দ্বাদশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

খোটানে পদার্পণ

১০ অক্টোবর খোটানের প্রায় কাছে পৌঁছে গেছি। পিয়ালামা থেকে আক-লাঙ্গার যেতে ঊষর সমতল প্রান্তরে শক্ত পাথরভরা পথের পাশে দুটো ভাঙা স্তম্ভ দেখেছিলাম। এই স্তম্ভ দুটো কারগালিক আর খোটানের সীমানাকে চিহ্নিত করেছিল। পিয়ালামা থেকে আক-লাঙ্গারের প্রায় চোদ্দ মাইল দূরত্বের মাঝে তাখতুয়েনে নামে এক জায়গায় আছে প্রায় ২০০ ফুট গভীর এক কুয়ো, এ-পথে জলের একমাত্র উৎস। আক-লাঙ্গারেও আছে অনুরূপ এক কুয়ো। পিয়ালামা থেকেই দক্ষিণে দূর বহুদূরে পাহাড়ের রেখা তপ্ত মরুপথের দৃষ্টির সঙ্গী হয়েছিল। কিন্তু কুয়াশার কারণে একবারের জন্যও পরিপূর্ণরূপে দেখা দেয়নি সে পর্বতশ্রেণি। আক-লাঙ্গার থেকেই আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল ছোটো ছোটো বালির পাহাড়। কুম-রাবাত-পাদশাহিমের মাজারে (‘মাই লর্ড অফ দ্য স্যান্ডস স্টেশন’) পৌঁছতে আবার বালির সাগর শুরু হয়ে গেছিল।

বালি সমুদ্রের মাঝে এক অদ্ভুত মাজার এই কুম-রাবাত-পাদশাহি। একে অনেকে ভালোবেসে ‘কাপ্তার মাজার’ বা ‘পায়রার অভয়ারণ্য’ও বলে। শয়ে শয়ে কাঠের খোপের মধ্যে হাজার হাজার পায়রার বাস। ভ্রমণার্থীদের দান আর পুণ্যলোভী রইসদের খয়রাতিতে এই পায়রাদের রক্ষণাবেক্ষণ চলে। গল্প আছে যে, খোটানের বৌদ্ধদের অর্থাৎ ‘কাফের’দের সঙ্গে মুসলমানদের এক যুদ্ধের সময় প্রাণ হারানো ইমাম শাকির পাদশাহের মৃতদেহের বুক থেকে আবির্ভূত হয়েছিল দুই পায়রা। মাজার-এ যখন গিয়েছিলাম, তখন সেখানে মাজারের কোনো হর্তাকর্তা শেখের এক অল্পবয়েসি ছেলে বসে ছিল। গল্পটা সে-ই আমাদের শোনায়। বলে, এই পায়রারা নাকি সেই দুই পায়রার বংশধর। সে যুদ্ধে দু-পক্ষেরই হাজার হাজার লোক মারা গিয়েছিল। মৃতদেহগুলো এমন জড়াজড়ি করে ছিল, যে তার মধ্যে কারা বৌদ্ধ ‘কাফের’ আর কারা মুসলমান ‘শহিদ’ তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তখন প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক মুসলমানের প্রার্থনার ফলে শহিদদের দেহগুলো নাকি অলৌকিকভাবে একপাশে এসে জড়ো হয়ে যায়। তারপর এই দুই পায়রার আবির্ভাব সেই দেহদের ভেতর থেকে ইমাম শাকির পাদশাহের দেহটাকে চিহ্নিত করে দেয়। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে, মাজারে আসা মুসাফিররা এই পায়রাদের খাবার দেন আজও। আমিও মাজারের দোকান থেকে কয়েক থলে ভুট্টা কিনে পায়রাদের খাওয়ার জন্য ছড়িয়ে দিয়েছিলাম।

এই প্রসঙ্গে হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত খোটানের পশ্চিম সীমান্তের একটি অনুরূপ ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। খোটানের রাজধানীতে পৌঁছনোর তিরিশ মাইল আগে তিনি মরুর মাঝে একটি ছোটো পাহাড় দেখেছিলেন। সেই পাহাড়টি ছিল ইঁদুরের গর্তে ভরতি। এই ইঁদুরগুলোকে খাবার দিয়ে পুজো করা হত। লোকে বিশ্বাস করৎ যে সুদূর অতীতে এই ইঁদুরগুলো হূণ আক্রমণের হাত থেকে এই দেশকে বাঁচিয়েছিল। খোটানের রাজা হূণদের আক্রমণের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে কোনো দিশা না পেয়ে প্রার্থনায় বসেন। তারপর এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। দলে দলে ইঁদুর রাতারাতি নিঃশব্দে হূণদের ঘোড়ার চামড়ার জিন ও হূণ সৈন্যদের চামড়ার বর্ম দাঁত দিয়ে কেটে ফালাফালা করে দেয়। এরপর প্রায় নিরস্ত্র হয়ে পড়া হূণদের তাড়িয়ে দিতে বেশি সময় নেয়নি খোটানের রাজার সৈন্যরা।

হিউয়েন সাঙকে সে সময় বলা হয়েছিল, মরু এলাকার বাসিন্দা সেই ইঁদুরগুলো নাকি শজারুর মতো বড়োসড়ো, সারা শরীর সোনালি আর রুপোলি লোমে ঢাকা। এখানকার ধার্মিক লোকজনের চোখেও আর সে ইঁদুরদের কোনো হদিশ মেলে না। তবে, প্রাচীন খোটানের অবস্থান ধরলে হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত সেই জায়গাটার সঙ্গে কাপ্তার মাজারের অবস্থান হুবহু মিলে যায়। ছোটো ছোটো টিলায় ঝাঁঝরির মতো গর্তে ভরতি। শুধু ইঁদুরের বদলে এখন এখানে পায়রাদেরই দেখা যায়। স্থানীয় উপাসনা-সংস্কৃতির এই যে যুগ-যুগান্তর ধরে (ধর্ম থেকে ধর্মান্তরে) টিকে থাকার ক্ষমতা, তার নিদর্শন আমি পরেও খোটান জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বৌদ্ধ ধ্বংসাবশেষে পেয়েছি।

কাশ্মীর আর সিন্ধু উপত্যকায় এককালে যেসব জায়গায় বৌদ্ধ ও হিন্দু উপাসনাস্থল ছিল, সেই জায়গাগুলোতেই অধুনা মুসলমান ধর্মস্থলদের অবস্থান লক্ষ করা যায়। এই অবস্থানগুলো থেকেই তাই ওসব এলাকায় প্রাক্তন হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মস্থলগুলোকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম আমি। এখানে এই কাপ্তার মাজারেও দেখতে পেলাম, বিগতদিনের বৌদ্ধ পূর্বসূরীদের একটা প্রথাকে সামান্য বদলে নিয়ে পবিত্রজ্ঞানে জিইয়ে রেখেছে বর্তমানের মুসলমানরা। খোটান পরিসরে ঢুকেই এমন একটা উদাহরণ পেয়ে যাওয়াটা খুবই শুভ লক্ষণ বলে মনে হচ্ছিল আমার।

কাপ্তার মাজার ছাড়িয়ে মাইল তিনেক যাবার পর বালুভূমি ছেড়ে আমরা পৌঁছেছিলাম খানিক জলামতো জায়গায়। এখানে আমরা টারবুগাজ লঙ্গরের একটিমাত্র কুঁড়ের পাশে আমাদের তাঁবু গেড়েছিলাম।

পিয়ালামা থেকে আমরা রওনা হবার পরপরই আমাদের আসার খবর পৌঁছে গিয়েছিল আশেপাশের গ্রামগুলোতে। সন্ধে নাগাদ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এক সুদর্শন শৌখিন বৃদ্ধ বেগ। তিনি আমাদের পথের সামনের গ্রাম ‘জাওয়া’র প্রধান। খোটানের মাটিতে তিনি আমাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন আন্তরিকভাবে।

উট আর মালবাহী টাট্টুঘোড়াগুলো আগের দিনের রাস্তার ধকলে ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই আমি বাকি যাত্রাটুকু দু পর্যায়ে ভাগ করে নিলাম।

খোটানের গ্রাম্য পরিবেশ

পরদিন সকালে টারবুগাজ ছাড়তেই সামনে এসেছিল আবাদি জমি। মাইল তিনেক যাবার পর পৌঁছেছিলাম মাটি দিয়ে তৈরি এক দুর্গের কাছে। বহুকাল আগে ইয়াকুব বেগের সময়ে তৈরি হয়েছিল এই দুর্গ। এই দুর্গ থেকে খানিক দূরেই পড়ে খোটান পথের প্রথম বড়ো গ্রাম জাওয়া।

এরপর থেকেই পথের দু-পাশে এসেছিল একের পর এক বসতবাড়ি, বাগান, আর চাষের খেত। পপলার আর উইলো গাছের ছায়া পড়ে পথের ওপর। হেমন্তের ছোঁয়া গাছের পাতায়। লাল আর হলুদ রঙ ধরেছে ডালে ডালে। মরুর একঘেয়ে খাকি রঙ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া চোখে দীপ্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু পথ ধুলোময়। গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে ছিল ধুলোয়।

রাস্তার যানজট দেখেই টের পাচ্ছিলাম যে আমরা একটি বড়ো বাণিজ্যিক কেন্দ্রে প্রবেশ করতে চলেছি। গাধার পিঠে বোঝাই হয়ে চলেছে ‘ঝুবাস’ নামের ভেড়ার লোম থেকে তৈরি কোট। এই কোট তৈরির জন্য খোটান প্রসিদ্ধ। আবার অনেকে গাধা, টাট্টুঘোড়া বা বলদের পিঠে না চেপে স্রেফ পায়ে হেঁটে চলেছে। এদের পরনের বেশভূষা দেখে বোঝা যাচ্ছিল এদের আর্থিক ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু সবার পরনেই হাঁটু পর্যন্ত উঁচু বুট। বালির রাজ্যে উঁচু হিলতোলা লম্বা জুতো খানিক হাস্যকর দেখতে লাগলেও এরা ধুলোর হাত থেকে বাঁচতেই এই ধরনের জুতো পরে।

জাওয়া থেকে মাইল সাতেক পথ যাওয়ার পর খোটানের দ্বিতীয় বড়ো নদী কারা-কাশ (‘কালো জেড’) পার হলাম। পাথরভরা নদীর বুকে খুব বেশি জল নেই এখন। আধ মাইলের বেশি চওড়া নদীখাত গ্রীষ্মে কারাকোরাম পর্বতের হিমবাহ গলা জলে ভরে যায়। অনেকগুলো জলের খাত থাকলেও মাত্র একটিতেই ত্রিশ গজ মতো চওড়া, ফুট দু-এক গভীর জলের ধারা বইছিল। সম্ভবত চাষের প্রয়োজনে এই নদীর জল নিয়ে যাওয়া হয় নানা জায়গায়।

এখান থেকে মাইল দেড়েক যাবার পর পার হতে হয়েছিল কারা-কাশ নদীর একটি শাখা। এই নদী পরিচিত ইয়াঙ্গি-দরিয়া নামে। যার অর্থ ‘নতুন নদী’। নদীর বয়স যাই হোক না কেন, প্রাচীন চিনা ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই নদীর উল্লেখ আছে। বলা আছে, এই নদী প্রাচীন খোটানের রাজধানীর পশ্চিমে অবস্থিত। যদিও ‘বোরাজান’ নামক প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ যেখানে আছে বলে অনুমান তা এখান থেকে অনেক দূরে।

বাগানবাড়িতে ক্যাম্প

নতুন নদীর কাছের পুবদিকের সিপা গ্রামের কাছে একটা বড়ো বাগান ক্যাম্প করার জন্য মনে ধরেছিল। আমার মালপত্র নামানোর সময় হঠাৎ নজরে এসেছিল, কাছের একটা বাড়িতে একটা লোকের ঘাড়ের সঙ্গে একটা লম্বা ভারী লোহার রড চেন দিয়ে বাঁধা। রডটা লোকটার থেকে বেশি লম্বা। শুনলাম লোকটা প্রতিবেশী চাষিকে অযথা মারধোর করার জন্য শাস্তি ভোগ করছে। লোকটার শাস্তির বহর দেখলেও একপক্ষে মনে হল আর যাই হোক জেলের ঘেরাটোপে রাখার থেকে ভালো। এতে লোকটা শাস্তি ভোগ করতে করতে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারছে ও সব কাজ করতে পারছে। দৃষ্টিকটু লাগলেও সবাই চলতে ফিরতে শাস্তির কথা জেনে যাচ্ছে, ফলে অনুরূপ আচরণ করার থেকে আগামীতে সে বিরত থাকবে।

১৩ অক্টোবর সকালে খোটানের উদ্দেশে রওনা দেবার আগে ইয়োকাকুনের বেগ এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। খোটানের আম্বান ওঁকে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য পাঠিয়েছিলেন। খোটান শহরের মাইল খানিক আগে দলবল-সহ টাট্টুঘোড়ার পিঠে চড়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন খোটানের আফগান ব্যবসায়ীদের প্রধান ও লাদাখের একজন বড়ো ব্যবসায়ী বদরুদ্দিন খান। টাট্টুঘোড়ায় চেপে এক বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে প্রবেশ করেছিলাম শহরে।

নতুন শহরের বর্গাকার দুর্গের প্রাচীরের পাশ দিয়ে খানিক এগিয়ে পুরোনো শহরের ধার ঘেঁষে আমাকে নিয়ে তোলা হয়েছিল তোখতা আখুন নামের এক বড়ো ব্যবসায়ীর বাগানবাড়িতে। কিন্তু বাড়িটা আমার পছন্দ হয়নি। ঘরের একদম ওপরের দিক থেকে আলো আসার ব্যবস্থা থাকলেও একরকম প্রায় দমবন্ধ এই ঘরে থাকার কোনো ইচ্ছে ছিল না। তার বদলে আমি বাইরে গাছ আর ঝোপঝাড়ে ছাওয়া ছবির মতন সুন্দর বাগানে তাঁবু খাটিয়ে নিয়েছিলাম। যদিও এতে আমার জায়গা কম পড়েছিল আর প্রাইভেসি অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।

দিনের অনেকটাই বাকি ছিল। খানিক বিশ্রামের পর আম্বানের জন্য আনা উপহার পাঠিয়ে দিয়ে একটা মনের মতো ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়েছিলাম।

এই অঞ্চলের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল ধনী-দরিদ্র যে-কোনো বাড়িতে নির্দ্বিধায় ঢুকে পড়া যায়। আর প্রত্যেক বাড়িতেই সমাদর মেলে। সে আপনি প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত যাই হোন না কেন।

চিনাদের বিরুদ্ধে শেষ বিদ্রোহের স্মৃতি ভাঙাচোরা মাটির দুর্গের পাশ দিয়ে তোখতা আখুনের বাগানবাড়ির আধমাইল মতো দূরে নজর কেড়েছিল উঁচু পাঁচিলঘেরা এক বাগানবাড়ি। আমি কোনো দ্বিধা না করেই ঢুকে পড়ে বেশ কয়েকটা ছোটো ছোটো ঘরের পাশ দিয়ে গিয়ে একটা বড়ো হলঘরমতো দেখতে পেয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। এগিয়ে এসেছিলেন একজন সুদর্শন বৃদ্ধ ভদ্রলোক, বাড়ির মালিক আখুন বেগ। অভ্যর্থনা করে নিয়ে বসিয়েছিলেন হলঘরে। আমি কেন এখানে এসেছি জানিয়ে ওঁর বাগানে থাকার অনুমতি চাইতে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে অতিথিরূপে বরণ করে নিয়েছিলেন। চা খেতে খেতে আমি ওঁকে ফিরদৌসির শাহনামার তুর্কি সংস্করণ থেকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। আখুন বেগ মোহিত হয়ে শুনছিলেন। মহান ফারসি মহাকাব্য আমাদের একে অপরের হৃদয়ের কাছে নিয়ে এসেছিল। আমার মনে অযাচিত আতিথ্য গ্রহণের যে দ্বিধা ছিল তা চলে গিয়েছিল।

পরদিন সকালে আমি তাঁর বাগানে থোকা থোকা ফুলের ছায়াবীথির মধ্যে নির্জনে আমার তাঁবু খাটিয়েছিলাম। দলের বাকি সদস্যরা ছিল অন্য জায়গায়।

প্যান-ডারিনের সঙ্গে প্রথম বৈঠক

দুপুরবেলা খোটানের আম্বান প্যান-ডারিনের সঙ্গে দেখা করতে যাই। উনি আমার অভিযানের উদ্দেশ্য খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। যদিও অনেক আগেই কাশগর থেকে আমার অভিযান সম্পর্কিত বিশদ তথ্য ওঁর কাছে পৌঁছেছিল। রাষ্ট্রীয় পোশাক পরিহিত শান্ত, বয়স্ক মানুষটি আমার অভিযান ও খোটান নদীর উৎস জরিপের বিষয়টি উনি কীভাবে দেখছেন তা জানতে আমি উৎকণ্ঠিত ছিলাম।

আমার উৎকণ্ঠা অচিরেই দূর হয়ে গিয়েছিল। উনি আমাকে প্রথমেই আশ্বস্ত করেছিলেন রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে যা যা সহযোগিতা করা ওঁর পক্ষে সম্ভব উনি করবেন। প্যান-ডারিনের মতে, আমি যার সন্ধান করছি তা যদি আদৌ থেকে থাকে তা আছে গোবি মরুভূমির বালির তলায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছনো এক অসম্ভব ব্যাপার। শুধু তাই নয়, ওখানকার বাসিন্দারা বর্বর, একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর পাহাড়ের পথ যেমনি কষ্টের তেমনি ঝুঁকিবহুল। বস্তুত পাহাড়ে নির্দিষ্ট পথ বলে কিছু নেই। কারাংগু-তাগের উপত্যকা পার হলে পরে তিব্বতের অজানা ভূখণ্ড। চিনা কর্তৃপক্ষের আদেশে যেখানে পদার্পণ নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, সুং-লি-ইয়ামেনের কঠোর নির্দেশে ওই ভূখণ্ডে যাওয়ার জন্য কোনোরকম সহায়তা করা ওঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

প্যান-ডারিনের সহজ-সরল কথাবার্তা, উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে হিউয়েন-সাঙয়ের ভ্রমণবৃত্তান্ত ও খোটানের প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আগ্রহভরা আলোচনা আমায় নিশ্চিত করেছিল যে উনি আন্তরিকভাবেই আমাকে সবরকম সাহায্য করবেন। পরবর্তীকালে আমি পদে পদে টের পেয়েছিলাম, উনি যদি আগ্রহভরে সহযোগিতা করতে না এগিয়ে আসতেন তাহলে মরুর বুকে অভিযান বা পাহাড়ের জরিপের কাজ করা সম্ভব হত না।

খোটানে পৌঁছেই আমি সম্ভাব্য প্রাচীন স্থানের খোঁজ শুরু করে দিলাম। বেশ বুঝতে পেরেছিলাম, আসল জায়গায় পৌঁছতে খানিক সময় লাগবে। ধন-সন্ধানীরা প্রাচীন জিনিসপত্রের সন্ধানে প্রায়শই হানা দেয় ধ্বংসস্তূপের ভেতরে। আর সঠিক জায়গায় পৌঁছতে আমাকে এই ধন-সন্ধানীদেরই সাহায্য নিতে হবে। যদিও ওরা অন্য কেউ এই ধনসম্পদের খোঁজ পাক তা নাও চাইতে পারে। বস্তুত খোটানে বহু মানুষ বালি খুঁড়ে বেড়ায় হঠাৎ করে ধনপ্রাপ্তির আশায়। মরূদ্যানের কাছে জলের স্রোতে বালি ধোয় সোনা পাবে বলে। ঠিক এই কারণেই আমি খোটানে পৌঁছনোর আগে পুরাকীর্তির খোঁজ করতে শুরু করিনি, কারণ এতে পুরাকীর্তির জালিয়াতরা আমাকে ভুল পথে চালনা করার চেষ্টা করতে পারত। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে কাশগর ও অন্য অঞ্চলের ইউরোপিয়ান পুরাকীর্তি সংগ্রাহকদের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বেশ কিছু লোক প্রাচীন ধনসম্পদ খুঁজে বের করে তা বিক্রি করাকে পেশা বানিয়ে নিয়েছে এবং এরা রীতিমতো সংগঠিত অভিযান করে পুরাকীর্তির খোঁজে। বেশ বুঝতে পেরেছিলাম, এরা কোনোভাবেই চাইবে না অন্য কাউকে সঠিক ধ্বংসস্তূপের খবর দিতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা চাইবে ভুল পথে চালিত করতে বা এমন কোনো জায়গায় নিয়ে যাবে যেখানে যা চাইছি তা পাব না। এতে শুধু অর্থ বা শ্রম নষ্ট হবে না, সবচাইতে মূল্যবান জিনিস ‘সময়’ চলে যাবে। আমার এতদূর আসার পরিশ্রম জলে যাবে। কাজেই সবচাইতে জরুরি ছিল সঠিক তথ্য জোগাড় করা, সঙ্গে কিছু নমুনা সংগ্রহ।

বদরুদ্দিন খান, যিনি মিঃ ম্যাকার্টনির সঙ্গে কিছুদিন কাজ করেছিলেন, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন ছোটো ছোটো কয়েকটি অনুসন্ধান দল বানিয়ে মরুর মাঝে নানাদিকে পাঠাতে যারা নানা ধ্বংসস্তূপ থেকে নমুনা ও খানিক তথ্য সংগ্রহ করে আনবে। প্রস্তাবটি যুক্তিপূর্ণ ছিল, তবে একমাসের আগে কোনো দলেরই আমার কাছে ফিরে আসার সম্ভাবনা ছিল না। এই সময়টা আমি অন্য কাজের জন্য ব্যয় করব বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম। খোটানের দক্ষিণ পাহাড়ে এই কাজটি করব বলে আগে থেকেই মনঃস্থির ছিল। তবে সময়টা ঠিক করা হয়নি।

পাহাড় যাত্রার প্রস্তুতি

কুয়েন-লুন পর্বতশ্রেণির যে অংশ থেকে ইউরুং-কাশ বা খোটান নদীর জন্ম, তা এখনও কার্যত জরিপ হয়নি। ১৮৬৫ সালে মিঃ জনসন লাদাখ থেকে খোটান পর্যন্ত যে-পথ দিয়ে গিয়েছিলেন তার স্কেচ ম্যাপে এই নদী সম্পর্কে সামান্য তথ্য মেলে। যদিও সে-তথ্য খুবই সামান্য। ১৮৭৫ সালে কর্নেল ট্রটার বলেছিলেন যে তিনি মনে করেন জনসন ইউরুং-কাশ নদীর উৎস বলে যে জায়গাকে ম্যাপে চিহ্নিত করেছিলেন, তা তার থেকে আরও পূর্বে। সম্ভবত পলু উপত্যকার দক্ষিণ থেকে বেরোনো ও মালভূমি দিয়ে বয়ে যাওয়া জলস্রোতটি ইউরুং-কাশ নদীর মূল উৎস। ১৮৯৮ সালে ক্যাপ্টেন ডিজি পলু উপত্যকায় অনেকটাই কাজ করেছিলেন। ১৬,০০০ ফুট উচ্চতায় এক নদীর স্রোতের উৎসেও পৌঁছেছিলেন, কিন্তু তাকে নীচ অবধি অনুসরণ করতে বাধা পেয়েছিলেন। কাজেই ইউরুং-কাশ নদীর মূল উৎস নির্ধারণ ও তার আশপাশ অঞ্চলের জরিপের কাজ বাকি পড়েই আছে।

শীতের প্রস্তুতি নিয়ে আমি চিন্তায় ছিলাম। শুধু মানুষদের জন্য নয়, টাট্টুঘোড়াগুলোর জন্যও গরম পোশাকের প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের নিয়ে আমি পাহাড়ে যাব। বরফে উট কোনো কাজে আসবে না, কিছু অতিরিক্ত টাট্টুঘোড়া সঙ্গে নিতে হবে লটবহর বহন করার জন্য। এইসময় কিরাকাশ বা পেশাদার ক্যারাভান নিয়ে যাবার লোকেরা সবাই কারাকোরামের পথে মাল পরিবহণে চূড়ান্ত ব্যস্ত থাকে, ফলে চট করে টাট্টুঘোড়া পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাওয়া গেলেও খুবই চড়া দাম দিতে হয়। কিন্তু খোটানের আম্বান আমার পরিবহন সমস্যার কথা জানতে পেরে এক আদেশবলে আশেপাশের গ্রাম থেকে দ্রুত তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

বদরুদ্দিন খান যখন দলের লোক আর টাট্টুঘোড়াদের জন্য ফেল্টের পোশাক আর চামড়ার কম্বল কিনছিলেন তখন আমি হানা দিয়েছিলাম ইয়োটকান গ্রামে। এটি খোটানের প্রাচীন রাজধানীর অংশ এবং প্রাচীন পুরাকীর্তি সংগ্রহের অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিত। দিনটা খুব ভালো কেটেছিল। প্রাচীন জনপদের ধ্বংসাবশেষের ওপর চাপা পড়া বালি, যা কী না সোনা পাবার আশায় এই অঞ্চলের কিছু লোক নিয়মিত ধুয়ে চলে, তার খানিক খুঁড়লেই বেরিয়ে এল প্রাচীন মৃৎপাত্র, মুদ্রা, সিলমোহর এইসব। একদল লোক নিয়ে খুব তড়িঘড়ি করে দেখা এই ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে আর বিশদে কিছু বলছি না।

সন্দেহজনক জালিয়াতি

পাহাড়ে যাত্রা শুরু করার আগে খোটানে যে-ক’দিন ছিলাম তার পুরোটাই কেটে যাচ্ছিল গ্রামবাসী আর ধন-সন্ধানীদের বিক্রির জন্য নিয়ে আসা মুদ্রা, টেরাকোটার মূর্তি এবং অনান্য পুরাকীর্তি পরীক্ষা করতে। বেশিরভাগই ছিল ভাঙা মাটির পাত্র আর তামার মুদ্রা যা ইয়োটকানে হামেশাই পাওয়া যায়। পরীক্ষা করতে করতে আমিও অনেক কিছু শিখে গেছিলাম। অপ্রয়োজনেও অনেক কিছু কিনে নিচ্ছিলাম, যাতে পেশাদার প্রত্ন-শিকারিদের আস্থা অর্জন করে সঠিক জায়গার হদিস পাই, যার সন্ধানে এতদূর আসা।

আমি ব্লক-প্রিন্টে ছাপা বা হাতে লেখা পুরোনো বইগুলো সম্পর্কে ভীষণ আগ্রহী ছিলাম। অজানা ভাষায় ও অজানা হরফে লেখা এই বইগুলো কাশগরের ইউরোপিয় সংগ্রাহকদের কাছে গত পাঁচ-ছ’ বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হচ্ছিল। এই বইগুলোর অধিকাংশই জাল বলে বেশ কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি দাবি করেছিলেন। কিন্তু এর প্রমাণ দরকার ছিল। আমার কাছে আসা কিছু পুরোনো বইয়ের নমুনা দেখে এগুলো যে জাল সে বিষয়ে আমি অনেকখানি নিঃসন্দেহ হলাম।

আমার কথা শুনে কোকান্দ থেকে একজন রাশিয়ান আর্মেনিয়ান বার্চ গাছের ছালের ওপর অচেনা হরফে হাতে লেখা দশ পৃষ্ঠার একটি পুথির নমুনা নিয়ে এসেছিলেন সেটি আসল না নকল জানতে। উনি পুথিটি চল্লিশ রুবল দিয়ে কিনেছিলেন। স্বভাবতই বইটির বাণিজ্যিক মূল্যায়ন করাতে চাইছিলেন।

আমি প্রথমেই খেয়াল করলাম যে সেই ‘ট্রিটমেন্ট’ যা প্রাচীন ভূর্জপাতায় দেখা যায়, তা এই বার্চের ছালের কোনো পৃষ্ঠাতে নেই। কাশ্মীরে প্রচুর প্রাচীন ভুর্জপত্রের ওপরে লেখা পুথি দেখে আমি তার চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। বার্চ গাছের ছালের নকল পুথি তৈরি করার সময় জালিয়াতরা এই বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। অথবা সেই বিশেষ কালি তৈরি করতে পারেনি। আমি যেই ‘জল-পরীক্ষা’ করলাম, দেখলাম আমার ভেজা আঙুলের ছোঁয়ায় কালি উঠে গেল। গাছের ছালের ওপর লেখা আর ব্লক-প্রিন্ট উভয় পদ্ধতিতে আনা পুথিগুলোর সবগুলোর একই হাল হয়েছিল। আমি কলকাতার সংগ্রহে থাকা এই ধরনের পুথির একই অবস্থা দেখেছিলাম। আর্মেনিয়ান ভদ্রলোক এই পুথিগুলো কিনেছিলেন বহুল পরিচিত পুরাতত্ব-শিকারি ইসলাম আখুনের কাছ থেকে। আমার কাছে খবর এসেছিল, এই ধরনের প্রাচীন পুথির নকল তৈরির জন্য ইসলাম আখুন রীতিমতো একটা কারখানা বানিয়ে রেখেছে। এই মুহূর্তে ইসলাম আখুন খোটান ছেড়ে অন্য কোথায় আছে, ফলে ওর সঙ্গে সে যাত্রা কোনোরকম সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি।

পাহাড়ের যাত্রা শুরুর আগে ইয়ারখন্দ থেকে আমার একগুচ্ছ চিঠি আসাতে আমার খুব আনন্দ হয়েছিল। অধিকাংশই বাড়ি থেকে, ১৭ আগস্ট ভারত হয়ে পাঠানো। যদিও গতকাল একটা চিঠি এসেছিল রাশিয়ান পোস্ট থেকে কাশগর হয়ে চিনা সরকারি ডাকের মাধ্যমে। সেই চিঠির তারিখ ছিল ১৯ সেপ্টেম্বর। এতে প্রমাণ হয় রাশিয়ান রেলওয়ে সুদূর তুর্কিস্তানের ঘরের কোণায় পৌঁছে গেছে। ১৮৬৫ সালে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত স্যার হেনরি ইউল তাঁর ‘ক্যাথে অ্যান্ড দ্য ওয়ে দিদার’ বইতে তুর্কিস্তান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এশিয়ার সমস্ত দেশের মধ্যে সবচাইতে দুর্গম ও স্বল্প পরিচিত’। কারণ ছিল একটাই, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। আমার অভিযানের সদা-সঙ্গী ওঁর এই বইটি থেকে নিয়মিত পান্ডিত্যপূর্ণ নির্দেশ এবং বিনোদনের খোরাক পেতাম।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%