অশোক দাশগুপ্ত
বাড়ির সকলের মহা ভাবনা! এই নাকি প্রথম সেজদিদিমা আছাড় খেলেন! জন্মাবার পরেই বড় বড় করে চোখ তুলে চেয়ে চেয়ে নাকি আঁতুড় ঘরের কোথাও কোনও খুঁত আছে কিনা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন৷ দু-মাসে দিদিমার কোল থেকে নিজেই নেমে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি হামা দিয়ে এক মস্ত আরশুলা ধরেই মুখে পুরে দিয়েছিলেন! সঙ্গে সঙ্গে ধর-ধর করে জনা পাঁচেক আধবুড়ি ওঁকে ধরে ফেলে মুখে আঙুল পুরে আরশুলার মরদেহের বাকি অংশগুলো বের করে দিয়েছিলেন৷ যেটুকু গিলে ফেলেছিলেন তারি ফলে নাকি তাঁর ওইরকম অসাধারণ বুদ্ধি আর অসহিষ্ণু স্বভাব হয়েছিল, এইরকম অনেকেরই ধারণা৷ অবশ্য ওই হট্টগোলে দেওয়ালে খুব জোরে মাথা ঠুকে গিয়ে খুদে একটা আলু মতো হয়ে গিয়েছিল৷ তাতেও হতে পারে৷
সেকালে এ বাড়িতে মেয়েদের বেশি লেখাপড়া শেখার রেওয়াজ ছিল না৷ তবে এখন লোকে যাই বলুক, স্কুলে না গেলেও এ বংশের সব মেয়েদের বাংলা লিখতে পড়তে অঙ্ক কষতে বাড়িতেই শেখানো হত৷ সেজদিদিমা এক কাঠি বাড়া! মাস্টারমশাই যখন ভাইদের অ্যাট ক্যাট করে ইংরিজি শেখানো ধরলেন, মেনিবেড়াল কোলে নিয়ে, দরজার চৌকাঠের ওপর বসে বসে সেজদিদিমা তাঁর মুখখানা দেখে দেখেই মুখে মুখে সব শিখে ফেললেন৷ তাই শুনে খুশি হয়ে মাস্টারমশাই তাঁকে ভাইদের সঙ্গে বসিয়ে যত্ন করে ইংরিজি, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল সব শিখিয়ে দিয়েছিলেন৷ প্রাইভেটে এনট্রান্স পাস করেছিলেন৷
মাস্টারমশাই নিজের ছেলের সঙ্গে এই সাধারণ মেয়ের বিয়ে দিয়ে, কালে কালে তাঁকে প্রাইভেটে ইতিহাসে এম এ পাস করিয়েছিলেন৷ শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে দাঁড়ালেন বাড়ির সব ছেলেমেয়েদের কট্টর প্রধানা শিক্ষিকা৷
যা একবার চোখে দেখেন, বা কানে শোনেন তা জম্মে ভোলেন না৷ সে এক ভয়াবহ ব্যাপার৷ পড়াশুনোর ব্যাপারে কারও আপত্তির কারণ ছিল না, বরং সুবিধাই ছিল৷ মানচিত্র বা অভিধান খুলতে হত না৷ তিনিই মানচিত্র তিনিই অভিধান৷ মুশকিল হল সাংসারিক জীবনের৷ সামান্যতম ব্যাপারটুকু একবার চোখে দেখলে বা কানে শুনলেই হয়ে গেল৷ চিরকালের মতো রেকর্ড হয়ে থাকত৷ অপরাধীর পার পাবার জো ছিল না৷
বিশ্বাস কর আর নাই কর, নেতাদের বড় বড় বক্তিমে একটিবার শুনলেই হল৷ কমা, সেমিকোলন, ভুলভালসুদ্ধ চিরকালের মতো সেজদিদিমার স্মৃতিপটে গাঁথা হয়ে থাকত৷ এসব নিজেদের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না৷ তবে ওঁদের ওই দত্তচৌধুরির বংশে ঘটনাগুলো প্রবাদবচনের মতো হয়ে আছে৷ তাঁর জ্বালায় আত্মীয়স্বজনদের গত পঞ্চাশ বছরের ভুলভালগুলো তাঁদের বংশধরদের অগোচর থাকত না৷ মাঝে মাঝে তাঁরা আপত্তি করতেন, বলতেন— ‘আমরা নিজেদের বংশধরদের অবজ্ঞার পাত্র হই, এই কি তোমার ইচ্ছে?’
কাষ্ঠ হেসে সেজদিদিমা বলতেন— ‘করবার সময় মনে ছিল না, সব কিছুর ফল ভোগ করতে হয়? ভুল বললে শুধরে দিস৷ মনে রাখিস ইংরিজিতে একটা প্রবচন আছে— দুটি জিনিস ফিরিয়ে আনা যায় না৷ ছোঁড়া তীর আর বলা কথা৷’
এইভাবে বছরের পর বছর ধরে, তিন পুরুষের সদস্যদের তিনি হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে রেখেছিলেন৷ তাঁর কর্তাটি পর্যন্ত তাঁর কথায় উঠতেন বসতেন৷ এ বিষয়ে তাঁর প্রাণের বন্ধুর কাছে মাঝে মাঝে আক্ষেপ করতেন৷ ‘আমার দোর্দণ্ড প্রতাপে কলেজের প্রিন্সিপাল থেকে বেয়ারা পর্যন্ত থরহরি কম্পমান আর নিজের গিন্নির কথায় কিনা ওঠ-বোস করি৷ ছিঃ!’ বন্ধু বললেন, ‘সব কথা কি আর ওঁর কানে যাওয়া সম্ভব— ওই দেখ কাণ্ড!’
ওই শেষের কথাটুকু বলার কারণ হল যে ওঁর পায়ের কাছে ওঁর পেয়ারের হলদে-কালো মেনি বিড়ালটা শুয়েছিল, সে হঠাৎ উঠে পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ সেজদাদু বললেন, ‘ওই দেখ! নিশ্চয় এইসব কথা লাগাতে গেছে!’ বন্ধু বললেন, ‘আমি বরং উঠি৷’
সে যাই হোক৷ স্বীকার করতেই হবে সেজদিদিমণির অসাধারণ স্মৃতিশক্তির ও কর্তব্যনিষ্ঠার ফলে বাড়ির অবস্থার দিন দিন উন্নতি হতে থাকল এবং তিনি নিজেও ছদ্মনামে একটা বিখ্যাত দৈনিক কাগজের যুগ্ম-সম্পাদিকা হয়ে গত পঞ্চাশ বছরে ঘটা সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের ভিতরের কথা ছেপে দিতে লাগলেন৷ অবশ্য সব নাম পাল্টে৷ দেখতে দেখতে বাড়ির অবস্থা পাল্টে গেল৷ ছিল একটা শখের গেরস্থ বাড়ি৷ এখন হয়ে উঠল একটা সচ্ছল সংসার৷ তবে সুখ তার মধ্যিখান থেকে কোন সুযোগে সুড়সুড় করে পালিয়ে গেল!
এতই নিঃশব্দে পালিয়েছিল যে গোড়ায় কেউ কিছু টের পায়নি৷ তারপর একেবারে স্তম্ভিত! এমন সর্বনাশ কেউ কল্পনাও করতে পারেনি! ব্যাপারটা খুলেই বলি৷ বিশ্বাস কর আর নাই কর, রাতে বাড়িতে কোনও অবিমৃশ্যকারিতায়-ভরা দুঃসাহসিক চোর এসেছিল৷ হয়ত বা বিদেশি কেউ, যার কাছে সেজদিদিমার খ্যাতি অজ্ঞাত ছিল৷
সে যাই হল, হয়ত বাড়ির সবাইকে ধুলোপড়া করে দিয়ে, কিংবা কোনও নিদমন্তর পড়ে বা শিকড়টিকড় পুড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে থাকবে৷ তারপর সেই সুযোগে সেজদিদিমার পুরনো কাগজপত্রের ক্যাশবাক্সটি সরিয়ে, অবিকল সেই রকম আরেকটি ক্যাশবাক্স রেখে, সটকান দিয়েছিল৷ শেষরাতে ঘুম ভেঙে সেজদিদিমা তার পায়ের গোড়ালি আর দেওয়ালে ছায়া ছাড়া কিছু দেখতে পাননি৷
সেই যথেষ্ট! ভয়-ডর বলে তাঁর কিছু ছিল না৷ উনি যেসব বিষয় লিখতেন, তার কটি নোট-পত্র ছাড়া মূল্যবান কিছু ছিলও না ওই ক্যাশবাক্সে৷ তাঁর আসল দলিলের ভাণ্ডার তো তাঁর মস্তিষ্কে৷ ক্যাশবাক্স যে নেবে সে কাঁচকলা পাবে৷ কিন্তু তার আস্পর্ধা দেখে তাঁর সর্বাঙ্গ রি-রি করে জ্বলে উঠল৷ তিনি দাদুর লাঠি-গাছি তুলে রে-রে-রে করে তার পাছু নিলেন৷ সামনের তিন-ধাপ সিঁড়ির কথা মনেই ছিল না৷ ধপাস করে পড়লেন৷ মেঝেতে মাথা ঠুকে তিনদিন অজ্ঞান অচৈতন্যি৷ চোর হাওয়া৷
সেই তিনদিন সকলের উদ্বেগ-আতঙ্কের শেষ ছিল না৷ তবু অনেককাল বাদে বাড়িতে যে এরকম শান্তি বিরাজ করছিল, সেটাও মানতেই হবে৷ কিন্তু সে শান্তি বড় দুঃখের৷
এক-দুই-তিন করে সাতদিন ওইভাবে কাটল৷ বাড়ি যেন বোবা৷ সেজদিদিমা একাই বাড়ি মাথায় করে রাখতেন, আর সকলে হয় চুপ করে থাকতেন, নয়ত ফিসফিস করে কথা বলতেন৷ হয়ত তার কারণ হল তার বেশি কিছু করবার সুযোগই পেতেন না৷ তাছাড়া তাঁর কোনও ব্যবস্থাপনায় আপত্তি করার কোনও সঙ্গত কারণ পাওয়া যেত না৷ প্রত্যেকটার ফল লাভজনক হত৷ সবাই তার যথেষ্ট ভাগ পেতেন৷ না চাইতেই পেতেন৷ কিছু বলার সাহস কারও হত না৷
তবে একটা প্রাকৃতিক নিয়ম আছে যে আধারে যতখানি ধরে, তার বেশি ঠুসে দেবার চেষ্টা করলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে৷ তাই সেজদাদু তাঁর প্রাণের বন্ধু, পূর্বোক্ত বদ্যিনাথ সামন্তর বাড়ি রোজ বিকেলে একবার (স্বাস্থ্যের কারণে হাঁটতে যাবার অছিলায়) গিয়ে মনের কথা প্রাণের কথা উজাড় করে দিয়ে আসতেন৷ শুনে বদ্যিনাথ মহা রেগে যেতেন৷ বলতেন, ‘তুমি কি একটা মুগুর ভাঁজা, সাঁতারকাটা পুরুষমানুষ, নাকি একটি কিঞ্চিলিকা?’
শুনে আশ্চর্য হয়ে সেজদাদু বললেন, ‘কিঞ্চিলিকা আবার কি?’ পরম পণ্ডিতের বিদ্যের দৌড় দেখে কাষ্ঠ হেসে বদ্যিনাথ সামন্ত বললেন, ‘কিঞ্চিলিকা হল কেঁচো৷’ খানিক ভেবে সেজদাদু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি কিঞ্চিলিকা৷ তা ছাড়া উপায় নেই৷’ রেগেমেগে সামন্ত বললেন, ‘আছে উপায়৷ সেটাকেই অবলম্বন করতে হবে৷ অত কথা কারও মনে থাকতে পারে না, মানে সেটা ফিজিকেলি ইমপসিবল৷ কোথাও নিশ্চয় নোট করা থাকে৷ ওঁর ডাইরি নেই?’
‘না, তা নেই৷ তবে একটা মান্ধাতার আমলের ক্যাশবাক্স আছে৷ খোপ খোপ করা৷ খরচের রেজকি পয়সাকড়ি, রসিদ ইত্যাদি রাখেন৷ ওপরের ট্রেটা তুলে তলায় অবিশ্যি গোপন কাগজপত্র থাকতেও পারে৷ তবে আমায় গিন্নি এত কথা বলেন যে গোপন কিছু থাকা সম্ভব মনে হয় না৷’
সামন্ত বললেন, ‘ওই বাক্সটি হাতাতে হবে৷ তবেই ঠাকরুণ পোষ মানবেন৷ খুব মূল্যবান বাক্স নাকি?’
‘আরে না, না৷ তখন কি আর মূল্যবান কিছু কিনবার সামর্থ্য ছিল আমাদের? বিদ্যা নিয়েই ধুয়ে খেতাম৷ এখনকার সচ্ছলতার সবটুকুই আমার গিন্নির কৃতিত্ব!’
সামন্ত চটে গেলেন, ‘ওই দুর্বলতাটাই তোমার কেঁচোমির কারণ৷ সে যাক গে৷ তাহলে ওরকম আরেকটা ক্যাশবাক্স দুষ্প্রাপ্য নয়?’ ‘আরে না, না, বড়বাজারের যে কোনও দোকানে পাওয়া যায়৷ সেকেন্ডহ্যান্ডের জলের দর৷ তাছাড়া আমাদেরই টং-এর গুদোমঘরে ওর জোড়াটা আছে চাবিসুদ্ধ৷’ ‘ব্যস, আর বলতে হবে না৷ আমাকে কিছু জিজ্ঞাসাও কর না৷ তুমি যা৷ অমনি নিজেই গিন্নির কানে তুলে দেবে৷ আজ মতলবটা পাকাই, কাল কার্যে পরিণত করা যাবে৷ তুমি নাক গলিও না৷’
এ বিষয় আর কিছু উচ্চবাচ্যও করেননি সেজদাদু৷ আর দুদিন পরেই তো ওই কাণ্ড৷ ভয়ে সেজদাদুর হাত-পা হিম! তার ওপর সামন্তর টিকির দেখা নেই! তাঁর বাড়িতে দুঃসংবাদটি দিতে গিয়ে বড় নাতি মনু ফিরে এল৷ তিনি নাকি নিখোঁজ৷ বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে৷ চারদিকে চররা তাঁকে খুজে বেড়াচ্ছে৷ পুলিসে খবর দেওয়া হয়েছে৷ সেজদাদু একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন৷ গিন্নির ওই অবস্থা৷ বন্ধু নিখোঁজ৷ তাঁকে সাহায্য করতে গিয়েই বন্ধুর কি সর্বনাশ হল কে জানে৷ হই হট্টগোল শুনে সে রাতে ওই পলায়মান ছায়া সেজদাদুও দেখেছিলেন আর সে যে কার ছায়া, সেটুকু বুঝতে তাঁর এক দণ্ডও দেরি হয়নি৷ সমস্ত সর্বনাশের জন্য তিনি নিজেকে ছাড়া কাউকে দায়ী করতে পারছিলেন না৷
এদিকে সেজদিদিমা তেমনি কাঠ হয়ে পড়ে আছেন৷ পাশে অবিনাশ ডাক্তারবাবু আর বড়কাকি ওষুধ, ব্র্যান্ডি ইত্যাদি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত৷ আত্মীয় বন্ধুদের সারাদিন আসা যাওয়া৷ এরই মধ্যে সপ্তম দিনে হঠাৎ চোখ খুলে, অপ্রসন্ন কণ্ঠে সেজদিদিমা বললেন, ‘কোথাকার না কোথাকার কে না কে মতলবি লোক রটাল বন্দুকের গুলিতে গরু শুয়োরের চর্বি দেয়৷ দাঁত দিয়ে খোলস ছাড়াবার সময় হিন্দু মুসলমান দুজনারই জাত যায়! আর বলা নেই কওয়া নেই অমনি সেপাইরা সব মার-মার কাট-কাট করে ক্ষেপে উঠল! শুরু হয়ে গেল সিপাহি বিদ্রোহ! কোয়ার্টারের জানলা দিয়ে তাই দেখে বেকুব বনে গেলাম৷’
শ্রোতারা সব নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল,— ‘তারপর? তারপর?’
