তৃতীয় অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

হুনজা হয়ে যাত্রা

১৫ জুন দুপুরে গিলগিট থেকে সেখানকার মানুষগুলোর আন্তরিক অভ্যর্থনায় ভরপুর হয়ে ফুরফুরে মনে যাত্রা শুরু করেছিলাম। গিলগিট ছিল এই এলাকার শেষ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ঘাঁটি।

প্রথম আঠারো মাইলের অধিকাংশ পথটাই ছিল অনুর্বর উপত্যকায় হুনজা নদীর জলকে কাজে লাগিয়ে চাষযোগ্য করে সবুজে ছাওয়া মরূদ্যানের মধ্যে দিয়ে। মেঘলা ও ঠান্ডা পরিবেশ থাকায় আমরা সেরকম কোনো পরিশ্রমও অনুভব করিনি। ১৮৯১-এর ছোটোখাটো যুদ্ধের পর হুনজায় ব্রিটিশ কর্তৃত্ব জোরদার হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চলে। রাস্তা থেকে সবেরই ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপে। আমি কৃতজ্ঞ গিলগিটের ১৭ বেঙ্গল ল্যানসার্স-এর কমান্ডিং অফিসার মেজর মেডলির কাছে। তিনি নদীতল থেকে সোজা কয়েকশো ফুট উঁচু খাদের ধার-ঘেঁষা সংকীর্ণ চড়াই পথে চলার জন্য আমাকে একখানা শিক্ষিত পাহাড়ি টাট্টুঘোড়া জোগান দিয়েছিলেন। খুব আরামদায়ক ছিল সেই ঘোড়ার পিঠে যাত্রা।

খাড়া পাহাড়ের মাঝ দিয়ে নদী এঁকে-বেঁকে তার পথ বানিয়ে নিয়েছে। দিনের শেষে গিলগিট প্রদেশের শেষ সীমা চাল্ট-এ পৌঁছলাম। প্রশস্ত উপত্যকা এখানে পূর্বদিকে মোড় নিয়েছে। কাশ্মীর ইম্পিরিয়াল সার্ভিসের একটি সৈন্যদল এখানে বহাল ছিল। সামরিক নির্মাণ বিভাগের একটি বাংলোতে ওঠার খানিক পরেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন সৈন্যদলের কমান্ডার। সুবেদার পদের ওই ভদ্রলোক ছিলেন এক বয়স্ক গাড়োয়ালি। কথা প্রসঙ্গে ভদ্রলোক আমাকে বিশ-তিরিশ বছর আগে কাশ্মীর বাহিনীর সৈন্যদলের কাছে গিলগিট কী গুরুত্বপূর্ণ ছিল আর কমিশারিয়েট ব্যবস্থা না থাকার ফলে তাদের, মানে সেনাবাহিনী আর স্থানীয় অধিবাসীদের কত কষ্ট করতে হয়েছে, তার নিখুঁত বর্ণনা দিলেন। সেই দুর্দশার কাহিনি থেকে প্রসঙ্গ পালটাতে আগের আমলের ডোগরা সেনাবাহিনীর গল্প শুরু করলাম। ওঁর কথা থেকেই জানতে পারলাম, অদ্ভুত সব সংস্কৃত শব্দ দিয়ে বানানো মহারাজা রণবীর সিংয়ের নানান হুকুম এই কিছুদিন আগে অবধি এখানকার সৈন্যবাহিনীতে ব্যবহৃত হত।

১৭ তারিখ সকালে যাত্রা শুরুর আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে সেদিনই হুনজা উপত্যকার মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছতেই হবে। ওখান থেকেই টাট্টুঘোড়া বাহিনীকে ছেড়ে পরবর্তী যাত্রাপথে মালবহনের জন্য কুলি বাহিনী নিয়ে এগোতে হবে তাঘদুম্বাশ পামির পর্যন্ত।

চাল্ট ছাড়ার পরে রাস্তাটা যেখানে নদীর বাঁ তীরে এসে পড়েছে, সে জায়গায় নদী পার হয়েছিলাম একটি শক্তপোক্ত ঝুলন্ত সেতুর ওপর দিয়ে। কাশ্মীরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেতুর মতো এই সেতু টেলিগ্রাফের মোটা তারের দড়ি দিয়ে তৈরি। রয়েল ইঞ্জিনিয়ার বাহিনীর কর্নেল আইলমার এই পার্বত্য প্রদেশে প্রথম এই ধরনের ঝুলন্ত সেতু বানানোর ঝুঁকি নেন। তাঁর উদ্যোগ সব জায়গাতেই সফল হয়েছিল, কারণ এইসব দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে সেতু তৈরির জন্য প্রচলিত উপকরণ সরবরাহ করাটাই একটা দুঃসাধ্য কাজ ছিল।

রাকাপোশি পর্বত

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থাকায় রাকাপোশি পর্বত ছিল চোখের আড়ালে। আমরা উপত্যকার পথ ধরে দক্ষিণ-পশ্চিম অভিমুখে চলছিলাম। বিশাল বিশাল পাথরের চাঙড় নদীর বুক জুড়ে থাকায় নদীর গতিপথ আঁকাবাঁকা। খানিক পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে যেতে নীল আকাশের বুকে ধবধবে সাদা বরফে ঢাকা ২৫,৫০০ ফুট উঁচু রাকাপোশির রূপ ধরা দিল। আশেপাশে অনেক উত্তুঙ্গ পর্বতের মধ্যে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা রাকাপোশির সৌন্দর্য অতুলনীয়। আপার হুনজা উপত্যকার রূপ-মাহাত্ম্যের চাবিকাঠি আসলে রাকাপোশিই। প্রায় সারাদিনই তার অপার্থিব সৌন্দর্য চোখের সামনে জেগেছিল। শুধু কয়েকবার নদীর পাড়ে রাকাপোশি থেকে এসে জমা হওয়া পাথরের স্তূপ পার হতে গিয়ে তাকে দেখতে পাইনি। রাকাপোশির হিমবাহ থেকে সৃষ্ট বেশ কিছু ছোটো ছোটো নালা নানা গিরিখাত বেয়ে এসে পড়েছে নদীর মূল ধারায়। পাহাড়ের উঁচু অংশের বরফ থেকে নির্গত জলধারারা উপত্যকার চাষ-আবাদকে সমৃদ্ধ করছে। এখানে পাইনের বন আর ঘাসে ছাওয়া চারণভূমির দেখা মেলে সেই বরফের সীমানা পর্যন্ত। পাহাড়ের মাথা ধবধবে বরফ-সাদা, তারপর খানিক ধূসর অংশ, শেষমেশ উঁচু পাহাড়ের সবুজে ছাওয়া ঢাল লম্বা জিভের মতো এসে ঠেকেছে সমুদ্রতল থেকে ছ’ থেকে সাত হাজার ফুট উঁচু উপত্যকায়।

চাল্ট থেকে মাইল আটেক পথ পার হয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম নিলথ নামের একটি নাগির গ্রামে। এপথের প্রথম নাগির গ্রাম। ১৮৯১ সালে এখানেই এক লড়াইয়ে হুনজা আর নাগিরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। উপত্যকার ডান আর বামদিকের এই দুই ছোটো পাহাড়ি রাজ্য মিলিতভাবে কানজুট নামে পরিচিত ছিল। এখানেই এই দুই রাজ্য মিলে ডোগরা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে তাদের স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল। ছোট্ট পার্বত্য অঞ্চলে নিজেদের জীবিকার পরিসর সীমিত হলেও এরা আপন শক্তি ধরে।

দীর্ঘকাল ধরে হুনজার মির বা প্রধানের আয়ের একটা বড়ো অংশ ছিল উপত্যকার নীচু অংশ থেকে মানুষ ধরে ক্রীতদাস বানানো। পামির পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত কারাকোরামের বুকচেরা এই বাণিজ্য পথে ব্যবসায়ীদের ক্যারাভান প্রায়শই লুঠ করত যাযাবর শ্রেণির ভয়ংকর কানজুটি দস্যুরা। মুজতাঘ পর্বতশ্রেণির বিশাল হিমবাহ অতিক্রম করে কানজুটি দস্যুর দল এসে হামলা চালাত বাল্টিস্তানের উপত্যকাগুলোতে। এগারো বছর আগে ব্রালদো উপত্যকার বায়াফো হিমবাহের মুখের কাছাকাছি দেখা পাথরের স্তূপ আমার বেশ মনে আছে। এই একই ধরনের পাথর ছুড়ে আক্রমণ শানাত দস্যুর দল।

ওইরকম একটি প্রকৃতির দুর্লঙ্ঘ্য অংশও যে আক্রমণের হাতিয়ার হতে পারে এবং হুনজাকে রক্ষা করতে তাতে প্রহরা বসাতে হবে, তা ওরাই দেখিয়েছিল। সবকিছুর শুরু আর শেষ হয়েছিল এই নিলথে। টাইমসের প্রতিবেদক মিঃ নাইট যিনি গিলগিট থেকে একটা ছোটো সৈন্যদলের সঙ্গে এ-অঞ্চলে এসেছিলেন, তিনি তাঁর প্রতিবেদনে এই অঞ্চলের ছবি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

নিলথ গ্রামের যে ছোট্ট বাগানে আমরা প্রাতরাশের জন্য থেমেছিলাম, তার আশপাশটা আমি ভালো করে খুঁটিয়ে দেখেছিলাম। কর্নেল ডুরান্ডের বাহিনী এখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই এলাকাটা তছনছ করে দিয়েছিল। কিন্তু সামনের ভয়ংকর পাহাড়ি পথের জটিলতা তাঁকে তিন সপ্তাহের বেশি এখানেই আটকে রেখেছিল। উলটোদিকের খাড়া পাহাড়ের মাথায় ঘাঁটি গেড়ে থাকা নাগির যোদ্ধার দল দুরন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে রুখে দিয়েছিল কর্নেলের বাহিনীকে। সেইসব লড়াইয়ের চিহ্ন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। গ্রামের সেইসব যোদ্ধাদের কয়েকজন আমার সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে আমাকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্থানগুলো দেখিয়েছিল। নীতি ও কৌশলগত কারণে এই যুদ্ধের কথা এখানকার মানুষ ভুলবে না।

দলের প্রাক্তন সেনারা হাজার ফুট সোজা উঠে যাওয়া পাহাড়ের এক খাড়া ঢাল দেখিয়েছিল, সবার চোখের আড়ালে যে-ঢাল বেয়ে উঠে কর্নেলের বাহিনীর ক্যাপ্টেন ম্যানার্স স্মিথ (তখন লেফটেন্যান্ট ছিলেন) গুটিকয়েক ডোগরা আর গুর্খা সৈন্য নিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন নাগিন যোদ্ধাদের প্রতিরোধ, আর এই সাহসিকতার জন্য পরে উনি ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ পেয়েছিলেন। ওরা সম্ভবত এত কথা বলেছিল এটা বোঝাতে যে স্থানীয় লোকজন ও শাসকরা বিদেশি শক্তির কর্তৃত্ব ভালোভাবে মেনে নেয়নি। অবশ্য ‘কাশ্মীর ইম্পিরিয়াল সার্ভিস’-এর যে ছোটোখাটো সৈন্যদল এই উপত্যকায় মোতায়েন ছিল, বছর কয়েক আগে তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্তা, যিনি হুনজা ও নাগিরের প্রধানদের উপদেষ্টা হিসেবে বহাল ছিলেন, তাঁকেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীকালে ব্রিটিশ প্রভাব আর কিছু বজায় না থাকলেও ব্রিটিশদের দৌলতে একটি ভালো রাস্তা পেয়েছে এই অঞ্চল। আর পথচারীদের নিরাপত্তা বিষয়টিও অনেক সুরক্ষিত হয়েছে। পরে ব্রিটিশদের চিত্রাল দুর্গ অভিযানের সময় কানজুটিরা এগিয়ে এসেছিল ব্রিটিশদের সহযোগিতায়। দুর্গ দখলের পর ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের অরাজক পরিস্থিতির বদল হতে শুরু করে। যদিও বরফ আর পাথরে ঘেরা উপত্যকার অসম সাহসী এই স্বল্প ক’জন পাহাড়ি মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম একই রয়ে গেছে, তবে হানাদারির দিন আর নেই।

নিলথ গিরিসংকট

নিলথ গ্রাম থেকে পথ চলেছে সুন্দর চাষভূমির মধ্য দিয়ে। হিমবাহ-পুষ্ট জলের ধারায় উর্বর এই অঞ্চল। চারদিকে ফলের বাগান আর তাতে সবে পাকতে শুরু করা মালবেরি। প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরী ছবির মতো সুন্দর করে সাজানো উপত্যকা। নদীপাড়ের খাড়া খাতের দুপাশের চাষের জমি পাথরের টুকরো দিয়ে বানানো নীচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। মাঝে মাঝে পাথর জড়ো করে বানানো চতুষ্কোণ এক-একটি মিনার। বোঝাই যায়, গ্রামবাসীরা নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। এই ছোটো ছোটো জনপদগুলো যে যথেষ্ট প্রাচীন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রাচীনত্বের নিদর্শন হিসেবে এখনও পর্যন্ত ভূমিপৃষ্ঠের ওপর যা নজরে এসেছ তা হল থল জনপদের উপকণ্ঠে একটি বৌদ্ধ স্তূপ। দশ বর্গফুট শক্তপোক্ত ভিতের ওপর প্রায় কুড়ি ফুট উঁচু স্তূপটি। স্তূপের ভিতের একটা কোনা আবার পাশ ঘেঁষে রাস্তা তৈরির কারণে খানিকটা ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সমগ্র ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য জায়গার মতো, এসব অতি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুপ্রাচীন সৌধগুলোও ‘উন্নয়নের’ অজুহাতে ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পায় না।

সবুজে ছাওয়া সমৃদ্ধ নাগির উপত্যকার ঠিক বিপরীত ছবি হুনজাতে। এর বেশিরভাগটাই পাথুরে ভূমি। এর মূল কারণ হল রাকাপোশি থেকে বয়ে আসা হিমবাহ গলা জল। রাকাপোশি নালার জলই নাগিরের প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের উৎস। দর্দ আর নাগির উপত্যকা প্রায় একইরকম সুফলা।

হুনজার ভাষা

গিলগিটের নিম্ন উপত্যকার মানুষজন ‘শিনা’ (Shina) ভাষাতে কথা বললেও হুনজার ভাষা ‘বুরিশেস্কি’-তেও (Burisheski) এরা স্বচ্ছন্দ। বুরিশেস্কির সঙ্গে ভারতীয় বা ইরানের ভাষাগোষ্ঠীর কোনো মিল নেই। এই ভাষায় তুর্কি শব্দের ব্যবহার নেই। ক্ষীণ মিল আছে উত্তর ইয়াসিন উপত্যকায় ব্যবহৃত উরশ্‌কি (Wurshki) ভাষার সঙ্গে। কীভাবে যে এই হুনজার মতন জন-অপ্রতুল জাতির এই স্বতন্ত্র ধরণের ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল তা ঐতিহাসিক প্রমাণ দিয়ে বলা কখনোই সম্ভব হবে না। হয়তো কখনো এখান দিয়ে চলে যাওয়া কোনো দিগ্বিজয়ী জাতি তাদের ভাষাভাষী কিছু মানুষকে কোনো অজানা কারণে এই দুর্গম অঞ্চলে ছেড়ে দিয়ে গেছিল। দক্ষিণে দর্দ আর উত্তরে ইরানি ও তুর্কি উপজাতিদের অবস্থানের মাঝামাঝি অংশে এরকম একটা ভাষা টিকে থাকার অন্যতম কারণ হতে পারে এই দুর্গম গ্রামগুলোর বিছিন্ন অবস্থান।

বিগত বেশ কিছু বছর ধরে এই অঞ্চলগুলোতে হিন্দুস্থানি ভাষার প্রচলন বহুগুণ বেড়ে গেছে। উপত্যকায় আসা সৈন্যবাহিনীর শত শত মানুষ আর তাদের মালপত্র বয়ে নিয়ে আসা হাজারো কুলি ও ব্যবসায়ীদের বদান্যতায় হিন্দুস্থানি ও পাঞ্জাবি ভাষা অজান্তেই জীবিকার কারণে এত অল্প সময়ের মধ্যে আয়ত্ত করে নিয়েছে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো। একইভাবে ইসলামের বিজয় অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে আরবি আর ফারসি শব্দ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়ার নানা প্রান্তে।

আগাগোড়া উঁচু-নীচু রাস্তাটা ধরে প্রায় ছাব্বিশ মাইল পথ চলে চাল্ট থেকে আলিয়াবাদে পৌঁছলাম। তাশসোট গ্রামের দুর্গের নীচে রাস্তাটা নদীর পাথরভরা বুকের ওপর দিয়ে এক শক্তপোক্ত সেতু পেরিয়ে রুক্ষ পাথরের ঢালের মাঝখান দিয়ে সাপের মতো এঁকে-বেঁকে অনেক দূর চলে গেছে। নদীগর্ভ থেকে প্রায় পাঁচ-ছ’হাজার ফুট ওপরে দুপাশের খাড়া পাহাড়ের মধ্যের পাথুরে রাস্তা ধরে যখন এগোচ্ছি, তখন সন্ধের স্তিমিত আলোতে তুষারাবৃত রাকাপোশি পর্বতমালার প্রেক্ষাপটে জায়গাটাকে ফরাসি চিত্রকর গুস্তাভ দো’র আঁকা ছবির মতো লাগছিল।

হুনজাকে সাময়িকভাবে দখল করার পরই আলিয়াবাদের ছোটো দুর্গটি তৈরি হয়। এই দুর্গের কাছেই পলিটিক্যাল অফিসারের বাংলো। যদিও বাংলোর বাসিন্দা ক্যাপ্টেন পি. জে মাইলস ছুটিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বাংলোতে আতিথ্য পেতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। এই সীমান্ত অফিসারের ছোট্ট বাংলোর আরাম ভোলার নয়। ক্যাপ্টেনের করিৎকর্মা হুনজা পরিচারকেরাও আমার খাওয়াদাওয়া আর বিশ্রামের ব্যবস্থায় কোনো খুঁত রাখেনি।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই এক অপ্রত্যাশিত মহিমাময় দৃশ্য আমাকে অভ্যর্থনা করল। ঝকঝকে আকাশে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দেখা রাকাপোশি পর্বতমালার তুষার ও বরফের মুকুট আগের চেয়ে অনেক কর্তৃত্বব্যঞ্জক দেখাচ্ছিল। উত্তরদিক জুড়ে ২৫,০০০ ফুট- ছাড়ানো মহান পর্বতশৃঙ্গেরা যেন নীচের উপত্যকার দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে দেখছিল; এছাড়াও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল পুবে বিস্তৃত বরফঢাকা পর্বতমালা…আমার আগামী পথ।

গিলগিট আর হুনজার মধ্যে ডবল মার্চ করে দুটো দিন বেঁচেছিল। সেই বেঁচে যাওয়া দুটো দিন আমরা আলিয়াবাদে কাটিয়েছিলাম। প্রথমত, সঙ্গের মালপত্রগুলো একবার নতুন করে বাঁধাছাঁদার প্রয়োজন পড়েছিল কুলিদের নতুন দলের পিঠে চাপাবার জন্য। তাছাড়া কিছু চিঠিপত্র পাঠাবার ছিল। এটা ঠিকই যে হুনজাতে সে-অর্থে কোনো ডাকঘর বা ডাকব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু একদিন পরপর গিলগিট থেকে কূটনৈতিক চিঠিপত্রের আদানপ্রদান চলত। সামনের লম্বা সফরের আগে খবর পাঠানোর এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি।

পরদিন সকালে হুনজার উজির আমার সঙ্গে দেখা করে আশ্বস্ত করলেন যে পরবর্তী যাত্রার সব আয়োজন সম্পূর্ণ। উজির হুমায়ুন হুনজার একজন গণ্যমান্য প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি বংশানুক্রমিক পদাধিকার বলে হুনজার প্রধান উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী কর্তা বা মির। লম্বা, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মির হুমায়ুনের বয়স হবে পঞ্চাশের আশেপাশে। একমুখ দাড়ি, ইউরোপিয়ান ধাঁচের পোশাক পরিহিত মানুষটিকে এক ঝলক দেখলেই যে-কোনো লোকের মনে সম্ভ্রম জাগবে। ভিনদেশি পরিচ্ছদ যে তিনি স্বেচ্ছায় নিয়েছেন, তা দেখে তাঁর প্রগতিশীল মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। আগেকার দিনের এইসব উজিরেরা কানজুটিদের দিয়ে সারিকোল, গিলগিট আর বাল্টিস্তানে হানাদারি করত; তাদের চেয়ে এখনকার উজিরেরা নিশ্চয়ই অনেক আলাদা। উনি যখন গল্পচ্ছলে ব্রালদো উপত্যকা আর তাশকুরঘান অভিযানের কথা বলছিলেন তখন ওঁর চোখগুলো উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছিল।

এখন সেই রক্তঝরা লড়াইয়ের দিন আর নেই। উনি এখন এই অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ উন্নয়নের জন্য লড়ে যাচ্ছেন। কাজটা মোটেই সহজ নয়। একদিকে সীমিত চাষযোগ্য জমি, অন্যদিকে বেড়ে চলা জনসংখ্যা। উপত্যকার পাথুরে জমিতে বহুদূরের হিমবাহ থেকে নালা খুঁড়ে সেচের জল নিয়ে এসে আবাদ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে নিরন্তর।

হুনজার সঙ্গে প্রাচীন চিন সাম্রাজ্যের সম্পর্ক কেমন ছিল জানার কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছিল। হুনজার মানুষ বহুকাল আগে থেকেই চৈনিক তুর্কিস্তানের ওপরাং উপত্যকার ইয়ারখন্দ নদী আর অন্যান্য জলপ্রবাহের ওপর দখলদারি চালিয়ে আসছিল। আর সম্ভবত সেই কারণেই ধীরে ধীরে বলবত হওয়া ব্রিটিশ সার্বভৌম অধিকারের ফলস্বরূপ বর্তমান কাশগর কর্তৃপক্ষ এই জল দখলদারিকে উপহার হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছে।

আবার অন্যদিকে হুনজা এই উপহারের ফিরতি উপহারও দিয়েছিল। এক চুক্তির ফলে সারিকোল আর কারাকোরাম রক্ষা পেয়েছিল কানজুটিদের আক্রমণের হাত থেকে। এই সুরক্ষা-সংক্রান্ত চুক্তির নথিপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে উজির জানিয়েছিলেন, বেশিরভাগ চিনা ভাষায় লেখা আর তার ফারসি ও তুর্কি অনুবাদ-সহ সমস্ত নথি ১৮৯১ সালের দখলদারির পর বালটিতে মিরের বাসস্থান থেকে সিমলাতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নথিগুলো দেখতে পারলে জানা যেত যে কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে কানজুটি প্রধানদের ঠিক কী মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।

আলিয়াবাদে সাময়িক বিরতি

হুনজায় ব্রিটিশ আধিপত্য নিয়ে চিনা গল্পে অন্যরকম লেখা হলেও তা অলীক গল্প নয়। এই আধিপত্য রক্ষা হত কোনো বলপ্রদর্শন ছাড়াই। আলিয়াবাদে যে ছোটো কেল্লাটা আছে, বর্তমানে সেটা কমিশারিয়েটের গুদাম। কিছু স্থানীয় গ্রামবাসী কেল্লাটা পাহারা দেয়। নানা জায়গায় এরকম কেল্লা-পাহারা দেয়া গ্রামবাসী বা ‘দফাদার’-এর সংখ্যা একশো আশির মতো। চিত্রাল অভিযানের সময় এই দফাদারেরা খুব কাজে এসেছিল। অন্যান্য জায়গার মতোই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তেও এই স্থানীয় দফাদারেরাই এলাকার রাজনৈতিক প্রশাসন ও অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের প্রধান খুঁটি। নিয়মিত বেতনের বিনিময়ে এদের দিয়ে সহজ পরিষেবামূলক কাজ করিয়ে চমৎকার ফল মিলেছে। আফগান সীমান্তে এই দফাদার নিয়োগের মাধ্যমে এলাকার কুখ্যাত লোকজনকে নিরাপদ পেশায় ব্যস্ত রাখা হয়। তবে সৌভাগ্যক্রমে হুনজাতে তেমনটা করবার দরকার পড়েনি। বিচক্ষণ কর্তৃপক্ষ এখানকার মানুষজনকে বাধ্য ও ভীষণ কর্তব্যপরায়ণ বলে স্বীকার করেছেন। এদের পুরোনো ইতিহাস যাই হোক, এদের সম্পর্কে বর্তমান সময়ের মূল্যায়ন যথার্থ বলে আমার মনে হয়েছে।

আলিয়াবাদে থাকার দ্বিতীয় দিন হুনজার আর এক মির মহম্মদ নাজিম আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ইনি ১৮৯১-র ব্রিটিশ অধিগ্রহণের পর মিরের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। খোলা মনের, পেটানো চেহারার মিরের বয়স হবে বছর পঁয়ত্রিশ। বুদ্ধিমান, স্পষ্টবাদী ও দৃঢ়চেতা নাজিম নিঃসন্দেহে এই পদের যোগ্য অধিকারী।

কথোপকথন চলেছিল ফারসিতে। আলোচনার মোড় ঘুরে গিয়েছিল এই অঞ্চলের পুরোনো অবস্থার সঙ্গে বর্তমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন নিয়ে। আগে তারা হত্যা ও লুঠতরাজ নিয়েই মেতে থাকত। তার জায়গায় রাস্তা তৈরি, টিকাকরণ হেন পশ্চিমা উন্নতির প্রভাব এখানকার প্রাচীন পরিবারের এই প্রতিনিধির কাছে অদ্ভুত বলে মনে হয়েছিল। এই সংস্কার ও পরিবর্তন আসলে ব্রিটিশ শান্তি (pax Britannica) অভিযানের ফল।

উজিরের মাধ্যমে আমি দুজন হুনজাবাসীকে আমার দলের সঙ্গে সারিকোল পর্যন্ত গাইড হিসেবে যাবার জন্য নিযুক্ত করেছিলাম। এই দুজন এর আগে পামিরে গিয়েছিল। মিরের দেহরক্ষী দলের প্রধান মহম্মদ রফি আমাদের অভিযানের পরিবহণের জন্য ষাটজন কুলির একটা দল জোগাড় করে দিয়েছিল। এত কুলি আর দলের লোকজন নিয়ে আমাদের ক্যারাভান একটা বিশাল আকার নিয়েছিল।

২০ জুন সকালে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। অল্প পথ পার হয়ে পৌঁছলাম হুনজার প্রধান শহর বাল্টিট-এ। এই শহরেরই খানিক উঁচু অংশে মিরের বাসস্থান। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ফলের বাগানের মাঝে লম্বা মিনারওয়ালা তাক লাগানো দুর্গ তথা প্রাসাদ। প্রাসাদ থেকে দূরে, পাহাড়ের নীচু অংশে পাথরের ওপর পাথর চাপিয়ে তৈরি গায়ে গা লাগিয়ে থাকা শ’ দু-এক ঘরবাড়ি।

চোখ জুড়ানো সবুজ চিনার গাছের ছায়াঘেরা সদ্য তৈরি একটা বাংলোয় আমি গিয়ে উঠলাম। সেটা একদম শহরের পোলো খেলার মাঠের লাগোয়া। উপত্যকার দক্ষিণে বিশাল বরফের নদী সুমায়ের হিমবাহ ঝকঝক করছিল। তার পেছন থেকে উঁকি মারছিল তুষারঢাকা চূড়া।

মিরের দুর্গ পরিদর্শন

দুপুরে মিরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে হুনজা শাসকদের প্রাসাদটি ভালোভাবে দেখার সুযোগ হল। শক্তপোক্ত ভিতের ওপর উঁচু পাঁচিলঘেরা প্রাসাদ। এক বাল্টি রাজকুমারীর সঙ্গে আসা বাল্টি শ্রমিকদের হাতে তৈরি এই প্রাসাদ। বাল্টি রাজকুমারীর সৌজন্যে এই জায়গার নাম হয় বাল্টিট। প্রাসাদের ছাদে অজস্র সেবকসহ মির হাজির ছিলেন। সেখান থেকে হুনজা উপত্যকার বিস্তৃত অঞ্চলের দারুণ দৃশ্য দেখেছিলাম। এরপর প্রাসাদের একটি সদ্য তৈরি অংশে বসিয়ে আমাকে চা ও কেক দিয়ে আপ্যায়িত করা হল। সেখান থেকেও হুনজার নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। ইউরোপিয়ান ঘরানার সন্দেহজনক রুচির কিছু আসবাবপত্র দিয়ে প্রাসাদের এই নতুন অংশটি সাজানো, কিন্তু পুরোটাতেই মধ্য-প্রাচ্যের কারিগরির প্রভাব।

ভারতীয় দ্রব্যসামগ্রীর চাইতে ইয়ারখন্দের কার্পেট, চিনা সিল্ক আর কাশগরের রঙিন ছাপা কাপড় সারিকোল গিরিপথ বেয়ে এখানে সহজে হাজির হতে শুরু করেছিল গিলগিটের পথ চালু হবার অনেক আগে থেকেই। বাণিজ্যের জন্য উত্তর থেকে আসা পথের তুলনায় গিলগিটের পথটি এখনো অল্প সময়ের জন্য চালু থাকে।

প্রাসাদ থেকে ফেরার পথে বেশ কয়েকটি কাঠের তৈরি ছোটো ছোটো মসজিদ নজরে এসেছিল। মসজিদের কাঠের থামগুলোতে খোদাই করা হাতের কাজগুলো সত্যিই তারিফ করার মতো। পুরানো কাশ্মীরি কাঠখোদাইর তুলনায় স্থূল, তবুও তার সাজসজ্জা পরিষ্কারভাবেই প্রাচীন ভারতীয় ঘরানার। অনেকটা কাশ্মীরি দারুশিল্পীদের বানানো ‘চৈত্য’ ঘরানার, খিলানাকৃতি আকারের মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ‘চাকা’ ও ‘স্বস্তিকা-চিহ্ন’ ধরনের। তবে, এই খিলানগুলো খুব প্রাচীন নয়। ফলে দক্ষিণ থেকে আনা এই নকশাগুলো এখনকার পরিবেশে কী করে এখানে ঠাঁই পেল সেটা একটা ধাঁধা।

জুনের ২১ তারিখের হাঁটাটা ম্যাপে কম দেখালে হবে কী, যা খবর জুটেছিল তাতে বুঝে গিয়েছিলাম একটা কঠিনতম পথ পেরোতে যাচ্ছি। বাল্টিট ছেড়ে মাইল দু-এক এগোবার পর চোখের সামনে থেকে ছবির মতো সাজানো মনোরম বাল্টিট, বাল্টিটের দুর্গ - গ্রাম উধাও হয়ে গিয়ে এসে হাজির হল বৃক্ষহীন পাথরের সাম্রাজ্য। এক কণা সবুজের ছোঁয়া নেই কোথাও। উদ্দাম হাওয়া ঠেলে একচিলতে খাড়াই পথ দিয়ে এগোতে হচ্ছিল আমাদের। একবার পা হড়কালেই স্থান হবে কয়েকশো ফুট নীচ দিয়ে বয়ে চলা দুরন্ত পাহাড়ি নদীতে। কখনও আবার নেমে আসতে হচ্ছিল নদীর পাশে। পথের ওঠাপড়া লেগেই ছিল।

মাইল চারেক চলার পর মুহম্মদাবাদ নামের একটা ছোট্ট গ্রামের দেখা পেলাম, কিন্তু গ্রামটা ছিল আমাদের চলার পথের অনেক নীচে নদীর ধার ঘেঁষে একটা বালিভরা মালভূমির মাঝখানে। নদীর ধার-ঘেঁষা গ্রামের পাশ দিয়ে ওই পথ চলাচলের জন্য সহজ হলেও শুধুমাত্র শীতের সময় যখন নদীতে জল কম থাকে তখনই কেবল টাট্টুঘোড়া নিয়ে নদী পারাপার করা যায়। ও-পথ ধরে চলতে গেলে বহুবার নদী এ-পার ও-পার করতে হয়। পাহাড়ের বরফ গলা শুরু হয়ে গিয়ে নদীতে জল বেড়ে গেলে ওই নদী পারাপার করা সম্ভব হয় না।

এখন বরফ গলার সময়। তাই ওই আলগা পাথরভরা পাহাড়ের ভয়ংকর খাড়া গা বেয়ে পা হড়কানো পায়ে-চলা পথ ধরে এগোনো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় রইল না।

একসময় আমাদের নীচের দিকে নামা শুরু হল। পা টিপে টিপে ঘাম ঝরানো হাঁটার শেষ হল নদীর ধারে আটাবাদের ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডে পৌঁছে। যে-গ্রামের থেকে এই অঞ্চলের নাম, সেটা এই ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। খাড়া পাথরের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে ছিল গ্রামটা। ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডটা একান্তই নীরস। বছর পঞ্চাশেক আগে এক ভয়ংকর ধ্বসে এই পুরো উপত্যকাটা লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। আর আটাবাদের ওপরের অংশে সৃষ্টি হয়েছিল এক বিশাল জলাশয়ের।

হুনজা নদীর স্রোতের সঙ্গে বয়ে আসা হিমবাহের কালো পলি সারাদিন রোদের তাপে শুকিয়ে নদীর পাড়ের বালির সঙ্গে মিশে যায়। সন্ধে হতে না হতেই সেই বালি তীব্র ঝোড়ো হাওয়াতে উড়ে বেড়াতে শুরু করে উপত্যকা জুড়ে। এখানকার খাবার আর পানীয়ের মধ্যেও তাই বালির দানা মিশে থাকে। মনে হচ্ছিল যেন খোটানের মরুভূমি অভিযানের মহড়া শুরু হয়ে গেছে।

এইরকম এক নির্জন জায়গায় ডাক-রানার রাতের বেলায় আমার ব্যক্তিগত কিছু চিঠির বান্ডিল নিয়ে হাজির হয়েছিল। এই প্রত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে চিঠিগুলো পেয়ে ডাক-রানারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ রইল না।

রাফিকের চড়াই ভেঙে

পরের দিনের হাঁটাপথটা ছিল এক চরম পরীক্ষা। আটাবাদ থেকে স্বল্প দূরত্ব অতিক্রম করতে আমাদের কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। নদীর ধার থেকে পথ উঠে গিয়েছিল পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে। সে-পথ শুধু খাড়াই নয়, সংকীর্ণ ও আলগা নুড়িতে বোঝাই। পা ফেলতে একটু এদিক-ওদিক হলে খাদ বেয়ে অনেক নীচে সটান ছিটকে পড়তে হবে। খানকতক সরু জলের ধারাও বয়ে গেছে পথের ওপর দিয়ে। মাঝে-মাঝেই এই পথ বিপজ্জনকভাবে বাঁক নিয়েছে। স্থানীয়রা এই বাঁকগুলোকে বলে ‘রাফিক’। এখানে পদক্ষেপে সামান্যতম ভুল হলেই ভয়াবহ মাশুল গোনা ছাড়া উপায় নেই।

আবার কিছু জায়গায় পথ খাড়া হলেও খানিক সিঁড়ির মতো করা আছে। এই পথে টাট্টুঘোড়ার পিঠে বোঝা চাপিয়ে চলা এক দুর্বিষহ কাজ, সে ঘোড়া যতই পাহাড়ি পথে চলতে অভ্যস্ত হোক না কেন। বেশ কয়েক জায়গায় আমার টেরিয়ার কুকুর ‘ইওলচি বেগ’কে ওর আপত্তি সত্ত্বেও কোলে তুলে পার করাতে হয়েছিল। কারণ, লক্ষ করেছিলাম পাথরের ওপরে ওর পা বার বার হড়কে যাচ্ছে। এর আগেও কাশ্মীরে কয়েক জায়গায় দেখেছি বেশ কিছু ধরনের পাথরের ওপর ও ঠিকমতো চলতে পারে না। পিছল খেতে থাকে ক্রমাগত।

পুরো পথটায় খুব সামান্য জায়গায় ক্ষীণ জলের ধারার পাশে নামমাত্র ঝোপঝাড় নজরে এসেছে। ধূসর পাথরের বুকে ছিটেফোঁটা সজীবতার ছোঁয়া। ঘণ্টা ছয়েক হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে পা টিপে টিপে খাড়াই পথ চলার পর নজরে এল দূরে বিস্তৃত এক উপত্যকার। আরও ঘণ্টা দু-এক লাগল ঘুলমিত গ্রামে পৌঁছতে। হিমবাহের কোল ঘেঁষা গ্রামের, খেত আর ফল বাগিচার আঙিনা ছাড়িয়ে দূর বরফ-নদীর ধবধবে সাদা অবয়ব দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট।

ঘুলমিত গ্রাম দিয়ে হুনজা উপত্যকার ছোটো গুহিয়াল এলাকায় ঢোকা যায়। এলাকার বাসিন্দাদের থেকেই তার এমন নাম। বর্তমান গ্রামবাসীদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ওয়াখি অভিবাসী, অক্সাস বা আমুদরিয়া নদীর কূলবর্তী ওয়াখান বা গুহিয়ালের বাসিন্দা। সেখান থেকে অনেকদিন আগে তারা এই অঞ্চলে চলে এসেছিল।

গ্রামপ্রধান অনেক লোকজন নিয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছিলেন আমাকে স্বাগত জানাতে। তাদের লম্বা, সুগঠিত, সুদর্শন দেহ জানান দিয়েছিল এই গ্রামবাসীদের জাতিগত স্বাতন্ত্র। মিরের আত্মীয় মহম্মদ নাফিজ, যিনি মিরের প্রতিনিধি হিসেবে এই অঞ্চলে কাজ করেন, তিনিও গ্রামপ্রধানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

গ্রামের লোকেরা শোভাযাত্রা করে আমাদের নিয়ে গেল একটি নাসপাতি গাছের বাগানে। এই বাগানেই আমাদের শিবির স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট করেছিল ওরা। অবশেষে এদের মুখে ওয়াখানের ভাষা শুনতে পেয়ে আমার ভীষণ আনন্দ হল। ভারতে আসার অনেক আগেই পূর্ব ইরানের প্রাচীন ভাষার এক রক্ষণশীল বংশধর এই অসাধারণ ওয়াখান ভাষার কথা শুনে আকৃষ্ট হয়েছিলাম! এই দুর্গম পর্বতশ্রেণির সুউচ্চ এলাকায় প্রাচীন ইরানের সেই ভাষা-সীমান্তের স্পর্শ পাবো, এ আমি আশা করিনি।

এই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, আমি যে পামিরের পথে চলেছি, সে শুধু নানা গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক এলাকার মিলনস্থল নয়, সেখানে এসে মিশেছে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রাচীন ভাষা আর সেই ভাষায় কথা বলা নানা জাতির মানুষ। আমুদরিয়া, সিন্ধু আর ইয়ারখন্দ নদীর স্রোতবিধৌত এলাকাগুলোকে ঘিরে রাখা জলবিভাজিকারা এইখানে এখানে কিলিক গিরিসঙ্কটের কাছে এসে মিশেছে। ইতিহাসের যতদূর সম্ভব দেখতে পাই, এই এলাকা আসলে ইরান, ভারত আর তুর্কিস্তানের অনেক প্রভাবশালী জাতিগোষ্ঠীর দখলে ছিল।

ওয়াখি বসতি

ছোটো গুহিয়াল বা ঘুলমিত গ্রামের জনসংখ্যা হবে হাজারের মতো। বলিষ্ঠ চেহারা, গড়পড়তা হুনজাবাসীর তুলনায় বেশ লম্বা। ধারালো বুদ্ধিদীপ্ত চোখ-মুখ, ঈগলের ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক, গায়ের রঙ পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছিল এঁদের স্বতন্ত্রতা। ইরানিদের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য এঁদের চলনে-বলনে। এঁরা অনেকেই ফারসি ভাষায় কমবেশি পটু। কাজেই সরাসরি এঁদের সঙ্গে কথা বলতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি।

ওয়াখানের সঙ্গে সারিকোলের যোগাযোগ এখনও রক্ষিত আছে মূলত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে। একদা যুদ্ধবাজ, জমির অধিকার রক্ষায় সচেতন হুনজাবাসীরা যে কী করে ওয়াখিদের প্রবেশ মেনে নিয়েছিল তার ব্যাখ্যা পাওয়া মুশকিল। ওয়াখিদের শান্তিপূর্ণ চরিত্র বা অবস্থানকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যে-কোনো সরকারি অনুষ্ঠান গৃহকর্তা থেকে গ্রামের প্রতিটি অধিবাসী সুচারুভাবে পালন করে। প্রতিটি অনুষ্ঠানে এরা সঙ্গে নেয় লম্বা ডান্ডা, যার প্রান্তে কাঠের হরতন-আকারের বেলচা। যা এই অঞ্চলের উর্বরতা বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার। এই বেলচা সেচের খালগুলোতে বাঁধ দেওয়া ও বাঁধ খোলার কাজে ব্যবহৃত হয়। ব্যবহৃত হয় জমি খোঁড়া থেকে পরিষ্কার করা সহ নানান কাজে। এদের উন্নয়নের অন্যতম প্রতীক এই বেলচা।

ঘুলমিতবাসী ‘সাহেব’ খুব বেশি দেখেনি। পরিচ্ছন্ন ফলের বাগানে আমাদের তাঁবু ঘিরে গ্রামবাসীরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। পরদিন সকালে কুলি পালটানোর জন্য আমাদের রওনা হতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। কুলি পালটানোর সময় প্রতিবারই এটা হয়। কুলিদের বোঝা বাছাই করে পিঠে তুলতে-তুলতেই কেটে যায় অনেক সময়। যদিও পরবর্তী লক্ষ পাসু গ্রামের দূরত্ব খুব বেশি ছিল না আর রাস্তাটাও ছিল আগের দিনের তুলনায় অনেক সহজ ছিল। তবে এত সহজ বা মসৃণ নয় যে ওই পথ দিয়ে একটা বাচ্চাকে প্যারাম্বুলেটরে চাপিয়ে গড়গড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া যাবে।

ঘুলমিতের খানিক ওপরে ঘুলকিন হিমবাহ নেমে এসেছে প্রায় নদীর কোল ঘেঁষে। অসংখ্য ছোটো ছোটো ঘোলা জলের ধারা হিমবাহ থেকে বেরিয়ে এসে মিশেছে নদীতে। বরফ গলার ঋতুতে এই পথে চলাচল খুবই কষ্টকর। যদিও এখানকার উপত্যকা অনেক চওড়া আর নদীর ডানদিকের পাথুরে পাড় চলাচলের জন্য যথেষ্ট আরামদায়ক।

গন্তব্যে পৌঁছোবার খানিক আগেই আমাদের পাসু হিমবাহের সামনে দিয়ে আসতে হল। বরফে মোড়া বড়ো বড়ো পাথরসহ এই চিরতুষারের হিমবাহ নেমে এসেছে দূরের পঁচিশ হাজারেরও বেশি উঁচু এক পাহাড়শৃঙ্গ থেকে।

আলিয়াবাদ আর বাল্টিট থেকে এই পর্বতশৃঙ্গের দেখা মেলে। হিমবাহের পাশের স্তূপাকৃতি মোরেন বা পাথরের স্তূপ দেখে সহজেই বোঝা যায় যে এই হিমবাহটি আগে আরও কত বড়ো ছিল।

হিমবাহের মুখ থেকে খানিক উত্তরে এগিয়েই ছোট্ট পাসু গ্রাম। গ্রামের সবুজ শস্যখেত আর ফলের বাগান চারপাশের ধূসর বর্ণের মাঝে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। হিমবাহ নির্গত জল, সেচ নালার সাহায্যে ধরে নিয়ে আসার সুফল এই সবুজের সমারোহ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু বাড়িঘরের মাঝের ছোট্ট ফলের বাগানে আমরা আমাদের তাঁবু খাটিয়েছিলাম। ঠান্ডা বাতাস, ওট আর বাজরা খেতের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল এই জায়গার উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে আট হাজার ফুটের আশেপাশে। খেত ঘিরে ফুলের গাছগুলো সংখ্যায় কম হলেও মনোরম বসন্তের পুরো আমেজ ধরে রেখেছিল।

বাতুর হিমবাহ

পরদিন ২৪ জুন পাসু থেকে মাইল তিনেক এগিয়ে আমরা সুবিশাল বাতুর হিমবাহে পৌঁছলাম। উত্তর-পশ্চিমদিক থেকে নেমে আসা প্রায় চব্বিশ মাইলেরও বেশি লম্বা এই হিমবাহের অংশ উপত্যকার একটা দিক ধরে এগিয়ে এসেছে। আগে পার হয়ে আসা হিমবাহগুলোর মতো নয়। এর হিমায়িত শরীর চলে গেছে নদীর তলদেশে।

মাইলের পর মাইল বিস্তৃত হিমবাহের উপরিভাগ ভরতি কুচো পাথরে। আর এই কুচো পাথরের কল্যাণেই হিমবাহের ওপর দিয়ে আমাদের পথ চলা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। এই পাথরের ওপর পা রেখে আমি হিমবাহের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় মাইল দেড়েক পথ অতিক্রম করতে পারছিলাম। যদিও পিচ্ছিল বরফের কারণে কুলিদের গতি ছিল তুলনায় অনেক কম।

হিমবাহের অনাবিষ্কৃত উপরিভাগ থেকে নেমে আসা বরফের চাঁই পেরিয়ে মানুষের পক্ষে এই সুবিশাল বরফ-নদী পার হওয়া আগে অসম্ভব ব্যাপার ছিল। পশুদের পিঠে মাল চাপিয়েও এই পথ পার হওয়া যেত না। ভয়াবহ এই পথের বাধা এড়িয়ে পথ খুঁজতে সক্ষম হয়নি কোনো ইঞ্জিনিয়ারও। প্রাকৃতিক এই প্রতিরক্ষা প্রাচীর, এই পথ ধরে উত্তরের বহিরাক্রমণ থেকে হুনজা উপত্যকাকে রক্ষা করে এসেছে অনাদিকাল ধরে।

খাইবার পেরিয়ে

বাতুর হিমবাহ পরবর্তী পথ ছিল আরও উচ্চতার। আলগা পাথর-বোঝাই পথের দু-পাশে পাথরের দেওয়াল। পাসুর ওপরে বসতির দেখা মেলে সেই খাইবার গিরিপথ পার হয়ে। এখানে পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি নালাটি হিমবাহের জলে পুষ্ট নয়। যদিও ক্ষীণকায়া নালাটি এই গ্রীষ্মে যথেষ্ট ভয়াবহ। দু-পাশের পাহাড়ের শিরাগুলো থেকে সোজা ওপরে উঠে যাওয়া পাথর চূড়াগুলো সব অসাধারণ আকারের। কিন্তু এখানে বরফের দেখা নেই।

নাগাড়ে ঘণ্টা ছয়েক ধরে ক্লান্তিকর হাঁটার পর খাইবারের যে গ্রামটায় আমরা পৌঁছেছিলাম সেটি উপত্যকার সংকীর্ণ মুখের ধারে বালিময় ভূমির ওপর গড়ে ওঠা। গ্রামটা ভীষণরকম নির্জন। বাসযোগ্য জমি প্রায় নেই বললেই চলে। তারই মধ্যে আধডজন মতো পরিবারের বাস। প্রকৃতি এখানে ভয়ংকর রকমের কঠোর। এখানে বেঁচে থাকতে হলে প্রকৃতির নির্মমতার সঙ্গে যুঝতে হয় প্রতিনিয়ত।

খাইবার থেকে মিসগার যাওয়ার দুটি পথ আছে। একটি নদীর বাঁদিক দিয়ে গিরচা গ্রামের মধ্যে দিয়ে। আর একটি নদীর ডানদিক ধরে খুদাবাদ গ্রাম ছুঁয়ে। যদি নদীতে জল বেশি না থাকে তবে গিরচা গ্রাম হয়ে পথটাই হাঁটার জন্য সহজ।

২৫ জুন সকালে গিরচা গ্রামের পথ ধরে রওনা হবার খানিক পরেই খবর এল যে সামনে ওই রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ, ওই পথ ধরে এগোনো বোকামি হবে। আবার পিছু ফিরে নদীর ডানদিকের রাস্তা ধরতে হল। চলার পথে কোনো বাধা না এলেও বড়ো বড়ো পাথর ডিঙিয়ে নদীর ধারের নুড়ির ওপর দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে হাঁটাটা খুবই কষ্টের ছিল।

মুরখুন গ্রামের ঠিক উলটোদিকে একটা রাস্তা পূর্বমুখী চলে গেছে শিমশাল উপত্যকার দিকে। খাড়া পাহাড়ের পাথুরে শরীর ঘেঁষে রাস্তাটা ক্রমাগত নীচের দিকে নেমে গেছে। এই পথে একটি স্বাদু পানীয় জলের ঝরনা আছে। এ-পথে যারা চলাচল করে তাদের কাছে ওই ঝরনার আকর্ষণ প্রবল।

খানিক এগোতেই হুনজার উজিরের এক বার্তাবাহকের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হল। সে আমার যাত্রার খবর নিয়ে তাশকুরঘানের ‘রাজনৈতিক মুন্সি’র কাছে গিয়েছিল। লোকটা ১৮ই জুন তারিখে হুনজা থেকে হাঁটা শুরু করে তাশকুরঘান পৌঁছে মুন্সির কাছ থেকে উত্তর নিয়ে সেখান থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের কিছু মালপত্র কিনে, সেই বোঝা পিঠে চাপিয়ে এতটা পথ ফিরেও এসে গিয়েছিল।

নিঃসন্দেহে হুনজার পুরুষদের হাঁটার ক্ষমতার তুলনা নেই। হুনজা থেকে কিলিকের দূরত্ব প্রায় একাশি মাইল, আর সে-পথের চরিত্র আমাদের পার হয়ে আসা পথের মতোই কঠিন। কিলিক থেকে তাঘদুম্বাসের দূরত্ব চল্লিশ মাইলের মতো। তাছাড়া লোকটা পামিরের তাঘদুম্বাস থেকে তাশকুরঘান গিয়ে আবার ফেরত এসেছে। তাঘদুম্বাস থেকে তাশকুরগানের দূরত্ব আশি মাইল। মানে তাঘদুম্বাস থেকে তাশকুরঘান গিয়ে ফিরে আসতে লোকটাকে ১৬০ মাইল পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় চল্লিশ মাইল মতো পথ হেঁটেছে লোকটা। লোকটার এই হাঁটার গতি বুঝিয়ে দেয় অতীতে কী করে কানজুটিদের দল দ্রুত আক্রমণ হেনে লুটপাট সেরে ফিরে যেত।

আটটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রাম খুদাবাদে পৌঁছে আমাদের সেদিনের হাঁটা শেষ হয়েছিল। এটা কোনো ওয়াখি বসতি নয়। হুনজাদের একটা ছোটো গ্রাম। গ্রামের লোকদের নিজস্ব ভঙ্গির উচ্চারণে বলা কথা আমার তাঁবু থেকে স্পষ্ট শোনা যেত। তুর্কিতে আমার পরিচারকদের সঙ্গে কথাবার্তা চালালেও আমার ওয়াখি গাইড আর গ্রামবাসীদের সঙ্গে ফারসি ভাষাতেই কথা বলতাম। ফারসিতেই এরা বেশি স্বচ্ছন্দ। আমার কুলিরা ওয়াখি, বুরিশেস্কি আর শিনাদের দর্দ উপভাষা মিলিয়ে-মিশিয়ে কথা বলত। এতসব ভাষা ছাড়াও আমার সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং তার রাঁধুনি তথা তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারক যশবন্ত সিংয়ের সঙ্গে হিন্দুস্থানি ভাষায় কথা চলত। কাশগর থেকে আমার দলে যোগ দেওয়া সাদাক আখুনের আগে আমার যে কাশ্মীরি পরিচারক সঙ্গে এসেছিল, তাকে আনলে ওর সঙ্গে কাশ্মীরি ভাষায় কথা বলতে হত। ভাষাই ভাষা! এতগুলো ভিন্ন ভাষার সমারোহ একজায়গায় হলেও কারও কথাবার্তা চালাতে অসুবিধা হচ্ছিল না। কারণ, অনেক শব্দের মধ্যেই আশ্চর্যরকম মিল।

মিসগারের চড়াইয়ে

২৬ জুন খুদাবাদ থেকে মিসগারের পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম। এই দূরত্বটা যে এই অংশের যাত্রাপথের সবচাইতে ভয়াবহ তা আগেই জেনে গিয়েছিলাম। আলপাইন ধাঁচের আরোহণ যে এই যাত্রায় হবে তা বুঝে সেইমতো একটা ছকও কষে নিয়েছিলাম। উত্তর-পশ্চিমদিকের ইরশাদ আর চিলিঞ্জি গিরিপথের কাছের হিমবাহ থেকে নেমে এসেছে চাপরসুন নদী। খুদাবাদের কাছে এই নদীর জল আবার খুব ভোরের দিকে কমে যায়। সে-সময় এই নদী পার হতে খুব একটা সমস্যা হয় না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে শুধু জলই বাড়ে না, স্রোতও ভয়ংকর রূপ নেয়। চক্কর কাটা লম্বা পথ এড়াতে আমরা খুব ভোরে নদী পার হয়েছিলাম। ওখানকার নদীর ওপরকার নড়বড়ে দড়ির সেতু ব্যবহারের ঝুঁকি নিইনি।

কিন্তু এই হাঁটার অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। আগের সমস্ত প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। খানিক পর পর শুধু তীক্ষ্ণ বাঁক বা ‘রাফিক’ই ছিল না, সংকীর্ণ পথের একধারের মাটি-পাথরের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে থাকা পাথরের টুকরোগুলো ছুরির ফলার মতো ধারালো। বাঁকের মুখে মাটি-পাথরের বুক খুদে তৈরি করা কোনোরকমে পা রাখা যায়, এরকম সিঁড়ির মতো ধাপগুলো না থাকলে মালের বোঝা পিঠে নিয়ে এগোনো একটা অসম্ভব ব্যাপার হত। প্রায় হামাগুড়ি দেবার মতো করে আলগা নুড়ির ওপর দিয়ে খাড়াই বেয়ে এগোতে হচ্ছিল আমাদের। একচিলতে পায়ে চলার পথের ধারে গভীর খাড়া খাদ। খাদের নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে তুমুল খরস্রোতা নদী। একবার পা হড়কানো মানে সোজা কয়েকশো ফুট নীচের নদীর বুকে পতন। আগের পাঁচদিনের হাঁটার অভিজ্ঞতা অবশ্য আমাদের এই ধরনের পথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ফলে আগে থাকতেই পথের চরিত্রের সঙ্গে খানিকটা অভ্যস্ত থাকায় নির্বিঘ্নেই ভয়ংকরতম পথ পার হয়ে পৌঁছেছিলাম খুনজেরাব নদীর গিরিসংকটে। মিসগারের কয়েক মাইল আগে নির্জন মালভূমির এক অংশে দেখা হয়েছিল জনাকয়েক দফাদারের সঙ্গে।

রুক্ষ পাথুরে সাম্রাজ্য আর হিমবাহ থেকে বেরিয়ে আসা অগুনতি ঝোরা পার হয়ে সবুজ চাষের খেতগুলো নজরে আসতে বুঝে গিয়েছিলাম পৌঁছে গিয়েছি মিসগারের চৌহদ্দিতে। চোখ খানিক আরাম পেয়েছিল সবুজ দেখতে পেয়ে। খুনজেরাব নদীর বাঁ-পাশে, নদী থেকে তিনশো ফুট মতো ওপরে মিসগারের জনপদ। গ্রামের পূর্বদিকের এক গিরিসংকট থেকে বেরিয়ে আসা স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের ধারাকে ধরে-বেঁধে ছোটো ছোটো নালার মাধ্যমে সেই জল নিয়ে যাওয়া হয়েছে উপত্যকার নানা অংশে। আর এই জলকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠেছে একের পর এক চাষযোগ্য জমি আর ফলের বাগান। বাজরা আর ‘রিশখা’ গাছের কচি পাতাগুলো ফনফন করে বেড়ে উঠেছে, যদিও ফসল ঘরে তোলার এখনও ঢের দেরি। উপত্যকার পুব কোনার এই অংশে গ্রীষ্মের প্রভাব পড়ে খানিক দেরিতে।

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসত ভিটেগুলোর মাঝে খানিক ফাঁকা জমিতে আমারা আমাদের শিবির ফেললাম। বেশ কিছুদিন পর আবার সবুজঘেরা জায়গায় থাকার সুযোগ এল। জায়গাটার একদম পাশেই এক স্থানীয় সাধক পীর আকতাশ সাহেবের দরগা। দরগা ঘিরে বাতাসে পতপত করে উড়ছে অসংখ্য রঙবেরঙের পতাকা। ঠিক যেন সিকিম বা লাদাখের কোনো বৌদ্ধ স্তূপ।

বিস্তীর্ণ, খোলা, সবুজে ছাওয়া উপত্যকার মাঝে আমাদের বর্তমান শিবির যেন বিগত কয়েকদিনের অন্ধকারাচ্ছন্ন বন্দিদশা থেকে মুক্তির সামিল। উত্তর-পশ্চিমে যে বরফে ঢাকা শৈলশিরার অস্পষ্ট আভাস দেখা যাচ্ছিল তা আমুদরিয়ার জলবিভাজিকার অংশ। বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আমরা পৌঁছে গিয়েছি পামিরের খুব কাছে।

মিসগারে এ-ক’দিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করা কুলির দলকে ছেড়ে দিলাম। ওদের তুলনা নেই। এই দুরারোহ বিপজ্জনক পথে আমাদের সঙ্গের মালপত্রের বোঝায় একটা আঁচড় লাগতে দেয়নি।

২৭ জুন আমরা মাল পরিবহণের জন্য নতুন দল নিলাম। এবার আর কুলি নয়, তরতাজা টাট্টুঘোড়ার দলের পিঠে মাল চাপালাম আমরা। সামনের পথ সারাবছর ধরে পশু চলাচলের উপযুক্ত। এ-পথ বিপজ্জনক না হলেও সারা পথ বড়ো বড়ো পাথরে বোঝাই থাকায় সেগুলো কাটিয়ে হাঁটাটা খুব ক্লান্তিকর ছিল।

খানিক এগিয়ে তোপখানাতে দেখা পেয়েছিলাম প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক ওয়াচ-টাওয়ারের। এখানে আগে যে বসতি আর চাষের জমি ছিল, তার নিদর্শন। এখানেই আলাপ হয়েছিল সারিকোলের এক হাসিখুশি স্বভাবের বাসিন্দার সঙ্গে। ওর পোশাক আর চেহারার বৈশিষ্ট্য বুঝিয়ে দিয়েছিল যে সে চিনদেশ থেকে এসেছে। ও ছিল মিনতাকা গিরিপথে রাখা সৈন্যবাহিনীর একজন ‘কারাউল’ বা প্রহরী। ওকে পাঠানো হয়েছিল আমার আগমন সম্পর্কে খোঁজখবর নেবার জন্য। ওর পিঠে একটা লম্বা ‘ম্যাচলক’ ঝোলানো ছিল। পুরো চিনা সাম্রাজ্য জুড়ে অধিকাংশ সৈন্যদের পিঠে এই ধরনের বন্দুক ঝোলে, এটা রাজকীয় সৈনিকদের একটা অপরিহার্য অংশ। লালচে গাল, পশমের টুপি, শক্তপোক্ত বুট আর লম্বা ঝুলের মোটা ‘চোগাস’ বা কোটে ছেলেটিকে মানিয়েছিল বেশ। একবারে রাজকীয় সৈন্যবাহিনীর উপযুক্ত। ছেলেটি আমাকে প্রথমেই জানিয়ে দিল যে আমার পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় ইয়াক আর টাট্টুঘোড়ার দল তৈরি আছে। ওর মিশুকে ভাব দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন আমার দলের সঙ্গে প্রথম থেকেই আছে।

সীমান্ত অঞ্চল হলেও বাস্তবে এখানে সৈন্যবাহিনী নয়, ওয়াখি পশুপালকদের বাস। বারো মাইলেরও বেশি পথ হাঁটার পর আমরা পৌঁছোলাম মুরকুশিতে। এখান থেকে কিলিক আর মিন্‌টাকা যাবার পথ ভাগ হয়ে গেছে।

সীমান্ত অঞ্চলের নানা অংশ থেকে আসা একদল হাসিমুখের ঝলমলে পোশাক পরা ওয়াখি আমাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিল। ওরা সীমান্তের ও-পারে ওদের ইয়াকগুলো ছেড়ে দিয়ে এসেছে, ওটা ভালো চারণভূমি হবার দরুণ। রামধনুর রঙ ধরানো ইয়ারখন্দের পোশাক পরা লোকগুলোকে দেখে আমার মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল। লোকগুলোর ইরানিদের মতো ধারালো নাক-মুখ আর ইউরোপিয়ানদের মতো গায়ের রঙের সঙ্গে অজস্র রঙ মেশানো কিরগিজিয় পোশাক এক আকর্ষণীয় বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে বলে আমার মনে হয়েছিল।

নদীর ধারে বার্চ গাছের বনে যেখানে আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম, সেখানে সেরকম ঠান্ডা ছিল না। অন্তত বারো হাজার ফুট উচ্চতায় যেরকম ঠান্ডা থাকা উচিত সেরকম ছিল না। পরদিন সকাল ছ’টায় থার্মোমিটারে তাপমাত্রা দেখেছিলাম ৪৮.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।

শিরিন ময়দানে শিবির

২৮ জুন চার ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা পৌঁছলাম উচ্চ মালভূমি শিরিন ময়দানে। শিরিন ময়দান কথাটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘মিল্কি প্লেইন’। এটা একেবারে কিলিক গিরিপথের পাদদেশে। উচ্চতাজনিত শীতের কামড় এখানে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছিল। দুপুরবেলা নাগাদ সূর্য মেঘের আড়ালে চলে যেতেই তীব্র হাওয়ায় ভেসে প্রচণ্ড ঠান্ডা থাবা বসাল শরীরে। লটবহর নিয়ে ইয়াকের দল পৌঁছতেই আমি আগেভাগে আমার ব্যাগ থেকে ফারের কোটটা বের করে গায়ে চড়িয়ে নিয়েছিলাম।

উত্তরের দিকে যে পাহাড়-সারিগুলো গিরিপথের কাছ ঘেঁষে গিয়েছে, সেগুলোর ফাঁক দিয়ে দূরের বরফঢাকা চূড়াগুলো দেখা যাচ্ছিল। তাঘদুম্বাসের দিকের জলবিভাজিকার চাইতেও অপরূপ লাগছিল পশ্চিমদিকের পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান বহুদূরে অবস্থিত একটি হিমবাহকে। ওর পিছনেই আছে আমুদরিয়া নদীর উৎসেরা, বা, বলতে গেলে আব-ই-পাঞ্জা শাখাটি।

এখন আর সঙ্গে গুহিয়াল কুলির দল নেই, কোলাহলহীন শান্ত ক্যাম্প-সাইট। মহম্মদ ইউসুফ, সারিকোলের মোড়ল আর তার সাত সঙ্গী যারা ইয়াকের দল নিয়ে আমার সঙ্গে চলছিল তাদের সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগছিল। প্রাণোচ্ছল একটি দল। ওরা তুর্কিতে ভালোই দক্ষ আর কথাবার্তাতেও ওস্তাদ। এতক্ষণে আমার মনে হতে শুরু করেছিল যে ভারত থেকে আমি অনেক দূরে চলে এসেছি।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%