ঐশ্বর্যের শক্তি

অশোক দাশগুপ্ত

না, খুব দূরের কোনও জায়গা নয়— অতি সহজ, মানে যাওয়া আসার খুব সুবিধা— বলছি পুরীর কথা৷

বহু লোক আসে— প্রতিদিনই৷ সমুদ্র এখানে দেখার মতো, স্নানের মতো এবং কখনও কখনও ডুবে মরবার মতোও৷

খরচ কম, যাতায়াত বলতে এক রাত্রির যাওয়া ও আসা, অজস্র হোটেল, প্রতিদিনই বলতে গেলে একটা হোটেলের নতুন নতুন বিজ্ঞাপন দেখা যায়৷

এমনিই এক হোটেলে তিন বন্ধু একদিন এসে নামল৷

মাঝারি হোটেল, যারা এসেছে তারাও সেই স্তরের লোক৷ ভাল আপিসে চাকরি করে, কিন্তু বয়স বেশি নয়, সবই ত্রিশের গণ্ডি পার হওয়ার উজ্জ্বল আশ্বাস আছে, সেই জন্যেই বিয়ে করছে না, সে অবস্থায় এলে মেয়ে আরও ভালই পাবে, মানে উচ্চস্তরের মেলামেশা করা যাবে৷

ছেলেগুলি সবাই ভদ্র৷ এদের সঙ্গে কলেজেরও আলাপ আছে৷ কলকাতায় দুজন নিজ নিজ বাড়িতে থাকে৷ এই নবেন্দু ছেলেটিই একটা ভাল মেসে থাকে৷ তবে সে ঠাঁই নেই বলে নয়— ওর বাবা-মা দুজনই গত হয়েছেন, দাদা আছেন আমেরিকায়, তবে ফিরে আসবে কিনা সন্দেহ৷ একা অত বড় বাড়িতে থাকবে কী করে? নবেন্দুর দিদি আছেন, তিনি কর্ণাটকে থাকেন৷ সে জামাইবাবুরও বিস্তর পয়সা, ওখানে তিন চারটে বাড়ি আছে৷ সব বুঝেই ভাড়া দিয়েছে, বন্দোবস্ত আছে ট্যাক্স ইত্যাদি ওদের দিতে হবে, নবেন্দুর যাতে না ঝামেলা হয়৷

এরাই এসে মাসখানেক না হলেও বেশ কিছুদিন থাকবে— এই মনে করেই এসেছে৷

এ হোটেলটাও ভাল পাওয়া গেছে৷ ব্যবহার ভাল৷ আহারাদিও বরং কিছু বেশি৷

একটি লাউঞ্জ মতো আছে, ভাল ভাল বেতের চেয়ার, ফুলের টব ঘেরাও৷ বসে থেকেও আরাম লাগে৷

নবেন্দুদের দিন তিনেক যেতে ওদের খেয়াল হল ব্যাপারটা৷ একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক আর একটি সুশ্রী যুবতীই বলা চলে— মনে হয় পিতা আর পুত্রী৷ এরা দুজনেই পাশে বা কাছাকাছি বসে থাকেন— কিন্তু কথা বলে খুব কম৷ মেয়েটি বসে যেন শুধুই সমুদ্র দেখে৷ বাবার মুখেও শান্তি বা আনন্দ নেই৷ মধ্যে মধ্যে বাবা কীসব বলেন? মেয়েটি বোধহয় উত্তরও দেয় না৷ মনে হয় বাবা চান সমুদ্রের কাছে ঘোরা বা অন্তত কাছে বালির ওপর কোথাও বসে থাকা৷ ভাবটা মনে হয় মেয়েটা তিতিবিরক্ত হয়ে হঠাৎই বেরিয়ে সেই সমুদ্রের বালির ওপর বসে পড়ে৷ কিন্তু ওই পর্যন্ত, বাবাকেও বসে থাকতে হয়, কথাবার্তা হয় না বলেই মনে হয়৷

ব্যাপারটা নবেন্দুর চোখে পড়ল৷

এ আবার কি? বেড়াতে এসে মন গোঁজ করে বসে থাকা!

ঝগড়া-ঝাঁটি? বাবা আর মেয়ে যদি হয় কতদিন বা ঝগড়া থাকবে৷

না, নবেন্দুর মনে হল একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে৷

পরের দিনই বলতে যাবে— হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ওই মেয়েটি যে ওর চেনা!

আর এসব ক্ষেত্রে, দ্বিধা করার লোকও নবেন্দু নয়৷

বাকি দুজন কিছু বলার আগে নবেন্দু একেবারে সামনে এসে বললে, ‘আরে, এ কি! আপনি! এখানে এসেছেন তা অমন চুপ করে বসে আছেন কেন? আমাকে চিনতে পারছেন না? আপনি বাংলায় থার্ড হয়েছিলেন, আমি কিন্তু হিস্ট্রির স্টুডেন্ট ছিলুম— কিন্তু দেখা হত প্রায়ই৷ আপনাদের ওখানেও আড্ডা দিতুম৷ আপনার সেই বন্ধু— তাকে নিয়ে—৷ আচ্ছা সেকথা থাক৷ চলুন চলুন— আজ আপনাকে নিয়ে যাবই৷’ বলে বৃদ্ধের দিকে চেয়ে বললে, ‘আপনিও চলুন না, স্নান না করেন একটু দেখবেন বসে৷’

এইবার সেই মেয়েটির টনক নড়ল যেন৷

একটু বিব্রতও মনে করল৷

তারপর সামলে নিয়ে বললে, ‘না, ওসব আমার ভাল লাগে না৷’

এবার নবেন্দুও একটু বোধহয় চটে গেল৷ বললে, ‘হ্যাঁ, আমি জানি কেন আপনার ভাল লাগে না৷ সবই জানি— বা এখন মনে পড়ছে৷ ওই যে সলিল! দেখুন, সে পাপ যদি চলে গিয়ে থাকে তো ভালই৷ চলুন চলুন, আমি সহজে ছাড়ব না৷ এখানে এসেছেন— ওসব সেই গোঁজ হয়ে বসবেন কেন৷ আমি তো আপনার বন্ধুই বলতে গেলে, চলুন বন্ধু৷’

একটু বিব্রত হয়েই বাবার মুখের দিকে চাইল৷

বাবা— পরে শুনেছিল নবেন্দু, প্রদোষ ব্যানার্জি— তিনিও বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ— চল না মা৷ তুই যেতে চাস না বলেই আমি যেতে পারি না৷’

কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ভালই লাগল৷ একটু অন্যমনস্ক হতেই যেন একটা ভাঙা ঢেউ কাপড় ভিজিয়ে দিয়ে গেল৷

‘এই তো, বেশ হয়েছে, জল যখন ভিজিয়ে দিয়েছে— আপনি আর দ্বিধা করবেন না৷ চলুন চলুন, একটু নাবুন—’

‘আমার ভয় করে৷’ বলে ফেলল অরুণা৷

‘কিছু না, কিছু না৷ আমরা তিনজন তো, ঘিরে থাকব— আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে চান করুন৷ তারপর প্রদোষবাবুকেও বলল, ‘আসুন না, আমরা তো আছি৷’

বোধহয় মনে হল, এরা যদি মেয়েকে একটু সান্ত্বনা দেয় তো বেঁচে যাই, ওদের দলে থাকাই উচিত৷

তিনি কোনওমতে হাঁটু পর্যন্ত ভিজিয়ে জল না হোক বালি খেতে লাগলেন৷

স্নান করে ফিরতে দেরি হল৷ বালি তেতেছে, অরুণা একটু ভুরু কোঁচকালো, চটিটা আনা হয়নি, এই বালি তাতিয়ে যাওয়া—

যেন নিমেষে নবেন্দু বললে, ‘চলুন, আমি আপনার আগে আগে যাচ্ছি— আমি দেখুন কেমন বালি কাটিয়ে কাটিয়ে যাচ্ছি, আপনার পা সেখানে পড়বে অত আর তাত লাগবে না৷’

এর ওপর কথা চলে না৷

যখন হোটেলে এসে পৌঁছল— প্রদোষবাবু আড়ে দেখলেন, মেঘ অন্তত ঈষৎ কেটেছে৷

বিকেলে চা ইত্যাদি খাওয়ার পর পাছে টেনে নিয়ে যায় বলে অরুণা আর বেরোতে চাইল না৷ কিন্তু একটু পরেই তিন বন্ধু একেবারে এ ঘরে দরজার কাছে এসে হাঁক দিল, ‘ওকি, এখনও বেরোননি? চলুন চলুন, একটু বেড়িয়ে আসবেন৷ ওই দিকটায় যাব, কখনও দেখিনি— গভর্নরের প্রাসাদ পর্যন্ত দেখা আছে, শুনেছি ঝাউবন পেরিয়ে ওদিকে নুলিয়ারা ওখানে থাকে অনেকে— কিন্তু এখন তারা জলে নাবে না, আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারব!’

তিনজনে একসঙ্গে এসে ঘিরে দাঁড়ালে বিব্রত হতে হয় বৈকি৷

প্রদোষবাবুও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, ‘হ্যাঁ মা চল না, এ কদিন কিছু দেখা বা ঘোরাও তো হল না৷’

এইবার যেন মেঘ কাটল৷

একটু একটু করে যেন অরুণোদয় হচ্ছে৷

কথাবার্তা বেশ চালাচ্ছে— অবশ্য একটু একটু করেই৷

নবেন্দুও তাড়া দিতে চায় না৷

একদিন জোর করেই মন্দিরে নিয়ে গেল৷ তারপর এখানে যা যা দ্রষ্টব্য— নিয়ে যায় দেখাবার জন্য৷ প্রদোষবাবুকে সঙ্গে নেয়৷ আরও যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন৷ তিনিই বেশি উৎসাহ দেন৷

এখানে ওদিকে সকলেই যাচ্ছে এক একদিন করে বেরোচ্ছে, কোণারক, ভুবনেশ্বর, যাবার জন্যে৷ প্রদোষবাবু বললেন, ‘যাবে নাকি— তোমরা?’

‘না, কাকাবাবু ওইভাবে যাব না৷ ওতে ভাল করে দেখাও হয় না, আর সেই সাতটা থেকে বেরিয়ে রাত দশটায় আসা— ও আপনারা পারবেন না৷ আমি একটা গাড়ি ঠিক করেছি, আমরা তিনজন— আপনারা— ঠিক হয়ে যাবে৷ আমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারব৷’

শতদল যেন পাপড়ি মেলল৷

অরুণার কথাবার্তা সাধারণ হয়ে উঠল৷ হাসিঠাট্টাও করে, যেন এখন কোথাও যাবার থাকলে উৎসাহ দেয় বেশ৷

কিন্তু তিনজনের চাকরি বুঝি যাবে এবার৷ দুই বন্ধু বলে, ‘কিরে, আমাদের চাকরি চলে যাবে যে৷ বেশি হয়ে যাচ্ছে৷’

নবেন্দুরও মনে পড়ে যেন এবার৷

‘হ্যাঁ, অন্যায় হয়ে যাচ্ছে বটে৷ চাকরি থাকবে, তবে একটু দাগ পড়বে৷ ...কী জানিস, মেয়েটা তোরা দেখছিস, সত্যিই সুন্দরী না হলেও, মনে গেঁথে যাবার মতো৷ ওটা কি জানিস— সেই যে বলে না— হায় মিষ্টি পাকা আম দাঁড়কাকে খায় এ তাই৷ ওই ছোঁড়াটা— আমাদেরই দেখলেও যেন বিষ হয়ে উঠত, কী করে যে ওর প্রেম হল কে জানে? রোগা, কালো, লম্বা ধনুকের মতো চেহারা৷ দিনরাত সিগারেট খায়— দুই আঙুলে বিশ্রী দাগ হয়ে গেছে৷ লেখাপড়া? তিন তিনবার ফেল করল৷ ওর প্রেমে পড়ল— একটু যেন অ্যাবসার্ড বলে না৷ কিন্তু আমাদের বিশী স্যার বলতেন প্রায়ই, ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে ছেলেমেয়েগুলো ওই হ্যারিসন রোডের মোড়ের মধ্যে এসে দাঁড়ায় তো দেখি— ভাল মেয়েগুলোকে এই অখাদ্য ছোঁড়ার প্রেমে পড়ে হামেশা দেখি তো৷ আর ভাল ছেলেগুলোর কপালে নচ্ছার মেয়েগুলো আসে৷

এই ঘটনার পর আকর্ষণ তো থেকে যাবেই৷

তবে নবেন্দু ওকে যে প্রায় আত্মসাৎ করেছে সেটা বাকি দুই বন্ধু বুঝে নিয়েছে৷ তাতে ওরা খুব ঈর্ষাও বোধ করে না৷ বাকি দুজনের ঘরবাড়ি আছে৷ তাঁরা কে কেমন নেবে তা বলা যায় না— নবেন্দু তো একাই৷

নবেন্দু প্রদোষবাবুর কাছ থেকে এবার সব ঘটনাই জেনেছে৷ ওই ছোঁড়া, মদ খায় তাও জানা হয়ে গেছে৷ প্রদোষবাবুর একটিমাত্র সন্তান৷ স্ত্রী মারা গেছেন— এই সবেধন নীলমণি— তাকে উনি কোনওমতেই ওর হাতে মেয়েকে দিতে দেবেন না, ওই নচ্ছারের হাতে৷ শেষ পর্যন্ত ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দিলেন, বন্দোবস্ত হল কলকাতায় ওই রবীন আর আসবে না, অন্তত দশ বছর আসবে না৷ সেইরকম লেখাপড়া হয়েছে৷

প্রদোষবাবু এবার নবেন্দুকে একেবারে নিজের ছেলের মতো দেখছেন, অরুণাও ক্রমশ যেন উদগ্রীব হয়ে থাকে— কখন নবেন্দু আসবে৷

এরপর যা হওয়া উচিত তাই হল৷

নবেন্দু একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনে নিল, আসবাব ইত্যাদিও৷ অরুণা বলেছিল, ‘আসবাব আমাদের বাড়িতে যথেষ্ট— কেন অত খরচ করছ?’

‘না, না, কবে কোন দিন খোঁটা দেবে৷ এ আর কত, তা নিয়ে মাথা ঘামিও না৷’

বিবাহও হল, বন্ধুরা কেউ ঈর্ষিত হল, কেউ বা খুশি৷

একটি ‘কাজের লোক’কেও প্রদোষবাবু এনে দিলেন৷ একটা ভাল সংসারের যা কিছু থাকা উচিত তা সব খুঁটিয়ে দিলেন৷

এবার প্রদোষবাবু আশা করেছিলেন— একটি সন্তান এ সংসার পূর্ণ করে দেবে৷ নবেন্দুরও যে সে আশা ছিল না তা নয়৷ কিন্তু অরুণা তাতে বাদ সাধল৷ বললে, ‘না বাপু, দু-তিনটা বছর যেতে দাও, এরই মধ্যে ন্যাঞ্জারী হতে রাজি নই৷’

আর কিছুদিন পরে এখনকার ভাষায় বলে ‘বোর’ তা কিন্তু হচ্ছে৷ তবে সংসার পূর্ণ হতে দিল না, নিজেই একটা চাকরি জুটিয়ে নিল— একটা ভাল চাকরি৷

‘হ্যাঁ রে, কী দরকার৷ না না ও করিস না৷’

অনেক বাধা দিলেন বাবা৷

কিন্তু অরুণা চিরদিনই জেদি, বোধহয় এক সন্তান বলেই— বাবাকে স্বামীকেও বোঝাল, এ কি আর চিরকাল করব! ঠিক সময়ে দেখো সংসারের কোনও অসুবিধে হবে না৷’

তবে এখানে একটা সংসার চালানো দরকার৷

এমনি ঠিকে লোক— সে কী করবে কে জানে৷

প্রদোষবাবুই খুঁজেপেতে একটি মেয়েকে নিয়ে এলেন— জানাশুনো মেদিনীপুরে বাড়ি, ওদের সবাইকেই চেনেন, ষোলো সতেরো বছর বয়স, ঠান্ডা শান্ত মেয়েটা৷ রঙ ময়লা, তবে মুখ চোখ ভাল৷ কথা কম বলে, তবে হাসতে পারে৷ নামটা ‘অন্নপূর্ণা’— প্রদোষবাবু বললেন ওকে বরং ‘খুদু’ বলো৷

ঠিক কি করতে হবে সেটা এরা বুঝিয়ে দিলে— আর কোনও অসুবিধে রইল না৷ রান্নাও কিছুটা জানে, তবে ওকে বোঝালেন প্রদোষবাবু৷ ধারাটা বুঝলে সেদিকেও কোনও উদ্বেগ রইল না৷

সুখে-শান্তিতে জীবন-তরী ভেসে যাবার কথা৷ তা হল না৷

অরুণা ও প্রদোষবাবুর শনি এসে হাজির হল৷

দলিল ইত্যাদি যে কাগজপত্র হয়েছিল— তা অরুণা আগে জানত না৷ পরে জেনেছে৷

প্রদোষবাবু ব্যাকুল হয়ে উঠলেন৷ পুলিস, মকদ্দমা— এসব করা মানে আরও ইতরতা করা৷ প্রদোষবাবু এবারেও টাকা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলেন৷

বোঝা উচিত ছিল প্রদোষবাবুর— এ লোক কিছুই মানবে না৷ শুধু শুধু টাকা খরচ করা৷

টাকাটা হস্তগত হল— কিন্তু সেই আরও কদর্য— কুৎসিত ব্যাপার হল৷ ইতিমধ্যে যে সেই প্রেম— যা লোককে বললে বুঝবে না— ‘এ কেমন প্রেম— যাই আসি’ বলতে বলতে এক সময় সেই প্রেমাস্পদের সঙ্গেই অরুণাও চলে গেল৷

হাহাকার করলেন প্রদোষবাবু৷

কাঠ হয়ে গেল নবেন্দু৷ শুধু বললে, ‘আপনি বারবার ঘুষ দিতে গেলেন কেন? সব কিছু টাকায় ভাল হয়ে যায় না৷’

কিছুদিনে যেন সামলে নিলেন প্রদোষবাবু৷ তারপর বললেন, ‘তুমি এমনভাবে থাকবে কেন, তুমি আর একটা বিয়ে করো৷’

খুব যেন কঠোর কণ্ঠে নবেন্দু বলল, ‘না, আর বিয়েতে আমার রুচি নেই, তাছাড়া আপনি জানেন না, আমাদের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়েছিল৷ তাকে আপনি পাবেন কোথায়? না, ও অভিনয়ে আর দরকার নেই৷’

প্রথমটা বড় শূন্য বোধ হল৷ বন্ধু আত্মীয় সবাই শুনল— সেইটেই বড় কথা৷ কোথাও দূরে যেতে পারলে ভাল হত৷

কিন্তু এ ‘দাগ’ কি মুছে যাবে!

থাক, সহ্য করাই ভাল৷ আপনিই এ জ্বালা জুড়িয়ে যাবে৷

এতদিন অন্নপূর্ণার দিকে ভাল করে তাকায়নি নবেন্দু৷

তবে এটা দেখেছে বৈকি— সেবা করতে পারে— অস্খলিত সেবা৷ সংসারটা মাথায় করে রেখেছে৷

এখন দেখছে৷

সেবা বলে শুধু নয়— খুদু যে ওকে দেবতা বলে মনে করে সেটা বুঝল৷

কখনও কখনও হঠাৎ ওর দিকে চাইলে দেখে— তার দিকেই চেয়ে আছে৷

আরও দেখে, কখন কি দরকার তা যেন সমস্ত আগে থেকেই ঠিক করে রাখে৷ আরও দেখে একদিন, নবেন্দুর জুতো পর্যন্ত পালিশ করতে শিখেছে৷

যেদিন ওদিকে চেয়ে দেখল নবেন্দুর জুতোটাকে গাল দিয়ে চেপে বসে আছে তখন ওকে টেনে পাশে নিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল৷

তাতেও বাধা দিল না খুদু৷ লজ্জা প্রকাশ করল না, একেবারে যেন সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিল৷ বিয়ের কথা তুলল না, কী হবে ভবিষ্যতে তাও বোধহয় ভাবল না৷

এতটা যে ভালবাসা, নবেন্দু বোঝেনি, দেখেওনি বোধহয়৷

আজ বুঝল, অরুণার প্রেম নিয়েই যথেষ্ট ভেবেছিল— আসল প্রেম বা ভালবাসা এই প্রথম বুঝল৷

কাউকে কিছু বলল না৷ নবেন্দুর ফ্ল্যাট ওপরে— কী হচ্ছে তাতে কৌতূহল থাকলেও সবটা বুঝতে পারেনি৷ যাওয়া আসা খুদুর ঠিক দাসীর মতোই থাকে৷ যখন নবেন্দু ডাকে বা টেনে আনে ঠিক সেইভাবেই যেন সমস্তটা মিশিয়ে দেয়, বোধহয় কৃতার্থ ভাবে৷

নবেন্দু এই জীবন কাউকে বুঝতে দেয়নি৷ প্রয়োজনও হয়নি৷ হঠাৎ কেউ এলে বন্ধুবান্ধব দাসী বলেই জানে, সেইভাবেই দেখে৷

আর সমস্তটাই সে দাসী বলেই মনে করে, বোধহয় ভাবে এইটেই তো প্রাপ্য তার৷ মালিকের সেবা করবে, যদি বলে চলে যাও— ওকে যেতেই হবে৷

এইভাবেই চলছিল, সেইভাবেই রেখেছিল৷ তবে ক্রমশ আর সেভাবে চলতে পারল না৷

যত দেখছে ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে৷

এখন এই চিন্তাই ওর বেশি— সেই রেজিস্ট্রিটা কী করে নাকচ করা যায়৷ তা নিয়ে বেশি তোলপাড় করার ইচ্ছা নয়৷ একটু ভেবে চিন্তা করে এক ভাল উকিলকে ধরাই ঠিক করল৷

খুদুকে সে গৃহিণীর পদবি দেবেই৷ যা পেয়েছে তার কিছুমাত্রও যদি ঋণ না শোধ করে তাহলে তাকে নিজেই নিমকহারাম ভাববে৷ লেখাপড়া করেছে, ভেবেছে— সাধারণভাবে একদিন ফেলে চলে যাবে না৷

গোপনে নিজে নিজে অ্যাটর্নি বা উকিল খুঁজতে চেষ্টা করতে থাকে৷

কে জানে, মনে হয় সন্তানও আসতে পারে৷

যে প্রেমাস্পদকে অরুণা প্রেমিক বলে ভেবেছিল— সেটা টাকা পেয়ে ফেলে চলে যাওয়াতেও চৈতন্য আসেনি৷

এবার বুঝল৷ প্রেম তো নয়ই৷ সে প্রেমের যোগ্য ধারণাও তার নেই৷ মানুষও নয়— এমনকী কোনও জন্তুরও যোগ্য নয়৷

অবস্থা যখন প্রায় চরমে পৌঁছল তখন আর থাকতে পারল না, বাবার কাছেই চিঠি পাঠাল৷

অবস্থা যে এইরকমই হবে তা প্রদোষবাবু জানতেন— শুধু ঠিকানাটা পাননি, এবার আর দ্বিধা করলেন না, আবারও গিয়ে, শেষপর্যন্ত আবারও বেশ কিছু টাকা দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসতে হল৷

অরুণা কিছুই করল না৷ কাউকে কিছুই বলল না৷ শুধু ঘরে বসে কাঁদতে লাগল৷

বাবাকে বলেছিল, ‘কাউকে এখানে আসতে দিও না, আমি আর কাউকে মুখ দেখাতে চাই না৷ তোমার জন্যেই আমি আছি, এর পরেও তুমি হয়ত আমার জন্যে আকুল হবে তবে আমি সত্যিই বলছি— আমার আর বাঁচবারও ইচ্ছা নেই, মুখ দেখানোরও না৷ আমি জেনেছি— আমার মতো পশু কেউ নেই৷ বোধহয় পশুর চেয়েও বড়৷

প্রদোষবাবুর এই একটিই সন্তান৷ তিনি এর মধ্যে অনেক টাকা করেছিলেন ব্যবসায়৷ স্ত্রীর মৃত্যুর পর এই মেয়ে নিয়েই আছেন৷ মেয়েই ধ্যানজ্ঞান৷ সুতরাং আবারও টাকা দিয়ে কিছু করা যায় কিনা সেই চেষ্টা করতে চাইলেন৷

সেটা নবেন্দুর জানার কথা নয়৷ সে যেমন থাকে তেমনিই আছে৷ খুদু ছাড়া একমুহূর্ত থাকতে চায় না এখন, বিকেলে ছটার মধ্যে এসে যে ঘরে ঢোকে আর কোথাও যায় না৷ আসবার সময় একেবারে বাজার করে আনে, খুদুর জন্যে খাবার মিষ্টি নিয়ে আসে, এক আধদিন ফুল নিয়ে আসে৷ তারপর ওই দুটি প্রাণী নিজেদের নিয়ে শুধু থাকে— পৃথিবীর আর কিছুই তাদের মনে পড়ে না৷

এর মধ্যেই একদিন বাজার করে এসে যখন কড়া নাড়তে গেল— দেখল খোলাই আছে৷ বাড়িতে আলো জ্বলেনি— দরজাটা ভেজানো ছিল৷ বোধহয় হাওয়ায় খুলে গেছে৷

পাগলের মতো ডাকতে লাগল নবেন্দু, ‘খুদু খুদু, কোথায় গেলে৷ অ খুদু!’

অন্ধকার হয়ে আছে— এবার আলো জ্বালল৷ দেখল ঘটনা৷

শোবার ঘরের ওপর একরাশ টাকা পড়ে আছে৷ কাঁচা টাকা— অনেক, অনেক৷ তারপরই চিঠিটা দেখতে পেল৷

একটা চিঠি আছে, আর কিছু না পেয়ে একটা বড় তালা দিয়ে চাপা দিয়েছে৷

খুদুকে পড়া ও লেখার ব্যবস্থা করেছিল— অরুণার সময় থেকেই৷ ভাল না লিখতে পারলেও চলনসই করে নিয়েছে৷

সেই লেখা পড়া যায় এখন, অসুবিধা হয় না৷

খুদু লিখেছে, ‘বৌদিদি এখানে এসেছেন, বাপের বাড়িতেই আছেন৷ তোমার জন্যে খুব কাঁদেন সবসময়৷ তুমি ওঁকে শান্তি দিও, শান্তি দিতে পারবে৷ মেসোমশাইও খুব কাঁদেন, তাঁর ওই একটি মেয়ে৷ আমি স্বীকার পেয়েছি, আমি চলে যাব৷ তিনি তখনই ত্রিশ হাজার টাকা আমার হাতে দিয়ে— হাত ধরেই বললেন, তুই মা যখন যা বলবি, যখন দরকার হবে আমাকে চিঠি লিখবি, তোর কোনও অসুবিধা হবে না৷ তা অত টাকা আমি কি করব, তুমিই রেখো৷ আমাকে অন্যকিছু ভেবো না— দিদিও তোমাকে ভালবাসেন, তুমিও বাসতে৷ তোমরা ভালভাবে থেকো৷ তুমি এবার শান্তি পাবে৷’

চিঠিটা বুঝতে দেরি হল৷

এমন বোঝেনি, কখনও ভাবেওনি৷

এ কী হল৷ কী করলে খুদু, তুমি যে আমার প্রাণ৷ আর মনে হচ্ছে তোমার পেটে আমার সন্তান যে!

এত কাল পরে এই প্রথম নবেন্দু প্রায় হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল৷

না, আজকের রাতও কাটাতে চায় না৷ সময় নেই, সময় নেই৷ খুদুকে চাই যে!

মুখে একটুও জল দিল না৷ উদভ্রান্তের মতো চলল শ্বশুরের কাছেই৷

যেন হিংস্র পশুর মতোই এসে দাঁড়াল নবেন্দু৷

সেই টাকার তোড়া ভাল করে সাজিয়ে তুলতে পারেনি, একটা বড় রুমালে করে নিয়ে— এসেছে পুঁটুলির মতো৷

সেই টাকাগুলো একেবারে শ্বশুরের গায়ের ওপর মুখের ওপর যেন ছুঁড়ে মারল৷ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল৷

ঈষৎ বিহ্বলতা কাটাতে যাবে— সে সময় দিল না নবেন্দু৷

‘আপনি অনেক টাকা করেছেন না? অনেক টাকা৷ তাই ভেবেছেন পৃথিবীতে টাকায় সব কিছু করা যায়৷ মেয়ে পশুর ওপর পড়েছিল, তাদের টাকা খাইয়ে বারবার মেয়েকে উদ্ধার করেছেন৷ বারবার৷ এখন এই অবোধ মেয়েটাকেও টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছিলেন৷ ছিঃ৷ সে লোক সে মেয়ে নয়, তাই ওই টাকা আপনার মুখে ছুঁড়ে দিয়ে গেল৷ সে অনেক, অনেক বড় আপনাদের মধ্যে৷ টাকাতে সব হয় না, এবার সেইটে ভাবতে চেষ্টা করুন৷ আমি চললুম৷’

খুব আকুল হয়ে কি বলতে গেলেন প্রদোষবাবু, বাধা দিয়ে বলল নবেন্দু, ‘না আমার আর সময় নেই৷ এখন আমার ধ্যানজ্ঞান শুধু রইল খুদুকে খুঁজে বার করা৷ যেমন করে হোক তাকে চাই৷ আর দাঁড়াতে পারব না৷’

বলতে বলতে পাগলের মতোই ছুটে বেরিয়ে গেল৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%