সেজদিদিমা বললেন, ‘তারপর আর কী? হিসেবরাখা কেরানিবাবুরা রাতারাতি সপরিবারে বারাকপুর থেকে সটাং কলকাতা! বলে বাঁচলে পরে অন্য কথা৷ সেই ইস্তক আমরা কলকাত্তাই বনে গেছি৷’ এই বলে ফিক করে হেসে সেজদিদিমা আবার চোখ বুজলেন৷ বাড়ির সকলে তাজ্জব বনে গেল৷
সেই হল শুরু৷ একটু একটু করে সেজদিদিমার পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে আর তার হুবহু বর্ণনা দেন৷ সাল, তারিখ, অকুস্থল-সহ৷ মহারানী ভিক্টোরিয়ার প্রতি ভারি ভক্তি দেখা গেল৷ তিনিই তো সব ভাল ভাল আইনকানুন বেঁধে দিয়ে, খুনেদের ছাড়া আর সবাইকে বেকসুর খালাস দিয়ে সব গোলমাল মিটিয়ে দিলেন৷ আজ পর্যন্ত তাঁর ওই ভাষণের ভিত্তিতে আইনকানুন চলছে৷ তার ওপর সামান্যই রদবদল হয়েছে৷ স্বয়ং যুবরাজ ভারতে এলেন, দিল্লিতে দরবার হল৷ সে এক দেখবার জিনিস৷ চোখের সামনে ভাসে৷ — এই বলেই আবার চোখ বন্ধ৷
ডাক্তার বললেন— ‘কোনও চিন্তার কারণ নেই৷ শরীরে শক্তি ক্রমে ফিরে আসছে৷ এইরকম একটা বড় আঘাতের পর রোগীরা অনেক সময় কিছুদিন ভুল বকে৷ তারপর আবার প্রকৃতিস্থ হয়৷’
আত্মীয়-বন্ধুরা শুনে ভারি বিরক্ত৷ ভুল বকা আবার কী? এ তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সেজদিদিমার পূর্বজন্মের কথাও এতদিনে মনে পড়ছে৷ তা পড়বে না? কি প্রখর স্মৃতিশক্তি, সেটা ভুললে তো চলবে না৷
এই আশ্চর্য ব্যাপার চারদিকে রটে যায়৷ চেনা-অচেনা লোকে শুনতে আসে৷ বলাবাহুল্য ডাক্তারবাবু দরজায় খিল দিতে বলেছেন৷ আরও বলেছেন, তেমন বুঝলে ডালকুত্তো এনে সদর দরজায় বেঁধে রাখবেন৷
বাড়ির ছেলেমেয়েদের কিন্তু একটা মস্ত উপকার হল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধেকের ভারতেতিহাস একেবারে নখাগ্রে এসে গেল৷
গিন্নির শারীরিক উন্নতি দেখে সেজদাদু যেমনি খুশি, তাঁর মানসিক বিভ্রান্তির কারণে তেমনি চিন্তিত৷ হ্যাঁ, মানসিক বিভ্রান্তি ছাড়া আবার কি?
