ত্রিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

আক-সিপিল এবং রাওয়াক স্তূপের ভাস্কর্য

৬ এপ্রিল ইউরুং-কাশেই থেকে গেলাম। সেখানে বসে চটপট করে ছেঁড়া-ফাটা সরঞ্জাম মেরামত করিয়ে, খাবারদাবার-সহ অনান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও মজুর জোগাড়ের কাজ সেরে ফেলতে হয়েছিল। গরম আর বেড়ে চলা ধুলোঝড় বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আর কিছুদিনের মধ্যেই মরুভূমিতে কাজ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্রামের খুব প্রয়োজন হলেও দলের সবাই এটা বুঝে গেছিল যে খোটানের উত্তর-পূর্ব এলাকার প্রাচীন স্থানগুলোতে অনুসন্ধানের কাজ তাড়াতাড়ি শুরু না করতে পারলে কাজটা আর করা হয়ে উঠবে না। দারোগা ইব্রাহিম এখান থেকেই বিদায় নিল। যাওয়ার সময় ওকে পুরস্কৃত করেছিলাম সোনার রুবল দিয়ে। সঙ্গে কেরিয়ার আম্বানের জন্য অনেক ওষুধ দিয়ে দিয়েছিলাম।

আক-সিপিলের পথে

৭ এপ্রিল ভোরবেলা খোটানের উলটোদিকে ইউরুং-কাশের ডান তীর ধরে ‘আক-সিপিল’-এর দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ‘আক-সিপিল’ মানে সাদা দেওয়াল। খোটান থেকে প্রায় পনেরো মাইল মরুর উঁচু বালিয়াড়ির মাঝে জায়গাটা প্রত্ন-শিকারিদের কাছে এই নামেই পরিচিত। যাওয়ার পথে এক গ্রামের ধারের চাষের খেতের প্রান্তে ‘তাম-ওঘিল’ নামের একটি জায়গা ঘুরে দেখেছিলাম। এই জায়গায় অনেক প্রাচীনকালের জিনিসপত্র যেমন টেরাকোটার নানা সামগ্রী, মুদ্রা, সোনার কুচি এইসব মাটির স্তর থেকে পাওয়া গেছে। ঠিক যেমন অবস্থায় পাওয়া গেছিল ইয়োটকানে। এইখানে জলের জোগান কম থাকায় আর খোঁড়াখুঁড়ির পরিণতি সুবিধাজনক ছিল না বলে খুব বেশি খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়নি। তবে বছর কুড়ি আগে সেচ খাল উপচে বন্যার ফলে একটা ছোটো ‘ইয়ার’ বা জলের খাত তৈরি হয়। সেই খাতের মাটির স্তরে সোনা পাওয়া যায়। তারপর থেকে প্রতিবছর গরমকালের এক থেকে দু-মাস সময় বেশ কিছু মানুষ এখানে সোনা খুঁজে বেড়ায়। লক্ষ করলাম যে খাতের দু-পাশের উঁচু হয়ে জমে থাকা উর্বর পলি কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুনলাম, কাছের গ্রামের মানুষেরা এই পলি কেটে নিয়ে চাষের জমিতে ফেলেছে।

চাষের জমির আওতা ছাড়াতেই ছোটো ছোটো বালিয়াড়ির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে থাকা অজস্র প্রাচীন ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরোর ওপর দিয়ে মাইল চারেক এগোতেই শুরু হল উঁচু উঁচু বালিয়াড়ির সাম্রাজ্য। অতীতে গ্রাম ও চাষের জমি যে আরও উত্তরে প্রসারিত ছিল, এই ভাঙা মাটির টুকরোগুলো তার সাক্ষী। ধু-ধু মিহি বালির সমুদ্রের মাঝে মোটা বালি আর নুড়ি-পাথরের উপস্থিতি দেখে অনুমান করে নিতে অসুবিধা হয় না যে এখানে একসময় নদী ছিল। এই নুড়ি-পাথর আর মোটা বালি জলবাহিত।

প্রায় মাইল পাঁচেক উঁচু বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌঁছলাম প্রায় সমতল আক-সিপিলে। এখানে উঁচু বালিয়াড়ি নেই। বালির বুকে জেগে ছোটো ছোটো বাঁধের চিহ্ন।

আক-সিপিল-এ এক প্রাচীন দুর্গের ভগ্নাবশেষ সুস্পষ্ট, বিশেষ করে দুর্গের পাঁচিল আর প্যারাপেটের খানিক অংশ। আমার আগে বেশ কিছু ইউরোপিয় পর্যটক এই ধ্বংসাবশেষ পরিদর্শন করেছেন এবং সে-সম্পর্কে বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য তথ্য এম. দুত্রে দ্য হ্র্যা-এর নোট থেকে এম. গ্রেনার্ড প্রকাশ করেছেন।

জরিপ করে দেখেছিলাম, দুর্গটির ভাঙা পাঁচিলের এক অংশ প্রায় ৩৬০ ফুট লম্বা। পুরো পাঁচিলটা ১,০০০ ফুট ব্যাসের এলাকা জুড়ে বৃত্তাকারে রয়েছে। এন্ডারের মতোই এই পাঁচিলের নীচের অংশ পুরু কাদামাটির তৈরি। বালিমুক্ত জায়গায় পাঁচিল এখনও অক্ষত। উচ্চতায় ১১ ফুট এবং তা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। আট ফুট চওড়া পাঁচিলের মাথার রোদে শুকনো ২০*১৫*৪ ইঞ্চি মাপের ইটে তৈরি প্যারাপেট প্রমাণ করে যে এই পাঁচিল ভীষণ শক্তপোক্ত করে বানানো হয়েছিল। পাঁচিলের গায়ে ভিতের থেকে ৫ ফুট উঁচুতে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর একটা করে ১৬ ইঞ্চি ফোকর, যা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়। প্যারাপেটের দুটি অংশে উভয়দিকে বেরিয়ে থাকা শক্ত ইটে তৈরি ধাপ কাটা তিন ফুট উঁচু মাচা অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল। সম্ভবত এগুলো ছিল ওয়াচ টাওয়ার।

পুরো অঞ্চলটা ঘুরে দেখেছিলাম, দুর্গের উত্তরদিকের অল্প অংশ ছাড়া কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। দুর্গের ভেতরে একসময় ঘরবাড়ি ছিল নিশ্চিত, কিন্তু প্রবল হাওয়ায় সব ক্ষয়ে গিয়ে বালিতে মিশে গেছে। ইতিমধ্যে আশেপাশের কিছু বালি টিলার মাঝের সমতল অংশে প্রত্ন-শিকারিরা খুঁজে পেয়েছে হান আমলের মুদ্রা, সিলমোহর-সহ নানা প্রাচীন সামগ্রী। এইসব নমুনা আগেই আমার হাতে এসেছিল।

রাওয়াক স্তূপ আবিষ্কার

তুর্দি এখান থেকে আমাকে নিয়ে গেছিল মাইল দেড়েক দক্ষিণ-পশ্চিমে এক নীচু ঢিবির কাছে। ধন-সন্ধানীদের খোঁড়াখুঁড়ির ছাপ স্পষ্ট। একটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া বৌদ্ধমন্দির। ধন-সন্ধানীদের খোঁড়াখুঁড়ির ফলে বালির ওপর ছড়িয়ে ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরের পলেস্তারা, স্টাকোর টুকরো আর পচা কাঠ। স্টাকোর টুকরোগুলো হাতে নিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, মন্দিরের গায়ের মূর্তির শৈলী আর অলংকরণ দান্দান-উইলিক বা এন্ডারের তুলনায় অনেক উচ্চমানের, গান্ধার শিল্পের গ্রেকো-বৌদ্ধ ঘরানার সেরা ভাস্কর্যগুলোর মতো।

স্টাকোর টুকরোগুলো শক্ত হলেও তাতে মাকড়সার জালের মতো চিড় ধরে ছিল। জায়গায় জায়গায় পোড়া দাগও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। সম্ভবত এই মন্দির আগুন ধরে পুড়ে যাওয়ার ফলে স্টাকোগুলোর এই হাল হয়েছে। সত্যিই আগুন লাগার ফলে স্টাকোগুলো এই অবস্থা হয়েছে কি না তা একমাত্র সেরামিক বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। প্রত্ন-শিকারিরা এই জায়গাকে বলে ‘কিঘিল্লিক’। ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরের কাছে প্রায় ৭০ ফুট * ৫০ ফুট জায়গা জুড়ে কোনো সময় স্তূপ করে রাখা সম্ভবত ঘোড়ার মল শুকিয়ে সার (কিঘিক) হয়ে আছে। এই কিঘিক থেকেই এই জায়গার নাম কিঘিল্লিক। সারের স্তূপের পাশ ঘেঁষে প্রত্ন-শিকারিদের খোঁড়া সুড়ঙ্গের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে। এছাড়াও হাড়ের টুকরো, পোড়া কয়লা, জ্বালানীর টুকরোটাকরা চোখে পড়ল।

১০ এপ্রিল আক-সিপিল থেকে সকালবেলা রওনা দিয়ে মোটা ধূসর বালির টিলা আর নুড়িভরা ‘সাই’ বা পাথুরে মরুপথ ধরে প্রায় চোদ্দ মাইল পার হয়ে সন্ধেবেলা পৌঁছেছিলাম রাওয়াক, যাকে তুর্দি আর তার ‘প্রত্নশিকারী’ বন্ধুরা ‘উঁচু প্রাসাদ’ বলে ডাকে। তখনও জানতাম না যে কী ঐশ্বর্য অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য!

তুর্দি আগে থাকতেই বলেছিল যে এখানে একটা পুরোনো বাড়ি বালিতে অর্ধেক চাপা পড়ে আছে। কিন্তু আমি ধ্বংসস্তূপে পৌঁছেই বুঝেছিলাম এটি শুধুমাত্র পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটি বিশাল প্রাসাদের অংশই নয়, এর মধ্যে একটা বড়ো স্তূপও রয়েছে। খোটান অঞ্চলে এখনও পর্যন্ত যা দেখেছি এটি তার মধ্যে সবচাইতে ভালো অবস্থায় আছে। ২৫ ফুটেরও বেশি উঁচু বালি টিলা পাঁচিলঘেরা অংশের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্বদিকের দখল নিয়েছে। বালির তলায় চাপা পড়ে স্তূপের ভিত্তির অনেকটা অংশ। স্তূপের দক্ষিণদিকে বালি কম জমার ফলে ভিতের বেশ খানিকটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। পাঁচিলের দক্ষিণ কোণের কাছে প্রত্ন-শিকারিদের লুণ্ঠনের নিশান হয়ে বিশাল স্টাকো মূর্তির মাথাগুলো টুকরোটুকরো হয়ে বালির ওপর পড়ে ছিল। আমি এই মূর্তি দেখেই বুঝে গেছিলাম, এখানে খননের পরিসর বড়ো হবে, সেইমতো সঙ্গে সঙ্গে আরও মজুর জোগাড় করে নিয়ে আসার হুকুম দিয়েছিলাম। আমার সৌভাগ্য, ধ্বংসস্তূপের কাছাকাছি মরূদ্যান শহর ও গ্রাম থাকাতে মজুর পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। কাছের গ্রাম জিয়া থেকেই বেশ কিছু মজুর জোগাড় হয়ে গেছিল।

এবারে এই বিশাল দলের জন্য জলের ব্যবস্থা করাই আমার চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল। তবে মজুরের দলই ধ্বংসস্তূপের দুই মাইল মতো দূরে বালির টিলার মধ্যে একটা কুয়ো খুঁড়ে জলের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। তাদের ক্যাম্প করা হল ওই কুয়োর পাশে। রাওয়াক থেকে ইউরুং-কাশ নদীর দূরত্ব মাত্র সাত মাইল মতো। জলের উৎস খুব বেশি দূরে না থাকায় সহজেই মাটির নীচের জল পাওয়া সম্ভব হয়েছিল বলে মনে হয়।

বালি-ঝড়ের পুনরাবৃত্তি

বুরান বা মরুঝড়ের সময় শুরু হয়ে গেছিল। প্রতিদিন দুরন্ত গতিতে উড়ে চলা হালকা বালি নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছিল। লক্ষ করে দেখেছি, প্রতিদিন বাতাস বওয়া শুরু হয় আগের দিনের উলটোদিক থেকে। সকাল এবং সন্ধেতে ঝড়ের গতি থাকে সবচাইতে বেশি যা তাকলামাকানের বৈশিষ্ট্য। স্থানীয় অধিবাসীরা এটা ভালো জানে, ফলে আগামীকাল কোন দিক থেকে হাওয়া বইবে সে-সম্পর্কে তারা প্রস্তুত হয়ে যায়। আমার আগে যেসব পর্যটক তাকলামাকান ভ্রমণ করেছেন, তাঁরাও এই বিষয়ে একই কথা বলে গেছেন।

ক্রমাগত বালির ঝাপটা আর দিনের প্রচণ্ড গরম খননের কাজকে অস্বস্তিকর করে তুলছিল। চকচকে হলদে ধূলিকণায় সূর্যের আলো পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। সূর্য অস্ত যেতেই দ্রুত ঠান্ডা নেমে আসছিল। আবহাওয়ার চূড়ান্ত তারতম্যের ফলে দলের সবাই জ্বর-কাশিতে ভুগতে শুরু করেছিল। সত্যি বলতে কী, ইউরুং-কাশ পার হয়ে আসার পর থেকেই শুরু হয়েছিল রোগের উপদ্রব। প্রতিকূল বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব এড়ানো সম্ভব ছিল না, কিন্তু কুইনাইনের ডোজে কাজ হচ্ছিল।

স্তূপ প্রাঙ্গণ খনন

১১ এপ্রিল পাঁচিলঘেরা অংশের দক্ষিণ কোণে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করার পরপরই টের পেয়েছিলাম স্তূপের দেওয়ালের গায়ে সারি দেয়া বিশাল আকৃতির স্টাকো মূর্তি অনেকটাই অক্ষত অবস্থায় আছে। প্রায় সাত ফুট গভীর বালির তলায় চাপা পড়ে থাকার জন্য মূর্তিগুলোর প্রাকৃতিক সংরক্ষণ ভালোভাবেই হয়েছে। বুঝতে পেরেছিলাম, এই ভাস্কর্যগুলোকে অবিকৃত অবস্থায় পেতে খনন চালাতে হবে নিখুঁত পদ্ধতিতে। প্রথমেই দেওয়ালের পাশ থেকে বালি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে যার জন্য প্রচুর লোকবল দরকার। চেয়ে পাঠানো অতিরিক্ত লোকজন এসে না পৌঁছানোয় আমি সঙ্গে থাকা ডজন খানেক লোককে লাগিয়ে দিয়েছিলাম কাঠামোগত জরিপের কাজের জন্য দেওয়ালের ধার ঘেঁষে অল্প অল্প করে বালি সরাতে।

পাঁচিলঘেরা অংশের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব কোণের স্তূপ ঘিরে প্রাথমিক জরিপ করার পর দেখা গেল এটি লম্বায় ১৬৪ ফুট ও ১৪৩ ফুট চওড়া, রোদে শুকনো ইটের ৩ ফুট চওড়া ও ১১ ফুট উঁচু পাঁচিলের ভেতর আলাদা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সম্ভবত পাঁচিলের উচ্চতা আরও বেশিই ছিল কোনো এক সময়। স্তূপটি ভিত থেকে দুটো সমভুজ ধাপে ওপরে উঠেছে। প্রতিটি ধাপ প্রায় ২০ ফুট করে উঁচু। নীচের ধাপটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৫০ ফুট।

বৃত্তাকার ড্রামের আকারের শুকনো ইটে তৈরি স্তূপের গম্বুজটির উচ্চতা ছিল ৩২ ফুটের ওপরে। ৭১ ফুট ব্যাসের এই গম্বুজের ভেতরে সম্ভবত একটি ঘর ছিল। কিন্তু সত্যি ছিল কি না তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি কারণ, গম্বুজের পশ্চিমদিকের অর্ধেক অংশ পুরোপুরি ভাঙা ছিল। ভাঙা ছিল গম্বুজের মাথাটিও। সম্ভবত ধন-সন্ধানীদের খোঁড়াখুঁড়ির শিকার। ঝড়ের ঝাপটাও ধ্বংসের কারণ হতে পারে। ফলে গম্বুজের সঠিক উচ্চতা মাপা সম্ভব হয়নি। লক্ষণীয় বিষয় হল, গম্বুজের পাদদেশ পর্যন্ত দুটি ধাপ খাড়া উঠে গিয়েছিল।

সময় কম পাওয়া যাবে বলে স্তূপঘেরা পাঁচিলের দক্ষিণ-পূর্বদিকের প্রবেশদ্বারের দিকের অংশটি সম্পূর্ণ বালি-মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভিতের পাদদেশ থেকে স্তূপের দেওয়াল সাদা রঙের স্টাকো মূর্তিতে ভরতি ছিল। সম্ভবত স্তূপের চারদিকও একইভাবে নানা ছাঁচের মূর্তিতে সজ্জিত ছিল। একটি ছাঁচের মূর্তির পলেস্তারার আস্তরণে আটকে থাকা চারটি হান আমলের তামার মুদ্রা (সম্ভবত ভক্তের অর্ঘ্য) পেয়েছিলাম, যা আমাকে এই কাঠামোগুলোর সময়কালের আভাস পেতে সাহায্য করেছিল।

বিশালাকৃতির সব মূর্তির সন্ধান

১২ এপ্রিল ইউরুং-কাশের বেগ নতুন শ্রমিকের একটি দল পাঠাতেই পদ্ধতি মেনে খননের কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। জানতাম স্তূপে নয়, মহান ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে স্তূপঘেরা দেওয়ালের গায়ে। দেওয়ালের গায়ের অতি প্রাচীন ভাস্কর্য যাতে খোঁড়াখুঁড়ির করতে গিয়ে ভেঙে না যায়, তাই দেওয়াল-ঘেঁষা বালি তুলে একটা চওড়া খাল খোঁড়ানো শুরু করেছিলাম। তাছাড়া ছবি তোলার জন্য মূর্তির সামনে অনেকটা খালি জায়গারও প্রয়োজন ছিল।

দেওয়াল-ঘেঁষা বালি পরিষ্কার করা শুরু হবার খানিক পরপরই বালি থেকে একটু একটু করে জেগে উঠতে শুরু করেছিল দেওয়ালজোড়া বিভিন্ন ভঙ্গিমায় পরিকল্পিতভাবে গড়া বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বদের বিশাল স্টাকো মূর্তিগুলো। বড়ো মূর্তিগুলোর মাঝে নানা দেবতা ও সন্তদের ছোটো ছোটো মূর্তি। অধিকাংশ মূর্তির মাথার পেছনে জ্যোতির্বলয়। সেই সঙ্গে দেওয়ালের বিভিন্ন অংশে রঙিন ফ্রেস্কো চিত্রাবলি। রিলিভোর পুরো কাজটি রঙিন ছিল, কিন্তু বালির তলায় থাকতে থাকতে অধিকাংশ জায়গার রঙ চটে গিয়েছিল। মূলত টিকে ছিল তলার টেরাকোটা রঙ।

খননকার্যের ঝুঁকি

প্রথম থেকেই খোঁড়াখুঁড়ির কাজ অতি সাবধানে করতে হচ্ছিল। ৫ ইঞ্চি পুরু বর্গাকার কাঠের বিম দিয়ে মাটি থেকে ৮ ফুট উঁচু সমান মাপের কাঠের খুঁটি দিয়ে তৈরি মূর্তির আভ্যন্তরীণ শক্ত কাঠামো মাটির নীচের আর্দ্রতার কারণে পচে গেছিল সম্পূর্ণরূপে। বালি সরাতেই প্রবল গতিতে বইতে থাকা মরুঝড় বুরানের দাপটে ভেঙে যাওয়া কাঠামো থেকে মূর্তিগুলো উলটে পড়ে যাচ্ছিল। ফলে ক্ষতি এড়াতে কোনোরকমে মূর্তিগুলোর গা থেকে বালি পরিষ্কার করে ছবি তুলেই আবার সেগুলোকে অর্ধেক বালি চাপা দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। যতক্ষণ ছবি তোলার কাজ শেষ না হয় ততক্ষণ শ্রমিকেরা মূর্তিগুলোকে হয় হাত দিয়ে, না-হয় বালির ওপর থেকে দড়ি বেঁধে টেনে ধরে রাখছিল।

সন্দেহ নেই অধিকাংশ উঁচু মূর্তিগুলোর ওপরের অংশ ভেঙে গিয়েছিল পচনের ফলে কাঠের কাঠামোগুলো দীর্ঘদিন ভার ধরে রাখতে না পারায়। তাছাড়া বালির ওপরের অংশ সরাসরি বাতাসের সংস্পর্শে ছিল অনেক বেশি সময় ধরে। ফলে তা বালি-সংরক্ষণের সুবিধা খুব বেশি সময় ধরে পায়নি। ছোটো মূর্তিগুলো পাওয়া গেছিল প্রায় অক্ষত অবস্থায়। সম্ভবত ধন-সন্ধানীরা এই ধ্বংসস্তূপে সেরকমভাবে আঘাত হানেনি, অন্তত তার কোনো প্রমাণ আমি পাইনি। খোঁড়াখুঁড়ি তারা যা করেছিল তা পাঁচিলের বাইরে বালির ওপরের অংশ। আমার ধারণা, এই অঞ্চলটি খোটানে ইসলাম ধর্ম আসবার আগেই পরিত্যক্ত হয়ে বালিতে ঢাকা পড়ে গেছিল।

সম্ভবত এই মূর্তিগুলোকে রক্ষা করার জন্য দরদালানের ওপর কাঠের আচ্ছাদন ছিল। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তবে এই অঞ্চলে বালির আক্রমণ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরটি পরিত্যাগের আগে তা খুব সুচারুভাবে খুলে নেওয়া হয়েছিল। আমার এই ধারণার কারণ, খোঁড়ার সময় পাঁচিলের দক্ষিণ-পূর্বদিকে পাওয়া কাঠের পাটাতনের অংশের কিছু টুকরো। বর্তমান তুর্কিস্তানে বাড়ি তৈরির জন্য কাঠের মূল্য বিবেচনা করলে মন্দিরের দেখভালকারীদের মন্দির ছেড়ে যাওয়ার আগে অন্যতম প্রয়োজনীয় বস্তুটি সঙ্গে নিয়ে যাবার ধারণা অস্বীকার করা যায় না।

দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পূর্ব দেওয়ালের পরিষ্কার করা অংশ বরাবর বিরাট আকারের মূর্তির সংখ্যা ছিল একানব্বইটা। এছাড়াও অনেকগুলো ছোটো ছোটো মূর্তি ও অলংকরণ ছিল বড়ো বড়ো মূর্তিগুলোর ফাঁকে। সমস্ত মূর্তির বিশদ মাপ ও বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছিল যথাযথভাবে। এছাড়াও প্রায় তিনশো ফুট দেওয়ালজোড়া সব মূর্তিগুলোর ছবিও তুলেছিলাম সিরিজ হিসেবে। রাম সিং আর তুর্দির সক্রিয় সাহায্য ছাড়া ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত বালি সরিয়ে খোঁড়া খালের মধ্যে নেমে নিখুঁতভাবে কাজটা করা সহজ ছিল না। ভ্যাপসা গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। উড়ন্ত মিহি বালি চোখে-মুখে ঢুকে নাজেহাল করে ছেড়েছিল। উড়ে আসা বালি আজও নোটবুকে জমে আছে।

যেসব প্রাচীন ভাস্কর্য রাওয়াকে পাওয়া গেছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। এর বিস্তারিত বিবরণ আমার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ছবি-সহ লিপিবদ্ধ করেছি।

এদের মধ্যে মন্দিরের দক্ষিণ কোণের ভেতরের দক্ষিণ-পশ্চিমের দেওয়ালে পড়ে থাকা মূর্তির অবশিষ্টাংশের মধ্যে উপবিষ্ট বুদ্ধদেবের চমৎকার এক মূর্তি, পেছনের ছবির দন্ডায়মান বুদ্ধের পেছনে বিস্তারিত জ্যোতির্বলয়, তার মধ্যে শিক্ষা দানের ভঙ্গিমায় বোধিসত্ব আর অর্হতের অজস্র ছবি বিশেষ প্রশংসা দাবী করে। উপবিষ্ট বুদ্ধের সামনের তিন ফুট অংশের কারুকার্য ভাস্কর্যের উচ্চ মানের ইঙ্গিত দেয়। একটি মনুষ্যপ্রমাণ মাপের বোধিসত্ব মূর্তির গায়ে পোশাকের পারিপাট্য, তলার দিকের বস্ত্রের নিপুণ বস্ত্রসজ্জা, বাহুতে আর বুকের ওপরে সযত্নে রচিত রত্নমালিকা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। রত্ন মালিকার স্টাইল ও সাজানোর রীতি, ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে পাওয়া গ্রেকো-বৌদ্ধ স্থাপত্যের সঙ্গে মিলে যায়।

দক্ষিণ পুবের দেয়ালের রিলিফমূর্তিগুলোর জমকালো পোশাকের সযত্ন নির্মাণ, তাদের হাত ও মাথার সুষম মাপ সহজেই নজর কাড়ে। দক্ষিণ কোণের বাইরের দেয়ালের গায়ে অতিকায় চেহারার একগুচ্ছ মূর্তি রয়েছে। একেবারে দক্ষিণের মূর্তিগুলোর কাঁধ প্রায় আট ফুট উঁচু। এই মূর্তিগুলোকে বালি থেকে পুরোপুরি খুঁড়ে বের করা সম্ভব হয়নি। আসলে এদের পায়ের নীচের অংশ থেকে বিপুল বালির স্তূপের ঠেকনা সরিয়ে নিলে ভারী উর্ধ্বাঙ্গগুলো উলটে পড়বার পড়বার ভয় ছিল। স্থাপত্যের সামনের দিকে একটা গলির বাইরের দিকের দেয়ালের ভগ্নাবশেষ চোখে পড়ে। দেয়ালটার দু’দিকই অলঙ্কৃত। এর গায়ের রিলিফমূর্তিগুলো সম্ভবত পরবর্তীকালের সংযোজন। এদের মাথা ঘিরে জ্যোতির্বলয়গুলোয় সূক্ষ্ম কারুকাজের চিহ্ন। তবে দেয়ালটা পাতলা হওয়ায় এবং কোনো আবরণ না থাকায় কাজগুলো বড়ো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দক্ষিণ-পুবের দেয়ালের দিকটায়, বড়ো মূর্তিগুলোর পায়ের কাছে কিছু ছোটো ছোটো বুদ্ধমূর্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। এরা অধিকাংশই আসলগুলোর প্রতিমূর্তি। কেউ ধ্যানরত, কেউ বা উপদেশ দেবার ভঙ্গীতে রয়েছেন।

অপূর্ব ভাস্কর্য সম্পদ ও অদ্ভুত বিশ্বাস

স্তূপ প্রাঙ্গণে ঢোকার দরজার দু-পাশে বিশাল আকারের ধর্ম-সম্পর্কীত নয় এমন দুই মূর্তি ছিল, যাদের দেহের ওপরের অংশ ভেঙে গেলেও কয়েকটা টুকরো উদ্ধার করা গেছিল। সন্দেহ নেই, মূর্তি দুটো ছিল মন্দিরের ‘দ্বারপাল’ বা দ্বাররক্ষকদের, যা ভারতীয় ঘরানার প্রায় অধিকাংশ উপাসনালয়ে দেখা যায়, তা সে মানুষ বা পৌরাণিক কাহিনির চরিত্র যাই হোক না কেন। রাওয়াক স্তূপের বৌদ্ধ উপাসনালয়ের দুই দ্বাররক্ষকের মূর্তি দুটো সম্ভবত ছিল যক্ষের, যা এক শ্রেণির পরিচর্যাকারী দেবতা। মূর্তি দুটির পোশাক ছিল সম্ভবত যখন এই মন্দির নির্মিত হয় সেই সময়কালের ও স্থানীয় ঘরানার। দ্বাররক্ষকের পায়ের বুটজুতোর ওপরের অংশটি ছিল চওড়া ও পায়ের গোছের কাছে ঢিলে ও গাঢ় লাল রঙের বর্ডার দেওয়া, যে রঙ বহুযুগ পরেও সমান উজ্জ্বল। বুটের ওপরের অংশে ছিল ফুলে থাকা ট্রাউজার যা কোমরের নীচ পর্যন্ত ঝোলা কোট দিয়ে ঢাকা ছিল। কোটের কিনারাগুলো ছিল সূক্ষ্ম সূচিকর্মের মতো কাজে ভরা। একটি বিশাল মূর্তির বাঁ-হাঁটুতে এক সময়ে সোনার পাত লাগানো ছিল। হিউয়েন-সাঙ পি-মো প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এখানকার মানুষ বিশ্বাস করে যে, ব্যথা কমাতে আন্তরিক চিত্তে প্রার্থনা করে রোগগ্রস্ত অংশ সোনার পাত দিয়ে মুড়ে রাখলে ব্যথার উপশম হয়।’ এই মূর্তির হাঁটুতে লেগে থাকা সোনার পাতের অবশিষ্টাংশগুলো দেখে আন্দাজ করা যায় যে হাঁটুর ব্যথা কমানোর বিশেষ ক্ষমতার জন্য এটি প্রসিদ্ধ ছিল।

গ্রেকো-বৌদ্ধ শিল্প সম্প্রীতি

সবচাইতে আকর্ষণীয় আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাওয়াকের মূর্তিগুলোর সঙ্গে পেশোয়ার উপত্যকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের গ্রেকো-বৌদ্ধ ভাস্কর্যের মিল (গন্ধার শিল্পরীতি- সম্পা)। এই ধ্রুপদি শিল্পকলা বা ভাস্কর্য-রীতি যে সরাসরি সিন্ধু উপত্যকা অথবা ব্যাক্ট্রিয়া অঞ্চল থেকে এসে সেই যুগে খোটানে বিকাশ লাভ করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এইসব ভাস্কর্যের অধ্যয়ন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে। আশা করি আমার তোলা ছবিগুলো এই বিষয়ে গবেষণাকারীদের সহায়ক হবে।

ভারতীয় গ্রেকো-বৌদ্ধ কালানুক্রম নির্ধারণের নিরিখে আমাদের হাতে তথ্য এতই কম যে তা থেকে রাওয়াকের ভাস্কর্যের (রিলিভো) কাল অনুমান করা কঠিন। ধ্বংসাবশেষ থেকে আমরা এমন কোনো এপিগ্রাফিক নমুনাও পাইনি যা থেকে এই স্তূপ বা মন্দিরের সময়কাল সম্পর্কে কোনো আলোকপাত সম্ভব। যদিও আমি এমন কিছু মুদ্রা পেয়েছিলাম যা থেকে সময়কাল সম্পর্কে খানিক ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। স্তূপের নীচে, বিভিন্ন মূর্তির পাদবেদি ও মন্দির প্রবেশদ্বারের কাছের পাঁচিলের গায়ের একটি কাঠের গেট পরিষ্কার করে পরীক্ষা করার সময় কিছু ‘উ-চু’ চিহ্ন দেওয়া তামার মুদ্রা পাওয়া গেছিল যা হান রাজবংশের সময়কালীন। এই মুদ্রাগুলো মূর্তির পায়ের কাছে বা প্লাস্টার ও ইটের ফাঁকফোকরে পাওয়া গেছিল। সম্ভবত এগুলো অর্ঘ্য হিসেবে রাখা হয়েছিল। খননের সময় পাঁচিলঘেরা দক্ষিণ অংশের ভেতরের দিকে কাঠ দিয়ে ঘেরা একটি আট বর্গফুট মূর্তিহীন পাদবেদির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে একই ধরণের মুদ্রা পাই।

প্রায় শ-খানেক মুদ্রা সংগৃহীত হয়েছিল। মুদ্রাগুলোতে কোনো বিকৃতির চিহ্ন বা হাত-বদলের চিহ্ন ছিল না, অর্থাৎ মুদ্রাগুলো নতুন অবস্থায় অর্ঘ্য হিসেবে জমা করা হয়েছিল। হান রাজবংশের (Eastern Han) শাসনকাল ২৫-২২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চালু থাকলেও এই মুদ্রা সচল ছিল প্রায় চতুর্থ খ্রিস্টাব্দেও। ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া এইসব প্রত্নসামগ্রী থেকে তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, এই স্তূপের স্থাপনাকাল ইমাম জাফর সাদিক ছাড়িয়ে যেসব প্রাচীন জনবসতির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, তাদের কাছাকাছি হবে।

রিলিভো স্থানান্তরকরণ

যতই সাবধানতা নেয়া হোক না কেন, সামান্য নাড়াচাড়াতে মূর্তির হাত, অলংকরণ ইত্যাদি ভেঙে যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এখান থেকে পাওয়া বড়ো ভারী মূর্তিগুলো গাধা, টাট্টুঘোড়া, উট বা মানুষের পিঠে চাপিয়ে হাজার হাজার মাইল পাহাড়-মরু টপকে সে ভারত বা ইউরোপ কোনো জায়গাতেই স্থানান্তরকরণ সম্ভব হবে না। এছাড়াও এই ধরনের ভাস্কর্য সঠিকভাবে বয়ে নিয়ে যেতে কফিনের মতো বাক্স লাগে, যা জোগাড় করার সময় বা সম্ভাবনা ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, খনন করে পাওয়া সব মূর্তি ছবি তোলার পর তার বিস্তারিত বিবরণ লিখে সেগুলো পুনরায় সযত্নে বালি সমাধিতে পাঠিয়ে দেব। যতদিন না খোটানে সংগ্রহশালা গড়ে উঠছে (কবে তা হবে জানি না) ততদিন এই অমূল্য ভাস্কর্যগুলো এখানে নিরাপদে থাকবে। খুব খুশি হয়েছিলাম যে মূর্তির কিছু ভাঙা অংশ, মাথা ও অলংকরণ যা অতি যত্নে মুড়ে ও প্রচুর পরিশ্রম করে প্রায় ছ’হাজার মাইল পথ উট, টাট্টুঘোড়া, গাধা, মানুষ, স্টিমার, রেলওয়েতে চাপিয়ে লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল, তা শেষ অবধি নিরাপদেই পৌঁছেছিল।

১৮ এপ্রিল স্তূপের আশেপাশে বালি টিলার নীচে চাপা না পড়া অংশে অনুসন্ধান চালিয়ে এখানে ওখানে কিছু ভাঙা মাটির পাত্র ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাইনি। এই ধ্বংসস্তূপে বসতি-সহ অন্য উপস্থিতির খোঁজ চালাতে কয়েক মাস সময়, প্রচুর লোকবল ও অর্থের প্রয়োজন, যার কোনোটাই আর আমার কাছে আর অবশিষ্ট ছিল না। তাছাড়া তাপমাত্রা ও বালি-ঝড়ের বেড়ে চলা দাপট মরুভূমিতে আর কাজ করতে দিচ্ছিল না। ধ্বংসাবশেষ ছেড়ে যাবার আগে বালি খুঁড়ে গড়ে তোলা খাল আবার বালি ফেলে ভরাট করে দিলাম। খনন করে উদ্ধার করা বিশাল মূর্তিগুলো চোখের সামনে সমাধিস্থ হচ্ছিল একে একে। বহু শতাব্দী প্রাচীন পূর্বপুরুষদের গড়া শিল্পকলা যাকে মরুভূমির বালি এতদিন গোপনে লুকিয়ে রেখেছিল, তারা ফের ফিরে যাচ্ছিল বালির সেই নিরাপদ আশ্রয়ে।

রাওয়াক থেকেই গেছিলাম মাইল চারেক উত্তর-পূর্বের আর এক ধ্বংসস্তূপ ‘জুম্বে-কুম’-এ। খোটান মরুর চৌহদ্দির মধ্যে আমার জানা শেষ ধ্বংসাবশেষ। গিয়ে বুঝেছিলাম, প্রত্ন-শিকারিরা খোঁড়ার জন্য আর কিছু অবশিষ্ট রাখেনি এই ধ্বংসস্তূপে।

১৯ এপ্রিল খোটানের উদ্দেশে রওনা হবার আগে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম যে তাকলামাকানের বুকে আমার অনুসন্ধানের কাজ শেষ হয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%