দশম অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

ইয়ারখন্দ ও কারঘালিক

১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় মাইল আঠারো পথ পার হয়ে কোক-রোবাত থেকে আমরা পৌঁছলাম ইয়ারখন্দে। আগের দিনের পথের দৃশ্যের তুলনায় এ যেন স্বর্গ। পথের দু-পাশে উর্বর জমি আর সবুজের ঢল নেমে আছে। মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকলেও ছোটোবড়ো সেচ খাল দিয়ে জল ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সর্বত্র। রাস্তার দু-পাশে লম্বা পপলার আর উইলো গাছের সার।

তোগুচাক গ্রামের আগে এবং পরের কয়েক মাইল রাস্তা গিয়েছে ইয়ারখন্দ নদী থেকে আসা খালের পাশ দিয়ে। পুরো অঞ্চলটাকেই সেচ খালের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। একটি ঊষর বালুভূমিকে সবুজ করে তোলা সম্ভব হয়েছে শ্রমিকদের আন্তরিক কঠোর পরিশ্রমে। মাঝে মাঝে খানিক গুল্ম জড়িয়ে বালির টিলাগুলো রয়ে গেছে স্বমহিমায়। কিন্তু সেগুলোকে ঘিরে ধাপ কেটে তৈরি হয়েছে চাষের খেত। শুনলাম সেচের দৌলতে এ-বছর প্রচুর গমের ফলন হয়েছে। সেচ খালের পরিকল্পনা যে অত্যন্ত সফল হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মূল খাল থেকে কেটে বের করা নালাগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িত। যখন যেখানে প্রয়োজন সেখানে বাঁধ দিয়ে জল ঘুরিয়ে দেওয়া যায় অভীষ্ট লক্ষ্যে। পুরো পরিকল্পনা রূপায়ণের দায়িত্বে ছিলেন ইয়ারখন্দের তৎকালীন আম্বান লিউ-ডারিন। অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একটা জটিল উৎপাদনশীল কাজ সম্পন্নে তিনি সফল। দারুণ কৃতিত্বপূর্ণ কাজ। পাশাপাশি এটাও সত্য, এই কাজ করতে যাদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছিল তাদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। পুরোপুরি ‘বেগার’ শ্রমিক হিসেবে কাজ করানো হয়েছিল। তবে শ্রমের বিনিময়ে কোনো অর্থ না দেওয়া হলেও অঞ্চলের যে ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল তার কৃতিত্ব কোনোভাবেই কম নয়। যেসব চাষিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল তারা সবাই জানিয়েছিল, একরকম জোর করে তাদের দিয়ে বেগার খাটানো হয়েছিল, কিন্তু বিনিময়ে তারা যে জমিকে চাষযোগ্য করতে পেরেছে তাতে তারা অন্তর থেকে আনন্দিত। এককালীন অর্থের পরিবর্তে প্রজন্মের পর প্রজন্মের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে কিছুদিনের বেগার শ্রম। কাশ্মীরের চাষিদের ব্যাপারটা মনে পড়ল, সেখানেও টাকাপয়সার বদলে, জুতোপেটায় কাজ বেশি হয়। উন্নয়নের কাজে তুর্কিস্তানের লোকজনের জন্যেও এই জবরদস্তিই একমাত্র দাওয়াই।

শহর থেকে মাইল তিনেক আগে ওপা নামের এক জায়গায় ইয়ারখন্দ নদী পার হবার পর একদল ভারতীয় ব্যবসায়ীকে দেখতে পেয়েছিলাম। ওরা আমারই অপেক্ষায় ছিল। মিঃ ম্যাকার্টনি দ্বারা নিযুক্ত ‘নিউজ রাইটার’ মুন্সি বুনিয়াদ আলির নেতৃত্বে ওরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিল আমাকে শহরে নিয়ে যাবে বলে। বলতে গেলে ওই অঞ্চলের সমস্ত ভারতীয়রাই উপস্থিত ছিল সেখানে। তবে পাঞ্জাবের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বেশ কিছুদিন হল লাদাখে গেছে মালপত্র আনার জন্য, তারা এখনও এসে পৌঁছতে পারেনি। অধিকাংশই পাঞ্জাবের পরিশ্রমী ‘ক্ষত্রি’ সম্প্রদায়ের লোক। এ ছাড়াও জম্মুর কিছু মানুষ, কিছু কাশ্মীরী মুসলমান। তারা এখানে রীতিমতো উপনিবেশ বানিয়ে নিয়েছে। আমি খুব খুশি হলাম যখন এরা আমাকে দেশবাসী ‘সাহেব’ হিসেবে সম্ভাষণ করল।

প্রত্যেকেই পরিপাটি পোশাক পরে এসেছিল সাহেবকে অভ্যর্থনা জানাতে। তারপরে শোভাযাত্রা করে নিয়ে গেছিল ইয়াঙ্গি-শহর বা নতুন শহরে। পুরোনো বাজারের মধ্যে দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে চলা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা লোকজনের মধ্যে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছিল। শহরটা খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, আর কাশগরের তুলনায় অনেক বেশি মনোরম।

প্রাসাদোপম বাসগৃহ

বাজারের মধ্যে দিয়ে খানিক গিয়ে আমরা ডানদিকে ঘুরে পাঁচিল ঘেরা ‘পুরোনো শহর’কে পাক মেরে পৌঁছেছিলাম শহরতলির এক বাগানে। এখানেও আছে ‘চিনি বাগ’—এক বিশাল পাঁচিলঘেরা প্রাসাদ, যা বর্তমানে ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক প্রতিনিধির কার্যালয় তথা আবাসস্থল। মিঃ ম্যাকার্টনি আগে থেকেই এখানে আমার থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। অনেকগুলো ঘরের পাশ দিয়ে পৌঁছেছিলাম এক বিশাল হলঘরে। লম্বা লম্বা পালিশ করা কাঠের স্তম্ভ সুবিশাল ছাদটাকে ধরে রেখেছে। একসময় এই প্রাসাদ ছিল নিয়াজ হাকিম বেগের। আর এই বিশাল হলঘরটা ছিল ওঁর সভাকক্ষ। পুরো হলঘর জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা গৌরবের চিহ্ন। মেঝে-জোড়া পুরু কার্পেট, দেয়ালভরা নানা কারুকার্য। যদিও সোনালি কাজ করা জালিকাটা পর্দাগুলো-সহ অনেক কিছুই বিবর্ণ হয়ে গেছে, অযত্নের চিহ্ন স্পষ্ট।

ইয়ারখন্দের দিনগুলো অস্বাভাবিক দ্রুততায় কেটে গেছিল। আমি প্রথম থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে ইয়ারখন্দে পাঁচ-ছয় দিন থেকে কিছু পুরোনো নৃতাত্ত্বিক ও শিল্প সামগ্রী সংগ্রহ করব, সঙ্গে অন্যান্য কাজগুলোও সেরে নেব। কিন্তু পরিস্থিতির প্যাঁচে আমাকে অনেক বেশিদিন থেকে যেতে হয়েছিল। কাশগরে নিশ্চিন্ত ছিলাম যে আমার সঙ্গে যে ভারতীয় সরকারি চেকগুলো আছে ইয়ারখন্দে তা ভাঙিয়ে আমার আগামী দিনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমার দুর্ভাগ্য, যারা এই বিনিময়ের কাজটা করে থাকে সেই ব্যবসায়ীরা সবাই বেশ কিছুদিন আগেই শহর ছেড়ে লাদাখের পথে পাড়ি দিয়েছিল ব্যাবসার কাজে। আর যেসব ক্ষত্রি ব্যবসায়ীরা এখানে উপস্থিত ছিল, তারাও তাদের পণ্য বিক্রয়ের অর্থ ওই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কোনো উপায় না পেয়ে একজনকে চেকগুলো দিয়ে কাশগর পাঠাতে হয়েছিল আর অপেক্ষা করতে হয়েছিল যতক্ষণ না সে সেগুলোর পরিবর্তে সোনা আর রুপো নিয়ে আসে। সোনা আর রুপোর বিনিময়ে এখান থেকে নগদ পাওয়া গেছিল।

এখানে পৌঁছনোর পর আবিষ্কার করা গেছিল যে দলের দুটো উট আর টাট্টুঘোড়ার পিঠে ঘা হয়েছে। এই ঘা দ্রুত সারানো না গেলে এদের দিয়ে মাল বওয়ানো যাবে না। ভাগ্য ভালো যে সময়মতো বিষয়টা আমার নজরে আনা হয়েছিল। ঘা সারতে কম করেও এক সপ্তাহ সময় দরকার। ঘা গুলো পরিষ্কার করে জন্তুগুলোকে দক্ষিণের এক চারণভূমিতে পাঠানো হয়েছিল যাতে ওরা খানিক বিশ্রাম পেয়ে সেরে উঠতে পারে। সেই চারণভূমিও ছিল ইয়ারখন্দ থেকে একদিনের পথ।

এই অভিজ্ঞতার পর প্রতিদিন পশুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলাম। সঙ্গে যারা পশুগুলোর পিঠে মাল চাপানোর দায়িত্বে ছিল তাদের স্পষ্ট বলে দিয়েছিলাম, জন্তুগুলো যদি তাদের ভুলে জখম হয়, তবে ওই জখম জন্তুদের জায়গায় মাল পরিবহণের জন্য যে অতিরিক্ত পশু ভাড়া করতে হবে, তার খরচ তাদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে। কঠোর হতেই হয়েছিল।

বহুজাতিক দর্শনার্থী

আমার সৌভাগ্য, ইয়ারখন্দে আমার থাকার জায়গাটা এতই বিশাল ছিল যে প্রতিদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা দর্শনার্থীদের সামলাতে কোনো অসুবিধাই হয়নি। ইয়ারখন্দ হল চিনা-তুর্কিস্তানের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছে। ভারত, আফগানিস্তান আর উত্তরের নানা দেশের সঙ্গে যোগাযোগকারী পথগুলো এখানে এসে মিলেছে। বহুজাতিক অবস্থান পরিষ্কার। কাশ্মীরি, গিলগিটিস, বাদাখশানি এবং ভারতের সীমান্ত অঞ্চলের লোকেদের বড়ো বড়ো উপনিবেশ এখানে গড়ে উঠেছে। আর এরা প্রায় সকলেই ‘সাহেব’-এর সঙ্গে একবার দেখা করার জন্য উদগ্রীব ছিল। আমাকে সবার সঙ্গে দেখা করতেই হত। বৃদ্ধ মুন্সি বুনিয়াদ আলি আমাকে এই দেখাসাক্ষাতের বিষয়ে খুব সাহায্য করতেন। অগুনতি লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের ফলে সভাঘরের কার্পেট প্রতিদিন নোংরা হয়ে যেত। যদি এরা সবাই এখানকার বাসিন্দাদের সম্পর্কে যা ধারণা দিয়ে গেল তা ঠিক হয়, তাহলে বলতে হবে ইয়ারখন্দের অভিবাসী জনসংখ্যা অদ্ভুতরকমের মিশ্র। ওয়াখান, শিঘনান, বাদাখশান, ইরানের পশ্চিম অঞ্চলের নানা জনজাতির সংখ্যা প্রচুর। এছাড়া লাদাখ আর কাশ্মীর থেকে আগত বসবাসকারীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এমনকি সুউচ্চ বরফ পাহাড় ডিঙিয়ে বাল্টিস্তান থেকে আসা লোকেরাও উপনিবেশ গড়ে নিয়েছে এখানে। কাজেই নৃতাত্ত্বিক কাজের জন্য রসদের কোনো অভাব নেই এখানে। আমি চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব তথ্য নিংড়ে নিতে।

আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকজনের মুখে কাশ্মীরি, পাঞ্জাবি এবং পুশতু শুনে শুনে আমার বার বার মনে হচ্ছিল আমি সুদূর তুর্কিস্তানে নই, আছি ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কোনো জায়গায়। ইউরোপিয়ান ফ্যাশন এখনও এই অঞ্চলে প্রায় অনুপস্থিত।

তুর্কি অবশ্যই এখানকার স্থানীয় ভাষা। সমস্ত অভিবাসী লোকেরাই একে অপরের সঙ্গে এই ভাষাতেই কথা বলে। সমস্ত জনজাতির লোকেরা নিজেদের জাতের মেয়েকেই বিয়ে করলেও বহুদিন থাকতে থাকতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্ম তাদের মাতৃভাষা ভুলতে চলেছে। কিন্তু তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে যায়নি। এখানকার জনসংখ্যার অধিকাংশই যে বিদেশি, বিশেষ করে ইরানি, তা ইয়ারখন্দের বাজারের মধ্যে খানিক হাঁটলেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়।

মুন্সি বুনিয়াদ আলি আমি যে পুরোনো শিল্পকলা কিনতে চাই তা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছিল। ফলে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাওয়া দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ কিছু ছিল স্থানীয় পুরোনো শিল্পকলা বিক্রি করতে চাওয়া লোকজনও। আমি সেইসব পেতলের অলঙ্কৃত কাজের খোঁজ করছিলাম যা শুধুমাত্র খোটান অঞ্চলেই তৈরি হত। মধ্য এশিয়াতে এর কদর ছিল খুব। অধিকাংশই ছিল সুন্দর সুন্দর ‘আপ্তবাস’, ‘চৌগান’ (চা-পাত্র), ‘চিলাপচিস’ (জলের বেসিন), জগ এবং অন্যান্য ধাতব জিনিসপত্র। কোনো সন্দেহ নেই, একসময় এগুলো কোনো না কোনো ধনী পরিবারের সম্পত্তি ছিল।

প্রাচীন তুর্কিস্তানি শিল্পকর্ম

আমার কাছে আনা জিনিসগুলোর মধ্যে আমি কয়েকটা বেছেছিলাম কেনার জন্য। বেশিরভাগই ছিল ধাতব খোলের ওপর ফুলের নকশাকাটা পাত্র—তাতে পারস্যের প্রভাব স্পষ্ট। তবে হাতের কাজের মুন্সিয়ানা দেখার মতো। এছাড়াও ছিল কিছু মৃৎপাত্র আর সূচিকর্ম। সুদূর প্রাচ্যের প্রাচীন এমব্রয়ডারি কাজের সৌন্দর্য আর বিশেষত্ব জড়িয়ে ছিল ওই মৃৎপাত্র ও সূচিকর্মগুলোর মধ্যে। এছাড়া ছিল কিছু প্রাচীন চিত্র। পুরোনো দিনের ধনী বেগদের তাদের সূক্ষ্ম কাজ করা চৈনিক লাল বা নীল সিল্কের সরকারি পোশাক (‘টোগা’) যে চমৎকার দেখাত তা ছবিগুলোতে খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়েছিল। বিক্রির জন্য আনা প্রাচীন তুর্কোমান এবং খোরাসানের সূক্ষ্ম কাজ করা কার্পেটগুলো প্রমাণ দিচ্ছিল যে পশ্চিম থেকে এই অঞ্চলে জিনিসপত্র আমদানি হত। এইসব জিনিসগুলো প্রমাণ করে, ইয়ারখন্দ এমন একটি জায়গা যেখানে প্রথম থেকেই চিন, ইরান আর তুর্কিস্তানের সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে। আর খোটান এই সমস্ত শিল্প তৈরির মূল অঞ্চল ছিল। আমি সবচাইতে আশ্চর্য হয়েছিলাম এই দেখে যে, যারা এই সমস্ত দুর্মূল্য জিনিসগুলো বিক্রির জন্য আমার কাছে হাজির করেছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল কাশ্মীরি। নিজভূমি ত্যাগ করার পরও এদের ফেরিওয়ালার চরিত্র একইরকম রয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল যেন আমি সুদূর মরুর মাঝের এক মরূদ্যান শহরে নয়, আমার শ্রীনগরের ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে নাছোড়বান্দা কাশ্মীরি ফেরিওয়ালাদের ঘেরাটোপে আছি।

লিউ-ডারিনের সঙ্গে

আমি যখন ইয়ারখন্দে পৌঁছই তখন এখানকার আম্বান লিউ-ডারিন কর্মোপলক্ষে শহরের বাইরে ছিলেন। তিনি ফিরে এলে আমি একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে কথা বলে টের পেয়েছিলাম, সঠিক দোভাষীর অভাবে আলাপচারিতায় খামতি থাকলেও তিনি অতি প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। লিউ-ডারিনের আচার-ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছিল। পরদিন উনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি ওঁকে হিউয়েন সাঙ সংক্রান্ত নানা তথ্য পরিবেশন করে আমার অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছিলাম। আমি যে সত্যি সত্যি সেই মহান তীর্থযাত্রী বর্ণিত খোটানের এবং সংলগ্ন অঞ্চলে মরুভূমির বালিতে চাপা পড়ে যাওয়া সভ্যতার খোঁজ করতে এসেছি, তা নিয়ে এই বুদ্ধিমান প্রশাসকের কোনো দ্বিধা ছিল না। উনি সোৎসাহে আমাকে নানা তথ্য দিতে শুরু করেছিলেন। আবার প্রমাণ হয়ে গেছিল, বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত চিনাদের মধ্যে হিউয়েন সাঙ-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁর জনপ্রিয়তা প্রবলভাবে বিদ্যমান। অবশ্য, বহু উদ্ভট গল্পকেই এই ‘তাং যুগের সাধু’টির নামে চালানো হয়ে থাকে সেও ঠিক। তাঁর “পশ্চিমদেশের বিবরণী” বইতে সেসব গপ্পোকথার কোনো চিহ্ন মেলে না। তবে সে নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর কোনো কারণ নেই।

২২ সেপ্টেম্বর লিউ-ডারিন আমার সম্মানে এক নৈশভোজ দিয়েছিলেন। ষোলো রকমের খাবার পরিবেশিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশের সঙ্গেই আমি পরিচিত ছিলাম না। আমি চিনাদের মতো কাঠি ব্যবহার করে বড়ো পাত্র থেকে খেতে পারছিলাম না। তাই লিউ-ডারিনের নির্দেশে আমার খাওয়ার সুবিধার জন্য আমার জন্যে একটা কাঁটা (ফর্ক) আর কয়েকটা ছোটো বাটি হাজির করা হয়েছিল। আম্বান স্বয়ং আমাকে কাঠি দিয়ে খাওয়া শেখানোর চেষ্টা করছিলেন, সঙ্গে উনি নিজে একটা প্লেটে আমার জন্য খাবার তুলে তুলে দিচ্ছিলেন। ঘণ্টা তিনেক লেগেছিল খেতে, কিন্তু আমি প্রায় সবগুলো খাবারই চেখে দেখেছিলাম। যদিও খাবারগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। খাবারের সঙ্গে একধরনের গরম পানীয় দেওয়া হয়েছিল, যা আমার দেশি মদ বলে মনে হয়েছে। ছোট্ট চৌকো ধরনের পাত্রে পানীয় ঢেলে দিচ্ছিল একজন। অল্প করে দিচ্ছিল যাতে তা গরম থাকে। পানীয় শেষ হয়ে গেলে পাত্রে হাত ছোঁয়ালেই সঙ্গে সঙ্গে তা ভরতি করে দিচ্ছিল পরিবেশক। আম্বান ছাড়াও শহরের অনেক গণ্যমান্য লোক ও উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন ভোজসভায়।

ভোজসভাতেই লিউ-ডারিন আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন পিকিং-এর যুদ্ধ সম্পর্কে আমি কী শুনেছি। জুলাইর শেষ দিকে আমি জানতে পেরেছিলাম যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, এর বাইরে আমার কিছু জানা ছিল না। তাই ওঁকে বিশেষ কিছু বলতে পারিনি। ঝানু রাজনীতিক খানিক হতাশ হলেও কোনোরকম অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। টেলিগ্রামের মাধ্যমে সত্য-অসত্য সব খবর তুর্কিস্তানের কাশগরের চিনা ইয়ামেনদের কাছে পৌঁছলেও আমার কাছে যে কোনো তথ্য ছিল না তাতে বেশ অবাক হয়েছিলেন উনি, এটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম। ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার মধ্যেই যে এক দুশ্চিন্তা কাজ করছে তাতে ভুল নেই। যদি আমার কাশগরের বন্ধুরা সঠিক বলে থাকে, চিনের সব প্রশাসকই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যতটা দোলাচলে থাকে, ততটা জাতির জন্য নয়।

ডিনারের পর লিউ-ডারিনের সঙ্গে ওঁর কিছু লোকজনের ছবি তুলব বলে আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম। উনি সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। নিজের অফিসের উঁচু পিঠওয়ালা চেয়ারে বসে নিজের দুই ছোটো ছেলেমেয়েকে দু-পাশে দাঁড় করিয়েছিলেন। চেয়ারের পাশে একটা উঁচু টেবিলে একটা ঘড়ি আর ফুলদানি রেখেছিলেন যাতে ছবিটা ভালো হয়। চেয়ারের পেছনে ভোজসভায় আসা কিছু লোককেও ডেকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সবাই ছবি তোলার সময় মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে আমার ছবি তোলার কাজটা সহজ হয়ে গেছিল। ছবি তোলা শেষ হলে ফিরে আসার সময় উনি বলেছিলেন শীঘ্রই উনি অবসর নিয়ে ফিরে যাবেন নিজের জন্মভূমি হু-নানে। তারপর চেষ্টা করবেন জীবনের বাকি ক’টা দিন ওঁর চিনা ধর্মগুরু তাং-সেং-এর মতো আধ্যাত্মিক জীবন কাটাতে।

মুদ্রার জটিলতা

ইয়ারখন্দে শেষ ক’টা দিন কেটেছিল চূড়ান্ত ব্যস্ততায়। আমার দলের লোকজনের জন্য শীতের পোশাক কেনার কাজ শেষ করে সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে প্যাক করতে। এছাড়া সব পাওনাগণ্ডাও মেটানোর ছিল। এই হিসেবনিকেশ চোকাতে আমাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিলেন লালা গৌরীমল। ইনি এখানকার হিন্দু ব্যবসায়ীদের প্রধান। গালভরা সাদা দাড়ি, বিবেচক লোক। সব জায়গার মতো এখানেও বাইরের লোক দেখে দ্বিগুণের বেশি দাম হাঁকতে দ্বিধা করেনি স্থানীয় ব্যাপারীরা। দামের ব্যাপারটা দৃঢ় হাতে সামলেছিলেন গৌরী মল, সঙ্গে মুদ্রার জটিলতা। এখানে নানারকম চিনা মুদ্রা চলে। সের, টেল, মিসকাল আর ফেনস। কিন্তু সব জায়গায় এর একরকম গ্রহণযোগ্যতা নেই। তবে তাঙ্গা আর পুল-এর চল আছে সব জায়গায়। তুর্কিস্তানে একধরনের ছোটো চৌকো তামার মুদ্রা চলে, তাকে বলে ডাচিন। কাশগর আর ইয়ারখন্দে দুই ডাচিন সমান এক পুল আর পঁচিশ পুল দিয়ে এক তাঙ্গা পাওয়া যায়। আবার খোটান তাঙ্গা মূল্য কাশগরি তাঙ্গার দ্বিগুণ। এখানকার হিসেব খুব জটিল।

২৪ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই আকাশ মেঘে ছেয়ে ছিল, আর পারদও নেমে গেছিল অনেক। বেশ ঠান্ডা লাগছিল। হলদেটে ধোঁয়াশায় ঢেকে গেছিল চারপাশ। আমার সাময়িক আস্তানার বিশাল ঘরে বসে টের পাচ্ছিলাম শীত এখানে কীরকম ভয়ংকর।

২৭ সেপ্টেম্বর সকালে ইয়ারখন্দ থেকে আমাদের ক্যারাভান যখন যাত্রা শুরু করেছিল তখনও একইরকম ধোঁয়াশায় ঢেকে ছিল চারদিক। দিনটা ছিল হাটবারের। শয়ে শয়ে গ্রামবাসী রাস্তা জুড়ে তাদের রসদ নিয়ে চলেছিল। মহিলারা মালপত্র কেনাবেচায় এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহিলাদের সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চাও ছিল। পুরুষরা ছিল মূলত সহযোগীর ভূমিকায়। মহিলাদের প্রায় সবার মাথাতেই বিরাট বিরাট মখমলের চূড়াওয়ালা টুপি ছিল শীতের হাত থেকে বাঁচতে।

ইয়ারখন্দের বাজার ছাড়াতেই সব কোলাহল শেষ। চওড়া রাস্তা গেছে পপলার আর মালবেরি গাছের সারির মধ্যে দিয়ে। দু-পাশে সমতল উর্বর জমি। ভুট্টার খেতে ফসল কাটা চলছিল। এরপর জমিতে লাঙ্গল দিয়ে ধান বোনা হবে, তবে তার জন্য প্রতীক্ষা চলবে গরমকাল পর্যন্ত। মাঝে হয়তো অন্য কিছুর চাষও হবে।

মাইল পাঁচেক চলার পর আমরা পৌঁছেছিলাম মাংলিক। রাস্তার দু-ধারে বেশ বড়ো বাজার। সারি সারি মাটির কুঁড়ে। কিন্তু পুরো শুনশান। কারণ, আজ এখানে হাটের দিন নয়। সবাই গেছে ইয়ারখন্দের হাটে। এই ধরনের ছোটো ছোটো বাজারগুলো কারঘালিক পর্যন্ত পুরো পথের ধারেই রয়েছে। এটা প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলে শুধু প্রচুর মানুষই বাস করে না, এখানকার জমি প্রচুর ফলনও দেয়। এখানকার অর্থনীতি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে।

ইয়ারখন্দ নদী পারাপার

এখান থেকে আরও মাইল আটেক পথ পার হয়ে আমরা পৌঁছলাম ইয়ারখন্দ নদীর ধারে। ইয়ারখন্দ নদী জারফশান নদী নামেও পরিচিত। মুজতাঘ-আতা আর কারাকোরামের মধ্যবর্তী অঞ্চলের হিমবাহের বরফগলা জলে পুষ্ট এই নদী। গরমকালে এই নদী কানায় কানায় জলে ভরে থাকে। নদী এখানে তিনটে শাখায় বিভক্ত। এক-একটা শাখা কম করে চল্লিশ গজ চওড়া। জলও প্রচুর—এক-একটা উটের ঘাড় পর্যন্ত গভীর। নৌকো চেপে পার হওয়া ছাড়া উপায় নেই। নদী পারাপার করার জন্য নৌকোগুলো ছিল পলকা। মালপত্রসহ পশু…সব উলটে যেতে পারে। তাই উট, গাধা আর টাট্টুঘোড়ার পিঠ থেকে মালপত্র সব খুলে নিতে হয়েছিল।

মালপত্র, পশু আর দলের লোকজনকে নদী পার হতে ঘণ্টাতিনেকের বেশি সময় লেগে গেছিল। নদী পার হয়ে সেইসব মাল আবার চড়াতে হয়েছিল পশুদের পিঠে। ঘাটে উপস্থিত সবগুলো নৌকাকে কাজে লাগানো হয়েছিল ফেরি করার কাজে। নদীর তটভূমি প্রায় মাইল খানেক চওড়া।

নদীর অন্য পারে গিয়ে পাইনাপ নামের একটা গ্রামের বাজারের ভেতর দিয়ে পোসগাম-এ পৌঁছেছিলাম বিকেল পাঁচটার সময়। পোসগামের রেস্টহাউসটি সেই ইয়াকুব বেগের আমলের। কিন্তু খুব যত্নের সঙ্গে রাখা। ঘরগুলো যথেষ্ট বড়ো ও নিখুঁতভাবে পরিষ্কার। ঘরগুলোর ভেতরটাও যথেষ্ট গরম। ঘরের ভেতর থাকলে গরমে আরামেই থাকতাম। কিন্তু আমি আমার ছোটো তাঁবুতে থাকব বলেই ঠিক করেছিলাম।

পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর কারঘালিকের উদ্দেশে যাত্রাপথটি যথেষ্ট লম্বা ছিল। প্রায় চব্বিশ মাইল পথ পার হয়েছিলাম আমরা। কিন্তু যাত্রাটা খুব উপভোগ্য ছিল। আগের রাতে ঝড় উঠেছিল, ধুলো ঝড়, বৃষ্টির ফোঁটাও পড়েনি। কিন্তু এতে ধোঁয়াশা দূর হয়ে গিয়ে চারপাশ ঝকঝক করছিল। পেসগাম পার হয়ে দক্ষিণের দিকে পুরো পথটাই ছিল ফলের বাগান আর চাষের খেতের মাঝ দিয়ে। খুব যত্ন নিয়ে আবাদগুলো করা। ইয়ারখন্দ নদী থেকে সেচ খাল কেটে জল এনে পুরো অঞ্চলটা উর্বর করা হয়েছে। পথের পাশের গ্রামের চেহারা স্পষ্ট করে দিচ্ছিল এখানকার সমৃদ্ধি।

পেসগাম থেকে মাইল নয়েক পর এসেছিল এক বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। তুগুলাজ নামে পরিচিত এই অঞ্চল। অনেক ছোটো ছোটো জলের ঝোরায় পুষ্ট এই তৃণভূমি ক্রমে পশ্চিমের দিকে চলে গেছে। এই তৃণভূমিতে চারণদাররা তাদের পশুর পাল চরিয়ে বেড়ায় বছরভর। কাশগরের সঙ্গে এখানে জলের রঙে অনেক তফাত। ওখানকার জলের বর্ণ খানিক বাদামি, লাল বা কর্দমাক্ত। কিন্তু এখানে জল স্বচ্ছ। দক্ষিণ-পশ্চিমের বহুদূরের বরফ-ঢাকা পাহাড় চূড়াগুলো উৎস এই পরিষ্কার জলধারা। ইয়ারখন্দে থাকার সময় ধোঁয়াশার কারণে দূরের বরফ-ঢাকা পাহাড়গুলো আমাদের চোখের আড়ালে ছিল।

তুগুলাজ পার হয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম তিজনাফ নদীর ধারে। এখন নদীর ধারায় জল কমে এসেছে। কিন্তু যখন দূরের কুয়েন-লুন পর্বতের বরফ গলে তখন এই নদী ভয়ংকর হয়ে ওঠে। নদীর ওপরের শক্তপোক্ত সেতুটি বছর পঁচিশ আগে বানানো। সেতুর এ-মাথা থেকে ও-মাথায় যেতে ২৫০ পা হাঁটতে হয়। সেতু পার হলেই চাষের খেতের শুরু। লুসার্ন আর ভুট্টায় ভরে আছে খেতগুলো। আর আছে খেতভরা তুলো। চাষের জমির ফাঁকে ফাঁকে ছোটো ছোটো গ্রাম। খানিক এগোতেই এসেছিল চার্বাক গ্রামের বাজার। আজ ছিল এখানে মঙ্গলবারের হাট। আশেপাশের গ্রামের লোকের ভিড় উপচে পড়েছিল বাজারে। এ-পথে কারগালিকের আম্বানের ইয়ারখন্দ যাওয়ার কথা লিউ-ডারিনের উত্তরসূরিকে স্বাগত জানাতে। কিন্তু আমার জন্য তিনি তাঁর যাত্রা পিছিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও এ-পথে কারগালিকের আম্বানকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাজার অঞ্চল সেজে উঠেছিল রঙিন পতাকায়। পুরো অঞ্চল জুড়ে ছিল উৎসবের মেজাজ। স্থানীয় বেগ এখানে উপস্থিত ছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। পুরোদস্তুর সরকারি চিনা পোশাকে। উনি আমাকে নিয়ে বসিয়েছিলেন একটি বিশাল দোকানে। দোকানটিকে কার্পেট বিছিয়ে রঙবেরঙের কাপড় দিয়ে মুড়ে অভ্যর্থনা কক্ষে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। আমাকে চা খেতে দেওয়া হয়েছিল, সঙ্গে ছিল নানাধরনের তাজা ফল। দীর্ঘ সময় পথের ধুলো খেতে খেতে আসার পর চা আর রসালো ফল আমাকে আবার তরতাজা করে তুলেছিল।

কারগালিকে সাময়িক অবস্থান

বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ কারগালিক শহরের কাছে পৌঁছলাম। শহরে প্রবেশের আগে এসেছিল সুন্দর শহরতলি। ফলের বাগানের পর বাগান। আশেপাশে পাহাড়ের সার। তারই মাঝে সুন্দর করে সাজানো বাড়ি আর মাজার। শহরে ঢোকার মুখেই পার হতে হয়েছিল প্রায় শুকনো এক নদী। একের পর এক জমজমাট অঞ্চল পার হয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম শহরের কেন্দ্রে। শহরের পরিছন্নতা আর পরিকল্পিত রূপ আমাকে মোহিত করে দিয়েছিল। এই শহর যে প্রকৃত অর্থেই বাণিজ্যকেন্দ্র তাতে সন্দেহ নেই। কারাকোরাম গিরিপথ থেকে খোটান, ইয়ারখন্দ-সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে সংযোগকারী পথ এসে মিলেছে এখানে। শহরতলির দক্ষিণে খানিক খোঁজাখুঁজির পর একটা মনের মতো ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড পেয়েছিলাম। ঘাসে ছাওয়া আখরোট গাছে ঘেরা খানিক সমতল—একেবারে কাশ্মীরে আমার ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের মতো। আমি ক্যাম্পে থাকতে মনস্থ করলেও আমার লোকেরা আশেপাশের সরাইখানায় থাকতে চাইছিল, ওদের বারণ করিনি। কাছাকাছি সুন্দর চারণভূমি ছিল, সেখানে আমাদের দলের মালবাহক পশুগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। মোটের ওপর সবাই খুশি হয়েছিল।

২৯ তারিখ সকালে কারগালিকের আম্বান কয়েকজন বেগের হাত দিয়ে আমার জন্য একটি ভেড়া আর দলের পশুদের জন্য অনেক পশুখাদ্য উপহারস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল দুপুরে ওঁর বাড়িতে খাওয়ার আমন্ত্রণ। আমি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ওঁর জন্য ফিরতি উপহার হিসেবে রাশিয়ান মিষ্টি, টিনে ভরা সার্ডিন মাছ আর জার্মানিতে তৈরি সুগন্ধি সাবান পাঠিয়েছিলাম। এগুলো আমি উপহার দেবার উদ্দেশ্যেই কাশগর থেকে কিনেছিলাম।

দুপুরে কারগালিকের আম্বান চ্যাং ডারিনের সরকারি আবাসন বা ইয়ামেনে তাঁকে দর্শন করার জন্য গেলাম। আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তৈরি ছিল ইয়ামেনের কর্মীরা। তিনবার আকাশে বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ে আমাকে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়েছিল চ্যাং ডারিনের ছোটো পরিপাটি বসার ঘরে। খানিক কথাবার্তার পর চ্যাং ডারিন আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁর জ্ঞান আর প্রাণোচ্ছল আন্তরিক ব্যবহারে। কাশগরের তাও-তাইয়ের কাছ থেকে তিনি আমার ও আমার অভিযানের উদ্দেশ্যের বিষয়ে বিস্তারিত জেনেছিলেন। তাই আমাকে খোটানে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বিশেষ কিছু বলতেই হয়নি। আমার অভিযানের জন্য যা যা লাগবে, বিশেষ করে পরিবহণ আর খাদ্য যাতে ঠিক ঠিক পাওয়া যায় তার জন্য সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস উনি দিয়েছিলেন।

চ্যাং ডারিন আমার খাওয়ার বহর জেনে গেছিলেন। সেই কারণেই দুপুরের খাওয়ায় অল্প সংখ্যক পদের আয়োজন করেছিলেন। সঙ্গে ছিল সুস্বাদু ওয়াইন। আমার ভাগ্য ভালো ছিল যে এগুলো লিউ ডারিনের টেবিলে সাজানো কড়া চিনা মদ ছিল না। সম্ভবত ককেশাস বা ক্রিমিয়া থেকে আনানো ‘মেদেইরা’ জাতীয় কিছু। দুটি ওয়াইন খাবার ছোটো গ্লাসের পাশে আমার জন্য চিরাচরিত চিনা চপস্টিকের পাশে কাঁটা চামচও ছিল। আমার নিমন্ত্রণকর্তা আমাকে যেন কোনো অস্বস্তিতে পড়তে না হয় তার সব ব্যবস্থাই নিখুঁতভাবে করে রেখেছিলেন।

চ্যাং ডারিনের বাসভবন থেকে ফেরার পথে আমি স্থানীয় বাজারে ঢুঁ মেরেছিলাম। প্রায় পুরো বাজারটাই ছাদের তলায়, যাতে গরমকালে তাপ কম লাগে তাই এই ব্যবস্থা। প্রচুর দোকান বাজারে, যদিও ক্রেতা খুব একটা ছিল না। বাজার খুঁজে খুঁজে পেয়ে গেছিলাম আমার দলের লোকদের জন্য প্রয়োজনীয় চামড়ার শীত পোশাক। কোকিয়াকের পাহাড়ি গ্রামগুলো ফেল্টের মোজা ‘পাইপাক’ তৈরির জন্য বিখ্যাত। কারগালিকের বাজারে এই মোজাগুলো সহজলভ্য।

রাস্তার পাশ দিয়ে খাল বয়ে গেছে। খালের এ-পাড় থেকে ও-পাড়ে যাওয়ার জন্য খানিক পরপর ছোটো ছোটো সেতু। সুন্দরভাবে পরিকল্পিত পথের দু-পাশে গাছের সারি। খানিক বাদে বাদে খাবারের দোকান। ভিড় কম থাকায় দোকানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম। পশ্চিমি নয়, এই খাবার দোকানগুলোর সঙ্গে ভারতীয় দোকানের মিলই বেশি। সেই একইরকমভাবে চুলায় হাঁড়ি-পাতিল বসানো। তাতে কিছু না কিছু ফুটে চলেছে। দোকানের সামনে থরে থরে সবজি, রুটি আর নানাবিধ খাদ্য সাজানো। একপাশে ডাঁই করা প্লেট ও বাসনকোসন। অধিকাংশ দোকানের পেছনের সাদা দেওয়াল ফুল-লতাপাতার আলপনায় চিত্রিত।

আমার ক্যাম্পে আম্বানের আগমন

হেলতে-দুলতে ক্যাম্পে ফিরে দেখি আম্বান স্বয়ং এসেছেন আমার থাকার ব্যবস্থা দেখতে। সব ঠিকঠাক আছে দেখে তিনি খুশি হয়েছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে আনা একটা ভাঁজ করা টেবিল দেখে খুব উৎসুক হয়েছিলেন। পরদিন সকালে এলাহাবাদের মেসার্স লুসকম্ব অ্যান্ড কোং-এর বানানো টেবিলের মাপজোক নেবার জন্য এক ছুতোরকে পাঠিয়েছিলেন নিজের জন্য অনুরূপ টেবিল বানাবেন বলে। হিউয়েন সাঙকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল। আমি চ্যাং ডারিনকে হিউয়েন সাঙের ‘সি-ইউ-কি’ বইয়ের জুলিয়ান কৃত ‘পশ্চিমের ইতিহাস’ নামক অনুবাদের সঙ্গে সংযুক্ত চিনা-শব্দকোষ এবং ডঃ হোর্নল-এর খোটান ও কুচার পুরাকীর্তি ওপর লেখা বইয়ে ছাপা ছবি দেখিয়েছিলাম। প্রাচীন চিনা মুদ্রা ও চিনা পাণ্ডুলিপির ছবি দেখে উনি বিস্মিত হয়েছিলেন। আমি চিনা ভাষায় আমার অজ্ঞতার অভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। দোভাষী নিয়াজ আখুনের সাহিত্য বিষয়ে জ্ঞানের অভাবে চ্যাং ডারিন যে সমস্ত জিজ্ঞাস্যের উত্তর ঠিক ঠিক পাচ্ছিলেন না, তা অনুভব করতে পারছিলাম।

পরদিন সকালে মিঃ ম্যাকার্টনির সহযোগিতায় আমার লাহোরের ব্যাঙ্কের ড্রাফট ভাঙিয়ে কাশগর থেকে স্থানীয় অর্থের জোগান এসে পৌঁছেছিল। কারগালিকে আমাকে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়েছিল এই অর্থের জন্যই। চিনা রুপোর মুদ্রার সঙ্গে কিছু স্বর্ণমুদ্রাও এসেছিল। সঙ্গে মিঃ ম্যাকার্টনির চাপরাসি নিয়ে এসেছিল আমার জন্য আসা একগুচ্ছ চিঠি। আমার লেখা চিঠিপত্র নিয়ে চাপরাসি আবার ফিরে যাবে কাশগর, সেখান থেকে সেই চিঠি আবার যাবে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আমি সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম চিঠিপত্র লিখতে আর সরকারের কাছে আমার অভিযানের জন্য এখনও পর্যন্ত হওয়া খরচের হিসেব পাঠাতে। আখরোট গাছের তলায় খাটানো আমার সাময়িক অফিসের তাঁবুতে বসে হিসেব লিখতে লিখতে ভাবছিলাম কলকাতা অফিসের বাবুরা আমার মাসিক ক্যাশ অ্যাকাউন্ট-এর খাতা দেখে মুদ্রা বিনিময়ের জটিলতর হিসেব কতটা বুঝবে!

সন্ধেবেলা শহরের পশ্চিমে প্রবাহিত খালের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দূরবর্তী কোকিয়ার পাহাড়ের দিকে বার বার দেখছিলাম। ওই অঞ্চলে প্রচুর পশমের উৎপাদন হয়। খালের ধারে দেখা হয়েছিল এক কাশগরের ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি এখানে পশম ধুয়ে পরিষ্কার করে সেগুলো চালান দেন আন্দিজান-এ। এছাড়াও আরও কিছু পশম ব্যবসায়ী আছে যারা এই পশম ওঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি করে সেইসব জায়গায় যেখানে এগুলোর চাহিদা প্রচুর।

১ অক্টোবর ছিল কারগালিকে হাটের দিন। আমি এই দিনটার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। আমার আশা ছিল হাটে কোকিয়ার দক্ষিণ উপত্যকায় বসবাসকারী ফাখপো জাতির পাহাড়ি লোকগুলোর দেখা মিললেও মিলতে পারে। নৃতাত্ত্বিক তথ্যের কারণে এদের চাক্ষুষ করাটা খুব দরকার। তারা এখনও সেই আদি যুগের মতো আছে না বদলে গেছে, না আদপেই সেই জাতির অস্তিত্ব নেই, তার রেকর্ড থাকাটা জরুরি। এর আগে ইয়ারখন্দ মিশনের অভিযাত্রীরা লিখে গেছিলেন ফাখপোদের কথা। এদের চেহারার গঠন খাঁটি আর্যদের মতো। ফাখপোদের সঙ্গে সারিকোলি আর তাজিকদের চেহারার কোনো মিল নেই। যদিও তারা তুর্কি ভাষায় কথা বলে। এরা সংখ্যায় খুব কম, লাজুক প্রকৃতির আর পাহাড়ের গহিনে বাস করে। সহজে অন্য কারও সংস্পর্শে আসতে চায় না। ফলে বিশদ পর্যবেক্ষণ নথিভুক্ত করতে পারেননি অভিযাত্রী দলের সদস্যরা। আমার ভাগ্যও সঙ্গ দেয়নি। সমস্ত হাট তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোনো ফাখপোর দেখা পাইনি। আম্বান নিজে হুকুম দিয়ে রেখেছিলেন যে কোনো ফাখপোর দেখা পেলেই যেন আমার সামনে হাজির করা হয়। তারা না এলে আর দেখা পাব কী করে? এর পরের হাট আবার এক সপ্তাহ পরে। সেই হাটেও তাদের দেখা পাওয়া যাবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। আমার পক্ষেও অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

তবে পাহাড়ি উপকথার মানুষের পরিবর্তে দেখা পেয়েছিলাম সুদূর পূর্ব চিনের এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর। তিনি আকসু এবং খোটান হয়ে স্রেফ ভিক্ষে করতে করতে এসে পৌঁছেছিলেন কারগালিকে। এখান থেকে তিনি যাবেন উত্তরের পথে। এই সন্ন্যাসী লোকমুখে আমার অভিযানের কথা শুনেছিলেন। আমি যে মরুর বুকে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যের সন্ধানে এসেছি, তা শুনে তিনি বড়োই প্রীত হয়েছিলেন। যদিও তিনি কোনো প্রাচীন তীর্থের সন্ধানে ছিলেন না। ওঁর সরল হাসিখুশি ব্যবহার আমায় মুগ্ধ করেছিল। আমি ওঁকে লাল কাপড়ের ওপর বুদ্ধের বাণী লেখা রুপো দিয়ে বাঁধানো একটি স্মারক উপহার দিয়েছিলাম। উনি খুব খুশি হয়েছিলেন।

কারগালিকের কথা আমার চিরকাল মনে থাকবে। যেখানে আমি ছিলাম সেটা ঠিক শহরের অংশ ছিল না। ইয়েতুমলুকুম জায়গাটাকে গ্রামই বলা চলে। জায়গাটা এতই শস্যশ্যামল ছিল যে, খানিক দূরের মরুভূমির অস্তিত্ব টেরই পাইনি। টের পাইনি দূরের বন্ধ্যা পাহাড়ের অবস্থান। যতদূর চোখ যায় দেখেছিলাম সবুজে ভরা মাঠ আর বাগানের পর বাগান। মরুভূমির মাঝে কোনো মরূদ্যানে নয়, মনে হত আছি আমার প্রিয় কাশ্মীরের কোনো গ্রামে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%