মার্ক অরেল স্টাইন

১৯ ডিসেম্বর সকাল থেকে শিবিরের দক্ষিণের এক বালিয়াড়ির ওপর সামান্য মাথা তুলে থাকা একটি ছোটো চৌকো মতন ভবনের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে আমরা খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলাম। তুর্দি এই ভবনকে জানত ‘বাট-খানা’ বা ‘মূর্তির মন্দির’ নামে। সে নিজে একবার এই জায়গাটা তার নিজস্ব পদ্ধতিতে হাঁটকে দেখেছিল। তবে ওটাকে ঘিরে বালির স্তরটা মাত্র দু-তিন ফুট উঁচু হলেও সেটাকে সে সরায়নি। সে বালি সরিয়ে এর ভিত আর মেঝেটা পরীক্ষা করলে এ ধরণের পূজাস্থলের গঠনপ্রণালী আর নকশার বিষয়ে কিছু প্রাথমিক ধারণা হবার আশা ছিল। আমাকে হতাশ হতে হল না। উত্তর আর পশ্চিমদিকে বালি সরিয়ে পাওয়া প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ সাবধানে পরীক্ষা করে বোঝা গেল যে এর মাঝখানে একটা চৌকো ‘সেলা’ বা মন্দিরের গর্ভগৃহ ছিল, যার থেকে সমদূরত্বে কুড়ি ফুট লম্বা বাইরের দেওয়াল ছিল। দেয়াল ও সেলার মাঝখানটায় সেলা-র দুপাশেই লম্বা করিডর ছিল। বাইরের ও ভেতরে দুই দেয়ালই কাঠ ও খাগড়ার কাঠামোর ওপরে শক্ত পলেস্তারা চাপিয়ে তৈরি। তাকে সিধে করে ধরে রাখবার জন্য মাঝে মাঝেই বসানো ছিল বড়ো বড়ো চৌকো গড়ণের খুঁটি।
সেলা-র দেওয়ালের ওপরের দিকের কারুকাজ বহুকাল আগেই উড়েঝুরে গেছে। তার ভেতরের মেঝের বালি খুঁড়ে যা পেলাম তা থেকে সেসব নকশারা ঠিক কেমন ছিল তার একটা সুষ্ঠু ধারণা পাওয়া গেল। জিনিসগুলো পঙ্খের কাজ করা চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা টুকরো সব। একসময় তারা যে দেয়ালজোড়া নকশাদার টালিদের অংশ ছিল তাতে সন্দেহের অবকাশ ছিল না আমার। টুকরোগুলোর গায়ে বারবার ঘুরে ফিরে আসা কিছু বিমূর্ত নকশার পাশাপাশি বুদ্ধের রিলিফ ছিল বেশ কিছু। কোনোটায় বা প্রথাগতভাব ধর্মকথনের ভঙ্গীতে হাত তুলে ধরেছেন তিনি। কোনোটায় আবার তিনি ধ্যানস্থ। এছাড়া, অনেক ছোটো ছোটো রিলিফ মূর্তিতে তাঁর বিভিন্ন ভক্তজনের প্রতিরূপ মিলছিল। যেমন, পদ্মফুল থেকে মালা হাতে উঠে আসা এক অপরূপ গন্ধর্বী মূর্তি। সব মূর্তিগুলোই একেবারে সাধারণ প্রথাগত কাজ। কয়েকটা ছাঁচই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করে তাদের গড়া হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও, ভারতবর্ষে চিরায়ত শিল্পভাবনার প্রভাবে যে বৌদ্ধ ভাস্কর্যশৈলির জন্ম হয়েছিল, এই রিলিফমূর্তিগুলোতে তার অভ্রান্ত স্বাক্ষর দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। সবচাইতে আশ্চর্য হয়েছিলাম মরু-বালির সংরক্ষণ ক্ষমতা দেখে। ছাঁচের কাজের ওপর করা রঙের উজ্জ্বলতা বালির তলায় বহু শতাব্দী চাপা পড়ে থাকা সত্ত্বেও এখনও সজীব। খসে পড়া ছাদের কড়িকাঠ আর বেড়ার গায়ের কাঠের খুঁটিদের গায়ে খুদে তোলা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মূর্তিগুলোর গায়ের রঙের প্রলেপদের ঔজ্জ্বল্যও ছিল চোখে পড়বার মতো।
বালি খুঁড়ে বের করা এই খুদে মন্দিরটা থেকেই ইউরোপে চালান করবার মতো কমপক্ষে দেড়শোটা রিলিফ মূর্তি মিলে গিয়েছিল আমার। এছাড়া আরো একটা লাভ হয়েছিল আমার। এরপর, বালিতে আরো গভীরভাবে ডুবে থাকা স্থাপত্যগুলোকে ঠিক কীভাবে খুঁড়ে দেখতে হবে তারও একটা দিকনির্দেশ আমায় দেখিয়ে দিয়েছিল এই ছোটো খননটা।
পরদিন ক্যাম্পসাইট থেকে আধমাইল দক্ষিণে এক বালিয়াড়িতে যাওয়া হল। তার ঢালে ছ’ থেকে আট ফুট গভীর বালির নীচে একগুচ্ছ ছোটো ছোটো বাড়ি তলিয়ে আছে। বালির বুকে কিছু ভাঙাচোরা রোদ ঝলসানো খুঁটির মাথা উঁকি দিচ্ছিল শুধু। তবে আগের দিনের অভিজ্ঞতা থেকে সেইটুকু দেখেই আমি বালিচাপা স্থাপত্যগুলোর গঠন আর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যদের একটা আন্দাজ করে নিতে পেরেছিলাম। খুঁড়তে শুরু করে বোঝা গেল, খুঁটিগুলো দুটো মন্দিরের দেয়ালের অংশ ছিল। একসময় সে দেয়ালদের গায়ে ফ্রেস্কো আর পঙ্খের কাজের অপরূপ সাজ ছিল।
এদের গঠনগত বৈশিষ্ট্য আর অলঙ্করণগুলো পরবর্তী সময়ে খুঁড়ে বের করা আরো বহু বৌদ্ধ মন্দিরেই দেখেছি। অতএব এখানে আমি সেগুলোকে সংক্ষেপে একবার বলে রাখতে চাই।
মন্দিরের গর্ভগৃহ (cella) ১০ ফুট মাপের বর্গক্ষেত্রাকার। তার প্রবেশদ্বার উত্তরমুখী। মন্দিরের কাঠের দেওয়ালের দু-পাশে সাড়ে ছয় ইঞ্চি পুরু শক্ত পলেস্তারা। দেয়াল ঘিরে সাড়ে চার ফুট চওড়া প্রদক্ষিণ পথ যা ভারতের প্রায় সব উপাসনাস্থলেই দেখা যায়। মন্দিরের কেন্দ্রের বিশাল মূর্তির আস্তরণের ওপর উজ্জ্বল রঙের প্রলেপ। মূর্তিটি সম্ভবত বুদ্ধেরই ছিল। তিন ফুট উঁচু একটি আয়তাকার কাঠের কাঠামোর মধ্যে ঢালাই করা মঞ্চের ওপর দাঁড়ানো মূর্তির শুধুমাত্র পায়ের খানিক অংশই পাওয়া গেছিল যা লম্বায় তেরো ইঞ্চি। মূর্তির বাকি অংশ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মন্দির গর্ভেই পড়ে ছিল। সামান্য স্পর্শেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল। মঞ্চের কাঠামোর শুধুমাত্র নীচের কাঠের অংশটিই অক্ষত ছিল যা মূর্তির বাঁপা’কে ধরে রেখেছিল। মঞ্চ ছিল পদ্মফুলের অলংকরণ দিয়ে সজ্জিত। পরে যত মূর্তি এখান থেকে পাওয়া গেছিল তার মধ্যে শুধুমাত্র উত্তর-পশ্চিম কোণে পাওয়া মন্দিরের মূর্তিখানাই একমাত্র কোমর পর্যন্ত অক্ষত ছিল।
দেওয়ালের উচ্চতা দেখেই মূর্তির বিশালত্বের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। মন্দিরের গায়ে বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বদের অলংকরণের চারপাশে জ্যোতির্বলয়। পূর্ণাকার প্রতিটি অলংকরণের নীচে পদ্ম ও উপাসকদের ছোটো ছোটো মূর্তি। রঙের জেল্লা চলে গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে মন্দিরগুলো বালিতে চাপা পড়ে যাবার আগে এইসব অলংকরণ বহুদিন দৃষ্টিগোচর ছিল। মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালের মসৃণ পলেস্তারার প্রলেপের ওপর টেরাকোটা রঙে আঁকা অলংকরণের প্রান্তরেখাগুলো এখনও স্পষ্ট। মন্দিরের বাইরে দেওয়ালে ধ্যানরত ছোটো ছোটো বৌদ্ধ সাধকদের মূর্তি, যাদের পোশাকের রঙ এখনও যথেষ্ট উজ্জ্বল। দেওয়ালে সাধকদের ছবি ছাড়াও আরও কিছু অলংকরণ রয়েছে যা সম্ভবত স্থানীয় জীবনযাত্রার পরিচয়। যেমন টাট্টুঘোড়া ও উটের পিঠে চড়ে যুবকদের সারি, যাদের প্রসারিত ডানহাতে একটি করে পেয়ালা ধরা। একজনের মাথার ওপর উড়ন্ত এক পাখির ছবি, সম্ভবত বাজ। পরে আরও একটি মন্দিরের দেওয়ালে অনুরূপ ছবির দেখা পাই।

সেলার মতো মন্দিরের ভেতরের গলিপথের দেওয়ালও বৌদ্ধ সাধকদের প্রমাণ মাপের ফ্রেসকো দিয়ে একদা অলংকৃত ছিল। তার তলায় একটানা অলংকরণে জলে ভাসমান পদ্ম ও ছোটো ছোটো মানবমুর্তিও ছিল যা ‘নাগ’ বা অন্য কোনো জলদেবতাকে কল্পনা করেও আঁকা হতে পারে। মন্দিরের দক্ষিণ দেওয়াল থেকে অলংকরণের একটি আস্ত টুকরো আমি খুলে নিতে পেরেছিলাম, যা লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। এটি বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বের একটি চিত্র যা অন্য দুই বড়ো ফ্রেসকোর তলার দিকের মাঝখানে ত্রিভুজাকৃতি একটি জায়গা জুড়ে আঁকা ছিল। ছবির নীচে কালো রঙে টানা হাতের লেখায় ব্রাহ্মী লিপিতে কিছু লেখাও ছিল। দান্দান-উইলিকের অন্যান্য মন্দিরের গায়ে এই ভাষা বা লিপির দেখা পেয়েছি। ভাষাটি ভারতীয় নয়, তবে এই ভাষা আমি পরে এখানে পাওয়া অ-সংস্কৃত ব্রাহ্মী নথিপত্রে দেখেছি।
২১ ডিসেম্বর। গতকাল যে বৌদ্ধ মন্দিরটি ঘিরে খননের কাজ চলছিল খোঁড়ার সময় তার পশ্চিমদিকের দেওয়াল লাগোয়া আরও একটি বৌদ্ধমন্দিরের সেলা বেরিয়ে এসেছিল। এটি আগের মন্দিরটির তুলনায় ছোটো মাপের হওয়া সত্বেও অনেক বেশি শিল্পশোভাময়। ছোট্ট উপাসনাস্থলটি আয়তাকার, উত্তর থেকে দক্ষিণে ১২ ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা আর ৮ ফুট ৮ ইঞ্চি চওড়া। কিন্তু মন্দিরটি ঘিরে কোনো পরিক্রমণ-পথ ছিল না। মন্দিরের কাঠের দেওয়ালের ওপর চার ইঞ্চি পুরু পলেস্তারার প্রলেপ। মন্দিরের পূর্বদিকের দেওয়ালটি ছাড়া বাকি দেওয়াল ভূমি থেকে ফুট দু-এক উঁচু পর্যন্ত পুরো ভেঙেচুরে গেছে। পূর্বদিকের দেওয়ালের সঙ্গে বড়ো সেলাটা জুড়েছিল, ফলে তা ধ্বংস হয়ে যায়নি। দক্ষিণদিকে একটা সুদীর্ঘ বেদি, তার ওপরে একটা শক্তিশালী বেদিকা দেওয়াল-জোড়া মূল মূর্তির ভিতের কাজ করছিল। এই দেওয়াল-জোড়া বিশালকায় চুন-বালির ভাস্কর্য বা স্টাকো মূর্তিকে সম্ভবত ধরে রাখার জন্যই দেওয়ালের ভিত এত মজবুত করে গড়ে তোলা হয়েছিল। স্টাকো ভেঙেচুরে ধ্বংস হয়ে গেলেও কিছু টুকরো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল মন্দিরের ভেতর থেকে। স্টাকোর জন্য তৈরি মঞ্চ, ভূমি থেকে চার ফুট উঁচু। দীর্ঘকাল পরেও সদা উড়ন্ত বালির রাজ্যে মঞ্চটি প্রায় অটুট রয়েছে। এমনকি ভেঙে যাওয়া মূর্তির উদ্ধার করা অংশের রঙও অনেকটাই বজায় ছিল। স্টাকোর নিম্নভাগে তিন ফুট চওড়া এক সিংহের মূর্তি সংবলিত আসন ছিল। ‘সিংহাসন’—যা ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে স্বর্গের দেবদেবী বা মর্ত্যের শাসকদের বসার আসন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে আদিকাল থেকে। সিংহের মাথা ক্ষয়ে গেলেও দেহের সামনের অংশ জুড়ে কেশরের দাগের খাঁজ পরিষ্কার চেনা যায়।

ধ্বংসস্তূপের উপরদিকের চাপা পড়া দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বালি খানিক সরাতেই ৫ থেকে ৮ ইঞ্চি মাপের স্টাকোর টুকরো পাওয়া যেতে শুরু করল। তার মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ছিল বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বের ডানহাত তুলে শিক্ষাদানের ভঙ্গি। মূর্তির মাথা ঘিরে হালকা সবুজ রঙের জ্যোতির্বলয়ের আভাস ও মূর্তির পোশাকে গাঢ় লালচে-বাদামি রঙের ছোঁয়া যা ভারতীয় সন্ন্যাসীদের চিহ্নিত করে। স্টাকোর গায়ের অংশে সামান্য লেগে থাকা পলেস্তারার ওপর রঙের আস্তরণ অল্প হলেও টিকে আছে। এটা স্পষ্ট, বালি খুঁড়তে খুঁড়তে খুঁজে পাওয়া মূর্তির টুকরোগুলো মূল স্টাকোর অংশ ছিল। শুধু তাই নয়, মরুভূমির বালি ভিত থেকে মন্দিরের দেওয়ালের নীচু অংশ ধ্বংস করে দিলেও ওপরের অংশকে সেরকমভাবে ভাঙতে পারেনি।
তুলনামূলকভাবে সেলার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ ভালোভাবেই সুরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছিল। সেই দিকে থাকা স্টাকো মূর্তি অবশ্য ধ্বংস হয়ে গেছে, অন্য তিন কোণের অবস্থাও তথৈবচ। তবুও ঢালাই-করা গোলাকার পদ্ম-বেদির শনাক্তকরণে কোনো ভুল হবার উপায় নেই। এছাড়াও আরও কিছু অলংকরণ ছিল। কোণের বেদিকা আর মূল মূর্তির ভিতের মধ্যেকার লম্বা বেদি পরিষ্কার করার পরে স্টাকো থেকে খসে পড়া একটি ফুট দেড়েকের সম্ভবত বুদ্ধ বা বোধিসত্ব মূর্তির টুকরো পাওয়া গেছিল প্রায় অক্ষত অবস্থায়, যদিও সেই টুকরোটা ছিল শুধুমাত্র মাথা-সহ বাহুর। মূর্তির আলখাল্লার রঙ সামান্য ফিকে হয়ে গেলেও রঙের গভীরতা ধরে রেখেছিল।
স্টাকোর অংশটি অপেক্ষাকৃত শক্ত থাকায় আমি এটিকে ভালো করে খোটানি তুলো ও নরম দেশি কাগজের মোড়কে মুড়ে ছোটো কাঠের বাক্সে ভরে খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে খোটান হয়ে লন্ডনে পাঠানোর ঝুঁকি নিয়েছিলাম এবং মূর্তিটি ঠিকঠাক ভাবেই লন্ডনে পৌঁছেছিল।
মন্দিরের মূল ভিতের গায়ে পাঁচটা ভিন্ন মাপের আয়তাকার কাঠের ছবি আঁকা প্যানেল ছিল। সবচাইতে বড়োটির মাপ লম্বায় এগারো ইঞ্চি, উচ্চতায় সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি আর এক ইঞ্চির চার ভাগের একভাগ মতো মোটা। মাটির কাছাকাছি হওয়ায় জল রঙে আঁকা প্রায় সবক’টি প্যানেলই ছাতা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। বালি-মাটি সরিয়ে সেগুলোর মূল রূপের ধারণা পাওয়া সহজ ছিল না। অস্পষ্ট হয়ে আসা ছবিগুলো বৌদ্ধ পুরাণের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বা বৌদ্ধ উপাসনা এবং কিংবদন্তি সম্পর্কিত দৃশ্যাবলি। এদের একটিতে পদ্মের উপর হাতে জপ-থলি নিয়ে উপবিষ্ট দুই বোধিসত্ত্বের চিত্র, যাঁদের মাথা ঘিরে আলোকজ্যোতি। আর একটি প্যানেল খুব বিবর্ণ ও আবছা হয়ে গেলেও ভারতীয় দেবকূলের জ্ঞানের দেবতা হাতির মাথাওয়ালা গণেশের ছবি চিনে নিতে ভুল হয়নি। তৃতীয় প্যানেলে বাঁ-হাত দিয়ে অপরূপ ভঙ্গীতে ঘোমটা দিয়ে মুখ আড়াল করা নৃত্যরতা এক মহিলার ছবি, পেছনের দিকে হেলানো মাথা থেকে লম্বা বেণী ঝুলছে। পরবর্তীতে দান্দান-উইলিকের প্রায় প্রতিটি মন্দির খনন করে ভিতের কাছে এইধরনের ছবি আঁকা ফলকের দেখা পেয়েছি, যা অতীতে পুণ্যকামী ভক্তদের উৎসর্গ করা ভক্তিমূলক নৈবেদ্য হিসাবে আসলে এখানেই এইভাবেই রাখা ছিল।
প্রতিটি মন্দিরের ভেতরে ও বাইরে শক্ত ঘাসে তৈরি ষোলো ইঞ্চি লম্বা ঝাঁটা পেয়েছিলাম, যা এই মন্দিরগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে ব্যবহার করা হত। ঝাঁটাগুলো গোড়ার দিকে মজবুত করে ঘাসের দড়ি দিয়ে বাঁধা আর ডগার দিকটা ছড়ানো। দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম যে ঝাড়ুগুলো একসময় বালির সঙ্গে লড়াই করত, সেগুলো এত বছর পরেও বহাল তবিয়তে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি কাপড়ের থলে প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছিল। থলের মাঝে কিছু হাড় আর মানুষের দাঁত ছিল। এই দাঁত ও হাড়ের টুকরোগুলো কোনো মৃত সাধকের অস্তিত্ব হিসেবে এখানে আনা হয়েছিল, না কোনো কুসংস্কারের বশে এখানে জমা করে রাখা হয়েছিল তা বলা সম্ভব নয়।
খনন ও পরিষ্কারের কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের গায়ে নানাধরনের ছবি ও স্টাকোর দেখা পাওয়া শুরু হয়েছিল। যেমন একজন পুরুষের রিলিভো মূর্তি, যার মাথা আর বাঁহাতের হদিস পাওয়া যায়নি, পা থেকে কাঁধ পর্যন্ত লম্বায় তিন ফুটের বেশি। পূর্ব তুর্কিস্তানের ‘চারুক’ জাতীয় চামড়ার লম্বা বুট পরা, লম্বা ঝুলের কারুকার্য করা পোশাকে এবং অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তার পায়ের কাছে এক উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে। পোশাকের লাল-নীল ও লাল-সবুজের রঙের ছোঁয়ার কাজ বছরের পর বছর বালিতে চাপা পড়ে থাকার পরও উজ্জ্বল রয়ে গেছে। অতি যত্নসহকারে তৈরি মূর্তির পোশাকের নিখুঁত ভাঁজগুলো এখনও অটুট। কোনো সন্দেহ নেই, যে-শিল্পী এই মূর্তি তৈরি করেছিলেন তিনি সে-সময় এই ধরনের পোশাক দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন। পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকা পরাহত দৈত্যের মূর্তির গঠনও মাটি থেকে মাথা উঁচিয়ে থাকা চোখ খোলা দাঁত বের করে রাখা ভয়ংকর রূপের। এই ধরনের গ্রেকো-বৌদ্ধ ভাস্কর্য আমি লাহোর জাদুঘরে দেখেছি। আমার ধারণা, মাটিতে শায়িত মূর্তির রঙ ঘন নীল ছিল, কিন্তু সেই রঙ মাটির কাছাকাছি থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটি সম্ভবত বৌদ্ধ পৌরাণিক কাহিনির কোনো যক্ষ বা দৈবশক্তির যা ‘দ্বার রক্ষক’-এর প্রতীক।
মন্দিরের ভেতরকার দেওয়ালে উত্থিত চিত্রকলা (রিলিভো) ও দেওয়াল চিত্রের (ফ্রেস্কো) বিষয় আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। একটি ছিল চারদিক বাঁধানো পদ্মভরা বর্গাকার জলাশয়ে স্নানরতা এক নগ্ন রমণীর ছবি। রমণী নগ্ন হলেও তার মাথায় লাল রঙের ভারতীয় পাগড়ি সদৃশ কাপড় জড়ানো। ডানহাত দিয়ে স্তনদ্বয় আড়াল করা, আর বাঁহাত পেটের ওপর দিয়ে বেঁকে কোমরের ডান অংশ ধরে। বাহু, কবজি ও গলা অলংকারে ভরা। নিতম্ব ঘিরে ছোটো ছোটো ঘণ্টা সার দিয়ে ঝুলছে, ঠিক যেরকমটি দেখা যায় অতীতের হিন্দু যুগের নৃত্যরত মেয়েদের ভাস্কর্যে। ছবিতে কিছু আঙুরলতার উপস্থিতিও আছে যা ভারতীয় কলার ডুমুর পাতার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে বলে মনে হয়েছে। স্নানরতা মূর্তির মুখ সামান্য ডানদিকে ঘুরে নীচের দিকে তাকিয়ে। যেখানে স্নানরত এক বালক হাত বাড়িয়ে রমণীকে ধরে জল থেকে ওঠার চেষ্টা করছে। অলংকার-সহ রমণীর শরীর শৈলীর রূপরেখা নিখুঁতভাবে আঁকা।
জলাশয়ের পদ্মেরা কোনোটা আধফোটা, কোনোটা-বা কুঁড়ি অবস্থায়, আবার কোনোটা-বা পুরো ফোটা। ফুলের রঙ ঘন নীল থেকে বেগুনি, যা শিল্পীর বাস্তবাচিত ধারণাকেই স্বীকৃতি দেয়। কাশগরের ইয়ামেন তাও-তাইয়ের ব্যক্তিগত জলাশয়ে এই ধরনের অপূর্ব চিন থেকে আমদানি করা পদ্মের দেখা পেয়েছিলাম। এই ফুল বলে দিচ্ছিল, প্রাচীন খোটান ভারতের দেবতাদের প্রিয় ফুল সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিল। কোনো সন্দেহ নেই হিউয়েন-সাঙ কাশ্মীর ও খোটানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক যোগসূত্রের কথা বলেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। হয়তো মরুভূমির বালিতে সমাহিত হবার আগে এই অঞ্চলের বসতি সংলগ্ন জলাশয়গুলো হিমালয় উপত্যকার হ্রদের পদ্মফুলে শোভিত হত। চিত্রে জলাশয়ের সামনে এক সওয়ারহীন ঘোড়ার উপস্থিতি হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত এক ‘নাগ’ কন্যার আশ্চর্য কাহিনির কথা মনে পড়িয়ে দেয়। এক ধর্মনিষ্ট মানুষ খোটানের পূর্বদিকে জলের মধ্যে বসবাস করা সেই নাগ-কন্যাকে প্রেম নিবেদন করেছিল। কিন্তু ছবিতে আঁকা এই বিষয়টিকে একটি ইঙ্গিত ছাড়া অন্য কিছু ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পাশের চিত্রটি আরও অর্থপূর্ণ, চিহ্নিতকরণে ভুল হবার জো নেই। আবছা হয়ে গেলেও শিল্পীর কাজ ছিল অতুলনীয়। দু-পা ভাঁজ করে বসা ডান কাঁধ খোলা ঘন নীল রঙের জোব্বা পরিহিত এক যুবা পুরুষ। ডানহাতে ধরা ভারতীয় রীতির আয়তকার ‘পোথি’ বা পাণ্ডুলিপির মাঝে নিবন্ধিত দৃষ্টি—নিশ্চিতভাবে এক বৌদ্ধ পণ্ডিত। এই চিত্রের পাশের প্যানেলে আঁকা নানা মাত্রার বাদামি রঙের তাপ্পিমারা আলখাল্লা (যাকে সংস্কৃতে ‘চিরবস্ত্র’ বলা হয়) পরিহিত এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধ শিক্ষাদানের ভঙ্গিতে বসে আছেন। তাঁর বাঁহাতে ‘পোথি’ আর ডানহাতের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঙুল সামনের দিকে প্রসারিত। পাতলা কাঠের প্রচ্ছদপট বা মলাট যা আজও সাধারণত ভারতীয় প্রাচীন সংস্কৃত পুথির ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার রেখা ছবিটিতে স্পষ্ট। শিল্পী নিপুণ দক্ষতায় বৃদ্ধের মুখে শিক্ষকের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বৃদ্ধ বসে আছেন এক পদ্মফুল ভরা জলাশয়ের সামনে—গাঢ় নীল ও সবুজরঙা গলার দুই বুনো হাঁস জল থেকে মাথা তুলে বৃদ্ধ শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে।
ছবিগুলোর ভঙ্গুর দশার জন্য তা মন্দিরের গা থেকে খুলে নেওয়া অসম্ভব ছিল। পরিবর্তে তাদের ফোটোগ্রাফ তুলে নিয়েছিলাম। সেখানেও বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি, কিন্তু পরবর্তীতে শিল্পী বন্ধু মি. এফ. এইচ. অ্যান্ড্রুজ এই ছবি আর দান্দান উইলিকে তোলা অন্যান্য ফোটোগ্রাফ দেখে আমার বর্ণনামতো হাতে ছবি এঁকেছিলেন। এই ছবিগুলোর সঙ্গে ভারতের অজন্তা গুহাচিত্রের সাদৃশ্য অনেকটাই।
প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলার খুব সামান্যই ভালো অবস্থায় ভারতে টিকে আছে। তুলনায় প্রাচীন দান্দান-উইলিকের নানা ফ্রেস্কো ও চিত্রিত ফলকে ভারতীয় শিল্পধারার নিদর্শন অনেক ভালোভাবে বৌদ্ধ খোটানের বালির তলায় বেঁচে আছে। এগুলোর সংরক্ষণে অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন