ময়না তদন্ত

অশোক দাশগুপ্ত

এক

‘কিছু পেলেন?’

‘আজ্ঞে না৷’ কানাইবাঁশি সরখেল মাথা চুলকে জবাব দিলেন৷ কিছু পাওয়া উচিত ছিল অথচ পেলেন না— এই অপরাধবোধে কানাইবাঁশি কিছুটা লজ্জিত, সন্ত্রস্ত, বোধহয় ভীতও৷ কারণ, যে সে লোক নয়, হাইকমান্ডের জ্যোতির্বলয়ের দেদীপ্যমান নক্ষত্র— সামনের এই মেদবহুল, কৃষ্ণকায়, কেশবিরল মানবসন্তানই তার নেতা৷ তার ইহকাল, পরকালও কিনা কে জানে৷ কানাইবাঁশি জনগণমন অধিনায়ক জয় হে গানটি মনে মনে গাইবার চেষ্টা করেন৷

নেতা, যে সে নেতা নয় রীতিমতো কেন্দ্রীয় নেতা, কামতাপ্রসাদ সিংহ গর্জন করে উঠলেন৷ ‘কী বিড়বিড় করছেন তখন থেকে, তিনটে দিন ধরে তিরিশটা লোক মিলে কিছুই বের করতে পারলেন না৷’

‘আজ্ঞে না’ — কানাইবাঁশি সরখেল একইভাবে মাথা নাড়লেন, না পারার দুঃখে কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ হলেন৷

নেতা কামতাপ্রসাদ কেশবিরল মাথায় হাত বোলালেন, তারপর চেয়ারের ওপর ধপ করে বসে পড়লেন৷ বললেন, ‘এখন কী হবে? একটু পরেই খোঁচড় রিপোর্টারগুলো আসবে— আমি যে স্টেটমেন্ট করে দিলাম মুকুন্দ চাকলাদার আমাদের পার্টির শহিদ— তার কী হবে?’ কানাইবাঁশি কিঞ্চিৎ উদ্ভাসিত৷ হাইকমান্ডের জ্যোতির্বলয়ের কাছাকাছি অবস্থান করে তার রাজনৈতিক জ্ঞান প্রায় প্রজ্ঞার কাছাকাছি চলে গেছে৷ গদগদ হয়ে বললেন, ‘আপনি যা বলেছেন, মানে ইনসিডেন্টের দিন যা বলেছেন, সেটাতেই স্টিক করবেন স্যার!’

নেতা কামতাপ্রসাদই এখন খানিকটা বিহ্বল, হতবুদ্ধি৷ তিনি বললেন, ‘তার মানে?’

এই প্রশ্নটায় স্বভাবসিদ্ধ দাঁতখিঁচুনি ছিল না৷ বরং একটা মানে কানাইবাঁশি বের করলেও করে ফেলতে পারে, এমনতর পেলবতাই, আশ্বাসের জন্য আগ্রহাতিশয্যই প্রকট হয়েছিল৷

কানাইবাঁশি কথাটিকে, ‘তার মানে’ শব্দদুটিকে নিয়ে লোফালুফি করেন৷ তাঁর দুচোখ আবেশে ছোট হয়ে আসে৷ বিরোধী দলের গুহ্যদ্বারে আছোলা বংশদণ্ড দেবার কাল্পনিক তুরীয়ানন্দে কানাইবাঁশি কখনও কখনও কামজ উত্তেজনা ও সুখ অনুভব করেন৷ জনশ্রুতি এই যে, কামতার সঙ্গে তার দক্ষিণহস্তস্বরূপ কানাইবাঁশির সমকামী সম্পর্ক আছে৷

নেতা অকৃতদার, কানাইবাঁশি বিবাহিত৷ কিন্তু স্ত্রী বছর দশেক ঘর করার পর, একটি বিকলাঙ্গ জড়বুদ্ধি সন্তানকে কানাইবাঁশির ঘাড়ে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়৷ কানাইবাঁশি মর্মাহত হয়েছিলেন খুব৷ সে সময় তার আর্থিক অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না৷ তাদের দলে হোলটাইমার হিসেবে মাসমাহিনা প্রথা তখনও চালু হয়নি সেভাবে৷ কিন্তু কানাইবাঁশি নিজেকে আশ্বাস দিতেন— এ্যায়সা দিন নেহি রহেগা৷ বাংলায় যেমন গীত হয়, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’ গাইতেন৷

কানাইবাঁশি স্বগত, আত্মস্থ ‘তার মানে’ শব্দদুটিকে নিয়ে খেলাতে চান, নাচাতে চান যেন৷ কিন্তু নেতাদের ধৈর্যচ্যুতির স্বাভাবিক সময়সীমা পার করে কামতাপ্রসাদ খিঁচিয়ে ওঠেন, ‘তখন থেকে ক্যালাচ্ছেন কেন? মানেটা কী সেটা বলুন৷’

কানাইবাঁশির সম্বিত ফেরে৷ নেতাকে তিনি দেখেন, অবলোকন করেন৷ তাঁর মুখে রহস্যময় একটা হাসি আলগা ঝুলে থাকে৷ ‘আপনি স্টিক করে থাকুন, বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দিন৷ মুকুন্দ আমাদের দলের শহিদ৷’

নেতার অধৈর্য হওয়ার কারণ আছে৷ তিনদিনে তিরিশটা লোক সারা জেলা তোলপাড় করে ফেলেছে, কলকাতা গেছে, ফিরে এসেছে, আবার গেছে৷ আর এই কম্ম করতে পার্টি তহবিল থেকে হাজার পাঁচেক আর নিজের গাঁট থেকে আরও ছ-সাত হাজার টাকা গলে গেছে৷ একটা পিস এভিডেন্স পাওয়া যায়নি যাতে প্রমাণ করা যায় মুকুন্দ চাকলাদার তার দলের সমর্থক ছিল, সক্রিয় না হলেও নিষ্ক্রিয় সদস্য ছিল৷ আর শেষ বিচারে, তাই— বন্ধুগণ, মুকুন্দ চাকলাদার আমার দলের শহিদ তেমন জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না৷

নির্দল শহিদ পুলিস রেকর্ডে কিংবা খবরের কাগজে পাওয়া যাবে কিনা সেটা নেতার ব্যক্তিগত সচিব শ্রীমতী নন্দিনী যোশি না ফিরে আসলে বোঝা যাবে না৷ সে সবকটি ন্যাশনাল ডেইলিকে যোগাযোগ করার জন্য কলকাতা গেছে৷ প্রশ্ন একটাই— কোনও নির্দল ব্যক্তি পুলিসের গুলিতে মারা গেলে তাকে শহিদ বলা যাবে কিনা? অথবা পুলিসের গুলিতে মারা গেল, অর্থাৎ গুলিতে মারা গিয়ে শহিদ হল— এমন লোকটি নির্দল হিসেবে গণ্য হতে পারে কিনা? আদৌ তাকে নির্দল বলা চলে কিনা?

এক্ষেত্রে যস্মিন দেশে যদাচারঃ৷ পশ্চিমবাংলায়, শহিদ অধ্যুষিত পশ্চিমবাংলায় তথা কলকাতায় এ প্রশ্নর যদি কোনও উত্তর না থাকে, তবে পৃথিবীর কোথাও এ প্রশ্নের উত্তর নেই৷ কামতাপ্রসাদ এ কথাটাই তার ব্যক্তিগত সচিব শ্রীমতী যোশিকে বুঝিয়ে বলেছিলেন৷ যোশি নেতার কথার মর্মার্থ ঠিকই বুঝেছিল৷ বলেছিল, ‘রাইট স্যার— পুলিসের গুলিতে একটা লোক মারা গেল, তাকে তো শহিদ হিসেবে কাউন্ট করতেই হবে৷ বুলেট মেকস হিম ম্যার্টার৷ যুক্তিটা কানাইবাঁশির কাছে ঘোলাটে লেগেছিল৷ আমতা আমতা করে তিনি বলেছিলেন, ‘তাহলে চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসবাদী সকলেই কী শহিদ? সবাই পুলিসের গুলিতে মরেছে বলেই শহিদ হয়ে গেল৷’

নেতা বিরক্ত হলেন৷ সন্ত্রাসবাদী আর চোর ডাকাত এক হল৷ সন্ত্রাসবাদের যদি রাজনৈতিক দল থাকে, মতাদর্শ থাকে— তাহলে বুলেটে মৃত সন্ত্রাসবাদী আলবাত শহিদ৷ নেতা বলেছিলেন, ‘ছি ছি কানাইবাঁশি! গণতান্ত্রিক সংবিধানের অধীনে চার দশক কেটে গেল এটুকু গণতান্ত্রিক চেতনা হল না আপনার৷’

কানাইবাঁশি লাইসেন্স, পারমিট— মিটিং, মিছিল এগুলো মোটামুটি বোঝেন৷ তাই এতকাল বুঝে এসেছেন৷ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যকার বিষয় নিয়ে আবছা ধারণাও আছে, এগুলো নিয়ে বিভিন্ন পার্টির বক্তব্যও যে একটু আধটু না বোঝেন তা নয়৷ কিন্তু নির্দল হলে বা না হলে শহিদ হতে অসুবিধে কোথায় এটা বুঝতে তাঁর সত্যিই অসুবিধে হচ্ছিল৷

শ্রীমতী নন্দিনী ঝকঝকে, স্মার্ট— উত্তর তিরিশ না চল্লিশ বোঝা দায়৷ দিল্লিতে হাইকমান্ডের কারও কী যেন সুপারিশে এখন তাঁর নেতার সচিব, ব্যক্তিগত৷ কানাইবাঁশি সচিবকেও সমীহ করেন নেতারই মতো৷ শ্রীমতীর সব কথার অর্থ না বুঝলেও, তিনি গেলেন, গিলে হজমের চেষ্টা করেন৷

শ্রীমতী বিষয়টিকে বিশদ করে৷ ‘পুলিস মানে কী স্যার? পুলিস মানে রাষ্ট্র৷ ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ যেহেতু রাজ্যের, সুতরাং যে কোনও পুলিস এমনকী কেন্দ্রীয় পুলিসও, অন্তত গুলি ছোঁড়ার পয়েন্টে রাজ্যের পুলিস৷ সেই পুলিস গুলি করল৷ পুলিস গণতান্ত্রিক দেশে নিরপরাধ লোককে গুলি করে না, এটা যদি অ্যাকশন হয় স্যার, তাহলে বুলেটে যে মারা গেল সে নিশ্চিত অপরাধী, সে রাষ্ট্রদ্রোহী, নিদেনপক্ষে রাজ্য সরকার বিরোধী৷ রাজ্য সরকার কে স্যার?’

শ্রীমতী উজ্জ্বল যেন বা জটিল অঙ্কের সমাধানসূত্রে তাঁর চোখ চকচকে, ‘রাজ্য সরকার মানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দল৷ বুলেটে মৃত মুকুন্দ চাকলাদার সেই রাজনৈতিক দলের বিরোধী৷ বুলেট যদি সত্যি হয়, তাহলে মুকুন্দ নির্দল হতে পারে না৷ সে সরকার-বিরোধী দলের সমর্থক৷’

বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণ শেষে শ্রীমতীর গালে, পাউডারের পাফ৷ ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট আয়নায় মুখ দেখল, লিপস্টিক বের করে ঠোঁটে ঘষল৷ বলল, ‘তবু আপনি যখন বলছেন, আমি কলকাতা যাচ্ছি নির্দল অর্থাৎ পার্টিলেস কিংবা অ্যাপলিটিক্যাল কোনও ব্যক্তি বুলেটে মৃত হলে শহিদ হিসেবে তার দাবি থাকে কিনা, আই উইল ট্রাই টু ফাইন্ড আউট৷’

মুকুন্দ চাকলাদারকে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের দলের শহিদ হিসেবে ঘোষণা করার দাবিতে সোচ্চার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে কিনা, তা নিয়ে হাইকমান্ডের মতামত চাওয়া হবে, জানার পর কামতাপ্রসাদের অনুগামীরা আশ্বস্ত হয়ে ঘরে ফেরার পথ ধরল৷

দুই

কামতাপ্রসাদ উদ্বিগ্ন অবস্থায় পায়চারিরত৷ শ্রীমতী যোশি কলকাতা থেকে ফিরে আসেনি৷ হাইকমান্ড মুকুন্দর স্ত্রীকে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও দপ্তরে চাকরির অফার দিতে বলেছে৷ কিন্তু স্পষ্টভাষায় মুকুন্দকে, পুলিসের বুলেটে মৃত মুকুন্দকে দলীয় শহিদ বলা যাবে কিনা, তা নিয়ে কোনও নির্দেশ দেয়নি৷

কামতাপ্রসাদ কানাইবাঁশির মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিলেন৷ কানাইবাঁশির ইদানীংকালের কাজকর্মে কামতাপ্রসাদ এবং তিনি মারফত হাইকমান্ডও খুব খুশি৷ আগামী নির্বাচনে কানাইবাঁশি যাতে জেলা পরিষদের টিকিট পান, কামতাপ্রসাদ দেখবেন৷ অনেকটা কানাইবাঁশির একগুঁয়েমির জন্যই কামতাপ্রসাদ মুকুন্দের অর্থাৎ শহিদ মুকুন্দের বা বলা ভাল মুকুন্দকে শহিদ করে নেবার গুরুদায়িত্ব নিয়ে ফেলেছেন, কানাইবাঁশি বলেছেন, ‘কালেভদ্রে একটা শহিদ পাওয়া যায় স্যার৷ আমরা শহিদ মুকুন্দকে নিয়ে আগামী মাসতিনেকের জন্য আমাদের মিটিং-মিছিল— অবরোধ, অনুরোধ, উপরোধ সব চালিয়ে যাব৷ এমনকী একটা জেলা বনধ, পশ্চিমবাংলা বা ভারত বনধ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি৷ শহিদের পোটেনসিয়ালিটি তো আপনি জানেন স্যার৷’

কামতাপ্রসাদ জানেন, খুব ভাল করেই জানেন, সবকটা ন্যাশনাল ডেইলিতে তিনদিন ধরে শুধু মুকুন্দ চাকলাদার৷ পুলিসের বন্দুক তোলার ছবি, ট্রিগারে আঙুল রাখার ছবি, বুলেটে বিদ্ধ পতনশীল মুকুন্দর ছবি, ভূপতিত মুকুন্দর রক্তাক্ত দেহের ছবি— আর সঙ্গে জুতসই হেডলাইন৷ কামতাপ্রসাদ হাইকমান্ডের জ্যোতির্বলয়ের প্রায় অন্তর্বর্তী নেতা হয়ে উঠেছেন সম্প্রতি৷ তবুও ন্যাশনাল ডেইলির প্রথম পাতায় তার বিবৃতির হেডলাইন, ওঃ ভাবলেই গা শিরশির করে, কতবার বেরিয়েছে এ পর্যন্ত? প্রথম পাতার হেডলাইনে থাকা— সে তো সব নেতার স্বপ্ন৷ দলের প্রথম সারিতে থাকতে হলে হেডলাইনে থাকতেই হবে৷ মুকুন্দকে নিজের দলের শহিদ হিসেবে ঘোষণা করে কামতাপ্রসাদ হেডলাইনে ছোট বড় নানা অক্ষরে তিনদিন ধরে আছেন৷ কিন্তু যদি গোটা ব্যাপারটাই ফ্লপ করে? তাহলেও হেডলাইন— কাল অথবা পরশুর কাগজে৷ কিন্তু সেটাই হয়ত আগামী পাঁচ-সাত বছরের জন্য শেষ হেডলাইন৷ হাইকমান্ড কী এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বিবৃতির জন্য কষে পেছনে একটা লাথি মারবেন না? আর সেই লাথি খেয়ে কী প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে কিংবা হেডলাইনে!

কানাইবাঁশি নেতার সঙ্কট ভালই উপলব্ধি করেছেন৷ তিনদিন অনেক আলোচনা হয়েছে৷ এখন জোর দিয়ে বললেন, ‘আপনি যা বলেছেন, মানে ইনসিডেনটের দিন যা বলেছেন, সেটাতেই স্টিক করবেন স্যার!’

কামতাপ্রসাদের আগ্রহাতিশয্যে, উৎকণ্ঠায় কানাইবাঁশি বিশদ হলেন৷ বললেন, ‘আমরা তো বলছি মুকুন্দ আমাদের দলের কর্মী ছিল৷ মিউনিসিপ্যালিটির ভোটের দিনে একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সে ভোটকেন্দ্রের রিগিংয়ে শাসকদলের সমর্থকদের বাধা দিতে গিয়েছিল৷ পুলিস তাকে গুলি করে মেরেছে৷’

কামতাপ্রসাদ বললেন, ‘এটা তো আমরা বলেই দিয়েছি৷ কিন্তু এভিডেন্স৷’

কানাইবাঁশি মৃদু হাসলেন, বললেন, ‘আমরা তো দাবি করছি স্যার৷ আমরা যে ভুল বলছি, মানে অন্যায় অন্যায্য দাবি করছি সেটা অপোজিট পার্টি প্রমাণ করুক৷ সাংবাদিকরা প্রমাণ করুক৷’

খুব মনঃপূত না হলেও, কামতাপ্রসাদ যেন একটু আলো দেখতে পেলেন৷ অন্তত ভরসা পেলেন যে শহিদ মুকুন্দ চাকলাদার, যিনি সম্ভবত এখনও মর্গে, সাংবাদিক সম্মেলনে এসে কামতাপ্রসাদের কথায় কন্ট্রাডিক্ট করবেন না৷

কামতাপ্রসাদ একটা লার্জ পেগ হুইস্কির জন্য আদেশ দিলেন, বললেন, ‘শহিদ মুকুন্দ চাকলাদার অমর রহে৷’

তিন

মুকুন্দ চাকলাদার, এত লোক থাকতে, শহিদ হওয়ার উপযোগী সমাজসচেতন ও সমাজবিরোধী দুয়েরই যখন এ শহরে অভাব নেই— শেষ পর্যন্ত মুকুন্দই কেন যে শহিদ হতে গেল? এ নিয়ে সরকারপক্ষের নেতা, আমলা, পুলিসের কর্তারা তিনদিন ধরে কূলকিনারা করে উঠতে পারলেন না৷ উদ্যোগ যতটা গভীর এবং ব্যাপক হতে হয় হয়েছে, কিন্তু মুকুন্দ একটা ধাঁধার মতোই রয়ে গেছে, অন্তত উদ্যত বন্দুকের সামনে তার দাঁড়িয়ে পড়াটা৷

শেষ রিপোর্টে জানা গেছে, মুকুন্দ মর্গে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে লাশকাটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে৷ তার হৃৎপিণ্ডে না ফুসফুসে— বুকের বাঁদিকে না ডানদিকে কিংবা দুদিকেই দুটো সিসের গুলি বিঁধে আছে৷ কাগজগুলোতে এ সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য প্রকাশিত ইতিমধ্যে৷

তিনদিনের প্রথম পাতা গরম রীতিমতো৷ দূরদর্শনের হামদো ক্যামেরাম্যান কীভাবে যেন ওই ভয়াবহ দৃশ্য দেড় মিনিটের বিস্তৃত অনুপুঙ্খে পর্দায় ভাসিয়ে তুলেছে৷ জেলার গঞ্জ, স্টেশন, দোকানপাটে অঘোষিত বনধ নেমে এসেছে— ঝুপ করে দুপুরেই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার মতো৷ আর এরই মধ্যে সরকারের বিরোধীপক্ষ মুকুন্দ চাকলাদারকে তাদের দলের সমর্থক হিসেবে দাবি করেছে৷ মৃত মুকুন্দকে শহিদ হিসেবে ঘোষণা করে দিয়েছে৷ শহরের বিভিন্ন জায়গায় ইট গেঁথে শহিদবেদিও তৈরি হয়ে গেছে৷ দলীয় পতাকা অর্ধনমিত হয়ে মসৃণ দণ্ডের ওপর শোভা পাচ্ছে৷ বুকে কালো ব্যাজ এঁটে গোটা পাঁচেক মৌন শোকমিছিল হয়ে গেছে৷ মর্গ থেকে শহিদ মুকুন্দর লাশ বের হওয়ার পর আরও গোটাকতক মিছিল হবে৷ অন্তত শ্মশানঘাট পর্যন্ত যে একটা বড়সড় মিছিল হবে, গোয়েন্দা বিভাগ সরকারকে সে খবর ইতিমধ্যেই পৌঁছে দিয়েছে৷

নিঃসন্দেহে সরকারপক্ষ একটা প্যাঁচে পড়ে গেছে৷ মুকুন্দকে শহিদ হিসেবে বিরোধীপক্ষের শিবিরে তুলে দেওয়ার অর্থ স্বেচ্ছামৃত্যু৷ মৃত্যু না হোক সরকারি দলের পক্ষে তা হবে এক মর্মান্তিক আঘাত৷ ভিত, জনগণের মনে যে ভিত শনৈঃ শনৈঃ গড়ে উঠেছে গত এক দশক ধরে— সেই ভিত চৌচির হয়ে ধসে না পড়লেও, তাতে ফাটল ধরা কোনও কৌশলেই আর আটকানো যাচ্ছে না৷

সরকারপক্ষের সাংবাদিক সম্মেলনে এক উঠতি নেতা তো মুকুন্দ চাকলাদারকে নিজেদের দলীয় কর্মী হিসেবে সোচ্চারে দাবিই করে বসেছিলেন৷ কোনও রকমে বর্ষীয়ান এক নেতা তার মুখে হাত চাপা দিয়ে সামাল দিয়েছিলেন, তাইতে রক্ষে৷ না হলে মুকুন্দ চাকলাদারকে শহিদ বানাতে গেলে গোটা মিউনিসিপ্যাল ভোটের হিসেবটাই গড়বড় হয়ে যেত৷ পুঁজিপতিদের কুক্ষিগত কাগজওলারা চিৎকার করে জানান দিত সরকারপক্ষ ভোটে রিগিং করা, বুথ দখল করার জন্য মুকুন্দকে পাঠিয়েছিল৷ পুলিস কর্তব্যের খাতিরে শাসকদলের পোষা সমাজবিরোধীকে গুলি করে মেরেছে৷ সে আরেক কেচ্ছা হত৷

সরকারপক্ষের রাজ্যস্তরের জনৈক তাত্ত্বিক নেতা জানালেন যে তিনদিন চেষ্টা করে মার্কস-এঙ্গেলস গ্রন্থাবলী ঘেঁটে কিংবা মাও-এর রচনাবলী থেকে তিনি এ ধরনের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির কোনও উদাহরণ পাননি৷ কারণ সম্ভবত ভারতবর্ষের সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিকাঠামো মার্কস-এঙ্গেলস কিংবা মাও-এর চিন্তাধারায় স্থান পায়নি৷

সরকারপক্ষ বস্তুত তার নাতিদীর্ঘ শাসনকালের মধ্যে এরকম বিটকেল পরিস্থিতির মুখোমুখি আর কখনও হয়নি৷ পুলিসের গুলিতে কেউ মরলে সে স্বাভাবিক নিয়মেই শহিদ হিসেবে গণ্য হয়েছে৷ এতে সরকারপক্ষ বা বিরোধীপক্ষ শহিদের মালিকানা নিয়ে বাদানুবাদ করলেও, শেষ পর্যন্ত একটা রফায় পৌঁছানো গেছে৷ সাক্ষ্যপ্রমাণে দলীয় দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অথবা নাকচ হয়ে গেছে৷ কিন্তু এবার মুকুন্দ চাকলাদার শাসকপক্ষকে রীতিমতো ফেরে ফেলে দিয়েছে৷

সরকারি প্রশাসন যতটুকু খবর নিয়েছে তাতে মুকুন্দ চাকলাদারের কোনও পলিটিক্যাল আইডেনটিটি পাওয়া যাচ্ছে না৷ আর এইখানেই যত রাজ্যের গন্ডগোলের সূত্রপাত৷ মুকুন্দ যে বিরোধীপক্ষের সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় কোনও ধরনেরই সমর্থক ছিল না, এটা স্থানীয় বিধায়ক বারবার জোর দিয়ে বলেছেন৷ তাঁর বক্তব্য রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরের নেতৃত্ব মেনেও নিয়েছেন৷ কিন্তু তাতেও মুকুন্দর মৃত্যু সম্পর্কিত রাজনৈতিক আবিলতা কাটছে না৷ মুকুন্দ শহিদ নয়— তাহলে কী?

রাজ্যস্তরের একদল বলছে এটাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া হোক৷ অন্যদল বলছে, ক্ষমতায় থেকে একথা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনও নজির অন্তত মার্কসবাদ লেনিনবাদে নেই৷ সোবিয়েত রাশিয়া এবং চীনের তথা সমগ্র সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার বর্তমান অবস্থায় পশ্চিমবাংলার পরিস্থিতি— বিশেষ এই পৌর নির্বাচনে মুকুন্দর মৃত্যুজনিত পরিস্থিতির দ্বান্দ্বিক বিচার আদৌ প্রাসঙ্গিক কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দলের বিভিন্ন স্তরে, জেলা, রাজ্য এমনকী কেন্দ্রীয় কমিটিতেও৷

স্থানীয় মন্ত্রী বিচারবিভাগীয় তদন্তের জন্য ঘোষণা করতে দলকে এবং মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছেন৷ কারণ এটা না হলে পৌর নির্বাচনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীর এবং সামগ্রিকভাবে সরকারি দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷

এখন বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিলেই পুরভোটের গোটা ব্যাপারটাই বিচারবিভাগের হাতে চলে যাবে৷ তাতে শেষ পর্যন্ত কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করা শক্ত৷ পুর-প্রশাসন ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা বন্ধ করে দিয়েছে এবং ওপরতলা থেকে নির্দেশ চেয়ে পাঠিয়েছে৷ পুর-প্রশাসনের আমলার বাপান্ত করে সরকারি দল এখন গোটা বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে৷ কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি৷

পুরনির্বাচন আধিকারিক— ঢ্যামনাটা আবার শুধু নির্বাচন আইনের ধারা উপধারা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি— কাগজ ও দূরদর্শন প্রসঙ্গ তুলে জনমত রিপিট জনমত বলে পরিস্থিতিটাকে, তার সরকারি মেসেজটিকে অনেক বেশি ঘোরালো করে তুলেছে৷

সরকারপক্ষের উচ্চপর্যায়ের মিটিংয়ে প্রশাসনের হোমরাচোমরা, বিশিষ্ট নেতা ও মন্ত্রিমণ্ডলী উপস্থিত৷ স্থানীয় বিধায়ক যে প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছে, গোয়েন্দা রিপোর্টের সঙ্গে তার অনেকটাই মিলে যাচ্ছে৷ তবু রিপোর্টটি আবার বিশদভাবে পরীক্ষা করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে নির্দেশ দেওয়া হল৷

স্বরাষ্ট্র বিভাগ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিল কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডই বলুন অথবা কামতাপ্রসাদই বলুন মুকুন্দ চাকলাদার যে ওঁদের সমর্থক ছিল তার এক পিস এভিডেন্সও এঁরা আনতে পারবেন না৷

স্বরাষ্ট্র জানাল, মুকুন্দ বন্দেমাতরম গান করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা বীরচন্দ্রপুর প্রাইমারি ইস্কুলে চার বছর৷ মুকুন্দ সেখানে ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে৷ আর ডি পি আই— শিক্ষা বিভাগের নির্দেশে তখন জাতীয় সঙ্গীত কম্পালসারি ছিল ইস্কুলে, সিনেমাহলে৷ ফলত এ থেকে প্রমাণ হয় না, মৃত মুকুন্দ প্রাো বন্দেমাতরম ছিল৷ অর্থাৎ বিরোধী দলের সমর্থক ছিল৷

শাসকদলের একজন বললেন, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত না? মুকুন্দর বয়স পঁয়ত্রিশ৷ তার স্বাভাবিক রাজনৈতিক চেতনা যদি তার আঠারো বছরেও বিকশিত হয়ে থাকে, তো পরবর্তী আঠারো বছরে সে কিছুই করল না? কোনও মিটিংয়ে গেল না, মিছিলে গেল না— ছাত্র-যুবা হিসেবে কোনও দল করল না, রীতিমতো অদ্ভুত তাই না? মুকুন্দ তাহলে কী?

চার

মুকুন্দর বায়োডেটা থেকে যেটুকু বোঝা গেছে তাতে সে নিতান্তই নিরীহ মামুলি ছাপোষা গেরস্ত৷ এমন ঘর থেকে যে কেউ বেরিয়ে এসে শহিদ হয় না, তা নয়৷ চারের দশক থেকে শুরু করে সাতের দশক পর্যন্ত পারিবারিক এই প্রেক্ষাপট থেকেই রাজনীতি বেরিয়েছে— শহিদ বেরিয়েছে অকুতোভয়৷ পুলিসের গুলি খেয়েছে, শহিদ হয়েছে— এটাই সোজা হিসেব৷ এই হিসেবে মুকুন্দর পুলিসের গুলি খাওয়া পর্যন্ত ঠিক আছে, শহিদ হওয়াটা যেন কেমন ঠেকে সরকারি দলের নেতার কাছে৷

তিনি তৎপরতার সঙ্গে স্থানীয় বিধায়ককে মুকুন্দর বাড়িতে শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন৷ ত্রাণ তহবিল থেকে বিনা দ্বিধায় দশহাজার টাকার চেক দিয়ে পাঠিয়েছেন এক প্রথম সারির নেতাকে৷ তিনি মুকুন্দর বাড়ির সামনে গেট মিটিংয়ে দলীয় সমর্থক ও স্থানীয় অধিবাসীদের সামনে মূল্যবান ভাষণ রেখেছেন৷ তিনি বলেছেন একটি প্রাণ অমূল্য৷ সে প্রাণের দাম দশহাজার টাকা নয়৷ কিন্তু কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ মনোভাব ও সরকারের সীমিত আর্থিক ক্ষমতার কথা স্মরণে রেখে জনগণ দশহাজার টাকার এই সামান্য অনুদানকে অনুমোদন করবেন এ বিশ্বাস তিনি সোচ্চারে ব্যক্ত করেন৷ এরই মধ্যে তিনি প্রয়াত মুকুন্দর স্ত্রী বিশাখা চাকলাদারকে দিয়ে চাকুরির জন্য একটি স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র মুসাবিদা করিয়ে নেন এবং বাড়িতে বসেই সরকারি সংস্থায় বিশাখার জন্য নিয়োগপত্র দেন৷ বিশাখা, সদ্য বিধবা, স্বামী মর্গে এখনও ময়না-তদন্তের অপেক্ষায়, হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে৷ বিশাখার কান্না দেখে মুকুন্দর মা, অবিবাহিত ছোট বোন— সবাই একযোগে ডুকরে কেঁদে ওঠে৷ আশপাশের বাড়িগুলো থেকে যেসব মহিলারা সমবেত হয়েছিল, আরেক প্রস্থ সমবেদনা জ্ঞাপন করার জন্য তারাও মড়াকান্নায় সুর মেলাল৷

শুধু একজন অভিজ্ঞ দলীয় কর্মী বিশাখাকে বলল— ‘এখনও অনেক কাজ বাকি’, সে বিশাখার চোখ মোছার জন্য রুমাল এগিয়ে দিল, স্থানীয় সরকারি দলের একজন সম্ভাব্য মহিলা কর্মীকে বিশাখার মধ্যে সহসাই আবিষ্কার করে অভিভূত হল৷ শোকসন্তপ্ত বিশাখা মূর্তিমতী পবিত্রতা, এখন এঁর হাতে দলীয় পতাকা তুলে দিলেই হল৷ কর্মীটি নেতার দেওয়া নিয়োগপত্রর গুরুত্ব বোঝাবার জন্য ভেঙে পড়া বিশাখার পিঠে আলতো করে হাত রেখে এককোনায় নিয়ে গেল৷ বলল, ‘আপনাকে লড়াই করতে হবে বৌদি৷ লড়াই করে বাঁচতে হবে৷ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা সাবধানে রেখে দিন৷’

মুকুন্দর বাবা, বৃদ্ধ জয়রাম চাকলাদার কিছুটা বিব্রত৷ এতসব মান্যগণ্য হোমরা-চোমরা নেতাদের সান্নিধ্যে কিছুতেই তিনি সহজ হতে পারছেন না৷ দুফোঁটা চোখের জল মেলাতে পারছেন না পুত্রশোকাতুরা স্ত্রী, পুত্রবধূর সঙ্গে৷ কান্না আটকে আছে গলার কাছে৷ একসঙ্গে দুদুটো চাকরির নিয়োগপত্র বাড়িতে৷ জয়রামের ভায়রা বলছিল, ‘গণতন্ত্রের কী মহিমা দেখুন৷ এতদিন মুকুন্দ আর বৌমা মোটামুটি একটা চাকরির জন্য কী না করেছে৷ দরখাস্ত করেছে, সুপারিশের জন্য এখান-ওখান ছুটোছুটি করেছে৷ আর এখন...’

বৃদ্ধ জয়রাম বললেন, ‘গত বছরই মুকুন্দর পঁয়ত্রিশ হয়ে গেল৷ বলতে গেলে চাকরির বয়স আর রইল না৷ আর এখন দুটো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার৷’

জয়রাম চাকলাদারের ভায়রা তাঁকে শক্ত হতে পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিলেন৷

মুকুন্দ একটা ছোটখাটো চাকরি করত৷ মাস গেলে দুশো টাকা মাইনে, পুজোয় একমাসের বোনাস— একটা কাপড়ের দোকানে খাতা লেখার কাজ কীভাবে যেন জুটে গিয়েছিল৷ সরকারপক্ষ জেনে গেছে, বলাই বাহুল্য বিরোধীপক্ষের শিবিরও জেনে গেছে পৌর এলাকার মধ্যে কাপড়ের দোকানের কর্মচারীদের তিনটি ইউনিয়ন আছে৷ মুকুন্দ তিনটি ইউনিয়নেই মাসে দু টাকা করে চাঁদা দিত৷ মুকুন্দর কী রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব ছিল? মুকুন্দ কী একশোভাগ অরাজনৈতিক নাগরিক? নাকি যেটা কানাইবাঁশি বলেছে, মুকুন্দ চাকলাদার রীতিমতো ধড়িবাজ, তিন দলের বদলে পাঁচ দল হলে মুকুন্দ হয়ত পাঁচ দলকেই চাঁদা দিত— চাঁদা দিয়ে টিকে থাকতে হয় বলে টিকে থাকত৷ এক্ষেত্রে অবশ্য মুকুন্দ বেঘোরে মারা পড়ল— এবং পুরোপুরি শহিদ হলে সে যতটা অমরত্ব লাভ করত, তা তার কপালে জুটল না৷ বিরোধীপক্ষ মুকুন্দ চাকলাদারকে শহিদ বানাবার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব থাকলেও মুকুন্দর, শহিদ মুকুন্দর বুলেটবিদ্ধ লাশের দাবি থেকে তারা এখনও সরে যায়নি৷

বিশাখা, মুকুন্দর স্ত্রী, দশবছর আগে টাইপ শিখেছিল৷ তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মতো স্পিডও ছিল৷ পৌর এলাকায় আগামী দশবছরে যতজন টাইপিস্ট দরকার হবে, স্ত্রী-পুরুষ মিলিয়ে তার পঁচিশগুণ টাইপিস্ট এখনই তৈরি হয়ে গেছে৷ দশবছরে যতজন টাইপিস্ট এই এলাকায় তৈরি হবে, সমগ্র পশ্চিমবাংলায় তত টাইপিস্টের শূন্যপদ দশবছরে হয়ত তৈরি হবে না৷ এমনি আশঙ্কায় বিশাখা কাপড়, জামা, ফ্রক, পেটিকোট সেলাই-এর কাজ শিখতে শুরু করেছিল৷ ভালই শিখেছিল বলা যায়৷ মাস গেলে সেলাই থেকে আড়াইশো, সাড়ে তিনশো টাকা ঘরে আসে৷ বিশাখার কাজ হাওড়া হাটে, শ্যামবাজারের কাছে হরিসায়ের বাজারে শোভা পায়৷

বিরোধীপক্ষের কামতাপ্রসাদের নেতৃত্বে ছোট দলটিই প্রথম বিশাখার জন্য চাকরি বয়ে আনে বাড়ি পর্যন্ত৷ বলতে কি তখনও মুকুন্দর রক্ত, শহিদের রক্ত রাস্তায় চাপ চাপ পড়ে আছে, পুলিস জায়গাটিকে কর্ডন করে রেখেছে৷ প্রাথমিক দৌড়ঝাঁপ, থানা-পুলিস শেষে মুকুন্দ যখন মর্গে ঢুকে গেল লোহার বিশাল ট্রেতে চেপে তারপরই বিশাখা বাড়ি ফিরেছিল৷ আর তার পিছন পিছনেই প্রায় ‘মুকুন্দ চাকলাদার অমর রহে’ ধ্বনি দিয়ে বিরোধীপক্ষের জনা পঞ্চাশ৷

তিনদিনে এ পরিবারের দিশাহারা ভাব অনেকটাই কেটে আসছে৷ ভবিষ্যৎ তত অনিশ্চিত নয়, অন্তত সংসার ভেসে যাওয়ার মতো নয় এমত অবস্থায় বিশাখা, তার শ্বশুর অর্থাৎ মুকুন্দর বাবা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুলিসের, সাংবাদিককে, সরকারি ও বিরোধীপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছে— না মুকুন্দ চাকলাদার কোনওদিন কোনও দলের রাজনীতি করত না৷ সক্রিয়, নিষ্ক্রিয় কোনওভাবেই নয়৷

পাঁচ

তাহলে মুকুন্দ করতটা কি?

এ প্রশ্নটা সাংবাদিকদের কাছেও খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে৷ পুরভোট এবং সেই ভোটে রিগিং, বুথ দখল, ফল ঘোষণা স্থগিত সমস্ত কিছু নিয়ে যা যা সংবাদ সম্ভাবনা সব উথালপাথাল হয়ে গিয়েছে৷ সবচেয়ে বড় সংবাদ মুকুন্দর শহিদ হওয়ার ঘটনাটি— বিশেষ সে ঘটনা এক রণাঙ্গনের ইঙ্গিত দেয়, ভোটযুদ্ধ প্রকৃতই সশস্ত্র যুদ্ধের আকার নেয়৷ মুকুন্দর শহিদ হওয়ার ঘটনা শুধু সংবাদ নয়, রীতিমতো সচিত্র সংবাদ৷ অরাজনৈতিক ভ্যাবলা মুকুন্দ একা, নিরস্ত্র, সামনে পুলিস বন্দুকে তাক করছে৷ মুকুন্দ নির্বিকার, বন্দুকের ট্রিগারে পুলিসের আঙুল৷ এক শ্বাসরোধী সচিত্র সংবাদ৷ এত সত্য যেন মনে হয় সাজিয়ে তোলা হয়েছে৷ পুরভোটের প্রেক্ষাপটে মুকুন্দ আর পুলিস বিস্তৃত রাজপথের সেটে অ্যাক্টিং করছে৷

কত প্রত্যাশা ছিল কাগজের, খবরের সেইসব চনমনে সাংবাদিকদের৷ এখন তারা কিঞ্চিৎ দিশাহারা৷ আগামী সাতদিনের অন্তত দু কলম হিসেবে চোদ্দ কলমের সম্ভাবনা, তিনদিনের মাথায় এসে প্রায় নিঃশেষিত৷ মুকুন্দকে শহিদ হিসেবে বাঁচানো না গেলে, এরপর বনধ, অবরোধ, বিক্ষোভ, ভাঙচুর লুটপাটের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হবে না৷ মুকুন্দর পদাঙ্কে পৌর এলাকায় আরও আরও শহিদ তৈরি হবে না৷ দাবি পাল্টা দাবিতে দেওয়ালগুলো গরম হয়ে উঠবে না৷ সংসদে উত্তাল টেবিল-চাপড়ানি ধ্বনিত হবে না৷ তাহলে কী হবে শেষপর্যন্ত৷

সে ভাবনা সরকারপক্ষ তৎপরভাবে ভেবে ফেলেছেন ইতিমধ্যে৷ তাঁরা জেনে গেছেন মুকুন্দ পৌর এলাকায়, সেদিনের প্রাসঙ্গিক ভোটপর্বের ভোটার পর্যন্ত ছিল না৷ মুকুন্দ পৌর এলাকার সীমান্ত থেকে এক কিলোমিটার ভিতরে পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা৷ সুতরাং পুরভোট বা সেই ভোট সম্পর্কিত ব্যাপারে মুকুন্দ পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক৷ সে জাল ভোট দিতে কিংবা জাল ভোট দেওয়া আটকাতে ওখানে আসেনি৷ অরাজনৈতিক মুকুন্দ কোনও গোলমাল বাধাবার জন্যও আসেনি৷ মুকুন্দ সমাজবিরোধীদের সুপরিচিত তালিকাতেও পড়ছে না৷ তাহলে মুকুন্দ দুটো বুলেট খেল কেন? মুকুন্দ তাহলে কী?

সরকারপক্ষের ওপরতলার নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিলেন, মুকুন্দের মৃত্যু রাজনীতি বহির্ভূত একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনামাত্র, বলা যায় অ্যাকসিডেন্ট৷

আর এ ধরনের বিচ্ছিন্ন অ্যাকসিডেন্ট সর্বত্রই ঘটছে, তার ভূরি ভূরি নজির খবরের কাগজ খুললেই পাওয়া যাবে৷ জনৈক নেতা মন্তব্য করলেন মুকুন্দ তো গাড়ি চাপা পড়েও মরতে পারত, ধরুন কোনও সরকারি গাড়ি, তাহলে তাকে কী আপনারা বিরোধীপক্ষের শহিদ বলতেন?

শেষ পর্যন্ত পুলিসের জেলাকর্তাকে গুলিচালনার ব্যাপারে বিশদ তদন্ত করার নির্দেশ দিয়ে, সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন কনস্টেবলদের গুলিচালনার ঘটনার একক এবং বিচ্ছিন্ন দায়দায়িত্বর পরিমাণ নির্ধারণ করে, প্রয়োজনে বিভাগীয় শাস্তি দিয়ে মুকুন্দ চাকলাদারের ফাইলে উপসংহার টেনে দেওয়ার আদেশ জারি হয়ে গেল৷

ছয়

‘কিছু পেলেন?’

‘আজ্ঞে না’ কানাইবাঁশি সরখেল পুরোপুরি হতাশ গলায় উত্তর দিলেন৷ বললেন ‘সরকারপক্ষের চাকরির অফারটা নাকি ওরা নিয়ে নিয়েছে৷ ত্রাণ তহবিলের টাকা অবশ্য আমরাও দিয়েছি, ক্যাশে৷ সরকার দিচ্ছে চেকে৷’

‘দুটো টাকাই নিয়ে নিয়েছে?’

কানাইবাঁশি একথার কোনও উত্তর দিলেন না৷ শ্রীমতী যোশি এখনও কলকাতা থেকে ফেরেননি৷ নেতা কামতাপ্রসাদ রীতিমতো বিব্রত৷ হাইকমান্ড তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজে বেজায় অসন্তুষ্ট৷ আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মুকুন্দকে দলীয় শহিদ হিসেবে প্রমাণ না করতে পারলে, হাইকমান্ড কামতাপ্রসাদকে দিল্লি ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন৷

শ্রীমতী যোশি এখনও ইতি অথবা নেতিবাচক কোনও খবরই আনতে পারল না৷ কামতাপ্রসাদের আশঙ্কা শ্রীমতী তাকে বিপাকে পড়তে দেখে কলকাতায় হয়ত তার বিরোধী শিবিরের দলীয় এক নেতার সঙ্গে আমড়াগাছি করছে, কামতাপ্রসাদ নির্ঘাৎ আরও গাড্ডায় পড়বে৷

তবু শেষ উদ্যোগ হিসেবে কানাইবাঁশিকে নিয়ে তিনি মর্গের উদ্দেশে রওনা হলেন৷ মহকুমা হাসপাতালের এদিকটায় জনসমাগম খুবই কম৷ মর্গের সামনের ছোট বারান্দায় ডোমদের দুজন সম্ভবত চুল্লুর বোতল নিয়ে বসেছে৷ চতুর্দিকে সম্ভবত বাসি লাশের গন্ধে— ওষুধ আর পচনশীল মরদেহের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আসছে৷ কামতাপ্রসাদের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল৷

কানাইবাঁশি বলল, ‘যাই বলুন স্যার, শহিদদের জন্য মর্গে একটা আলাদা ব্যবস্থা থাকা উচিত স্যার৷’

কামতাপ্রসাদ একথার কোনও উত্তর দিলেন না৷ এই সময়েই দুজন কনস্টেবলসহ ডাক্তার পাকড়াশীকে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল৷ তিনিই সম্ভবত ময়নাতদন্তের কাজ সারবেন৷ কামতাপ্রসাদ এ অঞ্চলে খুব একটা অপরিচিত নন৷

ডাক্তার পাকড়াশী কামতাপ্রসাদ এবং তার গুটিকয় অনুগামীকে সহসা এখানে দেখে একটু যেন বিচলিত৷ মুকুন্দর লাশ নিয়ে কামতাপ্রসাদের দলের দাবি তাঁর অজানা নয়৷ একটু জোরেই চিৎকার করে ডোমদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘কীরে, সব রেডি—’

কামতাপ্রসাদ ময়নাতদন্তেও কেন যে আগ্রহী বোঝা মুশকিল৷ বস্তুত কানাইবাঁশিও কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করে ফেলল, ‘স্যার পোস্টমর্টেম থেকে কিছু কী পাওয়া যাবে?’

কামতাপ্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী আবার পাওয়া যাবে?’

‘এমন কিছু যাতে প্রমাণ করা যায়, মুকুন্দ চাকলাদার আমাদের দলের শহিদ, মুকুন্দর রক্তে, শিরায় বা হৃৎপিণ্ডে, ডি এন এ বা আর এন এ-তে দলের কী, আমাদের পার্টির কী এরকম কিছু থাকতে পারে, ময়নাতদন্তে যেটা পাওয়া যাবে?’

ডাক্তার পাকড়াশী অযাচিত, কামতাপ্রসাদের মুখোমুখি একটু শুকনো হাসি হাসলেন৷ বললেন, ‘বুঝতে পারছি আপনারা খুব উদ্বেগের মধ্যে আছেন৷ কিন্তু ময়নাতদন্ত না হলে তো কিছু বলতে পারছি না৷’

হাতে রবারের গ্লাভস গলাতে গলাতে ডাক্তার পাকড়াশী দুজন কনস্টেবল আর পুরোপুরি মাতাল দুজনকে সঙ্গে নিয়ে লাশকাটা ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন৷

দরজা খুলতেই একটা প্রচণ্ড ভ্যাপসা পচা গন্ধ৷ কামতাপ্রসাদ বমির ওয়াক তুললেন৷ কানাইবাঁশিও কাপড়ের কোঁচা তুলে নাকে চাপা দিলেন৷

মর্গের ঘরে আলো জ্বলল৷ অতি ধীরে লাশকাটা ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল৷

কানাইবাঁশি বলল, ‘ময়নাতদন্তে কী কিছু পাওয়া যাবে মনে হয় স্যার?’

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%