আক্রান্ত

অশোক দাশগুপ্ত

তিন ডেসিমেল প্লট৷ মোটামুটি চৌকো৷ এককোনায় একটু খাঁজ৷ পৌর নর্দমার পচা জল মাটিকেও পচিয়ে দিয়েছে৷ তাই ওই ক্ষয়ের দাগ৷ দিলওয়ার হোসেন ক্ষয়টির দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল৷ শ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সে৷ বলেছিল, ‘এখানটা...’

‘সামান্য ব্যাপার৷’ হাসুমিয়াঁ দালাল তাকে থামিয়ে দিয়েছিল৷ ‘ওই দেখুন কত্তো ইট৷ বাঁধিয়ে ভরাট করে নেবেন৷ আজকাল এক ইঞ্চি মাটির দাম হিসেব করলে মাথা খারাপ হয়ে যায়৷’

কিন্তু মাথা খারাপ করার আরও একটা জিনিস ছিল৷ সীমানার কাছে একটা পুরনো ইটের কবর৷ তার ওপর একটা ডালিম গাছ৷ কবরটার কথা বলতে গিয়ে দিলওয়ার হোসেন বলে ফেলেছিল, ‘বাঁজা, না ফল ধরে?’ কবরটা ডালিমগাছ হয়ে গিয়েছিল৷

দালাল হেসে কুঁজো৷ ‘কথাটা আপনিও জানেন মাস্টারসায়েব! সবুরে মেওয়া ফলে৷ ফলবে৷ সবকিছুর সিজন আছে৷’ সে মক্কেলকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যেদিকটাতে দু’ঘরের ছোট্ট বাড়ি৷ ইটের দেওয়াল, অ্যাজবেস্টসের চাল৷ একটুকরো বারান্দা৷ ফাটলে শ্যাওলা, অবিশ্বাস্য ঘাস৷ ‘মেরামত করলেই ফিটফাট নতুন৷ আসুন, ভেতরটা দেখাই৷’ বলে বারান্দায় পৌঁছে মুখে ও গলায় রহস্য এনে ফিসফিস করছিল৷ ‘সময়মতো ভেঙে দোতলা বানাবেন৷ মাছের তেলে মাছভাজা, বুঝলেন তো? একতলার আগাম সেলামির টাকায়... আজকাল যা হচ্ছে৷ সে ভাববেন না৷ আমি জুটিয়ে দেব৷’ সে বুদ্ধিদীপ্ত হাসছিল৷ খুব হাসতে পারে হাসুমিয়াঁ৷ অথবা ঘরবাড়ি জমিজায়গার দালালদের এরকম হাসতে হয়৷...

কিন্তু ডালিমগাছটা মাথায় ঢুকে গেল দিলওয়ার হোসেনের৷ অথবা কবরটাই ওই প্রতীক হয়ে সেঁটে রইল৷ মালিক এক হিন্দু ভদ্রলোক৷ কাঠগোলার কারবারি৷ শহরের শেষদিকে এই সম্পত্তি এবং মহল্লাটি মুসলমানদের, দুটোই চিন্তাযোগ্য৷ আরও চিন্তাযোগ্য বিষয় একটা কবর৷

তহমিনা বেগমও স্বামীর মতো স্কুল টিচার৷ বাসে চেপে পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটা গ্রামের বা গ্রামনগরীর স্কুলে যাতায়াত করে৷ খুঁটিনাটি জেনে বলল, ‘কবর, তাতে কী? আমাদের বাড়ির উঠোনেই দাদিমার কবর ছিল৷ পরে পাঁচিল তুলে পার্টিশন করে দিয়েছিল... ও কিছু না৷ নিয়ে নাও৷’

‘তুমি দেখবে না একবার?’ দিলওয়ার হেসেন একটু অবাক হল৷

‘দেখার কী আছে?’ সহজভাবে কথাটি বলল তহমিনা বেগম৷ ‘মাটির যা অবস্থা আজকাল৷ পা রাখার জায়গা নেই কোথাও৷’

অবিকল দালাল হাসুমিয়াঁঁর কণ্ঠস্বর৷ অবশ্য দিলওয়ার হোসেন জানে, তার বউ সব কিছুতে এমন শীতল৷ সহজে মেনে নেয় সব কিছুই৷ স্কুলে কিছু ঘটলেও৷ এমনকী, একদা দিদিমণিদের মধ্যে একটা হাতাহাতি বা চুলোচুলির ঘটনাও না হেসে শীতলতায় বর্ণনা করেছিল৷ দিলওয়ার হোসেন ভাবে, হয়ত এ এক ধরনের শক্তি৷

চিন্তিত দিলওয়ার হোসেন একটু পরে বলল, ‘কবরটাতে একটা ডালিমগাছ আছে৷’

‘ভালই তো!’ তহমিনা বেগম স্কুলের শাড়ি স্বামীর সামনে বদলে নিচ্ছিল৷ একটা মাত্র ঘর৷ অন্যায়রকমের ভাড়া৷ তবু পাওয়া গেছে, সৌভাগ্য৷ যদিও কিছু কিছু গোপন ও অনুচ্চারিত বিধিনিষেধ আছে৷ বাইরের লোকজন ঢোকানো চলবে না, এবং নিষিদ্ধ মাংস-টাংস৷ তাছাড়া এক বছরের চুক্তি৷ বাড়ির মালিকের মেয়ে তহমিনা বেগমের এক কলিগ৷ সেটাই সূত্র৷ কলিগটি মালিক মাকে সুপারিশ করেছিল, ‘ওদের যা ভাবছ, মোটেও তা নয়৷ দেখবে, একেবারে আমাদের মতোই৷ কথাবার্তা চালচলন৷’ শোনা কথা এটা৷ তবে বাড়িওয়ালি বৃদ্ধা এই দম্পতিকে দেখে এবং কথাবার্তা বলে আশ্বস্ত হন৷ দিলওয়ার হোসেন বলেছিল, ‘গন্ডগোলটা কালচারের৷’ পরে রমলা একদিন চুপিচুপি প্ররোচনা দেয়, ‘মা ওইরকমই৷ মিনু, কাবাব খাওয়াবে?’ অর্থাৎ সে ওসব মানে না৷...

দিলওয়ার হোসেন দ্বিধান্বিত হেসে বলল, ‘তোমার দাদিমার কবরটার মতো পার্টিশনের আড়ালে রাখা যায়৷ কিন্তু...’

‘কিন্তু কী?’ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তহমিনা বেগম চুলে চিরুনি দিল৷ ‘কিন্তু-টিন্তু নয়৷ এমন চান্স ছাড়লে আর মাথা ভেঙেও পাবে না৷’ সে দ্রুততায় চিরুনি টানছিল, যেন এখনই বাইরে যাবে৷ কিংবা একটা ছটফটানি৷

‘না— মানে, কবরটার কথা বলছি৷’ দিলওয়ার হোসেন একটা কাগজে স্কেচ করতে থাকল৷ সে মোটামুটি ছবি আঁকতে জানে৷ চিত্রকর হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল ছেলেবেলায়৷ এঁকে বলল, ‘এই দেখ পজিশন৷’

খাটে স্বামীর পাশে বসে স্কেচটা দেখতে দেখতে তহমিনা বেগম আস্তে বলল, ‘পার্টিশন পরে হবে৷ এখানে অনেকটা স্পেস, দেখছ? একটু গার্ডেনিং করব৷ বড্ড ইচ্ছে করে, জানো?

‘রাতবিরেতে তুমি ভয় পাবে না তো!’ বউয়ের রঙিন ফুলবাগিচার ওপর একটু ছায়া দিল দিলওয়ার হোসেন৷ ঈষৎ দুষ্টুমি ছিল৷

কিন্তু তহমিনা বেগম শীতল কণ্ঠস্বরে বলল, ‘মিলাদ দেব৷ মৌলবি এনে কোরান পড়াব৷’

স্কুল শিক্ষক প্রেমবশে বউকে টানল৷ ‘কবরে যে আছে, সে যদি আমার মতো হয়?’ বলে চুম্বনের চেষ্টা করতেই বাধা পেল৷ বউ উঠে গিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল৷ চোখ জ্বলে গেল স্কুল শিক্ষকের৷

তহমিনা বেগম ঘরের কোনায় কেরোসিন কুকারের কাছে বসল৷ ‘চা-টা খেয়ে এখনই হাসুমিয়াঁর বাড়ি যাও৷ ওকে নিয়ে কাঠগোলায় যাবে৷ বায়না করতে হলে তাও করে এস৷’ এই কথাগুলিতে বিস্ময়কর উত্তাপ ছিল, অপ্রত্যাশিত এবং নতুন৷ অবশ্য শহরে একটি নিজস্ব বাড়ির স্বপ্ন তার আছে, দিলওয়ার হোসেন জানে৷...

এ ভাবেই তিন ডেসিমেল মাটি একটি দু’কামরার নিচু ঘর, একটি জীর্ণ কবর, একটি ডালিমগাছ সমেত কেনা হয়ে যায়৷ শিক্ষক দম্পতি সেখানে এসে ওঠে৷ অ্যাজবেস্টসের চালের তলায় সমতল কার্ডবোর্ডের মসৃণ সিলিং একটু আধটু ফাটল মেরামত ও রঙের কাজ পোড়ো বাড়িটিকে বাসযোগ্য এবং সুন্দর করে তোলে৷ মিলাদ মহফিল, টুপি পরা মুসলিমবৃন্দ এবং মাইক্রোফোনে এক বৃদ্ধ মৌলবির রাতভর পুরো কোরানপাঠ তাকে প্রচুর আধ্যাত্মিক শুচিতা ও রক্ষাকবচ দিয়েছিল৷

কলিগ রমলাকে এক প্রাকসন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফেরার সময় টেনে নিয়ে এল তহমিনা বেগম৷ তার অঙ্কুরিত ফুল বাগানটি দেখাল৷ রমলা কবরটি খুঁজছিল, সে শুনেছিল৷ ‘মিনা, কবর আছে বলেছিলে?’ সে দেখতে চাইল৷

তার কলিগ দ্বিধাহীন পা বাড়িয়ে বলল, ‘ওই তো!’

‘বাঃ!’

‘কী?’

‘ওই গাছটা!’

‘ডালিমগাছ’ তহমিনা বেগম উজ্জ্বল মুখে বলল, একটি ঘোষণা৷ ‘এপ্রিলে ফুল ফুটবে৷ তুমি ডালিমফুল দেখেছ কখনও? অসাধারণ! ফলের কথাও ভাবো!’

রমলা অবাক হয়ে বলল, ‘গাছটা তো কবরে৷ সেই ডালিম খাওয়া যাবে!’

হাসল তহমিনা বেগম৷ ‘জানি না! আগে তো ধরুক, তখন দেখা যাবে৷’

‘আচ্ছা শোনো৷’ রমলা নার্ভাস একটু হাসল৷ ‘তোমার— তোমাদের ভয় করে না?’

‘কিসের ভয়?’ বলে তহমিনা বেগম ঠিক করল, তার হিন্দু কলিগকে ব্যাপারটা বোঝানো উচিত৷ ‘মুসলমানদের ভূত-টুত হয় না৷ কেন জানো? আমরা আত্মাকে বলি রুহ৷ মৃত্যুর পর রুহ বন্দী থাকে ইল্লিন-সিজ্জিন নামে একটা জায়গায়— কোনও একটা গ্যালাক্সিতে বলতে পারো৷ সেখানে থাকে৷ তারপর ডুমস ডে-তে তাদের রেজারেকশন৷

‘কিন্তু মামদোভূত ডিকশনারিতে দেখেছি মুসলমানদের প্রেতাত্মা৷’

তার কলিগ খুব হাসতে লাগল৷ ‘ভুল ধারণা৷ এক্কেবারে ভুল৷ আমাদের ভূত হওয়ার চান্সই নেই৷’

‘তা হলে তোমরা ভূত মানো না বলছ?’ রমলা চার্জ করল৷ ‘কতজনকে দেখেছি, তারা মুসলমান৷ ভূত মানে৷’

তহমিনা বেগম সিরিয়াস হয়ে বলল, ‘ভূতটুত না, জিন৷ মুসলমানরা জিন মানে৷’

‘একই কথা৷’

‘উহুঁ! মানুষ মাটি থেকে তৈরি, আর জিন আগুন থেকে৷’ তহমিনা বেগম ব্যাখ্যা করতে থাকল৷ ‘আসলে কী হয় জানো? মানুষের মতো কোনও-কোনও দুষ্টু জিনও আছে৷ তারা পৃথিবীতে এসে দুষ্টুমি করে৷’

রমলা সন্দিগ্ধ দৃষ্টে কবরটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধরো যদি তেমন কেউ ওখানে ডেরা পাতে?’

তহমিনা বেগম জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘নাঃ৷ সে তুমি বুঝবে না৷ ওটা হয় না৷ কবর শুধু মানুষদের জন্য রিজার্ভ প্লেস৷’

‘কিন্তু কবরটা কার?’

‘জানি না৷’ খুব আস্তে কথাটি বলল তার কলিগ৷ তারপর হাত ধরে টানল৷ ‘এস, ঘরে গিয়ে বসি৷ ও এখনই এসে যাবে৷ আজ কী যেন মিটিং আছে৷’

কবরটা কার, ওই গোপন ও অস্বস্তিকর অনুসন্ধিৎসা শিক্ষক দম্পতির মনে থেকে গিয়েছিল৷ মফসসল শহরের এদিকটায় মুসলিমমহল্লা৷ কুটিরশিল্পী, রিকশাচালক, ঠিকে মজুর, কিছু খুদে দোকানদার, অফিস-আদালতের বেয়ারা, ‘মেহনতি জনগণ’ এবং কতিপয় উকিল ও ডাক্তার৷ যথেচ্ছ বৃক্ষলতার ভেতর ওতপ্রাোত, ঠাসাঠাসি, অসম্বন্ধ বাড়িসকল উঁচু বা নিচু৷ আর প্রহরে-প্রহরে মাইক্রোফোনে আজান৷ সব সময় নিঝুম পারিপার্শ্বিক হঠাৎ-হঠাৎ এভাবে গর্জন করে জানিয়ে দেয় একটি জোটবদ্ধ অস্তিত্বের স্বকীয়তা৷ এদিকে অনুসন্ধিৎসাটি খুব ভেতরে ঘাই মারে৷ কখনও পুরুষটি কখনও স্ত্রীলোকটি চমকে উঠে তাকায়, ‘কে ছিলে তুমি? পুরুষ না স্ত্রীলোক৷’ ডালিমগাছটি শেষ চৈত্রের বাতাসে ছটফট করে৷ ক্রমে বিন্দু-বিন্দু লালচে ফুলগুলি ফুটতে থাকে৷ ক্রমে রক্তাক্ত, যন্ত্রণা মনে হয়৷ কোন কোটি কোটি আলোকবর্ষের দূরত্বে ‘ইল্লিন-সিজ্জিনে’ একটি মানবাত্মা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে আছে ধ্বংসের দিন রোজ কেয়ামতের প্রতীক্ষায়, যখন সে নিজস্বতা ফিরে পাবে এবং আবার ব্যক্তি হয়ে উঠবে! তহমিনা বেগমের এরকম চিন্তা হয়৷ দিলওয়ার হোসেনের অন্যরকম চিন্তাভাবনা৷ মানুষটি কি দুঃখী ছিল, যার কবর ফাটিয়ে ওই রক্তাক্ত অভ্যুত্থান? আসলে সে একটু রোমান্টিক৷ জ্যোৎস্নার রাতে তার খুব আশা হয়, সে কাউকে দেখতে পাবে, পরনে সাদা কাফন৷ সে কিছুতেই ভয় পাবে না৷ কাছে গিয়ে বলবে, কে তুমি?

খালপোলের ওপর এক বিকেলে দেখা হয়ে গেল হাসুমিয়াঁর সঙ্গে৷ ‘মাস্টারসায়েবের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?’ বলে সে কপালে হাত ঠেকাল৷ মুখে দালালের মধুর হাসি৷

দিলওয়ার হোসেন বলল, ‘খোঁজ নিয়েছিলেন?’

‘কিসের?’ বলে সে হাতের একটা ভঙ্গি করল, আশ্বাসের৷ ভাববেন না৷ লোক মুখিয়ে আছে৷ বাজিয়ে দেখে তবে নিয়ে আসব৷ ইনশাল্লা! দোতলা বাড়ি করিয়ে দেবই৷ ওপরতলায় থাকবেন৷ সিনসিনারি দেখাবেন৷’

‘না, না৷’ শিক্ষক বিরক্ত হলেন৷ ‘কবরটার কথা বলছি৷’

দালাল কাঠের সাঁকো মচমচিয়ে হাসতে লাগল৷ ‘তাই! ও কিছু না৷ সেই পার্টিশনের সময়কার ব্যাপার! তখন আপনার জন্মই হয়নি৷ কে এক মিয়াঁসাহেব কালেক্টরিতে চাকরি করতেন৷ অপশন নিয়ে পাকিস্তানে যান৷ পরে এসে নারাণবাবুর বাবাকে বেচে গেলেন৷ জোর করে গছিয়ে যাওয়া বলতে পারেন৷ এ মহল্লায় তখন কেনার লোক নেই৷ সবাই ভাবছে পপুলেশন-এক্সচেঞ্জ হবে৷....না , না৷ কিছু ভাববেন না৷’

দালাল সিগারেট দিল৷ দিলওয়ার হোসেন কদাচিৎ খায়৷ নিল৷ ধোঁয়ার সঙ্গে আস্তে বলল, ‘কিন্তু কবরটা কার?’

হাসুমিয়াঁ প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে রোংরা জলেভরা খালের দিকে নাক ঝাড়ল৷ মুছে বলল, ‘হঠাৎ গরম পড়ে সর্দি৷ একটু বৃষ্টি-ফিস্টি হলে....’ আবার সে শব্দ করে হাসতে লাগল৷ ‘পার্টিশন করে দেবেন বলেছিলেন৷ দেননি?’

‘না৷’ বউয়ের চেয়ে শীতল কণ্ঠস্বরে বলল দিলওয়ার হোসেন৷

‘নতুন বাড়ি উঠলে দেবেন৷ ক হাত জায়গা ছাড়লে ক্ষতি কী?’ দালাল চোখে একটা ভঙ্গি করল৷ ‘হিসেব করলে নারাণদাকেও ছাড়তে হয়েছে কি না বলুন আপনি? টু পার্সেন্ট লেস৷ আমারও তাতে কিছু কমিশন লস৷ হিসেব করুন৷’

অসহিষ্ণু স্কুলশিক্ষক বলল, ‘আহা! কবরটা কার?’

দালাল অগত্যা সিরিয়াস হল৷ ‘তা কে বলবে? মহল্লায় খুঁজতে হয় বুড়োটুড়োদের কাছে৷ তবে বাড়ির উঠোনে কবর৷ খুব... .খুবই আপনজন ছাড়া...’ একটু নড়ে উঠল হাসুমিয়াঁ৷ ‘বরকত ডাক্তার মহল্লার পুরনো লোক৷ জিজ্ঞেস করবেন তো৷’

বাড়ি ফিরে দিলওয়ার হোসেন দেখল, এক বুড়ি বারান্দার নিচে বসে থালা-হাঁড়ি ধুচ্ছে৷ মাথার কাপড় টেনে দিল নোংরা হাতে৷ তা হলে কাজের লোক পাওয়া গেছে৷ তারপর ঘুরেই একটু চমকে উঠল৷ তহমিনা বেগম কবরের খুব কাছে দাঁড়িয়ে ফুলবতী ডালিমগাছটি দেখছে৷ ‘ওখানে কী করছ?’— শুনে সে মুখ ফেরাল৷ মহল্লার গাছপালার ফাঁক গলিয়ে একটি নরম গোলাপি আলোর রেখা পলকে সেই মুখে এসে বিঁধল৷ যখন সে স্বামীর কাছে ফিরে আসছে, তখন তার স্বামী বুঝতে পারছিল না, চোখদুটি কি ভিজে দেখেছে, না ভুল দেখা?

তহমিনা বেগম একটু হাসল৷ গলাটা ঈষৎ ধরা৷ ‘নানি পাতিয়েছি৷ তুমিও কিন্তু নানি বলবে৷ বুড়ো মানুষ৷ দুবেলা এসে যতটুকু পারে, সাহায্য করবে৷’

মহল্লায় কাজের লোক পাওয়া কঠিন৷ ঝিয়ের কাজ কেউ করতে চায় না৷ কুটিরশিল্প, নিজেদের ঘরকন্না এসবেই দম ফেলার নাকি সময় নেই৷ অথচ একজন কাজের লোকের খুব দরকার হয়েছে ইদানীং৷ তহমিনা বেগমকে ডাক্তার বলেছেন, ভারী কাজকর্ম যেন না করে৷ ঝুঁকে কিছু করাও ঠিক নয়৷ তবু কুকার জ্বেলে চা করল৷ সুজি ও ডিম ভাজল৷ দিলওয়ার হোসেন যখন অন্যমনস্ক হাতে সেগুলি মুখে তুলছে, তখন তহমিনা বেগম বলল, ‘নানির কাছে সব শুনলাম, জানো? এক ভদ্রলোক এখানে...’

‘জানি৷ হাসুমিয়াঁ বলছিল৷ পার্টিশনের সময় বেচে দিয়ে যান নারাণবাবুর বাবাকে৷’

‘ভ্যাট!’ তহমিনা বেগম বলল৷ ‘গনি উকিলকে৷ টিনের চালে মরচে ধরেছিল৷ ফেলে দিয়ে অ্যাজবেস্টস চাপায়৷ গোডাউন করেছিল৷ চোরের জায়গা৷ শেষে নারাণবাবুকে বেচেছিল৷ তাই না নানি?’

বুড়ি আস্তে বলল, ‘হুঁ৷ এ মহল্লায় সব খালি জায়গা নারাণবাবু কিনেছে৷ কে জানে কী মাথায় আছে!’

দিলওয়ার হেসেন বুড়ির দিকে তাকাল ‘কবরটা কার, জানো?’

‘সন্ধেবেলা ওসব কথা থাক৷’ ‘বুড়ি উঠে দাঁড়াল৷ সেই মুহূর্তে মাইক্রোফেনে আজানের শব্দ৷ ‘আল্লারসুলের নাম করো৷ আমি আসি, নাতনি!’ বলে বুড়ি বেরিয়ে গেল৷ সম্ভাষণে কোমল আত্মীয়তা ছিল৷

তহমিনা গলার ভেতরে বলল, ‘বলব৷ পরে শুনো৷’...

এ রাতে পাশাপাশি দুটিতে চুপচাপ শুয়ে ছিল৷ হাতে হাত, আঙুলে আঙুল৷ নিষ্পন্দ দুটি মানবশরীর৷ একসময় স্ত্রীলোকটি বলল, ‘শোনো!’ সে কনুই বালিশে রেখে উঁচু হল৷ ফিসফিসিয়ে বলতে থাকল, ‘যদি আমারও তেমন কিছু হয়...বাচ্চা হতে গিয়ে যদি আমিও অমনি করে...’ সহসা সে পুরুষটির বুকে মুখ গুঁজে দিল৷ ‘তুমি বলো! কথা দাও৷ আমাকেও উঠোনে কবর দেবে৷’ সে ভালবাসার প্রার্থনায় বা একটি স্বপ্নের ব্যর্থতা আশঙ্কা করে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল৷ বারবার বলছিল, ‘কথা দাও, তুমি মুখ ফুটে বলো! ‘আমার কবরে অমনি ডালিমগাছ...’

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%