মার্ক অরেল স্টাইন

একের পর এক খনন করা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম, বাসিন্দারা বসতি ছেড়ে যাবার সময় সব প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান সামগ্রী সঙ্গে করে নিয়ে গেছিল। তাদের ফেলে যাওয়া আবর্জনার মাঝেই আমাকে খুঁজতে হচ্ছিল দুর্লভ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ক্যাম্প থেকে উত্তরে মাইল তিনেক দূরে প্রায় দু-মাইল জায়গা জুড়ে অনেক প্রাচীন আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে জানতে পেরে আমার লোকেদের ছ’টা দলে ভাগ করে সেই আবর্জনা ঘাঁটতে শুরু করেছিলাম। প্রথমে বালির ওপর কিছু ফিকে হয়ে যাওয়া কাঠের ফলক খুঁজে পেলেও খানিক বালি সরাতে পাওয়া গেছিল তিরিশটার মতো লেখা কাঠের পাটাতন ও অন্যান্য সামগ্রী। তার মধ্যে দুটো জিনিস আমার নজর কেড়েছিল—চিনা ভাষায় লেখা একটি ভাঙা কাঠের টুকরো, আর খরোষ্ঠী লিপিতে তারিখ লেখা ছেঁড়াখোঁড়া একটি চামড়ার পটি। এগুলো পাওয়ার পর ঠিক করি এখানেই ক্যাম্প সরিয়ে নিয়ে আসবো।

৬ ফেব্রুয়ারি যখন আমার লোকেরা আবর্জনা ছড়ানো এলাকাটার কাছাকাছি ক্যাম্প সরিয়ে নিয়ে যাবার কাজ করছিল, তখন আমি আমার তাঁবুর পাশের ছোট্ট স্তূপটি ভালো করে দেখার কাজ শুরু করি। গম্বুজাকৃতি স্তূপটি ১৩ ফুট ৬ ইঞ্চি বর্গাকৃতি ও ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু ভিতের ওপর ৭ ফুট লম্বা। কিন্তু তামারিস্ক ঝাড়ে ঢাকা শঙ্কু আকৃতির বালির পাহাড়ের ঢালের শুরুতে স্তূপের ভিতটি ভালো করে পরীক্ষা করার পর মনে হয়েছিল এটি আসল ভিত নয়, তা আরও গভীরে আছে। স্তূপের ভিতের পুবদিকের বালি খোঁড়ার পর দেখা গেছিল, যে-ভিত বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল তা ওপরের ভিতের থেকে আরও ৩ ফুট চওড়া ও ৬ ফুট উঁচু ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। স্তূপের মোট উচ্চতা ছিল ২০ ফুট। খানুই, মোজি এবং পিয়ালমার ধ্বংসপ্রাপ্ত স্তূপগুলির সঙ্গে এই স্তূপের গঠন মিলে যায়। রোদে শুকনো ইটের মাপও এক ২২*১৭*৪। প্রত্ন-শিকারিরা যে এখানে হানা দিয়েছিল তা ওপরের ভিতের ইট খুলে করা দুটো গর্ত বলে দিয়েছিল। যা কিছু স্মরণচিহ্ন ছিল বহু প্রাচীন এই ছোট্ট স্তূপে, যাকে হিউয়েন সাঙ ‘স্মৃতি-মিনার’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, তা নিশ্চয়ই অনেকদিন আগেই গায়েব হয়ে গেছে।
আমার মন বলছিল সেই আবর্জনার এলাকা থেকে মিলতে পারে অনন্য সম্পদ। বালির তলায় কী থাকতে পারে তা ছড়িয়ে থাকা আবর্জনার মাঝে জেগে থাকা ২৩ ফুট বাই ১৮ ফুট ভাঙা ঘরের দেওয়াল দেখে অনুমান করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু পদ্ধতি মেনে ভাঙা ঘরের উত্তর-পূর্বদিক থেকে খোঁড়া শুরু করার পর থেকে বের হতে শুরু করেছিল কাঠের ফলক-সহ নানা জঞ্জাল। সন্দেহ নেই, বহুবছর ধরে জমা হওয়া অপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রাচীন কালের গুদামঘর ছিল এটি।
প্রায় দু-শতাধিক কাঠের ফলক উদ্ধার হয়েছিল ফুট চারেক উঁচু হয়ে জমে থাকা ভাঙা মাটির পাত্র, খড়, পশমের কম্বল, বোনা কাপড়, চামড়ার ফালি ময়লার তলা থেকে। কোনো সন্দেহ নেই, এই বিশাল আবর্জনার স্তূপ বাতাসের ক্ষয়কারী ক্ষমতা থেকে প্রাচীন নথি সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। উত্তুরে ঠান্ডা হাওয়ায় অসাড় হয়ে যাওয়া আঙুল দিয়ে উদ্ধার করা প্রত্নসামগ্রী পরিষ্কার ও তার নথিবদ্ধকরণ খুবই শ্রমসাপেক্ষ কাজ ছিল। পরে এর কালানুক্রমিক ক্রম তৈরি করতে এবং বিভিন্ন নথির মধ্যে সম্পর্ক টানতে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে। টানা তিন দিন একনাগাড়ে এই প্রত্নসামগ্রীর কয়েক শতাব্দী ধরে জমে থাকা সোঁদা গন্ধে শ্বাস নেওয়া অস্বস্তির হলেও আমি আমার এই বিপুল প্রত্নসামগ্রীর আবিষ্কার নিয়ে খুশিতে ছিলাম।
প্রাচীন আবর্জনার স্তূপ থেকে যেসব নথি উদ্ধার হয়েছিল তা খুবই ভালো অবস্থায় ছিল। কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পরই চামড়ার ওপর খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা নথি মিলেছিল। ভেড়ার নরম চামড়ার ওপর লেখা দু-ডজনের মতো আয়তাকার গোটানো নথিগুলো ছিল ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা। গোটানো নথিগুলো খুলতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। চামড়ার একদিকে সুন্দর হস্তাক্ষরে কালো কালিতে খরোষ্ঠী লিপিতে লেখাগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন সদ্য লেখা হয়েছে। প্রতিটি নথির ওপরে যেন ফর্মুলার আকারে একই লেখা লিখিত হয়েছে। এর আগে যত নথি উদ্ধার হয়েছে তার অনেকগুলোর শুরু একইভাবে হলেও পরে লেখা আবছা হয়ে যাওয়ায় পড়তে পারিনি। কিন্তু এই নথির শিরোনাম পড়তে পেরেছিলাম ‘মহানুয়ব মহারায় লিখতি’, যা প্রমাণ করে এগুলো কোনো সরকারি তথ্য। প্রায় সবগুলোতেই তারিখ লেখা। যদিও শুধু দিন আর মাসের উল্লেখ আছে তাতে। আর উলটোদিকে ঠিকানা লেখা বা লেখার জন্য দাগ কাটা খালি জায়গা। নথিগুলো দেখে তার মধ্যে দুটি ব্যক্তিগত নাম বার বার এসেছে বলে মনে হয়েছিল। যদিও জানা নেই সেই প্রাপক কে বা কোথাকার, কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা, না এই এই প্রাচীন বসতির কোনো করণিক…
নথির বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, এই প্রথমবার চামড়ার ওপর লেখা কোনো নথি হাতে এল। ভারতীয় কাজকর্মে চামড়ার ব্যবহার শুরু হয়েছে অনেককাল থেকেই, বিশেষ করে নথি বাঁধাইয়ের কাজে। ধর্মীয় বাধা যাই থাকুক না কেন, কোনো সন্দেহ নেই যে বহু শতাব্দী আগে যেমন কাশ্মীরের গোঁড়া ব্রাহ্মণেরা চামড়ার ওপরে সংস্কৃত শাস্ত্র লিখত, তাদের মতোই এই অঞ্চলের ধার্মিক বৌদ্ধরাও লেখার কাজে চামড়া ব্যবহার করেছিল। পশুর চামড়াকে লেখার মাধ্যমের উপযোগী করে তোলা শুধু সময় ও শ্রমসাধ্যই নয়, যথেষ্ট কারিগরি কুশলতা প্রয়োজন। প্রচুর না লেখা ছোটো ছোটো চামড়ার টুকরো পড়ে ছিল ‘অফিস ঘর’-এর বাইরে আবর্জনার স্তূপে। আবর্জনার স্তূপেই পাওয়া গেছিল একটি তামারিস্ক কাঠের কলম। কলমের পেছনে একটা হাড়ের বড়ো গাঁট আঁটা, সম্ভবত লেখার পরে তার ওপর বার্নিশের প্রলেপ দেবার কাজে এটি ব্যবহার করা হত।


অফুরন্ত কাঠের ফলক প্রমাণ করে, কাঠ ছিল এই অঞ্চলে লেখার মূল উপাদান। অবাক হয়েছিলাম নথি প্রাপকের কাছে পাঠানোর আগে তা খাম- বন্ধ করার পদ্ধতি দেখে। দড়ি দিয়ে বাঁধার পর তা সিল করার ব্যবস্থা ছিল
অসাধারণ। প্রাপকের কাছে পৌঁছানোর আগে তা খুললেই বার্তাবাহক ধরা পড়ে যেত। কীলক (wedge) আকৃতির কাঠের ট্যাবলেট যা মূলত অল্প কথার যোগাযোগবাহী বার্তা হিসেবেই পাঠানো হত, তা একই মাপের দুই কাঠে লিখে একের ওপর আর একটিকে বসিয়ে দিলে ভেতরের বার্তা চোখের আড়ালে চলে যেত এবং তা খামের আকার নিত।
কীলকের চওড়া অংশের পেছনটা খুদে বের করে ফাঁপা করা হত ও তাতে খাঁজ কাটা থাকত। ট্যাবলেটের দু-প্রান্তের দুই ছিদ্রে সুতো ঢুকিয়ে তা খাঁজের মধ্যে দিয়ে নিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে তার ওপর কাদামাটির প্রলেপ চড়িয়ে চার ধার-সহ সমস্ত জোড় বন্ধ করে দিয়ে সুতোর ওপর মাটির সিলমোহরের ছাপ দিয়ে দেওয়া হত। সুতো ছিঁড়ে সেই বার্তা পড়ার চেষ্টা করা হলে সেই ছাপ গুঁড়িয়ে যেত। ফলে প্রাপকের আগে বার্তা পড়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না ধরা পড়ে যেত। মিঃ এফ. এইচ. অ্যান্ড্রুজ ছবিতে ও তাঁর বানানো স্কেচে সেই বাঁধার পদ্ধতি ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সাধারণত যেদিকে সিল থাকত তার উলটোদিকের ফাঁকা জায়গায় প্রাপক ও প্রেরকের নাম ঠিকানা লেখা থাকত। বেশ কিছু ট্যাবলেটে হাতের লেখার ছাঁচের তারতম্য দেখে মনে হয়েছে সিল করা ও ঠিকানা লেখার কাজ অন্য কেউ করত এবং সম্ভবত এই বার্তা পাঠানোর আগে কোনো ‘ডকেট’ নম্বর দিয়ে তা আলাদা করে নথিভুক্ত করা হত। বোঝা গেল যে খাম সিল করার পদ্ধতি অতি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করা হত। আবর্জনার স্তূপ থেকে বেশ কয়েকটি খাম সিল করা অবস্থায় অবিকৃতভাবে পাওয়া গেছিল। সব ট্যাবলেটের কাঠের কীলক আকৃতির পাতলা দিকের বিপরীত কাঠটি ছিল মোটা থেকে সরু হওয়া অংশ। প্রতিটি ট্যাবলেট একবারে খাপে বসে নিখুঁতভাবে মিশে ছিল একে অপরের সঙ্গে। প্রতিটি কাঠে সিল করার জায়গা নির্দিষ্ট। সুতো বাঁধার ধরনও এক। একটি ফাঁসের ভেতর দিয়ে গিয়ে সমান্তরাল ও অনুভূমিক বাঁধনের সমন্বয়। এমনভাবে বাঁধা হত যে নথি খুলে আলগা হয়ে যাবার কোনো সম্ভাবনা থাকত না। একটি কাঠের সিল-সকেট খুলে গেছিল। যদিও মাটির সিলের-ছাপ অক্ষত ছিল।

সবকিছুর বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এই সিলমোহরগুলো সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়। আমার বন্ধু মিঃ এফ. এইচ. অ্যান্ড্রুজ লন্ডনে সিলমোহরের নমুনা দেখে তা ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ভালোভাবে প্রদর্শনের জন্য। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিলমোহরগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ঘরানা সম্পূর্ণই পাশ্চাত্য ধ্রুপদি শিল্পকলা। সিলমোহরে গ্রীক দেবী অ্যাথেনা (Pallas Athene) ও বজ্রপাতের ছাপ। সুদূর ইউরোপ থেকে মরু খোটানে ধ্রুপদি গ্রিক ছবির আবির্ভাব কী করে হয়েছিল! অনেক নথিতে এই সিলমোহরের ছাপ ছিল যা দেখে মনে হয়, এই ছাপ প্রাচীন বসতির কোনো কর্মকর্তা ব্যবহার করতেন। আর একটি বড়োসড়ো সিলমোহরে ছিল বসে থাকা নগ্ন এক দেবশিশুর, সম্ভবত এরোসের রূপরেখা। ছিল দাঁড়িয়ে থাকা এরোস, আরেকটি অ্যাথেনা, ও হেরাক্লেসের ছাপ। অন্যান্য সিলগুলোতে ছিল অনেক ধ্রুপদি ছাঁদের পুরুষ ও মহিলাদের মুখের ছাপ, যদিও সেসব মুখ বারবারিয়ান ধাঁচের।
ইয়োটকানের ধ্বংসাবশেষে এই ধরনের পাথরে খোদাই মূর্তি পাওয়া গেছে, কিন্তু এটা বলা অসম্ভব যে এগুলো খোটানেই তৈরি হয়েছিল, না সুদূর এশিয়ার পশ্চিমের কোনো অংশ থেকে আনা হয়েছিল গ্রিক ধ্রুপদি ঘরানার এই শিল্প। কারা বা কোন অঞ্চলবাসীদের এই সিলমোহর প্রয়োজন পড়েছিল বলা সম্ভব নয়, কিন্তু এই বসতের আশেপাশে বা খোটানের সাম্রাজ্যের মধ্যে যে এই সিলমোহর ব্যবহার হত তা নিশ্চিত। আমরা শুধু মোহরকৃত ছাপগুলো দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু যা থেকে ছাপ তৈরি হত অর্থাৎ ছাঁচ পাইনি। পেলে হয়তো আরও কিছু জানা সম্ভব হত। ব্যাক্ট্রিয়া হয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে পাশ্চাত্য ধ্রুপদি শিল্পকলার উপস্থিতি অনেক আগেই হয়েছে, কিন্তু পশ্চিম ইউরোপ আর পিকিংয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলেও যে প্রাচীনকালে এদের উপস্থিতি ছিল তা ভাবতে মানসিকভাবে তৈরি ছিলাম না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন