পঞ্চদশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

খোটানে পুরাকীর্তি সন্ধানের প্রস্তুতি

১১ নভেম্বর আট মাইল পথ পার হয়ে পৌঁছেছিলাম কারা-কাশ নদীর বাঁ-পাড়ে উজাত নামের এক গ্রামে। ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন ধূসর চারধার আমাকে লন্ডনের অনুভূতি এনে দিয়েছিল। আশেপাশের পাহাড় থেকে শুরু করে সব দৃশ্য যেন কেউ তুলি দিয়ে মুছে দিয়েছে। কুয়াশা আর ধুলোভরা বাতাসের দৌলতে আধমাইল দূরেরও কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এখানেই তাঁবু খাটিয়েছিলাম আমরা।

গোসরিঙ্গা পর্বত পরিদর্শন

এই পাহাড়ি অঞ্চল ‘কোহমারি’ নামে পরিচিত। উলুঘাট পর্বতমালা এখানে সমতলে মিশেছে। এম. দুত্রে দ্য হ্র্যা-এর সহচর, এম. গ্রেনার্ড কোহমারিকে হিউয়েন সাঙ বর্ণিত ‘পবিত্র পাহাড় গোসরিঙ্গা’ বলে শনাক্ত করেছিলেন। হিউয়েন সাঙ গোসরিঙ্গাকে বৌদ্ধভূমি খোটানের একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। বিশ্বাস যে এখানে বসেই নাকি শাক্যমুনি ন্যায়শাস্ত্রের সারাৎসারের শিক্ষা দিয়েছিলেন দেবতাদের। তাই সেই বিশেষ জায়গার ওপরেই গড়ে উঠেছিল এক বৌদ্ধবিহার বা মঠ। এর পাশেই এক গুহায় নাকি ‘গভীর আনন্দমগ্ন’ একজন অর্হত ‘মৈত্রেয় বুদ্ধের আগমনের অপেক্ষায়’ থাকতেন।

উজিত গ্রামের উলটোদিকে নদীর ডানপাশে এক মুসলিম মাজার। সাধক ‘মহেব খ্বাজা’-র চিরবিশ্রাম-স্থান। বৌদ্ধ তীর্থভূমির প্রাচীন মাহাত্ম্য সে জায়গা যেন এখনো বহন করে চলেছে। খোটানের বাসিন্দারা এখানে বছরভর তীর্থযাত্রায় আসে। তাঁরা বিশ্বাস করে, সাধু মহেব খ্বাজার কৃপায় তাদের নদীতে বছরভর জল থাকবে ও ফসল ভালো হবে। বর্তমানে এই মাজার সরকারি অর্থে পোষিত। আম্বান প্যান-ডারিনও কিছুদিন আগে এই তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করে গেছেন।

পবিত্র গুহায়

মহান পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ যে গুহাটির কথা বলেছিলেন তা এখনও গোসরিঙ্গা পাহাড়ের চূড়ার পঞ্চাশ ফুট নীচে রয়েছে। মাজারের পাশ দিয়ে পাথরের স্তূপ পেরিয়ে পৌঁছতে হয় মাজারের দেখাশোনাকারি শেখের আধা নির্জনবাসের সে-গুহায়। গুহাটা চল্লিশ ফুট গভীর আর আট থেকে দশ ফুট উঁচু। প্রচলিত প্রবাদ, ইসলামধর্মী পূজারিকে কিছু কাফের এখানে গুহার ভেতর হত্যা করেছিল স্রেফ ধোঁয়া তৈরি করে। গুহার দেওয়ালে এখনও ধোঁয়ার কালো চিহ্ন বর্তমান। আসলে পুণ্যলোভী তীর্থযাত্রীরা এখানে আসে, দু’দন্ড বসে প্রার্থনা করে; শীতের সময় নিজেদের গরম রাখতে তারা যে আগুন জ্বালায়, পাথরের দেয়ালে তার ছাপ রেখে যায়। ওপরে একটা ছোটো গুহা আছে, মই ছাড়া ওঠা যায় না। সেখানে গেলে দেখা যায় পাথরের দেয়ালের মধ্যে একটা ফাটল চলে গেছে। হিউয়েন সাঙ-এর শোনা কিংবদন্তি অনুসারে এই ফাটল ছিল ভেতরে যাবার পথ আর অর্হতকে আড়াল করার জন্য অলৌকিকভাবে এই ফাটলের মুখ নাকি পাথর পড়ে বন্ধ হয়ে গেছিল।

শুধু হিউয়েন সাঙ-এর বর্ণনায় থাকার জন্য নয়, ‘কোহমারি’ গুহা নামে পরিচিত এই গুহার প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল খানিক অন্য কারণেও। এই গুহা থেকে খরোষ্ঠী অক্ষরে প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় লেখা কিছু বার্চ গাছের পাতার ওপরে লেখা পুথির টুকরো পাওয়া গেছিল বলে দাবি করা হয় যা বর্তমানে ‘দুত্রে দ্য হ্র্যা এম.এস’ নামে পরিচিত। এম. গ্রেনার্ডের বিবরণে পাওয়া যায়, তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীকে কোহমারি গুহা থেকে এই পাতার টুকরো এনে বিক্রি করেছিল স্থানীয় মানুষেরা। যদিও এম. গ্রেনার্ড বা তাঁর সঙ্গী ধর্মীয় কারণে স্থানীয় বাধা আসায় নিজেরা কোহমারি গুহায় যেতে পারেননি। এই পাণ্ডুলিপি যে ঠিক কোনখান থেকে আনা হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়।

আমি কিন্তু গুহা পরিদর্শনে কোনো বাধা পাইনি। বরং স্থানীয় মোল্লারা হাসিমুখেই আমাকে গুহা দেখাতে যেতে প্রস্তুত ছিল। দেখলাম তাদের সঙ্গে ভারতীয় ‘তীর্থক্ষেত্রের’ পুরোহিতদের সঙ্গে ভালোই মিল আছে এ ব্যাপারে। ভালো করে গুহা পরীক্ষা করে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম যে ওই পাণ্ডুলিপি ওখান থেকে পাওয়া যায়নি। ফরাসি অভিযাত্রীদের এখানে আসার কথা স্থানীয় শেখদের ভালোভাবে মনে থাকলেও গুহায় পাণ্ডুলিপি পাওয়ার বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেনি। একই ধরনের পাণ্ডুলিপি কাশগরে রাশিয়ানদেরও বিক্রি করা হয়েছিল। সম্ভবত স্থানীয় ধন-সন্ধানীরা পাণ্ডুলিপিকে এমনভাবে গুহার সঙ্গে মিশিয়ে গল্প তৈরি করেছিল যাতে আসল জায়গার সন্ধান অজানা থাকে।

এই পবিত্র গুহা পরিদর্শনকালে খোটানের স্থানীয় সহজসরল উপাসনার রীতির সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছিলাম। দেখলাম, সে যতই ধার্মিক মুসলমান হোক না কেন, এখানকার উপাসনালয়ে ঢোকার জন্য পায়ের জুতো খোলে না। যদিও সচরাচর জুতো খুলেই ধর্মীয় স্থানে প্রবেশের রীতি। শীত এখানে ভয়ংকর। জুতো খোলা বিশেষ করে এই সময়ে এখানে দুঃস্বপ্ন। ভারতীয় মন্দির বা মসজিদে ঢোকার সময় পুরোহিতদের সঙ্গে সাঁট করে, ইউরোপিয়ানদের পক্ষে জুতো না পরে হাঁটা যে কতটা অসুবিধাজনক বুঝিয়ে জুতো পরে ঢোকার অনুমতি পেতাম। এখানে আমাকে জুতো পরে মাজারে বা গুহায় ঢুকতে কোনো কচকচানিতে যেতেই হয়নি।

আঙুর বাগানে ঘেরা উজাত একটি বড়ো গ্রাম, যা তার আঙুরের জন্য বিখ্যাত। এখানকার শুকনো আঙুর আর কিশমিশ চালান যায় আকসু, কাশগর এবং তুরফানের বাজারে। চিনা তুর্কিস্তানের আর দশটা জায়গার মতো এখানেও আঙুরলতাগুলোকে নীচু নীচু বেড়ার গায়ে সমান্তরালভাবে বাড়িয়ে দেয়া হয়। শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঙুরলতার ডালপালা মাটির প্রলেপে ঢেকে রাখার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবার পরেও বহুকাল ধরে উজাতের মানুষজনের ধর্মবিশ্বাসের ঘাটতি, আর নানান বিধর্মী কাজকর্মে আসক্তির কথা সুপরিচিত ছিল। এর পেছনে এদের এই বিপুল পরিমাণ আঙুরচাষের কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয়।

উজাতে থাকতেই আমার কাছে বহু প্রত্যাশিত একগুচ্ছ চিঠি কাশগর হয়ে এসে পৌঁছেছিল। চিঠিগুলো এসেছিল আমার বাড়ি ও ভারত থেকে। এর কিছু জরুরি উত্তর পাঠানোর দরকার ছিল যা আমি সেরে নিয়েছিলাম উজাতে বসেই।

১৫ নভেম্বর খোটানে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করি। কোহমারি পর্বতের প্রান্ত থেকে কালো নুড়ি (সাই)-ভরা পথ দিয়ে এসে পৌঁছই কোসা গ্রামের নিকটবর্তী কৃষিক্ষেত্রগুলোর দক্ষিণ সীমায়। চাষজমিগুলো যে কী দ্রুত শীতের পোশাকে মুখ ঢেকেছে তা দেখে চমকে যেতে হয়। পপলার আর উইলো গাছের দীর্ঘ সারিরা পত্রহীন। কারাকাশে প্রথম অবতরণের সময় সেখানে হেমন্তে উজ্জ্বল বর্ণমালার সাক্ষী হয়েছিলাম। আর, এবারে এসে দেখি, যে ঝড় পাহাড়ে আমাদের জরিপের কাজ পন্ড করে দিয়েছিল, সেই ঝড়ই এ চত্বর থেকে হেমন্তের উজ্জ্বল বর্ণমালাকে ধুয়েমুছে দিয়ে গেছে।

তুর্দি-র নিয়ে আসা পুরাকীর্তি

দলের লোকজন ও টাট্টুঘোড়াদের চাঙ্গা করে তোলার জন্য খোটানে কয়েকদিন থেকে বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া আমার দলের কিছু লোক যারা মাসখানেক সময় ধরে খোটানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা পুরাকীর্তি সংগ্রহ করে খোটানে পাঠিয়েছিল, সেগুলো পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবারও দরকার ছিল। আমি খোটানে এসে পৌঁছবার পরপরই আমার পাঠানো লোকেরাও ফিরে আসতে শুরু করেছিল। ইউরুং-কাশ ক্যান্টনের একটি গ্রামের তুর্দি নামের এক অভিজ্ঞ প্রত্ন-শিকারির নেতৃত্বে আমার লোকেরা মরুর নানা অঞ্চলে গিয়েছিল পুরাকীর্তির নমুনা সংগ্রহে।

তুর্দি নিজে গিয়েছিল সবচাইতে দূরে দান্দান-উইলিক-এ (‘হাতির দাঁতের ঘরবাড়ি’)। যেসব নমুনা এরা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিল, তার মধ্যে ভারতীয় ব্রাহ্মী লিপিতে লেখাসহ ফ্রেস্কোর অনেক টুকরো ছিল। এছাড়া বৌদ্ধ উপাসনায় ব্যবহৃত উপাদানের ‘স্টাকো রিলিভো’ টুকরো এবং এক ‘আসল’ ছোট্ট টুকরো কাগজের নথি, যাতে মধ্য এশিয়ান ব্রাহ্মী লিপিতে ‘টানা হাতের লেখায়’ লেখা রয়েছে। এসব নিদর্শন হাতে পেয়ে আমার গভীর আনন্দ হয়েছিল।

আরো পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখা গেল যে মরুর গভীরের যেখান থেকে এই পুরাকীর্তি সংগ্রহ করে আনা হয়েছিল তা খোটান থেকে উত্তর-পূর্বে দশ দিনের পথ। ডঃ হেডিন তাঁর ‘কেরিয়া দরিয়া’ যাত্রায় এই ধ্বংসস্তূপ দেখেছিলেন। সেই অভিযানের কথা উনি লিখেছিলেন ‘তাকলামাকানের প্রাচীন শহর’ গ্রন্থে। আমার লোকেদের ভাষ্যের সঙ্গে ডঃ হেডিন বর্ণিত জায়গার আপাত মিল পাওয়া গেল। যদিও তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন অন্য পথ ধরে তাওয়াক্কেল হয়ে মরূদ্যানের উত্তর প্রান্তে। খোটানের আম্বান প্যান-ডারিনকে সংগৃহীত ফলাফল সম্পর্কে জানাতে উনি সঙ্গে সঙ্গে তাওয়াক্কেলের বেগকে খবর দিয়েছিলেন ডঃ হেডিনের অভিযানে যাওয়া দুই পথপ্রদর্শককে আমার কাছে পাঠাতে।

২০ নভেম্বর তাওয়াক্কেলের বেগ নিজে আহমদ মেরঘেন এবং কাসিম আখুন নামের দুই পথপ্রদর্শককে সঙ্গে করে নিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন আমার কাছে। আমার সন্ধানী দলের নেতা তুর্দির সামনাসামনি এই দুজনের সঙ্গে কথা বলে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিলাম দান্দান-উইলিকের পরিচয় সম্পর্কে। খনন কোথায় শুরু করব সে-জায়গা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলাম নির্দ্বিধায়।

খোটানে ফিরে এসেই আমি আমার সহৃদয় বন্ধু আম্বানের সঙ্গে দেখা করে ধন্যবাদ জানাতে গেছিলাম। কারণ, ওঁর সক্রিয় সাহায্য না পেলে পাহাড়ে জরিপের কাজ করা সম্ভব হত না। ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আমার আগামী মরু অভিযানের উদ্দেশ্য জানালাম; যার ব্যাখ্যা হিসাবে সংগ্রহ করে আনা প্রত্নতত্ত্বের নমুনা, যা এই অঞ্চলে একদা মহান ‘তাং-সেং’-এর উপস্থিতির কথা প্রমাণ করে, সে কথা ওঁকে বলেছিলাম। ওঁর সঙ্গে দেখা করার ঠিক দু-দিন পর উনি আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে আমি ওঁকে তুর্দির সংগ্রহ করে আনা নমুনাগুলো দেখাই। উনি খানিক স্বস্তি পেয়েছিলেন এই দেখে যে এই অভিযানে প্রাচীন ও বিখ্যাত তীর্থস্থান খুঁজে বের করার জন্য সঠিক লোকেরা আমার সঙ্গে থাকছে। ওঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার ছিল না, কিন্তু আমার দোভাষী নিয়াজ দুর্দান্তভাবে আমার হয়ে ওঁকে আমার মনের কথা বলেছিল। কারণ আম্বান বেশ গম্ভীরভাবেই আমাকে প্রশ্ন করলেন যে আমি ‘তাং সেং’-এর আত্মার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্বে বিশ্বাস করি কিনা। দেখা গেল বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী চিনবাসীদের কাছে হিউয়েন সাঙ এখনো এক মহিমাময় অর্হতের সন্মান পেয়ে থাকেন। বিদায় নেবার আগে আবারও তিনি সমস্তরকম সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছিলেন।

পাহাড় থেকে নেমে এসে আমি আবার গিয়ে তাঁবু খাটিয়েছিলাম আখুন বেগের বাগানে। এখানে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে না এলেও শীতের হাওয়া কাবু করে দিচ্ছিল। পাহাড় থেকে নেমে আসার পর আখুন বেগের ঘরগুলো আমার দমবন্ধ লাগছিল, তাই শীতে কষ্ট পেলেও তাঁবুতেই থাকব বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম। ‘অন্ধকারের পাহাড়’-এর ভয়ঙ্কর এবড়োখেবড়ো পথে আর ইয়াকদের এলোপাথাড়ি চালে চলার ফলে অনেক জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর জরুরি মেরামত প্রয়োজন ছিল। কামার, দর্জি, ঘোড়ার জিন ও অন্যান্য চামড়ার জিনিসের মেরামতকারী, এদের নিয়ে লেগে পড়েছিলাম ছিঁড়ে-ফেটে যাওয়া সব সারাই করে নিতে। বাগানে বসে আমার সামনেই সবকিছু মেরামত হচ্ছিল। প্রাচীন জিনিস যেমন সিলমোহর, মুদ্রা, মাটির পাত্র, বেশিরভাগই ইয়োটকান থেকে সংগ্রহ করে আনা, বিক্রি করার জন্য রোজই কিছু না কিছু লোক হাজির হত। কিন্তু একজন লোকও আমার কাছে প্রাচীন পুথি বিক্রি করার জন্য আসেনি। ওরা বোধ হয় বুঝে গিয়েছিল যে ওদের এহেন ‘প্রাচীন পুথি’ তৈরি করার কারবার নিয়ে আমি বেশ রেগে রয়েছি।

চিকিৎসা প্রত্যাশী

এখানে আমার দিনগুলো শুধু অভিযানের তদারকি বা প্রস্তুতিতেই কাটেনি, আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল স্থানীয় লোকেদের চিকিৎসা করতে। স্থানীয় বেগ থেকে চিনা কর্তাব্যক্তিদের পাঠানো রোগীদের ফেরাতেও পারছিলাম না। আমার দেয়া ‘ট্যাবলয়েড’রা আদপে বিশেষ কোনো কাজে না এলেও তার বিস্ময়কর সারানোর ক্ষমতার কথা ভেবেই তারা আমাকে বড়ো মাপের হেকিম ধরে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো জেলা জুড়ে। রকমারি রোগী দেখে আমার মনে হয়েছিল যে খোটান হল রোগের আখড়া। সব রোগের নিরাময় করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখানে যদি কোনো সত্যিকারের ডাক্তার আসেন তাহলে যে তাঁর পসার দ্রুত জমে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। যদিও তিনি উপযুক্ত ফি পাবেন কি না তাতে সন্দেহ আছে। কারণ, এই অঞ্চলের মানুষ দাতব্যই আশা করে। যদিও আমার কাছে যারা চিকিৎসার জন্য আসত তারা অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির চিনা মানুষজন। তাদের অসুখবিসুখের ব্যাপারটা সামলাবার পর অবধারিতভাবে তারা কিছু না কিছু ভিক্ষে চাইত আমার কাছে। তাদের চেহারা আর পোশাক আশাকের দশা থেকে বোঝা যেত ভিক্ষেটা তারা নিতান্ত নাচার হয়েই চাইছে। এত নিরাশ্রয় ভিখিরি-র ভিড় যে তাঁদের শাসনের বদনাম করছে এটা চিনা কর্তাব্যক্তিরা আদৌ বুঝছেন কি?

দীর্ঘ সময় মরূদ্যান থেকে বহুদূরে ভয়ংকর মরুভূমির বুকে যে থাকতে হবে, তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। তাই যাত্রা শুরুর আগে খোটান মরূদ্যানের মধ্যে ঘুরে ঘুরে এই অঞ্চলের প্রাচীন ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইছিলাম। পাশাপাশি রাম সিংকে একা কুয়েন-লুন শীর্ষ নং ৫-এর পুবদিকে পাঠাতে মনস্থ করেছিলাম যাতে আমাদের সাম্প্রতিক জরিপের মধ্যে থেকে যাওয়া কিছু ফাঁক ভরাট করা যায়। এর মধ্যে আছে ক্যাপ্টেন ডিজির পোলু অঞ্চল অভিযানের রাস্তা। রাম সিং তাঁর কাজ শেষে মাসখানেক পর দান্দান-উইলিকে আমার দলের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে ঠিক হয়েছিল।

২৩ নভেম্বর আমাদের দুই দল খোটান ছেড়ে জমদা গ্রাম পর্যন্ত একসঙ্গে গিয়ে তারপরে আলাদা হয়ে যায়। ইউরুং-কাশ নদীর ধারের এই গ্রামে আগে এসেছিলাম কারাংঘুটাঘ যাবার পথে। জমদা গ্রামে এক রাত কাটিয়েছিলাম। গ্রামের মানুষজন বিশেষ করে পূর্বপরিচিত ছোটোখাটো চেহারার ওয়াং-দালোইয়ের অভ্যর্থনা মন ভরিয়ে দিয়েছিল। পিকিং থেকে এসে গত দশ বছর ধরে ওয়াং-দালোই এই গ্রামে থেকে ইউরুং-কাশ নদী থেকে জেড পাথর সংগ্রহ করে বিক্রি করে। ওয়াং জেড মাইনিং করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। আমার দোভাষী জানিয়েছিল, ওয়াং বিশ্বাস করে যে জেড পাথর বিক্রি করে সে একদিন অনেক অর্থ জড়ো করতে পারবে আর ফিরে যাবে পিকিংয়ে।

আমি টের পেয়েছিলাম, এই অঞ্চল সম্পর্কে ওয়াং অনেক কিছু জানে। বিশেষ করে ইউরুং-কাশের বাঁদিকের অঞ্চল সম্পর্কে। তাছাড়া সে খানিক তুর্কি জানাতে আমার কথাবার্তা চালাতে সুবিধা হয়েছিল। পরদিন সকালে এমন একটি জায়গার ওপর দিয়ে গিয়েছিলাম যেখানে নদীর কিনারায় প্রায় এক বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে পড়ে ভাঙা প্রাচীন মাটির পাত্রের টুকরো। এমনকি তাং রাজবংশের সময়কাল অবধি প্রাচীন চিনা মুদ্রা পর্যন্ত নজরে এসেছিল, কিন্তু কাঠামোগত কোনো নিদর্শন খুঁজে পাইনি।

মাইল ছয়েক পেরিয়ে আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিলাম যেখানে নদীর বুকে বা ধারে জেড পাথর পাওয়া যায়। নদীর বাঁ ধারে আধমাইল মতো নুড়িভরা সমতল গিয়ে মিশেছে এক পাথুরে ঢালে। ইউরুং-কাশ স্রোতবাহিত এই নুড়ি-পাথরের সাম্রাজ্য ঘেঁটেই মেলে মূল্যবান জেড পাথর। প্রাচীনকাল থেকেই এই জেড পাথর খোটান অঞ্চলকে পুরো পুবে বিখ্যাত করে রেখেছে। খোটানের জেড পাথরের চাহিদা ও দাম সবচাইতে বেশি। প্রাচীন খোটানের খ্যাতির যা ইতিহাস পাওয়া যায়, তার পেছনে এই জেড পাথরের ভূমিকা অনেকটাই।

চালমাকাজানের জেড খাদান

খানিক উৎসাহ নিয়ে জেড পাথরের খোঁজে নদীর কিনারায় খোঁড়া গর্তগুলো হাতিয়ে দেখেছিলাম। কোনো মানুষের দেখা নেই, গর্তগুলোও অধিকাংশ বুজে গেছে উড়ে আসা মরুবালিতে। কিন্তু চালমাকাজান পৌঁছতেই নজরে এসেছিল সদ্য খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন। এখানেও নদীর কিনারা থেকে ভাঙা প্রাচীন মৃৎপাত্র, কাচের টুকরো আর ধাতুর গলিত অংশ পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে। বিস্তৃত অঞ্চলের মাঝখানে পাথরের একটা ছোটো ঢিবি আমার নজর কেড়েছিল। ওর গোল আকৃতি দেখেই বুঝেছিলাম এটি ‘স্তূপ’ না হয়ে যায় না। ভালো করে পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম বৌদ্ধ মঠের অস্তিত্ব। আমার দুর্ভাগ্য, আমার আগেই এই মঠের অস্তিত্ব টের পেয়েছিল প্রত্ন-শিকারিরা, একটা লম্বা খোঁড়া গর্ত তাদের কাজের প্রমাণ রেখে গেছে। মাপজোক করে দেখেছিলাম, ঢিবির ব্যাস প্রায় আটানব্বই ফুট আর মাটি থেকে ফুট পনেরো উঁচু। খানিক খোঁড়াখুঁড়ি করে দেখেছিলাম, ধ্বংসস্তূপের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অসমান পাথর দিয়ে, আর তার ওপর বৃত্তাকার দেওয়াল তৈরি হয়েছিল মাটি আর পাথর মিশিয়ে। মাঝখানে থাকা ঝুরো মাটি দিয়ে বোজানো একটা কুয়ো জাতীয় গর্তে সম্ভবত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ছিল।

একসময় এখানে যে ছোটো জনপদ ছিল এবং তা গড়ে উঠেছিল এই জেড মাইনিংকে ভিত্তি করে—এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। নদীর বামপাশের জেড খনন এখনও নিয়মিত হয়। এখান থেকে মাইল দেড়েক হেঁটে পৌঁছেছিলাম সিরিক-তোঘরাকের জেড খুঁজিয়েদের ডেরায়। এখানে নদীর কিনারার বালি-পাথর সরিয়ে জেড খুঁজে পাওয়ার বর্গাকার বা আয়তাকার খাদগুলো নয় নয় করেও দশ থেকে কুড়ি ফুট গভীর। যদিও বড়ো আকারের জেড পাথর খুব কমই জোটে, কিন্তু এই বিশাল আকৃতির খাদানের রূপ, খোটান ও তুর্কিস্তানের শহুরে ‘বাই’ বা লগ্নিকারীদের এখানে টেনে আনার জন্য যথেষ্ট। লগ্নিকারীরা এখানে হতদরিদ্র কৃষকদের নিয়ে এসে কুড়ি থেকে তিরিশ জনের দল তৈরি করিয়ে জেড খননের কাজ করায়। বিনিময়ে খাবার, জামাকাপড় আর মাসে ছয় খোটান তাঙ্গা (ভারতীয় মুদ্রায় দু-টাকা মতো) পায়। খনন করে যেসব পাথর পাওয়া যায় তাতে শ্রমিকদের কোনো অধিকার থাকে না, তবে বিশেষক্ষেত্রে কখনো-সখনো পুরস্কারস্বরূপ কিছু অতিরিক্ত অর্থ জুটে যায়। তবে ওয়াং-দালোইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই খনিতে লগ্নিকারীদের টাকা ডুবেই যায়, ফেরত পায় না প্রায় কিছুই। তবে একেবারে যে কিছুই মেলে না তা নয়, মাঝে মাঝে বড়ো জেড পাথরের টুকরোও বেরিয়ে আসে খাদান থেকে। এক লগ্নিকারীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, গত তিন বছরে খনিতে তিরিশ ইয়াম্বাস (রুপোর বার) খরচ করে প্রায় একশো ইয়াম্বাস কামিয়েছেন—ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় তেরো হাজার টাকার কাছাকাছি।

এই জেড খননের ওপর চিনা কর্তৃপক্ষ কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ জারি করেনি। কোনো খনি-খাদই কুড়ি ফুটের বেশি গভীর নয়। আমার ধারণা, এর বেশি খুঁড়লে সেখানে জল জমে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে—এটা এরা ভালোই জানে। জেড খননের কাজ শুধু নদী সমতলেই সীমাবদ্ধ। যেখানে নদী পাহাড়ের সীমায়, সেখানে কেউ খননের কাজ করেনি। ছোটো ছোটো দলে নদী কিনারায় খননের কাজ হয়ে চলেছে। খনি খননের ছোটো দলকে স্থানীয় ভাষায় ‘কুমাট’ বলে। এই শীতের সময় এখানে মাত্র প্রায় শ-দু-এক মানুষ কাজ করে চলেছে। গরমকালে অভাবের সময়ে এই সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি হয়। জেড খননকারী ছাড়াও গরমের সময় আরও একদল জেড-সন্ধানী এখানে হাজির হয়। তবে তারা নদীর ধারে বালি-পাথর সরিয়ে জেড খোঁজে না, হিমবাহ গলা জলে বা বর্ষায় প্লাবিত হয়ে যাওয়া নদীতীরে ওরা চিনা প্রাচীন ইতিহাসে বর্ণিত ঢঙে বালি-পাথর ছাঁকনিতে চেলে মাছ ধরার কৌশলে জেড পাথর খুঁজে ফেরে। তখন পুরো জমদা উপত্যকা ছেয়ে যায় খোটান মরূদ্যান থেকে ভাগ্য অন্বেষণে আসা গরীব কৃষকের ভিড়ে। খুব কম লোকের ভাগ্যেই শিকে ছেঁড়ে। কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা একইরকমভাবে এখনও বহমান।

হান যুগ থেকে শুরু করে প্রাচীন চিন রাজবংশদের ইতিহাসে, এই ছোট্ট রাজ্য ইয়ু-তিয়েন (ইয়ু মানে জেড) বা খোটান সম্পর্কে অনেক আশ্চর্য তথ্য ও কিংবদন্তী পাওয়া যায়। চিন-বিশারদ আবেল রেমুসাত, তাঁর Histoire de la ville de Khotan (প্যারিস- ১৮২০) বইতে এইসব তথ্য ও কিংবদন্তী সংগ্রহ করে তার অনুবাদ করে লিখে গেছেন। আমার পরম সৌভাগ্য যে চোখের সামনে সেই দামি পাথরের খাদান দেখতে দেখতে, ইউরোপিয় সাহিত্যে খোটান সম্পর্কিত সেই আদিতম বইটি পড়তে পেরেছিলাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%