মার্ক অরেল স্টাইন
২ অক্টোবর সকালে আমাদের ক্যারাভান শহরের পূর্বদ্বার দিয়ে শহর ছেড়ে রওনা দিল। এই পথ সোজা গিয়েছে খোটানের দিকে। পথে ঘুজক মসজিদ এর নামে পরিচিত এক বড়োসড়ো মাদ্রাসা দেখতে গেলাম। মাদ্রাসার স্থাপত্য ধ্রুপদি রীতির। চ্যাং ডারিন ওঁর প্রধান ‘তুংচি’ বা দোভাষীকে পাঠিয়েছিলেন যাত্রা শুরুর সময় আমাকে কিছুটা এগিয়ে দিতে। খোটানের পথে মাইল খানেক এগিয়ে অনুর্বর মরু রাস্তা শুরু হতে সুদর্শন বৃদ্ধ বিদায় নিয়েছিলেন।
মাইল কয়েক চলার পর বেশারিক নামে একটা ছোট্ট মরূদ্যান পড়েছিল। বিকেল তিনটে নাগাদ সামান্য চাষের জমি আর কয়েকটা ঘরবাড়ি সম্বলিত মরু-গ্রামের পাশ দিয়ে আমরা পড়েছিলাম রুক্ষ মরুভূমির পথে। পথের পাশে খানিক পরপর লম্বা কাঠের খুঁটি পোঁতা যাতে রাতের অন্ধকারে বা মরুঝড়ের কবলে পথচারী পথ না হারায়, তার ব্যবস্থা। আমাদের যাত্রা যেখানে শেষ হল সেই কোশ লঙ্গরে পৌঁছে অবাক হয়ে দেখি মরুভূমির মাঝে পোড়া ইটের তৈরি সরাইখানা। আর অনেকগুলো খিলান দেওয়া বড়ো ঘর-সহ বেশ কিছু ছোটো ছোটো আউট-হাউস।
ইয়াকুব বেগের শাসনকালে খোটানের গভর্নর নিয়াজ হাকিম বেগ এই সরাই তৈরি করিয়েছিলেন। সরাইখানার প্রান্তে একটা বড়ো জলাশয়—এই জলাশয়ে ছোটো নালা দিয়ে বহু দূরের পাহাড় থেকে প্রতি সপ্তাহে একদিন জল সরবরাহ আসে। সরাই থেকে খানিক এগিয়ে মরুভূমির মধ্যে প্রায় মাইল দেড়েক জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ফুট তিরিশ উঁচু ইটের ভাঙাচোরা ঢিবি। সম্ভবত এগুলো কোনো প্রাচীন স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু এর প্রাচীনত্বের কাল সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
৩ অক্টোবর আমাদের পুরোটাই মরুপথ ধরে যেতে হল। বহুদূরের পাহাড়শ্রেণি আবছাভাবে দেখা গেলেও এখানে মরুর বুকে সেই পাহাড় থেকে কোনো জলের ধারা নেমে আসেনি। রাতে কনকনে ঠান্ডা হলেও দিনের বেলার প্রচণ্ড গরমে ঝলসে যাচ্ছিলাম আমরা।
ভয়াবহ তাকলামাকান মরুভূমির প্রতি আমার এক বিশেষ ঐতিহাসিক আকর্ষণই আমাকে এই পথে টেনে এনেছে। নিঃসন্দেহে এই পথই ছিল আমুদরিয়া থেকে খোটান হয়ে চিনে যাবার প্রাচীন পথ। কখনও হেঁটে, কখনও পশুর পিঠে চেপে যেতে যেতে দেখছি মরুভূমির দু-পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা অসংখ্য সাদা হয়ে যাওয়া কঙ্কালের স্তূপ। শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে এই জলশূন্য ঊষর পথে চলতে চলতে পথেই মারা গিয়েছে অগুনতি পশু আর পথচারীরা। হিউয়েন সাঙ তাঁর গ্রন্থে এই পথের ভয়াবহতার কথা বিস্তারিত বলে গেছেন। মধ্যযুগে হিউয়েন সাঙ-এর পরে এই পথ ধরে ‘ক্যাথে’ (চিন) গিয়েছেন মার্কো পোলো ছাড়াও অনেক স্বল্প-পরিচিত ভ্রমণকারী। যুগ যুগ ধরে এই পথ ধরে অগুনতি ভ্রমণকারী চলাচল করলেও ভয়ংকরতম যাত্রার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। অতীতকে যেন ধরে রেখেছে এই পথ। যাঁরা একবার পথের টানে এই বালিতে পা রেখেছেন তাঁদের আত্মায় জড়িয়ে গেছে বৌদ্ধধর্ম, শিল্প-সংস্কৃতি আর ভারতবর্ষ।
চোলক লঙ্গর ঠিক কোশ লঙ্গরের সরাইয়ের মতোই। দক্ষিণদিক থেকে ক্রমশ নেমে আসা নীচু পাহাড়ের উপত্যকার মধ্যে বালুময় গিরিখাতের কিনারায় দাঁড়িয়ে। মরুভূমির মাঝে এ-সরাইয়ের বিশেষত্ব হল এর কোল-ঘেঁষা বেশ কিছু জলে টইটম্বুর জলাশয়। একটা ছোটো নালা বেয়ে জল আসে সেই সুদূর উত্তরের পাহাড় থেকে। জলধারার পাশে হয়ে থাকা ঝোপের সারি, জলের স্রোতকে চিহ্নিত করে রেখেছে সবুজ রেখা হয়ে।
গতকাল রাতে এখানে ডাকবিভাগের কর্মরত ক্লার্ক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ছেলেটি সুশিক্ষিত এবং স্বভাবে শান্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন মরুভূমির মধ্যে কাজ করতে করতে বেচারা খুব একটা খুশিতে ছিল না। ওর অধীনে ডাকবিভাগের ন’টা টাট্টুঘোড়া আর চারজন পত্রবাহক। গুমা থেকে কারগালিক পর্যন্ত ডাকব্যবস্থা পরিচালনা করার পুরো দায়িত্ব ওর ওপর। এই ডাকপথ সাধারণত চিনা কর্তৃপক্ষের চিঠিপত্র চালাচালির জন্যই সীমাবদ্ধ। বছর দু-এক আগে কারগালিকের আম্বান ছেলেটিকে উরুমচি থেকে এখানে এনেছিলেন। কারগালিকের আম্বান আর ছেলেটি দুজনেই হো-নান প্রদেশের বাসিন্দা। ‘তাং-সেং’ ( অর্থাৎ তাং যুগের সন্ন্যাসী) বা হিউয়েন সাঙ-এর জন্ম হয়েছিল ছেলেটির বাড়ির খুব কাছের এক গ্রামে। এ-কথা আমার অজানা ছিল না। চা-কেক খাইয়ে, সে নিশ্চয়ই খুব তাড়াতাড়ি ভালো কোনো জায়গায় পোস্টিং পেয়ে যাবে এসব বলে যতটা সম্ভব ছেলেটিকে চনমনে করার চেষ্টা করলাম।
চোলক লঙ্গর থেকে গুমা যাবার পথ বেশ লম্বা, নয় ‘পোটাই’। তাই ভোর হবার আগেই ভারী মালপত্র সমেত উটগুলো রওনা হয়ে গেল। তারপরে আমার তাঁবু আর অন্যান্য সরঞ্জাম টাট্টুঘোড়াতে বাঁধাছাঁদার ফাঁকে সরাইখানার আশপাশটা একবার ভালো করে ঘুরে দেখে নিচ্ছিলাম। সরাইয়ের বাইরের দেওয়ালে সাঁটানো একটা বড়ো সরকারি হুকুমনামা নজরে এসেছিল। প্রায় দু-মাস আগের এই বিজ্ঞপ্তিতে চিন ও রাশিয়ার মধ্যে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে চিনা, মঙ্গোলিয়ান আর তুর্কি—তিনটে ভাষায় সম্রাটের তরফে নিয়মনীতি সংক্রান্ত এক আদেশনামা ছিল। আমার দোভাষী নিয়াজ আখুন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এটাই শেষ আদেশনামা কী না জানতে। কারণ, এই আদেশ পিকিং থেকে শুরু করে দেশের সব বাজারেই সাঁটা হয়েছে।
মাইল দশেক নুড়ি আর বালির ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছলাম শিলিঘ
লঙ্গরে। একটি ছোটো নালা শিলগি সরাইয়ের খানকয়েক জলাশয়কে জলে পূর্ণ করে আশেপাশের বালিমাটিকে কাদাময় করে তুলেছিল। ছোটো ছোটো ঝোপে ভরে ছিল জায়গাটা। পুরো অঞ্চলটায় ‘কুমুশ’ গাছের ছড়াছড়ি। পরের সরাই মাইল আড়াই দূরের হাজিব লঙ্গর পর্যন্ত পুরো রাস্তার পাশেই দেখা মিলেছিল এই ছোটো ছোটো ঝোপ আর কুমুশ গাছের। এরপর ছোটো ছোটো গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে পুরো রাস্তাটাই ছিল নুড়ি-পাথরে ভরা। দূরে বহুদূরে গুমা মরূদ্যানের আবছা গাছপালার আভাস দেখা যাচ্ছিল।
মাইল ছয়েক ভয়াবহ এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে চলার পর আমরা পৌঁছলাম এক শুকনো নদীখাতে। এটাই গুমার পশ্চিম সীমান্ত। নদীখাত ধরে অনেকটা পথ যাওয়ার পর ফুট চল্লিশ উঁচু নদীর খাড়া পাড় বেয়ে উঠে পৌঁছেছিলাম উর্বর চাষের খেত আর বাগানের মধ্যে। শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা খালের ধারে মূল বাজার থেকে খানিক দূরে এক বিশাল উইলো আর পপলারের বনের মাঝে একটা সুন্দর মাঠ দেখতে পেয়ে সেখানেই ক্যাম্প করতে মনস্থ করেছিলাম। আমার লোকেরা যখন ক্যাম্প খাটাচ্ছিল তখন আমি টাট্টুঘোড়ার পিঠে চেপে ছুটেছিলাম বাজারের দিকে।
সেদিন ছিল সাপ্তাহিক বাজারের দিন। পুরোদমে বাজার চলছিল। গবাদিপশু, ফল, তুলো আর স্থানীয় নানাবিধ পণ্য কেনাবেচার জন্য জমায়েত লোকজন বুঝিয়ে দিচ্ছিল এই মরূদ্যানের বিশালতা। সারি সারি দোকানে ঝুলছিল লাল চামড়ার হাঁটু পর্যন্ত উঁচু বুটজুতো। শীতকাল আসন্ন, তাই এই বুটের চাহিদা খুব।
৫ অক্টোবর নানা পুরাকীর্তির বিষয়ে খোঁজ নেবার প্রয়োজনে গুমাতেই থেকে গেছিলাম। ১৮৯৫ সাল থেকে মিঃ ম্যাকার্টনি-সহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক আধিকারিক ভারত সরকারের জন্য ‘অজানা অক্ষর’ এ লেখা এর অনেক কাগজের পাণ্ডুলিপি ও ‘ব্লকপ্রিন্ট’ কিনেছিলেন এই অঞ্চল থেকে। রাশিয়া এবং ইউরোপের বেশ কিছু সরকারি সংগ্রহশালাতেও এই ধরনের পুরাকীর্তি পৌঁছেছিল। সম্ভবত এগুলোর সবই সংগৃহীত হয়েছিল খোটান অঞ্চলের বালির তলা থেকে।
খোটানের ‘ধন-সন্ধানী’ ইসলাম আখুন, মিঃ ম্যাকার্টনি যার কাছ থেকে এই পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য পুরাকীর্তি সংগ্রহ করেছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ উনি নথিবদ্ধ করেছিলেন কাশগরের অফিসে। পরবর্তীকালে এই সংগ্রহ কলকাতায় গেছিল। ডঃ হোর্নল (Augustus Rudolf Hoernle, a prominent scholar of Indo Aryan languages for decipher, later on Principal of Calcutta Madrasa) বিশদভাবে এগুলোর এলাকাভিত্তিক ক্রম উল্লেখ করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই পুরাকীর্তির সংগ্রহস্থল মরুভূমির ক্যারাভান পথের উত্তরে গুমা ও খোটানের মাঝামাঝি বলে উল্লিখিত হয়েছিল। কাশগরে যেসব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করার সঠিক জায়গা হবে গুমা।
সকালে স্থানীয় বেগ ও আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রধান ‘ইউজ-বাশির’-দের নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে হাজির হয়েছিল। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম যে গুমা আর মোজির মরূদ্যানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে মরুপথের পুবধারে অনেক ধ্বংসাবশেষ বালিতে ঢাকা পড়ে আছে। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটা ‘কোন্-শহর’ নামে পরিচিত। কিন্তু যারা এসেছিল তাদের কেউই এই অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রাচীন পুথির বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারেনি। ইসলাম আখুন বর্ণিত অনেকগুলো ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মাত্র দুটো নাম ওদের পরিচিত বলে জানাল।
বেগ ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম আশপাশটা দেখে আসতে। উত্তর-পূর্বদিকে খানিক চলার পর আমরা বিশাল বিশাল বালিয়াড়ির সাম্রাজ্যে পৌঁছলাম। এক-একটা বালির পাহাড় নয় নয় করেও কুড়ি থেকে চল্লিশ ফুট উঁচু। এই বালিয়াড়িগুলো গুমাকে উত্তর দিকে বেড় দিয়ে আছে। ‘হাসা’ নামের একটা গ্রাম পৌঁছে শুনলাম, ওরা কোন-শহরের ধ্বংসস্তূপের বিষয়ে ভালোই জানে। সেখানে বালির তলায় অনেক বাড়িঘর চাপা পড়ে আছে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও সেসব ধ্বংসাবশেষ দেখা যেত, কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে বালি ঝড় সব ঢেকে দিয়েছে। এখন আর কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু ওখানে যে একটা জনপদ জাতীয় কিছু ছিল তা ওরা নিশ্চিত করে বলেছিল।
হাসা থেকে মাইল তিনেক এগিয়ে কারাকুল মাজারে (কৃষ্ণ হ্রদের মাজার) পৌঁছেছিলাম। ইসলাম আখুনের বর্ণনায় এই মাজারের উল্লেখ আছে। মাজারের ঠিক পাশে একটা বড়ো জলাশয়। জলাশয়কে ঘিরে ছোটো ছোটো বালিয়াড়ি। একটা বালি পাহাড়ের ওপরে খুঁটির মাথায় ঝোলানো ইয়াকের লেজ, চামড়া আর কাপড়ের পতাকা, যা বলে দিচ্ছিল এটি কোনো পীরের সমাধিস্থল। যদিও এই পীর সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারিনি। শুধু জানতে পেরেছিলাম, পীর যখন এখানে এসেছিলেন তাঁর দাড়ি ছিল কালো, আর মারা গিয়েছিলেন ‘আক-সাকাল’ (সাদা দাড়ি) হিসেবে। এই মাজারের চারপাশের সুবিশাল কবরস্থান থেকেই নাকি ইসলাম আখুন সুপ্রাচীন ব্লক-প্রিন্টগুলো খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু আমি এখানে এসে অবধি কোনো ধরনের প্রাচীন ব্লক-প্রিন্ট ও ওই জাতীয় জিনিসের উপস্থিতির কোনো চিহ্ন পেলাম না।
এই কারা-সু (কালো জল) হ্রদের জল আসে অর্ধেক উলুখাগড়ায় ভরা পূর্বদিকের এক নালা বেয়ে। এই নালাটা গিয়ে মিশেছে মাইল খানেক দূরে হাসার কাছে ছোটো ছোটো কতগুলো ঝরনার সঙ্গে। যখন দূর দক্ষিণ পাহাড়ের বরফ-গলা জল বন্যার মতো ভাসিয়ে দেয় নদী আর ঝোরার দু-কূল, তখন এইসব জলবাহিকা হয়ে যায় আক-সু (সাদা জল)।
প্রায় শুকনো এই নালার বুক বেয়ে মাইল তিনেক গিয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম কারাতাঘ-আঘজি বা কারাতাঘিজের মরূদ্যানে। মরুভূমিতে প্রবেশের পর এই প্রথম এত ঘন জঙ্গল দেখলাম। নানা ধরনের শক্ত খাগড়া জাতীয় গাছ আর শক্ত ‘ইউলঘুন’ উদ্ভিদ। তার হিদার ফুলের মতো ছোটো ছোটো ফুল কারা-সুর বুক জুড়ে। শরৎ ঋতু ইতিমধ্যে গাছের পাতার রঙ বদলে হলদে করে দিয়েছে। এত রঙ দেখতে দেখতে মনে ধাঁধা লেগে যায়, সত্যি সত্যি তাকলামাকান মরুভূমিতে আছি তো?
কারাতাঘ-আঘজির ভুট্টার খেতের মধ্যে পপলার, মালবেরি আর ওই জাতীয় গাছের ঝোপ। কিছুদিন আগেই একপ্রস্থ ফসল কাটা হয়ে গেছে। শুনলাম, মাত্র বছর পনেরো হল জল ধরে জলসিঞ্চন ব্যবস্থা গড়ে তুলে মরুর মাঝে এই জমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তোলা হয়েছে। ইসলাম আখুন বলেছিল যে বেশ কিছু প্রাচীন পুথি ও অন্যান্য প্রত্নসামগ্রী সে সংগ্রহ করেছিল কারাতাঘ-আঘজির আশেপাশের ধ্বংসস্তূপ থেকে, কিন্তু স্থানীয় লোকেরা আশেপাশে কোনো ধ্বংসস্তূপের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই বলতে পারল না।
সারাদিন ঘুরেও ইসলাম আখুনের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে না পেরে গুমায় ফিরে এসেছিলাম। বালিময় পথ ধরে গুমা মরূদ্যানের উপকন্ঠের তোয়েন বাজার হয়ে শহরে ফিরেছিলাম। পুরো পথটাই ছিল গ্রামের ভেতর ছোটো ছোটো ফলবাগানের মাঝ দিয়ে। শসা আর তরমুজ ফলে আছে অসংখ্য। আর ছিল কিছু কাগজের কারখানা। মালবেরি গাছের ছাল থেকে মণ্ড তৈরি করে সেগুলো থেকে হাতে তৈরি হচ্ছে কাগজ। একদল বিচিত্র পোশাক পরা ‘দিওয়ানা’ বা ভিখারির দেখা পেয়েছিলাম গ্রামের পথে। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কিছুটা করে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করছিল।
৬ অক্টোবর গুমার ক্যাম্প গুটিয়ে রওনা দেবার সময় আকাশ ছিল পরিষ্কার। গুমা মরূদ্যানের ছায়া-ঢাকা পথ থেকে বেরিয়ে ‘দশত’-এর শক্ত মাটি, ছোটো ছোটো ঝোপঝাড় পরিপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছতেই বহুদূরে অন্ধকার পর্বতশ্রেণির মাথায় মাথায় তুষারের ঝলক দেখা যাচ্ছিল। ওগুলো নিঃসন্দেহে কারাকোরামের নানান গিরিপথের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা ওর প্রধান পাহাড়শ্রেণি। ওই আকাশছোঁয়া পাথুরে দুর্গপ্রাকারদের ওপাশেই সিন্ধু উপত্যকা। কারাকোরামের দিকের আকাশ অধিকাংশটাই কুয়াশা আর মেঘাচ্ছন্ন। ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে বরফ-চূড়া আবার অদৃশ্য হয়ে গেছিল মেঘের ঘোমটার আড়ালে।
কয়েক মাইল যাবার পর একটা চওড়া জলশূন্য নদী পার হয়ে পৌঁছলাম গুমা আর মোজি মরূদ্যানের মধ্যবর্তী জায়গায়। নদীর ডান তীর বরাবর বালির বুকে ছড়িয়ে অজস্র লাল মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো। ভাঙা পাত্রের গায়ে কোনো অলংকরণ না থাকলেও এর জেল্লা ও শক্তপোক্ত গড়ন বুঝিয়ে দিচ্ছিল এর প্রাচীনতা। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পড়ে থাকা এই পাত্রের টুকরোগুলো জানান দিচ্ছিল যে একসময় এই জায়গাটি একটি বড়ো জনপদ ছিল। সভ্যতার আর সব চিহ্ন ঢাকা পড়েছে বালির তলায়।

ধ্বংসাবশেষ থেকে খানিক পূর্বদিকে এগোতে পৌঁছেছিলাম মোকুইলা নামের এক গ্রামে। গ্রামের সেচখালের পাশ দিয়ে দশতে পৌঁছতে উত্তর-পূর্বদিকে নজরে এসেছিল ঢিবিটা। গুমা থেকেই জানতে পেরেছিলাম এই ঢিবিটা সম্পর্কে। এর নাম টোপা টিম। কাশগর সন্নিহিত অঞ্চলের অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত ঢিবি বা স্তূপকে ‘টিম’ বলা হয়। আমি দূরবীন চোখে লাগিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম এটি এক অতি প্রাচীন স্তূপের ধ্বংসাবশেষ।
আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢিবিটার কাছে পৌঁছতে চাইছিলাম। কিন্তু পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। স্তূপের কাছে দ্রুত পৌঁছনোর জন্য আমাদের গাইড বুদ্ধি দিয়েছিল নদীর শুকনো বুক ধরে এগোতে। আমি খানিক দোনোমনা করে ওর কথা মেনে নিয়েছিলাম। আবার নদীতে ফিরে মাইল দু-এক গিয়ে ঢিবির কাছে পৌঁছে দেখি সেখানে নদীর ধার ফুট পঞ্চাশেক খাড়া উঠে গেছে। সে-খাড়াই বেয়ে ওপরে ওঠা অসম্ভব। আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে দশত পার হয়ে মরুপথ ধরে চলে পৌঁছেছিলাম ঢিবির কাছে। স্তূপের কাছে পৌঁছে আমার প্রত্নতাত্ত্বিক মন আনন্দে নেচে উঠেছিল। আয়তন ও অনুপাতে এটির সঙ্গে খানুই এর মাওরি টিম স্তূপের মিল আছে। স্তূপের বহিরঙ্গ অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। স্তূপের গায়ে খোঁড়াখুঁড়ির ছাপ স্পষ্ট। ধনসন্ধানীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ২৯ ফুট উঁচু এ স্তূপ। স্তূপের চারপাশে ঘুরে অসংখ্য প্রাচীন ভাঙা মাটির পাত্র পেয়েছিলাম, যেরকম আগেও দেখেছিলাম মোকুইলা-সহ আরও কিছু জায়গায়। বেশ জোর দিয়েই বলা যায়, এই স্তূপ বৌদ্ধ যুগের।
ক্যারাভান পথের উত্তরে প্রায় তিন বর্গ মাইল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ধ্বংসাবশেষ। এই অঞ্চলে আগে যা দেখেছি সেগুলোর থেকে এর ব্যাপ্তি অনেক বড়ো। আমার গাইড জানিয়েছিল, ওরা এই জায়গাটাকে কাকশালের ‘তাতি’ বলে। এই অঞ্চলে ধ্বংসস্তূপকে আবার ‘তাতি’ বলে। পুরো অঞ্চলটা ঘুরে প্রচুর মাটির পাত্র, পোড়া ইট ও ধাতুর টুকরো ছাড়াও হাড় ও অনুরূপ শক্ত বর্জ্য দেখেছিলাম। ‘কাকশাল তাতির’ পড়ে থাকা নানা জিনিষের টুকরো দেখে পরিষ্কার ধারণা হল যে এই স্তূপ ধ্বংস হয়েছে প্রাকৃতিক কারণে।
এই অঞ্চলে নদীর ধারে গড়ে ওঠা স্থাপত্যগুলোর ক্ষয়ের কারণ বালি-ঝড় আর জোরালো বাতাস। বিশেষ করে বসন্ত আর গ্রীষ্মে এখানে প্রচণ্ড দাপটে ঝড় আর বাতাস বয়। মাটির দেওয়াল, কাঠের কড়িবরগা যা সাধারণত তুর্কিস্তানে বাসস্থান বানাতে ব্যবহৃত হয়...সবই হাওয়ার দাপটে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চলে গেছে বালির তলায়। শুধু কিছু কাঠামো তাদের কাঠিন্যের দৌলতে খানিক জেগে আছে বালি-মাটির ওপরে।
কয়েক শতাব্দী ধরে লাগাতার ক্ষয় হবার সঙ্গে সঙ্গে ভূমিতল নেমে গিয়ে এইসব পরিত্যক্ত প্রাচীন বসতি চলে গেছে বালির তলায়। কিন্তু ভূমিতল সব জায়গায় সমানভাবে নেমে না যাবার ফলে পুরো সভ্যতার চিহ্ন মাটির তলায় চলে যায়নি। বালি সাম্রাজ্যে বালির পাহাড়ের মাঝে উপত্যকার আকার নেওয়া অংশে জেগে থাকা তাতি বা ধ্বংসের স্তূপ তার প্রমাণ। এই ধ্বংসস্তূপের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম, এর অবশ্যই সংরক্ষণ হওয়া উচিত। প্রাচীন মুদ্রা, ধাতুর অলংকার, পাথরের সিলমোহর—এই জাতীয় প্রত্নদ্রব্য যে এখান থেকে বহুল পরিমাণে খুঁড়ে বের করে নেওয়া হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। ইসলাম আখুন বর্ণিত ধ্বংসস্তূপের তালিকায় এই অঞ্চল ছিল। এখান থেকেও সে কাগজের ব্লক-প্রিন্ট পেয়েছিল বলে জানিয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তার দাবি সঠিক নয়, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বলেছে। এই অঞ্চলের আবহাওয়ায় কাগজের প্রাচীন ব্লক-প্রিন্ট টিকে থাকা সম্ভব নয়।
আমি হন্যে হয়ে কাকশালের ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম যদি কোনো বিশেষ ধরনের নমুনা খুঁজে পাই। কিন্তু সময়ের অভাব টের পাচ্ছিলাম। আমাদের গন্তব্য মোজি এখান থেকে বহুদূর, ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে অনেক। একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতা গ্রাস করে রেখেছিল আমাকে। সম্পূর্ণ জনমানবহীন জায়গাটা একসময় ঘনবসতি ছিল। আমার লোকেরা একের পর এক কারুকার্য করা মাটির পাত্রের নমুনা ধ্বংসাবশেষ থেকে খুঁড়ে বার করছিল আর আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। জায়গাটা ছেড়ে এগোনোটাই কষ্টকর হয়ে উঠল। দিন শেষের সূর্যের নরম লাল আলো ততক্ষণে ভাঙা পাত্র আর হলুদ বালির ওপর একটা অবর্ণনীয় রঙের ছোঁয়া দিয়েছে।
একের পর এক বালি পাহাড়ের জন্য হালকা আলোয় সামনের পথ চেনাই দুরূহ হয়ে উঠেছিল। বেশ কয়েক মাইল ধু ধু বালির সাম্রাজ্য ধরে চলার পর দেখা মিলল সামান্য ঝোপঝাড়ের। আমরা পৌঁছলাম চুড্ডা নামের ছোট্ট এক গ্রামে। ঝকঝকে চাঁদের আলোর ভরসায় গ্রামের পাশ দিয়ে টাট্টুঘোড়ার পিঠে এগিয়ে চলেছিলাম নিঃশব্দে। নির্মল আকাশে চাঁদ সঙ্গ দিচ্ছিল আমাদের, ফলে পথ হারানোর ঝুঁকি কমে গেছিল অনেকটাই। রাত আটটা নাগাদ পৌঁছেছিলাম মোজিতে। আমার দলের আগে আসা লোকেরা তাঁবু খাটিয়ে বসে ছিল আমাদের অপেক্ষায়।
আমার কাছে নিয়ে আসা স্তূপীকৃত পুরোনো মুদ্রা দেখে ৭ তারিখ আমি মোজিতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। মুদ্রাগুলো মুসলমান শাসনের শুরুর দিককার কিংবদন্তির শাসক সুলাইমান খাগানের সময়ের। যেখান থেকে এগুলো তুলে আনা হয়েছে সেই তোগুজাই এখান থেকে উত্তরে মাইল খানেক দূরে অবস্থিত। জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখা দরকার ছিল। তোগুজাইয়ের শুকনো নদীখাতের ধারে পৌঁছে দেখি গতকাল দেখা ভাঙা মৃৎপাত্রের মতো অসংখ্য মাটির পাত্র পড়ে। কিন্তু এগুলো গতকালের জায়গায় দেখা পাত্রের মতো অত ভাঙাচোরা নয়। সম্ভবত এখানে কাকশালের মতো অতটা ক্ষয় হয়নি। গত গ্রীষ্মে নদীখাত প্লাবিত হওয়ার পর জল সরে গেলে নদীখাতের ধারের এক জায়গা থেকে এই প্রাচীন মুদ্রার সন্ধান পাওয়া গেছিল। বন্যার ফলে নদীখাতের ওপর জমে থাকা পলি সরে গেছিল অনেকটা।
স্থানীয় বেগের নির্দেশে গ্রাম থেকে বেশ কিছু লোক আমার সঙ্গে এসেছিল জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। আমার সামনেই গ্রামের লোকগুলো নদীর ধার থেকে কারুকাজ করা অসংখ্য উজ্জ্বল মাটির পাত্র কুড়িয়ে আনছিল, শুকনো নদীখাত খুঁড়ে তুলে এনেছিল আধ ডজন মতন তামার মুদ্রা। কোনো সন্দেহ নেই, কালের গতিতে নদীর বুকে জড়ো হওয়া এই মুদ্রা আর মাটির পাত্র একই ধ্বংসাবশেষের। এই নমুনাগুলো অন্যান্য ধ্বংসস্তূপের কালানুক্রম তৈরিতে সাহায্য করবে। নদীখাতের বালি খুঁড়তে মৃৎপাত্র আর মুদ্রার সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল ভাঙা কাচ আর অল্পসল্প জেড পাথরের টুকরো। এই কাচের টুকরোগুলোর কয়েকটার বর্ণচ্ছটার সঙ্গে প্রাচীন পশ্চিমের কাচ দিয়ে তৈরি জিনিষের মিল পেলাম। কাচশিল্প তুর্কিস্তানের অতি প্রাচীন অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিস্মৃত এক শিল্প।
তোগুজাই থেকে গেছিলাম মাইল দেড়েক উত্তর-পূর্বে আর একটি ধ্বংসাবশেষ দেখতে। হাসা নামে পরিচিত জায়গাটার উল্লেখ ডঃ হেডিন তাঁর লেখায় করে গেছেন। নিঃসন্দেহে হাসা একটি মুসলমান কবরস্থান। কিন্তু এর প্রাচীনত্ব আন্দাজ করা মুশকিল। ছোট্ট টিলার মাথায় অজস্র মাথার খুলি আর কঙ্কাল ছড়িয়ে। কাঠের পাটাতনে ঢাকা অনেকগুলো কবরের একটার আচ্ছাদন সরাতে দেখতে পেয়েছিলাম কাপড়ে জড়ানো এক শিশুর কঙ্কাল। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শিশুটির মাথা কিবলার (কাবা) দিকে করা ছিল।
এই কবরগুলো শহিদদের হওয়ার কথা, অর্থাৎ কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে যারা মারা গিয়েছিল। সাধারণত এই ধরনের কবর নাড়াচাড়া করতে গেলে ধর্মীয় বাধা আসে, কিন্তু আমার সঙ্গে আসা মোজির গ্রামবাসীরা আমি কবরস্থানে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও কোনো বিরুদ্ধাচারণ করেনি। এটি প্রমাণ করে, ধর্মীয় উগ্রতা ও কুসংস্কার এখানে এখনও গেড়ে বসেনি। মরুভূমি মৃত ব্যক্তিদের বিশ্রামস্থলের ওপর পুরু বালির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। নির্জনতা গাঢ় হয়ে চেপে আছে চতুর্দিকে। ধুলো-মাখা আকাশে ফ্যাকাসে ভাব সবসময়।
এখান থেকে পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায় না। যদিও কারাকোরাম যাওয়ার পথ যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেই সাঞ্জু, মোজি থেকে মাইল বারো দক্ষিণে। আমার ধারণা, হিউয়েন সাঙ পো-কিয়া-ই বলে যে জনপদের উল্লেখ করছিলেন, তা হল মোজি। সেখানে তাঁর সময়ে কাশ্মীর থেকে আনা এক প্রসিদ্ধ বুদ্ধমূর্তি এখানে পূজিত হত।
৮ অক্টোবর নুড়ি-পাথরভরা দশত দিয়ে চোদ্দ মাইল মতো পথ চলে পৌঁছলাম জাঙ্গুয়াতে। রাস্তাটায় ঝোপঝাড় কম। গ্রামে ঢোকার ঠিক আগে যে নালাটা পার হয়েছিলাম সেটা পুরো শুকনো ছিল। এই মরশুমে সেচের কাজেই নালার জল ব্যবহার করা হয়ে গেছে। পাঁচশোর বেশি পরিবারের বাস জাঙ্গুয়া মরূদ্যান ও লাগোয়া গ্রামগুলোতে। ভিড়ে ভরা গ্রামের বাজার পার করে গ্রামের পুবদিকের শেষ প্রান্তে এক লুসার্নের খেতের ধারে আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম।
শেষ বিকেলে গ্রাম থেকে মাইল দু-এক উত্তর-পশ্চিমে মরুভূমির প্রান্তে একটি ধ্বংসস্তূপ দেখতে গেছিলাম। কুল-লঙ্গর নামের জায়গাটায় অনেক প্রাচীন মৃৎপাত্রের পাশাপাশি দুটো বড়ো বুঁজে যাওয়া জলাশয়ের চিহ্ন নজরে এসেছিল।
৯ অক্টোবর সকালে যাত্রা শুরু করি পিয়ালামা যাব বলে। পিয়ালামা মরূদ্যান জাঙ্গুয়া থেকে উনিশ মাইল দূরে। প্রথম কয়েক মাইল পথ গিয়েছিল সেচযুক্ত খেতের মাঝ দিয়ে। কিন্তু সেচের জল যেহেতু কম পাওয়া যায় তাই প্রতিবছর মরূদ্যানের চারপাশের জমিগুলোতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাষযোগ্য করা হয়। এই বছর এই খণ্ড জমিটায় চাষ হল তো পরের বছর তার পাশের খণ্ডটায়। এতে করে নাকি জমিতে বেশি ফসল পাওয়া সম্ভব। ধীরে ধীরে পিয়ালামা পর্যন্ত অনুর্বর দশতকে যতটা সম্ভব সেচের আওতায় আনার চেষ্টা হচ্ছে।
আধা রাস্তা পার হতে দশত শেষে আবার বালু সাম্রাজ্যে পড়েছিলাম। তবে বালি পাহাড়গুলো এখানে খুব একটা উঁচু নয়। মরুপথ ধরে চলতে চলতে আমরা পৌঁছেছিলাম একটা ঢিবির মাথায়। বেলকুম নামের জায়গাটার অর্থ ‘বালি পাহাড়ের চূড়া’।
এখান থেকে কয়েক মাইল এগোনোর পর আমরা পৌঁছেছিলাম কারাকির-এ। এখানে একটা প্রাচীন ঢিবি বা স্তূপ রয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেলেও বালি পুরোপুরি ঢেকে ফেলতে পারেনি এর অস্তিত্বকে। এখনও স্তূপের শীর্ষদেশ বালি থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। অক্ষত অবস্থায় এই ঢিবির কাঠামো ৬৫ বর্গফুট মতো ছিল বলে আমার মনে হল। কাঠামোর ইটের মাপ প্রায় মাউরি টিমের ইটের মাপের মতো।
পিয়ালামা একটা শ-খানেক ঘরের ছোটো গ্রাম। এটাই কারগালিক জেলার পুবের দিকের শেষ মরূদ্যান। গ্রামের মধ্যে এক ছোট্ট ফলের বাগানে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম। সেখানের পিচফলের গাছে তখনো সুস্বাদু পিচফল ভরে আছে।
বাগান মালিক তার ঘরগুলো আমার পরিচারকদের থাকার জন্য খুলে দিয়েছিল। ঘরগুলোর মেঝের খানিকটা অংশ খাটের মতো উঁচু। সেই জায়গায় দ্রুত বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল মোটা তোশক আর তার ওপর পেতে দেওয়া হয়েছিল পশমের গালিচা।
আমি যতবার পরিচারকদের থাকার ঘরগুলোর পাশ দিয়ে গেছি ততবার অবাক হয়ে দেখেছি স্থানীয়দের জীবনযাত্রার উচ্চতর মান। শুধুমাত্র জীবনযাত্রার মানই নয়, কৃষিভিত্তিক তুর্কিস্তানের ঘরবাড়িও অনেক উচ্চমানের, অন্তত ভারতের সমশ্রেণির জীবিকাধারীদের তুলনায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন