মার্ক অরেল স্টাইন

৭ ডিসেম্বর সকালে যখন আমরা শীতকালীন মরু অভিযানের জন্য রওনা দিলাম তখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা; কনকনে ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল হাড়মজ্জা। আমার প্রাথমিক লক্ষ ছিল দান্দান-উইলিক, এখান থেকেই অনুসন্ধান শুরু করব বলে স্থির করেছিলাম। দান্দান-উইলিক পৌঁছনোর জন্য তাওয়াক্কেল হয়ে যাব বলে ঠিক করেছিলাম। যদিও খোটান হয়ে গভীর মরুভূমিতে পৌঁছনোর জন্য এ-পথে বেশি ঘুরে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের গাইড ‘প্রত্ন-সন্ধানী’ তুর্দি এই পথ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক বলে এটা ধরেই যাবার সুপারিশ করেছিল।
প্রথম দিন আমরা পৌঁছলাম খোটান শহরের উত্তরে ইয়াঙ্গি-আরিকে। সত্যি কথা বলতে কী এখানেই শেষ হয়েছে খোটানের চাষযোগ্য জমির সীমা। এরপর দু-দিন ধরে চললাম ইউরুং-কাশ নদীর অনুর্বর বাম তীর ধরে। নদীর খাত আর বালির স্তূপ ছাড়া আর কিছু নজরে এল না।
চতুর্থ দিন নদী পার হয়ে যখন তাওয়াক্কেল মরূদ্যানের প্রান্তে পৌঁছেছি, তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। বছর ষাট আগে একটি সেচ খাল খুঁড়ে এই মরূদ্যানকে আরও সজীব করে একটি জনবসতি গড়ে তোলা হয়েছিল। কয়েক হাজার পরিবার বাস করে মরুর মাঝখানের এই মরূদ্যানে। এখানকার বেগ আগেই ইয়ামেন থেকে আমাদের আসার খবর ও প্যান-ডারিনের কাছ থেকে সবরকম সহযোগিতা করার নির্দেশ পেয়েছিল। বেগ নদীর কিনারায় আমার অপেক্ষায় ছিল। আমি পৌঁছতেই বিশাল শোভাযাত্রা করে সাড়ম্বরে নিয়ে গেল মরূদ্যানের মাঝে। পথের দু-পাশে কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালানো হয়েছে আমার সম্মানার্থে। এখানে ওখানে জড়ো করে রাখা কাঠের স্তূপ আর কাঠের ঘরবাড়ি বলে দিচ্ছিল এলাকাটার আশেপাশে জঙ্গলের উপস্থিতির কথা।
পরদিন সকালে আগের রাতে যেখানে ক্যাম্প করেছিলাম সেখান থেকে আরও ছয় মাইল উত্তরে ক্যাম্প সরিয়ে নিই। জায়গাটার নাম আটবাশি, বেগের বাড়ি এখানেই। মরু অভিযানের মালপত্র বহন ও খোঁড়াখুঁড়ির জন্য আমাদের অনেক শ্রমিকের দরকার, সেই শ্রমিক জোগাড় আর বাছাইয়ের কাজের জন্য বেগের সক্রিয় সহযোগিতা দরকার। লক্ষ করেছি, খোটানের তুলনায় তাওয়াক্কেলের রাস্তা কৃষি জমি থেকে সামান্যই নীচে। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় এই মরূদ্যানের বয়স খুব কম, পলি জমিয়ে চাষ জমির উচ্চতা বৃদ্ধির বেশি সময় পায়নি। শুনে অবাক হলাম, আরও সেচ খাল খনন করা হচ্ছে উপনিবেশকে মরুর দিকে প্রসারিত করতে। বসন্ত আর গ্রীষ্মের নদীর জলের অফুরান সরবরাহকে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার বালির টিলার সাম্রাজ্যের মধ্যে দিয়ে বইয়ে নিয়ে গিয়ে, বালির ওপর পলির স্তর জমিয়ে অঞ্চলের উর্বরতা বাড়িয়ে, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ানোর মরিয়া প্রচেষ্টা। কিন্তু তুর্কিস্তান মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তে জনসংখ্যার পরিমাণ এতই কম যে, স্থানীয় চাষিদের পক্ষে অতিরিক্ত জমিতে চাষ করা কঠিন হয়ে যাবে।
প্রথমে হরেক কুসংস্কার আর কঠিন শীতের ভয়ে এখানকার কেউ আমাদের অভিযানে যোগ দিয়ে সুদূর মরুভূমির দিকে যেতে চাইছিল না। তাই শ্রমিক পেতে আমি এখানকার গড় মজুরির দ্বিগুণের বেশি দেব বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলাম। একদিকে আম্বানের হুকুম, আর অন্যদিকে দ্বিগুণ মজুরির হাতছানির ফলে আটবাশি থেকে খননের জন্য ত্রিশজন শ্রমিক-সহ প্রায় চার সপ্তাহের খাবার জোগাড় সম্ভব হয়েছিল অল্প সময়ের মধ্যেই। এসময় চাষবাস প্রায় বন্ধ থাকে, তাই চাষিদের হাতে কোনো কাজও নেই এখন। এই গ্রাম থেকেই আমাদের দলে যোগ দিতে এল দুই তাওয়াক্কেল শিকারি...আহমদ মেরঘেন এবং কাসিম আখুন।
খোটান থেকেই আহমদ মেরঘেন এবং কাসিম আখুনকে দলে গাইড হিসেবে নেব বলে ঠিক করে এসেছিলাম। ওরা দলে যোগ দেবার পরপরই টের পেয়েছিলাম ওদের অন্য দক্ষতা। মজুরদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে ওদের জুড়ি নেই। নদীর ধারের জঙ্গল আর গহিন মরুভূমিতে ঘোরাঘুরির ফলে ওরা সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ছিল। ওরা ভয় পাওয়া অনভিজ্ঞ মজুরদের বুঝিয়েছিল যে এইসময় মরুতে খুব একটা বালি-ঝড় ওঠে না আর ‘জিন’ বা ‘মরু-রাক্ষস’ শীতের সময় কোনো ক্ষতি করতে পারে না। সঙ্গে প্রচুর শুকনো কাঠ নেওয়া হচ্ছে, ফলে মরুভূমির মধ্যে শীতে জমে মারা যাবার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
আমার সামনে অনেক লোককেই হাজির করা হয়েছিল তাদের যাচাই করার জন্য। আমি আমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাদের মধ্যে থেকে সেরা লোকগুলোকে বেছে নিয়ে যার যার গ্রামের প্রধানকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম লোকগুলোর জন্য শীত পোশাকের ব্যবস্থা করতে। আমি সবাইকে অগ্রিম অর্থ দিয়ে দেওয়াতে সমস্ত বন্দোবস্ত দ্রুত হয়ে গেছিল। মরুভূমিতে গিয়ে কোনো সমস্যা এলে যাতে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য পাওয়া যায় তাই দলে নিয়েছিলাম এক দর্জি আর মুচিকে। আর নিয়েছিলাম হিসেব রাখার জন্য স্থানীয় মসজিদ-স্কুলে পড়া, কাজ চালানোর মতো তুর্কি জানা এক যুবককে। প্রত্যেককে নিজের ‘কেটমান’ (তুর্কিস্তানি কোদাল – যা বালি খোঁড়ার জন্য আদর্শ) নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। যদিও কাশগর থেকে বেশ কিছু জার্মানিতে তৈরি স্টিলের বেলচা নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু দেখেছিলাম এতে বালি বা মাটি খোঁড়াখুঁড়ির সময় তলায় ঢাকা পড়ে থাকা প্রত্নবস্তুর ক্ষতি হবার সম্ভাবনা প্রবল। তুলনায় বালি খুঁড়তে কেটমান অনেক কাজের। তাছাড়া স্থানীয় মজুরেরা কেটমান দিয়েই কাজ করতে অভ্যস্ত।

মরু অভিযানের খাবার-দাবার ও অন্যান্য মালপত্র বয়ে নেবার জন্য যত উটের দরকার তা আমাদের কাছে ছিল না। তাই এক ডজন গাধা ভাড়া নিলাম যেগুলো খুব কম খেয়েই মরুভূমিতে কাজ করতে পারে। উটের জন্য তেলের বীজ থেকে তৈরি একধরনের পশু-খাবার নেওয়া হল। যেখানে কোনো চারণভূমি নেই, নেই কোনো পশুখাদ্যের প্রাকৃতিক উৎস, সেখানে দুর্গন্ধযুক্ত এই খাবার সামান্য খেয়েই উটগুলো যে জল ছাড়াই অনেকদিন কর্মক্ষম থাকতে পারে তা পরে প্রমাণিত হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে এতদিন যে টাট্টুঘোড়াগুলো ছিল, মরুভূমিতে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার বা জল বয়ে নেওয়া আর সম্ভব ছিল না বলে সেগুলোকে দোভাষী নিয়াজ দায়িত্ব নিয়ে খোটানে পাঠিয়ে দিল। এর পরে আমার সঙ্গের লোকজন যখন শুনল যে সবাইকে আমারই মতো বালি-সমুদ্রে পায়ে হাঁটতে হবে, তখন তাদের মুখগুলো দেখার মতো হয়েছিল!
তাওয়াক্কেলে প্রস্তুতির জন্য ছাড়াও কয়েকটা দিন বেশি কাটাতে হয়েছিল আমার এক বেয়াক্কেলে দাঁতকে শায়েস্তা করতে। দাঁতটা বেশ কিছুদিন ধরেই ভোগাচ্ছিল। এক স্থানীয় নাপিতকে ধরেছিলাম নড়বড়ে দাঁতটা তুলে দেবার জন্য। সে প্রথমবার তার সাঁড়াশি দিয়ে অনেক কসরত করেও দাঁত তুলতে পারল না। আমি তাকে প্রথমেই তার সাঁড়াশি আর অন্যান্য সরঞ্জামগুলোকে ভালো করে সাবান এবং গরম জলে ফুটিয়ে পরিষ্কার করাতে সে-বেচারা বেদম ঘাবড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বার আবার চেষ্টা করে রণে ভঙ্গ দেয়। দাঁতটা থেকেই যায় নিজের জায়গায়।
১২ ডিসেম্বর দুপুর নাগাদ আমাদের দলের সব লোকজন উট আর গাধাদের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে সুকঠিন তাকলামাকান মরুভূমির পথে এগোনোর সময়ে তাওয়াক্কেলের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা আমাদের বিদায় জানাতে হাজির হল। যাদের নিকটজনেরা আমাদের অভিযাত্রী দলে যোগ দিয়েছিল, তারা প্রায় সবাই আমাদের পিছনে পিছনে মরূদ্যানের সীমানা পর্যন্ত হেঁটেছিল।
তাওয়াক্কেলের বেগও আমাদের সঙ্গে মরুপ্রান্ত অবধি এল। মর্যাদার প্রতীক হিসেবে তার দু-পাশে ছবির মতন দুই পরিচারক দুটি বাজপাখি হাতে বসিয়ে হাঁটছিল। বিদায় নেবার আগে তার হাতে বেশ কিছু রাশিয়ান দশ রুবলের স্বর্ণমুদ্রা তুলে দিয়েছিলাম কৃতজ্ঞতাস্বরূপ। যদিও আমার ধারণা, আম্বানের হুকুমে সবরকম সহযোগিতা করলেও মন থেকে সে তা করেনি। কিন্তু মরুভূমিতে কোনো অসুবিধায় পড়লে ওর সাহায্য যে আবার দরকার হতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রথম দিনের যাত্রাপথ খুবই সংক্ষিপ্ত ছিল। গাইডের পরামর্শ মেনে রাতের আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম মরুপ্রান্তের এক নির্জন চারণভূমির মধ্যে নদীর পাড়ের জায়গা ‘সাতমা’-কে। চাইছিলাম মরুভূমিতে ঢোকবার আগে যাতে সঙ্গের প্রাণীগুলো প্রচুর পরিমাণে জলপান করে নিতে পারে। পরদিন সকালে পূর্বদিকে যাত্রা শুরু করার খানিক সময়ের মধ্যেই বালির বুকে মানুষ আর পশুর পায়ের ছাপ দেখতে পাই। এই পায়ের ছাপ আমার ‘অ্যাডভান্স’ দলের, যাদের কাসিমের নেতৃত্বে দু-দিন আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তাদের কাজ ছিল ক্যাম্প করার উপযুক্ত জায়গা বেছে তার পাশে বালির বুকে একটা কুয়ো খুঁড়ে রাখতে, যেখানে এই দু’দিনে যাতে খানিক জল জমে। এদের প্রতি নির্দেশ ছিল যেন এরা দান্দান-উইলিক পৌঁছে সেখান থেকে আরও খানিক এগিয়ে কেরিয়া দরিয়ায় চলে যায়, কারণ রাম সিংয়ের ওখানে এসে পৌঁছনোর কথা।
বালির মধ্যে দিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটা যায় না। বালির মধ্যে গেঁথে যাওয়া পা তুলে আর একটা পা ফেলা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর। খুব বেশি হলে ঘণ্টায় সওয়া মাইল মতো পথ এগোনো যাচ্ছে। সঙ্গে খাবার আর পানীয় অপ্রতুল থাকায় যতটা পরিমাণ শক্তিক্ষয় কম করা সম্ভব তাই করতে চাইছিলাম। সারাদিন হেঁটে ৯ থেকে ১০ মাইল পথ এগোতে পারছি। দু-দিন ধরে যে পথে চলেছি তার আশেপাশের বালির ঢিপির উচ্চতা খুব বেশি নয়, ৬ থেকে ১০ ফুটের মধ্যে। তামারিস্ক আর কুমুশ-এর যে দু-একটা ঝোপঝাড় প্রথমদিন দেখেছিলাম সেগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। বালির টিলার ওপরকার খানকতক শুকনো গাছের ঝোপ শীতের রাতের জ্বালানি হয়েছিল।
সাধারণত টিলাগুলোর কাছাকাছি বালির মধ্যে মরুঝড়-সৃষ্ট ফাঁপা বালির খোঁজ পাওয়া যায়। দুই টিলার মাঝের এই আলগা বা ফাঁপা বালির স্তর ১০ থেকে ১৫ ফুট গভীর হয়। আর এই আলগা বালির স্তর খুঁড়ে অনেক সময় ভূপৃষ্ঠের জল পাওয়া যায়। আমাদের আগে পাঠানো কাসেমের দল এই বালির স্তর খুঁড়ে কুয়ো বানিয়ে গেছিল, যার কাছে আমরা তাঁবু খাটাতাম। এই কুয়োর মধ্যে সামান্য জল জমলেও তা এতই নোনতা ও বিস্বাদ যে মানুষের পক্ষে খাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমরা যতই খোটান নদী থেকে দূরে সরে গেছি, লক্ষ করেছি যে জলের স্বাদ তুলনামূলক মিষ্টি হতে শুরু করেছে। ভূতত্ত্বের এই আচরণ, বিশেষ করে তাকলামাকানের এই অংশের...আমার গাইডদের জানা ছিল, তাই মরুভূমিতে চলার পথ তারা সুনিশ্চিতভাবে ঠিক করতে পেরেছিল। ডঃ হেডিনও তাঁর অভিযানে তাকলামাকানে এইভাবে জল পাবার কথা উল্লেখ করেছেন। এই কুয়ো থেকে যা সামান্য জল সংগ্রহ হত তা আমার বিশাল দলের জন্য নিতান্তই কম ছিল। এছাড়া রাতের বেলা সেই সামান্য জল প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে বরফ হয়ে যেত। তাই আমার লোকেরা কাসেমের লোকেদের খুঁড়ে যাওয়া কুয়োয় যতটুকু জল জমত তা সন্ধে হওয়ার আগেই সঙ্গে নিয়ে চলা লোহার ট্যাঙ্কে ভরে রাখতে শুরু করেছিল পরের দিন ব্যবহারের জন্য।
তাকলামাকান মরুভূমির বুকে শীত পুরো জাঁকিয়ে বসেছে। দিনের বেলা তাপমান ছায়ার মাঝে হিমাঙ্কের নীচে থাকলেও হাওয়া চলত না বলে খুব একটা কষ্ট হত না, বরং বেশ উপভোগ্য ছিল। কিন্তু রাতে তাপমাত্রা নেমে যেত হিমাঙ্কের ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট নীচে (-২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস)! আমার ছোট্ট কাবুলি তাঁবুতে অতিরিক্ত আচ্ছাদন থাকা সত্ত্বেও তা ছিল ভয়ংকর ঠান্ডা। তাঁবুর মধ্যে ‘স্টরমন্ট-মারফি আর্কটিক স্টোভ’-এ লন্ডন থেকে আনানো প্যারাফিন কেক জ্বালিয়ে সামান্য আরাম পাওয়া গেলেও শীতের ভারী পোশাক অর্থাৎ পশমের ওভারকোট আর পশমের লাইনিং দেওয়া উঁচু বুটজুতো খোলার কথা ভাবতেও পারতাম না। আমার দাড়ি তখন এতটাই বেড়ে উঠেছিল যে আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুও আমাকে দেখলে চিনতে পারত না। স্টোভ জ্বালানোর পর তাঁবুর তাপমাত্রা খানিক বাড়লেও আঙুল নাড়ানো ছিল অসম্ভব। ফলে রাতে পড়া বা লেখা সম্ভব হত না। সোজা ঢুকে পড়তে হত ভারী কম্বলের তলায়। ইওলচি বেগও গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকত আমার কম্বলের নীচে। ওর জন্যও কাশ্মীরে তৈরি পশমের পোশাক ছিল, যা সে পরেছিল ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত।
শেটল্যান্ড টুপিতে মাথা ঢাকা থাকলেও মুখ থাকে খোলা। প্রবল ঠান্ডা থাকা থেকে বাঁচতে কাশ্মীরে তৈরি পশমের লাইনিং দেওয়া একটা ‘বালাক্লাভা’ টুপি চাপাতাম শেটল্যান্ডের ওপর। কিন্তু এতে নাক আর গালের খানিক অংশ খোলা থাকত। ফলে সকালে যখন ঘুম থেকে উঠতাম দেখতাম শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস গোঁফ-দাড়ির ওপর বরফের আস্তরণ জমিয়ে তুলেছে। এই বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচতে একটা উপায় বের করেছিলাম। একটা পশমের কোটে মাথা ঢেকে নিতাম আর ওর একটা হাতা নাকের সামনে হাতির শুঁড়ের মতো বের করে রেখে দিতাম, ফলে দাড়িগোঁফে বরফ জমত না। মরু অভিযান আমায় অনেক কিছু শিখিয়েছিল।
তাওয়াক্কেলে যে নড়বড়ে দাঁতটা তুলতে পারলাম না সেটা তখন খুব ভোগাচ্ছিল। বিশেষ করে রাতে যন্ত্রণা বাড়ত। ব্যথা কমাতে একটাই দাওয়াই ছিল আমার কাছে, কয়েক ফোঁটা ক্লোরোডিন। ক্লোরোডিনের জন্য সামান্য জলের প্রয়োজন হয়। এই জল পাবার জন্য খানিক বরফ অ্যালুমিনিয়াম পাত্রে গলাতে হত। মোমবাতির ওপর ধরে বরফ গলিয়ে সামান্য জল পাবার জন্য যে সময়টুকুর জন্য পাত্র ধরে থাকতে হত তাতেই হাত আর আঙুলগুলো ঠান্ডায় অসাড় হয়ে যেত।
নির্জন মরুর মাঝে চতুর্থ দিন সন্ধে হওয়ার খানিক আগে এক বালির টিলার নীচে যখন মরে যাওয়া কতকগুলো তামারিস্ক ঝাড়ের শুকনো ডালের পাশে তাঁবু খাটাচ্ছিলাম, তখন আগের কাসেমের দলের দুই সদস্য এক বার্তা নিয়ে হাজির হল…কাসিম দান্দান-উইলিক ধ্বংসস্তূপ খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে!
এই খবর শোনার পর তুর্দি উত্তেজিত হয়ে পড়ল। যদিও সে এই পথ ধরে মাত্র একবারই দান্দান-উইলিক গিয়েছে, কিন্তু এতক্ষণ পথের বিষয়ে কোনো মুখ খোলেনি, মরুর মাঝে দুই তাওয়াক্কেল শিকারির দক্ষতা মেপে নিতে চাইছিল সে। যদিও সে এর আগে বার দু-এক আমাকে বলেছিল যে আমরা বোধহয় বেশি উত্তরের দিকে সরে যাচ্ছি। আশঙ্কা সত্যি হয়ে যাওয়ায় সে যে চাপা আনন্দে নেচে উঠেছিল তা ওর কুঁচকে যাওয়া মুখের চামড়ায় খেলে ওঠা জেল্লা বলে দিচ্ছিল। কাসেমের লোকেদের সঙ্গে কথা বলে তুর্দি বুঝে গিয়েছিল ওদের অবস্থান। পরদিন সকালে ওদের কোন দিকে যেতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে ভোরবেলা রওনা করিয়ে দিয়েছিল। এবার আমরা পথ চলা শুরু করছিলাম তুর্দির নির্দেশনায়। প্রায় তিরিশ বছর ধরে তাকলামাকান মরুভূমিতে ঘোরাঘুরির ফলে তুর্দি একজন মরু বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। ‘প্রত্ন-সন্ধান’ তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য। তুর্দির বাবাও ছিল একজন প্রত্ন-সন্ধানী।
দিনভর একের পর এক বালিয়াড়ি পাহাড় বা ‘দাওয়ান’-এর মাঝখান দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে যেতে যেতে সন্ধে নাগাদ আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে বালির ভেতর থেকে বড়ো বড়ো শুকনো গাছগাছালির ডাল বেরিয়ে ছিল। তুর্দি ও তাওয়াক্কেল থেকে দলে মজুর হিসেবে যোগ দেওয়া কয়েকজন কৃষক গাছের গুঁড়ি দেখেই বলে দিল এগুলো পপলার আর উইলো, কোনো সময় যা এখানে পোঁতা হয়েছিল। এখানে একসময় সময় যে চাষবাস হত তার প্রমাণ। নিশ্চিন্ত হয়ে গেছিলাম যে আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে প্রায় পৌঁছে গেছি। আরও প্রায় মাইল দেড়েক যাওয়ার পর পরিষ্কার এক লম্বা খাতের দেখা পাওয়া গেল বালির বুকে। এ যে শুকিয়ে যাওয়া এক নদীখাত তা প্রথম দর্শনেই স্পষ্ট হয়ে গেছিল। মরুর উড়ন্ত শুকনো বালি নদীর অস্তিত্ব পুরোপুরি বুজিয়ে দিতে পারেনি। খাতের খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে ওই রাত্তিরেই একটা জায়গায় কুয়ো খুঁড়িয়েছিল তুর্দি। কুয়োর গভীরে অল্প অল্প জল জমতে শুরু করেছিল অচিরেই। তুর্দির মতে, এই জায়গা থেকেই জল পেত একসময় এখানের বসবাসকারীরা।
পরদিন ১৮ ডিসেম্বর সকালে একটা বিশাল উঁচু বালির পাহাড়কে বেড় দিয়ে কয়েক মাইল যাওয়ার পর দেখা মিলেছিল মরুর বুকে বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ… অবশেষে দান্দান-উইলিক!
প্রায় দেড় মাইল লম্বা ও প্রায় আধমাইল চওড়া জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোটো ছোটো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ বালির নীচ থেকে সামান্য করে বেরিয়ে রয়েছে। যেখানে বালি খানিক সরে গেছে, সেখানে বালির ওপর জেগে থাকা ভাঙা কাঠের কাঠামোর ঘরগুলোর পলেস্তারা চাপানো দেওয়াল ভেঙে থুবড়ে পড়ে রয়েছে। প্রত্ন-সন্ধানীদের খননের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে এলাকা জুড়ে। নিঃসন্দেহে অনেক পুরা-সম্পদ এখান থেকে উধাও হয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এই লুপ্ত জনপদের চরিত্র ও বয়স আন্দাজ করতে আমার অসুবিধা হয়নি। দেওয়াল চিত্রের (fresco) টুকরোগুলো যা একসময় এখানকার বড়ো বড়ো কক্ষের দেওয়ালের অংশ ছিল তাতে বুদ্ধ ও বোধিসত্বের নানা আলেখ্য দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। নিঃসন্দেহে আমি বৌদ্ধ উপাসনাস্থলের ধ্বংসাবশেষের মাঝে দাঁড়িয়ে। ফ্রেস্কোর বৈশিষ্ট্যগুলি জানান দিচ্ছিল যে এই অঞ্চলের বসতির বয়স ইসলাম ধর্ম আসবার পূর্ববর্তী শেষ শতাব্দী। আমার চোখের সামনে ভাঙা ভবনের বালির তলা থেকে খুঁড়ে বের করা হল কাই-ইয়ুয়েন যুগের (৭১৩-৭৪১ খ্রিস্টাব্দ) চিনা তাম্রমুদ্রা। সম্ভবত ইসলাম প্রবর্তনের পর এই অঞ্চলের বসতিগুলি জনশূন্য ও পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
তুর্দির চলনবলন দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন নিজের পুরোনো বাড়িতে ফিরে এসেছে। হবেই তো! সেই শৈশব থেকে বাবার সঙ্গে সে এখানে এসেছে বহুবার। গুপ্তধনের টানে শুধু বাবার সঙ্গেই নয়, নিকট আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে এই ধ্বংসস্তূপ ছানবিন করেছে বার বার। শুধু গুপ্তধনের নয়, এই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপে বারংবার আসার পর এই জায়গা সম্পর্কে জানার টান জন্মেছিল ওর মধ্যে…এখানে কারা থাকত, কেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল জায়গাটা, কীরকম ছিল সেসময়কার জীবনযাত্রা! আমাকে ধ্বংসস্তূপের ভুতুড়ে আনাচেকানাচে ঘোরাতে ঘোরাতে ও আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে লাজুক মানুষটি ক্রমশ উজ্জীবিত হয়ে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, শুধু ধনসম্পদের খোঁজে নয়, সে আসত জানার আগ্রহ নিয়েও। তুর্দি কথায় কথায় জানিয়েছিল, এই অঞ্চলের বালি-টিলাগুলোর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে বালির তলায় তলিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসস্তূপের ঘরবাড়ি। যদিও এই পরিবর্তনের ফলে জায়গা চিনে আসতে তার অসুবিধা হয়নি। এই জায়গার অবস্থান এখনকার বসতি অঞ্চল থেকে অনেক দূরে। তাছাড়া এখানে আসা খুব কষ্টকর ও দুঃসাধ্য হওয়ায় খুব বেশি লোক এখানে আজকাল হানা দেয় না বা দিলেও বেশিদিন থাকার মতো সামর্থ্য থাকে না। তাকলামাকানের মাঝে পথ হারানোর ভয়াবহতা এখানকার লোক খুব ভালোই জানে।
এখানের ধ্বংসাবশেষ বালির এত গভীরে বদ্ধ হয়ে রয়েছে যে কোথা থেকে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করব ঠিক করতে পারছিলাম না। তুর্দির অসাধারণ স্মৃতি ও এলাকার ভূ-সংস্থান সংক্রান্ত সহজাত জ্ঞানের জন্য আমি কৃতজ্ঞ; সে-ই আমাকে সঠিক জায়গার খোঁজ দিয়েছিল। আমাদের শিবির তৈরির এমন স্থান নির্বাচন করার দরকার ছিল যেখান থেকে ধ্বংসস্তূপের যে-কোনো প্রান্তে অনায়াসে কাজ করা সম্ভব। আমার লোকেদের প্রতিদিন একটানা কাজ করতে হবে, তাই ঝুরো বালির সাম্রাজ্যে তারা শুধু যাতায়াত করেই যেন দ্রুত ক্লান্ত না হয়ে পড়ে তা নিশ্চিত করাও খুব জরুরি ছিল। প্রয়োজন ছিল এমন জায়গায় শিবির করা যেখানে অনায়াসে জ্বালানির জোগান জোটে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীন জনপদের বাগানের মৃত গাছগুলো শীতের রাতে জ্বালানির অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছিল। প্রচুর শুকনো গাছের ডালপালা সংগ্রহ করেছিলাম আমরা। দান্দান-উইলিকে আমাদের মরু শিবির তৈরি হয়ে গেলে, মালপত্তর নামিয়ে আহমদ মেরঘেনের তত্ত্বাবধানে উটগুলোকে পুবদিকের কেরিয়া দরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হল নদীর ধারের জঙ্গলে চরে খানিক স্বাভাবিক খাদ্য খেয়ে পরবর্তী অভিযানের জন্য চাঙ্গা হয়ে ওঠার জন্য। কেরিয়া দরিয়া দান্দান-উইলিক থেকে তিনদিনের পথ। যে-গাধাগুলো নিজেরা সামান্য খাবার খেয়ে দলের সবার খাদ্যের মোট বয়ে নিয়ে এসেছিল, সেগুলোকেও তাওয়াক্কেলে ফেরত পাঠানো হয়েছিল দুজন গ্রামবাসীকে দিয়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন