ঊনবিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

প্রথম প্রাচীন পাণ্ডুলিপির খোঁজ

গত তিনদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ির পরে আজ হঠাৎ করে সেই অমূল্য বস্তুটির অর্থাৎ এক প্রাচীন পুথির সন্ধান পাওয়া গেল। জীর্ণ কাপড়ে মোড়া কয়েকটি পুথির ততোধিক জীর্ণ পাতা আমার উৎসাহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে বালির তলায় চাপা পড়ে থাকলেও পুথির অস্তিত্ব পাওয়া প্রায় অসম্ভব, এই চরম আবহাওয়ায় গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে তা এতদিনে বালির সঙ্গে মিশে গিয়েছে।

প্রথম তিনদিন খোঁড়াখুঁড়ি করে বিশেষ কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু আমার হেলে পড়া আশাকে চাঙ্গা করতে হঠাৎ করে আজ হাতে এল একটি চিত্রিত ফলক। বালির তলায় চাপা পড়ে থাকা শেষের দিকের একটি ঘরের ভেতর থেকে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল ফলকটি। ফলকের ওপরে একটি সরু কাগজের ফালির ওপরের অংশে তিন লাইন আড়াআড়িভাবে ভারতীয় ব্রাহ্মী লিপিতে কিছু লেখা। আর বাকি অংশ জুড়ে দুই মহিলার এক শিশুকে ধরে থাকা ছবি, ফিকে হয়ে গেলেও বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু কয়েকটি লিপি ছাড়া সেই খারাপ হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠাতে যে কী লেখা আছে তার আভাস পাওয়া সম্ভব হয়নি। মন্দিরের ফ্রেস্কোর নীচে টানা (cursive) লেখার মতো নয়, গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা। ধরন দেখে মনে হয় এটি কোনো সুদক্ষ হাতে লেখা সংস্কৃত সাহিত্যকর্ম।

ছোটো ছোটো মন্দির খনন করে বালিতে চাপা পড়ে যাওয়া এই বসতিটি পরিত্যক্ত হবার আগেকার সংস্কৃতি ও শিল্পকলা সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ি থেকে এখনও পর্যন্ত পাওয়া নমুনা থেকে এখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই ঠিক করেছিলাম এখানে আরও খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালিয়ে যাব।

প্রথম পৃষ্ঠা আবিষ্কার

২২ ডিসেম্বর আমি আমার লোকজনকে নির্দেশ দিলাম কাছাকাছির মধ্যে বালি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা বেশ কিছু কাঠের খুঁটি বরাবর খোঁড়া শুরু করতে। খুঁটির বিন্যাস দেখে মনে হয়েছিল এটি কোনো বসতবাড়ি হলেও হতে পারে। মন্দির এলাকা থেকে এটি উত্তর-পশ্চিমে প্রায় কুড়ি গজ দূরে একটি বালিয়াড়ির উত্তরভাগে অবস্থিত ছিল। বালিয়াড়িটা প্রায় ১৬ ফুট উঁচু। বালিয়াড়ির নীচু অংশ থেকে মরে যাওয়া শুকনো গাছের শেকড় বেরিয়ে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শেকড়ের ব্যাপ্তি দেখে বোঝা যায় যে বাড়িটা গাছ দিয়ে ঘেরা ছিল। আর যেভাবে শেকড়গুলো বালির তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে, তা বলে দেয় এখানে আগে প্রত্ন-শিকারিরা খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। খনন শুরু হবার অল্প সময়ের মধ্যেই কাঠের ওপর পলেস্তারা দেওয়া দেওয়ালের অংশ দেখা যেতে শুরু করে। মোটামুটি ভালো অবস্থাতে পাওয়া বাড়ির দেওয়ালটা সম্ভবত এক আয়তাকার বসতবাড়ির নীচের অংশ। তার মাপ ছিল ২৩ ফুট * ২০ ফুট * ১০ ফুট।
দুপুর নাগাদ ফুট দু-এক গভীর আলগা বালি সরাতে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা একটি জীর্ণ কাগজের টুকরো পাওয়া গেল। এই ছোট্ট টুকরোটাকে অতীত সন্ধানের এক বড়ো সূত্র হিসেবে দেখেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমি বালি খুঁড়িয়েদের মধ্যে উৎসাহ বাড়ানোর জন্য যে প্রথম আর একটি ‘খত’ বা হাতে লেখা কাগজ বা পুথি খুঁজে পাবে তাকে এক টুকরো রুপো পুরস্কার দেব বলে ঘোষণা করে দিলাম।

বালি সরানোর কাজটা খুব সহজ নয়। একদিক থেকে বালি সরানো হলে সঙ্গেসঙ্গে অন্যদিক থেকে বালি ঝুরঝুর করে পড়ে সেই জায়গা দখল করে ফেলে। ঘণ্টা খানেক যেতে না যেতেই ধ্বংসস্তূপের উত্তর-পশ্চিমদিকের এক বালি খুঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘খত!’

খুব সাবধানে নিজের হাতে বালি সরিয়ে কাগজের পৃষ্ঠাটা বের করলাম। ১৩ ইঞ্চি লম্বা ৪ ইঞ্চি চওড়া আয়তাকার মাপের কাগজের পৃষ্ঠাটি খুব ভালো অবস্থাতেই ছিল। সম্ভবত একটি প্রাচীন ভারতীয় ঘরানায় বানানো বড়ো পুথির অংশ ছিল। পৃষ্ঠাটির বাঁ ধারে ছোটো গোল ছিদ্র, যার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা দড়ি পুথির অনেকগুলো পৃষ্ঠা ক্রমান্বয়ে একসঙ্গে ধরে রাখে। এই গড়নের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি চিনা তুর্কিস্তান থেকে আগেও উদ্ধার হয়েছে। পৃষ্ঠাটির দু-পাশে ছ’টি করে লাইন সুন্দর স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লেখা। অক্ষরের ধরণ গুপ্তযুগের ব্রাহ্মী জাতীয় হলেও ভাষা অ-ভারতীয়।

আমার দলের লোকেরা আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ‘খত’ পরিষ্কার করা দেখছিল। পরিষ্কার করতে করতেই কানে আসছিল ‘খত’ উদ্ধারের আগে আমার ঘোষণা করা পুরস্কার নিয়ে দলের লোকেদের হাস্যকৌতুক। পৃষ্ঠাটি খুঁজে পেয়েছিল তাওয়াক্কেল থেকে দলে যোগ দেওয়া খননকারী দলের একমাত্র পড়তে-লিখতে পারা যুবকটি। ছেলেটির নাম নিয়াজ, ওকে আমরা মোল্লা বলে ডাকতাম। এতে ছেলেটি ভীষণ খুশি ও সম্মানিত বোধ করত। দলের লোকেদের মতে, নিয়াজ লেখাপড়া জানে বলে ওই-ই ‘খত’টা খুঁজে পেয়েছে।

পুরস্কার পেয়ে নিয়াজ তার বালকসুলভ আনন্দ চেপে রাখতে পারেনি। পরবর্তীকালে নিয়াজ-সহ অন্যান্যরা এই প্রত্নতত্ত্বের গুরুত্ব বুঝে শুধু যে খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা ও যত্ন নিয়েছিল তাই নয়, সংগৃহীত নানা নমুনা পাঠানোর ক্ষেত্রে নিয়াজ তার তুর্কি জ্ঞান দিয়ে আমাকে প্যাকিং বাক্সের ওপর তুর্কিতে নির্দেশ লিখতে যথাসাধ্য সাহায্য করত।

সংস্কৃত পুথি আবিষ্কার

ওপরে যে-পৃষ্ঠাটি নিয়ে বলেছি সেটি পাওয়া গিয়েছিল বাড়িটার ঘরের ভেতরে একটি খুঁটির বাঁদিক থেকে ৫ ফুট মতো দূরে। এর অল্প সময়ের মধ্যেই আরও বেশ কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাণ্ডুলিপির অংশ পাওয়া গেল ঘরের মাঝখান থেকে। কিছু শুধুমাত্র আলগা কাগজ হিসেবে আবার কিছু বা টুকরো টুকরো আকারে, যদিও অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় সবগুলোই একটু প্রাচীন ধরনের ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। কাগজ, লেখার ছাঁচ ও ধরন দেখে মনে হল এগুলো আলাদা আলাদা তিনটে পুথির অংশ। এর ভাষা ছিল সংস্কৃত আর বক্তব্য বৌদ্ধ অনুশাসন বিষয়ক। ঘরের মূল মেঝে থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে আলগা বালির মধ্যে যেভাবে পৃষ্ঠাগুলো ও পাণ্ডুলিপির টুকরোগুলো পাওয়া গিয়েছিল তা বলে দেয়, নিঃসন্দেহে ওগুলো ওপর থেকে নীচে পড়ে গেছিল। শুধু তাই নয়, টুকরোগুলো পাওয়া গিয়েছিল বালির নানা স্তরে। যা থেকে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে ঘরের কোনো ওপরের অংশ থেকে এগুলো খসে পড়ে উড়ে আসা আলগা বালির মধ্যে নানা সময়ে জমা পড়েছে। আমার ভাবনার তত্ত্বকে সমর্থন করছিল ঘরে জমা হওয়া আলগা বালির নানা স্তরে পাওয়া অন্যান্য সামগ্রী। যেমন পশু-চামড়ার ও পশমের (ফেল্ট) টুকরো, অয়েল কেক (কুঞ্জরা) ইত্যাদি। কয়েকটি কাগজের ধারে লেখা পৃষ্ঠা সংখ্যা বোঝা সম্ভব হয়েছিল। যেমন একটি আলগা পাতার ধারে পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লেখিত ছিল ১৩২। সম্পূর্ণভাবে উদ্ধার করা না গেলেও পুথিগুলোর বিশালত্ব অনুমান করা যাচ্ছিল। সম্ভবত ওপরতলা ভেঙে যাবার সঙ্গে সঙ্গে এরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

২৩ ডিসেম্বর খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু হওয়া থেকেই আমি নতুন কিছু পাওয়ার আশায় ছিলাম। কারণ, বালি খুঁড়তে খুঁড়তে ঘরের প্রায় আসল মেঝের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল আমার লোকেরা। যতই গভীরে যাওয়া হচ্ছিল, বালি খোঁড়ার কাজটা ততই জটিল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। বালিয়াড়ির দক্ষিণের উঁচু ঢাল থেকে শুকনো বালি গড়িয়ে এসে ভরিয়ে দিচ্ছিল খালি জায়গা। ফলে আবার খুঁড়ে তুলতে হচ্ছিল বালি।

দমে না গিয়ে বার বার একই কাজ করে যাচ্ছিল এই মরুরই বসবাসকারী লোকেরা। বালি পরিষ্কার করার পর প্রথমেই মেঝে জুড়ে পড়ে থাকা পপলার গাছের বিশাল গুঁড়ি বেরিয়ে এল। ১৯ ফুটের মতো লম্বা গুঁড়িটা ফুট খানেক মোটা। কোনো সন্দেহ নেই, এই লম্বা গুঁড়িটা ঘরের ছাদকে ধরে রাখার কাজ করত। তাকে ঘরের মেঝেতে ঠেকনা দিয়ে রেখেছিল আরও দুটো অষ্টভুজাকার খুঁটি। খুঁটি দুটোর ঘণ্টাকৃতির মাথা দেখে ভারতীয় স্থাপত্যের ‘অমলক’ এর কথাই মনে এল।

খুঁটিগুলোর গা ঘেঁষে বালি পরিষ্কার করার পরপরই পাওয়া গিয়েছিল বোঁচকায় বাঁধা আরও পান্ডুলিপির পৃষ্ঠা। নিঃসন্দেহে আদি পুথিটির পৃষ্ঠাগুলো পরপর যে ভাবে সাজানো ছিল সে অবস্থাতেই রয়েছে। বালি আরও খুঁড়তে বেরিয়ে এসেছিল প্রায় একইরকম পোটলায় বাঁধা আরও দুটি প্রায় অক্ষত পান্ডুলিপির পাতা। আর্দ্রতার কারণে পুথির পাতাগুলো একটার সঙ্গে আর একটা আটকে ছিল। পাতা আলাদা করার চেষ্টা সেভাবে করিনি, কারণ কাগজগুলো ভঙ্গুর হয়ে ছিল। যে সুতোর বাঁধুনি দিয়ে পাতাগুলো জড়ানো ছিল, ভাঁজের কাছে সেগুলো অতি জীর্ণ অবস্থায় ছিল। এই পাতাগুলো লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পাণ্ডুলিপি বিভাগের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়েছিল সঠিকভাবে পুনরুদ্ধারের জন্য। ১৪ ইঞ্চি লম্বা পাতার দু-পাশে ছয় লাইন করে গোটাগোটা ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। লেখার ধাঁচ সম্ভবত ‘গুপ্ত’ যুগের। সংস্কৃত ভাষায় লেখা পৃষ্ঠাগুলোর বক্তব্য মূলত বৌদ্ধ ‘ধর্ম’ বা ধর্মীয় অনুশাসন সংক্রান্ত।

আমার উদ্ধার করা এই পৃষ্ঠাগুলো জন্য বিশিষ্ট ভারতবিদ ডক্টর এ. এফ. রুডলফ হোর্নল-এর কাছে গিয়েছিল। তিনি ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা সেই সমস্ত কাগজ ও পান্ডুলিপির পাঠোদ্ধার করে ছাপানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। এই বই যখন ছাপতে যাচ্ছে তখন তিনি আমায় জানিয়েছিলেন যে তিনি এর অনেকটাই পাঠোদ্ধার করতে পেরেছেন এবং এটিকে পুরোটাই বজ্রচ্ছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র (বৌদ্ধধর্মের মহাযান পন্থার একটি বিখ্যাত সূত্র) হিসাবে চিনতে পেরেছেন।

লিপির প্যালিওগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এটাও বলা কঠিন এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা সব পাণ্ডুলিপির কাল সপ্তম শতাব্দীর পরে কি না। বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করলে সেসব এক দু-শতাব্দী আগের লেখাও হতে পারে।

পাণ্ডুলিপির নানা বক্তব্যের ধর্মীয় প্রকৃতি দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায় এগুলো কোনো বৌদ্ধ মঠের (মনাস্টেরি) পাঠাগারের মধ্যে ছিল। এই বিহার থেকেই আশপাশের ছোটো মন্দিরগুলোতে পুরোহিতদের পাঠানো হত। বেসমেন্টের যে ঘরটি আমি খুঁড়ছিলাম, ঘটনাচক্রে সেটি কোনো সময়ে বৌদ্ধসাহিত্যের ছেঁড়াখোঁড়া পান্ডুলিপিগুলোর আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। আসলে সেটার ব্যবহার ছিল আরো কেজো উদ্দেশ্যে। আসলে সেটি ছিল মঠের রান্নাঘর। খুঁড়তে খুঁড়তে আমরা পরে একটা শক্ত প্লাস্টার করা উনুন পেলাম, যার বিস্তারিত ভাবে ঢালাই করা চিমনিটি উঠে গেছে মেঝে থেকে প্রায় ফুট ছয়েক ওপরে।

