মার্ক অরেল স্টাইন

৮ জুলাই আর তার পরের দিনটা তাশকুরঘানেই থাকব বলে ঠিক করা ছিল। আগামী যাত্রার জন্য নতুন করে পরিবহণ ও খাবারদাবারের বন্দোবস্ত করা ছাড়াও এখানকার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়ে স্বল্প সময়ে যতটা বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ ও তার নথিবদ্ধকরণ খুব জরুরি ছিল। তাশকুরঘানের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীনতম জনপদ হচ্ছে সারিকোল। এই অঞ্চলের পাহাড়ি পথ বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত সেই প্রাচীনকাল থেকেই। এই অঞ্চলে ধ্রুপদি পশ্চিম দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের পণ্যের সঙ্গে চিনা ব্যবসায়ীদের পণ্য বিনিময় হত।
স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে আলাপচারিতায় যা জানতে পেরেছিলাম, তা স্যার হেনরি রলিনসনের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একদম মিলে যায়। এই তাশকুরঘান বা ‘পাথরের মিনার’ তার একই নাম ও একই গুরুত্ব নিয়ে পরিচিত ছিল টলেমির যুগে, বা তারও আগে প্রসিদ্ধ গ্রীক ভূগোলবিদ টায়রের মারিনাসের (Marinus of Tyre) সময়ে। পাশ্চাত্যের মানুষ সেযুগে এই জায়গাটাকে ‘সেরিকে’ বা কেন্দ্রিয় চিনা আধিপত্যের একদম পশ্চিম সীমান্তের একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবেই জানত।
প্রকৃতি নিজেই শুধু এই জায়গাটিকে সারিকোল এলাকার উপত্যকাগুলোর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেনি, বরং প্রাচীন বাণিজ্যপথের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মধ্য এশিয়ার বিশাল অংশকে বানিজ্যপথের সাহায্যে সুদূর পশ্চিম ও পুবের সঙ্গে যুক্ত করেছিল এই জায়গা।
এখান থেকেই পথ গিয়েছে কাশগর ও খোটানে। পথ এসেছে তুর্কিস্তান থেকে, গিয়েছে চিনের অভ্যন্তরে। পামিরের সঙ্গে যোগাযোগের সেরা দুটি পথের শুরুও এখান থেকেই। আপার অক্সাসে ঢোকবার সরাসরি প্রবেশপথ এই তাঘদুম্বাশ উপত্যকা; এর সঙ্গে আবার এসে জুড়েছে নাইজা-তাশ গিরিপথ হয়ে আকসু উপত্যকায় যাবার পথ। আকসু পেরিয়ে সে পথ গ্রেট পামিরের গা ঘেঁষে নেমে গিয়েছে শিগনান ও বাদাখশানে।
তাশকুরঘানের পথে ঘুরে বেড়িয়ে আমার মন ভরে গেছিল। কারণ, এই তাশকুরঘান হয়েই মহান চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন-সাঙ ভারতে পৌঁছেছিলেন। ওঁর পরিভ্রমণ করা প্রাচীন পবিত্র ভারতীয় বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলো দেখার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল যে! ৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন-সাঙ, যে ‘কি-প্যান-তো’ জেলার মধ্য দিয়ে হয়ে বাদাখশান থেকে খোটান গিয়েছিলেন, সে-জায়গাকে অনেক আগেই স্যার হেনরি ইউল আধুনিক সারিকোল হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। হিউয়েন সাঙ ও তাঁরও আগের এক চিনা তীর্থযাত্রী সুং-ইউন (৫০০ খ্রিস্টাব্দ) এই অঞ্চলের পুরোনো রাজধানী সম্পর্কে যে বর্ণনা করেছিলেন, তা যে তাশকুরঘানই ছিল তাতে দ্বিমত নেই। ‘একটা খাড়া পাহাড়কে ঘিরে পুবমুখে বয়ে গেছে সীতা নদী’—(‘সীতা নদী’—ইয়ারখন্দ নদীর তাঘদুম্বাশ শাখা) ঠিক যেমনটি চৈনিক তীর্থযাত্রীরা বর্ণনা করেছিলেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরের মধ্যে সেই খাড়া পাহাড়ের মাথায় গড়ে উঠেছে বর্তমানের চিনা দুর্গটি।
নদীর পাশ ঘেঁষা পাহাড়ের মাথায় আলগা পাথরের ওপর পাথর চাপিয়ে, সুরক্ষার জন্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাইল লম্বা উঁচু-দেওয়াল তৈরি করে, চতুর্ভুজাকার জায়গাটিতে চিনা দুর্গটি বানানো হয়েছিল। প্রাচীন দুর্গের শুকনো ইটের পুরু দেওয়ালের গায়ে প্লাস্টারের প্রলেপ। এর ভিত যে যথেষ্ট শক্তপোক্তভাবে তৈরি করা হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।
এখন পুরো এলাকাটাই অদ্ভুতরকমের নিস্তব্ধ আর জনহীন! দুর্গের আশেপাশে পাথরে তৈরি কিছু ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ বলে দিচ্ছিল এই দুর্গের কাছে বাসস্থান বানিয়ে থাকাটা মোটেই সুখকর ছিল না, বিশেষ করে কৃষক সম্প্রদায়ের কাছে। মূলত জলের কারণে। সারিকোলে যুদ্ধ শেষে শান্তির সূচনা হতে চাষযোগ্য অঞ্চলে একের পর এক গ্রামের পত্তন হয়েছিল। অথচ দুর্গের আশপাশ জনশূন্য হয়ে গেছিল। ১৮৯৫ সালে ভয়ংকর ভূমিকম্পে দুর্গের আশপাশ ও ভেতরের ঘরবাড়ি ভেঙে পড়লে সেগুলো মেরামত করে আর কেউ থাকতে আসেনি। জায়গায় জায়গায় বিশাল ফাটল হয়ে রয়েছে দেওয়ালগুলোতে। নিঃসন্দেহে প্রাচীন কোনো কিছুকে যদি বারংবার মেরামত করা হয়, তাতে যুগগুলোর বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু অতীতে বেশ কয়েকবার কোথাও কোথাও পুনর্নির্মিত হলেও ২৫ ফুটেরও উঁচু এই পাথরের দেওয়ালের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার বলে দেয় যে এ এক অতি প্রাচীন স্থাপত্য।
এই দুর্গ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য স্তূপের ধ্বংসাবশেষ, বিশেষ করে দুর্গের প্রাচীরের উত্তর অংশের ও-ধারের প্রাচীনত্ব ও নানা তথ্য সংগ্রহের জন্য সার্ভে করার দরকার ছিল। আবার এই সার্ভে করার জন্য কূটনৈতিক সতর্কতারও দরকার। কারণ, চিনা কমান্ড্যান্ট বা তাঁর অধীনের লোকজন আমাদের উদ্দেশ্যের ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে। শের মহম্মদের অভিজ্ঞতা এই সমস্যা দূর করতে কাজে লেগে গেছিল।
আমি সাব-সার্ভেয়ারের সঙ্গে জায়গাটায় ঘুরতে গিয়ে কাজ শুরু করার জন্য দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম যতক্ষণ না সৈন্যাবাসের সকলে দুপুরের খাওয়া সেরে একটু গা এলিয়ে দেয়। যখন আমরা সার্ভের কাজটা নিঃশব্দে শুরু করছিলাম, সেই মোক্ষম সময়ে শের মহম্মদ গিয়ে পৌঁছেছিলেন সৈন্যাবাসের চিনা কমান্ড্যান্টের সঙ্গে দেখা করতে। আমার যাত্রা ও কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ঝানু কূটনীতিবিদের মতো এত দক্ষতার সঙ্গে চিনা কমান্ড্যান্টকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি বা তাঁর অধস্তন কেউই আমার দুর্গের ভেতর বা আশেপাশের কাজে কোনোরকম বাধা দিল না। সীমান্তের এই সৈন্যাবাসে যা আমার নজরে এসেছিল, তাতে পুরো সৈন্যবাহিনীটিকে আমার নিরীহ ও খানিক অলস বলে মনে হয়েছিল। দু-একজন নীল সুতির উর্দি পরা সৈন্য আমার তাঁবুর পাশে খানিক ঘুরঘুর করছিল আমরা কী করছি তা দেখার জন্য। নিছক কৌতূহল আর কী! ফারসি, তুর্কি বা ওয়াখি—স্থানীয় কাউকেই ওদের সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি।
মুন্সি শের মহম্মদ জানিয়েছিলেন, এই অঞ্চলে প্রায় আট বছর কাটিয়েছে এরকম চিনা সৈন্যদেরও আশেপাশের ভাষা সম্পর্কে প্রায় কোনো প্রাথমিক জ্ঞানই তৈরি হয়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে এই কারণেই সৈন্যদের কোনো কথাবার্তা হয় না।
একদিক থেকে দেখতে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে সৈন্যদের মাখামাখি না করাটা সামান্য কয়েকজন সৈন্য সম্বল করে চালানো দুর্গের চিনা সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ ছিল। এরা শুধু এখানে থেকে নিয়ম রক্ষার্থে দুর্গের দেখভাল করে। বাকি স্থানীয় যত সমস্যা, তার নিষ্পত্তির ভার স্থানীয় প্রধানদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমানে এই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে খাজনা আদায়ের পরিমাণ খুবই কম। চিনারাও তাঁদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও এককালীন বাণিজ্যের কর্তৃত্বের জায়গাগুলোতে নামকাওয়াস্তে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রেখেই সন্তুষ্ট।
চিনা দুর্গাধ্যক্ষ ‘আম্বান’ সবেমাত্র কাশগর থেকে ছুটি কাটিয়ে অসুস্থ অবস্থায় ফিরে এসে নিজের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আমার ওঁর সঙ্গে দেখা করার কথা থাকলেও মুন্সির পরামর্শে ওঁর অসুস্থতার কারণেই দেখা করার পরিকল্পনা বাতিল করেছিলাম। খানিক খারাপই লাগছিল, এত প্রাচীন জায়গায় এক সাম্রাজ্য-শক্তির প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নষ্ট হল বলে। হয়তো অনেক কিছু জানা যেত ওঁর থেকে।

সারিকোলের প্রধান করিম বেগ সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। শের মহম্মদের তুলনা নেই। তিনি আমার তাঁবু বা ‘কিরঘা’কে প্রায় দরবার কক্ষ বানিয়ে তুলেছিলেন। বেগরা আমাকে সারিকোলের পুরোনো দিনের ইতিহাস আর পরিবর্তিত অর্থনীতি থেকে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের ধারা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছিল, যা আমাকে এই অঞ্চলের জনজাতির জটিল মিশ্রণ সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করেছিল। এখানের উচ্চশ্রেণির মধ্যে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল যারা এই অঞ্চলের আসল ভূমিপুত্র। এদের কেউ কেউ ওয়াখি অভিবাসীদের বংশধর। এছাড়া রয়েছে অল্প কিছু চিত্রালি ও কানজুটি উদ্বাস্তু পরিবারের উত্তরসূরিরা। তবে সিঘনান থেকে এসে বসত করা মানুষের সংখ্যাই বেশি। মনে হয় চারদিক থেকে এসে মিলিত হওয়া পথের কেন্দ্রবিন্দু সারিকোলে বাণিজ্যের কারণেই হোক বা নিছক কৌতূহল বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে হোক, যারাই এসেছিল তাদেরই এই অঞ্চলে থেকে যাবার ইচ্ছে হয়েছিল। মনোরম আবহাওয়াও এর অন্যতম কারণ হতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এক বিচিত্র বহুভাষী জনতা, যারা মোটামুটি সবাই সারিকোলি ভাষায় ( ওয়াখি, ফার্সি আর তুর্কি ভাষার কাছাকাছি) কথা বলে।
আমার সঙ্গে যারা দেখা করতে এসেছিল, তাদের একটাই চাহিদা ছিল আমার কাছে…ওষুধের। কারও বয়সের ভারে চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গেছে, কারো-বা ছেলের কুষ্ঠ হয়েছে, কারও হাঁটুতে অসহনীয় যন্ত্রণা। অদম্য ইচ্ছে থাকলেও এদের ওষুধ দিয়ে কষ্ট লাঘব করার কোনো উপায় আমার ছিল না। কয়েকজনকে খানিক ওষুধ দিয়ে আর বাকিদের খাদ্যাভ্যাস বদলানোর খানিক উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত থাকতে হয়েছিল। শের মহম্মদ অনেক কসরত করে ওদের বুঝিয়েছিলেন যে আমি হাকিম নই। এদের নিরাময়ের জন্য মন্ত্র-তন্ত্র শোনালে বরঞ্চ লাভের চেয়ে লোকসান হত না।
১০ জুলাই তাশকুরঘান ছেড়েছিলাম। এখানে নতুন করে পরিবহণের ব্যবস্থা আর পরবর্তী যাত্রার জন্য সমস্ত রেশনের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। সমুদ্রতল থেকে ১০,০০০ ফুট উচ্চতায় ওট আর ডাল ছাড়া কিছুই জন্মায় না। তাই শাকসবজি জাতীয় কিছুই জোটানো যায়নি। শের মহম্মদ সামনের পথের দুর্গম যাত্রার কথা ভেবে আশেপাশের গ্রামে খুঁজেপেতে, সত্যি বলতে গেলে প্রায় লুট করে অজস্র ডিম সংগ্রহ করিয়ে আমার রাঁধুনি সাদাক আখুনের জিম্মায় সঁপে দিয়েছিল। আমার দলের অভিযানের খাদ্য জোগাতে স্থানীয় খাদ্য ভাণ্ডারের জোগান প্রায় শেষ হয়ে গেছিল। দুর্গাধ্যক্ষ আমাকে আগামী যাত্রার শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা অনুরোধ করে পাঠিয়েছিলেন গোটা ছ’য়েক ডিমের। ওঁর জন্য ওষুধ বানাতে ওই ডিমের প্রয়োজন ছিল। আমি সানন্দে ওঁকে ডিম পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। প্রায় মাইল তিনেক যাবার পর আমরা পৌঁছলাম তাঘদুম্বাশ নদীর বাম তীরের তিজনাফ গ্রামে। গ্রামটি প্রায় দুর্গের মতো। প্রথমেই যা আমার নজর কাড়ল, তা হল বিরাট এক কবরখানায় মাটি-পাথরে তৈরি অসংখ্য গোম্বুজ। নদী এখানে পূর্বদিকে মোড় নিয়ে সিন্দাহের সংকীর্ণ গিরিসংকটে প্রবেশ করে খানিক যাত্রার পর উপত্যকার মাঝবরাবর প্রবাহিত হয়েছে। আশেপাশে সবুজের নামমাত্র চিহ্ন নেই। চারপাশের পাহাড়গুলোয় কালচে ভাব। খানিক পেছনে ফেলে আসা সবুজের সমারোহের পরে এ এক অদ্ভুত বিপরীত দৃশ্য।
তাঘারমা-সু ধরে শীতে যাতায়াত অনেক সুবিধাজনক। মুজ-তাঘ-আতার পশ্চিম ঢাল থেকে বেরিয়ে আসা তাঘদুম্বাশ নদী এখানে যথেষ্ট গভীর। প্রবল স্রোত ঠেলে সে-নদী পার হওয়া অসম্ভব। যদিও শীতকালে নদীর জল জমে বরফ হয়ে গেলে তার ওপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটে পার হয়ে যাওয়া যায়। তাই খানিক পথ বদলে তিজনাফ থেকে অনেকটা উত্তর-পশ্চিমে গিয়ে একটি অপেক্ষাকৃত নীচু গিরিপথের মধ্যে দিয়ে যেতে হছিল।
দুটি নদীর চলার পথের ফলে এখানে একটা খোঁচমতন তৈরি হয়েছিল। শুশ বা কুম-দাওয়ান (‘বালুকাময় গিরিপথ’)-এর ১২,০০০ ফুট মতো উচ্চতা থেকে তাশকুরঘান উপত্যকার দক্ষিণদিকের একটি বিস্তৃত অঞ্চল দেখা যায়। সুদূরের তুষার-ঢাকা কারাকোরাম পর্বতমালার পাহাড়চূড়াগুলোর প্রায় সবক’টাই এখন মেঘের আড়ালে। দক্ষিণে ভারতের সীমান্ত এ যাত্রায় আমার শেষ দেখা। মুজতাঘ-আতার বিশাল বরফ-ঢাকা সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি পশ্চিম ও দক্ষিণ জুড়ে। দূরত্ব ও মেঘ-কুয়াশা মাখামাখি হয়ে থাকায় নাঙ্গা পর্বত, রাকাপোশি ও গডউইন অস্টিনের (কে২) রূপ ওখান থেকে অধরাই থেকে গেছিল। এর খানিক দক্ষিণে তাঘারমা সমভূমি, যার গড় উচ্চতা ১৪,০০০ ফুট। তারও দক্ষিণে চিরতুষারাবৃত পাহাড়শ্রেণি। স্থায়ী তুষারের আস্তানা। তাদের গড় উচ্চতা ১৭,০০০ ফুটের কম নয়। অবিশ্বাস্য লাগছিল যে ভারতের সমতল থেকে আমি পৌঁছে গেছি এমন একটি সমতলে যার চারপাশে আকাশ ছুঁতে চাওয়া বরফে ঢাকা পাহাড়রাজি, অগুনতি হিমবাহ আর গভীর গিরিখাত। এই অবর্ণনীয় দৃশ্য আমাকে মোহিত করে দিয়েছিল।
শুশ থেকে প্রায় হাজার ফুটের মতো নীচের দিকে নামার পর আমরা পৌঁছেছিলাম তাঘারমাতে। অনেকটা সবুজহীন পথ পার হয়ে এসে আবার খানিক সবুজের ছোঁয়া পেয়েছিলাম। সঠিক সেচের ফলে বার্লি আর ওটের সবুজ কচি পাতায় ভরে রয়েছে চাষের খেত। মুজতাঘ-আতার দিকে যদি চোখ না পড়ে তবে মনে হবে যেন কোনো সমতলের শস্যখেতের পাশে আছি। শুধু ফেল্টের পোশাক পরা কিরঘিজ রাখাল আর ঘাসে মুখ ডুবিয়ে মুখ নাড়াতে থাকা ইয়াকের দল বুঝিয়ে দেয় স্থানটির উচ্চতাজনিত অবস্থান।
সাফস্গোস, যেখানে আমরা তাঁবু খাটিয়েছিলাম, সেটি সারিকোল অঞ্চলের তাঘারমা সমভূমির অন্যতম গ্রীষ্মকালীন অস্থায়ী বসতিগুলির একটি। এখনও পর্যন্ত শিশু ও মহিলাসহ তিনটি সুদর্শন কিরঘিজ পরিবারের দেখা পেয়েছি। সবসময় পর্যাপ্ত দুধ ও মাখনের জোগান দিতে প্রস্তুত এরা।
১১ জুলাই সকালে হাওয়া প্রায় চলছিল না। ফলে ঠান্ডা কম লাগছিল। শুধুমাত্র মুজতাঘ-আতার চূড়া ছিল মেঘের আড়ালে। উচ্চ সমতলভূমির খোলা ঘাসজমি ধরে খচ্চরের পিঠে চেপে যেতে চারপাশের পাহাড়ের সৌন্দর্যকে দু-চোখ ভরে উপভোগ করছিলাম। খানিক চলার পর একের পর এক নজরে এসেছিল ঘুলান, সারিক-তাশ এবং বের্জাশ (বা বারদাশত)-এর গিরিপথগুলোয় যাবার পথ। এগুলো সবই রাশিয়ার অংশ। আকাশ পরিষ্কার থাকায় হিমবাহের সীমানা ছাড়িয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ড দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কার। সরলা নামের ছোট্ট গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় মাটির দেওয়ালঘেরা একটি চিনা সামরিক ছাউনি চোখে পড়েছিল। এই ছাউনির কাজ ছিল ছোটো ছোটো সারিকোলি গ্রামগুলোর ওপর নজরদারি করা, যাতে রাশিয়ানরা এই অঞ্চলে ঢুকে পড়ে আধিপত্য কায়েম করতে না পারে। এইসব গ্রামের মানুষগুলো মূলত চাষাবাদ করে থাকে।
সরলা গ্রামের চাষের খেতের চৌহদ্দি ছাড়াতেই নজরে এসেছিল বালিময় জমিতে ইতিউতি গুল্মের গুচ্ছ। বেশ কয়েকটি অস্থায়ী চামড়ার কুঁড়ে দেখতে পেয়েছিলাম। তাদের বাসিন্দা কিরঘিজ পশুপালকরা চেহারায় গাট্টাগোট্টা হলেও মুখে হাসি লেগেই ছিল। কুকিয়ার গ্রামের পর পথ গেছিল একটি পাথরভরা চওড়া নালার মধ্য দিয়ে। নালার পুব-পশ্চিমে পাথরের নীচু দেওয়াল। দেওয়ালগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যে অনেক প্রাচীন এই পাথরের স্তূপগুলো। পূর্বদিকের পাথরের দেওয়াল টপকে যে দৃশ্য সরাসরি নজর কেড়ে নিয়েছিল, তা হল দূরের তুষার-ঢাকা কারাকোরাম পর্বতরাজি। দুপুর পার হতে না হতেই উদ্দাম হাওয়া বইতে শুরু করল। আমাদের ভাগ্য ভালো যে আমরা কিরঘিজদের একটি ছোট্ট বসতি ঘুজাকে পৌঁছে গেছিলাম। গ্রামের লোকেরা আমাদের শিবির তৈরির জন্য সাগ্রহে জায়গা দেখিয়ে দিয়েছিল। তাঁবু খাটাতে না খাটাতেই শুরু হয়ে গেছিল টিপটিপে বৃষ্টি। সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা। আমি আমার লম্বা পশমের কোটটা গায়ে চাপিয়ে নিয়েছিলাম, যেটাকে সারিকোল উপত্যকায় ঢোকবার পর থেকে ব্যাগেই ভরে রেখেছিলাম। হিপসোমিটারে জায়গাটার উচ্চতা দেখাচ্ছিল ১১,৬০০ ফুট।
পরদিনের যাত্রাপথটি ছিল সংক্ষিপ্ত। তাই সকালটাকে অন্যভাবে কাজে লাগালাম। রাম সিংয়ের সঙ্গে সামনের উঁচু পাহাড়টার মাথায় উঠলাম। পুবদিকে আমাদের সরাসরি সামনে দাঁড়িয়ে কারাকোরামের শৃঙ্গরাজি। পাহাড়-চূড়া ঘিরে হালকা মেঘের ভিড়। আবহাওয়া পরিবর্তনের আভাস পাচ্ছিলাম। আকাশে ছাড়া ছাড়া মেঘ থাকলেও তাঘারমা উপত্যকার দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল তাশকুরঘানের দক্ষিণ-পূর্বের চূড়াগুলো। আমাদের মাপজোকের কাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। যদিও পুবদিকে মুজতাঘ-আতা আর সন্নিহিত হিমবাহগুলো ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকায় পুরোপুরি আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছিল।
বেশ খানিকটা সময় পাহাড়ের মাথায় কাটিয়ে ক্যাম্প সাইটে নেমে এসে উত্তরের দিকে হাঁটা শুরু করেছিলাম আমরা। সামান্য রাস্তা পেরোতে খাইন্দি নামের এক উপত্যকায় পৌঁছেছিলাম একটা সরু রাস্তার মধ্য দিয়ে। এখানে একটি ছোট্ট মাজার রয়েছে। কোনো পীরের সমাধিস্থল। চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কিরঘিজ চারণদাররা মাঝে-মাঝেই পশুর দল নিয়ে এখানে চলে এসে দিন কয়েকের জন্য আস্তানা পাতে কচি ঘাসের জন্য। কিছু পাথর স্তূপ করে রাখা মাজারের পাশে। তার ওপর ওভিস-পলি যা ‘মার্কো পোলো ভেড়া’ নামে পরিচিত, তার শিং বসানো।
এছাড়া মাজার ঘিরে কয়েকটা খুঁটির ওপর রঙিন কাপড়ের টুকরো পতপত করে উড়ছিল। এই ধরনের রঙিন কাপড়ের পতাকা উত্তর ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। বিশ্বাস, সাধুর আশীর্বাদ-ছোঁয়া বাতাস যেখানেই বয়ে যাবে সেখান থেকে অশুভ শক্তি বা রোগবালাই দূরে থাকবে।
ক্রমশ সরু হতে থাকা একটি জলের ধারার পাশ দিয়ে আলগা নুড়ি-পাথরের ওপর দিয়ে দু-ঘণ্টার বেশি চলে আমরা পৌঁছেছিলাম কারা-সুতে। এটি একটি ছোট্ট রাশিয়ান সামরিক পোস্ট বা ‘কারাউল’। ঘাঁটিতে মাত্র তিনজন সৈন্য ছিল। মাটির পাঁচিল দিয়ে ঘেরা খানকয়েক মাটির ঘর, যার প্রায় সবগুলোই খালি। মাটির পাঁচিল…হয় রক্ষণের জন্য, নয় হাওয়া আটকানোর জন্য দেওয়া। আমার পরিচারকেরা ওই ঘরগুলোর ভেতরে দ্রুত রাত কাটানোর বন্দোবস্ত করে ফেলল। জায়গাটার দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রশস্ত সমতল উপত্যকা ক্রমশ নীচের দিকে নামতে নামতে পৌঁছেছে কুলমা গিরিপথে। কারা-সুর তৃণভূমির লাল-সাদা ফুলে ছাওয়া কার্পেট দেখে আমার তাশকুরঘানের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক একইরকম প্রাকৃতিক কার্পেটের দেখা পেয়েছিলাম ওখানে।
পরদিন ১৩ জুলাই সকাল থেকেই আবহাওয়া বিগড়ে ছিল। মেঘ আর কুয়াশায় ঘোলাটে হয়ে ঢেকে ছিল আশপাশ। হিপসোমিটার বলছিল যে জায়গাটার উচ্চতা ১২,১০০ ফুট। যতটা ঠান্ডা হবে ভেবেছিলাম ততটা ঠান্ডা ছিল না। সকাল সাড়ে ছ’টায় তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। মনেই হচ্ছিল যে-কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। আবহাওয়া খানিক ভালো হবার অপেক্ষায় সাব-সার্ভেয়ার রাম সিংকে ওঁর কাজের জন্য এখানে রেখে আমরা ন’টার সময় সামনের গন্তব্যের জন্য রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু টাট্টুঘোড়া আর ইয়াকের পিঠে মাল চাপাতে বিস্তর বেগ পেতে হল। মনে হয় ওরা খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়েছিল। একটা তো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ওর পিঠ থেকে আমার কাগজপত্র বোঝাই একটা বাক্স ফেলে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল।
রওনা হবার খানিক পরপরই চারপাশ কাঁপিয়ে তুষারঝড় আছড়ে পড়েছিল আমাদের ওপর। এগোনোর গতি শুধু কমেই গেছিল তা নয়, এগোনোও বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দূরের কিছু নজরে আসছিল না। শুধু তাঘারমা-সুর জলের ধারা নজরে আসছিল। ওই জলের ধারাকে পাশে রেখে কোনোক্রমে পা টিপে টিপে আমরা এগোচ্ছিলাম। প্রায় দু-ঘণ্টা চলার পর আমরা গিরিপথের শীর্ষদেশ উলুগ-রাবাতের (‘উঁচু জায়গা’) কাছে পৌঁছলাম। বৃষ্টি খানিক ধরে এসেছিল। চারপাশ আঁধার-ঘন হয়ে থাকলেও টের পেয়েছিলাম, শুধু আমরা নই, আরও কেউ এখানে আছে। ক্ষণে ক্ষণে তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে আসছিল নানাদিক থেকে। আওয়াজ-কর্তারা মুখ বাড়িয়েছিল তাদের খুদে মাটির ঢিবি থেকে। হিমালয়ান মারমটের দল। এই গিরিপথের রক্ষক। এর আগেও এদের সঙ্গে দেখা হয়েছে গিরিবর্ত্মের বিপদজনক অংশে। প্রতিবারই এরা আওয়াজ তুলে সতর্ক করেছে যেন।
সাড়ে এগারোটা নাগাদ গিরিপথের মাথায় পৌঁছলাম। সমুদ্রতল থেকে ১৪,০০০ ফুট উঁচুতে কতগুলো পাথর স্তূপ করে রাখা। কোনো সাধুসন্তের চিরবিশ্রামস্থলের প্রতীক। হিমালয়ের উত্তরে এসেও দেখছি সব পার্বত্য অংশেরই বিশ্বাস আর রীতিগুলো অনেকটাই একইরকম। ডান-বাম কোনোদিকের কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না ঘন কুয়াশার জন্য। পাহাড়ের উঁচু অংশটা দৃষ্টির জন্য অধরা করে রেখেছিল প্রকৃতি। শুধু সামনের খোলা প্রান্তর যা ক্রমশ নেমে গেছে সু-বাশি হয়ে ছোটো কারাকুল হ্রদের দিকে, তা খানিক দেখতে পারছিলাম। ক্রমশ ঢালু হতে থাকা পথ ধরে খানিক এগোতে না এগোতেই আবার মুষলধারে তুষার মেশানো বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আগের থেকেও ভয়াবহ বৃষ্টির তেজ। চলতে গিয়ে পাহাড়ের তলার প্রথম পশুপালকদের ডেরা ‘আউল’-এর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন ভিজে গিয়ে একদম চুপসে গেছি। আবহাওয়ার খুব একটা উন্নতি হবে বলে মনে হল না। তাই অপেক্ষায় না থেকে উপত্যকার চিনা সামরিক পোস্ট সু-বাশির দিকে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে হয়েছিল। ওখানে পৌঁছতে পারলে আশ্রয় আর প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়ার আশা আছে। বৃষ্টি মাথায় করে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি কিরঘিজ কবরখানা আর পাথরের গম্বুজের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মনে হল যে এটি প্রাচীন কোনো স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। দুপুর দুটো নাগাদ চিনা পোস্টটি নজরে এসেছিল। আমার মন আনন্দে নেচে উঠেছিল আশ্রয় পাবার আশায়। একটি ভাঙাচোরা পাথরের পাঁচিলের ভেতর কতগুলো আধভাঙা ঘর। বেশ কিছু সার সার মাটির বাড়ি। সৈন্যদের থাকার জায়গা। সবমিলিয়ে এটাই এখানকার সামরিক আখড়া। আমি পৌঁছতে না পৌঁছতেই এই পোস্টের সবাই—সব মিলিয়ে মোট আটজন, হাজির হল। তাদের কমান্ড্যান্ট এক ছোটোখাটো কর্পোরাল গোছের পদাধিকারি। আমাকে তারা খাতির করে নিয়ে গিয়ে তুলল তাদের সবচাইতে ভালো ঘরটায়। সত্যি বলতে কি, তাদের ভালো ঘরটাও ছিল ভাঙাচোরা। মাথার ওপরকার চালের একটা ফুটো দিয়ে আলো এসে ঘরটাকে খানিক আলোকিত করে। সেটাও বৃষ্টির কারণে বন্ধ করে রাখা ছিল। গর্তের ঠিক নীচে ঝোলা একটা জ্বলন্ত টিমটিমে কুপির আলোয় নজরে এসেছিল ঘরের মধ্যে একটা উঁচু শোবার জায়গা। কুপির ধোঁয়ায় ঘরটা ভরে ছিল বলে আমরা বড়ো ঘরটার লাগোয়া ঘরটায় গিয়ে বসেছিলাম গরম চায়ের জন্য। আমার ছোট্ট টেরিয়ারটা ঘরে ঢুকে খুব আরাম পেয়েছিল। বেচারা বৃষ্টিতে আর ঠান্ডায় বেদম কাঁপছিল। গায়ের জল ঝেড়ে এক লাফে শোবার জায়গায় উঠে স্তূপ করে রাখা লেপের মধ্যে গিয়ে সেঁধিয়ে গেছিল। সেখানে আগে থেকেই একটা বেড়াল শুয়ে ছিল। ঠান্ডায় কাতর বেচারা কিন্তু বেড়াল দেখেও কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। বরং গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়েছিল ওর পাশে। মেজাজ ঠিক থাকলে কী করত কে জানে?
সৈন্যদের আন্তরিক আতিথেয়তা, নাকি তাদের চেহারার প্রফুল্লতা—কোনটা আমার ভালো লেগেছিল বলতে পারব না। শুধু এটা বলতে পারি, এইরকম জায়গায় ছোটো সামরিক ছাউনিটা মোটের ওপর আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সৈন্যদের বেশিরভাগই ছিল লম্বা আর পেটানো চেহারার। তুর্কিতে কথা বলতে অনেকটাই সাবলীল এবং যথেষ্ট বুদ্ধিমান। বৃষ্টি ধরে আসাতে ওদের ছবি তুলব বলাতে ওরা দ্রুত প্যারেডের পোশাক পরে নিল। নীল ভেলভেটের প্যান্ট, লাল কাপড়ের টিউনিক, তাতে কালো মখমলে সেলাই করা চিনা অক্ষর। মাথায় টুপি, পায়ে চামড়ার উঁচু বুট। নিখুঁত সামরিক পোশাক। তাদের কাঁধের এনফিল্ড কারবাইনগুলোতে ‘টাওয়ার’ কথাটা জ্বলজ্বল করছিল।
ইতিমধ্যে উলুঘ-রাবাতের উত্তরের কিরঘিজ পশুপালক-গোষ্ঠীদের প্রধান করম শাহ্ বেগকে আমার পৌঁছানোর খবর পাঠানো হয়ে গেছিল। তিনি আমাকে স্বাগত জানাতে এলেন। বৃষ্টি থেমে যেতে আমি মালপত্র নিয়ে ওদের সঙ্গে সু-বাশির সামরিক পোস্ট থেকে দু-কিলোমিটার দূরে করম শাহ্ বেগের তাঁবু কিরঘাজে গিয়ে উঠেছিলাম। আমার পরিচারকদের জন্য একটা তাঁবু খালি করে দেয়া হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। বৃষ্টি থেমে যাওয়াতে আমি আমার তাঁবুটা একটা শুকনো জায়গায় লাগিয়েছিলাম। জায়গাটা বালিময় হওয়াতে বৃষ্টি হলেও জল শুষে যাবে। তাঁবুর পাশ দিয়ে বৃষ্টির জলে ভরা অনেক ছোটো ছোটো জলের স্রোত কারাকুল হ্রদের দিকে বয়ে গেছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে মাইল দেড়েক দূরের হ্রদের চকচকে জল এখান থেকেই দেখা যায়।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন