মার্ক অরেল স্টাইন
কারাডং ছাড়ার পর আমার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ মরুপ্রদেশ। এখানে ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের আশেপাশে বেশ কিছু ধ্বংসস্তূপ আছে। আমার প্রথম কাজ ছিল প্রাচীন শহর পি-মোর অনুসন্ধান। হিউয়েন-সাঙ খোটান থেকে নিয়ার পথে এই শহরে গিয়েছিলেন। মার্কো পোলোও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে ‘পেইন’ শহরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সম্ভবত এই দুটিই একই শহর। বিশাল মরুভূমির মাঝে এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসস্তূপের অবস্থান খুঁজে বের করা সবচাইতে কঠিন। হিউয়েন-সাঙ পি-মোর অবস্থান উল্লেখ করেছিলেন খোটানের রাজধানী থেকে ৩০০ ‘লি’ অর্থাৎ প্রায় ৬০ মাইল পুবদিকে যা কেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমদিকে হবার সম্ভাবনা বেশি। শেষবার যখন কেরিয়ার আম্বানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখন তিনি এক ‘কোন-শহর’-এর কথা বলেছিলেন যা কেরিয়া শহর থেকে খোটানের রাস্তায় ৩০ মাইল পশ্চিমে গুলাখমার মরূদ্যান ছাড়িয়ে বালির মাঝে পড়ে আছে। রাম সিংও এই ধ্বংসাবশেষের কথা শুনেছিলেন। সময় বাঁচাতে মরুভূমির মাঝখান দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে এগোব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।
চারদিন ধরে কেরিয়া দরিয়ার ধার ধরে উট আর টাট্টুঘোড়া বাহিনী নিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত ছুটছিলাম। নদীর পাশের জঙ্গলে বসন্তের আভাস যদিও এখনও দেখা দেয়নি। কারাডং-এর বালু-ঝড়ের পরে তাপমাত্রাও খুব একটা বাড়েনি। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এমনকি ১৯ মার্চ তুষারপাতও হয়েছিল।
বুরহানুদ্দিন মাজারের আগে দলে দুজন গাইড যোগ দিয়েছিল। আম্বানের নির্দেশে গুলাখমাতের বেগ ওদের পাঠিয়েছিল। ওদের সঙ্গে কথা বলে টের পেয়েছিলাম যে রাস্তায় যেতে চাইছি সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ওদের নেই। নিজেদের অজ্ঞতা লুকোতে ওরা আমাদের ভয়ংকর তাকলামাকানের সংক্ষিপ্ত মরুপথ এড়িয়ে আরও দক্ষিণের সহজ পথ ধরে নিয়ে যেতে চাইছিল যা অনেক সময়সাপেক্ষ।
২৩ মার্চ নদীর বাঁ তীর ছেড়ে উঁচু বালিয়াড়ির বলয় পার করে কেরিয়ার দক্ষিণে শিভুল নদীর জলে পুষ্ট জলাভূমিতে পৌঁছলাম। অনেক জায়গা জুড়ে থাকা এই বিশাল জলাভূমি পার হতে গুলাখমাতের দুই গাইডের স্থানীয় জ্ঞান খুব কাজে লেগেছিল। ওদের সাহায্য ছাড়া জলার নরম বালি-কাদার মধ্যে দিয়ে উট, টাট্টুঘোড়া-সহ পার হতে গিয়ে বিপদ হতে পারত।
জলা পার হয়ে চারণভূমির মাঝে অসংখ্য ভেড়ার পায়ের ছাপ দেখলেও একটিও ভেড়া বা চারণদারের দেখা পাইনি যাদের কাছ থেকে পথের হদিস পাওয়া যায়। শীত যে এখনও বিদায় নেয়নি! শক্ত চারণভূমির মাঝবরাবর শিভুল দরিয়া এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে। নদী চওড়ায় খুব বেশি হলে ফুট পনেরো। এই নদী আমাদের গাইডদের পথ দিখিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছিল।
এই নদীর কিনারা ঘেঁষে সন্ধের আগে আগে আরিশ-মাজারে পৌঁছেছিলাম। এত বড়ো দল দেখে নির্জন মাজারের দেখভালকারী শেখ খুব ঘাবড়ে গিয়েও সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। প্রথমেই বড়ো আগুনের কুণ্ড তৈরি করেছিল, যাতে রাতের অন্ধকারে পিছিয়ে থাকা দলের সদস্যদের পথ চিনতে ভুল না হয়। ক্লান্ত টাট্টুঘোড়াদের জন্য অল্প হলেও আহারের ব্যবস্থা করেছিল।
গাইডদের ওপর ভরসা না থাকায় মাজারের রক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করে নিজের বিচারবুদ্ধিতে মরুভূমির বালিময় জঙ্গল-পথ ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে চলতে শুরু করেছিলাম। একটু পরেই কারাকি দরিয়ার জলাভূমি পড়ল। তামারিস্ক ঝাড়ে ভরা শঙ্কু আকৃতির বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে চলেছি। এই ধরনের বালিয়াড়ি সাধারণত মরুভূমির সীমান্ত বরাবর দেখা যায়। চলতে চলতে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেছিলাম, যে-অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছি তা আসলে এক পুরোনো জনপদের ধ্বংসস্তূপ। ইতিউতি ছড়িয়ে ভাঙা মাটির পাত্র, পেতলের আংটি, কাচের টুকরো আর বালি থেকে জেগে থাকা মাটির দেওয়ালের অংশ।
দারোগা ইব্রাহিম জঙ্গলের মধ্যে এক ভীত পশুপালককে দেখতে পেয়ে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেও এই জায়গাটিকে ‘তাতিলিক’ বা ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কোনো তথ্য জানতে পারেনি। সম্ভব হয়নি কুড়িয়ে পাওয়া মাটির পাত্রের টুকরো বা আংটি থেকে এই পরিত্যক্ত বসতির সময়কাল সম্পর্কে কোনো ধারণা করা।
এই ধ্বংসস্তূপের পেছনে দেবার মতো সময় আর হাতে ছিল না। দলবল নিয়ে ফের দ্রুত চলা শুরু করেছিলাম জঙ্গলের বালি-পথ ধরে। চলতে চলতে পৌঁছে গেছিলাম চাষ জমিতে, এসেছিল মালাকালাগান গ্রাম। প্রায় ১৫ বছর আগে খোটান-কেরিয়া পথের প্রধান মরূদ্যান ডোমোকোর কিছু লোক নদী থেকে খাল খুঁড়ে সেচের ব্যবস্থা করে জমিকে চাষযোগ্য করে এই গ্রাম বানিয়েছিল। কঠোর পরিশ্রম করে মরুভূমির জমিকে এইভাবে চাষের উপযোগী করে তোলা সত্যিই শিক্ষণীয়। তামারিস্ক গাছের ঝোপওয়ালা বালিয়াড়িকে বেড় দিয়ে ছোটো ছোটো নালা কাটা হয়েছে। যদিও পুরো অঞ্চলটা এখনও সমান করা হয়নি। তোঘরাক গাছের জঙ্গল বালিয়াড়ির কোল ঘেঁষে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। বসতের কাছে এই জঙ্গল আরও ঘন হয়েছে। সেচ নালার ধার ঘেঁষে লাগানো হয়েছে পপলার, জিগড়া-সহ নানা ফলের গাছ। পরিকল্পনায় কোনো খামতি রাখেনি গ্রাম-স্থাপনকারীরা।
শুধু এইটুকু জানা ছিল, আমি যে-ধ্বংসস্তূপ খুঁজছি তা লাচিন-আতার মাজারের আশেপাশে কোথাও হবে। মালাকালাগান গ্রামের লোকেদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছিলাম, আমি যে ‘কোন-শহর’-এর খোঁজ করছি, তার কথা শুনলেও গ্রামের কেউ ওই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপে যায়নি বা তার সঠিক অবস্থানও জানে না। আমার দুই গাইডও এই ধ্বংসস্তূপে কী করে পৌঁছানো যায় তার হদিস করতে পারেনি। যদিও এই অঞ্চল ওদের অপরিচিত নয়।
সময় দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছিল, তাই ২৫ মার্চ এই গ্রাম ছেড়ে আন্দাজে ভর করে রওনা দিয়েছিলাম।
এখানেই ‘মেল-ডিউটি’-তে থাকা ধন-সন্ধানী তুর্দি খোটান থেকে আবার আমাদের দলে এসে যোগ দিয়েছিল। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল খোটানে ছেড়ে আসা দুটো জলের ট্যাঙ্ক। ডোমোকোর লোকেদের সঙ্গে কথা বলে আর নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তুর্দি পথের দিশা অনেকটাই আন্দাজ করে নিল। গ্রাম ছাড়ার আগে ছ’টা ট্যাঙ্কে জল ভরে নেওয়া হয়েছিল ঝুঁকি কমানোর জন্য।
গত তিনদিন ধরে অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় কাটালেও যা অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে তাতে শারীরিক আর মানসিক ক্লান্তি কেটে গেছিল। কয়েক মাইল উত্তর-পশ্চিমদিকে চলার পর পৌঁছেছিলাম সদ্য সেচের আওতায় নিয়ে আসা এক অঞ্চলে। অবাক লাগল, নতুন করে সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা শুরু হলেও এখানে পুরোনো সেচ ব্যবস্থা ও চাষের চিহ্ন এখনও স্পষ্ট। পুরোনো চাষের খেত ভরে আছে কাঁটাগাছে। কাঁটাগাছের ঝোপের মধ্যে জমির উঁচু আল দেখা যাচ্ছে। চাষের খেতের মধ্যে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে ছোটো ছোটো শুকনো নালা। আমাদের গাইড জানিয়েছিল যে এটা ছিল ‘পোনক’ নামের এক গ্রাম যা ওদের দাদুর আমলে পরিত্যক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেও এটি একটি গ্রাম ছিল, কিন্তু কোনো কারণে লোকজন এখানে বসবাস করা ছেড়ে দেয়।
এরপরে এখান থেকে আরও তিন মাইল মতো উত্তরের দিকে এগিয়ে পৌঁছলাম আর একটা প্রায় পরিত্যক্ত গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে। গাইডরা বলেছিল, এই গ্রামের নাম ‘পুরোনো ডোমোকো’। ভেঙে পড়া গ্রামের মাটির বাড়ির মধ্যিখানে এই অঞ্চলের বর্তমানকালের গ্রামের মতো যে পরিকল্পিত রাস্তা, ফলের বাগান ছিল তা বোঝা যাচ্ছিল। প্রায় তিন মাইল জায়গা জুড়ে কবরস্থানের বিস্তার। বাড়ি ঘিরে চার থেকে পাঁচ ফুট উঁচু মাটির দেওয়াল প্রায় আস্ত রয়ে গেছে। অটুট বাড়ির মধ্যে ডাঁই করে রাখা কুমুশ গাছের শুকনো ডালপালা ও উঁচু অগ্নিকুণ্ড। শুধু বসতবাড়িগুলোর যেসব জিনিস এখনো বেশ মজবুত আছে, যেমন ঘরের চালের কাঠের বিম, দরজার পাল্লা ও চৌকাঠ ইত্যাদি উধাও হয়ে গেছে। সম্ভবত এই গ্রাম পরিত্যক্ত হবার আগে বাড়ির মালিকেরা এগুলো খুলে নিয়েছিল। বাড়ির উঠোনগুলোতে এতদিনে বালি জমতে শুরু করেছে, একদিন মরু থেকে উড়ে আসা বালির তলায় চাপা পড়ে গিয়ে ‘কোন-শহর’ হয়ে যাবে এই বসতিও।
গ্রামে যে দু-একজন লোক এখনও টিকে ছিল, তারা জানালো যে, এখানে নিয়মিত সেচের জল পেতে অসুবিধা দেখা দেওয়ায় ডোমোকো ও গুলাখমাতের বেগের নির্দেশে গ্রামকে বেশ কিছু বছর আগে প্রায় আট মাইল দক্ষিণে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওরা আরও জানালো, কেরিয়া থেকে চিরার মধ্যে ছোটো ছোটো মরূদ্যানগুলো নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও সেচের জল পাওয়ার ওপর নির্ভর করে প্রায়শই স্থান বদলায়। এই রীতি এই অঞ্চলে বহুকাল ধরে চলে আসছে। কোনো সন্দেহ নেই, সময়মতো বসতি অঞ্চলের স্থানান্তরকরণ এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে মানানসই।
এই বসতি ছেড়ে বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে প্রায় তিন মাইল গিয়ে ছোটো ছোটো তিনটে পরিত্যক্ত গ্রামের এলোমেলো ভগ্নাবশেষ পেরিয়ে একটি কাঠের তৈরি ছোট্ট সমাধিক্ষেত্রের কাছে পৌঁছলাম। এখানে সম্ভবত লাচিন-আতার এক সাধক সহযোগীর কবরে এখনো গ্রামবাসীরা পুজো দেয়।
ক্রমশ উঁচু হয়ে ওঠা বালিয়ালির রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতে আমার সঙ্গে আসা গ্রামবাসীরা, যাদের আমি পরের খননের কাজে লাগাব বলে নিয়ে এসেছিলাম, তারা মুখ খুলতে থাকল। তারা কেউই সেই জায়গা চোখে দেখেনি কিন্তু সবাই হারিয়ে যাওয়া ‘কোন শহর’ সম্পর্কে সেই কাহিনিটা শুনে এসেছে।
বালির গর্ভে চলে যাবার আগে কীভাবে ও কী কারণে জনপদ পরিত্যক্ত হয় তা আগের গ্রাম থেকেই দেখেছি। কিন্তু আমি অবাক হয়ে গ্রামবাসীদের কাছে শুনছিলাম, আজ থেকে প্রায় বারো শতাব্দী আগে ‘পি-মো’ শহরে বসে পরিব্রাজক হিউয়েন সাং বালিতে চাপা পড়া ‘হো-লো-লো-কিয়া’ জনপদের যে কিংবদন্তী শুনেছিলেন, গ্রামবাসীরা মোটামুটিভাবে সেই একই কাহিনি শোনালো হারিয়ে যাওয়া ‘কোন শহর’ সম্পর্কে। আমার কারাডং খনন পরিচ্ছেদে ইতিমধ্যে সেই গল্পের কথা বলেছি। এক পুণ্যাত্মা আগন্তুককে দুর্নীতিপরায়ণ শহরপ্রধান আর দুষ্ট শহরবাসীর উপহাস করার ফলস্বরূপ, তাঁর অভিশাপে যে হো-লো-লো-কিয়া নামের এক শহর টানা সাত দিন সাত রাত ধরে বালি-ঝড়ে চাপা পড়েছিল। শুধ সাতজন ভক্ত মানুষ সেই সাধকের কথা মেনে একটা উঁচু খুঁটির মাথায় নিজেদের দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। বালির ঝড় যখন তার তীব্র শক্তি নিয়ে জনপদে আছড়ে পড়ছে, তখন তারা ‘মেরি গো রাউন্ড’-এর মতো খুঁটির চারদিকে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে জমা হওয়া বালি ছাড়িয়ে অনেক ওপরে উঠে যায় আর এভাবেই তাদের প্রাণ বাঁচে। এই শেষের পদ্ধতিটা হিউয়েন-সাঙ এর বলা কাহিনিতে অবশ্য অন্যরকম ছিল।
মরুভূমির বালির তলায় চাপা পড়ে থাকে অসংখ্য ছোটো ছোটো ধ্বংসস্তূপ আর তার কয়েকটির সামান্য অংশই বালির ওপর থেকে বোঝা যায়। তারই একটা হঠাৎ করে খুঁজে পেয়েছিলাম পরদিন।
গতকাল সন্ধেতে আমাদের দুই অপদার্থ গাইডদের কল্যাণে মরুভূমির অনেক গভীরে চলে গেছিলাম। অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় রাত কেটেছিল অজানা বালি-টিলার মাঝে। দুই গাইডের একজন পালিয়ে গেছিল রাতের অন্ধকারে। তুর্দি আর একজনকে, সে আবার তুলনামূলক নিরীহ, চোখে চোখে রেখেছিল আর তার নিজের দীর্ঘদিনের ‘প্রত্নশিকার’ এর অভিজ্ঞতার গল্প বলে উৎসাহিত করতে পেরেছিল বলে সে পালাতে পারেনি। শেষ রাতেই তুর্দি তাকে বগলদাবা করে তাঁবু থেকে বেশ খানিকটা দক্ষিণ-পশ্চিমে চলে গেছিল আর সন্ধান পেয়েছিল এই ধ্বংসস্তূপের, যাকে স্থানীয়রা ‘উস্তান-তাতি’ বা ‘দূরের তাতি’ নামে চেনে।
প্রায় আধা বর্গমাইল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে মাটির পাত্রের টুকরো ও নানাধরনের জঞ্জাল ছড়িয়ে রয়েছে। প্রাকৃতিক ক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে গুপ্তধন শিকারিরাও যে এখানে হানা দিয়েছে তার ছাপ স্পষ্ট। মাটির বাড়ির যে সামান্য অংশ বালির ওপর মাথা তুলে আছে, তার অবস্থা এতই ভঙ্গুর যে অতি সাবধানে খনন করতে হবে। ফলে অনেক সময় লেগে যাবে। হাতে সময় নেই, তাই এই ধ্বংসস্তূপ খনন করে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। টোপোগ্রাফিকাল বৈশিষ্ট্য মিলে গেলেও ভাগ্যক্রমে খুঁজে পাওয়া এই ধ্বংসস্তূপই যে হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত ‘পি-মো’ তা মেনে নেওয়ার জন্য যে কালানুক্রমিক প্রমাণ দরকার ছিল, তা আমরা পাইনি।
প্রাচ্যবিদ (Orientalist) তথা ভূগোলবিদ স্যার হেনরি ইউলের মতে, মার্কো পোলো বর্ণিত ‘পেইন’ আর ‘পি-মো’ এক। মার্কো পোলো খোটান থেকে পুবের পথে এই শহর ভ্রমণ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। যদি তাই হয়, তাহলে ‘পি-মো’ বা ‘পেইন’ শহর ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাসযোগ্য ছিল। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া ভাঙা মাটির পাত্রের নমুনা, কাচ, পিতল আর ছোটো ছোটো পাথরের জিনিসপত্র হাতে ধরে আমার মনে হয়েছে বালির তলায় চাপা পড়ে থাকা এই শহর মধ্যযুগের। আমার এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছিল নিজের হাতে কুড়িয়ে পাওয়া দক্ষিণ সুং রাজবংশের (১১২৭-১২৭৮ শতাব্দী) ছাপ দেওয়া এক তামার মুদ্রা দেখে।
আমাদের গাইড বলেছিল, এই ধ্বংসাবশেষের কাছে উলুগ-জিয়ারাত (পবিত্র মানুষদের মাজার) নামে আরও একটি ধ্বংসাবশেষ আছে বলে সে শুনেছে, কিন্তু যথারীতি তার অবস্থান সে জানে না। প্রায় দু-দিন ধরে উদভ্রান্তের মতো মরুভূমির বুকে প্রায় ২৫ মাইল চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে সেই ধ্বংসস্তূপে পৌঁছেছিলাম। পরে হিসেব কষে বের করেছিলাম, আগের ধ্বংসস্তূপ উজান-তাতি থেকে দক্ষিণ-পূর্বে সোজা মাইল তিনেক গেলেই পৌঁছানো যেত উলুগ-জিয়ারাতে।
পাঁচিল দিয়ে ঘেরা উলুগ-জিয়ারাত আগের ধ্বংসাবশেষ থেকে আয়তনে ছোটো। বালির ওপর থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ভাঙা নমুনা দেখে দুই ধ্বংসাবশেষ একই সময়কালের বলে মনে হল। ৪৮০ ফুট লম্বা, ৩৪৮ ফুট চওড়া, ১৪ ফুট উঁচু পাঁচিলটার ভিত ১১ ফুট চওড়া। এই পাঁচিলঘেরা অংশের ভেতরে বসতের লক্ষণ বা কোনো কিছু প্রত্নবস্তুর খোঁজ পাওয়া গেল না বলে এর সময়কাল নিয়ে আমি কোনো নির্দিষ্ট মতামত দিতে পারলাম না।
গত তিনদিন ধরেই টের পাচ্ছিলাম কীরকম ভয়ংকর গরম আসতে চলেছে! ২৭ ও ২৮ মার্চ ছায়াতে তাপমাত্রা ছিল ৮৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩১.১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। যদিও রাতের তাপমাত্রা ছিল ২৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। সঠিক পথপ্রদর্শক ছাড়া এই বালি-সমুদ্রে কাঙ্ক্ষিত ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। সঙ্গে আনা জলও ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। তাই পি-মো খোঁজার আশা ছেড়ে জনবসতি অঞ্চলে পৌঁছতে দক্ষিণের দিকে চলা শুরু করি। আমাদের কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে বলে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তে আমার লোকেদের সঙ্গেসঙ্গে আমিও খুশি হয়েছিলাম।
২৯ মার্চ ‘লাচিন-আতা’ মাজারের কাছ ঘেঁষে মরুভূমি প্রান্তের ‘নতুন পোনাক’ গ্রাম পার হয়ে পৌঁছেছিলাম গুলাখমার মরূদ্যানে। অনেকদিন পরে চাষের মাঠ আর সবুজ বাগান দেখে চোখগুলো আরাম পেল।
ডোমোকোর বেগের অধীন গুলাখমারের গ্রামগুলোতে প্রায় ন’শো ঘরবসত রয়েছে। আমার দলের বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তাই ৩০ মার্চ রাম সিংয়ের নেতৃত্বে মালপত্র-সহ দলবল খোটানের পথে রওনা করিয়ে দিয়ে আমি সামান্য মালপত্র সঙ্গে করে আম্বানের কাছ থেকে বিদায় নিতে একা ছুট লাগিয়েছিলাম কেরিয়ার দিকে। ওঁর সহায়তা ভোলার নয়।
রাস্তার দু-পাশে বসন্তের আগমনবার্তা স্পষ্ট। উইলো আর পপলার গাছে কচি সবুজ পাতা বেরোতে শুরু করেছে। কেরিয়ার পথে ‘ইয়াকা-লাঙ্গারে’ নিয়াজ হাকিম বেগের তৈরি সরাইয়ের পাশে ফুলে ভরা আলুবোখরা গাছের বাগানের মাঝে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটিয়েছিলাম। সন্ধের হালকা ঠান্ডা বাতাস আর চারপাশের সবজে আভা পাঞ্জাবের গ্রাম-বাসের অনেক সুখস্মৃতি মনে পড়িয়ে দিয়েছিল।
কেরিয়াতে পৌঁছে দেখি শহরটা বকর-ঈদের উৎসবে মজে আছে। একদিকে গাছে গাছে গজানো নতুন সবুজ পাতা আর একদিকে গানবাজনা করতে করতে চলছে খানাপিনা। এতদিন মরুর নির্জনতায় কাটিয়ে হঠাৎ করেই যেন চলে গেছিলাম অন্য জগতে। ক্যাম্প করেছিলাম তোপবাশির বাগানে।
পরদিন ১ এপ্রিল কেরিয়ার আম্বান হুয়াং-দালোইয়ের জন্য কিছু স্মারক উপহার নিয়ে শেষ বিদায় জানাতে গেলাম। অভিযানের কথা বলতে বলতে দারোগা ইব্রাহিমের প্রসঙ্গ উঠেছিল। ইব্রাহিমের উদ্যোগ আর কর্তব্যনিষ্ঠা ছাড়া এত বড়ো অভিযান মসৃণভাবে পরিচালনা করা কঠিন হত বলাতে সঙ্গে সঙ্গে সবার সামনে দারোগা ইব্রাহিমের পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছিলেন আম্বান।
কেরিয়াতে ইতিমধ্যে রটে গেছিল যে আমি কাজের প্রশংসা করেছিলাম বলেই খোটানের আম্বান প্যান-ডারিন আমার অভিযানে সহকারী হিসেবে যোগ দেওয়া খোটান-ইয়ামেনের তরুণ আর উদ্যমী পরিচারক ইসলাম বেগকে কারা-কাশের বেগ পদে উন্নীত করেছিলেন। হুয়াং-দালোইও ঠিক প্যান-ডারিনের পথেই পুরস্কৃত করেছিলেন ইব্রাহিমকে। আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম দুজনকেই এইভাবে পুরস্কার দিতে দেখে।
হুয়াং-দালোইকে বিদায় জানিয়ে ইয়ামেন ছেড়ে আসার সময় বুঝতে পেরেছিলাম আমরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে পড়েছি। দুজনেই জানতাম আর কখনও আমাদের দেখা হবে না।
২ এপ্রিল খোটানের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথম রাত ছিলাম ডোমোকো মরূদ্যানের রাস্তার ধারের এক বাজার, কারাকির লঙ্গরে রাস্তার দু-ধারে চাষের খেত। শুনলাম মাত্র বছর দশেক আগে পাহাড়ের অতি বর্ষার পর কিছু ঝোরা তৈরি হয় এই অঞ্চলে। ঝোরা বেয়ে হিমবাহ গলা জল নিয়মিত আসা শুরু হতে ৮০০ মতো পরিবার এখানে বসত বানিয়ে চাষাবাদ শুরু করে। পত্তন হয় আচমা নামের এক গ্রামের।
দ্বিতীয় দিন ছিলাম চিরা নামের এক বিশাল মরূদ্যানে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারের বাস এখানে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বের মুজতাঘ হিমবাহের জলে পুষ্ট হাসা নদীর উপনদী বেয়ে জল পৌঁছায় এই মরূদ্যানে। যে-বাগানের মধ্যে তাঁবু খাটিয়েছিলাম তা তুষার কণার মতো ছোটো ছোটো সাদা ফুলে ছেয়ে ছিল।
পরের দিন রওনা হবার খানিক পরেই শুরু হয়েছিল ধুলোঝড়। পশ্চিম থেকে উড়ে আসা বালির মিহি কণা নাজেহাল করে ছেড়েছিল, সঙ্গে দোসর ছিল ঘন কুয়াশা। পথের দু-পাশে সার দিয়ে খুঁটি পুঁতে রাস্তা চিহ্নিত ছিল বলে প্রায় ৪০ মাইল পথ পার হয়ে নিরাপদে কেরিয়ার আম্বানের অধীন সাম্পুলা বা লোপ মরূদ্যানে পৌঁছতে পেরেছিলাম। পথের ধারে খুঁটি পোতা না থাকলে বালু-ঝড়ে পথ যে হারাতাম তাতে ভুল নেই। ইউরুং-কাশ নদী থেকে খাল কেটে নিয়ে আসা জলে পুষ্ট সাম্পুলা মরূদ্যান। মূলত কার্পেট শিল্পকে ভিত্তি করে সাম্পুলা একটি সমৃদ্ধ গ্রাম হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছিল গ্রামের বৃদ্ধ প্রধান। অ্যানিলিন রঞ্জক ব্যবহার করে তৈরি করা এখানকার রেশমের তৈরি কার্পেট পুরো তুর্কিস্তানে প্রসিদ্ধ।
চতুর্থ দিন খোটানের পথে সাম্পুলার উত্তরের একটি বড়ো গ্রাম হাঙ্গুয়া ছাড়িয়ে মরুভূমির মাঝে এক ধ্বংসস্তূপ দেখতে গেছিলাম। কয়েক বর্গমাইল জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই ধ্বংসস্তূপের কথা আমাকে তুর্দি আগেই জানিয়েছিল। হাঙ্গুয়া গ্রামের লোকেদের কাছে এই ধ্বংসস্তূপ ‘আরকা-কুদুক টিম’ নামে পরিচিত। ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে একটি কুড়ি ফুট উঁচু ইটে তৈরি প্রায় ভেঙে যাওয়া ‘স্তূপ’ দাঁড়িয়ে ছিল। ধ্বংসস্তূপে খুব উৎসাহ জাগানো কিছু খুঁজে না পেলেও তুর্দির পরিচিত লোকেরা এই ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কিছু প্রাচীন মুদ্রা, সিলমোহর ইত্যাদির নমুনা আমাকে দিয়েছিল যা এই ধ্বংসস্তূপের প্রাচীনত্বের প্রমাণস্বরূপ।
হলদে ধুলোঝড়কে সঙ্গী করে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে সন্ধে নাগাদ খোটানের প্রান্তে ইউরুং-কাশের ধারে পৌঁছলাম। নতুন পাওয়া বেগ-এর তকমা পোশাকে লাগিয়ে ইসলাম বেগ আমার জন্য নদীর ধারে অপেক্ষা করছিল। তার সঙ্গে হাজির ছিল আফগান আকসকল বদরুদ্দিন খান-সহ স্থানীয় বেগ ও ব্যবসায়ীদের দল। সবাই মিলে শোভাযাত্রা করে আমাকে নিয়ে তুলেছিল পুরোনো বাগানে, যেখানে আমি আগেই ক্যাম্প করে গিয়েছি। আমাকে আবার দেখতে পাওয়ার আনন্দে চিৎকার করতে করতে ছুটে এসেছিল ইওলচি বেগ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন