অশোক দাশগুপ্ত
তিন ডেসিমেল প্লট৷ মোটামুটি চৌকো৷ এককোনায় একটু খাঁজ৷ পৌর নর্দমার পচা জল মাটিকেও পচিয়ে দিয়েছে৷ তাই ওই ক্ষয়ের দাগ৷ দিলওয়ার হোসেন ক্ষয়টির দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল৷ শ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সে৷ বলেছিল, ‘এখানটা...’
‘সামান্য ব্যাপার৷’ হাসুমিয়াঁ দালাল তাকে থামিয়ে দিয়েছিল৷ ‘ওই দেখুন কত্তো ইট৷ বাঁধিয়ে ভরাট করে নেবেন৷ আজকাল এক ইঞ্চি মাটির দাম হিসেব করলে মাথা খারাপ হয়ে যায়৷’
কিন্তু মাথা খারাপ করার আরও একটা জিনিস ছিল৷ সীমানার কাছে একটা পুরনো ইটের কবর৷ তার ওপর একটা ডালিম গাছ৷ কবরটার কথা বলতে গিয়ে দিলওয়ার হোসেন বলে ফেলেছিল, ‘বাঁজা, না ফল ধরে?’ কবরটা ডালিমগাছ হয়ে গিয়েছিল৷
দালাল হেসে কুঁজো৷ ‘কথাটা আপনিও জানেন মাস্টারসায়েব! সবুরে মেওয়া ফলে৷ ফলবে৷ সবকিছুর সিজন আছে৷’ সে মক্কেলকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যেদিকটাতে দু’ঘরের ছোট্ট বাড়ি৷ ইটের দেওয়াল, অ্যাজবেস্টসের চাল৷ একটুকরো বারান্দা৷ ফাটলে শ্যাওলা, অবিশ্বাস্য ঘাস৷ ‘মেরামত করলেই ফিটফাট নতুন৷ আসুন, ভেতরটা দেখাই৷’ বলে বারান্দায় পৌঁছে মুখে ও গলায় রহস্য এনে ফিসফিস করছিল৷ ‘সময়মতো ভেঙে দোতলা বানাবেন৷ মাছের তেলে মাছভাজা, বুঝলেন তো? একতলার আগাম সেলামির টাকায়... আজকাল যা হচ্ছে৷ সে ভাববেন না৷ আমি জুটিয়ে দেব৷’ সে বুদ্ধিদীপ্ত হাসছিল৷ খুব হাসতে পারে হাসুমিয়াঁ৷ অথবা ঘরবাড়ি জমিজায়গার দালালদের এরকম হাসতে হয়৷...
কিন্তু ডালিমগাছটা মাথায় ঢুকে গেল দিলওয়ার হোসেনের৷ অথবা কবরটাই ওই প্রতীক হয়ে সেঁটে রইল৷ মালিক এক হিন্দু ভদ্রলোক৷ কাঠগোলার কারবারি৷ শহরের শেষদিকে এই সম্পত্তি এবং মহল্লাটি মুসলমানদের, দুটোই চিন্তাযোগ্য৷ আরও চিন্তাযোগ্য বিষয় একটা কবর৷
তহমিনা বেগমও স্বামীর মতো স্কুল টিচার৷ বাসে চেপে পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটা গ্রামের বা গ্রামনগরীর স্কুলে যাতায়াত করে৷ খুঁটিনাটি জেনে বলল, ‘কবর, তাতে কী? আমাদের বাড়ির উঠোনেই দাদিমার কবর ছিল৷ পরে পাঁচিল তুলে পার্টিশন করে দিয়েছিল... ও কিছু না৷ নিয়ে নাও৷’
‘তুমি দেখবে না একবার?’ দিলওয়ার হেসেন একটু অবাক হল৷
‘দেখার কী আছে?’ সহজভাবে কথাটি বলল তহমিনা বেগম৷ ‘মাটির যা অবস্থা আজকাল৷ পা রাখার জায়গা নেই কোথাও৷’
অবিকল দালাল হাসুমিয়াঁঁর কণ্ঠস্বর৷ অবশ্য দিলওয়ার হোসেন জানে, তার বউ সব কিছুতে এমন শীতল৷ সহজে মেনে নেয় সব কিছুই৷ স্কুলে কিছু ঘটলেও৷ এমনকী, একদা দিদিমণিদের মধ্যে একটা হাতাহাতি বা চুলোচুলির ঘটনাও না হেসে শীতলতায় বর্ণনা করেছিল৷ দিলওয়ার হোসেন ভাবে, হয়ত এ এক ধরনের শক্তি৷
চিন্তিত দিলওয়ার হোসেন একটু পরে বলল, ‘কবরটাতে একটা ডালিমগাছ আছে৷’
‘ভালই তো!’ তহমিনা বেগম স্কুলের শাড়ি স্বামীর সামনে বদলে নিচ্ছিল৷ একটা মাত্র ঘর৷ অন্যায়রকমের ভাড়া৷ তবু পাওয়া গেছে, সৌভাগ্য৷ যদিও কিছু কিছু গোপন ও অনুচ্চারিত বিধিনিষেধ আছে৷ বাইরের লোকজন ঢোকানো চলবে না, এবং নিষিদ্ধ মাংস-টাংস৷ তাছাড়া এক বছরের চুক্তি৷ বাড়ির মালিকের মেয়ে তহমিনা বেগমের এক কলিগ৷ সেটাই সূত্র৷ কলিগটি মালিক মাকে সুপারিশ করেছিল, ‘ওদের যা ভাবছ, মোটেও তা নয়৷ দেখবে, একেবারে আমাদের মতোই৷ কথাবার্তা চালচলন৷’ শোনা কথা এটা৷ তবে বাড়িওয়ালি বৃদ্ধা এই দম্পতিকে দেখে এবং কথাবার্তা বলে আশ্বস্ত হন৷ দিলওয়ার হোসেন বলেছিল, ‘গন্ডগোলটা কালচারের৷’ পরে রমলা একদিন চুপিচুপি প্ররোচনা দেয়, ‘মা ওইরকমই৷ মিনু, কাবাব খাওয়াবে?’ অর্থাৎ সে ওসব মানে না৷...
দিলওয়ার হোসেন দ্বিধান্বিত হেসে বলল, ‘তোমার দাদিমার কবরটার মতো পার্টিশনের আড়ালে রাখা যায়৷ কিন্তু...’
‘কিন্তু কী?’ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তহমিনা বেগম চুলে চিরুনি দিল৷ ‘কিন্তু-টিন্তু নয়৷ এমন চান্স ছাড়লে আর মাথা ভেঙেও পাবে না৷’ সে দ্রুততায় চিরুনি টানছিল, যেন এখনই বাইরে যাবে৷ কিংবা একটা ছটফটানি৷
‘না— মানে, কবরটার কথা বলছি৷’ দিলওয়ার হোসেন একটা কাগজে স্কেচ করতে থাকল৷ সে মোটামুটি ছবি আঁকতে জানে৷ চিত্রকর হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল ছেলেবেলায়৷ এঁকে বলল, ‘এই দেখ পজিশন৷’
খাটে স্বামীর পাশে বসে স্কেচটা দেখতে দেখতে তহমিনা বেগম আস্তে বলল, ‘পার্টিশন পরে হবে৷ এখানে অনেকটা স্পেস, দেখছ? একটু গার্ডেনিং করব৷ বড্ড ইচ্ছে করে, জানো?
‘রাতবিরেতে তুমি ভয় পাবে না তো!’ বউয়ের রঙিন ফুলবাগিচার ওপর একটু ছায়া দিল দিলওয়ার হোসেন৷ ঈষৎ দুষ্টুমি ছিল৷
কিন্তু তহমিনা বেগম শীতল কণ্ঠস্বরে বলল, ‘মিলাদ দেব৷ মৌলবি এনে কোরান পড়াব৷’
স্কুল শিক্ষক প্রেমবশে বউকে টানল৷ ‘কবরে যে আছে, সে যদি আমার মতো হয়?’ বলে চুম্বনের চেষ্টা করতেই বাধা পেল৷ বউ উঠে গিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল৷ চোখ জ্বলে গেল স্কুল শিক্ষকের৷
তহমিনা বেগম ঘরের কোনায় কেরোসিন কুকারের কাছে বসল৷ ‘চা-টা খেয়ে এখনই হাসুমিয়াঁর বাড়ি যাও৷ ওকে নিয়ে কাঠগোলায় যাবে৷ বায়না করতে হলে তাও করে এস৷’ এই কথাগুলিতে বিস্ময়কর উত্তাপ ছিল, অপ্রত্যাশিত এবং নতুন৷ অবশ্য শহরে একটি নিজস্ব বাড়ির স্বপ্ন তার আছে, দিলওয়ার হোসেন জানে৷...
এ ভাবেই তিন ডেসিমেল মাটি একটি দু’কামরার নিচু ঘর, একটি জীর্ণ কবর, একটি ডালিমগাছ সমেত কেনা হয়ে যায়৷ শিক্ষক দম্পতি সেখানে এসে ওঠে৷ অ্যাজবেস্টসের চালের তলায় সমতল কার্ডবোর্ডের মসৃণ সিলিং একটু আধটু ফাটল মেরামত ও রঙের কাজ পোড়ো বাড়িটিকে বাসযোগ্য এবং সুন্দর করে তোলে৷ মিলাদ মহফিল, টুপি পরা মুসলিমবৃন্দ এবং মাইক্রোফোনে এক বৃদ্ধ মৌলবির রাতভর পুরো কোরানপাঠ তাকে প্রচুর আধ্যাত্মিক শুচিতা ও রক্ষাকবচ দিয়েছিল৷
কলিগ রমলাকে এক প্রাকসন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফেরার সময় টেনে নিয়ে এল তহমিনা বেগম৷ তার অঙ্কুরিত ফুল বাগানটি দেখাল৷ রমলা কবরটি খুঁজছিল, সে শুনেছিল৷ ‘মিনা, কবর আছে বলেছিলে?’ সে দেখতে চাইল৷
তার কলিগ দ্বিধাহীন পা বাড়িয়ে বলল, ‘ওই তো!’
‘বাঃ!’
‘কী?’
‘ওই গাছটা!’
‘ডালিমগাছ’ তহমিনা বেগম উজ্জ্বল মুখে বলল, একটি ঘোষণা৷ ‘এপ্রিলে ফুল ফুটবে৷ তুমি ডালিমফুল দেখেছ কখনও? অসাধারণ! ফলের কথাও ভাবো!’
রমলা অবাক হয়ে বলল, ‘গাছটা তো কবরে৷ সেই ডালিম খাওয়া যাবে!’
হাসল তহমিনা বেগম৷ ‘জানি না! আগে তো ধরুক, তখন দেখা যাবে৷’
‘আচ্ছা শোনো৷’ রমলা নার্ভাস একটু হাসল৷ ‘তোমার— তোমাদের ভয় করে না?’
‘কিসের ভয়?’ বলে তহমিনা বেগম ঠিক করল, তার হিন্দু কলিগকে ব্যাপারটা বোঝানো উচিত৷ ‘মুসলমানদের ভূত-টুত হয় না৷ কেন জানো? আমরা আত্মাকে বলি রুহ৷ মৃত্যুর পর রুহ বন্দী থাকে ইল্লিন-সিজ্জিন নামে একটা জায়গায়— কোনও একটা গ্যালাক্সিতে বলতে পারো৷ সেখানে থাকে৷ তারপর ডুমস ডে-তে তাদের রেজারেকশন৷
‘কিন্তু মামদোভূত ডিকশনারিতে দেখেছি মুসলমানদের প্রেতাত্মা৷’
তার কলিগ খুব হাসতে লাগল৷ ‘ভুল ধারণা৷ এক্কেবারে ভুল৷ আমাদের ভূত হওয়ার চান্সই নেই৷’
‘তা হলে তোমরা ভূত মানো না বলছ?’ রমলা চার্জ করল৷ ‘কতজনকে দেখেছি, তারা মুসলমান৷ ভূত মানে৷’
তহমিনা বেগম সিরিয়াস হয়ে বলল, ‘ভূতটুত না, জিন৷ মুসলমানরা জিন মানে৷’
‘একই কথা৷’
‘উহুঁ! মানুষ মাটি থেকে তৈরি, আর জিন আগুন থেকে৷’ তহমিনা বেগম ব্যাখ্যা করতে থাকল৷ ‘আসলে কী হয় জানো? মানুষের মতো কোনও-কোনও দুষ্টু জিনও আছে৷ তারা পৃথিবীতে এসে দুষ্টুমি করে৷’
রমলা সন্দিগ্ধ দৃষ্টে কবরটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধরো যদি তেমন কেউ ওখানে ডেরা পাতে?’
তহমিনা বেগম জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘নাঃ৷ সে তুমি বুঝবে না৷ ওটা হয় না৷ কবর শুধু মানুষদের জন্য রিজার্ভ প্লেস৷’
‘কিন্তু কবরটা কার?’
‘জানি না৷’ খুব আস্তে কথাটি বলল তার কলিগ৷ তারপর হাত ধরে টানল৷ ‘এস, ঘরে গিয়ে বসি৷ ও এখনই এসে যাবে৷ আজ কী যেন মিটিং আছে৷’
কবরটা কার, ওই গোপন ও অস্বস্তিকর অনুসন্ধিৎসা শিক্ষক দম্পতির মনে থেকে গিয়েছিল৷ মফসসল শহরের এদিকটায় মুসলিমমহল্লা৷ কুটিরশিল্পী, রিকশাচালক, ঠিকে মজুর, কিছু খুদে দোকানদার, অফিস-আদালতের বেয়ারা, ‘মেহনতি জনগণ’ এবং কতিপয় উকিল ও ডাক্তার৷ যথেচ্ছ বৃক্ষলতার ভেতর ওতপ্রাোত, ঠাসাঠাসি, অসম্বন্ধ বাড়িসকল উঁচু বা নিচু৷ আর প্রহরে-প্রহরে মাইক্রোফোনে আজান৷ সব সময় নিঝুম পারিপার্শ্বিক হঠাৎ-হঠাৎ এভাবে গর্জন করে জানিয়ে দেয় একটি জোটবদ্ধ অস্তিত্বের স্বকীয়তা৷ এদিকে অনুসন্ধিৎসাটি খুব ভেতরে ঘাই মারে৷ কখনও পুরুষটি কখনও স্ত্রীলোকটি চমকে উঠে তাকায়, ‘কে ছিলে তুমি? পুরুষ না স্ত্রীলোক৷’ ডালিমগাছটি শেষ চৈত্রের বাতাসে ছটফট করে৷ ক্রমে বিন্দু-বিন্দু লালচে ফুলগুলি ফুটতে থাকে৷ ক্রমে রক্তাক্ত, যন্ত্রণা মনে হয়৷ কোন কোটি কোটি আলোকবর্ষের দূরত্বে ‘ইল্লিন-সিজ্জিনে’ একটি মানবাত্মা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে আছে ধ্বংসের দিন রোজ কেয়ামতের প্রতীক্ষায়, যখন সে নিজস্বতা ফিরে পাবে এবং আবার ব্যক্তি হয়ে উঠবে! তহমিনা বেগমের এরকম চিন্তা হয়৷ দিলওয়ার হোসেনের অন্যরকম চিন্তাভাবনা৷ মানুষটি কি দুঃখী ছিল, যার কবর ফাটিয়ে ওই রক্তাক্ত অভ্যুত্থান? আসলে সে একটু রোমান্টিক৷ জ্যোৎস্নার রাতে তার খুব আশা হয়, সে কাউকে দেখতে পাবে, পরনে সাদা কাফন৷ সে কিছুতেই ভয় পাবে না৷ কাছে গিয়ে বলবে, কে তুমি?
খালপোলের ওপর এক বিকেলে দেখা হয়ে গেল হাসুমিয়াঁর সঙ্গে৷ ‘মাস্টারসায়েবের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?’ বলে সে কপালে হাত ঠেকাল৷ মুখে দালালের মধুর হাসি৷
দিলওয়ার হোসেন বলল, ‘খোঁজ নিয়েছিলেন?’
‘কিসের?’ বলে সে হাতের একটা ভঙ্গি করল, আশ্বাসের৷ ভাববেন না৷ লোক মুখিয়ে আছে৷ বাজিয়ে দেখে তবে নিয়ে আসব৷ ইনশাল্লা! দোতলা বাড়ি করিয়ে দেবই৷ ওপরতলায় থাকবেন৷ সিনসিনারি দেখাবেন৷’
‘না, না৷’ শিক্ষক বিরক্ত হলেন৷ ‘কবরটার কথা বলছি৷’
দালাল কাঠের সাঁকো মচমচিয়ে হাসতে লাগল৷ ‘তাই! ও কিছু না৷ সেই পার্টিশনের সময়কার ব্যাপার! তখন আপনার জন্মই হয়নি৷ কে এক মিয়াঁসাহেব কালেক্টরিতে চাকরি করতেন৷ অপশন নিয়ে পাকিস্তানে যান৷ পরে এসে নারাণবাবুর বাবাকে বেচে গেলেন৷ জোর করে গছিয়ে যাওয়া বলতে পারেন৷ এ মহল্লায় তখন কেনার লোক নেই৷ সবাই ভাবছে পপুলেশন-এক্সচেঞ্জ হবে৷....না , না৷ কিছু ভাববেন না৷’
দালাল সিগারেট দিল৷ দিলওয়ার হোসেন কদাচিৎ খায়৷ নিল৷ ধোঁয়ার সঙ্গে আস্তে বলল, ‘কিন্তু কবরটা কার?’
হাসুমিয়াঁ প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে রোংরা জলেভরা খালের দিকে নাক ঝাড়ল৷ মুছে বলল, ‘হঠাৎ গরম পড়ে সর্দি৷ একটু বৃষ্টি-ফিস্টি হলে....’ আবার সে শব্দ করে হাসতে লাগল৷ ‘পার্টিশন করে দেবেন বলেছিলেন৷ দেননি?’
‘না৷’ বউয়ের চেয়ে শীতল কণ্ঠস্বরে বলল দিলওয়ার হোসেন৷
‘নতুন বাড়ি উঠলে দেবেন৷ ক হাত জায়গা ছাড়লে ক্ষতি কী?’ দালাল চোখে একটা ভঙ্গি করল৷ ‘হিসেব করলে নারাণদাকেও ছাড়তে হয়েছে কি না বলুন আপনি? টু পার্সেন্ট লেস৷ আমারও তাতে কিছু কমিশন লস৷ হিসেব করুন৷’
অসহিষ্ণু স্কুলশিক্ষক বলল, ‘আহা! কবরটা কার?’
দালাল অগত্যা সিরিয়াস হল৷ ‘তা কে বলবে? মহল্লায় খুঁজতে হয় বুড়োটুড়োদের কাছে৷ তবে বাড়ির উঠোনে কবর৷ খুব... .খুবই আপনজন ছাড়া...’ একটু নড়ে উঠল হাসুমিয়াঁ৷ ‘বরকত ডাক্তার মহল্লার পুরনো লোক৷ জিজ্ঞেস করবেন তো৷’
বাড়ি ফিরে দিলওয়ার হোসেন দেখল, এক বুড়ি বারান্দার নিচে বসে থালা-হাঁড়ি ধুচ্ছে৷ মাথার কাপড় টেনে দিল নোংরা হাতে৷ তা হলে কাজের লোক পাওয়া গেছে৷ তারপর ঘুরেই একটু চমকে উঠল৷ তহমিনা বেগম কবরের খুব কাছে দাঁড়িয়ে ফুলবতী ডালিমগাছটি দেখছে৷ ‘ওখানে কী করছ?’— শুনে সে মুখ ফেরাল৷ মহল্লার গাছপালার ফাঁক গলিয়ে একটি নরম গোলাপি আলোর রেখা পলকে সেই মুখে এসে বিঁধল৷ যখন সে স্বামীর কাছে ফিরে আসছে, তখন তার স্বামী বুঝতে পারছিল না, চোখদুটি কি ভিজে দেখেছে, না ভুল দেখা?
তহমিনা বেগম একটু হাসল৷ গলাটা ঈষৎ ধরা৷ ‘নানি পাতিয়েছি৷ তুমিও কিন্তু নানি বলবে৷ বুড়ো মানুষ৷ দুবেলা এসে যতটুকু পারে, সাহায্য করবে৷’
মহল্লায় কাজের লোক পাওয়া কঠিন৷ ঝিয়ের কাজ কেউ করতে চায় না৷ কুটিরশিল্প, নিজেদের ঘরকন্না এসবেই দম ফেলার নাকি সময় নেই৷ অথচ একজন কাজের লোকের খুব দরকার হয়েছে ইদানীং৷ তহমিনা বেগমকে ডাক্তার বলেছেন, ভারী কাজকর্ম যেন না করে৷ ঝুঁকে কিছু করাও ঠিক নয়৷ তবু কুকার জ্বেলে চা করল৷ সুজি ও ডিম ভাজল৷ দিলওয়ার হোসেন যখন অন্যমনস্ক হাতে সেগুলি মুখে তুলছে, তখন তহমিনা বেগম বলল, ‘নানির কাছে সব শুনলাম, জানো? এক ভদ্রলোক এখানে...’
‘জানি৷ হাসুমিয়াঁ বলছিল৷ পার্টিশনের সময় বেচে দিয়ে যান নারাণবাবুর বাবাকে৷’
‘ভ্যাট!’ তহমিনা বেগম বলল৷ ‘গনি উকিলকে৷ টিনের চালে মরচে ধরেছিল৷ ফেলে দিয়ে অ্যাজবেস্টস চাপায়৷ গোডাউন করেছিল৷ চোরের জায়গা৷ শেষে নারাণবাবুকে বেচেছিল৷ তাই না নানি?’
বুড়ি আস্তে বলল, ‘হুঁ৷ এ মহল্লায় সব খালি জায়গা নারাণবাবু কিনেছে৷ কে জানে কী মাথায় আছে!’
দিলওয়ার হেসেন বুড়ির দিকে তাকাল ‘কবরটা কার, জানো?’
‘সন্ধেবেলা ওসব কথা থাক৷’ ‘বুড়ি উঠে দাঁড়াল৷ সেই মুহূর্তে মাইক্রোফেনে আজানের শব্দ৷ ‘আল্লারসুলের নাম করো৷ আমি আসি, নাতনি!’ বলে বুড়ি বেরিয়ে গেল৷ সম্ভাষণে কোমল আত্মীয়তা ছিল৷
তহমিনা গলার ভেতরে বলল, ‘বলব৷ পরে শুনো৷’...
এ রাতে পাশাপাশি দুটিতে চুপচাপ শুয়ে ছিল৷ হাতে হাত, আঙুলে আঙুল৷ নিষ্পন্দ দুটি মানবশরীর৷ একসময় স্ত্রীলোকটি বলল, ‘শোনো!’ সে কনুই বালিশে রেখে উঁচু হল৷ ফিসফিসিয়ে বলতে থাকল, ‘যদি আমারও তেমন কিছু হয়...বাচ্চা হতে গিয়ে যদি আমিও অমনি করে...’ সহসা সে পুরুষটির বুকে মুখ গুঁজে দিল৷ ‘তুমি বলো! কথা দাও৷ আমাকেও উঠোনে কবর দেবে৷’ সে ভালবাসার প্রার্থনায় বা একটি স্বপ্নের ব্যর্থতা আশঙ্কা করে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল৷ বারবার বলছিল, ‘কথা দাও, তুমি মুখ ফুটে বলো! ‘আমার কবরে অমনি ডালিমগাছ...’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন