বিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

তারিখ লেখা নথি উদ্ধার

ক্রিসমাসের দিনটা কেটেছিল ক্যাম্প থেকে আধমাইল মতো উত্তর-পূর্বে কতকগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো পরিষ্কার করে। কাঠামো দেখে সেগুলো যে বর্গাকার মন্দির ও তার সংলগ্ন সন্ন্যাসীদের বাসস্থান, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। ভূমি ক্ষয়ের ফলে এই মন্দির ও আবাসগুলো সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কাঠামোগুলো মূল ভূ-স্তর থেকে প্রায় কুড়ি ফুট মতো বালির গভীরে বসে গিয়েছিল সম্ভবত কোনো ধ্বসের কারণে। জায়গাটার সামান্য উত্তর-পূর্বে বালির সমুদ্রের বুকে অনেক জায়গা জুড়ে বসে যাওয়া বালি বা গর্ত রয়েছে। বসে যাওয়া জমিতে ডুবে থাকা ধ্বংস হয়ে যাওয়া কাঠামোর ওপর দুই থেকে তিন ফুটের বেশি বালির স্তর জমা হয়নি। বালি ফুঁড়ে কাঠামোর কয়েকটা খুঁটি বেরিয়ে ছিল। এই খুঁটিগুলোই একসময় কাঠামোর দেওয়ালকে ধরে রেখেছিল। বেরিয়ে থাকা খুঁটির মাথার অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছিল আবাসগুলো বেশ কয়েকটা খোপে বিভক্ত ছিল। মাটির ওপর বেরিয়ে থাকা এইসমস্ত খুঁটিই পুরাতত্ত্বের খোঁজ পেতে গুপ্তধন সন্ধানীদের কাজ সহজ করে দিয়েছিল। তুর্দি-সহ অনেকেই এ-জায়গা খুঁড়ে প্রাচীন মৃৎপাত্র-সহ অনেক প্রত্নসামগ্রী নিয়ে গেছে বিক্রির জন্য। বালির ওপরেই ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে ঘরের প্লাস্টার, কাঠ, মৃৎপাত্র-সহ অনেক ধ্বংসাবশেষ।

ধ্বংসের মাঝ থেকে খুঁজে পাওয়া এই ভাঙা নমুনাগুলোই ছিল আমার ধৈর্যের পুরস্কার। খুব সাবধানে আমরা খননের কাজ করছিলাম। মন্দিরকে ঘিরে চতুর্ভুজাকার পথের পশ্চিমদিকের মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে কাঠের ওপর আঁকা দুটো ছবির প্যানেল প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছিল। প্যানেলে আঁকা ছবিগুলো নিঃসন্দেহে কোনো উপাসকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। দুটো প্যানেলের মধ্যে একটা ছিল ১৮*৪ ইঞ্চি মাপের। তাতে আঁকা ছিল দুই সহচরের মধ্যে বসে থাকা ইঁদুরের মাথাওয়ালা আলখাল্লা পরে বসে থাকা এক মানব মূর্তি। মাথায় রত্নখচিত মুকুট। পরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আমার বন্ধু মিঃ এফ. এইচ. অ্যান্ড্রুজ এই ছবি ঠিক-ঠিক মতো পরিষ্কার করে তাকে প্রায় আসল অবস্থায় নিয়ে এসেছিলেন।

আমি ছবিটি আবার ভালোভাবে দেখে ছবির চরিত্রকে চিনতে পেরেছিলাম। এই ছবি হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত কাপ্তার-মাজারে পূজিত উপকথার ইঁদুর রাজার, যিনি হূনদের আক্রমণ থেকে খোটান মরূদ্যানকে রক্ষা করেছিলেন।

মূর্তির মাথা ঘিরে অর্ধগোলাকার আলোর বলয় ও পাশে লম্বা হাতলওয়ালা পাখা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচারক বুঝিয়ে দেয় ইঁদুর রাজা সেসময়ে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে পূজিত হতেন।

অচেনা ভাষার নথি

মন্দির চত্বরের একটি কোণে মেঝের মধ্যে পড়ে থাকা দুটো পাতলা দাগ-টানা কাগজের ছেঁড়া টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। কাগজের এক পাশে অদ্ভুত টানা হাতের লেখায় ব্রাহ্মী লিপিতে অ-সংস্কৃত ভাষায় লেখা। ধ্বংসস্তূপের থেকে পাওয়া এইরকম কাগজ খোটান থেকে আগেই কিনে ডঃ হোর্নলকে পাঠিয়েছিলাম। ঘর থেকে বালি সরাতে আরও বেশ কিছু একইরকম একদিকে লেখা কাগজের টুকরো উদ্ধার হয়েছিল, হয় দলা পাকানো, নয় ভাঁজ করা অবস্থায়। একইভাবে থাকা কিছু চিনা ভাষায় লেখা নথিও আমরা পেয়েছিলাম এই ধ্বংসাবশেষ থেকে। ঠান্ডায় জমে থাকা আঙুল দিয়ে এই জড়িয়ে থাকা পাতলা কাগজ খোলা সহজ কাজ ছিল না, ফলে সব কাগজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বিশেষজ্ঞদের কাছে। এই কাগজ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম এগুলো কোনোভাবেই কোনো পুথির অংশ নয়, সম্ভবত এগুলো কোনো ধরনের হিসেব লেখা কাগজ বা দলিল।

দান্দান-উইলিকের ধ্বংসাবশেষ থেকে টানা ব্রাহ্মীতে লেখা যেসব নথি এখনও পর্যন্ত পেয়েছি তার সঙ্গে ডঃ হোর্নল-এর কষ্টসাধ্য গবেষণালব্ধ গ্রন্থ ১৯০২ সালে প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অন দ্যা ব্রিটিশ কালেকশন অফ অ্যান্টিকুইটিজ ফ্রম সেন্ট্রাল এশিয়া’ নথির হুবহু মিল আছে। বিশিষ্ট পণ্ডিত ডঃ হোর্নল যে-নথির ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছিলেন সেগুলো ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৭-এর মধ্যে মিঃ ম্যাকার্টনি ও ক্যাপ্টেন গডফ্রে খোটানের আফগান ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন খানের কাছ থেকে কিনেছিলেন। আমার নিজের হাতে উদ্ধার করা নথি প্রমাণ করে যে ডঃ হোর্নল যে-নথিগুলোর উপর ভিত্তি করে গবেষণা করেছিলেন তা একদম খাঁটি ছিল। শুধু তাই নয়, তুর্দি জানিয়েছে, আগে এই ধরনের নথি সে দান্দান-উইলিক থেকে তুলে নিয়ে বিক্রি করেছে। ডঃ হোর্নল-এর এইসব নথি নিয়ে শব্দ বা ভাষাতাত্ত্বিক (philological facts) বিশ্লেষণ একটি ক্রমমালা প্রতিষ্ঠা করেছে যা শুধু অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়ই নয়, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণও। তিনি অনেকগুলো শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যেগুলোকে তিনি নাম, পদ ও সংখ্যা বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘নথি বিশ্লেষণ করে বলা যায় এগুলো ইন্দো-ইরানিয়ান উপভাষা, এছাড়া এই ভাষার সঙ্গে ফারসি ও ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার মিল রয়েছে।’ যদিও এই ভাষার নিজের স্বকীয়তা আছে, পামির অঞ্চলের গালচাহ্ উপভাষার সঙ্গে এর সাদৃশ্য আছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল বেশিরভাগ নথিতেই তারিখ দেওয়া আছে। যদিও এর কালানুক্রমিক সজ্জার চাবিকাঠি এখনও আবিষ্কার করা যায়নি।

বেশ কিছু নথির নীচে নামের তালিকা ও স্বাক্ষর ছিল। আমি ও ডঃ হোয়ার্নলের সঙ্গে সহমত যে এগুলো সম্ভবত ঋণপত্র বা চাহিদাপত্র সংক্রান্ত দলিল। আমার সংগ্রহ করা জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা নথি থেকে এগুলোর সময়কাল বের করা সম্ভব হয়েছিল। লিপিবিদ্যার বিশ্লেষণ করে ডঃ হোয়ার্নলে এগুলো সম্ভাব্য অষ্টম শতকের বলেই ধারণা করেছেন। পরে এই আনুমানিক সময়ের ধারণার বাস্তবতাকে সমর্থন করেছে একই জায়গাতে পাওয়া ৭৮১ থেকে ৭৮৭ সময়কাল চিহ্নিত করে রাখা কিছু চিনা দলিল। আমার অনুমান, জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা ভাষায় এই জনপদ ধ্বংস হয়ে যাবার আগে এখানকার বসবাসকারীরা কথা বলত। তবে দান্দান-উইলিকে পাওয়া ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা পান্ডুলিপির ভাষা আর এই অঞ্চলে ব্যবহৃত কথ্য ভাষা একই কি না তা এই বই প্রকাশকাল পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা পান্ডুলিপিতে কিছু সংস্কৃত পরিভাষার মিশ্রণ দেখে মনে হয় এই সেগুলো বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত। সংস্কৃত থেকে মধ্য এশিয়ার ভাষায় অনুদিত হয়ে তা এই বৌদ্ধ অনুসরণকারী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

যে-ঘরে এই জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা কাগজের নথিগুলো পাওয়া গেছিল, তা মূল মেঝের তিন থেকে চার ফুট ওপরে বালির মধ্যিখানে ছিল। শুধু কাগজের টুকরো নয়, ঘরটার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মেঝের কাছাকাছি থেকে আরও কিছু জিনিষপত্র প্রায় অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছিল।

পাতলা কাঠের আয়তাকার তক্তা পাওয়া গিয়েছিল যা লেখার জন্য কাজে লাগানো হত। এর মাথার ডানদিকে একটা ছোটো গোল গর্ত ছিল সুতো দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখার জন্য। তক্তার মধ্যে একইরকম জড়ানো ব্রাহ্মী লিপিতে কয়েক লাইন লেখা। আরও একটি লেখার জন্য কাঠের হাতল দেওয়া তক্তা পাওয়া গিয়েছিল যা প্রায় চোদ্দ ইঞ্চি লম্বা তিন ইঞ্চি চওড়া, যা সমস্ত ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পাঠশালায় ব্যবহার করা হয় পাঠদানের কাজে। ‘তখতা’ নামের এই লেখার সামগ্রী স্লেটের সমতুল। তখতার ওপর কিছু লেখা না থাকলেও তার মধ্যে ফিকে হয়ে যাওয়া আঁকিবুকির দাগ থেকে বুঝে নেওয়া যায় যে কোনো না কোনো সময় এটি লেখালেখির কাজে ব্যবহার হত। এই তখতা আবিষ্কারের পর থেকেই আমার মন বলছিল লেখার এরকম সামগ্রী আরও পাবার সম্ভাবনা প্রবল।

চিনা নথি উদ্ধার

ওই ঘরেরই এককোণে পাওয়া বার্নিশ করা কাঠের বাটির বাইরের অংশের ফুলের নকশা স্পষ্টতই চিনা ঘরানার। এই ঘরের বাসিন্দারা যে চৈনিক ছিল সেই অনুমান দৃঢ় হয়েছিল কিছু চিনাভাষার নথি পাওয়ার পর। তার একটি হল তামারিস্ক কাঠের প্রায় ১৪ ইঞ্চি লম্বা এক ইঞ্চি চওড়া চ্যাপ্টা লাঠি যার দু-দিকে এক ডজন চিনা প্রতীক উলম্ব রেখায় আঁকা। কালির রেখা আবছা হয়ে যাবার জন্য লেখাগুলোর অর্থ এখনও উদ্ধার সম্ভব হয়নি। মনে হয় লাঠিটি কিছু হিসেবের কাজে ব্যবহার করা হত। আর একটি হল চিনা ভাষায় লেখা পাতলা হালকা দাগটানা কাগজ যা সরু রোলের মতো গোটানো ছিল। একে অক্ষত অবস্থায় পুনরুদ্ধার করা গেছে।

মিঃ ম্যাকার্টনি কাশগর থেকে এই কাগজের লেখার অস্থায়ী অনুবাদ করিয়ে দিয়েছিলেন যা পরে কলেজ দ্য ফ্রান্সের অধ্যাপক শাভানে যাচাই করে নিশ্চিতকরণ করেছিলেন। কাগজটি ছিল সংক্ষেপে এইরকম: দুজনকে ভাড়া দেওয়া একটি গাধা দশ মাস পরেও মালিকের কাছে ফিরিয়ে না দেওয়ায় তা উদ্ধার করে দেবার আবেদন। আবেদনে তারিখ উল্লেখ ছিল তা-লি সময়ের (Ta-li period) ষোড়শ বছরের দ্বিতীয় মাসের ষষ্ঠ দিন যা ৭৮১ খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে মিলে যায়। যে-এলাকা থেকে দরখাস্তটি এসেছিল তা লি-সে, লেই-সে বা লি-সা নামের কোনো স্থান। দুটি অক্ষরের ধ্বনিগত পার্থক্যের কারণে সঠিক নাম নির্ধারণে সন্দেহ আছে। শুধু তারিখের জন্যই নয়, এই দলিলের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এটি প্রমাণ করে দান্দান-উইলিকের এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসতি চিনা প্রশাসনের অন্তর্গত ছিল। মিঃ ম্যাকার্টনি ১৮৯৮ সালে বদরুদ্দিনের মাধ্যমে আরও একটি অনুরূপ দলিল পেয়েছিলেন।

যে-নথির কথা ওপরে উল্লেখ করেছি এবং দান্দান-উইলিক থেকে আমার উদ্ধার করা আরও দলিলের লেখার শৈলী ও চেহারা প্রায় একই ধরনের। সবগুলোই সরকারি বা ব্যক্তিগত রেকর্ড। মিঃ ম্যাকার্টনি তিনটে অনুবাদ কাশগরে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তার একটি তা-লি সময়কালের (Ta-li period) তৃতীয় বছরে লেখা অর্থাৎ, ৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে। সেটি ছিল স্থানীয় জনগণের আবেদনের ভিত্তিতে লি-শির এক দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের প্রতিবেদনের খসড়া। সেই খসড়ায় ডাকাতদের হাতে ভয়ংকরভাবে লুণ্ঠিত হবার কারণে স্থানীয় জনগণ বিবিধ কর সংগ্রহ স্থগিত রাখার আবেদন করেছিল। আর একটিতে মাস ও দিনের উল্লেখ থাকলেও বছরের উল্লেখ ছিল না। সেটি ছিল লি-শি সামরিক শিবির থেকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে পাঠানো একটি সামরিক চাহিদা-পত্র। তাতে ঢাক (ড্রাম) ছাইবার জন্য চামড়া ও তিরের পেছনে গোঁজবার জন্য পালক চেয়ে পাঠানো হয়েছিল। তৃতীয়টি চিয়েন-চুং (Chien-Chung period) সময়কালের সপ্তম বছরে অর্থাৎ ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটি ঋণপত্র। তাতে লেখা ছিল (গ্রামের নাম-সহ অনেকটাই পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) ‘১৫,০০০ মুদ্রা ঋণের বিনিময়ে বাড়ি গচ্ছিত রইল।’

দান্দান-উইলিকের প্রাচীন নাম

আমি নিশ্চিত যে দান্দান-উইলিক থেকে যেসব প্রাচীন চিনা নথিপত্র আমি উদ্ধার করেছি, সেরকম আরও কাগজ অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে আমার আগেই এই অঞ্চল থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে গুপ্তধন শিকারিরা। তুর্দি নিজেই বেশ কয়েক বছর আগে এই ধরনের কাগজ এখান থেকে নিয়ে গিয়ে খোটানে বদরুদ্দিনের কাছে বিক্রি করেছিল। এটা খুবই সম্ভব যে, যে-ঘর থেকে আমি এই নথিগুলো পেয়েছি, ঠিক সেই ঘর থেকেই তুর্দি ও তার মতো আরও দলবল একই ধরনের কাগজ পেয়েছে আর সেই কাগজ অনেক আগে মিঃ ম্যাকার্টনির হাতে পৌঁছেছিল। এও সম্ভব যে এই ধরনের দলিল অন্য কোনো অজানা ধ্বংসস্তূপ থেকে পেয়েছে গুপ্তধন শিকারিরা। সে যাই হোক না কেন, আমি যে দলিলগুলো উদ্ধার করেছি তা থেকে এটা পরিষ্কার, দান্দান-উইলিক লি-সে, লি-সিয়েহ্ বা লি-সা নামের কোনো উপনিবেশের অংশ ছিল।

কোনো সন্দেহ নেই যে দান্দান-উইলিক চিনা প্রশাসনিক বিভাগ ‘ছয় শহর’-এর (লিউ-চেং) অন্তর্গত ছিল। ‘ছয়টি শহর পরিদর্শনের সুপারিটেনডেন্ট’ নামের একটি নথি মিঃ ম্যাকার্টনির সংরক্ষণে আছে। আমার উদ্ধার করা দলিলে উপস্থিত লি-সে যে এই ছয় শহর বা উপনিবেশের একটি তা নিয়ে আমার আর সংশয় ছিল না। মিঃ ম্যাকার্টনির সহকারী চিনা শিক্ষাবিদ সান-এর দেওয়া ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ‘ছয় শহর’ চিনা প্রশাসকদের অধীনস্থ খোটান জেলার পুরোনো নাম হিসেবে পরিচিত। সম্ভবত এই নামগুলো ছিল ইলচি বা খোটান, ইউরুং-কাশ, কারা-কাশ, চিরা, কেরিয়া, কিন্তু ষষ্ঠ নাম নিয়ে ধন্ধ রয়েছে। এই জায়গাগুলো বর্তমান খোটান ও কেরিয়ার আলাদা আলাদা আম্বানের অধীনে যাবার আগে এক প্রশাসনের অন্তর্গত ছিল বলে মনে করা হয়।

রাতের কনকনে ঠান্ডার পর দিনের উজ্জ্বল আলোর আরামদায়ক গরমে এই আকর্ষণীয় আবিষ্কারগুলো বড়দিনের দিনে আমার মন আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল। সারাদিনের একঘেয়ে কাজের পর ক্যাম্প ছেড়ে খানিক হাঁটতে বেরিয়ে পথ হারিয়েছিলাম বালির সমুদ্রে। একটা বালিয়াড়ির গোড়ায় কাই-ইয়ুয়েন যুগের (৭১৩-৭৪১ খ্রিস্টাব্দ) ছাপমারা চিনা মুদ্রা পেয়ে আমি সেটা নিয়ে মেতে উঠেছিলাম। এদিকে দলের সবাই সাইট ছেড়ে ক্যাম্পে ফিরে গেছে। ক্যাম্প খুব কাছে থাকলেও কাউকে যে সঙ্গে রাখা উচিত, এ-কথাটা আমার মাথায় আসেনি। আমি বালির বুকে আরও মুদ্রা খুঁজতে শুরু করেছিলাম। আর তারপর সূর্যের আলো মরে যেতে চাঁদের আলোয় ক্যাম্পে ফিরতে গিয়ে টের পেলাম ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছি না। মাইল খানেক এদিক-ওদিকে ঘুরেও পেলাম না কোনো শব্দ, না কোনো নিশান। এদিকে আমার কম্পাসটাও ক্যাম্পে ফেলে এসেছি।

অবশেষে চাঁদের আলোয় বালিয়াড়ির ছায়ার অন্ধকার জাঁকিয়ে বসার আগেই আমার পায়ের ছাপ ধরে ক্যাম্পে ফেরার চেষ্টা শুরু করেছিলাম। তারপর এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে বালির মাঝে একটা শক্ত কিছুতে ধাক্কা খেলাম যেন। ভালো করে লক্ষ করে দেখি শক্ত বস্তুটি একটি প্রাচীরের অংশ, দিন কয়েক আগে ক্যাম্প থেকে বেশ খানিকটা দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে এটি নজরে এসেছিল।

ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে খানিক নিশ্চিত হতে আমি ডানদিকে ঘুরে বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে চিৎকার করতে করতে এগোতে শুরু করলাম। খানিক পরেই আমার লোকেরা চিৎকার করে সাড়া দিতে শুরু করল। আমার অনুপস্থিতিতে অস্থির হয়ে উঠেছিল আমার টেরিয়ার কুকুর ইওলচি বেগ। গড়বড় হয়েছে বুঝে আমাকে খুঁজতে তুর্দি, ইসলাম বেগ দুজন করে লোকের দল পাঠিয়েছিল নানাদিকে। টেন্টে ফিরে গরম চা আর ইওলচি বেগের সান্নিধ্যে ঠান্ডা নির্জন মরুর মাঝে বড়দিনের ডিনারের স্মৃতি আমার চিরসঙ্গী হয়ে থাকবে।

যে ধ্বংসস্তূপ আমায় ক্যাম্প খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল সেটায় এর পরদিন খনন শুরু হল। আগে পাওয়া নথিগুলোর সঙ্গে এখানে পাওয়া নথিগুলো একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। ধ্বংসস্তূপটি ছিল এখানকার অন্য মন্দির-শৈলীর মতো একটি ছোটো বৌদ্ধ মন্দির। বর্গাকার কক্ষ, মন্দিরঘেরা পথ, ফ্রেস্কো, মন্দিরের গায়ের প্যানেলে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা ও আঁকা ছবি। মন্দির সংলগ্ন একটি ১৮*১৩ ফুট আবাসিক বাড়ি খননের পর গভীর বালির নীচ থেকে পাওয়া গিয়েছিল কাগজে লেখা বেশ কিছু চিনাভাষার নথি। সব নথিগুলোই পাওয়া গিয়েছিল ফায়ার-প্লেসের আশেপাশের মেঝে থেকে গোটানো অবস্থায়। এর মধ্যে বেশ কিছু নথি আলাদা আলাদাভাবে, আবার কিছু নথি একসঙ্গে ছোটো ছোটো পুলিন্দায় রাখা ছিল। কাগজগুলো গড়ে ১১ ইঞ্চি লম্বা।

মাটির কাছাকাছি স্যাঁতস্যেঁতে জায়গায় যে-কাগজের রোলগুলো ছিল তার বেশ কয়েকটি পচে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আর যেগুলো একটু বালির ওপরের দিকে ছিল সেগুলো মোটামুটি ভালো অবস্থাতেই ছিল। এর মধ্যে চারটের অনুবাদ এই বই লেখার সময় পর্যন্ত অধ্যাপক শাভানে এবং ডগলাস করে উঠতে পেরেছিলেন। যদিও অনুবাদগুলো সম্পূর্ণ নয়, কিন্তু এই নথিগুলোর সময়কাল ও চরিত্র নিশ্চিন্ত হবার জন্য যথেষ্ট।

এদের মধ্যে দুটির সময়কাল চিয়েন-চুং সময়কালের তৃতীয় বছর অর্থাৎ, ৭৮২ খ্রিস্টাব্দ। এই দুটি ছিল হু-কুও মঠের পুরোহিত চিয়েন-ইং কৃত ঋণ গ্রহণকারীর তামার মুদ্রা বা শস্যের বিনিময়ে সুদ বা ছোটো ঋণ সংক্রান্ত পত্র। ঋণপত্রে ঋণগ্রহীতার নাম, বয়সের পাশাপাশি জামিন হিসেবে নির্দিষ্ট কয়েকজন আত্মীয় যথা মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যার নাম জোড়া ছিল। পাশাপাশি বন্ধক হিসেবে ঋণগ্রহীতার গৃহস্থালির সমস্ত জিনিসপত্র ও গবাদিপশুর মূল্য উল্লেখ ছিল।

আর একটি নথি যা ৭৮৭ খ্রিস্টাব্দ সময়কালের বলে ধরে নেওয়া যায় তাতে ঋণদাতার নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও অনুরূপ ঋণদানের চুক্তি ছিল। এই অজানা মহাজন যে হু-কুও মঠের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর একটি নথিতে হু-কুও মঠের দায়িত্বে থাকা তিন পুরোহিত দূরের এক জায়গার মঠের সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক পুরোহিতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে এই পত্র পাবার তিনদিনের মধ্যে তারা যেন কৃষিজমিতে জরুরি ভিত্তিতে শ্রমিক নিযুক্ত করে জমি থেকে ঘাস কাটার ও সেচের ব্যবস্থা করে।

এসব নথি থেকে বলা যেতেই পারে, এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর হয় হু-কুও মঠের অংশ ছিল, অথবা এখানে এমন কেউ থাকতেন যিনি সরাসরি ওই মঠের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মঠের চিনা নাম হু-কুও শব্দের অর্থ ‘দেশ রক্ষাকারী’। নথির শেষে পুরোহিত হিসেবে চিনা নামের স্বাক্ষর, যা মন্দিরের স্বাক্ষরকারীর নাগরিকত্ব প্রকাশ করে।

তবে এখানকার বাসিন্দাদের সবাই চিনা ছিলেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ঋণদাতা ও জামিন হিসেবে নথিভুক্তকারীদের নামগুলো ও ফ্রেস্কোর নীচে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা শিলালিপি তাই ইঙ্গিত করে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া একটি সংস্কৃত পুথির পাণ্ডুলিপির ছোটো অংশ বলে দেয়, এই মঠে বসবাসকারী জ্ঞানী সন্ন্যাসীরা সম্ভবত সংস্কৃতেও পারদর্শী ছিলেন।

বসতি পরিত্যাগের তারিখ

চিনা ভাষায় লিখিত এই নথির বিষয়বস্তু যতই তুচ্ছ হোক না কেন, সময়কাল নির্ধারণে এর গুরুত্ব অসীম। নিঃসন্দেহে এই কাগজগুলো লেখা হয়েছিল এই বসতি পরিত্যক্ত হবার আগে। লক্ষণীয়ভাবে, কাগজের তারিখ অনুযায়ী অধিকাংশ নথি ৭৮২ থেকে ৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লেখা। চিনা নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসা যেতেই পারে যে এই মন্দির ও বসতি পরিত্যক্ত ও ধ্বংস হয়েছিল অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে। প্রায় সব নথিগুলোই পাওয়া গিয়েছিল মূল মেঝের কাছাকাছি, যা থেকে অনুমান করা কঠিন হয় না যে বসতি পরিত্যক্ত হবার পর পরই মরুভূমির বালি এসে গ্রাস করে নেয় এই জনপদ। আমাদের সৌভাগ্য, যে-ঘরে এই নথিগুলো পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরটিই ছিল সবচাইতে ভালো অবস্থায়। এই ঘরেই পেয়েছিলাম সে-সময়কার কিছু আঁকা ছবি। মরুর বালি ক্ষতি করলেও সবকিছু ফিকে করে দেয়নি। কাঠের প্যানেলের ওপর আঁকা ছবিগুলো মেঝের কয়েক ইঞ্চি ওপরে বালির মাঝে ছিল। প্যানেলের পেছনে লাগানো আংটার ছাপ থেকে বোঝা যায় এগুলো একসময় দেওয়ালে শোভা পেত। মরু-ঝড় বালি দিয়ে মঠের ঘর ভরাট করতে শুরু করলে এগুলো খসে পড়ে দেওয়াল থেকে। মরুভূমির বালি আর শুকনো আবহাওয়া ছবির রঙ আর কাঠ সংরক্ষণে অনেকটাই ভূমিকা নিয়েছিল। এইসব ছবির রঙের বর্ণনা মুখে বলা অসম্ভব, আমার বিস্তারিত রিপোর্টেও তা দেখানো সম্ভব হবে না। তবে আমার প্রিলিমিনারি রিপোর্টে এর মধ্যের একটি রঙিন ছবি দেখিয়েছি। রঙিন কলোটাইপ প্লেটে তার একটা ফিকে সংস্করণ দেখাবার চেষ্টা করেছি।

চিত্রিত প্যানেল

দুটি ১৫*৭ ইঞ্চি আয়তাকার প্যানেল যার মাথাটা আর্চের মতো তাতে দুই অশ্বারোহীর ছবি, যা দেখেই বোঝা যায় যে তারা কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি হবেন। ওপরের মানুষটি সাদার ওপর বড়ো বড়ো কালো ছোপের একটি ছুটন্ত ঘোড়ার ওপর বসে। সাম্প্রতিক অতীতেও এই ধরনের পিবল্ড ‘ইয়ারখন্দি’ ঘোড়ার মালিক হবার স্বপ্ন দেখতেন উত্তর ভারতের উচ্চবিত্ত লোকেরা। তরুণ ঘোড়সওয়ারির মুখে ভারতীয় আর চিনা বৈশিষ্ট্যের মিলিত ছাপ স্পষ্ট। লম্বা কালো চুল ঝুঁটির মতো করে বাঁধা। মাথা ঘিরে থাকা হলুদ ফিতেতে ডিমের আকারের একটি বড়ো রত্ন আটকানো। লম্বা গোলাপি টিউনিক ও গলায় বাঁধা সরু স্কার্ফ হাওয়ায় পেছনের দিকে উড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে সওয়ারির গতি। সওয়ারির পায়ে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বুট রেকাব ধরে রেখেছে। যা আজও চিনা-তুর্কিস্তানে ব্যবহার হয়। বাঁহাতে রেকাব ধরা আর মেলে ধরা ডানহাতে একটি ঢাল বাড়িয়ে ধরা যার ওপর একটি বড়ো পাখি উড়ে এসে বসতে চলেছে। কোমর থেকে একটি লম্বা তলোয়ার ঝুলছে, ঠিক সেই ধরনের তলোয়ার যা প্রাচীনকালে পারস্য ও প্রাচ্যের মুসলিম দেশে দেখা যেত।

ঘোড়ার ছবি খুব নিখুঁত করে আঁকা। পা, খুর, রেকাব ও তার নীচের আচ্ছাদন বা ‘নুমদা’ প্রতিটির গঠন ও অলংকরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটে আছে ছবির মধ্যে। ঘোড়ার জিন, লাগাম, শিরস্ত্রাণ, নাকের ওপর ও কপালে লাগানো রত্নখচিত ধাতব প্লেট, প্রতিটি অতি পারদর্শিতায় আঁকা। ধাতব প্লেটের ওপর শিংয়ের মতো উঁচু হয়ে থাকা একটি ছাঁচ অনেকটা ভারতীয় ত্রিশূলের আকৃতির। অষ্টম শতাব্দীর এই ঘোড়ার সজ্জা তুর্কিস্তানে আজও সমানভাবে প্রচলিত।

ছবির নীচের মানুষটি দু-কুঁজ বিশিষ্ট একটি চলন্ত উটের আরোহী। আরোহীর মুখের অংশের খানিকটা মুছে গেলেও খাটো কোঁকড়ানো চুলের ওপর অদ্ভুতদর্শন ‘সুগারলোফ হ্যাট’ পরিষ্কার বোঝা যায়। টুপির চওড়া প্রান্ত গিয়ে ছুঁচালো তেকোণা ‘ভ্যান ডাইক পয়েন্ট’ তৈরি করেছে। গায়ে কিছু দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে টুপিটি ছোপওয়ালা পশম ব্যবহার করে তৈরি হয়েছিল। লম্বা ঝুলের ঢিলেঢালা প্রায় হাঁটু ছুঁয়ে থাকা সবুজ পোশাকের তলা থেকে বেরিয়ে হাঁটু পর্যন্ত উঁচু লাল বুট, যা বর্তমানে পূর্ব তুর্কিস্তানে ‘চারুক’রা বিশেষ করে শীতকালে ব্যবহার করে। আরোহীর বাঁহাতে উটের নাক বেড় দিয়ে থাকা লাগাম আর ডানহাতে ধরে একটি ঝিনুকের আকৃতির কাপ। উটের জিন আর রেকাব এত সুন্দরভাবে উটের গায়ে লেপটে রয়েছে যে মনে হয় শুধুমাত্র এই উটের পিঠে বসানোর জন্যই এই জিনিষগুলো তৈরি। যদিও এই ধরনের রেকাব আর জিন এই অঞ্চলে আজকাল আর প্রায় ব্যবহার হয় না। ছবির পেছনের হালকা উঁচু-নীচু রেখা পাহাড় বা বালিয়াড়ি, দুটোর যে-কোনোটাই হতে পারে। অশ্বারোহী ও উট-আরোহী দুজনের মাথা ঘিরে থাকা ‘নিম্বাস’ বা জ্যোতির্বলয় ইঙ্গিত দেয় এই দুই আরোহী কোনো পবিত্র চরিত্রের, ছবিটি কোনো ধর্মীয় কিংবদন্তীর সঙ্গে ছবিটি। যদিও এই দুই চরিত্রের কোনো সূত্র হদিস করে ওঠা যায়নি।

বৌদ্ধ চিত্রকর্ম

এখানে সব ছবির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। একটি প্যানেলের দু-পাশেই ছবি আঁকা ছিল। যেখান থেকে এটিকে পাওয়া গেল, তা মনে হয় হু-কুও মঠের গণ-খাওয়ার ঘর ছিল। এখানে পাওয়া বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বদের চিত্রকর্মগুলি মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধশিল্পচর্চার ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবিগুলোর অপূর্ব ড্রয়িং, লালিত্যযুক্ত ভঙ্গিমা এবং নিঁখুত রূপায়ণ প্রমাণ করে যে খোটানের মরুতে ভারতীয় শিল্পকলার প্রভাব বিস্তার হয়েছিল ভালোভাবেই। আবার, ছবিগুলোতে নানা বিশিষ্ট চিহ্ন, ভঙ্গিমা দেখে তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবতা এবং তিব্বতি শিল্পরীতির প্রভাবও চোখে পড়ে।

এই শিল্পরীতির বিষয়ে সামান্যই জানতে পেরেছি আমরা। সেই জ্ঞানের ভিত্তিও তুলনামূলকভাবে পরবর্তী সময়কালের কিছু কাজ। কারণ, উত্তরের তথাকথিত মহাযান রীতির বুদ্ধ-উপাসনাবিষয়ক প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলার প্রায় কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই।

এখানকার প্রায় নিখুঁত অবস্থায় রয়ে যাওয়া ছবিগুলো সেই উপাসনা পদ্ধতির খুঁটিনাটি নিয়ে গড়া, এবং এদের বয়সটাও মোটামুটি নিরূপণ করা যাচ্ছে- ফলে, এদের মূল্য যে কী অপরিসীম তা আলাদা করে বলবার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করেছিল কিছু ছবিতে পারসিক শিল্পের প্রভাব, বিশেষ করে পোশাক আর মুখের গঠনে। এই ছবিগুলো পরবর্তীতে আমার বৈজ্ঞানিক প্রকাশনায় যথাযথভাবে থাকবে। একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করতেই পারি যে পরবর্তী যুগের ইরানি শিল্পে পাশ্চাত্যের ধ্রুপদি শিল্পের প্রভাব পড়েছিল। আমার পরবর্তীকালের আবিষ্কার থেকে আমি প্রমাণ পেয়েছিলাম যে এই প্রভাব অনেক আগের সময় থেকেই ছিল।

দান্দান-উইলিকে আমার প্রথম দফায় বাসকালীন যে কাঠামোগুলো খোঁড়া হয়েছিল ও যার বিবরণ এখনও পর্যন্ত দিয়েছি তা এই জনপদের চরিত্র সম্পর্কে খানিক ধারণা পাবার জন্য যথেষ্ট। বালির টিলাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আরও মন্দির ও বাসস্থান খোঁড়ার ও জরিপের কাজ আমাকে আরও সপ্তাহ খানেক সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত চূড়ান্ত ব্যস্ত রেখেছিল। এই সময়ের মধ্যে মোট চোদ্দটি বৌদ্ধমন্দির ও বাসস্থান খুঁড়ে বের করে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এই খননকাজের পর যা পাওয়া গিয়েছিল তা আমার আগের তথ্যগুলোরই মতো, তাই এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দিচ্ছি না। মন্দির ও বাসস্থানের গড়ন, নির্মাণ ও উপকরণ প্রায় একইরকম। যা থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে জনপদের ঘরবাড়ি, মন্দির ইত্যাদি সব তৈরি হয়েছিল প্রায় একই সময় ও তাকে ছেড়ে সবাই চলে গিয়েছিলও একসঙ্গে একই সময়ে। কিন্তু সম্ভবত পরিত্যক্ত জনপদের সব জিনিষপত্র একইভাবে বা একই অবস্থায় টিকে থাকেনি বাতাসের ক্ষয়কারী ক্রিয়া ও ধন-সন্ধানীদের হামলার ফলে। ধন-সন্ধানীরা অনেক কাঠামো খুঁড়ে তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, খোঁড়ার পর কিছু কিছু জায়গায় তা যে আবার বালি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম।

একটি মন্দিরের ছোটো গর্ভগৃহের অষ্টভুজাকার ভিতের পেছনের দিক থেকে খুঁড়ে প্রধান মূর্তিটি উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। মূর্তির সামনের দিকে যে ‘উৎসর্গিত’ ফলকগুলো ছিল, সেগুলো অক্ষত। এমনকি মোটাসোটা পুঁটুলিতে বাঁধা এক গাদা পাণ্ডুলিপিও, সম্ভবত অনেকগুলো পুথির পাতা, পড়ে ছিল ভিতের সামনে। কিন্তু খননের ফলে বাতাসের ছোঁয়া পেয়ে সেই পাণ্ডুলিপি ধন-সন্ধানীদের কল্যাণে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। স্যাঁতসেঁতে কাগজগুলো এমনভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল যে সেগুলো আর আলাদা করা সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা পুথিটি একটি মণ্ডে পরিণত হয়েছিল এবং মণ্ড আকারেই তাকে তুলে আনা হয়েছিল। পুথির কাঠের পচে যাওয়া ঢাকনাটি আমি আমার নিজস্ব সংগ্রহে প্রাচীন পাণ্ডুলিপির নমুনা হিসেবে রেখে দিয়েছি।

তবে ধ্বংসাবশেষ খোঁড়ার ফলে পাওয়া পুরাকীর্তি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ কোনোভাবেই কোনো নির্দিষ্ট দিকে সীমাবদ্ধ ছিল না। জরিপের কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছিলাম, বিশেষ করে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল মরুভূমির মধ্যিখানে এই অঞ্চলে জনবসতি নিয়ে। আমি এই অঞ্চলের বাগান ও রাস্তাঘাট নিয়ে আগেই বলেছি। পপলার গাছের কাণ্ড, ফলের গাছের মোটা শিকড় বেশিরভাগ বাড়ির সামনে বালির তলায় অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। চলমান বালির টিলাগুলোর মাঝে মূল ভূমির কিছু অংশে পুরোনো সেচ খালের চিহ্ন সহজেই চিনে নেওয়া যায়। বিস্তারিত জরিপ না করলে এগুলো ধরা পড়ত না, কারণ দূর থেকে বালির টিলার মাঝে এগুলো নজরে আসত না।

পরিত্যক্ত জনবসতি

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অনেক জায়গায় পুরু হয়ে বিছিয়ে ছিল মাটির পাত্র, ধাতুর টুকরো আর অনুরূপ ভগ্নাবশেষ। এই ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছিল এমন কিছু জায়গাতেও যেখানে বাড়ির কাঠামোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সম্ভবত এখানে এমন কিছু পরিবারও বাস করত যাদের কাঠে তৈরি শক্ত পলেস্তারা দেওয়া দেওয়ালের বাসস্থান ছিল না। খোটানের সাধারণ চাষিরা বর্তমানে যেরকম রোদে শুকনো ইট দিয়ে বাড়ি বানায় সেরকম বা কাদার তালের ওপর তাল বিছিয়ে তৈরি বাড়িতে থাকত। কাঠ-পলেস্তারার বাড়ির তুলনায় এসব বাড়ির স্থায়িত্ব অনেক কম। খোটানের শহরে ও গ্রামে এই ধরনের প্রচুর বাড়ি দেখা যায় কারণ, কাঠ দিয়ে বাড়ি তৈরি ভীষণ খরচবহুল ও কাঠ আনতে হয় অনেক দূর থেকে। বর্তমানে শুধুমাত্র বিশেষ ব্যক্তি, মসজিদ, সরাই আর অনুরূপ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেই কাঠ-পলেস্তারার বাসস্থান বানানোর অনুমতি পাওয়া যায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যেতে পারে, দান্দান-উইলিকের জনবসতি বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে চলেছিল।

হতে পারে এই জনবসতি হঠাৎ করে জনশূন্য হয়নি, বিপর্যয়ের আঁচ পেয়ে ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করা হয়েছে, কোনোভাবেই হঠাৎ ধ্বংস হয়ে যায়নি। অন্তত খনন ও জরিপের ফলে সেরকম প্রমাণ উঠে আসেনি। যদিও কিছু ইউরোপিয় পর্যটক তাকলামাকানের মধ্যে রাতারাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ‘প্রাচীন-শহর’-এর প্রবাদের কথা বিশ্বাস করে থাকেন। পূর্ব তুর্কিস্তানে সদোম এবং গোমোরার মতো কিংবদন্তির ‘পুরোনো শহর’-এর কাহিনি চালু আছে যা নাকি রাতারাতি বালিতে ঢেকে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তা দান্দান-উইলিকের থেকেও প্রাচীন। হিউয়েন-সাঙও এই ধরনের লোকশ্রুতি শুনেছিলেন। তাঁর বর্ণিত ‘হো-লো-লো-কিয়া’ জনপদের কাহিনি আছে যা আমরা পরে পি-মো খননের সময় আলোচনা করব। এইসব কাহিনিগুলো নিঃসন্দেহে খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু যেখানে আমরা পরিষ্কার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাবো, যেমন আমরা পেয়েছি দান্দান উইলিকের ধ্বংসাবশেষে, সেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালাতে হবে, কিংবদন্তীর সঙ্গে তাকে জোড়া চলবে না।

সেচ-ব্যবস্থার পতন

দান্দান-উইলিকে করা বিশদ জরিপ, এর ভৌগোলিক অবস্থান ও পুরাকীর্তির নমুনা যা খননের ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে তা থেকে বলা যায় খুব সম্ভবত এই অঞ্চলে খাল খুঁড়ে চিরা, ডোমোকো এবং গুলাখমার স্রোতের জল নিয়ে আসা হয়েছিল মরুভূমির মধ্যের এই বসতির দক্ষিণে চাষ আবাদের জন্য। পরবর্তী সময়ে উজুন-তাতির ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত ‘পি-মো’ (Pi-mo) এবং মার্কো পোলো কথিত ‘পেইন’ (Pein)-এর সঙ্গে এই অঞ্চলের মিল পেয়েছিলাম এবং নিঃসন্দেহে ওইসব জায়গা দান্দান-উইলিকের থেকেও বহু শতাব্দী প্রাচীন ছিল। ঐতিহাসিক ও অবস্থানগত পর্যালোচনা করে এটা বলা যায়, পি-মো ও দান্দান-উইলিক একই কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল, সম্ভবত সেচ খালের কার্যকারিতা ও সুবিধা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

কী কারণে এই সেচ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা যায়নি তার সন্ধান করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার ধারণা, রাজনৈতিক কারণ, কমে যাওয়া জনসংখ্যা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণে খামতি বা মূল নদীর গতিপথ বদল - এগুলোর যে কোনো একটা সেচ ব্যবস্থা ধ্বংসের কারণ হতে পারে। পরবর্তীতে গুলখমা ও ডোমোকো মরূদ্যানের কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন করে জানতে পারি, এই গ্রামগুলো সেচ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে মূল অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে ছয় থেকে আট মাইল দক্ষিণে স্থানান্তরিত হয়েছিল। পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়, যদিও ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এক সময়কার চাষের জমি মরুর বালিতে চাপা পড়েছে। শুকিয়ে যাওয়া খাল আর বেড়ি বাঁধের চিহ্ন বালিতে ঢাকা পড়া চাষজমির পাশে স্পষ্ট। যেন দান্দান-উইলিক কীভাবে মরুভূমির গ্রাসে মিলিয়ে গিয়েছিল তারই ছবি।

প্রসঙ্গত বলে রাখা যাক, প্রাচীনকালে কেরিয়া দরিয়া দান্দান-উইলিকের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হত ও পরবর্তীতে তা পুবদিকে প্রায় আটাশ মাইল সরে যায় বলে ডঃ হেডিন যে অনুমান করেছিলেন, তার সমর্থনে আমি আমাদের জরিপ থেকে কোনো প্রমাণ পাইনি। এই বিশিষ্ট অভিযাত্রী যদি এখানকার ধ্বংসাবশেষ ও বালিটিলার গতিবিধি নিজের চোখে দেখতেন তাহলে সম্ভবত এই অনুমান প্রকাশ করতেন না। তিনি এই বসতিগুলো হাজার দু-এক আগে পরিত্যক্ত হয়েছিল বলে মত প্রকাশ করেছিলেন যদিও তারিখ দেওয়া নথি বলছে অষ্টম শতাব্দীতে এখানে বসত ছিল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%