মার্ক অরেল স্টাইন
কাশ্মীরের মোহন্দ মার্গের আলপাইন অধিত্যকাতে টানা তিনটি গরমকাল তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছিলাম।
সেখানে থাকাকালীন ১৮৯৮ সালের জুন মাসে ভারত সরকারের কাছে কাশ্মীর ও তার উত্তরের পর্বতমালা ছাড়িয়ে সুদূর খোটান মরুভূমি অঞ্চলে এক পুরাতাত্ত্বিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা জমা দিয়ে অনুমতির অপেক্ষায় বসেছিলাম। দু-বছর কেটে যাওয়ার পর ১৯০০ সালের মে মাসে অবশেষে সেই অনুমতি এল। অনুমতি নিয়ে আবার ফিরে গেলাম সমুদ্রতল থেকে ১০,০০০ ফুট উঁচু আমার প্রিয় মোহন্দ মার্গের শিবিরে আর দূরের তুষার-ঢাকা পর্বতমালার পাথুরে দেওয়ালের মাথাগুলো তৃপ্ত চোখে চেয়ে দেখতে লাগলাম। এখানে বসেই আমি খোটানের মরুভূমিতে অভিযান চালানোর রূপরেখা ছকেছিলাম!
আসলে দিস্তা দিস্তা চিঠি আর ফাইল চালাচালি করে অনুমতি পেতে পাক্কা দু-বছর লেগেছিল। অনেক টানা-হ্যাঁচড়ার পর অভিযান চালানোর প্রস্তুতি শুরু করতে পেরে তাই খানিকটা স্বস্তি এসেছিল। এরই মধ্যে সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য ছোটো ছোটো কয়েকটা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থল ঘোরাঘুরিতে ভারতের অনেক জায়গা দেখবার সুযোগ হয়ে গিয়েছিল। ছুটিগুলো মহানন্দে দৌড়াদৌড়ি করে উপভোগ করছিলাম। এর আগে লাহোরে এগারো বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে কাটিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময় সবসময় প্রাচ্যের প্রাচীনত্বের স্পর্শ অনুভব করতাম।
লাহোর থেকে আমার বদলি হয়েছিল কলকাতায়। ‘প্রাসাদ নগরী’ কলকাতার স্যাঁতস্যেঁতে আবহাওয়া আর পাশ্চাত্য ধাঁচের বড়ো বড়ো প্রাসাদে ভরা পরিবেশে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। মনে হত আমি বোধহয় লন্ডনেই কোনো ক্রান্তীয় শহরতলীতে আছি। কলকাতা থেকে আমি সিকিমে যাই। সিকিম এক আশ্চর্য আধা-তিব্বতী পাহাড়ি দেশ, যার প্রকৃত আলপাইন নিসর্গের মধ্যে দেখেছিলাম গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছগাছালির সমারোহ।
এরই ফাঁকে গিয়েছিলাম দক্ষিণ বিহারে...প্রাচীন মগধে। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১২০০ বছর আগে তাঁর বর্ণনা করা বৌদ্ধ স্তূপ ও মঠের ধ্বংসাবশেষগুলোর মধ্যে ঘোরাঘুরি করছিলাম।
ঘুরে বেড়িয়েছিলাম সিন্ধু নদের ধার দিয়ে আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায়। ক্লাসিকাল গ্রিসের শিল্পকলার ছাপ সেখানে সুপ্রাচীন ‘গ্রেকো-বৌদ্ধ’ মূর্তির মধ্যে পরিচয় রেখে গেছে। যদিও বুড়ি ছোঁয়ার মতোই এক ঝলক দেখেছিলাম অজস্র প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির আর মঠের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে সেসব অসংখ্য ‘গ্রেকো-বৌদ্ধ’ ভাস্কর্য।
এখানে-ওখানে যতই ঘুরে বেড়াই না কেন, আমার মাথার পেছনে একটাই ছবি ঘুরে ফিরে আসত, হিমালয়ের ও-পারে কী আছে! মে মাসের এক ভ্যাপসা গরমের রাতে কলকাতায় বসে আমার অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে খানিক হাঁফ ছেড়েছিলাম। শুরু করেছিলাম প্রস্তুতি। আসলে এই অভিযানের জন্য হাজারও খুঁটিনাটি জিনিসের প্রয়োজন ছিল।
অভিযান শুরুর আগে অফিসের নানা কাজের পাশাপাশি অনেক লেখালেখিও শেষ করা জরুরি ছিল। ব্যক্তিগত সরঞ্জাম ছাড়াও প্রচুর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির দরকার অভিযানের জন্য। সেই জোগাড়যন্ত্রটাও যেন একটা ছোটোখাটো অভিযান। তাঁবুর অর্ডার দিয়েছিলাম কৌনপোর (কানপুর) -এর এলগিন মিলকে। গ্যালভানাইজড লোহা দিয়ে জলের ট্যাঙ্ক বানাতে বলেছিলাম কলকাতার এক কারখানাকে। মরুভূমিতে এগুলো সব লাগবে। টিনবন্দি খাবার, ছবি তোলার সরঞ্জাম, আর আধা-মেরু হেন অঞ্চলে কাটানোর উপযোগী শীতবস্ত্রের অর্ডার করেছিলাম লন্ডনে।
অভিযানের সব সরঞ্জাম এক এক করে শ্রীনগরে পৌঁছে যাচ্ছিল।
আসলে কলকাতায় নয়, শ্রীনগরে বসেই আসল অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব ছিল। কলকাতায় এই সময় প্লেগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়াতে খারাপ লাগলেও আমি খানিক আনন্দ পেয়েছিলাম অন্য কারণে। প্লেগের হাত থেকে রক্ষা পেতে কলকাতার কলেজগুলোতে গ্রীষ্মের ঢের আগেই গ্রীষ্মকালীন ছুটি ঘোষণা করে দিয়েছিল। ফলে আমিও অফিসের কাজ থেকে মুক্তি পেয়ে এপ্রিলের দশ তারিখে উত্তর ভারতের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। যাত্রা শুরুর আগে অধুনা প্রয়াত বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জন উডবার্নের সঙ্গে দেখা করে আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম। উনি ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিলে এই অভিযান করা যেত না।
সপ্তাহটাক সময় লাহোরেও কাটিয়েছিলাম অভিযানের প্রস্তুতিতে। পোশাক-আশাক ছাড়াও অনেক খুঁটিনাটি জিনিস দরকার ছিল। এই কাজে লাহোরের পুরোনো বন্ধুরা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। শুধু কেনাকাটাই নয়, সেগুলো কাশ্মীরে পাঠানোর বন্দোবস্তও করতে হয়েছিল। কলকাতার পরে পাঞ্জাবের বসন্ত যেন খানিক শীতল লেগেছিল। রাওয়ালপিন্ডিতে টাঙ্গায় চেপে মুরির দিকে যেতে যেতে ঝিলম উপত্যকার ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে গেছিল। আমি লাহোরে থাকাকালীন প্রাচীন হাইডাসপেস (Hydaspes/ ঝিলম বা বিতস্তা) ধরে প্রায়শই বেরিয়ে পড়তাম। (এখানেই আলেকজান্ডারের সঙ্গে পুরুর সেই বিখ্যাত যুদ্ধ হয়েছিল)। ঝিলম এখানেই পাহাড় থেকে সমতলে মিশেছে। তবে আগেভাগে ছুটি না পড়লে এখানে আসতাম আরও গরম পড়লে। তখন ছোটো ছোটো গাছের ঝাড়গুলো ফুলে সেজে উঠত। মিষ্টি গন্ধ মিশে থাকত হাওয়ায়। দূরে পাহাড়ের বরফঢাকা চূড়াগুলো চকচক করত।
২৫ শে এপ্রিল বরামুলার গভীর গিরিখাত ধরে কাশ্মীর উপত্যকায় আবার পা রাখলাম। প্রাচীনকালে এই বরামুলা গিরিখাতই ছিল ‘কাশ্মীর রাজ্যে প্রবেশের পশ্চিমের সিংহদ্বার’। দূরের মহান পিরপাঞ্জাল পর্বতমালা এখনও বরফে মুড়ে। এই পিরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণি প্রাচীরের মতো কাশ্মীরকে বাকি দুনিয়া থেকে আড়াল করে রেখেছে। বরামুলা থেকে সামনের নদীবিধৌত সমতল তখন ফুলে ছেয়ে গেছে। বসন্ত রঙিন কার্পেট বিছিয়েছে সর্বত্র। নীল-সাদা আইরিস ফুলে ছেয়ে আছে গ্রামের সমাধিস্থল আর পোড়ো জমির আনাচ-কানাচ।
বরামুলাতে পরিচারকের দল আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ভারী লটবহর দিয়ে ওদের আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এখান থেকে শ্রীনগরে যাওয়ার জন্য আমরা নৌকোয় উঠলাম। আগের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, শ্রীনগরে যাওয়ার এর থেকে মনোমুগ্ধকর যাত্রাপথ আর হয় না।
দিনটা একটা ‘ডোঙা’ নিয়ে পরিচিত উলার হ্রদের আশপাশের জলা এলাকাগুলো আর ঝিলমের আঁকাবাঁকা স্রোতে চষে বেড়ালাম। বেশ কয়েকমাস পর ঝিলমের ফুরফুরে বাতাস যেন সব ক্লান্তি মুছিয়ে আমাকে চাঙ্গা করে দিল। অজস্র শাপলা/পদ্ম আর জলজ ফুলের দঙ্গল জলের মধ্যে মাথা তুলে ছিল।
ঝিলম নদীর ঘাট আর চিনার গাছের ছায়ায় ঢাকা আশেপাশের গ্রামগুলো, পিরপাঞ্জালের তুষারাবৃত ওই উঁচু চূড়াগুলো, আর দিন কয়েকের মধ্যে যাদের ঘিরে আমার যাত্রা শুরু হবে, তাদের স্নিগ্ধতা, মাধুর্য, আকর্ষণ কোনোদিন হারিয়ে যাবার নয়।
দ্বিতীয় রাতে উপত্যকাকে বেড় দিয়ে আমাদের নৌকো শ্রীনগরের অন্য পারে পৌঁছল। প্রতিটা নৌকো যাত্রার পর কাশ্মীর উপত্যকা নতুন নতুন রূপে ফুটে উঠছিল আমার চোখের সামনে। পরদিন সকালে নদী পার হয়ে আমার প্রিয় চিনারবাগের ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে পা রাখতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠল।
প্রতিবছরই ভারতের সমতল থেকে দলে দলে ছুটি কাটাতে আসা ইউরোপিয়ানদের দৌলতে আপেল বাগানের ছায়াঘেরা শ্রীনগরের নির্জনতা অনেকটা চলে গিয়েছিল। পাশাপাশি সারাদিন পথ চলা কাশ্মীরি ব্যবসায়ী আর হস্তশিল্পীদের সাহেবদের ক্যাম্পিংয়ের বায়নাক্কা আর চাহিদা মেটানোর কচকচানিতে পুরো অঞ্চলটা একটা বাজারের মতো হয়ে উঠেছিল। সে যাই হোক, শ্রীনগরে এটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
অভিযানের জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা বাকি ছিল। যেমন টাট্টুঘোড়া, বাক্স, চামড়া-মোড়া-ঝুড়ি...যাতে খাবারদাবার, নানা যন্ত্রপাতি ভরে নিয়ে যেতে হবে। চামড়ার কোট ও নানাধরনের গরম জামাকাপড় প্রচুর পরিমাণে দরকার ছিল নিজের ও আমার দলবলের জন্য। পামির আর তুর্কিস্তানের দুর্দান্ত ঠান্ডা থেকে বাঁচতে গেলে এগুলো লাগবেই লাগবে। অনেক থলেও দরকার। আমার অভিজ্ঞতা বলে, ব্যক্তিগত সরঞ্জামসহ অভিযানের সব জিনিসপত্র ঠিকঠাক রাখতে বোঁচকাবুঁচকি ঠিকমতো বাঁধাছাঁদা ভীষণ জরুরি। দুর্গম অজানা পথে তো বটেই।
কাশ্মীরি কারিগররা ভীষণ বুদ্ধিমান। কঠিন আবহাওয়ায় জিনিসপত্র কী করে নিরাপদে টিকিয়ে রাখতে হয় তা ভালোই জানে। তাছাড়া অভিযানের মালপত্র যাবে টাট্টুঘোড়া বা মালবাহকের পিঠে চেপে। তাই থলের মান সঠিক হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই নিয়ে কারিগরদের সঙ্গে পদে পদে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। সঙ্গে দর কষাকষি তো ছিলই। চূড়ান্ত ব্যস্ততার পাশাপাশি সামনের যাত্রাপথের প্রথম ভাগ নিয়ে খোঁজখবর একত্র করছিলাম।
ভারত সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর কাশগর যাবার জন্য আমাকে গিলগিট-হুনজা রুট ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল। ‘গিলগিট পরিবহন পথ’ জুড়ে যে বিশেষ পরিস্থিতি থাকে, তাকে মাথায় রেখে অভিযানের বিষয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কিছু তথ্য আগেভাগে জানাবার প্রয়োজন ছিল। যথা, দলের লোকসংখ্যা, ঠিক কতটা পরিবহন আমাদের দরকার হবে ইত্যাদি। ব্যাপারটা আরো বেশি জরুরি ছিল এই কারণে যে, মে মাসের শেষাশেষি যে সময়টা আমি রওনা দেব বলে ঠিক করেছিলাম সেটা ও পথে নিয়মিত চলাচল শুরু হবার সময়ের তুলনায় খানিক আগে।
আমার সৌভাগ্য যে ক্যাপ্টেন জি. এইচ. ব্রেথারটন, কাশ্মীরের সহকারী কমিশনার জেনারেল, যাঁকে এই বিষয়গুলো আমার জানানোর কথা, তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছিলেন আমাকে সাহায্য করতে। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আমাকে সমস্ত পথের বর্ণনাই শুধু দেননি, কী কী নিতে হবে, কতটা নিতে হবে, কীভাবে এগোতে হবে তার নিখুঁত ফর্দ বানিয়ে দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র হুনজা পর্যন্তই নয়, একেবারে চিনের সীমান্ত পর্যন্ত পরিকল্পনা ছকে দিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেনের কষে দেওয়া ছক আমার দারুণ কাজে এসেছিল। এই ছকের সাহায্যেই আমি ঝটপট আমার দলের সব তথ্য গিলগিট আর কাশগরে আগেভাগে পাঠিয়ে অনুমতি/পারমিট সংক্রান্ত অনেকটা সময় বাঁচিয়ে ফেলতে পেরেছিলাম। মাত্র পাঁচদিনের মধ্যেই আমার যাত্রাপথের যাবতীয় কাগজপত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে যে সময়টুকু বাঁচাতে পেরেছিলাম, তা আমি নিশ্চিন্তে লেখালেখির কাজে লাগিয়েছিলাম। এই লেখালেখিগুলো কাশ্মীর ছাড়ার আগেই আমায় শেষ করতে হত।
গত দশ বছরে যখনই কাজের বাইরে অবসর পেতাম, তখনই কাশ্মিরী সুলেখক কল্হনের লেখা ‘রাজতরঙ্গিণী’ থেকে ‘কাশ্মীরের রাজাদের ক্রমপঞ্জিকা’ তৈরিতে পড়তে ব্যস্ত রেখেছিলাম নিজেকে। ভারতীয় সমস্ত ধ্রুপদি সাহিত্যের মধ্যে মহান কবি কলহনের লেখা এই সংস্কৃত-গাথাতেই একমাত্র সঠিক ইতিহাসধর্মী বিবরণ আছে। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব, ভূগোল আর ধর্ম সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পাঠরত শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু বিষয় আমি এর আগেই সম্পাদনা করেছি। কিন্তু আমার করা অনুবাদ আর ভাষ্যের জন্য কাশ্মীরে এই বিষয় সংক্রান্ত যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা খুঁজে বের করে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। শুধু প্রাচীন দলিল বা দস্তাবেজই নয়, লোকগীতি, আচার-অনুষ্ঠান, লোককথা সবকিছুরই বিশ্লেষণ আবশ্যক। প্রয়োজন এগুলোর সংরক্ষণও। এই নিয়ে লেখা দুটি খণ্ডের বিশাল বই আকারে ছাপার অবস্থায় এসে গেছে; এই কাজের জন্য মুখবন্ধ, আর পুস্তক পরিচিতির লেখাটা শেষ করতে হবে। এইসব শেষ করার জন্য নির্জনতা আর মনঃসংযোগের ভীষণ প্রয়োজন ছিল।
শ্রীনগর আর তার আশপাশ যে এর জন্য উপযুক্ত তাতে কোনো দ্বিমত নেই। বিশেষ করে মোহন্দ মার্গের আমার পাহাড়ি আবাসস্থলের তুলনা নেই। দূরের পাহাড়গুলো এখনও বরফে ঢাকা।
কাশ্মীরের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে আমার জ্ঞান আমাকে অনেক কিছু সহজেই খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। ফলে সামান্য ঘোরাঘুরির পরই সিন্ধু উপত্যকায় যেখান থেকে মোহন্দ মার্গের উত্থান শুরু হয়েছে, সেখানে দুদারহোম গ্রামের কাছে নদীর ধারে আমি আমার তাঁবু ফেলেছিলাম। চিনার গাছের ছায়ার নীচের তাঁবু থেকে দূরের হরমুখ (Haramukh) পর্বতের উঁচু বরফঢাকা ঢালগুলোকে সঙ্গী করে আমি দিনরাত কাজে মেতে ছিলাম।
একটা সুবিশাল বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা ফের পর্যালোচনা করে স্বল্প সময়ে তার সংক্ষিপ্তসার লেখা খুবই কঠিন কাজ ছিল। তবুও কাজটা ঠিক ঠিকমতো করতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম। সন্দেহ নেই, উপত্যকার ছায়া আর দূরের বরফঢাকা পর্বতশ্রেণি আমাকে মনের প্রশান্তি ধরে রেখে কাশ্মীর বিষয়ক গবেষণার কাজটা করতে সাহায্য করেছিল।
গত কয়েকদিন ধরে ছোটাছুটির পর কাজটা নির্বিঘ্নে মনের মতো করে শেষ করাটা ছিল অনেকটা ছুটি কাটানোর সামিল। শিবিরের শান্তিতে বসে আমি আমার লেখার শেষ অংশ শেষ করেছিলাম ২৩ শে মে।অভিযান শুরুর দিন ঘনিয়ে এসেছিল। কাজেই ভিড়ভাট্টায় ভরা শ্রীনগরে ফিরে যেতে হয়েছিল অভিযানের শেষে মুহূর্তের খুঁটিনাটি কাজগুলো সেরে নিতে।
কাশ্মীরের প্রাণজুড়ানো জলপথের জবাব নেই। আনচার হ্রদের সঙ্গে প্রাচীন মার খাল দিয়ে ডাল হ্রদের সঙ্গে যুক্ত জলপথ ধরে এক রাতের নৌকা যাত্রায় পৌঁছে গিয়েছিলাম শ্রীনগরে। গিয়ে দেখলাম শ্রীনগর থিকথিক করছে ইউরোপিয়ান অতিথিতে। এর আগে একসঙ্গে এত লোকসমাগম দেখিনি। শিকারাগুলো সব ভর্তি। হ্রদের ধারে সার সার তাঁবু। কোথাও নতুন করে তাঁবু খাটানোর জায়গা নেই। আমার অবশ্য ওই অঞ্চল সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকায় ক্যাম্প করার ভালো জায়গা খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি। শহরের পশ্চিমে তখত্-ই-সুলাইমান পাহাড়ের নীচে একটা খোঁচের মতো অংশে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম। এখান থেকে শ্রীনগর শহর আর ডাল হ্রদের অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। উইলোর জঙ্গল আর ডাল হ্রদের ভাসমান বাগানের আড়ালে লুকোনো এই জায়গাখানা (বুচপোরা বাগ) ছিল আমার সবকিছু গুছিয়ে নেবার জন্য যাকে বলে একেবারে আদর্শ।
দিনগুলো কাটছিল চূড়ান্ত ব্যস্ততায়। অভিযানের জন্য জোগাড় করা প্রতিটি জিনিস শেষবারের মতো ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নেওয়া। নতুন আসা জিনিসপত্র মিলিয়ে নেওয়া। তারপর সেগুলো টাট্টুঘোড়ার পিঠে চাপানোর মতো করে বস্তাবন্দি করা। প্রয়োজনীয় প্রতিটি যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না দেখে সেগুলো যাতে কুলি বা ঘোড়ার পিঠে নিতে গিয়ে কোনোভাবেই ভেঙেচুরে না যায় তা নিশ্চিত করাও খুব জরুরি ছিল। এছাড়া সামলাতে হচ্ছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা কাশ্মীরি বন্ধুদের। শুভানুধ্যায়ী কাশ্মীরি পণ্ডিত বন্ধুদের অভিযানের যাত্রাপথ আর উদ্দেশ্য বার বার করে বুঝিয়ে বলতে হচ্ছিল। ওঁরা আমার যাত্রার উদ্দেশ্যের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে পরিচিত থাকলেও যাত্রাপথের অনিশ্চয়তা বা ভয়াবহতা আন্দাজ করতে পারছিলেন না। ‘উত্তরকুরু’ নামে চিহ্নিত যে প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার জগতে সত্যিসত্যিই যে আমি যাত্রা করতে চলেছি, তা নিয়ে কিছুতেই ওঁদের সংশয় যাচ্ছিল না।
ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল কর্নেল সেন্ট জর্জ গোর, তাঁর অধীনে কর্মরত গোর্খা সাব-সার্ভেয়ার রাম সিংকে বিভাগীয় যন্ত্রপাতি-সহ আমার অভিযানে অংশগ্রহণকারী হিসেবে কাজ করতে অনুমতি দিয়েছিলেন। যেদিন আমি শ্রীনগরে পৌঁছলাম, কথামতো রাম সিং ঠিক সেইদিনই পৌঁছে গিয়েছিলেন শ্রীনগরে। কিছুদিন আগেই তিনি ক্যাপ্টেন ডিজির সঙ্গে কারাকোরাম পর্বতমালার ইয়ারখন্দ (Yarkand) নদীর উৎসমুখের খুব কাছ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। এছাড়া কুয়েনলুন ( Kuen Luen) পর্বতেও অভিযানের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। ওঁর ওই অঞ্চল সম্পর্কে হাতেকলমে যা অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা আমাদের অভিযানের প্রস্তুতিতে একটা বড়ো সম্পদ হয়ে উঠেছিল। রাম সিংয়ের সঙ্গেই এসেছিল যশবন্ত সিং। ছোট্টোখাট্টো প্রাণসার কাংড়া উপত্যকার রাজপুত বাসিন্দা, রাম সিংয়ের ব্যক্তিগত পরিচারক ও রাঁধুনি। যশবন্তও ক্যাপ্টেন ডিজির দলে চৈনিক-তুর্কিস্তান অঞ্চলের অভিযানে ছিল।
২৮ শে মে আমাদের দলে যোগ দিল সাদাক আখুন। এক তুর্কিস্তানি পরিচারক। কাশগরের ব্রিটিশ প্রতিনিধি মিঃ ম্যাকার্টনি আমার জন্য ওকে পাঠিয়েছিলেন। এপ্রিলের প্রথম দিকে তার বাড়ি থেকে রওনা হয়ে একদম ঠিক সময়ে এসে যোগ দিয়েছিল আমার দলে। আমার দলে ওর ভূমিকা হবে রাঁধুনি তথা সর্দার গোছের। কোকান্দ অঞ্চলের লোক মির্জা আলম, যাকে আমি মাস চারেক আগে পেশোয়ারে আমার পরিচারক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলাম, সে মন থেকেই সাদাককে স্বাগত জানিয়েছিল। মির্জা এ-ক’দিন ধরে আমাকে কাজ চালানোর মতো তুর্কি ভাষা শিখিয়েছে। কিন্তু সাহেবের চাহিদামতো তুর্কি সাহিত্য থেকে নানা কাহিনি না শোনাতে পেরে খানিক হতাশ হয়ে পড়েছিল। বেচারার করারই-বা কী ছিল! দিনের অধিকাংশ সময় ওকে রান্নাবান্না নিয়েই পড়ে থাকতে হত। আমার কাজে যোগ দেবার আগে মির্জা কাবুল আর পেশোয়ারে খুচখাচ ব্যাবসা করত। যেসমস্ত কাজ আমার এখানে ওকে করতে হচ্ছিল, তার জন্য ও মোটেই মন থেকে তৈরি ছিল না। ওর কথা শুনে ওকে কাজে ধরে রাখতে পারব কি না তা নিয়ে আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। সাদাক এসে যাওয়াতে আমরা দুজনেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মির্জার দায়িত্ব বদলে ওকে যাত্রাপথে মালপত্র দেখাশোনার ভার দিয়েছিলাম। সাদাক আখুনের উপস্থিতি শুধু একজন সর্দারের মতোই ছিল না, ওর ইউরোপিয়ান রান্নার শিক্ষা আমার চাহিদা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল। ও পশমের টুপি মাথায়, টানটান ধোপদুরস্ত পোশাকে, হাঁটু পর্যন্ত উঁচু লাল রঙের বুট পরে ক্যাম্পের মধ্যে চলাফেরা করা শুরু করাতে ক্যাম্পের মধ্যে সত্যিকারের মধ্য এশিয়ার রঙের ছোঁয়া লেগেছিল। রাঁধুনি বাদে এ-ধরণের দুর্গম ও দীর্ঘ অভিযানে আর এক অপরিহার্য মানুষ হলেন একজন চিকিৎসক। কিন্তু সুদূর উত্তর থেকে তেমন কেউ এসে হাজির হবেন সে আশা আমার আদৌ ছিল না।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে আমি যেখানে অভিযানে যাচ্ছি সেখানে কোনো ইউরোপিয়ান চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে সঙ্গী হবে না। তাই লন্ডনের মেসার্স বারোজ ওয়েলকাম কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় ওষুধের অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। এরা ছোটোখাটো অসুখ সারানোর ওষুধের জন্য বিখ্যাত। দক্ষিণ আফ্রিকার যুদ্ধ ছাড়াও অন্যান্য কারণে ওষুধগুলো এসে পৌঁছতে দেরি করছিল। ওষুধগুলো কলকাতা পৌঁছানোর খবর টেলিগ্রাম মারফত পেলেও আমার সন্দেহ ছিল ঠিক সময়মতো ওগুলো হাতে পাব কি না। ইন্ডিয়া পোস্ট যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে গিলগিটের মতো সীমান্ত অঞ্চলে মালপত্র পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও কাজটা সহজ ছিল না। বরফঢাকা গিরিপথে গতি শ্লথ হতে বাধ্য। সময়ে শ্রীনগরে আমার কাছে ওষুধ পৌঁছানোর আশা খুবই কম ছিল। কিন্তু ভাগ্য আমার সহায় হল। ২৯ শে মে যাত্রা শুরুর আগেরদিন সন্ধেবেলা ছোটো নৌকোয় হ্রদের ওপর শ্রীনগর পোস্ট অফিসের কাছেই বসেছিলাম। সে-সময় পোস্টমাস্টার লালা মঙ্গুলাল হাঁক পেড়ে আমাকে ওষুধের বাক্স পৌঁছানোর খবর দিয়েছিলেন। আমার হাতে ওষুধের বাক্স সঁপে দিয়ে উনিও যেন খানিক নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন।
ভারতের ভেনিস থেকে আমার বিদায় নেবার সময় হয়ে গেল। পরপর সাতখানা সুপ্রাচীন সাঁকোর তলা দিয়ে ভেসে চললাম অন্ধকার নদী বেয়ে; ভাঙা মন্দিরের পাথরের টুকরোটাকরা দিয়ে তার দু-পাড় বাঁধানো। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন,
quod mihi supremum tempus in Urbe fuit
(এ-শহরে এই আমার শেষবার…)
(উৎস-রোমান কবি ওভিড লিখিত
অষ্টম শতাব্দীর বিষাদগাথা ‘ট্রিস্টিয়া’-সম্পা)
নদীর দুপাশে যার যার বাড়ির কাছের ঘাটে আমার কাশ্মীরি পণ্ডিত বন্ধুরা আলো হাতে আমাকে বিদায় জানানোর অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের শেষজন যখন আমাকে বিদায় জানালেন ততক্ষণে মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন