ষড়বিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

কাঠ ও চামড়ায় লেখা প্রাচীন নথির পাঠোদ্ধার

অভিযান বৃত্তান্ত লেখার সময় আমার উদ্ধার করা এইসব নথির পাঠোদ্ধার করা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। তা আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। উদ্বেগ ছিল এই নথিগুলো ছাড়াও উদ্ধারকৃত অসংখ্য প্রত্ন-সামগ্রীর বিশ্লেষণ ও যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা নিয়ে। আমি খননের সময় বা অভিযানের ফাঁকে ফাঁকে সেসব ওপর ওপর দেখতে পেয়েছিলাম। আমার বন্ধু ব্রিটিশ মিউজিয়ামের মিঃ ই. জে. র‍্যাপসন এগিয়ে এসেছিলেন খরোষ্ঠী নথির এপিগ্রাফিক পাঠোদ্ধারে। তাঁর হাতেই সঁপে দিয়েছিলাম সব প্রাচীন নথি। নিরলস উদ্যম নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ শ্রমসাধ্য গবেষণা করে বছর খানেকের মধ্যে যে সামান্য তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল তাঁর অনুমতি নিয়ে তা এখানে তুলে দিলাম। এই গবেষণা সহজে শেষ হবার নয়।

আমার অনুমানের সঙ্গে মিঃ র‍্যাপসনের বিশ্লেষণ অধিকাংশটাই মিলে গিয়েছিল জেনে তৃপ্তি পেয়েছিলাম। কাঠ ও চামড়ার ওপর খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা ভাষা আসলে প্রাচীন ধরণের প্রাকৃতভাষা (ভারতীয়) এবং তাতে একটা বিরাট অংশ জুড়ে সংস্কৃত শব্দ। চিঠি ও বিবরণীর শুরুতে বর্তমানের বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার মতোই সম্ভাষণ রয়েছে, যা প্রাচীন ভারতীয় ধ্রুপদি কাল থেকেই চলে আসছে। লেখার ধরন দেখে এগুলোকে অফিসিয়াল চিঠি ও রেকর্ড বলে মনে হয়েছিল। অধিকাংশ নথি ছিল প্রশাসন, পুলিশ, অভিযোগ, আদালতের সমন, আচরণ-বিধি সংক্রান্ত। ছিল আয়-ব্যয়ের হিসেব, চুক্তি, বন্ড, পেমেন্ট রিকুইজিশন, শ্রমিকদের তালিকা ইত্যাদি। সাধারণত এগুলো নানা মাপের একক ট্যাবলেটে ‘কলম’ এর মধ্যে লেখা ছিল। প্রতিটির শেষে ছিল নানা সংখ্যা-চিহ্ন।

খরোষ্ঠী লিপির নথির পাঠোদ্ধার খুব জটিল ব্যাপার। অধিকাংশ জড়িয়ে লেখা ও প্রাকৃত-সহ অন্যান্য উপভাষার মিশ্রণও তার সঙ্গে ছিল। বেশ কিছু শব্দ উচ্চারণ করাই কঠিন। কিন্তু তবুও এইসব নথি থেকে যা তথ্য পাওয়া গেছিল তা অতি আকর্ষণীয়।

ভারতীয় অভিবাসন পরিচায়ক নথি

অধিকাংশ নথি শুরু হয়েছে আদেশকারী হিসেবে উপাধি-সহ শাসকের নাম ও তারিখ দিয়ে। ‘মহারাজা’, ‘দেবপুত্র’...এই জাতীয় সম্পূর্ণ ভারতীয় উপাধি। এইসব উপাধি খ্রিস্ট-পরবর্তী প্রথম কয়েক শতাব্দী ধরে উত্তর-পশ্চিম ভারত, আফগানিস্তান জুড়ে কুষাণ ও ইন্দো-সিথিয়ান শাসকদের মধ্যে বহুল প্রচলিত ছিল। যাদের কাছ থেকে বা যাদের থেকে এইসব নথি গেছিল বা এসেছিল, তাদের মধ্যে স্বাক্ষরকারী হিসেবে খাঁটি ভারতীয় নাম দেখা গেছে। উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ‘কুষাণ-সেনা’ শব্দটি, যা বলে দেয় সুদূর দক্ষিণ-পশ্চিমে ইন্দো-সিথিয়ান/ কুষাণ প্রভুদের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগ ছিল।

ভারতীয় নামের পাশাপাশি অনেক অ-ভারতীয় স্বাক্ষরকারীর নামও পাওয়া গেছে যেমন চোড়বো, শোধোগা, কালা ইত্যাদি। পদাধিকারীদের নামের স্বাক্ষরের নীচে অনেক ভারতীয় পদের উল্লেখ পাওয়া গেছে যেমন ‘রাজদ্বার-পুরস্থিতা’, (রাজকীয় ন্যায়-আদালতের সভাপতি) ‘দিবির’ (করণিক) ইত্যাদি। পত্রবাহকদের ‘লেখহরক’ বলা হয়েছে যা পুরোপুরি সংস্কৃত। অনেক পত্রই শুরু হয়েছে একই ধরনের সম্মানসূচক সম্বোধন দিয়ে যেমন ‘প্রিয়দর্শন’, ‘দেবমনুষ্য-সম্পূজিত’, ‘প্রিয়দেবমনুষ্য’ ইত্যাদি। অধিকাংশ পত্রের শুরুতেই রয়েছে স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক কুশল কামনা যা আমি আমার কাশ্মীরি পণ্ডিত বন্ধুদের আমাকে সংস্কৃতে পাঠানো চিঠির সৌজন্যে পরিচিত ছিলাম। আবার কিছু নথিতে এই ধরনের সম্ভাষণ ছিল না, ছিল অফিস মেমো নাম্বার, হলফনামা নাম্বার, সাক্ষীর সই ইত্যাদি।

একটি ছোটো আয়তাকার ট্যাবলেটে বা ফলকে বন্ধক-সংক্রান্ত কিছু তথ্য ছিল। তারিখের উল্লেখ ছিল রাজা জিত্রঘবর্ষমানের নবম বছর হিসেবে। তাতে লেখা ছিল কোনো এক বৌদ্ধ শ্রমণ আনন্দসেনার দাস বুদ্ধঘোষ কিছু গৃহস্থালির সামগ্রী বন্ধক রেখে অর্থ নিয়েছে। সেই ট্যাবলেটে বন্ধক রাখা সামগ্রীর ফিরিস্তি আর তাদের মূল্য লেখা ছিল। তাতে ছিল ভেড়া, বাসনপত্র, পশম বোনার যন্ত্রপাতি, ‘নামাদি’ ইত্যাদি। আমরা সহজে ‘নামদা’ নামের একধরনের পশমের কম্বলকে চিনতে পারলাম যা একসময় শুধু দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় ব্যবহার হত। এখনো খোটান অঞ্চলে এই ধরনের পশমের কম্বল প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়ে লাদাখ ও কাশ্মীর অঞ্চলে রপ্তানি হয়। আরও একটি নথিতে সব স্থানীয় কর্মকর্তারা যথা ‘শোধগাস’ ও ‘দ্রাংগধর’-রা জলের অভাবের অনুযোগ করছে, তার উল্লেখ ছিল। উল্লেখ ছিল সেচের জল নিয়ে বিরোধের কথা।

ট্যাবলেটে বহুবার ‘খোটান’ শব্দের উল্লেখ দেখে পরিষ্কার যে এইসব জনবসতি খোটান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল এবং সাম্রাজ্যের নামের ধ্বনিগত সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। হিউয়েন-সাঙ-এর ভ্রমণ বৃত্তান্তে কুস্তানা(ক) নামেরও উল্লেখ আছে। কু-স্তন শব্দের সংস্কৃত ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘পৃথিবীর বক্ষ’। একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, এই বসতিগুলো গড়ে উঠছিল তথাকথিত চাষযোগ্য অঞ্চল থেকে বহুদূরে।

যেসব পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছিল তা থেকে বলা যায়, সে-সময় সব সরকারি নথিরই একটি নির্দিষ্ট নাম-তালিকা বা টার্মিনোলজি ছিল। যেমন, কীলক আকৃতির সিল করা ফলকের নাম ছিল ‘কিলা-মুদ্রা’, হাতল-সহ তখতা যা অফিস ফাইল হিসেবে ব্যবহৃত হত তার নাম ছিল ‘স্তোভানা’, আয়তাকার ফলক যা খামের আকারে পাঠানো হত তার নাম ছিল ‘লিহিতক’ বা চিঠি, চামড়ার ওপর লেখা নথির নাম ছিল ‘অনাদিলেখা’ অর্থাৎ ‘লিখিত উত্তর/আদেশ’ ইত্যাদি। এটা স্পষ্ট যে প্রাচীনকালের অফিসের কেরানিরা বর্তমান সময়ের বাবুদের মতোই আমলাতান্ত্রিক নিয়ম পদ্ধতি মেনে চলত।

খরোষ্ঠী নথি থেকে অল্প কিছু উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে প্রাচীনকালের মধ্য এশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার কথা। এই ইতিহাস সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। প্রাচীন ভারতের নথিতে তারিখ না থাকার ফলে উদ্ধার করা নথির বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাল মেলানো শুধু শ্রমবহুলই নয়, অসম্ভব ধৈর্য ও সময়সাপেক্ষ। এখানে পাওয়া অজস্র এইসমস্ত নথিগুলো থেকে একটি ঐতিহাসিক তথ্য পরিষ্কার হয়ে গেছিল যে প্রাচীন খোটান এলাকাতেয় একটি ভারতীয় ভাষার ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ব্যবহার ছিল। এর অর্থ একটাই যে শুধুমাত্র স্থানীয় কিংবদন্তী বা মহান পরিব্রাজক হিউয়েন-সাঙ-এর বক্তব্য নয়, প্রাচীন তিব্বতি গ্রন্থ অনুসারে, ভারতের একদম উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের তক্ষশিলা থেকে অভিবাসীরা গিয়ে প্রাচীন খোটান রাজ্যকে দখল করে পদানত করে রেখেছিল (খ্রিস্টের জন্মের আগে) প্রায় দুশো বছর ধরে। যেসব ফলকগুলো এখান থেকে উদ্ধার করা গেছে, তারা খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা। আসলে ভারতের যে এলাকায় খরোষ্ঠী লিপির প্রচলন ছিল, তার ঐতিহাসিক কেন্দ্র ছিল তক্ষশিলা।

আমাদের পাওয়া নথিপত্রে এই যে প্রাচীন ভারতীয় ভাষা এবং খরোষ্ঠী লিপি ব্যবহৃত হয়েছে, এ অঞ্চলে তা যে শুধুমাত্র বৌদ্ধধর্মের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে, এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি মানা যায় না। কারণ আমাদের হাতে আসা প্রমাণ অনুসারে বৌদ্ধধর্ম মধ্য এশিয়াতে এসেছিল ব্রাহ্মী লিপি ও ধর্মীয় ভাষা সংস্কৃতর হাত ধরে।

আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, হিন্দু কিংবদন্তিতে যাকে আবছাভাবে সুদূর উত্তরের বর্বরদেশের ‘বালির মহাসমুদ্র’ বলা হত, সেই দেশেই বালির গভীরে সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত ভারতীয় ভাষায় সঠিকভাবে রেকর্ডেড সবচাইতে প্রাচীন দৈনন্দিন জীবনের কথা (শিলালিপি ছাড়া)। এর আগে প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় এরকম রেকর্ডেড নথি অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি। আর সে কথা ভারতে এখনো কেউ জানে না।

প্রথম থেকেই এই কালানুক্রমিক সিদ্ধান্ত (chronological conclusion) নেবার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল। এখানে পাওয়া ফলক ও চামড়ার নথির খরোষ্ঠী লিপি খ্রিস্ট পরবর্তী দু’শতকে প্রচলিত উত্তর-পূর্ব ভারতের কুষাণ যুগের খরোষ্ঠী লিপির পুরাতত্ত্বগত বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে মিলে যায়। শুধু তাই নয়, আমাদের সৌভাগ্য যে এমন একটি খরোষ্ঠী ফলক পাওয়া গেছিল যাতে খরোষ্ঠী লিপির পাশাপাশি ব্রাহ্মী লিপিতেও কয়েক লাইন লেখা ছিল। কুষাণ যুগের এ ছিল এক বিশেষত্ব।

চিনা দিনতারিখ-যুক্ত নথি

ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া অসংখ্য তামার মুদ্রাও সময়ের হদিস দেয়। যদিও মুদ্রাগুলো ছিল চিনের হান সাম্রাজ্যকালীন যা ২২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শেষ হয়েছিল। কাঠ ও কিছু ক্ষেত্রে চামড়াকে লেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার পদ্ধতিও অতি প্রাচীনত্বকে সমর্থন করে। যদিও চিনা-তুর্কিস্তানে কাগজের ব্যবহার চতুর্থ শতাব্দী থেকেই শুরু হয়, কিন্তু এই প্রাচীন ময়লার স্তূপ থেকে এক টুকরো কাগজও আবিষ্কার করতে আমি সক্ষম হইনি।

এত কিছু প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও এই ধ্বংসস্তূপে পাওয়া চিনে অক্ষরে এক লাইন লেখা একটি কাঠ-খোদাই আমার কালানুক্রমিক-প্রমাণকে তর্কাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল। কাশগরে প্রাথমিক পরীক্ষার পর ব্রিটিশ মিউজিয়াম তাদের পরীক্ষায় জানায়, এটি কয়েকজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কিছু পথ ধরে ভ্রমণের অনুমতি - ব্যতিরেকে গ্রেফতারের হুকুমনামা। এতে প্রাচীন কিছু অঞ্চলের নাম যেমন কুচা, শেন-শেন, সু-লে (কাশগর) উল্লেখ ছিল। লোকদুটির পরিচয় ছিল ‘তা-ইউ-চি’ অর্থাৎ ইন্দো-সিথিয়ান। কিন্তু ভীষণ আনন্দ পেয়েছিলাম যখন বিশিষ্ট চীন-বিশেষজ্ঞ বা সিনোলজিস্ট ডক্টর এস. ডব্লিউ. বুশেল এইসব চিনা ফলক পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন যে এর মধ্যে একটিতে সময়কাল উল্লেখ আছে। আমার বন্ধু প্রফেসর শাভানও এই ফলকের শুরুর দিকের অক্ষরগুলো পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, এই হুকুমনামা তাই-শি রাজত্বের সম্রাট উ-তির শাসনের পঞ্চম বছরকে নির্দিষ্ট করেছে যা ২৬৯ খ্রিস্টাব্দ বলে ধরা যেতে পারে। অবশেষে এই তারিখ যুক্ত নথি থেকে এতগুলো ফলকের সঠিক সময়কালের দিশা পাওয়া গিয়েছিল। আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার করা অসংখ্য খরোষ্ঠী ট্যাবলেটগুলো বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ কালানুক্রমিক বিবরণ নির্ধারণ করা সম্ভব, কিন্তু তা যথেষ্ট সময়, পরিশ্রম ও ধৈর্য-সাপেক্ষ।

এই অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও একটা ঐতিহাসিক বিষয়ে আমি এখানে আলোচনা করতে চাই। আমরা চিনা ইতিহাস থেকে জানি যে পূর্ব তুর্কিস্তানের ওপর চিনের রাজকীয় শাসন সুদৃঢ় হয়েছিল পরবর্তী হান রাজবংশের আমলে (সময়কাল ২৪-২২০ খ্রিস্টাব্দ)। যদিও এই শাসন পরে দুর্বল হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে অনেক ছোটো ছোটো ও দুর্বল রাজবংশ এই এলাকায় শাসন করতে থাকে। পরবর্তীতে তাং রাজবংশের সময়কালে (৬১৮ খ্রিস্টাব্দ) এখানে ফের শক্তিশালী চিনা শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। উ-তি (Wu-ti) (২৬৫-২৯০ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন পশ্চিম সিন রাজবংশের (Western Tsin Dynasty) প্রথম সম্রাট যিনি পশ্চিমদিকের প্রদেশগুলোতে চিনা কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কথা লিপিবদ্ধ করে যান। ধ্বংসস্তূপের আবিষ্কার থেকে এটা পরিষ্কার যে এই প্রাচীন জনপদে চিনা সেনার উপস্থিতি ছিল এবং সম্ভবত খোটানের অন্যান্য অনেক এলাকায় তা ছড়িয়ে ছিল। যদিও এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে উ-তির সময়ের অনেক পর পর্যন্ত এইসব জনপদ বাসযোগ্য ছিল। হতে পারে এইসব জনপদ পরিত্যক্ত হওয়া এবং তৎসহ গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল খোটান অঞ্চলে চিন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব প্রত্যাহার।

ঐতিহাসিক ঘটনা যাই হোক না কেন, আবর্জনার স্তূপ থেকে পাওয়া নমুনা যথেষ্ট ছিল প্রাচীন চিনের সঙ্গে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক লেনদেন প্রমাণ করার জন্য। বার্নিশ করা নানা অসাধারণ সব সামগ্রী, সূক্ষ্ম রেশমের কাপড়ের ফালি, সবুজ ও হলুদ কাচের টুকরো যা অন্যান্য ধ্বংসস্তূপ থেকেও পাওয়া গেছে তা একমাত্র চিন সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল থেকেই আসা সম্ভব। আবর্জনার স্তূপ থেকে পাওয়া একটি চিনামাটির সিলমোহর, চিন দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে যে মরুভূমির মধ্যিখানের এইসব বসতিতে নানা বস্তু আমদানি হত সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।

প্রাচীন কলকারখানার পুরা-নিদর্শন

আরও এমন অনেক জিনিস পাওয়া গেছিল যা স্থানীয়ভাবে তৈরি হত বলেই মনে হয়। ধ্বংসস্তূপের মাটির পাত্রের টুকরোর সঙ্গে মিশে ছিল তুলোর লেপ ও সূক্ষ্ম রঙিন কাজ করা পশমের কম্বলের ছেঁড়া অংশ, কাঠের খাওয়ার কাঠি ও তুলো পাকানোর যন্ত্র, চামড়ার জুতোর অবশিষ্টাংশ, মহিলাদের লাল রঙের ‘চারুক’ ঢঙের চপ্পল যা এখনও এই অঞ্চলের মহিলাদের মধ্যে জনপ্রিয়, পুরু কাঠের টাট্টুঘোড়ার চিরুনি, হাড় থেকে তৈরি চামচ-সহ দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রী। পাওয়া গেছিল ভেড়ার হাড় থেকে তৈরি প্রচুর সংখ্যক পাঁচগুটি খেলার উপকরণ—লাল-হলুদ রঙের ফুটকি দেওয়া পাশা বা জুয়াখেলার ঘুঁটি। যা প্রমাণ করে যে পাশা বা জুয়াখেলা এই অঞ্চলে সে-সময়কার পরিবারের মধ্যে প্রচলিত ছিল। পাওয়া গেছিল হাতির দাঁতের বিশেষ আকৃতির ঘুঁটি, যা এখনো ভারতে জনপ্রিয়।ঘরের আবর্জনা পুরো পরিষ্কার হতে ঘরের এক কোনায় দেখা গেছিল ৩ ফুট উঁচু ৫ ফুট গোল পুরু মাটির দেওয়ালের বিশাল এক চৌবাচ্চা। ঘরের মূল মেঝে থেকে যা আরও ১০ ইঞ্চি গভীর। তাই দেখে মজুরেরা সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল, এটা ফুল বা পাতা জলে ভিজিয়ে রাখার জায়গা। নিয়া অঞ্চলের ধনী লোকেদের বাড়িতে এই ধরনের চৌবাচ্চা দেখা যায়। উড়ে আসা আলগা বালিতে ভরে থাকলেও চৌবাচ্চাটা অটুট ছিল। অন্যান্য ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়ে গেলেও যা পাওয়া গেল, তা আমাদের জন্য কম কিছু ছিল না। ঘরের এক কোনায় একগুচ্ছ খড় পড়ে ছিল। সম্ভবত ঘরের চাল থেকে খসে পড়েছিল। খড়গুলোর মধ্যে তখনও গমের দানা লেগে। খড়গুলো এখনও খাওয়ার অবস্থায় আছে কি না তা পরখ করার জন্য অবশ্য দান্দান-উইলিকের তুর্দির টাট্টুঘোড়ার মতো মৃতপ্রায় কোনো টাট্টু সঙ্গে ছিল না। তুর্দির টাট্টু ঘোড়ার কথা মনে হতেই দেখি তুর্দি, ‘তাকলামাকানের আকসকল’, যে-নামে সবাই ওকে সম্মান করে, সে আমার জন্য মাস খানেক ধরে জমা হওয়া একগুচ্ছ চিঠি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে খোটান থেকে ফিরে এসেছে।

এই ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা সব জিনিসপত্রের বিস্তারিত উল্লেখ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের দ্বিতীয় শিবির থেকে প্রায় দেড় মাইল উত্তর পর্যন্ত অর্ধবৃত্তাকার জায়গা জুড়ে বালির বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল বাতিল আর ফেলে দেওয়া নানা সামগ্রী। প্রচুর আকর্ষণীয় প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গেলেও রেকর্ডে সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ লেখা হয়নি। প্রায় দু-ডজন ফলক পাওয়া গেছিল। তার একটি পাওয়া গেছিল উত্তরের এক বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে। গুরুত্বপূর্ণ এই ফলকে খরোষ্ঠী লিপির পাশাপাশি ব্রাহ্মী অক্ষরও ছিল, যার কথা আগে বলেছি। এই বাড়িতে পাওয়া গেছিল বিশাল করবেলের আকারে বেশ কিছু ফুলের অলংকরণ করা কাঠ খোদাই, যা অনেকটাই প্রাচীন গান্ধারের গ্রেকো-বৌদ্ধ ভাস্কর্যের অনুকরণ। এই বাড়িতেই পাওয়া গেছিল জুতো তৈরির কাঠের ফর্মা, বুট-লাস্ট সহ একটি কাঠের আলমারি। এই বাড়ির পূর্বদিকে কয়েকশো ফুট দূরে উঁচু বালির টিলার কাছে ৪৮ বর্গফুট মাপের একটি জলাধারের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছিল। যে পপলার গাছটি জলাধারকে একসময় ছায়া দিত, তা মৃত অবস্থায় এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি বালির নীচে খুঁজে পাওয়া প্রতিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোর পরীক্ষা শেষ হবার পর এক উঁচু বালির টিলার মাথায় চেপে ফিল্ড গ্লাস দিয়ে মরুভূমির মধ্যে আরও ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন আছে কি না খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ধু-ধু বালির বুকে বিশাল বিশাল বালির পাহাড় ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি।

এ ক’দিন আবহাওয়া আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা শুধু রাত আর সকালের তাপমাত্রা নেমে যেত -৬০ থেকে -৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-২১ থেকে -২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। ১১ ফেব্রুয়ারি সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং তাঁর তীক্ষ্ণ খালি চোখে নিয়ার দক্ষিণে প্রায় ১২০ মাইল দক্ষিণের বরফ-ঢাকা পাহাড়ের চূড়া দেখতে পেয়েছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় আবহাওয়া কেমন পরিষ্কার ছিল। যদিও জানা ছিল এই পরিষ্কার আবহাওয়া বেশিদিন থাকবে না, শীত চলে গেলেই শুরু হয়ে যাবে বালি-ঝড়। তখন অনুসন্ধান চালানো আর সম্ভব হবে না। তাই গরম আসার আগে যতগুলো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালানো সম্ভব তা সেরে নিতে চাইছিলাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%