উনুনের পাশে একটা চওড়া কাঠের বেঞ্চ ছিল। বেঞ্চের আশেপাশে পড়ে ছিল বেশ কিছু মাটির পাত্র ও রান্নার বাসনকোসন। এই বেঞ্চটি সম্ভবত বসবার ও রান্নার বাসনপত্র রাখার – দুই কাজেই লাগত। বেঞ্চের পাশেই একটা কাঠের তেপায়া ছিল। তুর্কিস্তানের সব বাড়িতেই এই তেপায়াগুলো ব্যবহার করা হয় জলের পাত্র রাখার কাজে। তেপায়ার কাছেই একটা শক্ত ডালপালা-সহ মোটা গাছের ডাল পোঁতা ছিল। সম্ভবত এই ডালগুলো কেটলি ঝুলিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করা হত। ঘরের মেঝের নানাপ্রান্ত থেকে বালি সরিয়ে পাওয়া প্রাণীর হাড়, অয়েল কেক, কাঠকয়লার স্তূপ আমার রান্নাঘরের তত্ত্বকেই সমর্থন করে।

মরুর বুকে মিলন মেলা

২৩ ডিসেম্বরের দুপুর নাগাদ যখন আমি বালির গভীর থেকে উদ্ধার করা পাণ্ডুলিপি নিয়ে ব্যস্ত, তখন নিস্তব্ধ বালি-সমুদ্রের উত্তরদিক থেকে শোনা গেল বন্দুকের গুলির শব্দ। খোঁড়াখুঁড়ির তদারকিতে ব্যস্ত থাকা তুর্দি তার অভিজ্ঞতায় বুঝে গিয়েছিল এটা একটা সংকেত। কেরিয়া দরিয়ার দিক থেকে রাম সিং এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং, যশবন্ত সিং ( রাম সিং এর রাঁধুনি ও সঙ্গী) সহ পুরো দল আবার একত্র হলাম আমরা।

রাম সিংকে যে কাজ দিয়েছিলাম সেই টোপোগ্রাফির কাজ চিনা কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় লোকজনের কোনো বাধা ছাড়াই শেষ হয়েছে শুনে খুব স্বস্তি পেয়েছিলাম। আমাদের পুরোনো পথ ধরে পিশা উপত্যকায় ফিরে গিয়ে রাম সিং ইউরুং-কাশ নদীর উৎসস্থলের মাথার ওপরের বিশাল চূড়াগুলোর একটা বাড়তি ত্রিভুজিকরণ-জরিপ (সাপ্লিমেনটারি ট্রায়াঙ্গুলেশন) শেষ করে তারপর সেখান থেকে কে-৫, অর্থাৎ মুজতাঘ পর্বতের উত্তরদিকের হিমবাহের ঢাল ধরে কেরিয়ার পশ্চিমে মরুভূমির ধারের ছোটো ছোটো মরূদ্যানে নেমে আসেন। মুজতাঘ পর্বতের হিমবাহের ঢাল থেকে অসংখ্য ছোটো ছোটো জলের ধারা নেমে এসে মরুর কিনারায় গড়ে ওঠা মরূদ্যানগুলোকে সমৃদ্ধ করেছে। উঁচু পাহাড় থেকে প্লেন-টেবল ও ত্রিভুজকরণের (triangulation) মাধ্যমে রাম সিং পোলুকে ঘিরে ক্যাপ্টেন ডিজির করা জরিপের সঙ্গে পূর্বদিকে আমাদের করা কাজগুলোকে জুড়তে সফল হয়েছেন। কেরিয়াতে পৌঁছে স্থানীয় আম্বানের সাহায্যে নতুন গাইড নিয়ে কেরিয়া নদীর পাশের জঙ্গল ধরে আসার সময় তিনি শিকারি কাসিমের নেতৃত্বে পাঠানো দলের সঙ্গে মিলিত হন।

রাম সিং এমনিতে খুব কম কথা বলেন, কাজেই তিনি যে বিগত পর্বত যাত্রার বিস্তারিত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেবেন না তা ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর পেশাদার শিক্ষার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল ‘প্লেন-টেবিল’-এর টোপোগ্রাফিক্যাল বিবরণে। শুধু এটুকু জেনেছিলাম, প্রচণ্ড ঠান্ডা ও খাবার-দাবারের অভাবে খুব কষ্টের মধ্যে কেটেছিল তাঁদের দিনগুলো। এই কষ্টের অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে পাহাড়ে, তাই বুঝে নিতে আর কিছু প্রশ্ন করতে হয়নি। তবে তিনি সবচাইতে আশ্চর্য হয়েছিলেন এখানকার মরুর অদ্ভুত প্রাণশূন্যতা দেখে। জমে বরফ হয়ে যাওয়া নদীর ধার ছেড়ে আসার পর কোনো প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাননি, শুধু একের পর এক প্রাণহীন বালির পাহাড়। শুধু এইটুকু মনের ভাবই প্রকাশ করেছিলেন রাম সিং। নির্জন মরু প্রান্তরে বালি খুঁড়ে পাওয়া ভারতীয় ঘরানার ভাস্কর্য আর পাণ্ডুলিপি রাম সিংয়ের দুঃসাহসী হিন্দু সঙ্গীদের মধ্যেও যে খানিক ভয়ের সঞ্চার ঘটিয়েছিল তা টের পেয়েছিলাম। একটা জনপদ কী করে মৃত্যু-নির্জন হয়ে গেল, সে-কথা ভাবিয়ে তুলেছিল ওঁদের। আমি আমার সাধ্যমতো সবাইকে সঙ্গে থাকা সামান্য চা, ডিম, কিশমিশ, বাদাম ইত্যাদি খাইয়ে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম ।

রাতের আঁধার নামা শুরু হতে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি তাঁবুতে ঢুকে বিশ্রাম নিয়ে সময় নষ্ট না করে রাম সিংকে নিয়ে বসে গিয়েছিলাম তাঁর প্লেন টেবিলের কাজগুলো একবার দেখে নিয়ে আমার করা জরিপের নকশায় দান্দান-উইলিকের অবস্থান মিলিয়ে নিতে। এতে জরিপের নির্ভুলতা বজায় থাকবে। মরুভূমির প্রতারণাপূর্ণ চরিত্রের জন্য আমার জরিপের কাজ কতটা অভ্রান্ত হয়েছে জানার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। খুব আনন্দ হয়েছিল যখন রাম সিং জানিয়েছিলেন দান্দান-উইলিকের অবস্থান আমি যা লিপিবদ্ধ করেছি তার পার্থক্য মাত্র দ্রাঘিমাংশে আধা মাইল এবং অক্ষাংশে এক মাইলেরও কম। খোটান ছাড়ার পর থেকে রাম সিং প্রায় পাঁচশো মাইল পথ ধরে জরিপ সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৩০ মাইল পথে এমন কিছু ছিল না যাকে ‘ল্যান্ডমার্ক’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আমি একা প্রায় ১২০ মাইল মরুপথে ধূলিকণাভরা আবছায়ায় কাজ করেছি, দ্রাঘিমাংশ আর অক্ষাংশের এই পার্থক্য আমাকে তাই হতাশ করেনি।

রাম সিং, যশবন্ত সিং দুজনেই ঊষর মরুর অস্বস্তিকর আবহাওয়া বা কঠোর পরিবেশ মানিয়ে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কুয়ো খুঁড়ে জোগাড় করা নোনতা পানীয় জল গলায় দেওয়া দুঃসহ হয়ে উঠেছিল। নিজেদের অসুস্থতার জন্য পানীয় জলকেই দায়ী করেছিলেন দুজনে। যদিও আমার ধারণা, শুধু জল বা অপ্রতুল খাবারই নয়, দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি আর মরুর চরম আবহাওয়া অসুস্থতার অন্যতম কারণ। যশবন্ত সিং অনেকদিন কোনো সবজি না খেতে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। গিলগিট থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা লেবুর রস জমে বরফ হয়ে ছিল, তা গলিয়ে জলে সামান্য মিশিয়ে খাওয়ানোর পর একটু সুস্থ বোধ করেছিল সে।

এর মধ্যে রাম সিংয়ের আবার বাতের ব্যথা শুরু হল। তাঁর এই ব্যথা শুরু হয়েছিল ক্যাপ্টেন ডিজির সঙ্গে অভিযানকালেই। অথচ কাজপাগল এই মানুষটাকে ধ্বংসাবশেষ জুড়ে জরিপের কথা বলতেই ওঁর ব্যথা-ট্যথা সব চলে যায়। শীতের মরুতে আমার প্রত্যাশার চাইতেও ভালো কাজ করেছিলেন রাম সিং। কাজই ছিল তাঁর রোগের প্রতিষেধক। যদিও পরে বাতের ব্যথাই ওঁকে পেড়ে ফেলেছিল বিছানায়। কাশগর আর ইয়ারখন্দ থেকে দলে যোগ দেওয়া লোকজন শীতের মোকাবিলা করার জন্য তৈরি থাকলেও মরুভূমির প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়েছিল। হাত পা ফুলে যাচ্ছিল তাদের; শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। এমনকি কয়েকজনের শরীরে ঠান্ডায় ফোস্কা পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল।

শুধু দলের সবচাইতে বয়স্ক সদস্য তুর্দি ছিল সুস্থ। সেই ছোটোবেলা থেকে তাকলামাকানে গুপ্তধনের সন্ধানে আসতে আসতে মরুর আবহাওয়ার সঙ্গে ওর শরীরের পরিচয় থাকায় সেখানকার ঠান্ডা বা গরম তাকে কাবু করে উঠতে পারেনি। আমরা ওকে ‘তাকলামাকানের আকসাকল’ (দাদা) বলে ডাকতাম। মাঝে-মাঝেই তুর্দির সঙ্গে মজা করে মরুভূমির এই চরম আবহাওয়া সুস্থ থাকার রহস্য জানতে চাইলে তার কোঁচকানো মুখের চামড়ায় হাসি খেলে যেত।

তুর্দির টাট্টু

তুর্দি এত দূরদর্শী যে, যে-টাকা আমি ওকে মরুতে আসার আগে অগ্রিম হিসেবে দিয়েছিলাম তা দিয়ে একটি টাট্টু কিনে সেটাকে আমাকে লুকিয়ে নিজের মালপত্র বইবার কাজে লাগিয়েছিল। তার মাথায় ছিল যে, খাবারে টান পড়লেই সে-টাট্টু সে আবার আমার কাছেই বিক্রি করবে ওটাকে মেরে দলের শ্রমিকদের খাবার জোগাতে।

নিঃসন্দেহে টাট্টুকে দিয়ে মালপত্র বইয়ে শেষে সেটাকে মেরে খাবার হিসেবে বিক্রি করে অনেক টাকাই কামাতে পারত সে যদি না তাওয়াক্কেল থেকে আসা মজুরেরা অন্য কিছু ভেবে থাকত। তারা যথারীতি আমাকে লুকিয়ে একটা বুড়ো গোরু নিয়ে এসেছিল খাওয়ার জন্য। গোরু ও টাট্টুর বিষয়টা আমি জানতে পেরেছিলাম দান্দান-উইলিকে পৌঁছনোর ক’দিন পর যখন দেখছিলাম সঙ্গে আনা হিসেবের পশুখাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়ছে। হাড়জিরজিরে টাট্টুটাকে মজুরেরা না খেতে চাওয়াতে সেটাকে না খেয়ে মরার থেকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল তুর্দি। প্রথমে সে চেষ্টা করেছিল কাউকে দিয়ে কোনো এক মরূদ্যানে টাট্টুটাকে পাঠিয়ে দিতে। তা না পারাতে কেরিয়া নদীর ধারে পাঠাবার চেষ্টা করেছিল আধমরা টাট্টুটাকে। তাতেও সফল না হওয়াতে সে দলে থাকা তার এক সম্পর্কিত ভাইকে দিয়ে বেশ খানিক দূরের এক শুকনো চারণভূমিতে পাঠাবার চেষ্টা করেছিল যাতে শুকনো কুমুশ আর তামারিস্কের পাতা খেয়ে বাঁচতে পারে টাট্টুটা।

প্রাচীন পশুখাদ্যের ভাঁড়ার

কিন্তু টাট্টুটার আর এগোনোর ক্ষমতা ছিল না। এ-সময় তুর্দি আমার তাঁবু থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে শুকনো নদীখাতের ধারে খোঁড়াখুঁড়ির সময় বালির তলায় চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক বাড়ির উঠোনের ধারে পশুখাদ্য হতে পারে এরকম কিছু শুকনো খড়ের সন্ধান পায়। ক্ষুধার্ত টাট্টুটার উপস্থিতি এর পরেই আমার নজরে আসে যখন সেই শতাব্দী প্রাচীন শুকনো খড় খাওয়ানোর জন্য সেটাকে নিয়ে আনা হল। টাট্টুটা সেই খড় মুখে দিয়েই গোগ্রাসে খেতে থাকে। তুর্দির অনুমানে ভুল হয়েছিল। সেই খড় পশুর খাওয়ার যোগ্য ছিল না। এর একদিন পরেই রাম সিংয়ের দলের পুরো মালপত্র নিয়ে উটের দল হাজির হয়েছিল কেরিয়া দরিয়া থেকে। ওরা সঙ্গে করে কিছু কুমুশের শুকনো পাতা নিয়ে এসেছিল। সেখান থেকে কিছু পাতা খেতে দেওয়া হয়েছিল মৃতপ্রায় টাট্টুটাকে।

তুর্দি অনেকভাবে চেষ্টা করেছিল টাট্টুটাকে বিক্রি করার। কিন্তু কোনো খদ্দের না পাওয়ায় ঠিক হয়েছিল কেরিয়া দরিয়া থেকে আসা কাসিমের দুই লোকের সঙ্গে তাওয়াক্কেল-এ পাঠিয়ে দেওয়া হবে টাট্টুটা। লোকদুটো এমনিতেই আমার চিঠিপত্র নিয়ে তাওয়াক্কেল যেত সেখান থেকে খোটান পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য। যদিও আমার সন্দেহ ছিল ষাট মাইল মরুপথ পার হয়ে টাট্টুটা নদীর ধার পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কি না! একদিন পর খোটানের আম্বানের কাছ থেকে আমার কাছে আসা দুই বার্তাবাহক জানিয়েছিল, দান্দান-উইলিক থেকে একদিন যেতে না যেতেই টাট্টুটা রাস্তায় মারা পড়েছে।

এই ধ্বংসস্তূপ ছেড়ে রওনা হবার আগে তুর্দির কথাতে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এই মরু অঞ্চলের আইন কতটা কঠোর জেনে। সে তাওয়াক্কেলগামী লোকেদের কাছে মোল্লা নিয়াজকে দিয়ে তুর্কিতে একটি আবেদন লিখিয়ে ও মুখে বলে পাঠিয়েছিল যেন ওরা টাট্টুটার চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে তাওয়াক্কেলে বিক্রি করে। টাট্টুটা যে আবার বিক্রি করা হয়নি, এমনি মরে গেছে, তা লেখা ছিল ওই আবেদনে আর চামড়া তার প্রমাণ। এটা না করালে স্থানীয় বেগকে অনেক টাকা ট্যাক্স দিতে হবে, যা গরিব তুর্দির কাছে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে যেত। আমি অন্য কথা ভাবছিলাম। এই আবেদন পত্র ও টাট্টুঘোড়ার চামড়া যদি হাজার দু-হাজার বছর পর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিকের হাতে পড়ে, তবে সে না জানি কী ভাবত!

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%