মার্ক অরেল স্টাইন

১৭ অক্টোবর আখুন বেগের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়েছিলাম পাহাড়ের উদ্দেশে। একটা ছোটো স্টিলের বাক্সে পাঁচ রুবলের সোনার কয়েন ওঁর হাতে গুঁজে দিয়েছিলাম বাগান ব্যবহারের ভাড়া হিসেবে। উনি খানিক দোনোমনা করে গ্রহণ করেছিলেন। পাহাড় অভিযানে যা লাগবে না তা বদরুদ্দিনের জিম্মায় খোটানে ছেড়ে গিয়েছিলাম। সার্ভের সরঞ্জামসহ এক মাসের খাবারদাবার ও অনান্য জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে দশটা টাট্টুঘোড়া লেগে গিয়েছিল।
প্রথম দিনের যাত্রাপথ খুবই সহজ ছিল। জামাদা গ্রাম পর্যন্ত প্রথম ছয় মাইল পথ ছিল আবাদি জমির মধ্যে দিয়ে। দু-পাশে অজস্র ছোটো ছোটো গ্রাম। জামাদা গ্রাম ইউরুং-কাশ নদীর বাঁদিকে অবস্থিত। নদী থেকে গ্রামের দূরত্ব খুব বেশি নয়। এরপরই শুরু হল দশত। ধীরে ধীরে চড়াই শুরু হয়ে পৌঁছেছে পাহাড়ের পাদদেশে। খোটান থেকে এই পাহাড়ের আবছায়া আভাস পাওয়া যায়।
জামাদা থেকে খানিক এগিয়ে বালিময় সমভূমিতে একটি ‘তাতি’র খোঁজ পেয়েছিলাম। চারদিকে ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন। কয়েকজন গ্রামবাসী আমাদের দেখে পুরোনো মুদ্রা, পুঁতি এবং ছোটো ছোটো সিলমোহর নিয়ে এসেছিল। একজন আবার কামদেবের একটি ছোটো মূর্তি নিয়ে এসেছিল।
এখান থেকে মাইল চারেক পথ এগিয়ে পাথরভরা নদী পার হয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম নদীর ডান ধারে। এখানে নদীখাত এক মাইলেরও বেশি চওড়া। কিন্তু নদীর জল বইছে কয়েকটা তিরতিরে ধারা বেয়ে। নদীর মূল স্রোতকে কয়েকটা খালের মাধ্যমে বইয়ে দেওয়া হয়েছে খোটান মরূদ্যানের অভিমুখে।
রাত্রিটা কেটেছিল বিজিল নামের নদীখাত ঘেঁষা একটি ছোটো গ্রামে। নদীখাতে অসংখ্য গর্ত আর তার পাশে স্তূপীকৃত হয়ে থাকা নুড়ি-পাথরের স্তূপ জানান দিচ্ছিল জেড পাথর খুঁজিয়েদের উপস্থিতি। বহু প্রাচীনকাল থেকেই চিনে অতি মূল্যবান শ্বেত-জেড পাথরের চাহিদা তুঙ্গে এবং সে-চাহিদা বর্তমানেও বহাল।

বিজিল ছাড়িয়ে দক্ষিণের দিকে পাহাড়ের ঢাল ওপরের দিকে উঠে গেছে। ১৮ অক্টোবর সকালে নদীখাতের নুড়ি আর বালির ওপর দিয়ে শুরু হয়েছিল পাহাড়ে ওঠা। সম্পূর্ণ জনশূন্য অঞ্চলে গাছপালা খুবই কম। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে বহু নীচে খোটানের মরূদ্যান আবছা দেখা যাচ্ছিল। তাশলিক-বোয়ান গিরিপথের শীর্ষ থেকে ইউরুং-কাশ নদীর গিরিখাতের বিস্তার স্পষ্ট ধরা পড়েছিল চোখের সামনে। দেখা যাচ্ছিল দক্ষিণের বেশ কিছু বরফের টুপি পরা পাহাড়। তাশলিক-বোয়ান গিরিপথের মাথা থেকে সোজা নেমে আসতে হয়েছিল কিস্সেল নদীর ধারার পাশে। এই নদীর ধার দিয়েই এগোতে হবে আমাদের। ঢাল বেয়ে নামার সময় টাট্টুঘোড়ার খুরে ধুলো ধুলো হয়ে যাচ্ছিল চারদিক।
উপত্যকার নীচে পৌঁছতে পড়ল কুমাত নামের একখানা ছোট্ট গ্রাম। নদীর ধারের একফালি জমিতে চাষ করা ফসলে চলে গোটা পনেরো পরিবার। ক্রমশ সরু হয়ে আসা উপত্যকায় আঁধার ঘনিয়ে আসছিল দ্রুত। আমাদের রাতের আস্তানা চার মাইল দূরের ইয়াঙ্গি-লঙ্গর যেন আর আসতেই চাইছিল না। খোটানের মরূদ্যান থেকেও এখানকার তাপমাত্রা বেশি। রাত আটটায় ইয়াঙ্গি-লঙ্গারে তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল ৪৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।
১৯ অক্টোবর প্রায় আঠারো মাইল চলে পৌঁছেছিলাম তারিম-কিশলক-এ। কিস্সেল নদীখাত ধরে চলতে চলতে সারা পথে একটাও গ্রাম বা মানুষের দেখা পাইনি। পথ রুক্ষ আর পাথর-ভরা, কিন্তু অজস্র ছোটো ছোটো জলের ধারা দু-পাশের খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে এসে মিশেছিল কিস্সেল নদীতে। বেশ কয়েক জায়গায় মালপত্র বোঝাই টাট্টুঘোড়াকে নদীখাতের বড়ো বড়ো পাথর টপকে নিয়ে যেতে বেগ পেতে হয়েছিল। উদ্দাম গতিতে বাতাস বইছিল সরু উপত্যকার মাঝখান দিয়ে। দু-পাশের পাহাড়ের ও-পারে কী আছে জানার কোনো উপায় ছিল না। কারণ, এই অঞ্চলে জরিপের কাজ হয়নি কখনও। পাহাড়ের মাথায় উঠে আশপাশ দেখার মতো সময় হাতে নেই। তারিম-কিশলকে একটা মাত্র মাটির ঘর। তার কাছের এক ফালি জমিতে খানিক ওট ফলে আছে। এর বাইরে চারপাশে খালি বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই ছাড়া আর কিছু নেই।
২০ অক্টোবর সকালে তাঁবু থেকে বার হয়ে দেখি যে ছোটো জলের ধারার পাশে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম সেটা প্রায় জমে আছে। বয়েলিং পয়েন্ট থার্মোমিটারে তারিম-কিশলকের উচ্চতা দেখাচ্ছিল ৯,০০০ ফুট আর সকাল সাতটায় তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্ক বিন্দুতে। যে গিরিসংকট ধরে চলছিলাম, তার বিস্তার ছিল দক্ষিণ-পূর্বে আরও মাইল আটেক। তারপর আমরা নদীর কিনারা ছেড়ে চলতে শুরু করি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। পাহাড়ের গায়ে আলগা মাটির স্তর। অজস্র গুল্ম মাটিকে আঁকড়ে ধরে। গিরিপথের শীর্ষে পৌঁছনোর খানিক আগে থেকেই দমকা বাতাস আঘাত হানতে শুরু করেছিল। আশপাশ ঢেকে ছিল মেঘ আর ধুলোয়।
দুপুর দুটো নাগাদ গিরিপথের মাথা উলুঘ-দাওয়ানে পৌঁছনোর পর খানিক কুয়াশার মধ্যে দিয়েও সুদূর দক্ষিণের বরফ ঢাকা পাহাড়ের দেখা পেলাম। আমি আর সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং মিলে গিরিপথ লাগোয়া এক চুড়োর মাথায় উঠে পড়লাম। পুরস্কারও পেয়েছিলাম সঙ্গে সঙ্গে। দক্ষিণ-পূর্বে হিমবাহ আচ্ছাদিত সুউচ্চ পর্বতশিখর জ্বলজ্বল করছিল চোখের সামনে। ভুল হবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কুয়েন-লুন পিক-৫। গ্রেট ইন্ডিয়ান ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভের টেবিলে এই পর্বতের উচ্চতা উল্লেখিত আছে ২৩,৮৯০ ফুট। মেঘে ঢেকে থাকায় তুষারমৌলী পিক-৫ -এর ডান-বাঁয়ের পাহাড়চূড়াগুলো দেখতে পাইনি। গিরিসংকটের মাথায় উদ্দাম গতিতে বাতাস বইছিল, তাপমাত্রাও ছিল হিমাঙ্কের নীচে। জায়গাটার উচ্চতা ১২,০০০ ফুটের খানিক বেশি।
বিকেল চারটের সময় নীরস গিরিসংকট থেকে বেরোতে পেরে খুশিই হলাম। নামতে গিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমদিকে বিস্তৃত বুয়া উপত্যকার এক দুর্গম গিরিখাতের মধ্যে ইউরুং-কাশ নদী বয়ে চলেছে। আর পাহাড়ের যে ঢাল বেয়ে নামতে হচ্ছিল তা যেমনি খাড়া তেমনি ক্লান্তিকর। অসংখ্য জলের ধারা নেমেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কালো পাথরের ঢালে প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। অন্ধকার ঘনিয়ে আসা পাহাড়ের গা বেয়ে মালবোঝাই টাট্টুঘোড়াগুলো নিয়ে নামতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। খানিক ধীরে ধীরে হলেও আমাদের দক্ষ গাইড গভীর রাতে বুয়া উপত্যকার এক গ্রামে নিয়ে পৌঁছিয়েছিল কোনো অঘটন ছাড়াই।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি পরিষ্কার আকাশ। এমন দিন জরিপের জন্য আদর্শ। যদিও আমাদের দলের লোকজন আর টাট্টুঘোড়াগুলোর একদিন বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এমন সুন্দর দিনটাকে হাতছাড়া করতে চাইনি তাই পিশাতে চলে যেতে চাইলাম। আট হাজার ফুট উচ্চতার বুয়া উপত্যকার এই গ্রামটি প্রায় মাইল খানেক জায়গা জুড়ে। তিরিশটির মতো পরিবার এখানে মূলত ওটের চাষ করেই বেঁচে আছে। চড়াই ভেঙে উপত্যকার মাথার খানিক সমতল জায়গায় পৌঁছতে আমাদের সামনে লাদাখের দিকে যাওয়া আর তিব্বতের পশ্চিম সীমান্তের তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গগুলো তাদের রূপ মেলে ধরেছিল। কুয়েন-লুন পর্বতের হিমবাহের প্রতিটি ভাঁজ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বুয়ার ‘উন-বাশি’ অর্থাৎ মোড়ল এই কুয়েন-লুনকে জানে ‘মুজ-তাঘ’ বা ‘বরফ পাহাড়’ নামেই। বরফ পাহাড়ের বাইরে এইসব চূড়ার আলাদা কোনো পরিচিতি নেই এদের কাছে। দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ-পাহাড়, কিন্তু তারই মাঝে নীচের অংশের কুয়াশা সরে যেতে নজরে এসেছিল শৈলশিরায় মালভূমির হলদেটে ছাপ। চরম আবহাওয়া, শুকনো বাতাস আর গাছপালার অভাব প্রকৃতিকে এখানে করে তুলেছে বিপরীতমুখী। মরুর পাশেই বরফের সাম্রাজ্য!
এরপর আমরা দশ মাইল পথ পার হই। আমাদের ভাগ্য ভালো, টাট্টুঘোড়াগুলোর চলতে কোনো অসুবিধা হয়নি। মালভূমির দক্ষিণের শেষ শীর্ষদেশ থেকে পিশার প্রশস্ত চাষের জমি দেখা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল সেই শৈলশিরা যা কুয়েনে-লুয়েনকে তার পাদদেশের শেষ জনবসতির উপত্যকা কারাংঘুটাঘ থেকে আলাদা করে রেখেছে।
পাঁচটা নাগাদ আমরা পিশা উপত্যকার প্রধান গ্রাম কুলডোবেতে পৌঁছলাম। আমাদের স্বাগত জানাবার জন্য জনা চব্বিশজন তাঘলিক অপেক্ষায় ছিল। ওদের কথাবার্তা ও আচরণ অনেকটাই খোটানের বাসিন্দাদের মতো বলে আমার মনে হয়েছিল। ওদের ভেড়ার চামড়ার তৈরি পোশাক আর খানিক কোঁচকানো চামড়া বলে দিচ্ছিল দু-জায়গার জলবায়ুর ফারাক। এদের অধিকাংশই কোনোদিন সমতল দেখেনি। এই রুক্ষ কঠিন পার্বত্যভূমিই এদের দুনিয়া। আমার খালি মনে হচ্ছিল এরা বোধ হয় কেউ ফুলে ছাওয়া পামিরের চারণভূমি কেমন দেখতে তাও জানে না।
২২ অক্টোবর বিশ্রামের জন্য কুলডোবেতে থেকে গেছিলাম। আকাশ মেঘে ঢেকে ছিল। খানিক পরপর তুমুল ঠান্ডা ঝোড়ো বাতাস হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সঙ্গে ছিল ধুলো। সকালটা খানিক চিঠিপত্র লিখে কাটিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। একটা ছোটো জলের ধারা বয়ে গেছে চাষের জমির পাশ দিয়ে। কিন্তু কুয়াশা আর মেঘের জন্য দূরের কিছু নজরে আসছিল না। ফিরে এসে দেখি বলতে গেলে পিশার সব মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে আমাদের ক্যাম্পে। বহুবছরের মধ্যে ওরা গ্রামের বাইরের এত লোকজন দেখেনি। হাকিম শাহ্, বয়োবৃদ্ধ ইউজবাশি যিনি নিজের বয়স একশোর ওপর বলে জানিয়েছিলেন, কুঁজো হয়ে যাওয়া লাঠি ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা কোঁচকানো চামড়া আর বরফের মতো সাদা চুলদাড়ির হাকিম শাহ্…সবাই বেশ তরতাজা দেখতে। মুসলমানদের বিদ্রোহের আগে প্রথম দিকের চিনা শাসকদের কথা তাঁর স্পষ্ট মনে আছে। জীবনে একবারই তিনি এই অঞ্চল ছেড়ে খোটানে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকজন তাই ওঁকে ‘বাইরের দুনিয়ার খবর জানা মানুষ’ বলে মনে করে।
আমার দলের লোকেরা জেনে গিয়েছিল, সামনের পথ শুধু লম্বাই নয়, কঠিনও বটে। তাই ২৩ অক্টোবর খুব ভোরেই তাঁবু গুটিয়ে যাত্রা শুরু হল। সকাল ছ’টায় তাঁবু থেকে বেরিয়েই প্রথমে নজরে পড়েছিল পরিষ্কার আকাশ আর জমাটি ঠান্ডা। থার্মোমিটার বলছিল ২৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। আমার তাঁবুর সামনে দিয়ে বয়ে চলা একচিলতে জলের ধারা জমে তখন শক্ত বরফ হয়ে গেছে।
পিশা উপত্যকার শ-পাঁচেক ফুট উপরে উঠতেই বরফের চাদরে মোড়া পুরো অঞ্চলটা চোখের সামনে ফুটে উঠল। দক্ষিণ-পুবে কুয়েন-লুন-৫। পরিষ্কার আবহাওয়ায় কুয়েন-লুয়েনের হিমবাহ ঝকঝক করছিল। প্রায় আট মাইল অনুর্বর প্রশস্ত মালভূমির ওপর দিয়ে হেঁটে একটা শৈলশিরার মাথায় চেপেছিলাম। জরিপের কাজ করার আদর্শ জায়গা ছিল এটি।
এখানকার উচ্চতা ১৩,৯৫০ ফুট। মুজতাঘ-আতার ঢালের পর এত সুন্দর দৃশ্য আবার দেখতে পেলাম। পুবে আকাশে মাথা তুলেছে মহান কুয়েন-লুন শৃঙ্গ। তার অসামান্য গড়ণের উচ্চাবচ ধারগুলোকে জায়গায় জায়গায় চিরে গিয়েছে চোখ ঝলসানো হিমবাহেরা। তার পাদদেশে বিচিত্র চেহারার সব ক্ষয়ীভূত শিলাস্তর। এর ঠিক পাশের গিরিসংকটের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে ইউরুং-কাশ নদীর প্রধান শাখাটি। কুয়েন লুয়েনের প্রধান পর্বতমালার বরফ থেকে উৎপন্ন হয়ে বিপুলাকৃতি গিরিশিরাগুলোকে চিরে চিরে উত্তরমুখে বয়ে চলেছে তা। এই খাতটা মূল পর্বতশ্রেণি থেকে শৃঙ্গটাকে আলাদা করে রেখেছে। ব্যাপারটা খানিক অবাক করা হলেও, কারাকোরাম ও হিন্দুকুশ অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার বিষয়ে লেখাপত্রে এ বৈশিষ্ট্য নেহাত অমিল নয়। গভীর গিরিখাত আর মূল পর্বত থেকে নেমে আসা বরফের গিরিশিরাগুলি পেছনের মালভূমির সমতলের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছিল। পশ্চিমের দিকে ইউরুং-কাশের মূল ধারা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে সুউচ্চ পাথর-প্রাচীরের কল্যাণে, যা ধীরে ধীরে সমতলের দিকে গিয়ে ক্রমশ ছোটো হয়ে এসেছে। উত্তরের দিকের অবিচ্ছিন্ন পাহাড়ি রেঞ্জ যা আমরা বুয়াতে আসার সময় পার হয়ে এসেছি। খানিক দূরে তুষারাবৃত উলুগ-দাওয়ান আর তার পুবদিকে তিকেলিক-তাঘ শৃঙ্গ।
যে গিরিশিরার ওপর জরিপের কাজের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম তার থেকে আর ভালো জায়গা হতে পারে না। ঠিক মানচিত্রের মতো বিস্তৃত অঞ্চল চোখের সামনে। রাম সিং তাঁর প্লেন টেবিল নিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন আর আমি ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে পুরো অঞ্চলটা নিরীক্ষণ করছিলাম। আকাশ নীল থাকলেও প্রচণ্ড ঠান্ডায় আঙুলগুলো অসাড় হয়ে আসছিল। ফলে সূক্ষ্ম যন্ত্রটা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।
বিকেল তিনটের সময় কাজ শেষ করে রিজের মাথা থেকে খুব দ্রুত নেমে আসলাম আমরা। ওপর থেকেই লক্ষ করেছিলাম মালপত্রসহ টাট্টুঘোড়াদের নিয়ে আমাদের দলের বাকি সদস্যরা পিশার গাইডদের সঙ্গে কারাংঘু-তাঘ উপত্যকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মাইল দু-এক সহজে নামার পর উপত্যকায় নামার ভয়াবহ পথটি এসে গেল। গিরিসংকট বেয়ে সটান ঝাঁপ দিয়েছে গিরিখাতের মাঝে। এগারো হাজার ফুট উচ্চতা থেকে পাথরের দেওয়ালের সংকীর্ণ ঢাল বেয়ে নামতে হবে প্রায় তিন হাজার ফুট নীচে।
আমরা যখন নীচে নামা শুরু করি তখন একটু একটু করে রাতের আঁধার ঘনাতে শুরু করেছিল। দিনের প্রখর আলোতেও এ-পথে নামা ওঠা করতে অতি সাহসীর বুক কেঁপে যাবে। ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল বেয়ে সরু পথটা নেমেছে। ভীত টাট্টুঘোড়াগুলোকে প্রায় টেনে নামাতে হচ্ছিল অতি সন্তর্পণে। সামান্য হিসেবের ভুল বা একটা ভুল পদক্ষেপ মানেই ভয়ংকর ঘটনা। সবচাইতে বেশি বেগ পেতে হচ্ছিল আলগা নুড়ি আর মালভূমি থেকে উড়ে এসে জমে থাকা পুরু ধুলোর আস্তরণ নিয়ে। এমন ধুলো-মেঘের মধ্যে দিয়ে আমি আগে কখনও পথ চলিনি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে ধীরে ধীরে অবরোহণ করে উপত্যকার তলদেশে ইউরুং-কাশের ধারে পৌঁছে হাঁফ ছেড়েছিলাম। কারাংঘু-তাঘের পাশের এক উপত্যকা থেকে কাশ নদী এখানে এসে ইউরুং-কাশের সঙ্গে মিশেছে।
৭০ ফুট চওড়া খাদের ওপরে তিনটে গাছের গুঁড়ি পাশাপাশি ফেলে কোনোক্রমে জোড়া এক নড়বড়ে ব্রিজ টপকে ইউরুং-কাশের বামদিকে যখন এসে পৌঁছলাম তখন পুরো অন্ধকার হয়ে গেছে। পাথরের ওপর দিয়ে দুরন্ত গতিতে বইতে থাকা নদীর জলের ফেনা অন্ধকারেও ঝিলিক দিচ্ছিল। রাতে নদীতে জল কম থাকে, কিন্তু দিনের আলোতে আর শরীর-মন ক্লান্ত না থাকলে এই ব্রিজের ওপর দিয়ে নদী টপকাতে যে-কোনো লোকের স্নায়ুতে যে চাপ দেবে তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের দলবল নির্বিঘ্নে মালপত্র বোঝাই টাট্টুঘোড়াসহ নদী পার হয়ে এসেছিল দেখে খানিক স্বস্তি পেয়েছিলাম। কারাংঘু-তাঘ কথাটির অর্থ ‘অন্ধ করা পাহাড়ি অন্ধকার’ যে কতটা সত্য তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। এরপর আরও প্রায় ঘণ্টা খানেক ক্লান্ত পশুর দলের সঙ্গে খাড়া পাহাড়ের দেওয়ালকে পাশে রেখে কাশ নদীর ধারের পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম উপত্যকার শেষ গ্রামে। মালপত্তর এলো একটু দেরি করেই, তাই শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে গেল।
২৪ অক্টোবর কারাংঘু-তাঘেই কাটিয়েছিলাম আমরা। কারণ, এরপর এগোনোর জন্য কিছু লোকবল আর ইয়াকের দরকার। গতকালের জরিপের ফলে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে খোটান নদী অর্থাৎ ইউরুং-কাশের উৎসে পৌঁছনোর অন্যতম পথ নদীখাত নিজেই। ছোটো গ্রামের ইউজবাশি ও বৃদ্ধরা আমার কাছে এসে প্রথমেই জানিয়েছিল, যে পর্যন্ত আমরা এসে পৌঁছেছি তার পরে আর এগোনো সম্ভব নয়।
একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছিলাম যে বরফশৃঙ্গ থেকে নেমে আসা নালার ধারে পাহাড়ের ওপর বেশ কিছু গ্রীষ্মকালীন চারণভূমি আছে। আর ইউরুং-কাশের কিনারা থেকে এই চারণভূমিতে যাওয়া যায়। কোনো সন্দেহ নেই, এই গ্রামের লোকজন পরিচিত অংশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাহাড়ের উচ্চতর অংশে যেতে ভয় পায়।
১৮৬৫ সালে জনসনের লে থেকে খোটান অভিযান পথের নকশার সঙ্গে পিশার দক্ষিণের পাহাড়ের আসল অরোগ্রাফি খানিক বিভ্রান্তিমূলক। স্থানীয় মানুষজনের সাহায্য ছাড়া এই বিভ্রান্তি দূর হবার নয়। সে যাই হোক, আমার মূল উদ্দেশ্য পুবের দিকে ইউরুং-কাশের উৎস চিহ্নিত করা। গ্রামের লোকদের ইয়াক আর প্রয়োজনীয় লোকবল দিতে অনিচ্ছা দেখে আসরে নামল ইসলাম বেগ, খোটান ইয়ামেনের এক তরুণ আর উদ্যমী পরিচারক। স্বয়ং প্যান ডারিন ইসলাম বেগকে আমার সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন সবরকম সাহায্য জোগাড় করে দেবার জন্য। ইসলাম বেগ গ্রামবাসী তাঘলিকদের বলেছিল যে আম্বানের আদেশে আমাদের অভিযানের জন্য সবরকম সাহায্য করতে হবে, না-হলে বিপদ। কারাংঘু-তাগের নেতারা এরপর নানাদিকে লোক পাঠাতে শুরু করে। পর্বতের মাঝে লুকিয়ে থাকা কারাংঘু-তাঘের গ্রামের লোকেরা অনিচ্ছুক হলেও আম্বানের হুকুমে আমাদের প্রয়োজনীয় লোকবল আর ইয়াক জোগাড় করে দিয়েছিল অচিরেই।

সকালে গ্রাম ঘুরতে গিয়ে দেখেছিলাম নয় নয় করেও এই প্রত্যন্ত গ্রামে প্রায় চল্লিশটি বাড়ি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চাষের খেতে ওট ফলে আছে প্রচুর। অন্তত এই গ্রামবাসীদের খাবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট। শুধু তাই নয়, টের পেয়েছিলাম যারা এই উপত্যকার ওপরের অংশে ইয়াক আর ভেড়া চরিয়ে বেড়ায়, কারাংঘু-তাঘ সেই পশুচারকদের শীতকালীন আবাসও বটে। এইসব পশুর পালের আসল মালিক খোটানের কোনো না কোনো ব্যবসায়ী বা ‘বাইস’। কখনো-কখনো এই ব্যবসায়ীরা আসেন পশুপাল পরিদর্শনে। আর এই ব্যবসায়ীরাই উপত্যকার মানুষদের সঙ্গে বহির্বিশ্বের একমাত্র মেলবন্ধন।
কারাংঘু-তাঘের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে আরও ভূমিকা থাকে খোটানের অপরাধীকুলের। বিশেষ অপরাধে অপরাধীদের এখানে নির্বাসনে পাঠানো হয়। নির্বাসন কথাটা এই পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিলে যায়। নির্বাসিত জীবন কাটানোর জন্য এইরকম জায়গা আরও খুঁজে পাওয়া দুরূহ। খাড়া পাহাড়ের মাঝে সংকীর্ণ এক উপত্যকা, বহির্জগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ দূরের কথা, এখান থেকে খানিক দূরের বরফ ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্যও চোখে পড়ে না। বাইরে থেকে যারা কদাচ আসে তাদের কাছে প্রকৃতির এই বদ্ধ জায়গাকে সত্যিই জেলখানা মনে হবে।
শুনে অবাক লাগছিল, যেসব পাহাড়ি মানুষ এই অঞ্চলের কোথাও না কোথাও নির্জনে বসবাস করে, তাদের কাছে কারাংঘু-তাঘ হল এক শহর। যেখানে বলতে গেলে প্রাণের কোনো সাড়া নেই, সেখানে গুটিকয়েক উইলো আর পপলারের ঝাড়ের মাঝে পাথর আর মাটি দিয়ে গাঁথা গোটা চল্লিশ ঘরবাড়ির সাম্রাজ্য যে এক শহর বলে পরিচিত হবে সেটাই স্বাভাবিক। আমার কাছে এইরকম কঠিন আবহাওয়ার দুর্গমতম অঞ্চলের পরম নির্জনতায় নির্বাসনের ব্যবস্থা কঠিনতম শাস্তি বলে মনে হয়েছিল।
জরিপের কাজ করার জন্য গ্রামের উত্তর-পূর্বদিকের একটা খাড়া পাহাড়ের মাথায় উঠেছিলাম। নিঃসন্দেহে জরিপের জন্য পাহাড়-চূড়াটা একটা আদর্শ জায়গা ছিল। কিন্তু গতকালের মতো আজকের আকাশ অত পরিষ্কার ছিল না। খারাপ আবহাওয়ার কারণে খুব একটা কাজের কাজ হবে না দেখে পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে এসে কাছের এক কবরখানা দেখতে গেলাম। কবরের সংখ্যা প্রমাণ দেয় এখানকার বর্তমান জনসংখ্যা খুব বেশি হলে শ-দু’এক হলেও জনবসতি খুব প্রাচীন। মাটি স্তূপ করে কাঠের ঘের দিয়ে চিহ্নিত কবরের সংখ্যা অসংখ্য। কবরের ওপর খুঁটি পুঁতে ঝুলিয়ে রাখা ইয়াকের লোমের ঝালর। দুটো ছোটো মসজিদ আর আধডজন মাজারও ছিল জায়গাটায়। ইয়াকের লেজ আর কাপড়ের ফিতে দিয়ে সাজানো মাজারগুলো বুঝিয়ে দেয় এই সমাধিগুলো কোনো না কোনো সন্তের বিশ্রামস্থল।
ইউরুং-কাশের উৎসের দিকে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ নিয়ে কারাংঘু-তাঘের ইউজবাশি বা তার লোকেরা কোনোরকম আলোকপাত করতেই পারল না। গ্রামের গণ্ডির বাইরে এদের ধারণা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে একটা কথা ওরা বলেছিল, এখান থেকে একদিন হাঁটলে ওমশা জিলগা নামে একটা ছোটো গ্রাম আছে, ইয়াকে চেপে সেখানে যাওয়া যেতে পারে। সেই গ্রামের কাছে একটা গরম জলের কুণ্ড আছে। সেই কুণ্ডের জল গিয়ে ইউরুং-কাশে পড়েছে। কিন্তু ওই গ্রামের পর নদীর উৎসের দিকে যাবার কোনো পথ আর নেই। ওদের দেওয়া তথ্য সঠিক কি না জানার একমাত্র উপায় ছিল নিজে গিয়ে পরিদর্শন করা।
আমাদের ও অভিযানের মালপত্র বহন করার জন্য বেশ কিছু ইয়াক এনে হাজির করা হয়েছিল। আমাদের সঙ্গের ক্লান্ত টাট্টুঘোড়াগুলো কারাংঘু-তাগে থেকে যাবে আমাদের চিনা দোভাষী নিয়াজ আখুনের দায়িত্বে। এই কঠিন পথে যাত্রার ধকলে ও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। শুধু টাট্টুঘোড়াগুলোই নয়, আমার ছোট্ট টেরিয়ার ইওলচি বেগকেও ওর কাছে রেখে যেতে হবে। ওর মধ্যে ক্লান্তির কোনো লক্ষণ না থাকলেও অভিযানের আগামী দিনগুলোর জন্য সুস্থ রাখতে ওকেও বিশ্রামে রাখা প্রয়োজন।

২৫ অক্টোবর সকাল দশটার সময় ইয়াকের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে আমরা যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছিলাম। প্রতিটি ইয়াকের সঙ্গে একজন করে স্থানীয় পাহাড়ি মানুষ রেখেছিলাম। বরফ পাহাড়ের প্রাণী ইয়াক ‘শিওর ফুট’ হলেও প্রচণ্ড অলস। তাকে দড়িতে বেঁধে টেনে না নিয়ে চললে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে তো থাকবেই। দলের প্রতিটি সদস্যর কম করে দশদিন চলার মতো খাবার সঙ্গে নিয়েছিলাম। আমরা রওনা দেবার সময় কারাংঘু-তাগের প্রতিটি মানুষ জড়ো হয়েছিল। কারণ, এর আগে লটবহর নিয়ে এইরকম বিশাল দলের যাত্রা এরা আগে কখনও দেখেনি।
কাশ উপত্যকা ধরে মাইল দু-এক চলার পর পুবদিকের এক ঢাল পার করে পৌঁছেছিলাম পাশের উপত্যকা বুসাট-এ। সামনেই দুটি গিরিপথে ভাগ হয়ে এগিয়ে গেছে দক্ষিণের দিকে। উপত্যকার শীর্ষ বইনাক পৌঁছতে খাড়াই ঢাল বেয়ে উঠতে হয়েছিল। ১২,০০০ ফুট উঁচুতে পৌঁছতে মুজতাঘ পর্বতের হিমবাহ আর তা থেকে নেমে আসা বড়ো জলের ধারা আর গিরিখাতগুলোর পরিষ্কার ছবি ধরা দিল। ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু খানিক পরেই কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছিল আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করায়। ক’দিন ধরে লক্ষ করেছি, সকালে আবহাওয়া ভালো থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ঠান্ডা উত্তুরে বাতাস বইতে শুরু করছে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘ আর ধুলোর কুয়াশায় ঢেকে যায় চারদিক।
বইনাক থেকে মাইল তিনেকের সহজ একটা পথ বেয়ে নেমে গেছিলাম ওমশা উপত্যকায়। এখানে আমাদের ইউরুং-কাশ নদী পার হয়ে নদীর ডান পাশে যেতে হয়েছিল। ইউরুং-কাশ এখানে প্রায় ৫০ গজ চওড়া আর ফুট তিনেক গভীর। নদীর পান্না-সবুজ জল আমাকে কাশ্মীর আর আল্পসের নানা নদীর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। নদীর জলের স্বচ্ছতা বলে দিচ্ছিল ইউরুং-কাশ মুজতাঘ ও অন্যান্য চূড়া থেকে বেরোনো হিমবাহের বরফগলা জলে পুষ্ট হয়েছে। নদীখাতের বিস্তৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল গ্রীষ্মে কী পরিমাণ জল বয়ে যায় ইউরুং-কাশের খাত বেয়ে।
২৬ অক্টোবর সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। খানিক বাদেই সূর্যকিরণ আমাদের সকাল সাতটার ২৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার কথা ভুলিয়ে দিল। যেখানে নদীর ধারে গতকাল ক্যাম্প করেছিলাম, সেই তেরেক-আঘজি থেকে প্রায় টানা আড়াই ঘণ্টা খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পৌঁছলাম জিলান নামের একটা ঘাসে ঢাকা অঞ্চলে। এখানে পৌঁছে দক্ষিণদিকে মুজতাঘ আর অনান্য তুষারাবৃত পর্বতের দেখা পেয়ে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রায় মাইল চারেক দূরে নানা পাহাড়ের ভিড়ে ইউরুং-কাশের গিরিখাত সম্পূর্ণ চোখের আড়ালে চলে গিয়েছে। পাথুরে পাহাড়ের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আছে ‘কে-৫’ সহ আরও কিছু বরফ-চূড়া। ওই বরফ-চূড়াগুলোর পেছনেই আছে পামিরের উচ্চভূমি, যার সম্পর্কে আমি জেনেছিলাম ক্যাপ্টেন ডিজির অভিযানের বর্ণনা থেকে।
মুজতাঘ পর্বতের যে অংশ চিড়ে ইউরুং-কাশ নদী গিয়েছে, সেই এলাকার পাহাড়ের পাঁচিলের ওপর দিয়ে যে যাওয়া যাবে না তা স্পষ্ট বুঝে গেছিলাম। একমাত্র উপায় নদীখাত ধরে চলা। কিন্তু তা করতে গেলে আমাদের পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে হবে নদীর ধারে। যা ইয়াকদের কল্যাণে সম্ভব। ওখানেই নদীর বাম পাশে আছে ‘ইসিক-বুলাক’ গরম জলের ঝরনা। আমাদের ক্যাম্পের উলটোদিকে নদীতল থেকে প্রায় শ-তিনেক খাড়া উঠে যাওয়া পাথরের দেওয়াল বেয়ে নেমে আসা গরম জলের ঝরনা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। শীতকালে নদী পুরো জমে গেলে অনেক পাহাড়ি মানুষ এই ঝরনায় স্নান করতে যায়। ওমশার ছয় পশুপালক যারা আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তারা জোর গলায় জানিয়ে দিল যে, এর পরে আর এগোনো সম্ভব নয়। ইয়াকদের পক্ষে সম্ভব হলেও মানুষের পক্ষে অগম্য। ওদের দাবি সত্যি কি না তা আর না এগোলে বোঝা সম্ভব নয়।
২৭ অক্টোবর সূর্য ওঠার খানিক পরই রাম সিং আর আমার দলের অন্যতম সক্রিয় লোক তিলা বাই আর ওমশার দুই পশুপালককে নিয়ে পাহাড়ে ওঠা শুরু করেছিলাম। সঙ্গে নিয়েছিলাম সবচাইতে তাঘড়া তিনটে ইয়াক। ওঠা শুরু করতেই টের পেয়েছিলাম পশুপালক তাঘলিকদের কথার সারবত্তা। পাহাড়ের ঢাল বড়ো বড়ো পাথরের টুকরো আর আলগা নুড়িতে ভরা। নদীর ধারে যেখানে আমরা ক্যাম্প করেছিলাম, নদীর ধারের সেই ডানপাশের পাহাড়ের ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিলাম আমরা যাতে সামনে কী আছে না আছে তার একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়।
মাইল দেড়েক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগোনোর পর খাড়া পাহাড়ের গায়ে আটকে থাকা বড়ো বড়ো পাথরের ফাঁদ পেরিয়ে আর এগোনো সম্ভব হল না। প্রকৃতি এখানে ভয়ংকর রকম বন্য। খাড়া পাথরের দেওয়াল সোজা নেমে গেছে নদীখাতে। ওপর থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম নদীখাত এখানে দুশো ফুটের মতো চওড়া, কোথাও আরও কম। শরৎকালে জলের পরিমাণ কম থাকায় নদীখাতের তিন-চতুর্থাংশ জলে ভরা ছিল। পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে আসা বিশাল বিশাল পাথরের টুকরোয় নদীখাত ভরা। পাথরগুলো আবার এক সারিতে নেই। ফলে নদীর জলের ধারা পাথরে বাধা পেয়ে কখনও ডান কখনও বাম তীর বেয়ে চলেছে। জলের রঙ কোথাও সবুজ, আবার কোথাও নীল। নীল রঙের জায়গায় জল ঘুরে চলেছে, যা বলে দেয় ওখানে জলের গভীরতা খুব বেশি। নদী পার হতে হলে এই সবুজ রঙ ধরেই হতে হবে।
আমরা পাহাড়ের যেখান পর্যন্ত উঠেছিলাম সেখান থেকে নেমে আসাটা সহজ ছিল না। হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে আধ মাইল মতো পথ নামার পর তুলনামূলক কম খাড়াই একটা ঢাল খুঁজে পেয়ে সেখান দিয়ে কোনোরকমে নদীর ধারে নেমে এসেছিলাম। ইয়াকগুলোকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে নদীখাত ধরে এগোতে শুরু করেছিলাম। দু-পাশে খাড়া পাহাড়ের প্রাচীর, তার মাঝ দিয়ে দুরন্ত গতিতে বয়ে চলা নদী। ইয়াকবাহনে নিরাপদে বরফ-ঠান্ডা কোমরজল পার হয়ে নদীর অন্য পাড়ে যেতে পেরেছিলাম আমরা। ইয়াকদের এমনিতেই সমতল জমিতে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল। তাই ঈশ্বর ভরসায় নদী পার হওয়া ইয়াকদের মর্জির ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। বরফগলা জলে পিচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে অক্লেশে নদী পার হচ্ছিল ওরা।
নদীর বাম তীর দিয়ে কয়েকশো গজ যাবার পর নদীর বুকে অজস্র বড়ো বড়ো পাথর পড়ে ছিল। সে পাথর বেয়ে ওঠা অসম্ভব। একমাত্র উপায় আবার নদীর অন্য পাড়ে গিয়ে পথ খোঁজা। পাথর বেয়ে জল যেখানে গড়িয়ে পড়ছিল তার রঙ ছিল ঘন নীল। দূর থেকেই বুঝিয়ে দিচ্ছিল সেখানকার গভীরতা। একটা ইয়াককে নামিয়ে জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা সাঁতার কাটতে শুরু করাতে বুঝে গেছিলাম এখানে ভেলা ছাড়া নদী পার হওয়ার চেষ্টা প্রবল মূর্খামি। এখানে কোনো গাছও নেই যা দিয়ে ভেলা বানানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আবার, জলস্রোত পরিবহনের আরেক সাবেকি উপায়, ফোলানো পশুচামড়ার “মশক” এর নামও এখানে কেউ কখনো শোনেনি।
এগোনোর একমাত্র পথ ডানদিকের খাড়া পাহাড়ের গায়ে এবড়ো-খেবড়ো হয়ে বেরিয়ে থাকা পাথরের টুকরো ধরে ওপরে ওঠা। আর পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করা যে সে-পথ দিয়ে আবার নদীর ধারে নেমে আসা সম্ভব। ইয়াকগুলোকে নদীর ধারে ছেড়ে রেখে আমি সঙ্গের লোকেদের নিয়ে প্রায় পাঁচশো ফুট মতো কঠিন আরোহণের পর একটা পাহাড়ের এক সংকীর্ণ সমতল চূড়ায় উঠতে পেরেছিলাম। সেই সরু শৈলশিরাও শ-খানেক গজ গিয়ে ঝাঁপ দিয়েছে গিরিখাতে। সে-পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে যে-কোনো দুঁদে পর্বতারোহীও বহুবার ভাববে।
পাহাড়ের গা বেয়ে নদীর বুকে নামার একটা নির্ভরযোগ্য পথ খুঁজে বের করতে আমরা ব্যর্থ হলাম। খাড়া পাথরের দেওয়ালে পা রাখার মতো একটা খাঁজও দেখতে পাইনি। বিলকুল মসৃণ পাথরের দেওয়াল। আগে এগোনোর পথ খুঁজে বের করতে আমি পাশের একটা পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় হাজার খানেক ফুট উঠে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম কোনোভাবেই মালপত্রসহ ইয়াক বা মানুষের পক্ষে এখান দিয়ে আগে যাওয়া সম্ভব নয়।
পাহাড়ের ঢালে বসে খানিক বিশ্রাম নিচ্ছি, এমন সময় পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ শুনে সামনে তাকিয়ে দেখি আমার ঠিক উলটোদিকের পাহাড়ের গা বেয়ে এক দঙ্গল পাহাড়ি ছাগল (কিয়িক) নামছে। পাহাড়ের ঢালে এই ছাগলদের চলার চিহ্ন আমার নজরে এসেছিল অনেক আগেই। আমার সামনে থাকা এই বন্য দুনিয়ায় সম্ভবত এই প্রাণীদেরই একমাত্র প্রবেশাধিকার আছে। মুজতাঘ হিমবাহ থেকে বের হওয়া ইউরুং-কাশের স্রোতের উৎস খুব কাছে মনে হয়েছিল। যদিও বাস্তবে তা নয়। হয়তো নদীর এই বাঁকটা পার হতে পারলে সেখানে পৌঁছনো যেত। কিন্তু নদী সম্পূর্ণ জমে বরফ না হয়ে গেলে নদীখাত ধরে উৎস অভিমুখে এগোনো অসম্ভব। তার জন্য ভরা শীতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, যা এই যাত্রায় সম্ভব নয়। প্রবল ঠান্ডা ঝোড়ো বাতাস শীতের আগমন ঘোষণা করছিল। নদীর উৎসে পৌঁছতে না পারলেও আমাদের জরিপ অনুযায়ী নদীর উৎসের মোটামুটি সঠিক হদিস নথিভুক্তি সম্ভব হয়েছে।
ইয়াকের পিঠে চেপে নদী পার হয়ে সন্ধেবেলা নিরাপদে সবাইকে নিয়ে তাঁবুতে ফিরে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আকাশ পুরো মেঘে ঢেকে ছিল। সকালে উঠে দেখি যেখানে আছি, সেই ন’হাজার ফুট থেকে হাজার তিনেক ফুট উঁচু পাহাড় তুষারের চাদরে ঢেকে গেছে। যদিও নদীর ধারের তাপমাত্রা গতকালের তুলনায় খানিকটা বেশি, ৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১.১ সেলসিয়াস)। যে-পথ দিয়ে এসেছিলাম, সে-পথ দিয়ে ফিরে যাবার সময় ঠান্ডা বাতাস আমাদের ছিঁড়ে খাচ্ছিল। এই অঞ্চলে শীত এসে গেছে যে!
কারাংঘু-তাগে ফেরার সময় ১১,৫০০ ফুট সোঘাক-ওঘিলের শৈলশিরা পার হয়ে ১০,০০০ ফুট ওমশা উপত্যকায় পৌঁছেছিলাম সহজেই। ওমশা উপত্যকায় ওটের খেতের মধ্যে দুটি নীচু মাটির বাড়ির সন্ধান পেয়েছিলাম, যেখানে কয়েকজন পশুপালক বাস করে। দুপুরে আবহাওয়া একদম পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ওমশা উপত্যকা এক-চতুর্থাংশ মাইলের মতো চওড়া হলেও ভয়ংকর বন্য পাহাড়ে কয়েকদিন কাটিয়ে আসার পর এই উপত্যকাকে অত্যন্ত মনোরম মনে হয়েছিল। রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছিল ওমশায়।
২৯ অক্টোবর সকাল সাতটায় থার্মোমিটারে তাপমান দেখাচ্ছিল ১৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-৮.৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। কিন্তু আকাশ পরিষ্কার ও উজ্জ্বল ছিল। ঘণ্টা দু-এক পথ চলে ইউরুং-কাশ নদীর ডানদিকের তীরে পৌঁছলাম। এখান থেকে আসার সময় যে-পথ ধরে এসেছিলাম সে-পথ না ধরে নদীর কিনারা ধরে এগোতে শুরু করেছিলাম। মাইল দু-এক চলার পর নদী টপকে ডানদিকে চলে এলাম। নদীর ধারের পাশের পাহাড়ের উঁচু-নীচু ঢাল ধরে চলাটা ক্লান্তিকর হলেও নদীখাতের মনোরম দৃশ্য মন ভরিয়ে রেখেছিল। কাশ উপত্যকা যেখানে কারাংঘু-তাগে মিশেছে, সেখানে পৌঁছনোর খানিক আগে থেকে ইউরুং-কাশ দুই খাড়া পাহাড়ের মাঝের ফুট পঞ্চাশেক চওড়া খাত দিয়ে কয়েকশো গজ বয়ে গেছে দুরন্ত গতিতে। এখানে আমাদের খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে চলতে হয়েছিল। উঠতে হয়েছিল নদীখাত থেকে পাঁচশো ফুটের মতো উঁচুতে। প্রকৃতি এখানে নিজেই পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে রেখেছিল। ইয়াকরা আমাদের নির্বিঘ্নেই পাহাড়ি ঢালের পথটা পার করে দিলেও ওপর থেকে নীচের দিকে তাকাতে অস্বস্তিই হচ্ছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন