন৷

বাঁশের দরজাটা হাট করে খুলে ফেলে হাসিনা৷ কুপির ছোট আলোয় ছোট ঘরটা ভরে আছে৷ মেয়ে দুটোকে নিয়ে বোন ঘুমোচ্ছে৷ সকালে রান্না করে যায়৷ ভাত এলিয়ে যায়৷ সে ভাতই জল ঢেলে প্রতিদিন তাকে খেতে হয়৷ শিশুদের দেখে৷ নিঃশব্দে হাঁটাচলা করে ঘরের ভেতর৷

একা একা খায়৷ খেতে পারে না৷ রোচে না৷ কোনও রকমে দুটি ভাত খায়৷ মনে পড়ে যায় আমের কথা৷ উবু হয়ে ব্যাগ থেকে আম বের করে এনে খায়৷ মিষ্টি আম৷ ছোলাসুদ্ধ খায়৷ একটু একটু করে খায়৷ জিভে স্বাদ নিয়ে নিয়ে খায়৷ আঁটি চুষে চুষে খায়৷ তার আজ আম খাবার সাধ হয়েছিল, খাবে না কেন? গোটা আম একা বসে বসে তাই খাচ্ছে৷ সিজিনের প্রথম আম৷ গন্ধেই প্রাণ ভরে যায়৷ তাও আবার ভাল জাতের আম৷ হিমসাগর৷ একটু কামড়ায়৷ জিভের সাধ পরিতৃপ্ত করে৷ জিভ ও তালুর সঙ্ঘর্ষণে আমের টুকরো অংশটা নরম থেকে নরমতর হয়ে ওঠে৷ তার সঙ্গে লালা মেশে৷ অপূর্ব এক স্বাদ৷ সারা শরীরের মধ্যে এক স্বাদ মিশে যায়৷ শরীরের সমস্ত কোষে কোষে, রক্তে, ধমনীতে আমের স্বাদ ভরে উঠছে৷ প্রথমে আমের ছোল দাঁতে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছে৷ পরে একটু একটু কামড়ে খাচ্ছে৷ যতক্ষণ সে খায়, আমের স্বাদের পরিতৃপ্ততায় থাকে৷ তার রসনার শরীর আমের স্বাদের কাছ থেকে একটু কণাও বঞ্চনা খুঁজে পায় না৷ আঁটির গায়ের চারপাশ খাওয়া হয়ে গেলে এবার হাসিনা আঁটিটা মুখে পুরে চোষে৷ চুষে চুষে আঁটিটা খেয়ে চলে৷ আঁটির গায়ে একটুও আমের স্বাদ অবশিষ্ট রাখতে চায় না৷ অপূর্ব স্বাদের ভেতর গোটা আমটাকে এভাবে খেতে থাকে হাসিনা৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%