বনধ-এর ১০ দিন

অশোক দাশগুপ্ত

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার৷ আশ্বিনের মাঝামাঝি৷ আজ নিয়ে পাক্কা ১০ দিন শুভব্রতদের ফ্ল্যাটের পায়খানা বন্ধ হয়ে আছে৷

গেল মঙ্গলবারের আগের মঙ্গলবার সকাল বেলা৷ বাজার যাবার আগে, দুটি বিস্কিট-সহ চা খেতে খেতে, এ-সপ্তাহটা কেমন যাবে শুভ জেনে নেয়, সেই মর্মেও সেদিনও তার মেশরাশিতে সবে চোখ রেখেছে, এমন সময় ৭ বছরের মেয়ে পিঙ্কি বাথরুম থেকে এসে জানাল, ‘বাপি, চেন টানতে আজ প্যানটা জলে ভরে গেল৷’

শুভ ধরা গলায় বলল, ‘যাঃ৷’

‘হ্যাঁগো, এখনও ভরে আছে৷ তুমি দেখে এসো৷’

এমন কথা শুভ আগে কখনও শোনেনি৷ কোম্পানির কান মুলে শেষ পর্যন্ত এবার ৮% বোনাস আদায় হয়েছে, গত দেড় মাস ধরে অষ্টপ্রহর ‘দাও দাও’ আর ‘দিতে হবে’ করতে করতে গলা বসে গিয়েছে তার৷ শেষ পর্যন্ত আজ আকাশ যখন সত্যিই নীল, পাকা তালের মতোও একখণ্ড মেঘ নেই কোথাও, যখন সে ধরেই নিয়েছে যে অন্যান্যবারের মতো এবারের পুজোটাও তাহলে ভালই কাটছে— হেন সময়, জীবন দেবতার এ কী কৌতুক!

শুভদের পৈতৃক বাড়ি আহিরিটোলায়, জয় মিত্র স্ট্রিটে৷ ৫ বছর আগে কোম্পানি বেহালা ছাড়িয়ে জোকায় উঠে এলে, বউ-মেয়ে নিয়ে তাকেও গুটি গুটি এখানে চলে আসতে হয়েছে৷ ৩ শিফটের চাকরি তো আর আহিরিটোলা থেকে হয় না৷ ৬০ বছর বয়স হয়ে গেল বাড়ির, তার ৩০ বছর তো টানা ওখানেই, কই, এমনটা তো ওখানেও কোনওদিন শোনেনি৷ বিশ্বাস না হবারই কথা৷

শুভ কাগজ হাতেই, তাড়াতাড়ি বাথরুমে গেল৷ গিয়ে দেখল, ধুস, কোথায় কী, প্যানে একটি ফোঁটাও জল আর নেই৷ ছিল নিঃসন্দেহে, যে-জন্যে গায়ে ইতস্তত মল এখনও লেগে আছে৷

তবে, জল তো নেই, সবটাই পাস করে গেছে৷ সে তাই আর চেন-টানাটানির মধ্যে না গিয়ে, ১০ লিটারের বালতিটায় জল ভরে, হুড়ুস করে সবটা প্যানে ঢেলে দিল৷

ওগো মা! ওই দ্যাখো, ততোধিক বেগে হুড়মুড়িয়ে উঠে এসে প্যান তো মল আর ময়লা জলে ভরে গেলই, উপরন্তু, গড়িয়ে এসে বাথরুমও ভাসিয়ে দিচ্ছে৷

কুন্তলা এসে পড়ার আগেই মেথরানির ঝাঁটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্তত বাথরুমটা সাফ করে ফেলতে গেল সে৷ কুন্তির শুচিবায়ুগ্রস্ততা ইদানীং এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যে, এ-বাড়িতে, এখন এক সেক্স ছাড়া, আর সবটাই ভাগ হয়ে গেছে ‘তোমার-আমার’-এ৷ এমন যে, বেসিনের ওপর কাচের ট্রে-তে শুভ আর কুন্তলার টুথব্রাশেও ঠেকাঠেকি হবার যো নেই৷ মায়, বারান্দায় কুন্তলা আর পিঙ্কির জামাকাপড় শুকতে দেবার প্লাস্টিকের তারটিও আলাদা এবং সেটি ঘোর আক্রোশ-বর্ণের— বারবার সে কথা বলে দেওয়া সত্ত্বেও, একদিন, স্নান সেরে, অফিস যাবার হুড়োতাড়ায় নিজের তোয়ালেটা ওখানে টাঙিয়ে দিয়েছিল বলে, উরেব্বাস সে কী অনর্থ! খাওয়া, জামা-কাপড়-জুতো পরা, দরজা বন্ধ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত চলল সে নিয়ে গজগজানি, বারান্দা থেকে শেষটুকু রাস্তায় ছুঁড়ে দেবে— এমন আশঙ্কা যে করেনি, তা নয়৷ শুভ তাই দ্রুত হাতে অন্তত বাথরুমটা— যা ভেবেছিল৷ মেয়েটা ঠিক মাকে লাগিয়েছে! বা, ওই ১০ লিটার জলের তোড়-শব্দের জন্যই হয়ত শাড়ি গাছ-কোমর করে বেঁধে কুন্তলা রান্নাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে একদম সরেজমিনে এসে হাজির৷ বাথরুমের কাজ অনেকটা মেরে আনলেও, গুয়ে-মুতে পায়খানার তখনও সে এক বীভৎস দৃশ্য৷ তার পাজামা হাঁটু পর্যন্ত সপসপে৷

‘ওগো মা!’ বলে কোমরের প্যাঁচ থেকে খুলে যে ভাবে শাড়িটা নাকে চেপে ধরতে লাগল কুন্তলা যে শুভর মনে হল সে বুঝি সবটা খুলে ফেলার আগে থামবে না৷

শুভ প্রথমেই ছুটে গেল একতলার ফ্ল্যাটের প্রাচীন ভাড়াটে গোপালবাবুর কাছে৷ ভদ্রলোকের নতুন বাজারে খোয়া-ক্ষীরের কারবার, বেশ চালু ব্যবসা৷ খানদশেক শাড়ি খাটের ওপর বিছিয়ে ওঁর স্ত্রী ওঁকে পুজোর সওদা বোঝাচ্ছেন, আর উনি বলছেন, ‘না-না, এডা তোমারে মানাইব, এডা কাউরে দেবা না’— এমন সময় খিড়কি দরজা দিয়ে না বলে-কয়ে ঢুকে একেবারে শোবার ঘরে শুভকে দেখে গোপালবাবু বেশ অপ্রসন্নই হলেন৷ ‘কী ব্যাপার?’ জানতে চাইলেন৷

শুনে টুনে বললেন, ‘আর-এ মোশয়! আপনি তো আজ টের পালেন৷ আমাগর একতইল্লা৷ আমাগর তো গত হপ্তা হইতেই মাল যাচ্ছে না৷

‘সে কী৷ কই, বলেননি তো কিছু৷ চালাচ্ছিলেন কী করে!’

‘আর-এ মোশয়৷ আমরা হলেম গিয়া রেফিউজি৷ শেয়ালদ’র প্ল্যাটফরমে আইস্যা উঠি৷ আমাগর কথা ছাড়ান দ্যান৷ আমি আর ছাওয়ালডা তো ওই মাঠে গিয়া হাইগ্যা আসি৷’

‘অ্যাঁ!’ শুভ ঢোক গিলে বলল, ‘আর মেয়েরা?’

‘অরা রিকশা করে অর বোনের বাড়ি চইল্যা যায় হেই আপনার ইউনিক কলোনিতে৷ ক্যান, আপনার বাড়ি-অলাকে বলুন না৷’ বেড়ালের মতো চোখের তারা পাল্টে আবিল হাসি হেসে গোপালবাবু বললেন, ‘অর সঙ্গে তো দেহি খুব পীরিত আপনার৷’

উনি ১৫ বছর আছেন৷ এক পয়সা ভাড়া বাড়াননি৷ ৫ বছরে, বাড়িঅলার ছিঁটে-ফোঁটা ফেভার পাবার আশায়, শুভ ২৫ টাকা বাড়িয়েছে৷ একটা ছিটকিনি ভেঙে গিয়েছিল, উনি সেটাও লাগিয়ে দেননি৷ উল্টে, বাস্তুহারা গোপালবাবুর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেবার জন্য, তাঁর নাকের ডগায় টিনের ঘর তুলে লিয়াকৎ আলি নামে এক মুসলমান দরজিকে ভাড়াটে বসিয়েছেন৷ তার পায়খানা নেই৷ ছানাপোনা-সহ সে নাকি অতি প্রত্যুষে সেপটিক ট্যাঙ্কের লোহার ডালা তুলে, সরাসরি ওখানেই পায়খানা করে৷ আজ সেই বাড়িঅলা ব্যাপারেই উনি ঠেস দিচ্ছেন৷ সত্যি, ভুলই করেছিল শুভ৷ এই ২ কামরা ফ্ল্যাটের জন্যই, যেখানে ভাড়াটে তুলতে পারলেই সেলামি ১০ হাজার, সেখানে মাসে ২৫ টাকা এক টিপ নস্যি ছাড়া কী৷

সেই কখন থেকে শুভর ঠোঁট দুটি ইংরেজি 'O' অক্ষর হয়ে আছে! শুভর সসেমিরা অবস্থা দেখে বোধহয় মায়াই হল গোপালবাবুর৷ কথার সুর পাল্টে উনি এবার বললেন, ওঁরা চালিয়ে নিচ্ছেন৷ তবে শুভরা শিক্ষিত লোক, তাদের কথা আলাদা৷ শুভ এক কাজ করুক৷ কালীকিষ্টবাবুর কাছে চলে যাক৷ এই ওয়ার্ডে কনজারভেন্সির ব্লক সরকার৷ পুষ্পশ্রী সিনেমার কাছে— ওই যে নুটুর চায়ের দোকান, ওখানেই রোজ সকালে বসেন ভদ্রলোক— শুভ এখুনি চলে যাক ওঁকে পেয়ে যাবে৷ উনি একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেবেন৷

এই সময় নতুন বাজার থেকে ওঁর ফোন আসে৷ তাড়াতাড়ি রিসিভার ধরে উনি, ‘হ্যালোও— কে-হ্যাঁ-না-হ্যাঁ-না-হ্যাঁ-হ্যাঁ-না’ ইত্যাদি বলতে লাগলেন৷ শুভ তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে উনি বাঁ হাতের ওল্টানো তালুর আঙুলগুলিতে ভরতনাট্যমের কোনও একটি মুদ্রার কাঁপন তুলে তাকে তাড়াতাড়ি যেতে বললেন৷

ভদ্রলোক মধ্যবয়সী, গুড় আর ছানার কারবারিদের চেহারা যেমন হয়, বেশ গায়ে-গতরে৷ মুখে দু-দিনের দাড়ি, চুল একটাও পাকেনি৷ কালীকৃষ্ণবাবুকে সে ওখানেই পেয়ে গেল৷ এবং, করিৎকর্মা ছেলে বটে শুভ, ভদ্রলোককে রিকশায় তুলে নিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে একদম বাড়িতে৷ সোফায় বসে কালীকৃষ্ণবাবু বেশ জম্পেশ করে এক টিপ নস্যি নিলেন প্রথমে, কিছু তার আধময়লা লংক্লথের পাঞ্জাবির ওপর ঝরে পড়ল, টিভি-র দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘অলিম্পিক দেখলেন?’

‘হ্যাঁ’৷

‘রাশিয়ার মতো পারেনি৷’

‘না৷ তবে...’

‘পি টি ঊষার ব্যাপারটা দেখলেন৷ চুঃ, চুঃ, উঃ, একটুর জন্যে, অ্যাঁ?’

‘হ্যাঁ৷ আর এক-টু...’

‘আজকাল-ই সবচেয়ে বেস্ট লিখেছে— ঊষা সোনা ছুঁয়ে ফিরে এল৷’

এই সময়, ‘পাঁচীদিকে না পাঠিয়ে কুন্তলা স্বয়ং এসে একটা কোয়ার্টার প্লেটে বেশ খানিকটা ফ্রায়েড রাইস রেখে গেল, তৎসহ দু-দুটি ক্ষীরমোহন৷ জিজ্ঞাসা করল, ‘চা না কফি?’

‘এন-না-না৷ চা৷’

শুভ দেখল কুন্তলা পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে৷ সে আর দ্বিরুক্তি না করে বলল, ‘আচ্ছা কালীবাবু, তাহলে আমাদের পায়খানার ব্যাপারটা...’

‘ও হচ্ছে৷ আমি তুলসীদাসকে বলে এসেছি৷ এলো বলে৷’

বলতে বলতেই একতলা থেকে বেল৷ পিঙ্কি দৌড়ে বারান্দায় গেল৷ কালীবাবু হাঁক দিলেন, ‘কে, তুলসীদাস?’

একতলায় নেমে প্রথম ট্যাঙ্কটির ঢাকনা তোলাবার আগে, শুভকে একটু সরে যেতে বললেন কালীবাবু৷ শুনে শুভ তো বটেই, গোপালবাবুও জানলার পর্দাটা টেনে দিলেন৷ ট্যাঙ্কের হাঁ-মুখের দু’দিকে দু-পা রেখে তুলসীদাস মস্ত একটা ব্যাঁকারি ট্যাঙ্কের ভেতরে ঘোরাতে লাগল৷ উৎকট, ভয়াবহ দুর্গন্ধের কারণে শুভদের দোতলার জানলা-দরজাগুলো সব একে একে বন্ধ হয়ে গেল৷ শুধু কালীবাবু নাকে তর্জনীর টোকা দিতে লাগলেন আর শুভ দাঁড়িয়ে রইল মুখে রুমাল চাপা দিয়ে৷

ঢাকনা বন্ধ করে সিমেন্টের ট্যাঙ্ক থেকে লাফ দিয়ে তুলসীদাস মাটিতে নামল৷ এই প্রথম লোকটার সা-জোয়ান চেহারার স্বরূপ লক্ষ্য করল শুভ৷ আট-হাতি ধুতি-জড়ানো কোমর ছাড়া সম্পূর্ণ নগ্ন, লম্বায় ফিট-ছয়েক তো হবেই, বুকে ঘন চুল, তার মধ্যে গললগ্ন করে বাঁধা একটা অ্যালুমিনিয়মের চৌকো চাক্তি৷ শুভর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, তাদের ডাইনিং টেবিলের মাথার কাছে অনেকদিন টাঙানো ছিল নন্দলাল বসুর ‘কিরাতার্জুন’ ছবিটা, ঝড়ে পড়ে গিয়ে কাচ ভেঙে যায়৷ ওটা বাঁধাতে দিতে হবে৷

তুলসীদাস বলল, ‘টাঙ্কি পুরা বান্দো নেহি হুয়া বাবু৷ আভি কুছু দিন চলেগা৷ লেকিন হাপিস করনে পড়েগা৷’

হাপিস? সে আবার কী? হাপিস মানে তো লুকিয়ে ফেলা৷ যেমন, লাশ হাপিস৷ চোরাই মাল হাপিস৷ এক্ষেত্রে, সে কী হাপিস করবে?

কালীবাবু বললেন, ‘আচ্ছা, কত বছর ট্যাঙ্ক সাফাই হয়নি আপনি জানেন?’

‘আমি জানি৷’ পর্দা তুলে গোপালবাবু বললেন, ‘পনেরো বছর৷’ বলে পর্দা টেনে দিলেন৷ কালীবাবু (পর্দানশিনের প্রতি): ‘ও, তবে তো কথাই নেই৷ আচ্ছা, আপনারা কি প্যান ধোবার জন্যে অ্যাসিড ব্যবহার করেন?’

উত্তর নেই৷ শুভ বলল, ‘আমরা করি৷’

‘করবেন না৷’ কালীবাবু বললেন, ‘ট্যাঙ্কের মালে আপনার যে পোকারা জন্মায়, ওরাই আপনার স্টুলটা খেয়ে ফেলে, তাই জলটা আপনার ট্যাঙ্ক-টু-ট্যাঙ্ক সহজেই পাস হয়ে যায়৷ মোট চারটে ট্যাঙ্ক তো৷ আর নইলে যা আপনাদের ক্ষেত্রে হয়েছে, পোকাগুলো অ্যাসিডে বারবার মরে গেলে প্রথম ট্যাঙ্কের আউটলেটটা স্টুল আর মরা পোকায় জাম হয়ে যায়৷’

গোড়াতেই যে-কথাটা মনে হয়েছিল শুভর, সে বলল, ‘আচ্ছা কালীবাবু, আমাদের আহিরিটোলার বাড়িতে তা ধরুন অন্তত চল্লিশ বছরের স্যানিটারি প্রিভি৷ সেখানে তো কোনওদিন—’

‘আরে মোশাই, সে তো আপনার কলকাতায়৷ তার কানেকশান তো সেন্ট্রাল সুইয়ারেজের সঙ্গে৷ আন্ডারগ্রাউন্ড সিস্টেমে একদম সোজা চলে যাচ্ছে সেই ধাপায়৷ আর এ তো আপনার ব্যায়লা৷ এখানে তো যে-যার সে-তার সিস্টেম৷’

‘আই সি’৷ সমাজতন্ত্র আর পুঁজিবাদের আদত ব্যাপারটা কতকটা প্রাঞ্জল হয়ে আসে শুভর কাছে৷

‘হাপিস’ ব্যাপারটা কী, তাও বেশ বোঝা গেল৷ হাপিস আর কিছুই না, একটা বাঁশের খোঁটার মুন্ডে প্রচুর ন্যাকড়া বাঁধা৷ অত নেই বলে ফ্রিল দেওয়া একটা আস্ত শায়াই তুলে দিতে হল কুন্তলাকে, শায়ার টেপ খুলে খোঁটার মাথাটা বাঁধা হল, তাতে হল না, তাই বারান্দা থেকে ঘোরতর লাল-বর্ণের ফর-হার-ম্যাজেস্টি-ওনলি প্লাস্টিকের দড়িটাও শেষাবধি অফার করতে হল কুন্তলাকে— এবং তারপর প্যান জলে ভর্তি করে, সেই ন্যাকড়ার মুগুর দিয়ে প্যানের মুখে বারবার ভ্যাকুয়াম প্রেশার দিতে থাকা— এই হল, সংক্ষেপে, হাপিস!

কিন্তু হা কপাল, প্যানের গর্তে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে ভ্যাকুয়াম ঠাপ দিয়ে হাত খানেকের বেশি মাল কিছুতেই নামে না৷ দু-একবার ব্যবহারেই প্যান আবার মালে ভর্তি হয়ে আসে৷

সেই থেকে চলছে, আজ নিয়ে দশ দিন৷ এতদিন সারারাত ধরে নলের মধ্যে দিয়ে বিঘৎ খানেক এমনিই নামছিল, রোজ সকালে মিনিট-পনেরো ‘হাপিস’ করে শুভ নামাতে পারছিল আরও হাত খানেক৷ নাকে-মুখে চাপা দিয়ে তিনজনে কোনওরকমে একবার করে কাজ সারছিল৷ কিন্তু, গত পরশু থেকে প্যানের মল প্যানেই থেকে যাচ্ছে৷ একটুও সরছে না৷

গোড়া থেকেই প্রস্রাব-ট্রস্রাব বাইরেই সেরে আসছিল শুভ, ও-ব্যাপারে বাথরুম ছিল তার পক্ষে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এলাকা৷ প্রথম দিনেই হাঁকিয়ে দিয়েছিল কুন্তলা, ‘ও সব তুমি যে চুলোয় পারো সেরে এসো৷ বাথরুমে পা দেবে না বলে দিচ্ছি৷’ কিন্তু পরশু দিন, প্যানের মাল একটুও সরেনি দেখে, এবার হৃদয়-বিদারক বড় কঠিন নারা লাগাল সে, ‘তুমি বাইরে পায়খানা করে এসো৷ কোথায়, তা আমি জানি না৷’

বস্তুত, পরশু থেকে শুভ রাস্তার ওপারে প্রাক্তন ছাত্রী মণিকাদের বাড়ি পায়খানা করে আসছে৷ বাবা-দাদারা সবাই অফিস-কাছারি চলে যাবার পর সে যায়৷ তার অফিসে তাকে তিনদিনই হাফ ডে ক্যাজুয়াল নিতে হয়েছে৷ তা হোক, কিন্তু একজন ৩৫ বছরের ভদ্রলোকের পক্ষে পরের বাড়ির পায়খানা ব্যবহার লজ্জাজনক তো বটেই, তদুপরি, ও হো, সে কি কম ঝকমারি নাকি! প্রথমত, কোন মগটা ব্যবহার করব৷ জানলার ফ্রেমে লাল-নীল-হলদে নানান রঙের সাবানের টুকরো৷ বোঝা যায়, এর কোনওটা মণিকার, কোনওটা ওর বাবা-মার, কোনওটা পিসি বা দাদাদের৷ হায়, শুভর জন্যে ভিবজিওরের একটা রঙ-টুকরোও কি সেখানে থাকতে নেই৷ রোজ রোজ নিজের পায়খানার মগ হাতে বড় রাস্তা পারাপার, সে কী ভাবা যায়৷ কাল সে চেন টানতে বিলকুল ভুলে যায়৷ অবশ্য মল যে প্যানের ওপর পড়েছিল তা না৷ শৌচকার্যের সময়েই বেরিয়ে গিয়েছিল৷ তবু কুন্তলা সেই পাঠাল৷ চোখ পাকিয়ে, প্রায় ধমকে বলল, ‘যাও, চেন টেনে এসো৷ পরের পায়খানায়— ছিঃ৷’

তো, পরশু থেকে প্যানের মাল প্যানেই থেকে যাচ্ছে, নাকে-মুখে চাপা দিয়ে, চোখ বুজে, মা ও মেয়ে তার ওপরেই কাজ সেরে আসছে আজ নিয়ে ৩ দিন৷ জল ঢালবে যে, সে গুড়ে বালি৷ প্যান অমনি জলে ভর্তি হয়ে যাবে, এবং এখন, আর তো সরবে না! ছিটকে লাগবে৷ কুন্তলার দূরদর্শিতা তাই পিঙ্কিকে বারেকের জন্যও প্যানে থুতু ফেলতে বারণ করে দিয়েছে৷ সত্যি, ছুঁৎমার্গিতায় যে আনন্দমার্গীদের চেয়েও একনিষ্ঠ— সেই কুন্তলার জন্য, দুঃখ নয়, আজ কান্না পায়৷

আজ বৃহস্পতিবার৷ আজ নিয়ে দশদিন৷ আজ কালীবাবু এসেছিলেন৷ এখন ৪টি ট্যাঙ্ক সাফাই করা ছাড়া উপায় নেই৷ মিউনিসিপ্যালিটিতে খবর দিলে সেটা হতে পারে বটে, কিন্তু তা ৪০০ টাকার ধাক্কা এবং কি বাড়িঅলা, কি গোপালবাবু, কেউ একটা তামা ঠেকাবেন না৷ কুন্তলা তবু গয়না বাঁধা দিতে প্রস্তুত হয়েছিল৷ কিন্তু, কালীবাবু বললেন, ৬ মাসের আগে মিউনিসিপ্যালিটির মালের গাড়ি আসবে না৷ তাই আজ ঠিক হয়েছে, আপাতত ৩০০ টাকার ফুরনে, রাতারাতি, ১০/১২ জন মেথর লাগিয়ে কালীবাবু প্রথম ট্যাঙ্কের অন্তত নাইনটি টু এইটটি পার্সেন্ট মাল তুলে ফেলে দেবেন৷ মাস ছয়েকের জন্যে তো নিশ্চিন্তি! কোথায়? চোখ আধাআধি মেরে কালীবাবু বলে গেছেন, ‘সে আপনার জানার দরকারটা কী৷ এইদিকে— ওইদিকে—’ বলে হাতটা এমনভাবে ঘুরিয়ে দিলেন, যাতে ভারত ও ভূমণ্ডলও বোঝায়৷ ‘হাপিস’ শব্দের অর্থ সম্পর্কে শুভর পূর্বধারণা এই নতুন ব্যঞ্জনা পাবে আগামী শনিবার শেষ রাতে— কাকপক্ষী টের পাবার আগেই— এরকমই ঠিক হয়েছে৷ অর্থাৎ, নরকে আরও ৪ দিন৷

অবশ্য, ‘নরকে ৪ দিন’ বললে ঠিক বলা হয় না৷ বেশ ভুল বলা হয়ে যায়৷ ছোট ছোট ফ্ল্যাটে যেমন হয়, শুভদের পায়খানা বাথরুমের সঙ্গে ৬ ফিট দেওয়াল দিয়ে পার্টিশান করা৷ অর্থাৎ, ওপর দিকটা খোলা৷ বাথরুমের দরজা থেকে কাঠের একটা পিস অনেকদিনই খুলে গেছে৷ সেখান দিয়ে বেরিয়ে হু-হু দুর্গন্ধে ফ্ল্যাট ভরে থাকে সব-সময়৷ ধূপ-ধুনো তাকে ঠেকাবে, এমন সাধ্যি কি! ঘরে ঘরে তাই একটা করে ‘ওডোনিল’ টাঙিয়েছে কুন্তলা৷ মায় রান্নাঘরও বাদ যায়নি৷ এবং, তার এই একটি অদূরদর্শিতা— ৫টি ওডোনিল-এর অবিরাম কার্বলিক-গন্ধ— গোটা ফ্ল্যাটটিকে রাতারাতি, কিচেন-স্টোররুম ও ডাইনিং স্পেস-সহ এক দুই কক্ষ বিশিষ্ট অভিনব পায়খানায় রূপান্তরিত করেছে৷ সুতরাং, নরকে আরও ৪ দিন না বলে ‘পায়খানায় আরও ৪ দিন’ বললেই আজ ঠিক বলা হয়৷

রাত তখন ৩টে হবে৷ ক্রিং... ক্রিং... ক্রিং... ক্রিং৷ নিচের গোপালবাবুর ঘরে ফোন বাজছে৷ এত মৃদু শব্দে ঘুম ভেঙে গেল৷ শুনতে শুনতে শুভ ফের ঘুমিয়ে পড়ে৷

মিনিট পনেরোর মধ্যে কুন্তলা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল৷ সে দেখল, মা ও মেয়ে একদম রেডি৷ ব্যাপার কী?

আহিরিটোলার বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল৷ শুভর মা একটু আগে মারা গেছেন৷

মার বয়স হয়েছিল৷ এবারের সর্দিটা নিউমোনিয়ার দিকে টার্ন নেয়৷ দিন-পনেরো আগেও দেখে এসেছে সে, তখন ভাল হবার দিকে৷ তারপর পায়খানা-বিভ্রাটে আর খবর নেওয়া হয়নি৷ মা, সেই সুযোগে, এভাবে ফাঁকি দিয়ে পালালেন?

‘হঠাৎ আবার কী হল?’ সে-মনোহীনভাবে জানতে চাইল৷

‘তা তো বলেনি৷ নাও, তুমি তাড়াতাড়ি করো৷ মধুদার বাড়ি যাও৷ ট্যাক্সি বের করতে বলো৷’

‘অ্যাঁ-হ্যাঁ, যাচ্ছি-যাচ্ছি’ দু-হাতে পা-জামা ধরে একটু পেচ্ছাপ করে নেবে বলে সে বাথরুমের দিকে ছুটছিল, কুন্তলা মৃদুকণ্ঠে আপত্তি করল, ‘ওদিকে কোথায় যাচ্ছো? প্যান একদম ভর্তি৷ সারা রাতে একটুও নামেনি৷ তুমি তো বেরুচ্ছ?’ অর্থাৎ, বাইরে করে নিও৷

‘ও-হ্যাঁ, ও-হ্যাঁ’ বলতে বলতে ছিটকিনি খুলে, কিছুটা ঘুমঘোরে, কিছু-বা মাতৃশোকে টলতে টলতে শুভ খালি গায়েই বেরিয়ে যাচ্ছিল, কুন্তলা একটা গেঞ্জি ধরিয়ে দিল হাতে৷ বাইরে বেরিয়ে সে প্রথমে খোলা ড্রেনের ধারে বসল৷

ভোর হতে এখনও দেরি আছে৷ ছোট্ট লোহার গেট ধরে মেজদা দাঁড়িয়ে৷ ট্যাক্সির দরজা, জানলা গলিয়ে হাত ঢুকিয়ে খুলতে খুলতে মেজদা বললেন, ‘আয় আয়৷ এসো মা৷ আগে খবর দিতে পারলাম না৷ ও-হো, হো-হো৷’

আহিরিটোলার বাড়ির এখন যাই-যাই অবস্থা৷ এখন প্রায় সবটাই মেজদার দখলে৷ ঘর কম, তাই ওদের বাড়িতে কেউ মরলে, তবে ছেলেদের বিয়ে হয়৷ ক্যান্সারে বড়দা মারা গেলেন বেশ তাড়াতাড়িই, বৌদি ছেলে-মেয়ে নিয়ে চিলেকোঠায় চলে গেলেন, শুভ বিয়ে করল৷ মা অবশ্য বড্ড দেরি করছিলেন, মেজদা তাই বাধ্য হয়ে মাকে দোতলা থেকে একতলায় নামিয়ে আনেন ও খাবার ঘরের একাংশে খাট পেতে শেষ শয্যায় শুইয়ে দিয়ে, গত মাঘে ভাইপো ভোল্টুর বিয়ে দেন৷ বড়দা তথা শুভর ঘরটি আপাতত গৃহ-দেবতা জনার্দন জীউ ও মেজদার ছোট ছেলে পুনপুনের দখলে৷

ভাশুরকে প্রণাম করতে ভুলে গিয়ে কুন্তলা পিঙ্কির হাত ধরে সোজা ভোজন-কক্ষে চলে গেল৷ মেজদার সঙ্গে শুভ বসল সদর ঘরে৷ মেজদা টেবিল ল্যাম্প জ্বালালেন ও পাখার সুইচ টিপলেন৷ ওদিকে ঝুরঝুর করে খানিকটা পলেস্তরা খসে পড়ল৷

দু’জনেই চুপচাপ৷ রাঁধুনি গৌরীদি ‘চা না ভিভা’ জানতে এলে, মেজদা বললেন, ‘চা? তা, এ্যাঁ’

‘ভিভা তাহলে?’

‘ভিভা খেলে তো আবার উইন্ড হয়৷ আচ্ছা, ভিভাই দাও৷’

‘ছোটবাবুর চা তো?’

শুভ ঘাড় নাড়ল৷ দীর্ঘ নিঃশ্বাসে মেজদা আগে বুকটা ফুলিয়ে নিলেন৷ তারপর বললেন, ‘আমার হাত থেকে গঙ্গাজল পুরোটা খেলেন, তবে শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন৷ তার আগে গৌরীর দেওয়া ওষুধ সবটা ফেলে দিয়েছেন৷’

শুভ চুপ করে রইল৷

শেষ যেদিন এসেছিল, সে তখন ভাবছিল, মা তাহলে বুঝতে পেরেছিলেন যে আর বেশিদিন নেই৷ শুভর হাত ধরে বলেছিলেন, ‘ছোটখোকা, শিগগির আবার আসিস৷ মরার আগে তোর হাতের জল যেন পাই৷’ অসুখের পর থেকে শুভ সপ্তাহে দু’দিন করে আসছিলই৷ হঠাৎ কোথা থেকে যে কী, দুনিয়ার সব পায়খানা সড়গড়, যাবি তো যা, শুধু তাদেরটাই বন্ধ হয়ে গেল৷

মা শুভকেই ভালবাসতেন৷ বিয়ের আগে পর্যন্ত কাশী-বিন্ধ্যাচল থেকে হরিদ্বার মায় কেদার-বদ্রি, মাকে কোথায় নিয়ে যায়নি সে৷ বিন্ধ্যাচলে কী একটা ব্যাপারে মাকে কটু কথা বলেছিল, ব্যস, ধর্মশালার ঘর থেকে এক বস্ত্রে বুড়ি একদম হাওয়া৷ দারুণ লু বইছে সেদিন, তখন দুপুরবেলা৷ বহু খোঁজাখুঁজি করে রাস্তার ধারে এক বটগাছের নিচে শেষ পর্যন্ত পেল৷ শুভকে দেখেই রাগ করে মা’র সেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, ও-হো, সে জিনিস এ-জীবনে ভোলার নয়৷ অনেক হাতে-পায়ে ধরে শেষ পর্যন্ত টাঙ্গায় তোলে৷

শেষ যেদিন এসেছিল, তখন মেজদার ভাত বাড়া হয়েছে আর দু-একটা ইঁদুর ঘোরাঘুরি করছে দেখে গৌরীদি ঝঙ্কার দিয়ে বলেছিল, ‘ছি-ছি মা, আপনি কি একটু হুস-হাসও করতে পারেন না?’

শুনে কী চন্দ্র-সুষমা ছড়িয়ে পড়েছিল মার মুখে! ক্ষীণ হাসির উদয়-অস্তের মাঝখানে, মৃদুকণ্ঠে মা বলেছিলেন, ‘কী করব মা৷ আগে হুস-হাস করতাম, ওরা পালাত৷ এখন আর গেরাহ্যি করে না৷ এখন তাই গুরুদেবকে ডাকি৷’

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে শুভ কুন্তলাকে বলেছিল, ‘আমি মাকে কালই এ-বাড়িতে আনব৷’

‘মেজঠাকুর আনতে দেবেন না৷ মার গলায় এখনও বিছে-হারটা রয়েছে৷ তা ছাড়া’, কুন্তলা বলেছিল, ‘মা-ও ভিটে-বাড়ি ছাড়বেন না৷’

‘আলবৎ দেবে, আলবৎ ছাড়বে’, হাতের তালুতে ঘুসি মেরে শুভ বলেছিল, ‘তা বলে ওই স্যাঁতসেঁতে ঘরে ইঁদুর আরশোলার মধ্যে মরে পড়ে থাকবে? গৌরী এ রকম করে বলবে৷ বৌদি তাহলে কীভাবে ট্রিট করছে, ভাবতে পারো তুমি?’

‘বেশ তো, আনো না, যদি আসেন৷’ কুন্তলার স্বরে আগ্রহই প্রকাশ পেয়েছিল৷

সে আর হয়ে ওঠেনি৷ তারপরেই তো পায়খানা বুজল৷

বাইরে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে৷ একটা ট্যাক্সি এসে থামল৷ রাস্তার কুকুরগুলোর পরিত্রাহী চিৎকারের মধ্যে বোন কমলা আর ভগ্নীপোত জগদীশ নামছে৷ টেবিল ল্যাম্প সুইচ টিপে নিবিয়ে, ভিভায় শেষ চুমুক দিয়ে অভ্যর্থনার জন্য মেজদা উঠে দাঁড়ালেন৷ যেতে যেতে জানতে চাইলেন, ‘হ্যাঁরে, তোদের পায়খানা নাকি চোকড?’

চা খেতে খেতে শুভর বেশ পায়খানা পেয়েছে৷ এসে পর্যন্ত সে মৃতের ঘরে যায়নি৷ তার সর্বস্ব তাকে বাধা দিচ্ছে ও-ঘরে যেতে, সেই বিশ্বাসযোগ্যকে প্রত্যক্ষ করতে, জীবনে শুধু একমাত্র যাকে একটুও অবিশ্বাস করা যায় না৷

সে বরং পায়খানায় গেল৷ দিনের বেলাতেও সুইচ টিপতে হয়, এমন পায়খানা৷ আলো জ্বালালে বাদামি দেওয়ালে খর খর, শত শত আরশোলা৷ ফাটা, চলতা-ওঠা প্যান৷ সপ্তাহে মাত্র একদিন মেথর৷ সিস্টার্ন নেই৷ সেন্ট্রাল সুইয়ারেজ সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত বলে তবু, মাত্র দু-মগ জলেই, দ্যাখো, সি এস এসের সঙ্গে হাতে হাত, নাচতে নাচতে কেমন কোথায় চলে গেল৷

খাটে তোলার আগে মেজবৌদি যখন মা-র মাথার সিঁদুর শাঁখায় ঠেকিয়ে নিচ্ছেন— কুন্তলা-সহ অন্যান্য সধবারা ওঁর পিছনে লাইনে— আর মেজদা ফোটোগ্রাফার এস কুমারকে বলছেন, ‘শ্রাদ্ধের দিন আমি চাই আমার সুন্দরী মায়ের ছবি, একদম কম বয়সের’— সেই সময় ঘরে ঢুকে মা-র মুখের দিকে একবার তাকিয়েই শুভ মুখ ফিরিয়ে নিল৷ বেঁচে থাকার শেষ অভিব্যক্তিটি, সে দেখল, মৃতের মুখ থেকে এখনও মুছে যায়নি৷ এবং সেটা হল, তার মনে হল, ‘আঃ বাঁচলাম৷’

দাদা তখনও একটু চেঁচিয়ে, ‘ও-হো-হো, এই মায়ের জন্যে আমি কী না করেছি ... মার যখন কলেরা হল... শুভ তখন পাঁচ বছরের আর কমলি পেটে...’ বলে যাচ্ছেন বলে, শুভ, সেই সুযোগে, মার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে, অস্ফুটে উচ্চারণে দু-বার ‘মা ক্ষমা কোরো, মা ক্ষমা কোরো’ বলে নেয়৷

নিমতলায় ইলেকট্রিক চুল্লির সামনে শবের লম্বা লাইন, মা-র টার্ন আসতে সন্ধে হয়ে গেল৷ স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরাবার আগে ‘বন্ধনমুক্ত’ করার সময় শ্মশান-পুরোহিত ‘এখন যা পাওয়া যাবে সব আমার’ বলে পুরনো জামাকাপড় থেকে হাতের মাদুলি পর্যন্ত সব খুলে নেবার সময় এক কাণ্ড ঘটল৷ শাড়িতে একটা শক্ত গিঁট, কিছুতেই খোলে না৷ মেজদা, জগদীশ, ভোল্টু, পুনপুন— সবার সঙ্গে শুভও ঝুঁকে পড়ল৷ অবশ্য, পাবেটা কী৷ গয়নাগাটি বৌদি তো সবই একে একে খুলে নিয়েছেন৷ শেষ সম্বল গলার বিছে হারটা দেখিয়ে সকলের সামনে মা এই সেদিনও বলেছেন, ‘এটা পিঙ্কির৷’ বৌদি নিঃসন্দেহে সেটাও দেবেন না৷

মা-র আঁচলের গিঁট অনেক টানা-হেঁচড়া করে খুলে পাওয়া গেল একটা কুড়ি টাকার নোট, কতকাল বাঁধা আছে কে জানে, নিঃসন্দেহে দু-একবার জল-কাচা হয়ে গেছে৷ তুলার মতো নরম নোটটির ভাঁজ সন্তর্পণে খুলে অত্যন্ত অপ্রসন্ন মুখে পুরোহিতকে তাকাতে দেখে, শুভ তাঁর দুটি হাত ধরে ‘দেখুন পুরুত মশাই, এটার নম্বর তো ঠিকই আছে— আপনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে দাঁড়ালেই— রাস্তার লোক দাঁড়িয়ে থাকে— হয়ত খুব জোর একটা টাকা কেটে নেবে’ ইত্যাদি বলে মার অবিমৃশ্যকারিতার জন্য ক্ষমা চাইল৷

নতুন কাপড় পরে গোধূলি লগ্নে মা ট্রলিতে চেপে চুল্লির মধ্যে ঢুকে গেলেন, ঠিক যেন টোস্টারে পাউরুটির স্লাইস ৷ ভিতরে হটপ্লেটে ছোঁয়া লাগা মাত্র দপ করে লাফিয়ে উঠল আগুন৷ চুল্লির বিশাল গেট নেমে এল৷

পরদিন শুক্রবার সকালে তারা বেহালা রওনা দিল৷ কাল ফোন-টোন করে দিয়েছে অফিসে, দিন পনেরো ছুটিও মৌখিকভাবে পেয়েছে, অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম নিয়ে আজ এসট্যাবলিশমেন্টের মৌলিক আসবে৷ ট্যাক্সিতে সেই কথাটা ফের মনে পড়ল শুভর, গঙ্গার একবুক জলে দাঁড়িয়ে কাল সন্ধেবেলা যা মনে হয়েছিল৷ আচ্ছা, কাল সকালে কাছা গলায় নতুন কাপড় পরে সে মণিকাদের বাড়ি যাবে কী করে! অবশ্য, বাকি শুধু কালকের দিনটা৷ আজকের ব্যাপার তো সবারই এ বাড়িতে হয়ে গেছে৷ কাল শনিবার রাতারাতি নাইনটি টু এইট্টি পার্সেন্ট মাল হাপিস হবে৷ তারপর ছ-মাসের জন্যে নিশ্চিন্তি৷ সত্যি, মার মৃত্যু রাতারাতি কত বদলে দিয়েছে কুন্তিকে! কাল থেকে বারেকের জন্যও সে পায়খানা-প্রসঙ্গ উত্থাপন করেনি৷ আর একটা দিন সে ঠিক মানিয়ে নেবে৷ আর-এ! রবিবারই তো মহালয়া, তাই না৷ ভোরে মহিষমর্দিনী৷ এ-বছর মহালয়ার সকাল বেলাটা সত্যিই ছোটবেলার সেই ‘রাত পোহালো ফর্সা হলো’ পদ্যের মতোই নীল পতাকা কাঁপিয়ে আবার ফিরে আসবে৷

বাড়ি ফিরে নতুন ইটের ফাঁকে বালি ছড়িয়ে তার ওপর নিবে যাওয়া প্যাঁকাটি ও কাঠের আগুনে, বাতাস করতে নেই বলে, শুভ আর কুন্তলা উপুড় হয়ে একযোগে ফুঁ দিচ্ছে— ওপরে ফুটন্ত মালসা— এমন সময়— হুড়-হুড়-হুড়ুস!

ব্যাপার কী! দু’জনেই লাল অশ্রুভরা চোখে দু’জনের দিকে তাকায়৷ হ্যাঁ, এর দিল কি আরমা এখন ধোঁয়ার জ্বালায় ওর চোখের আঁসু দিয়ে ঝরে পড়ছে, কিন্তু দু’জনের চোখের ভাষা একই৷ আওয়াজটা বাথরুম থেকে না? একটাই সম্ভাবনার আশা তাদের চোখে ফুটে উঠেছে৷

সবার আগে পিঙ্কি ছুটে গেছে বাথরুমে৷ পায়খানার দরজা দু-হাট করে খুলেই সে চিৎকার করে উঠেছে, ‘বাবা! মা!’

শুভর পিছনে পিছনে কুন্তলাও হুড়মুড়িয়ে দৌড়, দৌড়৷ সত্যি, দৈব ছাড়া একে আর কী বলা যায়৷ এখনও গায়ে ইতস্তত মাল লেগে থাকলেও গুডনেস, প্যান একদম বিলকুল খালি! এতে কোনও সন্দেহ নেই যে কোনও অলৌকিক উপায়ে পাইপ খুলে গেছে হঠাৎ, সব মল হুড়হুড় করে কোথায় তলিয়ে গেছে!

শুভ প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে এক মগ জল ঢেলে দ্যাখে৷ কাণ্ড দেখলে, নেংটি ইঁদুরের মতো সহর্ষে, কেমন সুড়ুৎ করে চলে গেল৷ সে আর ধৈর্য রাখতে পারে না৷ দশ লিটার জল ভরা বালতির জন্য তার হাতের পেশি শক্ত হঠে ওঠে৷ সে হুড় হুড় করে প্যানের মধ্যে একসঙ্গে দশ লিটার জল ঢেলে দেয়৷

বিস্ফারিত দু’চোখ মেলে সে প্যানের জল-ধোয়া অকলঙ্ক সাদার দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত৷ ঠিক যেন তার হেঁড়ে মাথার ভেতরটা কী সাফ-সুফ আর ঝকঝকে লাগছে সেখানেও কতদিন এত নির্ভার বোধ করেনি তার মাথা! সহসা ঘুরে দাঁড়িয়ে এক অবাক-কাণ্ড করে বসে শুভ৷ বাথরুমের ছাদ ফুঁড়ে সে মেয়েকে আকাশ পর্যন্ত তুলে ধরে৷ তারপর চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘মা-মা৷’ মেয়েকে নামিয়ে দু’হাতে নাড়া দিতে দিতে উদ্ভাসিত মুখে সে কুন্তিকে বলতে থাকে, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ মা, কুন্তি, আমার মা৷ মা আমাদের কষ্ট আর সহ্য করতে পারেননি৷ মা-ই ট্যাঙ্কের মধ্যে বন্ধ আউট-লেট নিজের হাতে সাফ করে দিলেন; তুমি বিশ্বাস করো, দ্যাখো গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে আমার৷’

‘ওগো মা, তুমি আমাকে এত ভালবাসতে’ বলতে বলতে ঘরের মেঝেয় পাতা খড় ও কম্বলের বিছানার ওপর, কাছা গলায়, লুটোপুটি খেতে খেতে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল শুভ৷ না পিঙ্কি, না কুন্তলা, কেউ তাকে থামাতে পারল না৷ রান্নাঘরে পাতা ইটের উনুনে, পাশাপাশি দুটি মালসায় হবিষ্যির অন্ন ফুটে ফুটে ইট হয়ে যেতে লাগল৷

সকল অধ্যায়
১.
কাঁটাতারের বেড়া
২.
নির্বাসিতা
৩.
নমস্কার কলকাতা
৪.
হাসিনার পুরুষ
৫.
পৃথিবী চিরন্তনী
৬.
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে
৭.
ময়না তদন্ত
৮.
বাবু
৯.
ঐশ্বর্যের শক্তি
১০.
উত্তরপুরুষ
১১.
ভি এম স্যার
১২.
লোকসভা বিধানসভা
১৩.
জন্ম প্রজন্ম
১৪.
জাঁতাকল
১৫.
স্বাধীন মানুষ
১৬.
মূকাভিনেতা
১৭.
গুপ্তধন
১৮.
হয়ত, হয়ত নয়
১৯.
নতজানু
২০.
ওই ব্লেজারটা
২১.
কুসুমা
২২.
যে খেলার যা নিয়ম
২৩.
উল্লুক
২৪.
উৎসব
২৫.
সেজদিদিমার স্মৃতি পুরাণ
২৬.
সাপ পোষ মানে না
২৭.
নিজের বিপদে বুদ্ধিমানরাও
২৮.
হরধনু কাহিনীর পুনর্লিখন
২৯.
মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে
৩০.
চক্ষুলজ্জা
৩১.
বনধ-এর ১০ দিন
৩২.
কুসুমের পথ
৩৩.
জেটিঘাট
৩৪.
জন্মরোধ কেন
৩৫.
আক্রান্ত
৩৬.
লক্ষ্মণের নরকদর্শন
৩৭.
আখরিগঞ্জ
৩৮.
পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার
৩৯.
বিমলাসুন্দরীর উপাখ্যান
৪০.
সোনালি দিন
৪১.
ভালবাসার বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%