ষষ্ঠ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

মুজতাঘ-আতায়

পরদিন ১৪ জুলাই-ও খারাপ আবহাওয়া ছিল। তাই সেদিন আর না এগিয়ে বিশ্রাম নেওয়া ঠিক করলাম। আমি মুজতাঘ-আতার পশ্চিম ঢালের নানা তথ্য সংগ্রহে দিনটা কাজে লাগালাম। এছাড়াও যেসব সারিকোলি কুলি ও ভারবাহী পশুর মালিকরা তাশকুরঘান থেকে আমার সঙ্গে এসেছিল, হিসেব করে তাদের পাওনা মিটিয়ে দিলাম। মেটাবার আগে অবশ্য তাদের নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলোর মাপজোক নিয়ে নিয়েছিলাম। তাশকুরঘান থেকে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল শামস বেগ। সে হল গিয়ে একজন ‘উজ-বাশি’ অর্থাৎ কিনা ‘একশো লোকের সর্দার।’ শুরুতেই তার মাপজোক নেয়া হয়। এহেন একজন গুরুতর মানুষের উদাহরণ দেখে বাকিরা আর ওতে কোনো আপত্তি করেনি। একেকজনের মাপজোক নেবার সময় তাকে নিয়ে বাকিদের মধ্যে খানিক ঠিসিঠাট্টাও চলেছিল দিব্যি।

দুপুরের দিকে বৃষ্টি খানিক ধরে এল। আমি তখন করম শাহ্ বেগের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম ছোটো কারা-কুল ও বাসিক-কুল হ্রদ দেখতে। পাহাড়ের উচ্চদেশ ছিল ঘন মেঘে ঢাকা। ডঃ সোয়েন হেডিন সপ্তাহেরও বেশি বসবাস করে এই হ্রদগুলো ও তার আশেপাশের অঞ্চল ঘুরে তার অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর বইতে। তার দৌলতে এই জায়গাটা সম্পর্কে খানিক স্পষ্ট ধারণা ছিলই। টাট্টুঘোড়ার পিঠে চড়ে কারা-কুলের পশ্চিম তীরে বেড়াতে বেড়াতে হ্রদের কিনারার গ্র্যান্ড মোরেইনের সম্পূর্ণ গঠনটি নজরে এসেছিল। হিমবাহ বাহিত নুড়ি-পাথর জলের ধারার সঙ্গে নেমে এসে জমা হতে হতে হ্রদের কিনারায় এই পাথুরে সীমানা গড়ে তুলেছে।

হ্রদের পশ্চিম ধারে চার-পাঁচ হাজার ফিট পাহাড়দের সার, জলের ধারে ধারে হিমবাহদের বয়ে আনা নুড়িপাথরের খুদে খুদে টিলা… ধূসর আকাশের নীচে তারা সবাই মিলে ছোট্ট হ্রদটিকে একটা গম্ভীর বিষণ্ণ রূপ দিয়েছিল। মুজতাঘ-আতার হিমবাহগুলো দেখা গেলে হয়তো তার বিরাটত্বের রূপ এ বিষণ্ণতাকে ডুবিয়ে দিতে পারত, কিন্তু দিগন্তবিসারী সেই হিমবাহেরাও তখন নিজেদের লুকিয়ে রেখেছে।

ঘুরতে ঘুরতে যেখানে ডঃ সোয়েন হেডিন ক্যাম্প করেছিলেন, কারা-কুলের পুব পারের সেই জায়গায় আমরা উপস্থিত হলাম। লম্বা একটা সময় এইখানে থেকেছিলেন তিনি। এখানকার কিরঘিজ পশুপালকের সঙ্গে তাঁর আলাপও নিবিড় হয়েছিল। ফলে, আমার বর্তমান গাইডেরা সেই বিশিষ্ট পর্যটকের বিষয়ে প্রায় কিছুই মনে করতে পারছে না দেখে দেখে অবাক হলাম।

আসলে কিরঘিজ পশুপালকদের যাযাবর স্বভাবই এই বিস্মৃতির ব্যাখ্যা করতে পারে। হেডিনের সময় এই হ্রদের ধার ও মুজতাঘ-আতার আশেপাশে যে যাযাবর কিরঘিজদের আস্তানা ছিল, তাদের অধিকাংশই এতদিনে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। ডঃ হেডিনের বন্ধু ও অন্যতম সফরসঙ্গী তোগদাসিন বেগ ইতিমধ্যেই এখান থেকে বহু দূরে রাশিয়ান পামিরে মারা গিয়েছেন। তাঁর অন্যান্য সফরসঙ্গীরাও চারণভূমির অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এই উপত্যকার চির-পরিযায়ীদের কাছে স্থানীয় রীতিনীতির স্মৃতি ধরে রাখার সংস্কৃতি নেই। এ ঘটনাই তার এক শিক্ষণীয় প্রমাণ।

ছ’টা নাগাদ ক্যাম্পে ফিরতে না ফিরতেই আবার শুরু হয়েছিল অঝোরে বৃষ্টি। মানে, পাহাড়ের মাথায় তুষারপাত। আমার যাত্রাকে মন্থর করে দিতে যথেষ্ট। পরের দিন ১৫ জুলাই আমার ডায়েরির পাতা প্রমাণ করে, আমার আশঙ্কা একদম ঠিক ছিল।

‘সারারাত ধরে বৃষ্টি আর তুষারপাত হয়েছে। কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে আছে সবদিক। তাঁবুতে বসে নোট আর চিঠি লেখা ছাড়া কিছু করার নেই। এই চিঠিগুলো তাশকুরঘানে পাঠাতে হবে, সেখান থেকে এগুলো ডাকে যাবে ভারত আর ইউরোপের নানা প্রান্তে। বৃষ্টির মধ্যেই সকালে করম শাহ্ বেগ দেখা করতে এসে আমার তাঁবুর ভেতর এক কোনায় বসে জানতে চেয়েছিল আমার আগামী যাত্রাপথের জন্য সে কী করতে পারে। তার চোখ-মুখে একটা করুণভাব ফুটে ছিল। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে বুলুনকুলের চিনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমাকে সাহায্যের কোনো নির্দেশ না আসায় সে ভয় পাচ্ছে। রহস্যময় গোপন কথা বলার মতো চাপা স্বরে সে বলেছিল যে সে আমার জন্য যে কোনো ধরণের সাহায্য করতে রাজি, যদি না সেটা চিনাদের জন্য হয়। দেখলাম চিনাদের ওপরে সে বিশেষ আস্থা রাখে না। ইয়াম্বুলাক হিমবাহ এবং মুজতাঘের ঢাল দেখার জন্য সে ইয়াক আর যোগ্য লোক সঙ্গে দিয়ে দেবে, কিন্তু কাশগড়ে যাবার জন্য ইয়াক ও কুলি পরিবহণের ব্যবস্থা করে দিলে সে আম্বানের কোপে পড়তে পারে। এমনকি কারাসুতে আমার আগের শিবিরে কর্মরত সাব-সার্ভেয়ার রাম সিংকে তাঁর লটবহর-সহ ফিরিয়ে আনার জন্য ইয়াক পাঠানোও তার পক্ষে ঝুঁকির। বেগের কথাগুলো আমাকে চিনাদের যাযাবর কিরঘিজদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো ধারণা দিয়েছিল। একই সঙ্গে বুঝেছিলাম যে আমার প্রয়োজনীয় সাহায্যগুলো এক্ষুণি আর পাচ্ছি না। কী আর করা! আমি আমার সঙ্গে তাশকুরঘান থেকে আসা সারিকোলি বেগকেই কারাসুতে পাঠালাম কিছু একটা ব্যবস্থা করে রাম সিংকে নিয়ে আসার জন্য। পাশাপাশি করম শাহ্ বেগের একটা লোককে বুলুনকুলের আম্বানের কাছে পাঠানো হল। আমাকে চিনে যাবার জন্য যে স্থানীয় পাসপোর্ট (যা তাশকুরঘানের সামরিক পোস্ট থেকে দেওয়া হয়েছিল) তা দেখিয়ে করম শাহ্ বেগকে আমার আগামী যাত্রার যাবতীয় ব্যবস্থার অনুমতি দিতে।’

কিরঘিজ আতিথেয়তা

‘দুপুরের পর থেকে বৃষ্টি একটু ধরলে দেখলাম উপত্যকার কয়েকশো মিটার ওপরের অংশ থেকে পাহাড়ের ঢাল টাটকা তুষারে ঢাকা। দেখে বুঝলাম, আমার মুজতাঘ-আতা ভ্রমণের আশু কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে যা করতে হবে, তা অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই করতে হবে। সন্ধে নাগাদ বৃষ্টি পুরো বন্ধ হলে আমি হাজির হলাম বেগের চামড়ার তাঁবুতে। সে আমাকে স্বাগত জানিয়ে আমার কাজকর্মের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল। অনুমতি না এলে কী সাহায্য করতে পারবে তাতে সন্দিহান হলেও আমার আপ্যায়নের খামতি সে রাখেনি। তাঁবুর মাঝখানে একটি বড়ো কড়াই ‘কাজান’-এ দুধ ফুটছিল। বেগের স্ত্রীদের একজন বেঁটে জুনিপার ‘টেরেসকেন’ গাছের ছোটো ছোটো কাঠের টুকরো গুঁজে আগুনটাকে জিইয়ে রাখছিল। সুন্দর পোশাক পরা হাসিখুশি মহিলার বয়স নেহাত কম নয়।

‘দুধ যখন ফুটছিল তখন আমি বিশাল তাঁবুঘরটা ভালো করে দেখছিলাম। তাঁবুর ভেতরটা যথেষ্ট গরম ও আরামদায়ক। বাইরের ধূসর কুয়াশাচ্ছন্ন স্যাঁতস্যেঁতে রূপের ঠিক বিপরীত। তাঁবুর দেওয়াল আর ছাদের অংশ রঙিন উলের হাতে কাজ করা কাপড়ে সাজানো। তাঁবুর দেওয়ালের নীচু অংশ থেকে শুরু করে পুরো ঘরটার মেঝে চামড়ায় ঢাকা। থাক থাক ভাঁজ করা জামাকাপড়। সন্দেহ নেই, এগুলো এই কঠিন আবহাওয়ায় অপরিহার্য। ঘরের খানিকটা রঙচঙে উল আর পশমের সুতোয় সুন্দর কাজ করা পর্দা দিয়ে আড়াল করা। এটা ঘরের মহিলাদের জন্যই করা হয়েছে। সেই পর্দা সরিয়ে মহিলারা একবার ঢুকে আবার বেরিয়ে আসছিল হাতে কাপসহ নানা পাত্র নিয়ে। ঘরের ঠিক মধ্যিখান যেখানে আগুনটা জ্বলছে, সেটা বাদ দিলে পুরো মেঝেটা জুড়ে ইয়াকের রোমশ চামড়া বিছানো। আমার বসার জন্য ঘরের একপাশে ইতিমধ্যেই আন্দিজান কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাকে সুন্দর বিশাল চিনা কাপে করে কড়াই থেকে তুলে যে গরম ঘন দুধ পরিবেশন করা হয়েছিল তা ছিল দারুণ মিষ্টি ও সুস্বাদু। আমাকে ঘিরে বসে থাকা বেগের আত্মীয় ও প্রতিবেশীদেরও সেই দুধ দেওয়া হচ্ছিল কাঠ ও লোহার পাত্রে। দুধ কিরঘিজদের অন্যতম প্রধান খাদ্য। আর এর উপকারিতা তাঁবুঘরে উপস্থিত সব বয়সের পুরুষ ও নারীর স্বাস্থ্যের জৌলুস দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

‘চলে আসার সময় করম শাহ্ একটা বিশাল চেহারার ভেড়া এনে হাজির করল…ওটা আতিথেয়তা ও শুভেচ্ছা হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে। আমি সানন্দে এটা গ্রহণ করতেই পারতাম। কারণ, আমি লক্ষ করেছি যে আমার লোকেরা মাংসের জন্য ওটাকে কেনার তাল করছিল। করম শাহ্ও নিশ্চয় ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল। কিন্তু আমি জানতাম কিরঘিজরা টাকার ব্যপারটা ভালোই বোঝে। টাকা ছাড়া এরা কিছু ছাড়তে চায় না। আমি ভেড়াটা উপহার হিসেবে গ্রহণ করলেও করম শাহকে জানাতে ভুলিনি যে এই উপত্যকা ছাড়ার আগে আমিও ওর জন্য কিছু দিয়ে যাব।

‘বেশ রাতের দিকে যখন আমি তাঁবুতে আমার লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত তখন করম শাহ্ এসেছিল। বেশ উত্তেজিত ছিল। জানাল, বুলুন-কুল থেকে এক চিনা অফিসার এসেছে আমার যাত্রার যাবতীয় আয়োজনের অনুমতি নিয়ে। করম শাহকে দেখে বুঝতে পারছিলাম যে ওর মন থেকে একটা গ্লানির বোঝা নেমে গেছে। এত দ্রুত যে সমাধান বার্তা এসে পৌঁছবে, এটা আমি আশা করিনি। করম শাহ্ জানিয়েছিল, কাল সকালে অফিসার আমার সঙ্গে দেখা করে অনুমতি পত্র হাতে দেবে।’

রাতের দিকে আবহাওয়া অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছিল।

১৬ তারিখ সকালে করম শাহ্ বুলুন-কুল থেকে আসা আম্বানের প্রতিনিধি আর সু-বাশির সেই পরিচিত কমান্ড্যারকে নিয়ে দেখা করতে এল। বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছিল তাই তাঁবুর বাইরে বসতে কোনো অসুবিধা ছিল না। আমার দলের লোকেরা সুন্দর সুন্দর চিনা চায়ের কাপ ভরতি চা এনে হাজির করেছিল। কোথা থেকে যে এত সুন্দর পাত্রগুলো ওরা জোগাড় করেছিল জানি না। আমাকে অফিসার জানালেন, যে-পথেই কাশগর যেতে চাই, আমার পরিবহণের ব্যবস্থা পেতে কোনো অসুবিধা হবে না।

কাশগর যাবার সংক্ষিপ্ততম পথ হল গেজ গিরিসংকট ধরে যাওয়া। কিন্তু সে-পথে নদীর ওপরকার সেতুগুলো নদীর জলস্রোতে ভেসে গেছে। শরৎকালের আগে সে-সব সেতু ঠিক হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর অন্য পথটি হল মুজতাঘ-আতাকে উত্তরদিক থেকে ঘুরে কারাতাশ গিরিপথ হয়ে। কিন্তু সে-পথ বড়ো কঠিন। বরফে অবরুদ্ধ প্রায়। আমি বলতে দ্বিধা করিনি যে দুটোর যে-কোনো একটা পথ ধরে আমাকে এগোতেই হবে। তবে যে-পথ ধরেই যাই না কেন, আমার অভিযানের মূল যা লক্ষ্য, সেই জরিপের কাজ করতে-করতেই যাব। আমি চিনা প্রতিনিধিদের পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম যে আমি কী করব।

কথাবার্তা শেষে ওরা চলে যেতে আমি ফটো-থিওডোলাইট যন্ত্র নিয়ে হ্রদের পূর্বদিকের কারাকির পাহাড়ের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। বৃষ্টি না হলেও পাহাড়-চুড়োর আশেপাশে মেঘ ঝুলে ছিল। আর প্রবল হাওয়ায় মেঘগুলো অবস্থান বদলাচ্ছিল দ্রুত। ইয়াকের পিঠে চড়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে অভীষ্ট জায়গায় পৌঁছলেও ঝড়ের মতো বইতে থাকা ঠান্ডা বাতাস আমার মোটা জামাকাপড় পরা শরীরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। আর মেঘগুলোও দ্রুত ঘুরতে থাকায় মাপজোকের কাজও ঠিকমতো করতে পারছিলাম না। তারপরে উত্তর ও পূর্বের সুউচ্চ বরফের প্রাচীর থেকে নিঃসৃত একের পর এক সুবিশাল হিমবাহ ধরা দিল দৃষ্টিতে। পরপর দাঁড়ানো তুষারমন্ডিত গিরিশৃঙ্গ, যাদের বলা যেতে পারে মুজতাঘ-আতা পর্বতশৃঙ্গের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের থেকে এইসব হিমবাহেরা এসেছে। ওদিকেই আছে মুজতাঘ আতার উত্তর দিক ঘেঁষা এক্কিবেল-সু এর গভীর উপত্যকা।

তিনটে নাগাদ মেঘের ঢাকনা সরে গিয়ে পুরো পাহাড়ের দৃশ্যপট খুলে গেল। আমার কাজের জন্য যা প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পুরস্কার। ঠান্ডায় বেঁকে শক্ত হয়ে যাওয়া নিঃসাড় আঙুল দিয়ে ফটো-থিওডোলাইটের কাঁটা ঠিক করতে গিয়েই খুলে গেছিল ওটা। কী আর করা! সঙ্গে আনা আমার অন্য একটা পুরোনো আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করতে হচ্ছিল। এই যন্ত্র দিয়ে কাজ করতে গেলে যন্ত্র সম্পর্কে অনেক দক্ষতা প্রয়োজন। তাই দ্রুত কাজ সারার জন্য খানিক চেষ্টায় ফটো-থিওডোলাইটের খুলে যাওয়া কাঁটাটা ঠিক করে নিতে পেরেছিলাম গিলগিটে মিসেস ডাবলিউর দেওয়া মাথার চুল ব্যবহার করে। এর জন্য ওঁর অশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য।

গিরিশিরা থেকে ফেরার সময় কাঁপতে কাঁপতে নামলাম। এত ঠান্ডা! শেষে ছোট্ট তাঁবুতে ফিরে জ্বালানি কেক দিয়ে আমার ‘স্টরমন্ট মারফি আর্কটিক স্টোভ’ জ্বালিয়ে তাঁবুর উষ্ণতা বাড়িয়ে খানিক আরাম পেয়েছিলাম। নিয়েছিলাম। এই জ্বালানি কেকগুলো লন্ডনের ‘মিলিটারি ইকুইপমেন্ট কোং’ থেকে জোগাড় করেছিলাম। যে-কোনো অভিযানের জন্য এই জ্বালানি কেকগুলো খুবই কাজের। আমার আট বর্গফুটের তাঁবুর উষ্ণতার দৌলতে মাঝরাত পর্যন্ত আমার খবরাখবর জানিয়ে দূরের বন্ধুদের চিঠি লিখলাম।

পাহাড়-চুড়োয়

১৭ জুলাই ঘুম থেকে উঠে তাঁবু থেকে বেরোতে না বেরোতেই ঝকঝকে আকাশ দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠেছিল। আকাশে এত টুকুও মেঘ নেই। মুজতাঘ-আতার বরফে ঢাকা চূড়া বিশাল নীল আকাশের ক্যানভাসে যেন নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। আমি এই আবহাওয়াই চাইছিলাম। অতি উচ্চতায় যেতে পরিষ্কার আবহাওয়া খুব দরকার। বৃষ্টির জন্য সাব-সার্ভেয়ারের রাম সিংয়ের মাপজোকের কাজ বিশেষ এগোয়নি। কাজ শেষ করার জন্য ওঁর খানিক সময় প্রয়োজন ছিল। আমিও ঝাড়াই-বাছাই করে যতটুকু লাগবে ততটুকু পোশাক-আশাক আলাদা করে ব্যাগে ভরে তৈরি হয়েছিলাম পাহাড়ের উঁচু ঢালে অভিযানের জন্য। হ্রদের কাছে চরে বেড়ানো করম শাহ্ বেগের ইয়াকের দল থেকে দশটা ইয়াক ভাড়া নেওয়া হয়েছিল মালপত্র বয়ে নিয়ে যাবার জন্য। এদের কয়েকটার পিঠে আমাদেরও চাপতে হবে।

এই যাত্রার জন্য যতটুকু লাগবে ততটুকু মালপত্র প্যাক করে বাকি মালপত্র আমার তুর্কি পরিচারক মির্জার জিম্মায় করে দিলাম। এ বেচারাকে করম শাহের তাঁবুঘরে রেখে গেছিলাম। লক্ষ করেছি, এই ক’দিনের টানা যাত্রায় ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ওর খানিক বিশ্রাম দরকার। আমি আমার কুকুর ইওলচিকে বেগকেও ওর কাছে রেখে গেলাম, কারণ অতি উচ্চতার বরফ সাম্রাজ্যে ওর পক্ষে চলাফেরা করা কঠিন হবে। যদিও দীর্ঘযাত্রার পরেও ওর ছটফটানিতে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।

দুপুরের খানিক আগে আমার কাশগর-বাসী পরিচারক সাদাক আখুন, হুনজা আর পুনিয়ালের তিন দলসঙ্গীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। ওরা কঠিন পাহাড়ি যাত্রায় কতটা দক্ষ এই যাত্রা তারও পরীক্ষা। দারুণ আবহাওয়া। ঝলমলে রোদ্দুর। উদ্দাম হাওয়াও নেই। উপত্যকার সমতল অংশ ফুল আর ভেষজের গন্ধে ম-ম করছিল। ক’দিন আগে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আশ্রয় পাওয়া সু-বাশির সামরিক আস্তানাটা পার হবার সময় জোরালো রোদে পোস্টটাকে প্রথম যা দেখেছিলাম তার থেকেও অবস্থাটা করুণ দেখাচ্ছিল। কতগুলো ঘর কোনোরকমে খাড়া হয়ে আছে।

শামালদার সুবিশাল প্রসারিত বাহুর পাদদেশ বেড় দিয়ে ইয়াম্বুলাক হিমবাহের দিকে চলছিলাম আমরা। মুজতাঘ আতা-র দুটো প্রধান শৃঙ্গের মাঝখানের ‘কল’(দুই শৃঙ্গের মাঝখানে ঘোড়ার জিনের আকারের নীচু গিরিসঙ্কট) বেয়ে তা নেমে এসেছে। তার উত্তর আর দক্ষিণে সুবিশাল পাহাড়ি ঢালের প্রহরা। ডক্টর হেডিনের অসাধারণ বর্ণনা থেকে এটা জেনে গেছিলাম যে মুজতাঘ-আতার কোনো শৃঙ্গে না উঠতে পারলেও অন্তত তার উচ্চতর ঢালে যাবার একমাত্র পথ হল ইয়াম্বুলাক হিমবাহের উত্তর প্রান্ত দিয়ে ওঠা সুউচ্চ ঢালটা। উপত্যকার শীর্ষদেশের কাছে দাঁড়িয়ে আমার ছোট্ট টেলিস্কোপটি চোখে লাগিয়ে উত্তরের পাহাড়ি ঢালটি ভালো করে দেখে মনে হয়েছিল যে উত্তর চূড়া পর্যন্ত এটি একটানা উঠে গেছে। আর দক্ষিণের ঢাল খুঁটিয়ে দেখে এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে ও-পথে ওপরে ওঠা একরকম অসম্ভব। জমাট শক্ত বরফের ওপর অসংখ্য আঁকিবুঁকি, ফাটলে ভরতি। বরফের ওপর আলগা পাথর বোঝাই। আর জায়গায় জায়গায় খানিক খাড়া হয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে কয়েকশো ফুট। উত্তরের ঢাল তুলনায় অতটা খাড়া নয় আর বরফও কম জমে আছে ওইদিকে। উত্তরের ঢাল ধরে ওঠাটা শুধু সহজ আর নিরাপদই হবে না, দ্রুত ওঠা যাবে বলেই আমার মনে হয়েছিল।

ডক্টর হেডিন উত্তরের যে ঢাল ধরে তিনবার মুজতাঘ-আতায় আরোহণ করতে চেষ্টা করেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ ওঁর লেখায় আছে। শুধু একটি বিষয় তাতে নেই। ১৮৯৪ সালের অভিযানের সময় ওই পথে ২০,০০০ ফুটের বেশি উচ্চতায় খুব বেশি বরফ জমে ছিল না। কিন্তু আজ টেলিস্কোপে যা দেখলাম তাতে সন্দেহ নেই ১৭,০০০ ফুট থেকেই ও-পথের পাথরের স্তর পুরু বরফে ঢেকে গেছে। সতিপ আলদি, আমার কিরঘিজ পথপ্রদর্শক যিনি ডঃ হেডিনের একটি অভিযানের সদস্য ছিল, তার মতে, গত দু-বছরের প্রবল তুষারপাতের ফলেই ওই ঢালের এই অবস্থা হয়েছে। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে ডঃ হেডিন ইয়াকের পিঠে চড়ে অনায়াসে যতটা উচ্চতা অবধি উঠে গেছিলেন, আমাদের ততটা অবধি ওঠার আশা করা বৃথা।

ইয়াম্বুলাক হিমবাহের পথে

১৭ তারিখ উপত্যকার উঁচু অংশে কতগুলো পশুচারকদের অস্থায়ী চামড়ার তাঁবু-ঘরের পাশে আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম। জায়গাটার নামও ইয়াম্বুলাক। অতিরিক্ত তুষারপাতের কারণে ওপরের বরফ-ঢাকা অংশে যাত্রা শুরু করার আগে নিরাপত্তার খাতিরে আমি আমার আর দলের লোকেদের জন্য কিছু অতিরিক্ত ইয়াক সঙ্গে নিতে চাইছিলাম। এতে ইয়াকদের ওপর কম চাপ পড়বে।

ইয়াক জোগাড় করতে খানিক সময় লেগে গেছিল। ১৮ তারিখ সকাল সাতটার সময় আমরা ইয়াম্বুলাক থেকে রওনা দিয়ে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ইয়াম্বুলাক হিমবাহের মোরেন ঢাকা অংশে পৌঁছে গেছিলাম। একঘণ্টা চলার পর আমরা পৌঁছেছিলাম উত্তর ইয়াম্বুলাক হিমবাহের নীচের অংশের গ্রেট মোরেনের কাছে। ওখানেই সমতল ভূমির শেষ। ওই জায়গায় তাঁবু লাগাতে বলে ওপরকার পরিস্থিতি বুঝতে আমি কয়েকজনকে নিয়ে ইয়াকের পিঠে চড়ে মোরেন বোঝাই ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করেছিলাম। যেখানে তাঁবু খাটাতে বলেছিলাম সেই জায়গাটার উচ্চতা ১৫,০০০ ফুটের ওপর। সদ্য জোগাড় করা অতিরিক্ত ইয়াকগুলো সঙ্গে নিয়েছিলাম। ওপরে উঠতে উঠতে ইয়াকগুলো রীতিমতো ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছিল। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না উচ্চতাজনিত কষ্ট বরফের রাজ্যের প্রাণীগুলোরও হচ্ছে। কোনো ভুল নেই বরফ আর আলগা পাথরভরা খাড়া পাহাড়ি পথে ইয়াকেরা নির্বিঘ্নে চলতে পারে। কিন্তু পিচ্ছিল খাড়া ঢালে পথ তৈরি করে নেওয়াটা সহজ ছিল না। প্রাণীগুলোকে নির্দিষ্ট দিকে চালিয়ে নিয়ে যেতে লাঠি ব্যবহার করতে হচ্ছিল। ওদের মর্জির ওপর ছেড়ে দিলেই উলটোদিকে নীচের দিকে নেমে যাবার চেষ্টা করছিল। আলগা পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে বরফে ঢাকা অংশে পৌঁছতেই ঘণ্টা খানেক লেগে গেছিল। জমি এখানে যথেষ্ট শক্ত। আরও এগিয়ে যেতে নরম তুষার পেয়েছিলাম। প্রথম প্রথম নরম আর অল্প গভীর তুষারের ওপর দিয়ে এগোতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। আধমাইল মতো এগোতেই ক্রমেই বরফের পরিমাণ বাড়তে শুরু করল। ১৬,৫০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে ইয়াকের পিঠ থেকে নেমে পড়তে বাধ্য হলাম।

সকাল সাড়ে দশটা বেজে গেছিল। সকালে যেই ছাড়া ছাড়া মেঘগুলোকে নীচ থেকে সুন্দর লাগছিল, সেগুলোই এখন আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে। যেখান পর্যন্ত আমরা ইয়াকের পিঠে চেপে পৌঁছতে পেরেছিলাম, সেখানেই একটি শিবির স্থাপন করা যেতে পারে বলে মনে হয়েছিল। ওখানে পাহাড়ের ঢাল খুব বেশি খাড়া ছিল না। তাঁবু খাটাতে কোনো অসুবিধাও ছিল না। কিন্তু ভেবে দেখেছিলাম, ওই উচ্চতায় তাঁবু খাটালে তার পরের লম্বা আরোহণের জন্য সেটা খুব একটা কাজের হবে না।

সামনের উচ্চতার কথা মাথায় রেখে আমার সঙ্গের দুই হুনজা মালবাহককে আরও ওপরে উঠে বরফের অবস্থা বুঝে এমন একটা সুবিধাজনক জায়গা খুঁজে বের করতে বললাম যেখানে তাঁবু ছাড়াই আমরা রাত কাটাতে পারি। ওরা এইসব বিষয়ে ভীষণ দক্ষ। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকায় আমি আর না এগিয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই ফটো-থিওডোলাইট যন্ত্রটি নিয়ে কাজ করতে শুরু করে দিলাম।

ক্রমাগত চারপাশে জড়ো হওয়া হালকা মেঘ আর জোরে বইতে থাকা হাওয়া আমাদের সময় নষ্ট না করার সতর্কবাণী দিচ্ছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানকার দৃশ্য মোহিত করে রেখেছিল। হিপসোমিটার জানাচ্ছিল যে জায়গাটার উচ্চতা ১৬,৮২০ ফুট। এখান থেকে ইয়াম্বুলাক হিমবাহের উপর আর নীচের দুই অংশই দেখা যাচ্ছিল। দু-পাশের পাথরের উঁচু দেওয়াল হিমবাহটিকে আঁকড়ে রেখেছে যেন। মুজতাঘ-আতার দুই চূড়ার মাঝের অংশ ভরাট করে নেমে আসা হিমবাহের শিখরদেশ তাজা বরফে ঢাকা। হিমবাহের ওপরের অংশে হাঁ করে আছে বিশাল বিশাল বরফের ফাটল। ধবধবে সাদা বরফের মাঝে বরফ-ফাটলের সবজে রঙের ছোঁয়া। সে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আমাদের উলটোদিকে পাথরের দেওয়াল সোজা উঠে গেছে প্রায় মুজতাঘ-আতার দক্ষিণ অংশের সর্বোচ্চ চূড়া পর্যন্ত। বরফের স্তূপ সেই পাথরের দেওয়ালের মাথায় জমে।

হুনজা গাইডদের রেহাই

হালকা মেঘের আড়াল থেকে সূর্যদেব মাঝে মাঝে উঁকিঝুঁকি মারলেও প্রবল হাওয়া আমাদের কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সে কারণেই ফটো-থিওডোলাইটের সূক্ষ্ম যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে সময় লাগছিল। ইয়াকের দায়িত্ব নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসা দুই কিরঘিজ ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছে বলে জানিয়েছিল। আমার কাজ শেষ হবার আগেই আমিও উচ্চতাজনিত অসুস্থতা টের পাচ্ছিলাম। ইয়াকদের দেখভালকারীদের থেকে এখানকার টোপোগ্রাফিক্যাল কোনো তথ্য যে পাওয়া যাবে না তা বুঝে গেলাম। আমার হুনজা কুলিদের দেখা পাবার আশায় থেকে থেকে ওপরের বরফ-ঢালের দিকে তাকাচ্ছিলাম। যত বেলা গড়াচ্ছিল ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলাম। বিকেল পাঁচটা নাগাদ ওরা ফিরে এল। পাহাড়বাসী হয়ে জন্মানো শক্তপোক্ত ওয়ালি মহম্মদ এবং ঘুনকে বিধ্বস্ত লাগছিল। পেঁজা তুষারের মধ্যে দিয়ে তারা উঠে গেছিল হিমবাহের অনেকটাই ওপর পর্যন্ত। সেখানে তারা দেখেছে যে অনেক ওপরে একটা ছোটো হিমবাহ পাশের পাহাড়ের ঢাল থেকে এসে মিশেছে এই হিমবাহে। ওরা ওই পর্যন্ত পৌঁছে আর এগোতে পারেনি।

ওদের কথা শুনে এটা আমার পরিষ্কার মনে হয়েছিল যে আগের দিন যা ভেবেছিলাম সেটাই ঠিক…এই গিরিশিরা মুজতাঘ আতার আনুমানিক ২২,০০০ ফুট উঁচু চূড়া পর্যন্ত গেছে। লক্ষ করেছি, হিমবাহের টুকরো টুকরো বরফ ফাটলগুলো উত্তরের গিরিশিরার খানিক নীচ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। ওয়ালি মহম্মদ আর ঘুনের বর্ণনা থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছিল যে এটি একটি ‘ট্রান্সভার্স হিমবাহ’, যাকে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।

দুজনেই জানিয়েছিল যে ওপরে ভীষণ ঠান্ডা। শুধু তাই নয়, ওপরে উঠে খুব শ্বাসকষ্টও হচ্ছিল ওদের। হিমবাহের কিনারা ঘেঁষেই ওরা এগিয়ে গেছিল। কিন্তু এমন একটাও জায়গা পায়নি যেখানে রাত কাটানো সম্ভব। এমনকি ছোটো তাঁবু খাটানোর অবস্থাও নেই। সবখানেই তুষার ভীষণ গভীর। এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে এই পথ দিয়ে মুজতাঘ-আতার শীর্ষে পৌঁছানো খুবই কঠিন। যা করতে হবে তা হল চূড়ার পৌঁছানোর জন্য ওপরে এক রাত কাটানোর পরিকল্পনা বিসর্জন দেওয়া। আমার লোকেরা যেখান পর্যন্ত পৌঁছেছিল, সেখানে গিয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হবে। সবচাইতে চমকপ্রদ হল ১৮৯৪ সালে এ-পথ ধরেই ডক্টর হেডিন ইয়াকের পিঠে চড়ে কুড়ি হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। এর অর্থ, সেই সময় হিমবাহটির এরকম অবস্থা ছিল না। পাশাপাশি এটাও ডক্টর হেডিন বলেছিলেন, শীর্ষে পৌঁছানো পুরোটাই নির্ভর করছে পরিষ্কার আবহাওয়া আর শারীরিক সক্ষমতার ওপর। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আবহাওয়া ঠিক থাকলে আমার হুনজা সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে ওরা খানিক আগে যে-পথ দিয়ে এগিয়েছিল, কাল সে-পথ ধরে ওপরে চড়ব।

ঝাঁপিয়ে পড়া হিংস্র ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে আমরা দ্রুত নামতে শুরু করেছিলাম নীচে আমাদের তাঁবুর আশ্রয়ের দিকে। পৌঁছে দেখি মোরেনের ধার ঘেঁষে আমার তাঁবু খাটানো রয়েছে। আর কারাসু থেকে রাম সিংও এসে গেছিলেন। যখন আমি তাঁবুতে ঢুকলাম তখনই আকাশ মেঘলা হয়ে গেছিল।

পরদিন ভোর সাড়ে তিনটের সময় যখন ঘুম থেকে উঠে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি থম মেরে আছে চারপাশ, পরিষ্কার ঝড়ের ইঙ্গিত। খানিক সময়ের মধ্যেই প্রবল হাওয়ার সঙ্গে তুষার ঝরতে শুরু করেছিল। পুরু পশমের জ্যাকেট পরে কপাল কুঁচকে দেখছিলাম ঝড়ের তাণ্ডব। ভেবেছিলাম পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে। কিন্তু ছ’টার পরে ঝড় থেমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছিল। ডক্টর হেডিনের বর্ণনা হুবহু মিলে যাচ্ছিল। উনি লিখেছিলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই ভোরের দিকে তুষার-ঝড় আছড়ে পড়ে এই মহান পর্বতের কোনো না কোনো দিকে।’

ইয়াকগুলো তৈরিই ছিল, সকাল সাতটা নাগাদ সূর্যের মুখ দেখা দিতেই যাত্রা শুরু করতে বলেছিলাম। কিরগিজেরা আর যেতে চাইল না। গতকালই টের পেয়েছিলাম, ওরা এ এলাকায় কোনো কাজে লাগবে না। অগত্যা আমার হুনজা সাঙ্গোপাঙ্গরা, আর্দালি আজব খান, পুনিয়ালি আর্দালি আর সাব-সার্ভেয়ার রাম সিংকে নিয়ে আমি পাহাড় চড়া শুরু করলাম। রাম সিং এর যন্ত্রপাতি নেবার দায়িত্বে ছিল কোকিয়ার থেকে আসা সৎ-স্বভাবের তুর্কি ‘কিরাকাশ’( টাট্টুঘোড়া-বরদার বলা যেতে পারে) হাই বাই। সে ক্যাপ্টেন ডিজির ক্যারাভ্যানের সঙ্গী হয়ে লাদাখ থেকে কাশ্মীরে গেছিল। আপাতত সে কাশ্মীরে আমার ক্যাম্পে ফিরে যাবার জন্য মুখিয়ে ছিল।

এবার আর অতিরিক্ত ইয়াকগুলো সঙ্গে নেওয়া হয়নি। ঘণ্টাখানেক চলার পর গতকাল যেখানে এসেছিলাম সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। বেগে হাওয়া চললেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। আমরা উঠতে শুরু করেছিলাম ওপরপানে। ক্রমশ বেড়ে চলা তুষারে ঢাকা ঢাল বেয়ে উঠতে ইয়াকগুলো যথারীতি বেগড়বাই করছিল। ঘাড় নাড়তে নাড়তে এগোচ্ছিল এক-পা দু-পা করে। জন্তুগুলোর পিঠে বসে ওদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটা খুবই সমস্যার কাজ ছিল। বার বার ওদের পিঠ থেকে নেমে পড়ে নাছোড় প্রাণীগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে বরফ-ঢালের ওপরদিকে তুলতে হচ্ছিল। গতকাল যেখানে পৌঁছেছিলাম সেখান থেকে ইয়াকগুলো নিয়ে ঘণ্টা খানেক কসরত করে মাত্র ৫০০ ফুট মতো রাস্তা এগোতে পেরেছিলাম। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ইয়াকগুলো নিয়ে আর এগোনো ঠিক হবে না। ওখানেই ছেড়ে রেখে গেলাম ওদের। তুষারপাতে বরফের পরিমাণ বেড়ে গেছিল। নয় নয় করেও পাঁচ ফুটের ওপরে তুষার জমে ছিল। আমাদের আল্পাইন স্টিকগুলো বরফের নীচের পাথর-স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারছিল না। আগেরদিন এ-পথে আসা আমার হুনজা সঙ্গীদের বরফের ওপর রেখে যাওয়া পায়ের ছাপ হারিয়ে গেছিল সকালের তুষারপাতে। পাথরের খাড়া পাঁচিলের ধার ঘেঁষা যে-পথ দিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম, তার ওপরে জমে থাকা বরফ দেখে মনে হচ্ছিল এগুলো সাম্প্রতিক শীতেই জমছে। প্রবল শক্ত হয়ে যায়নি বরফগুলো। শুধু পাথরগুলোকে আঁকড়ে রেখেছে। একদিক থেকে আমরা নিরাপদেই ছিলাম। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উলটোদিকের পাথরের দক্ষিণ দেওয়ালটি বেয়ে ওপরের দিক থেকে ছোটো ছোটো ধস নামতে শুরু করল।

নরম তুষারের ওপর দিয়ে পর্বতারোহণ মোটেই সহজ কাজ নয়। প্রতি পদক্ষেপে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিলাম আমরা। আর আগে চলতে থাকা সঙ্গীর পায়ের দাগের ওপর পা না ফেলে একটু এদিক-ওদিক পা ফেললেই কোমর সমান বরফে সেঁধিয়ে যাচ্ছিলাম। একদিক থেকে বাঁচোয়া, উচ্চতাজনিত অসুস্থতার লক্ষণ কারও মধ্যে এখনও দেখা যায়নি। যদিও উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁফ ধরছিল দ্রুত, খানিক পরপর দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস নিতে হচ্ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ার গতিও বাড়ছিল, সঙ্গে শুরু হয়েছিল হালকা তুষারপাত। মাঝে-মাঝেই ওপরের ঢাল থেকে গড়িয়ে আসছিল ছোটো ছোটো বরফের গোলা। দুপুরের আগে আগে আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে পাশের পাথরের দেওয়াল থেকে খানকয়েক পাথরের খোঁচ বেরিয়ে রয়েছে। আর পাথরগুলো ছিল বরফশূন্য, শুকনো। আমরা ওখানেই খানিক বিশ্রাম আর সামান্য খাওয়াদাওয়া সেরে নেবার জন্য দাঁড়ালাম। ইয়াম্বুলাক হিমবাহটা চওড়া সাদা ফিতের মতো দুই পাথরের দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে নেমে গেছে নীচের দিকে। অবাক হয়ে গেছিলাম এটা দেখে যে আমরা পৌঁছে গেছি প্রায় ১৯,০০০ ফুট উচ্চতায়। আর এই দীর্ঘ আরোহণের পরেও ক্লান্তি বা খিদে আমাদের কাবু করতে পারেনি।

আবার হালকা তুষারপাত শুরু হয়ে গেছিল। খানিক পর তুষারপাত বন্ধ হতেই আমরা আবার চড়তে শুরু করলাম। রাম সিং আর আজব খানের মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছিল। তাছাড়া তাদের শরীরেও ঢিলেমি এসে গেছিল। ডক্টর বেলিউর পরামর্শ আমার মাথায় ছিল। ওদের খানিক পটাশের গুঁড়ো খেতে দিলাম। আমিও খানিক নিলাম। দুপুর দেড়টা নাগাদ রাম সিংও আর না এগিয়ে ওখানেই থেকে গেছিলেন । প্রবল বাতাস পাহাড়ের ওপরের অংশকে ঢেকে থাকা মেঘের চাদর সরিয়ে দিয়েছিল। ওখানে থেকেই রাম সিং চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলোকে নিয়ে ওঁর সার্ভের সূক্ষ্ম ‘প্লেন-টেবিল’-এর কাজগুলো সেরে নিয়েছিলেন। মিনিট কুড়ি যেতে না যেতেই দুঁদে পর্বতারোহী আজব খান ক্লান্তিতে ভারসাম্য ঠিক রাখতে না পেরে পা পিছলে পড়ে গেল। ভাগ্য ভালো কোনো অঘটন ঘটেনি। ও আর এগোতে চায়নি। আমার অনুমতি নিয়ে নীচে নেমে গেছিল। আমার সঙ্গে শীর্ষে যাওয়ার দলে অবশিষ্ট ছিল ওয়ালি মহম্মদ, গুন আর দুই হুনজা কুলি। পাহাড়ের মাথায় চড়ার জন্য ওরা উত্তেজনায় ফুটছিল। জমা তুষারের পরিমাণ বেড়েই চলছিল। পাহাড়-চুড়ো ঘিরে থাকা মেঘ স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে শীর্ষে পৌঁছে কোনো জরিপের সুযোগ পাব না। আবহাওয়া দ্রুত বদলাচ্ছিল। বলে দিচ্ছিল যে আর এগোনো ঠিক হবে না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি সামনের শৈলশিরার একটা অংশকে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে স্থির করে নিয়েছিলাম। বিকেল আড়াইটে নাগাদ শৈলশিরার শীর্ষে পৌঁছে নীচের দিকে নেমে যাওয়া বিপজ্জনকভাবে খাড়াই পাথরের দেওয়াল যেটা নীচে সোজা হিমবাহটার দিকে গিয়ে মিশেছে, তার গা ঘেঁষে খানিক বসলাম।

আনন্দ দর্শন

ঝোড়ো হাওয়ায় হিপসোমিটারের জন্য জল গরম করা এক দুঃসাধ্য কাজ। বরফের মধ্যে গর্ত করে হাওয়া আটকে জায়গা করে, কুকিং কেক জ্বালিয়ে, তার ওপর পাত্রে বরফ চাপিয়ে খানিক জল গরম করে, তাই দিয়ে হিপসোমিটারে জায়গাটার উচ্চতার মাপ পাওয়া গেছিল। প্রায় কুড়ি হাজার ফুট। ঘণ্টা ছয়েক টানা আরোহণের পরেও আমাদের শারীরিক অবস্থা মোটামুটি ঠিকই ছিল। চুড়োয় উঠতে কোনো অসুবিধা হত না। কিন্তু বাতাসের বেগ যেমন বাড়ছিল তেমনি আলোও কমে আসছিল। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে পড়ন্ত আলোয় আর এগোনো ঠিক হবে না। নেমে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আগামীকাল সব ঠিক থাকলে আবার চেষ্টা করা যাবে এটা ভেবে নিয়েছিলাম। চুড়োয় পৌঁছতে না পারলেও যে-দৃশ্য দেখেছিলাম, তাতে মন ভরে গেছিল। পশ্চিমদিকের মেঘ সরে গিয়ে পুরো রেঞ্জটা নিজেকে মেলে ধরেছিল আমাদের সামনে। তুষারের বুক থেকে উঠে আসছিল একটা মৃদু সুগন্ধ। সামনের দিকে সোজা ধু-ধু করছে পামিরের বিস্তৃত অঞ্চল। উপত্যকার পর উপত্যকা। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম ‘পৃথিবীর ছাদ’কে। এই উচ্চতা থেকে না দেখতে পেলে পৃথিবীর ছাদের বিশালতাকে উপলব্ধি করতে পারতাম না। দক্ষিণ-পশ্চিম দিগন্তে চিকচিক করছিল বরফে ঢাকা পাহাড়-দৈত্যরা। ভেবেছিলাম ওদের চিনতে পারব। না, সিন্ধু উপত্যকার রক্ষাকর্তাদের চিনতে পারিনি। উত্তরের কয়েক গগনচুম্বী পর্বতশৃঙ্গকে মানচিত্রের কল্যাণে শুধু চিনতে পেরেছিলাম, মাউন্ট কউফম্যান আর ট্রান্স-আলাই রেঞ্জের কিছু বরফ-শিখরকে। ওই চূড়াগুলোর শীর্ষদেশ অবশ্য তুলোর মতন সাদা মেঘে ঢেকে ছিল।

এই অদ্ভুত অসাধারণ দৃশ্যের সঙ্গে প্রবল ঠান্ডা আর ঝোড়ো বাতাস শুধু আমাকেই নয়, আমার সঙ্গীদেরও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল সমৃদ্ধ চারণভূমি। সঙ্গোপনে পড়ে থাকা সুবিস্তৃত চারণভূমি সম্পর্কে ছোট্ট হুনজা উপত্যকার মানুষদের সম্ভবত কোনো ধারণা নেই। আমি আমার হুনজা সঙ্গীদের বিস্ময় আর উত্তেজনা বেশ অনুভব করতে পারছিলাম। সাহসী অথচ নম্র পাহাড়ি হুনজাদের ঠোঁটের অভিব্যক্তি বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওদের মনের না বলা কথা। পশুর দল নিয়ে চারণের প্রতীক্ষায় অনাবিষ্কৃত ভূমি। ওদের কথাবার্তায় কনজুটিদের কথা উঠে আসছিল। কনজুটিরা এখন শান্তির পক্ষে। এখন শান্তিতে ওই অঞ্চলে পশুর দল চরাতে নিয়ে যাওয়া যাবে। ওয়ালি মহম্মদ ওর বাবার স্মৃতিচারণ করছিল, কীভাবে একবার তাঘরমার চারণদারদের এক বিশাল পশুর পালকে কিরঘিজরা আক্রমণ করে লুটে নিয়েছিল। ঘটনাটা ঘটেছিল এই পাহাড়ের পাদদেশেই, যেখানে রয়েছে আমাদের শিবির। অবশ্য এখন সরকার খুব কড়া। কনজুটিরা লুটপাট করার সাহস দেখায় না। আমি সুখের দিনের সেই স্বপ্ন নিয়ে মুখে কোনো মন্তব্য করিনি। কিন্তু অন্তর থেকে নীরবে ওদের জন্য শুভকামনা জানিয়েছিলাম। প্রশাসন যদি দক্ষিণ থেকে উত্তরে তাদের আধিপত্য ঠিক ঠিক বজায় রেখে নজরদারির কাজটি চালিয়ে যায় তবে সন্দেহ নেই হুনজারা আমুদরিয়া থেকে কাশগর সীমান্ত পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারবে।

সন্ধে ছ’টা নাগাদ ওপরে ওঠার সময় যেখানে খানিক খাওয়াদাওয়া আর বিশ্রাম নিয়েছিলাম, সেই পাথরের খোঁচের কাছে পৌঁছে দেখি পাথরের খাড়া ঢালের ধারে হিমবাহের কোল ঘেঁষে তাঁবু খাটিয়ে রেখেছেন রাম সিং আর আজব খান মিলে। ভীষণ আনন্দ হয়েছিল। কোনোক্রমে তাঁবু খাড়া করা। প্রবল হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল তাঁবুগুলো। তাঁবুর ভেতর ঢুকে ফরফর আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল যেন উথালপাতাল মাঝ-সমুদ্রে জাহাজের কেবিনে বসে আছি। তাঁবুতে ঢুকেই যে-কাজটা আমায় প্রথমে সারতে হয়েছিল তা হল রাম সিং আর আজব খানের খানিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ওদের মাথাব্যথার সঙ্গে বমি বমি ভাব ছিল। অতি উচ্চতাজনিত রোগের লক্ষণ। তাঁবুর বাইরে দুই হুনজা কুলি সঙ্গে আনা ভেড়ার মাংস নিয়ে মেতে ছিল। ওদের হাসির শব্দ আর কথাবার্তা কানে এলেও ওদের আলোচনার বিষয় যে কী ছিল তা বুঝতে পারিনি। সামান্য খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

বাতাসের হিংস্র শব্দ আর ইয়াম্বুলাক হিমবাহের অন্য কিনারা থেকে ভেসে আসা ঘনঘন তুষার-ধসের ভয়াবহ আওয়াজে স্বস্তিতে ঘুমোতে পারছিলাম না। হালকা তুষারপাতও হয়েই চলেছিল। একদিক থেকে খানিক নিশ্চিন্তে ছিলাম, হিমবাহের এ প্রান্তে যেখানে আমরা তাঁবু খাটিয়ে আছি সে জায়গাটা তুলনায় অনেকটাই নিরাপদ।

ভোর ছ’টায় ঘুম ভাঙতে বাইরে বেরিয়ে দেখি ইঞ্চি দু-এক তাজা বরফ জমেছে কালকের বরফের ওপর। মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। আবহাওয়া পরিষ্কার হবার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার ছিল না। কিন্তু পরিষ্কার আবহাওয়া আমাদের কপালে ছিল না। তাঁবুর বাইরের হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রায় প্রবল বাতাসে আমরা কেঁপে উঠছিলাম। বেলা বাড়লেও আবহাওয়া ভালো না হওয়ায় আমাদের শীর্ষে আরোহণের ইচ্ছে বিসর্জন দিয়ে তাঁবু গুটিয়ে নীচের দিকে নামতে বাধ্য হলাম। শীর্ষ আরোহণের জন্য অতিরিক্ত দিন বরাদ্দ করার সুযোগ আমার কাছে ছিল না।

শামালদায় মাপজোক

২০ জুলাই সন্ধে নাগাদ আবার ইয়াম্বুলাক জিলগার ঘাসজমিতে কিরঘাসের পাশে গিয়ে তাঁবু খাটালাম। পরদিন সকালে আমি রাম সিংকে সঙ্গে করে জরিপের সরঞ্জাম নিয়ে চড়েছিলাম কাম্পার-কিশলাক হিমবাহের উত্তরদিকে মুজতাঘ-আতা থেকে নেমে আসা শামালদা নামের এক শৈলশিরায়। চারপাশে উদ্দাম গতিতে বয়ে চলা প্রবল কনকনে ঠান্ডা বাতাসে বিস্ফোরণের মতো আওয়াজ উঠছিল। পাহাড়ের উলটোদিক মেঘ আর কুয়াশায় ঢেকে। ওইরকম পরিস্থিতিতে ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে কাজ করা বেশ কঠিন ছিল। মেঘ আর কুয়াশার চাদর মাঝে মাঝে সরে গিয়ে উপত্যকার পরিষ্কার ছবি ফুটিয়ে তুলছিল আমাদের চোখের সামনে। আমার সামনে যেন একটি রিলিভো (রিলিফ) মানচিত্র কেউ তুলে ধরেছে। জায়গাটার উচ্চতা ১৪,৭৫০ ফুট। কারাকুল হ্রদের উত্তর-পূর্বের সুউচ্চ চূড়া পর্যন্ত এলাকা আমাদের জরিপের (triangulation পদ্ধতিতে) আওয়ায় আনা হল।

দীর্ঘ সময় শৈলশিরার মাথায় হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে শিবিরে নেমে এলাম। ইতিমধ্যে আমাদের শিবির হ্রদের দক্ষিণে সরিয়ে নিয়ে গেছিল আমার লোকেরা। শিবিরে পৌঁছে দেখি ‘কিরাকাশ’দের একটি দল সঙ্গে দশটা টাট্টুঘোড়া নিয়ে হাজির হয়েছে। মিঃ ম্যাকার্টনি আমার কাজে লাগতে পারে বলে কাশগর থেকে নতুন করে পরিবহণের ব্যবস্থা করে পাঠিয়েছেন। ওদের সঙ্গে পাঠানো একরাশ চিঠি পেয়ে আমার মন আনন্দে নেচে উঠেছিল। ইউরোপ থেকে রাশিয়ার পোস্ট সমরকন্দ হয়ে, কাশগর থেকে সে-চিঠি পৌঁছেছিল আমার কাছে। একটা চিঠির পোস্ট করার তারিখ ছিল ২৪ জুন। প্রমাণ হয়ে গেছিল, রেলওয়ে মুজতাঘ-আতার ঢালকেও বাইরের দুনিয়ার কাছে নিয়ে এসেছে।

২২ জুলাই আকাশ আচমকাই পরিষ্কার হয়ে গেছিল। মহিমাময় সুবিশাল পাহাড়ের দৃশ্য চোখের সামনে নিখুঁতভাবে ফুটে থাকায় দিনটি কাজের মধ্যেও দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠল। উত্তর-পূর্বের হিমবাহ আবৃত উত্তুঙ্গ পাহাড়শ্রেণি যা আমাদের ম্যাপে ‘কঙ্গুর’ নামে উল্লেখিত, যার কোনো স্থানীয় নাম বা আলাদা করে কোনো পরিচিতি নেই, সেও ঘণ্টা খানেকের জন্য তার শরীরের ওপরকার মেঘের ওড়নার আবরণ সরিয়ে রেখেছিল। আমাদের যন্ত্রপাতি ও অঙ্কের হিসেব অনুযায়ী হিমবাহের ওপরের অংশের কঙ্গুর-দেবে এবং কোকসেলের সর্বোচ্চ পাহাড়-চূড়ার উচ্চতা যথাক্রমে ২৩,৬০০ এবং ২৩,৪৭০ ফুট। কাছাকাছি উচ্চতার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী পর্বতশিখর মুজতাঘ আতা ২৪,৩২১ ফুট।

কাশগর থেকে আসা ঘোড়া-চালকদের কাছ থেকে একটা কথা জানতে পেরে খুব আনন্দ হয়েছিল যে কারা-তাশ গিরিপথ যা ‘কালো পাথর’ নামেও পরিচিত, সেই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁক আমাদের দিয়ে এগোতে হবে না। এই পাহাড়ের ফাঁক দক্ষিণে ‘বরফ পাহাড়ের পিতা’কে অন্য পাহাড়শ্রেণি থেকে আলাদা করে রেখেছে। এই কঠিন যাত্রার পরিবর্তে আমরা গেজ গিরিসংকট দিয়ে যেতে পারব। যদিও আমি ইয়ামানিয়ার নদীর জলের টইটুম্বুর অবস্থার কথা ভেবে এই পথের কথা মন থেকে আগে সরিয়ে দিয়েছিলাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%