এই সময় দৈবাৎ বিধাতার ইচ্ছায় সমস্ত বিপদ কেটে গেল৷ ততদিনে দুই সপ্তাহ কেটে গেছে৷ সেজদিদিমা বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসেছেন৷ নার্সকে নিষ্কর্মা বলে ভাগিয়েছেন৷ ডাক্তারকে বড় বড় কথা বলার জন্য তাড়া দিয়েছেন৷ ডাক্তারের মা তাঁর সই বলে ডাক্তারও কিছু মনে করেননি, বরং তেড়ে তর্ক করেছেন৷
হেনকালে রোগা ফ্যাকাশে একটা বদ্যিনাথ সামন্ত সেজদিদিমার পেয়ারের পুতি বলাইকে ধরে এনে হাজির করলেন৷ বললেন, ‘বলাই, এবার সকলের সামনে বল কি নিয়ে তোরা এত আমোদ করছিলি৷’
এই বলে অবিকল সেজদিদিমার বাক্সের মতো একখানি ক্যাশবাক্স, সেজদাদুর হাতে দিয়ে, হনহন করে চলে গেলেন৷ সেজদাদু বাক্স খুলে দেখেন ওপরের ট্রে-তে একটা সোনার মাদুলি আর তলার খোপে একটা পুরনো ডাইরি৷ তার ওপর সবুজ কালি দিয়ে কাঁচা হরফে এবং ভুল বানানে লেখা শ্রীমতী কৃষ্ণপ্রিয়া দাসীর দিনপঞ্জিকা ইতি৷ খাতাটা সত্যিই একটা ডাইরি বলে মনে হয়৷ সম্ভবত বহুকাল আগে সেজদিদিমা ঘর গুছোতে গিয়ে ওটিকে খুঁজে পান এবং মুগ্ধ হয়ে পড়েন৷ পরে পরিবারের মানুষ বাড়লে বাক্সটা যেমন ছিল সেই অবস্থাতেই টং-এ স্থান পেয়েছিল৷ এবং বাড়ির নাতি-পুতিরাও ওই টংটিতে নিরিবিলি আস্তানা পেয়ে, নিজেদের ঘাঁটি বানিয়েছিল৷ তারাই সম্ভবত হাবিজাবির সঙ্গে ওই ক্যাশবাক্স ঘেঁটে পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে পড়ে খুব আমোদ পেয়েছিল৷ তারপর সেজদিদিমার মুখেও গড়গড়িয়ে ওইসব কথা শুনে, বোধহয় হকচকিয়ে গিয়ে আর কিছু বলেনি৷
সামন্তদাদু চুপিসারে টং-এ উঠে ওই ক্যাশবাক্সের হদিশ পান৷ কিন্তু সরানো আর হয়ে ওঠেনি, স্বয়ং সেজদিদিমার বীরবিক্রমের কারণে৷ তাঁর পা মচকে, সর্বাঙ্গ ছড়ে গিয়ে, এক বন্ধুর বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল৷ সেজদিদিমা আর তাঁর বংশধররা অন্য জাতের প্রাণী৷ ওরা সব পারে৷
এর একটা ভাল ফল হল৷ সেজদিদিমার মাথার ঘোর কেটে গেল৷ তিনি প্রকৃতিস্থ হলেন৷ পাণ্ডুলিপিটার কথা তিনি কখনও ভাবেননি৷ তখন বয়সও কম ছিল, অভিজ্ঞতাও ছিল না৷ এখন যেন হাতে চাঁদ পেলেন৷ লেখার হাত ক্রমে ক্লান্ত হয়ে আসছিল৷ এবার ধারাবাহিকভাবে, হুবহু যেমন আছে, প্রতি শনিবার তেমনি ছেপে দেবেন৷ শ্রোতারা লুফে নেবে৷
আহ্লাদে গদগদ হয়ে ডেকে বললেন, ‘কোথা গেলি বাবা বলাই, এই মাদুলিটা তোকে দিলাম৷ মায়ের কাছে রেখে দে৷’ আহা, বংশধর বলে কথা৷ ডাক্তারকে বললেন, ‘খেঁদুবাবা, আজ বড় সুখের দিন৷ তুমি দুপুরে খেয়ে যাবে৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন