মার্ক অরেল স্টাইন
৩ জানুয়ারি, ১৯০১।
দান্দান-উইলিকে আমাদের অনুসন্ধানের কাজ শেষ হয়েছিল।
ঠিক আগের সন্ধেতে কাশগর থেকে আমার জন্য এসে পৌঁছল ছ’সপ্তাহ ধরে জমা করা এক ভারী ব্যাগ ভরতি চিঠিপত্র। ইউরোপ থেকে ভারত হয়ে আসা চিঠিপত্রের তারিখ অক্টোবরের শুরুর দিকে। আমাকে সবচাইতে খুশি করেছিল ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরের একটি চিঠি। কলকাতা থেকে ন’মাস আগে রাশিয়ান তুর্কিস্তানের ভেতর দিয়ে ফেরার অনুমতি চেয়ে যে আবেদন করেছিলাম, সেই আবেদন রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে।
তাঁবুর ভেতরে সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম চিঠি ও রিপোর্ট লিখতে। পাশাপাশি চলছিল লন্ডনে পাঠানোর জন্য রাখা ভঙ্গুর পুরাকীর্তির নিদর্শনগুলো নিরাপদে প্যাকিং হল কি না তার দেখভাল। আগে পাঠানো নির্দেশমতো উটগুলোকে ফেরত নিয়ে আসা হয়েছিল দূরের নদীর ধার থেকে। নদীপাড়ের শীতের জঙ্গলে অল্প হলেও উটগুলোকে চাঙ্গা করে রাখার মতো খাবার ছিল। রাম সিং-সহ আমার দলের সমস্ত লোকদের মুখ-চোখ দেখে বুঝতে পারছিলাম যে এই ভূতুড়ে জায়গাটা ছেড়ে যেতে সবাই মুখিয়ে আছে। কিন্তু যেই শুনল যে আমি তুর্দির সঙ্গে কাছাকাছি আরও কয়েকটা ধ্বংসাবশেষ দেখতে চাই, ওদের মুখ ব্যাজার হয়ে উঠল। তুর্দি বহুকাল আগে দান্দান-উইলিকের উত্তরে ওই ধ্বংসাবশেষে খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল গুপ্তধন পাবার আশায়। ধন-সন্ধানীদের কাছে জায়গাটা ‘রাওয়াক’ (উঁচু প্রাসাদ) নামে পরিচিত ছিল।
৪ জানুয়ারি সকালে তাওয়াক্কেল থেকে আসা কয়েকজন মজুরকে ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। খুব ভালো কাজ করলেও এরা মরুভূমির একঘেয়েমিতে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। বাকিদের নিয়ে ৯ মাইল মতো উত্তরে হেঁটে পৌঁছেছিলাম রাওয়াক। চলার পথেই লক্ষ করেছিলাম যে বালিয়াড়ির উচ্চতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। জায়গায় জায়গায় ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো ভরতি, যা বলে দিচ্ছিল কোনো একসময় এখানে বসতি ছিল। আমরা মরা নদীর খাতের ধারে ক্যাম্প করব বলে ঠিক করেছিলাম। আজ থেকে আঠারো দিন আগে কাসিমের দল এখানে ক্যাম্প করে কুয়ো খুঁড়ে জল পেয়েছিল। কিন্তু সেই খোঁড়া কুয়ো থেকে আমরা আর জল বের করতে পারলাম না। জল বরফ হয়ে বালির সঙ্গে মিশে গেছিল। তাই আমাদের আরও একটা কুয়ো খুঁড়তে হয়েছিল। সেই কুয়ো থেকে সামান্য জল পেলেও তা ছিল ভীষণ বিস্বাদ।
ন’বছর পর এলেও তুর্দি এখানকার কিছু ভোলেনি দেখলাম। পরদিন সে আমাকে নিয়ে এল এক বিশাল বিশাল বালির পাহাড় এলাকায়। বালি পাহাড়গুলো নয় নয় করেও ফুট ষাটেক উঁচু। বালি পাহাড়ের মাঝে ছড়িয়ে রয়েছে নানারকমের প্রত্নবস্তুর টুকরো। রোদে শুকানো ইটের দুটো ঢিবি দেখা গেল। সম্ভবত কোনো ছোটো স্তূপ ছিল এখানে। খোঁড়াখুঁড়ি যে এখানে বার বার হয়েছে তার ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে আছে। যেখানে-সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির ফলে জায়গাটা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে। মাপামাপি করে দেখলাম, বড়ো স্তূপটার ভিত প্রায় ৩২ ফুট ব্যাসের। ঢিবির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে মাটির পাত্র আর ভাঙা কাচের টুকরো। তার মধ্যেই নজরে এল একটি শক্ত স্টাকোর টুকরো। তুর্দি পাকা চোখে ভালো করে সেটা নেড়েচেড়ে দেখে বলে দিল, স্টাকোর ওপর রয়েছে পাতলা সোনার পাত। সম্ভবত স্টাকোটি ছিল সোনার পাতে মোড়া কোনো মূর্তির অংশ।
পড়ে থাকা মাটির পাত্রের নীচের অল্প বালি খুঁড়তেই বেরিয়ে এল হান আমলের চিনা মুদ্রা। এখানে বালিয়াড়িগুলো এত উঁচু যে তার তলা থেকে কাঠের বাড়ির পুরো ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে বার করা প্রায় অসম্ভব। একটা পঁচিশ ফুট উঁচু বালির টিলার মাথা থেকে কাঠের খুঁটির সামান্য অংশ বেরিয়ে ছিল। একটু খুঁড়তেই দেখা গেছিল যে প্রায় পুরো কাঠামোটাই পচে গেছে। কোনোরকমে একটা ঘরের অংশ পরিষ্কার করতে পাওয়া গেল দুটো কাঠের আয়তাকার তক্তা যার একপাশে জড়ানো হাতের লেখায় ব্রাহ্মী লিপিতে কিছু লেখা। তক্তার পেছনে একটি অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া মাটির সিলমোহর আটকে ছিল।
এখানে পাওয়া হান মুদ্রা আর অনান্য কিছু চিহ্ন দেখে মনে হয় রাওয়াক দান্দান-উইলিকের আগেই পরিত্যক্ত হয়েছিল। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকলামাকানের বিভিন্ন অংশে বালিটিলার অবস্থান পরিবর্তন ও দক্ষিণের দিকে মরুভূমির এগিয়ে আসা নিয়ে বিশদ পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা হয় ততক্ষণ এই বিষয়ে কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না। শুধু তাই নয়, এই ধরনের সমীক্ষা হলেও যা তথ্য পাওয়া যাবে তা থেকে প্রাচীনকালে একের পর এক মরু-জনপদ ফাঁকা হয়ে যাবার সঠিক কারণ বের করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
রাওয়াকে অল্পবিস্তর সমীক্ষা চালিয়ে আমার কাজ শেষ হল, যে কাজের জন্য প্রায় একমাস আগে খোটান ছেড়ে এসেছিলাম।
৬ জানুয়ারি তাওয়াক্কেল থেকে আসা মজুরদের যে ক’জন দলে অবশিষ্ট ছিল তাদের পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে ছেড়ে দিলাম। এবার চলা শুরু হল কেরিয়ার পথে। খুশি মনেই আমাদের বিদায় জানিয়েছিল তারা। প্রত্যাশামতোই টাকা পয়সা দিয়েছিলাম তাদের। বিষণ্ণ মরুভূমি থেকে নিজের ঘরে ফেরার জন্য ওরা যেন মুখিয়ে ছিল। ইসলাম বেগও, যে এতদিন ধরে মজুরদের সুনিপুণ পরিচালনা করে এসেছে, সেও খোটানে ফিরে চলল। ছেড়ে যাওয়ার আগে তার সঙ্গে আমার ‘মেল ব্যাগ’ আর খোটানের আম্বানকে সবরকম সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানানো চিঠি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। সত্যি বলতে কী, খোটানের আম্বানের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া দান্দান-উইলিকে অভিযান চালানো সম্ভব হত না।
এরপরে আমাদের এগোনোর পালা। বালির টিলাগুলো থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছিলাম, ততই একটা অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি হচ্ছিল। তিন সপ্তাহ ধরে এদের মধ্যে ছিলাম। গত হাজার বছর ধরে নিঃসঙ্গ নিস্তব্ধ জায়গাটা কত ইতিহাস, কত স্মৃতি বালির তলায় সঙ্গোপনে আঁকড়ে ধরে রেখে দিয়েছে। সম্ভবত পরিত্যক্ত হবার পর কেউ আমার মতো করে ওকে উলটেপালটে দেখেনি, বিরক্ত করেনি হাজার বছর ধরে। দান্দান উইলিক ফের সেই একাকীত্বের মধ্যে ফিরে যাবে। এই জায়গার বিশুদ্ধ বাতাস, নির্মম ঠান্ডা আর অকলুষিত শান্তি আমৃত্যু আমার মনে রয়ে গেল।
সকাল থেকেই দিনটা মেঘলা ছিল। এগারোটা নাগাদ আমাদের ক্যারাভান রওনা হবার পরপরই উত্তর-পূর্বদিক থেকে জোরালো বাতাস বইতে শুরু করল। রাওয়াক থেকে মাইল দু-এক যাবার পর বালির টিলার মধ্যে অল্প মাটির দেখা পেলাম। জায়গাটা ভরতি ছিল ভাঙা মাটির পাত্র, কাচের টুকরো ইত্যাদিতে। জীবনের সব চিহ্ন মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকলেও শুকনো গাছের শেকড় আর গুঁড়ি মাথা উঁচিয়ে ছিল বালির তলা থেকে। গত কয়েক সপ্তাহে এই অঞ্চলের মরুর বুকে এইরকম বহু মৃত প্রাণের চিহ্ন দেখেছি। ঝোড়ো বাতাসে বালি মিশে খানিক বাদেই ধূসর কুয়াশায় ছেয়ে গেছিল চারপাশ। আগে আগে যাওয়া গাইড কাসিম আর তুর্দির পায়ের ছাপ মুছে যেতে বসেছিল উড়ন্ত বালিতে। তাই ছোটো হয়ে যাওয়া দলটাকে যতটা সম্ভব একসঙ্গে নিয়ে এগোবার চেষ্টা করছিলাম, যাতে মরুভূমির বুকে কেউ না পথ হারিয়ে ফেলে।
যত পুবের দিকে এগোচ্ছিলাম ততই দু-পাশের বালি পাহাড়ের উচ্চতা বাড়ছিল। আমি টের পাচ্ছিলাম, যে-পথ দিয়ে আগে উটগুলো নদীর ধারে গিয়ে ফিরে ফিরে এসেছিল, তার উত্তরদিকে জল পাবার সম্ভাবনা নিয়ে তুর্দির আশঙ্কা ঠিক হতে চলেছে। এক বিশাল বালি পাহাড়ের পাদদেশে রাত কাটানোর জন্য আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে একফোঁটাও জল ছিল না। কিছু শুকনো তামারিস্ক গাছের শেকড়বাকড়ের দেখা পেলেও এমন কোনো চিহ্ন বালির বুকে পাইনি যেখানে খুঁড়লে জল পাওয়া যেতে পারে। এই শেকড়গুলো রাতের শীত কাটানোর জ্বালানি হয়েছিল আর সঙ্গের ছোটো জলের ট্যাঙ্কের খানিক জল, জল না বলে বরফ বলাই ভালো, আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এই জল আমরা বইছিলাম দান্দান-উইলিক থেকে।
প্রথমে ভেবেছিলাম সাব-সার্ভেয়ারের করা মানচিত্র অনুযায়ী পুবদিকে এগিয়ে নদীর ধারে সবচাইতে কাছের জায়গা ‘গরিব-চাকমা’ যাব। কিন্তু পুবদিক দিয়ে পথ সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে যদি বালি খুঁড়ে জল না পাওয়া যায় তাহলে ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়তে হবে ভেবে মত বদলে দক্ষিণ-পুবে চলতে শুরু করলাম। কারণ, ক’দিন আগে ওই পথ দিয়েই কাশিম উট নিয়ে নদীর ধারে পৌঁছে গিয়েছিল।
রাতে জোরালো বাতাস বওয়া বন্ধ হওয়ায় দিনের আলোয় কুয়াশাও মরে গেছিল। যে বালির টিলাগুলো পার হতে হচ্ছিল তার প্রতিটির উচ্চতা ৩০ থেকে ৫০ ফুটের মধ্যে। এই টিলাগুলোর মধ্যে দিয়েই তিনটে ‘দাওয়ান’ (বালি পাহাড়ের মাঝের গিরিপথ) চলে গেছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। ছোটো বালিয়ারির মধ্যে দু-পাশের সমতল এলাকাগুলির থেকে তাদের উচ্চতা ১৫০ ফুটের মতো। প্রায় এগারো মাইল মরুপথ পার হয়ে তিন নম্বর দাওয়ানের মাথায় পৌঁছে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলাম। দূরে, বহুদূরে জীবন্ত তামারিস্ক গাছের বন দেখা যাচ্ছে। কাসিম দেখেই বলে দিল ওখানে বালি খুঁড়লে জল পাওয়া যাবেই। ওর কথা সত্যি হয়েছিল। ছ’ফুট মতো গর্ত খোঁড়ার পর জল পাওয়া গেছিল। যদিও প্রথম দু-ফুটের মাটি জমে বরফ-মাটি হয়ে ছিল। জল, স্বাদে নোনতা হলেও জল। সঙ্গে জল না থাকার মতো থাকায় গতকাল ভয়ে জল প্রায় খাইনি। জমিয়ে রেখেছিলাম জরুরি অবস্থার জন্য। জল পেতেই উটগুলো চোঁ চোঁ করে টানতে শুরু করেছিল। দীর্ঘ পথ ভারী বোঝা টেনে আনার পর ওদের জল দরকার ছিল।
সেই রাতের তাপমাত্রা ছিল ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। পরদিন খুব ভোরে রওনা দিয়েছিলাম আমরা। সবাই চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদীর কাছে পৌঁছতে। দু-মাইল মতো এগোনোর পর কাসিমের অভিজ্ঞ চোখ উড়ন্ত বালিতে ঢেকে যাওয়া তার আগের পদচিহ্ন ঠিক খুঁজে পেয়েছিল। এ-পথ ধরেই নদীর ধার থেকে কাসিমের দল দান্দান-উইলিক পৌঁছেছিল। সেই পদচিহ্ন ধরে খানিক এগোতেই পাওয়া গেছিল কিছুদিন আগে খুঁড়ে যাওয়া কাসিমের কুয়ো।
প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ ফুট উচ্চতার চারটে দাওয়ান পার হতে হয়েছিল। এর পরে বালিয়ারির উচ্চতা ক্রমশ কমে ২০ থেকে ৩০ ফুট মতন হয়ে এল। কিন্তু আমরা যে নদীর দিকেই এগোচ্ছি, তার কোনো নিশানা পাচ্ছিলাম না। অবশেষে শেষ বিশাল বালিয়ারির মাথায় ওঠার পর নজরে এসেছিল দূরে, বহুদূরে গাছের সারির কালচে আঁকাবাঁকা রেখা। নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম, কেরিয়া দরিয়ার কাছে পৌঁছে গেছি।
আরও চার মাইল মতো পথ ছোটো ছোটো বালির টিলার মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম তামারিস্ক গাছের বনে। কুমুশ ঘাসে ভরে ছিল অঞ্চলটা। বালির শেষ টিলাটা পার হবার পর নজরে এসেছিল নদীর বুকে চকচকে বরফ। প্রায় চোদ্দ মাইল বালির মধ্যে দিয়ে টানা হেঁটে এসে আমি বরফ হয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে বসতে পেরে হাঁফ ছেড়েছিলাম। কাসিম এগিয়ে গেছিল সেই টাট্টু ঘোড়াগুলো খুঁজতে যেগুলো সাব-সার্ভেয়ারের দল মরুভূমিতে প্রবেশের আগে এখানে ছেড়ে দিয়ে গেছিল।
আধঘণ্টা পরে কাসিম ফিরে এল ইব্রাহিম নামের এক দারোগাকে নিয়ে। কেরিয়ার আম্বান ওকে পাঠিয়েছেন আমাদের পথ দেখিয়ে নিরাপদে কেরিয়া শহরে নিয়ে যাবার জন্য। নদীর ধারে পপলার গাছের তলায় আগুন জ্বালিয়ে সবক’টা উট না আসা পর্যন্ত চুপ করে বসেছিলাম। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠার আগেই উটগুলো সব পৌঁছেগেছিল। মাস খানেকের ওপর ধরে শুধু হলুদ বালি দেখতে দেখতে ক্লান্ত চোখদুটো পাতা ঝরে যাওয়া শরতের গাছের ফাঁক দিয়ে দূরের বরফ-ঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থেকে খুব তৃপ্তি পেয়েছিল।
পরদিন সকালে কাসিম একজনকে সঙ্গী করে খোটান দরিয়ার দিকে রওনা দিল আর বাকিদের নিয়ে আমি চললাম কেরিয়ার দিকে। বেশ কিছুদিন পর আবার টাট্টুঘোড়ার পিঠে চাপতে পেরে খুব আনন্দ হচ্ছিল। পথের পাশের নদী জমে বরফ হয়ে আছে। কেরিয়া নদী এখানে এক গভীর আর প্যাঁচালো খাতে বয়ে চলেছে, সংকীর্ণ অংশে প্রায় ষাট থেকে দেড়শো গজ চওড়া। আবার বাঁকেতে তার প্রায় তিনগুণ বেশি বিস্তৃতি। নদীর বাম পাড়ের মাইলখানেক চওড়া খাগড়ার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম। জঙ্গলের শেষে শুরু হয়েছে বালির সাম্রাজ্য। নদীর ডানদিকে প্রায় শ-তিনেক ফুট উঁচু বালি পাহাড়ের শিরা চলছে নদীর কোল ঘেঁষে। এই শৈলশিরা ‘কিজিল-কুম’ (লাল বালির এলাকা) নামে পরিচিত। নদীর দু-পাড়েই প্রচুর উইলো আর পপলার গাছ।
চলার পথে বেশ কিছু মেষপালকের কুঁড়ে (‘সত্মা’) দেখলেও কারো দেখা পাইনি। কাঠের কাঠামোর চারপাশে মাটির দেওয়াল বেশ শক্তপোক্ত। প্রায় ষোলো মাইল যাওয়ার পর প্রথম মানুষের দেখা পেয়েছিলাম সৈয়দ বুরহানুদ্দিন পাদশাহিমের (‘আমার প্রভু’) মাজারে পৌঁছে। এটাই আজকের রাতের ডেরা। এই মাজার খোটান আর কেরিয়া জেলার লোকেদের কাছে খুব জনপ্রিয় তীর্থস্থান। পাঁচজন ‘শেখ’ এখানে উপস্থিত এই মাজারের দেখভাল করার জন্য। যদিও এই পাঁচজনের কেউই আমাকে সৈয়দ বুরহানুদ্দিন পাদশাহিম সম্পর্কে কিছু বলতে পারেনি। শুধু বলতে পেরেছিল যে সৈয়দ বুরহানুদ্দিন পাদশাহিম, আরো পুণ্যবান ইমাম জাফর সাদিকের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন। নিয়া নদী পাহাড় থেকে নেমে যেখানে মরুভূমিতে মিশেছে, সেই মরুতীর্থ ছিল ইমাম জাফর সাদিকের উপাসনাস্থল।
প্রতিবছর শয়ে শয়ে তীর্থযাত্রী সামলানো শেখরা ভালোই জানে কী করে অতিথিসেবা করতে হয়। পীর সমাধির পাশে পরিপাটি করে কার্পেট দিয়ে সাজানো ফায়ার-প্লেসওয়ালা একটি ঘর আমার জন্য তৈরি ছিল। আমার লটবহর এসে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে গেছিল, বসে বসে ভাবছিলাম সেই সাধু-সন্তদের কথা যাঁরা নির্জন দুর্গম মরুর বুকে একের পর এক তীর্থের নামে আশ্রয়স্থল গড়ে তুলেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন বসতি। এইরকম নিঃসঙ্গ চারণভূমিতে ঘুরে বেড়ানো রাখালরাও উপকৃত হয় বসন্ত ও হেমন্তকালে এই মাজারে আসা তীর্থযাত্রীদের সান্নিধ্য পেয়ে। জানতে পারে বাইরের জগৎ সম্পর্কে। হতে পারে কি দান্দান-উইলিকে যে বৌদ্ধ মঠ-মন্দিরগুলো আমি বালি খুঁড়ে বের করেছি, সেটাও এইরকম কোনো তীর্থস্থানের নামে মরুর বুকের আশ্রয়স্থল ছিল?
তিনদিন লেগেছিল মাজার থেকে কেরিয়া পৌঁছতে। নদীর ধারের পথযাত্রা শুরুর প্রথম থেকেই প্রায় এক। প্রতিদিন বেশ কিছু করে মেষপালকদের ফাঁকা কুঁড়ে দেখছি। সম্ভবত প্রতিবছর নদী জমে বরফ হয়ে যাওয়ার আগেই ওরা এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়। যদিও যত এগিয়েছি তত বেশি করে সবুজের দেখা পেয়েছি। যেখানে নদীর পলি পৌঁছায় না সেখানে বড়ো গাছ কমে গিয়ে বালির বুক আঁকড়ে রেখেছে কুমুশ আর তামারিস্ক।
কেরিয়া পৌঁছনোর আগে জঙ্গলের মাঝে বুলাক এবং চোগলমাতে আমরা ক্যাম্প করেছিলাম। সারা পথে মানুষের বসতির সেরকম কোনো চিহ্ন নজরে আসেনি। আমাদের পথপ্রদর্শক দারোগা ইব্রাহিম খুব ভালো করেই জানত কোথায় ক্যাম্প করা উচিত। ফলে জ্বালানির অভাব আমাদের হয়নি। প্রতিদিন কুয়াশা আর সূর্যের আলোহীনতার বিপরীতে মরুর ঝকঝকে দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল।
১২ জানুয়ারি দুপুর নাগাদ পৌঁছেছিলাম বিশাল এক জলাভূমির মাঝের গ্রাম বোস্তান লঙ্গরে। জলাভূমি থেকে অসংখ্য ছোটো ছোটো জলের ধারা বেরিয়েছে। পুরো জলাভূমিটাই জমে শক্ত হয়ে আছে। কাজেই এঁকে-বেঁকে চলার প্রয়োজন হচ্ছিল না। এখানেই দেখা হয়েছিল আফগান ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ্ খানের সঙ্গে। প্রায় পনেরো বছর আগে পিশিন থেকে কেরিয়াতে এসে ডেরা বেঁধেছিল সে। সুদর্শন বৃদ্ধটি সাহেবের সেবা করার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত কোন এক অসুখ তার জিভে জড়তার জন্ম দেয়, ফলে কথা বলতে তার সমস্যা হয়। কথা না বলে বলে আবদুল্লাহ্ খান ফারসি ভুলে গেছিল। তুর্কিও ভালো শিখে উঠতে পারেনি, আর হিন্দুস্থানি এখনকার দিনে এতই কম শোনে যে তাতে কথোপকথনে অসুবিধাই হয়। আমার পুশ্তু ভাষাজ্ঞান আবার এতই কম যে তা দিয়ে সে মাতৃভাষা ঠিক বলছে না ভুল, তা বিচার করা সম্ভব নয়। তবে আমার কথামতো কেরিয়াতে আমার থাকার ব্যবস্থা সে ঠিকঠাক করেছিল।
খানিক পরেই ‘সরকারি সুরক্ষা’ দেবার জন্য আধা-চিনা সরকারি পোশাকে লোকজন নিয়ে হাজির হয়েছিল স্থানীয় বেগের দল। সবাই বেশ মোটাসোটা আর আমুদে। সবার পরনে ছিল পশমের ঘের দেওয়া ‘খিতাই’ টুপি-সহ ‘চাপ্পান’ নামের লম্বা ঝুলওয়ালা কোট। একজনের মাথার লাল বোতাম দেওয়া কালো অফিসিয়াল সিল্কের টুপির ওপর থেকে বার বার খিতাই পিছলে পড়ে গিয়ে বেচারা ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছিল বলে বেগ তাকে অফিসিয়াল টুপি খুলে সরাসরি খিতাই পরার অনুমতি দিয়েছিল। আমাকে তাদের ভাষায় কাজ চালানো গোছের কথা বলতে শুনে বেজায় খুশি হয়েছিল বেগ। টাট্টুঘোড়াতে চেপে শহরের দিকে চলতে চলতে গপ্পো হয়েছিল প্রচুর এবং অবশ্যই শিষ্টাচার বজায় রেখে।
বোস্তান লঙ্গর থেকে মাইল চারেক চলার পর পৌঁছেছিলাম কেরিয়া মরূদ্যানের আবাদি অঞ্চলে। সেচ খালের পাশ দিয়ে পথের দু-পাশে পপলার গাছের সার। তুর্কিস্তানের মরূদ্যানের পরিচিত দৃশ্য। মরুভূমির নির্জনতায় মাস খানেক কাটানোর পর এই দৃশ্য মেজাজটাকে খুশি করে দিয়েছিল। আমার ছোট্ট টেরিয়ার কুকুর ইওলচি বেগ এতদিন পর স্বজাতিদের দেখে বেজায় উত্তেজিত হয়ে গেল। গ্রামের বড়ো চেহারার কুকুরদের থেকে ওকে সামলে রাখতে হচ্ছিল। পরপর কিছু মাটির ঘর দেখতে পেয়ে বুঝে গেছিলাম আমরা শহরে উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছি।
আবদুল্লাহ্ খান বাজার থেকে বেশ খানিকটা দূরে আমার জন্য একটা ভিলার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। ভিলাটা আবার ওর এক আত্মীয়ের। বেশ বড়ো আর খোলামেলা। অনেকগুলো ছোটো ঘর আর একটা বড়ো হল-ঘর পার হয়ে পৌঁছেছিলাম আমার জন্য নির্দিষ্ট ঘরে। ঘরের চালের কাছে একটা ছোটো ঘুলঘুলি ছাড়া আর কিছু নেই, এক কোনায় একটা চিমনি দেওয়া ফায়ার-প্লেস। এই মরশুমে এই ঘরই সবচাইতে আরামদায়ক। আমার লাগেজ এসে পৌঁছনোর আগেই উপহার নিয়ে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছিল আম্বানের ব্যক্তিগত সহকারী তথা দোভাষী। উপহারগুলো সব কাজের ছিল। যেমন জ্বালানি কাঠ, টাট্টু ঘোড়া আর উটদের জন্য পশুখাদ্য, আমার খাওয়ার জন্য ভেড়া আর মুরগি—এইরকম সব। উপহার বিনিময় করার মতো আমার কাছে এসবের উপযুক্ত কিছু ছিল না। উপহারের ধরন দেখেই বুঝে গেছিলাম আম্বান আমাকে সবরকম সাহায্যের জন্য প্রস্তুত। আমি পালটা কোনো উপহার না পাঠালেও উনি কিছুই মনে করবেন না। আমি আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা দোভাষীকে ঠিকমতো বোঝাতে পেরেছিলাম। দোভাষী জানিয়েছিল, আগামীকাল আম্বানের সঙ্গে আমার দেখা হবে।

পরদিন দুপুর একটা নাগাদ ইয়াঙ্গি-শহর বাজার হয়ে আম্বান হুয়াং-দালোই-র ইয়ামেনে পৌঁছেছিলাম। আমি ইয়ামেনের গেটের সামনে পৌঁছতে তিনখানা গান-স্যালুট গর্জে উঠল। বুঝলাম, আম্বান আমাকে উচ্চস্তরের অভ্যর্থনা জানাতে চান। খোটান, ইয়ারখন্দ ও কার্ঘালিকের মতো একই ধাঁচের কেরিয়ার ইয়ামেনও। গেট থেকে শুরু করে অভ্যর্থনা কক্ষের টেবিল এবং আসনগুলির অবস্থানও প্রায় একইরকম।
বছর পঁয়তাল্লিশের আম্বান হুয়াং-দালোইকে দেখতে খানিকটা রাগী মনে হলেও ভীষণ রসিক, ভালো স্বভাবের ও প্রাণচঞ্চল মানুষ বলে আমার মনে হল। উনি চিনা সিল্কের পোশাকের ওপর সুন্দর সুতোর কাজ করা একটি হলুদ রঙের পেটিকোট পরে ছিলেন। তার ওপর চাপানো ছিল সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা রাজকীয় জ্যাকেট। আমাদের দুজনের বসার আসনের মাঝের টেবিল ভরতি ছিল নানাধরনের মিষ্টি আর ইউরোপিয় ওয়াইন-গ্লাস ভরা এক জাতীয় মদিরা। যদিও চিনে সরকারি আলোচনায় চা পরিবেশনই রীতি। মদিরার বদলে সাবেকি কোনো ক্যাথে-পানীয় দেবার কথা। সম্ভবত ইউরোপিয় অতিথিকে খুশি করতেই এই ব্যবস্থা।
আমার দোভাষী নিয়াজ আখুনের খোটান থেকে টাট্টুঘোড়া নিয়ে এসে পৌঁছনোর কথা থাকলেও এখনও এসে পৌঁছতে পারেনি। তবুও কাজ চালানোর মতো কথোপকথন দিব্যি চলেছিল। দান্দান-উইলিকে যা যা পাওয়া গেছিল তার সবই ওঁকে জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, হিউয়েন-সাঙ এই অঞ্চলের বৌদ্ধধর্ম বা মন্দিরের অবস্থান নিয়ে যা যা বলেছেন তার অধিকাংশই মিলে যাচ্ছে। যদিও আম্বানের মুসলমান দোভাষীর বৌদ্ধধর্ম এবং তার কাফের প্রভুদের ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে খুব বেশি কিছু জানা না থাকায় এই নিয়ে কথাবার্তা হোঁচট খাচ্ছিল পদে পদে। আমি নিয়া নদীর উত্তরে হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত সুপ্রাচীন নি-জাং নামের জায়গায় যেতে চাই শুনে উনি সঙ্গে সঙ্গে সব ব্যবস্থা করে দেবার হুকুম দিয়েছিলেন। আমার ধন্যবাদ আর অন্যান্য প্রশংসার উত্তরে উনি আন্তরিকতার সঙ্গে আর সৌহার্দ্যপূর্ণ ভঙ্গিতে মৃদু হাসছিলেন; সর্বশ্রেষ্ট কূটনীতিবিশারদ অভিনেতাও বোধহয় সেই অভিব্যক্তি দেখে হিংসা করত। আমি ইয়ামেন থেকে বেরিয়ে আসার সময় উনি আমার পাশে হেঁটে মেন গেট পর্যন্ত এসেছিলেন, আর ওঁর সমস্ত কর্মচারীরা পরিষ্কার পোশাক পরে দু-পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো পরিবেশের পরিপাটি আর পরিচ্ছণ্ণ ভাবটি মনে হয় আম্বানের নিজস্ব অভ্যাসের দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
আমি ইয়ামেন ছাড়ার খানিক পরপরই খবর এসেছিল যে শিষ্টাচার মেনে আম্বান ফিরতি-দেখা করতে আসছেন এক্ষুনি। আমি পড়িমরি করে ছুটেছিলাম আমার ছোট্ট ভিলাতে আম্বানের জন্য অন্তত চায়ের ব্যবস্থাটুকু করতে। আমার ক্যাম্প টেবিলটা ঢাকা দেবার মতো কোনো কাপড় ছিল না। চিনাদের কাছে সাদা হল শোকের রঙ। বাজার খুঁজে একটা লাল কাপড় আনতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে ভেবে আমার কম্বলটাই চাপিয়ে দিয়েছিলাম টেবিল ক্লথ হিসেবে। খানিক আগেই যে রাজকীয় অভ্যর্থনা পেয়ে এসেছি, তার তুলনায় এই ইউরোপিয় শিষ্টাচারের খুবই করুণ অবস্থা। কিন্তু হুয়াং-দালোইকে একবারের জন্যও শিষ্টাচার নিয়ে ভাবিত বলে মনে হয়নি। উনি আমার সঙ্গে ভ্রমণ করা ছোট্ট বই-এর তাক, বইপত্র, হিউয়েন-সাঙ-এর ভ্রমণবৃত্তান্তের স্ট্যানিসলাস জুলিয়েন সম্পাদিত সংস্করণ, দান্দান-উইলিক থেকে নিয়ে আসা পুরাতাত্ত্বিক নমুনা, পান্ডুলিপির পাতা, প্রাচীন চিনা মুদ্রার বৃত্তান্ত আগ্রহের সঙ্গে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন।
কেরিয়ায় মোট তিনদিন থাকব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু খোটান থেকে টাট্টুঘোড়ার দল-সহ কিছু লোকজন এসে না পৌঁছতে আরও দু-দিন বেশি থাকতে হয়েছিল। অবশ্য রাম সিং-সহ সবাই এতদিন মরুভূমিতে কাটিয়ে আসার পর এতে খুশিই হয়েছিল। এই বাড়তি দিনগুলো আমার চিঠিপত্র আর হিসেব লিখতে কেটে গেছিল। লেখালিখি নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে দিনে একঘণ্টা সময়ও বের করতে পারিনি শহরে ঘোরাঘুরির জন্য। গত চারদিন ধরেই কেরিয়াতে বেদম ঠান্ডা। ১৪ আর ১৫ জানুয়ারি তুষারপাত হয়েছিল। কয়েক ইঞ্চি বরফে ঢেকে গেছিল মাঠঘাট। আগুন জ্বালিয়ে তার পাশে বসে কাজ করতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু ঘরে কোনো জানালা না থাকায় ঘরের অন্ধকারে অস্বস্তি লাগছিল। কী আর করা, খোটান-সহ এদিককার সব মরূদ্যানেই শীত আটকাতে ঘরের সব জানালা বন্ধ করে শুধু ছাদের কাছের এক ফোকর দিয়ে হাওয়া-বাতাস চলাচল করানোই এখানকার পদ্ধতি।
আবদুল্লাহ্ খান-সহ কেউই উৎসাহিত করার মতো পুরাতত্ত্বের খোঁজ দিতে পারেনি। কেরিয়ায় খোটানের মতো বাজার নেই, তাই প্রত্ন-শিকারির দল এখানে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু এখানে পৌঁছেই নিয়া নদীর উত্তরে এক ধ্বংসস্তূপের কথা কানে এসেছিল, তাই সেদিকে আগে যাব বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম। আবদুল্লাহ্ নামে কেরিয়ার আর এক সম্পন্ন চাষি বলেছিল, বছর দশেক আগে ইমাম জাফর সাদিকের মাজারের থেকে দিন কয়েক হাঁটাপথ দূরত্বে বালির মধ্যে কিছু ভাঙা বাড়িঘরের কাঠামো সে দেখেছিল। কেরিয়ার আরও কয়েকজন এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষের কথা জানে বলে নিশ্চিত হয়েছিলাম। আমার ঘোড়াদের আশায় আর বসে না থেকে আম্বানের ঠিক করে দেওয়া টাট্টুঘোড়া আর উট নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। এ এমন এক জায়গা যেখানে না আছে টেলিগ্রাফ, না সত্যিকারের পোস্ট অফিস। ‘বিলম্ব’কে এখানকার মানুষ সহজভাবে নিতে শিখেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন