মার্ক অরেল স্টাইন
খোটান থেকে যাত্রা শুরু করে কাশগর হয়ে রাশিয়ান তুর্কিস্তান হয়ে ইউরোপে যাওয়ার গল্প ছোটো আকারে বলা যেতেই পারে।
ছ’দিন ধরে মরুঝড় আর বৃষ্টি সামলে পৌঁছেছিলাম ইয়ারখন্দে। ওখানে আমার ক্যারাভান আগেই নিরাপদে পৌঁছে গিয়েছিল। ইয়ারখন্দে বসে যখন মহাজনদের পাওনাগণ্ডা মেটাচ্ছিলাম তখনও প্রবল বৃষ্টি হয়েই চলেছিল। বহুবছর এই অঞ্চলের লোকেরা এরকম বৃষ্টি দেখেনি। দু-দিন ধরে প্রায় অঝোরে বৃষ্টি হয়েছিল। মরূদ্যানের সব রাস্তাগুলো জলা হয়ে গিয়েছিল। অজস্র মাটির বাড়ি ভেঙে পড়েছিল। ইয়ারখন্দে যেখানে আমি ছিলাম সেই বাড়ির মাটির ছাদ ফুটো হয়ে এমনভাবে জল পড়ছিল যে আমার ভয় হচ্ছিল এত পরিশ্রম করে মরুর বালির নীচ থেকে উদ্ধার করে আনা প্রত্নসামগ্রীগুলো না ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে যাই হোক, টানা বৃষ্টি আবহাওয়াকে ঠান্ডা করে দিয়েছিল, ফলে মাত্র তিনদিনে প্রায় ১৪০ মাইল পথ পার হয়ে কাশগর পৌঁছতে পেরেছিলাম।
১২ মে, প্রায় আট মাস পরে আবার ফিরে এসেছিলাম চিনি-বাগে মিঃ ম্যাকার্টনির বাসভবনে। অভিযান নিয়ে কথা যেন শেষ হচ্ছিল না। অভিযান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা সামগ্রীগুলো তাঁকে দেখাতে পেরে আমারও যেন আনন্দের সীমা ছিল না। বিশ্রামের পাশাপাশি কাজেরও শেষ ছিল না। কলকাতা থেকে যাত্রা শুরুর আগে আমার অনুরোধে ভারতের সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর সেন্ট পিটার্সবার্গের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাশিয়ান তুর্কিস্তান হয়ে ইউরোপে ফিরে আসার জন্য ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রেলওয়ে ব্যবহার করতে চাওয়ার আবেদন ইতিমধ্যেই অনুমোদিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহগুলো রাশিয়ার ভেতর দিয়ে রেলে করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার। দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার আগে আবার নতুন করে সব বাক্সবন্দী করিয়ে প্রত্নসামগ্রী ছাড়া জরিপের যন্ত্র ও অনান্য সরঞ্জাম সাব-সার্ভেয়ার রাম সিংয়ের দায়িত্বে হুনজা হয়ে ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা ছাড়াও দুই দলের আলাদা আলাদা যাত্রাপথের জন্য নতুন করে পরিবহণের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। গত আট মাসে অভিযানের জন্য কেনা উট আর টাট্টুঘোড়াগুলো ভালো দামে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। যে-দামে ঘোড়াগুলো কিনেছিলাম প্রায় সেই দামেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। আর উটগুলো বিক্রি করে কেনা দামের তিন-চতুর্থাংশ পেয়েছিলাম। রাশিয়ার দিকের পরিবহণ মরশুম পুরোদস্তুর শুরু হয়ে গেলে কেনা দামের থেকেও বেশি দামে পশুগুলোকে বিক্রি করা সম্ভব হত। এই দাম প্রমাণ করে, কঠিন মরু অভিযানে আমরা সঠিকভাবেই সমস্ত পশুদের যত্ন নিয়েছিলাম। যাই হোক, অভিযানের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ অনেকটাই ফেরত দিতে পেরেছিলাম।
কাশগরে রাশিয়ার ইম্পেরিয়াল কনসাল-জেনারেল এম. পেত্রোভস্কির সহায়তায় আমার কাজ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন তুর্কিস্তানে সরকারি কাজে থাকার ফলে মিঃ পেত্রোভস্কির ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের প্রতি স্বভাব আগ্রহ জন্মেছিল। তিনি আমার অভিযানের অভিজ্ঞতা উৎসাহ নিয়ে শুনেছিলেন এবং প্রত্ন-নিদর্শন যাতে নির্বিঘ্নে ইংল্যান্ডে পৌঁছতে পারে সে-বিষয়ে সবরকম ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
এই অঞ্চলের মুখ্য সামরিক অধিকর্তা তাও-তাই-এর সঙ্গে ফেরার আগে বেশ কয়েকবার দেখা করেছিলাম। কোনো সন্দেহ নেই, আমি যেখানেই গেছি, ওঁর হুকুমে সেখানকার চিনা প্রশাসনের কর্তারা সবরকম সহযোগিতা করেছেন। অভিজ্ঞ বৃদ্ধ বন্ধুসুলভ প্রশাসক মানুষটি ব্যক্তিগতভাবে অভিযানের ফলাফল জানার জন্য উৎসুক ছিলেন। বৃদ্ধ ব্যক্তিটি বার বার বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, এই অভিযানে তিনি কোনো সাহায্য করেননি, স্বয়ং ঈশ্বর করেছেন। তিনি আরও বলেছিলেন, আমরা দুজন আগের কোনো জন্মে নিশ্চয়ই কোনো মহান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে ছিলাম, তাই এত বছর পরে ভয়ংকর বালি-সমুদ্রের তলা থেকে বিপুল আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের খোঁজ পেয়েছি। ওঁর অবসর গ্রহণের সময় ঘনিয়ে এসেছিল। ইচ্ছে ছিল অবসর গ্রহণের পর কোনো বৌদ্ধ মঠে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাবেন। যদিও ওঁর শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি, খবর পেয়েছিলাম, অসুস্থতা এবং বার্ধক্যের কারণে তিনি আমি কাশগর ছেড়ে চলে আসার এক বছরের মধ্যে অবসর গ্রহণের আগেই মারা যান।
প্রায় চোদ্দ দিন ধরে বারোটা বড়ো বড়ো মজবুত বাক্স বানিয়ে সমস্ত প্রত্নবস্তুগুলো তার মধ্যে নিরাপদে ভরে সেগুলো পাঠানো হয়েছিল রাশিয়ান কনস্যুলেটে শুল্ক পরীক্ষার জন্য। রাশিয়ান কনস্যুলেট বাক্সগুলোয় ইম্পেরিয়াল ঈগলের সিলমোহর মারার পর কাশগর থেকে লন্ডনের মাঝে কোনো সামরিক বা শুল্ক পোস্ট সিল ভেঙে সেগুলো খুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি।
কাশগর ছাড়ার দিন আমার ঠিক আগে-আগেই সাব-সার্ভেয়ার রাম সিং ভারতের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। রাম সিং শুধু জরিপের কাজটিই নির্ভুলভাবে করেনি, আমার প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের সঙ্গে মনেপ্রাণে জড়িয়ে পড়েছিলেন। মরু-পাহাড়ের কঠিন যাত্রার ক্লান্তি হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। শিবির পরিচালনায় ওঁর ভূমিকা কোনোভাবেই অস্বীকার করার নয়।
আমার আশ্রয়দাতা ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে বিদায় নিতে অনেকটাই সময় লেগেছিল। সকলের আতিথেয়তা ও সহযোগিতা কোনোভাবেই ভোলার নয়। সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, বিশেষ করে এর বর্তমান প্রধান সার্ভেয়ার জেনারেল কর্নেল সেন্ট জর্জ গোর, সি.এস.আই.-এর প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ রাম সিংয়ের মতো সুপ্রশিক্ষিত একজনকে সহকারী হিসেবে আমার অভিযানে পাঠানোর জন্য।
রাম সিংয়ের সঙ্গে তাঁর রাজপুত সহকারী যশবন্ত সিংয়ের কথাও বলতে হয়। সেও হাসিমুখে নিষ্ঠাভরে তার দায়িত্ব পালন করেছিল। এই দুজনেই আমার ফক্স টেরিয়ার কুকুর ইওলচি বেগকে খুব ভালোবাসত। মরু-পাহাড়ের কঠিন পথ পার হলেও দীর্ঘ রেলযাত্রার ধকল যদি সামলাতে না পারে ভেবে ওকে এই দুজনের সঙ্গে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এর কয়েক মাস পর নভেম্বরের এক রাতে ওর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল পাঞ্জাবের এক রেল-স্টেশনে। আমি পৌঁছনোর কিছুদিন আগে থাকতেই ও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তারপর আমার দেখা পেতেই দিন কয়েকের মধ্যেই আবার চনমনে হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাকে মাসখানেকের মধ্যেই সরকারি কাজে ইংল্যান্ডে ফিরতে হয়। প্রভুর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা বা যে-কারণেই হোক সে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমার অনুপস্থিতির সময় তার প্রিয় কাশ্মীরের পাহাড়েই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে ইওলচি বেগ।
শ্রীনগর ছেড়ে আসার ঠিক এক বছরের মাথায়, ১৯০১ সালের ২৯ মে আমি কাশগর থেকে ফারঘনার নিকটতম রাশিয়ান শহর ওশ-এর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। আমার ক্যারাভানের বহর অনেক ছোটো হয়ে গিয়েছিল। ছ’টা শক্তপোক্ত ঘোড়ার পিঠে প্রত্নসামগ্রীভরা বাক্সগুলো চাপানো হয়েছিল, আর একটা ঘোড়া আমার ব্যক্তিগত মাল বহন করছিল। ঘোড়াগুলোর দেখভালকারী লোক ছাড়া শুধুমাত্র সাদাক আখুন আমার সঙ্গে চলছিল। মরুভূমির দুষ্টু আত্মাদের (চরস খাওয়ার প্রলোভন থেকে) থেকে মুক্তি পেয়ে ও আবার শান্তশিষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
আলাই পর্বত ধরে কাশগর থেকে ওশ পর্যন্ত যেতে সাধারণত আঠারো দিন লাগে। কিন্তু আমি সময় বাঁচাতে ভোর থেকে শুরু করে অনেক রাত পর্যন্ত ঘোড়ার পিঠে বসে বা হেঁটে এই দূরত্ব পার করেছিলাম দশ দিনে।
গত সপ্তাহের প্রচণ্ড বৃষ্টি আর পাহাড়ের বরফ গলতে শুরু করায় পথের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কিজিল-সু নদী উপচে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়ান সীমান্তে আলাইয়ের দিকে এগোতে এগোতে খালি ভয় হচ্ছিল জলের তোড়ে সঙ্গের সব জিনিসপত্র ঘোড়া-সহ ভেসে না যায়! আমাদের ভাগ্য ভালো অতি সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর ফলে কাশগর থেকে রওনা হবার পাঁচ দিনের মাথায় সন্ধেবেলা রাশিয়ান সীমান্ত চৌকি ইরকেশতামে পৌঁছেছিলাম। রাজনৈতিক সীমান্ত পার হতে পুরো পরিবেশটাই বদলে গিয়েছিল। রাশিয়ান কাস্টমসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এম. ডোচেঙ্কো আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে চিন সীমান্ত থেকে কয়েকশো গজ দূরের কসাক গ্যারিসনের দুর্গের নীচে অবস্থিত সুনির্মিত এক আরামদায়ক বাড়িতে নিয়ে তোলেন। এলাকায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি ইউরোপে পৌঁছনোর অনুভূতি টের পেয়েছিলাম।
পরদিন সকালে ইরকেশতাম ছেড়ে যাত্রা শুরু করার পরপরই চারপাশের দৃশ্যও বদলে গিয়েছিল। কিজিল-সু নদীর উৎস এলাকার রুক্ষ পাথুরে জমি ছেড়ে পৌঁছে গেছিলাম ঘাসে ভরা আলপাইন ঢালে। পুরু হয়ে নরম তুষার জমে থাকার কারণে তখন তেরেক গিরিপথ হয়ে যাবার পরিচিত পথটা বন্ধ ছিল। তাই আমাকে আলাই পার হয়ে অনেক ঘুরপথে যেতে হল। তৌন-মুরুন গিরিপথ (সমুদ্রতল থেকে ১২,০০০ ফুট উঁচু) যা তারিম নদী এবং আমুদরিয়ার মাঝে জলবিভাজিকার কাজ করে, তার মাথায় সে রাতের মতো শিবির পেতেছিলাম। রাতটা কেটেছিল কষ্টে- প্রবল তুষারপাত আর ঝোড়ো হাওয়ায় শীতে কাঁপতে কাঁপতে।
পরের দিনও আকাশ পরিষ্কার হল না। তার মধ্যে দিয়ে আমি ঢালু ও প্রশস্ত ‘মার্গ’ (কাশ্মীরে বলে) দিয়ে আলাই উপত্যকায় নেমে এলাম। ফলে পামিরের দিকের মাউন্ট কাউফম্যান এবং ট্রান্স-আলাই পর্বতমালার উঁচু শৃঙ্গগুলো দেখার সুযোগ আর পাইনি।
কিরঘিজরা এখনও তাদের পশুর পাল নিয়ে চারণভূমিতে আসেনি। আরও বরফ গলার অপেক্ষায় আছে ওরা। সঙ্গে খাবার বেশি না থাকায় যেভাবেই হোক তালদিক গিরিপথ পার হয়ে উত্তরের দিকের সমভূমিতে পৌঁছতেই হবে ঠিক করে জোরকদমে চলা শুরু করেছিলাম। বেশ খানিকটা চলার পর পৌঁছেছিলাম গুলচা থেকে পামিরের পথে সুপরিচিত রাশিয়ান দুর্গ ‘পামিরস্কি পোস্ট’’-এ যাবার রাস্তায়। কিন্তু পুরো রাস্তাটাই বরফে ঢাকা পড়ে ছিল, সঙ্গে শুরু হয়েছিল ভয়ংকর তুষারঝড়। ইরকেশতামের শুল্ক আধিকারিক কাজান থেকে আসা একজন সাহসী ‘নোগাই’ বা রুশ মুসলিমকে আমার ‘জিগিত’ বা পথপ্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে দিয়েছিলেন। সে না থাকলে তুষারঝড়ের মধ্যে পথ চিনে এগোনো সম্ভব হত না। দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে সমস্ত মালপত্র-সহ নিরাপদে অনেক রাতে পৌঁছেছিলাম ওচ-টোবের পরিত্যক্ত কিরঘিজ ব্লক-হাউসে।
এখান থেকে তিনদিন যাত্রা করার পর পৌঁছেছিলাম মনোরম গুলচা নদী উপত্যকায়। পাহাড়ের নীচু ঢাল ভেষজ গাছ ও ফুলে ছাওয়া আর ওপরের ঢালে পাইনের বন আমাকে কাশ্মীরের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। গুলচা উপত্যকা পার হয়ে আলাই নদীর ধার ধরে হাঁটার সময় বেশ কিছু কিরঘিজ পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। উট ও টাট্টুঘোড়ার পিঠের ওপর বিছানো সূক্ষ্ম কাজ করা কার্পেটের ওপর বসা ঝলমলে পোশাক পরা পুরুষ-মহিলাদের নিয়ে লটবহর-সহ একের পর এক ক্যারাভান চলেছিল আলাই নদীর ধারে তাদের গ্রীষ্মকালীন আবাস ‘ইয়েলাক’-এ।
৭ জুন অতি সমৃদ্ধ ফারঘনা উপত্যকা পার করে সন্ধে নাগাদ ওশ-এ পৌঁছেছিলাম। ইউরোপিয় প্রশাসনের ভাবধারায় অতি যত্নে তৈরি করা চাষের খেত আর পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা একের পর এক গ্রাম নিয়ে ফারঘনা উপত্যকা। মাত্র বছর পঁচিশ আগে রাশিয়ান জেনারেল স্কোবেলেফ ফারঘনা প্রদেশ দখল করে রাশিয়ান তুর্কিস্তানের অংশ করে তুলে নদীর তীরে পূর্ব ইউরোপিয় ঢঙে এক জনপদ তৈরি করেন। তার সেনানিবাস, পরিষ্কার রাস্তাঘাট, পার্ক, রাশিয়ান ধাঁচের ঘরবাড়ি তারই সাক্ষ্য দেয়।

ফারঘনা জেলার প্রধান কর্নেল জায়ৎসেফ আমাকে ওশে অভ্যর্থনা জনিয়েছিলেন। ওঁর অফিসের বাইরে আমাকে স্বাগত জানাতে সুসজ্জিত মিং-বাশি এবং কিরঘিজ প্রধানরা অপেক্ষা করছিল। এত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একসঙ্গে উপস্থিতি দেখে ভারতীয় সীমান্ত জেলার ‘কাছারি’র কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। এক চমৎকার ভিলায় কর্নেলের আতিথেয়তা, তার জানালা দিয়ে বরফে ডাকা আলাই পর্বতমালা, সবকিছু মিলিয়ে যেন ইউরোপের বাতাসে শ্বাস নিচ্ছিলাম। এখান থেকে বাড়িতে টেলিগ্রাফ করতে পেরে বুঝে গেছিলাম যে আমি সত্যিই পাশ্চাত্যের সীমানায় পৌঁছে গেছি।
ওশে বসে অনেকদিনের প্রাপ্য বিশ্রাম নিলাম। এখানেই সাদাক আখুন বিদায় নিল। ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভারতীয় তাঁবু ও অন্যান্য সরঞ্জাম অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ায় এখানে ফেলে রেখে গেলাম।
ওশ থেকে ঘণ্টা চারেক উর্বর সমভূমির মধ্যে দিয়ে গাছের ছায়া ঢাকা রাস্তা ধরে পৌঁছেছিলাম বিখ্যাত আন্দিজান শহরে। এই শহর ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান রেলওয়ের টার্মিনাস স্টেশন। সব দিক দিয়েই এক ইউরোপিয় শহরে আসার অনুভূতি হচ্ছিল। এখানের ‘মস্কভিয়া নুমের’ হোটেল এতটাই আরামদায়ক ছিল যে এখানে আমার ক্যাম্প খাট আর ক্যাম্প চেয়ার পেতে বসলে ততটাই বিসদৃশ লাগত যেমনটি ইংলন্ডের গ্রামের কোনো ভালো সরাইখানায় লেগে থাকবে।
পূর্ব ইউরোপের রাশিয়ান ভাগের বাণিজ্যিক শহর আন্দিজানের রেল-স্টেশন পর্যন্ত চওড়া রাস্তার দু-পাশে সুসজ্জিত দোকান, বাড়িঘর আর অফিসের সারি। বিকেলে চার্চের মাঠে সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী সামরিক ব্যান্ড বাজায়। রাশিয়ান দখলের অনেক আগে থেকেই ফারঘনা প্রদেশের আন্দিজান গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। রেল যুক্ত হবার পর সেই গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। রাস্তার দু-পাশের দোকানগুলোতে ইউরোপিয়ান, রাশিয়ান আর চিনা-তুর্কিস্তানে উৎপাদিত পণ্যের ঢল দেখে মনেই হয় না গতবছর ভয়াবহ ভূমিকম্পে শহরটা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। শহর জুড়ে মধ্য এশিয়ার প্রায় প্রতিটি জনজাতির উপস্থিতি। এখানেই দেখা হয়েছিল কাশগরের এক ‘হাজি’র সঙ্গে। বছর খানেক আগে কাশ্মীরের শ্রীনগরে এক তুর্কি সরাইখানায় আমার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। সে তখন চলেছিল বম্বে। এবারে মক্কায় হজ করে মিশর ও কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) দেখে কৃষ্ণসাগর এবং কাস্পিয়ান হয়ে স্বদেশে ফেরার জন্য রেলপথকে বেছে নিয়েছিল কাশগরি হাজি। ওর সঙ্গে দেখা হবার পর মনে হয়েছিল পৃথিবীটা কত ছোটো হয়ে গেছে, এমনকি মধ্য এশিয়ার জন্যও!
১১ জুন ট্রান্স-কাস্পিয়ান রেলে চেপে বসেছিলাম প্রত্নসামগ্রী নিয়ে ইউরোপের পথে। যাত্রাপথে মার্গিলান এবং সমরখন্দের প্রাদেশিক রাজধানীতে সাময়িক বিরতির সুযোগে এশিয়ার একটি অংশের ঐতিহাসিক ও প্রাচীন সংস্কৃতির খানিক ঝলক দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রদেশের দুই গভর্নর জেনারেল চাইকোভস্কি এবং মেডিনস্কি আমাকে স্থানীয় যাদুঘরে সংগৃহীত প্রাচীন জিনিসপত্র দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাশিয়ান ভাষা জানা না থাকলেও স্থানীয় কর্মকর্তাদের যে সৌজন্য এবং সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিল না, তা স্বীকার করতেই হয়। সমরখন্দে থাকার সময় তৈমুরের আমলের অতুলনীয় স্থাপত্য-নিদর্শন দেখার কথা ভোলার নয়। তৈমুরের আমলেই মধ্য এশিয়ার মুসলমান শক্তি ও শিল্পকলা তুঙ্গে উঠেছিল, যা কিনা একসঙ্গে লাহোর, দিল্লি ও আগ্রার একত্রিত স্থাপত্য-শিল্পকলাকেও ছাপিয়ে যায়। মুঘল গার্ডেন দেখতে দেখতে বার বার কাশ্মীরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল।
মার্ভ-এ সাময়িক বিরতি আমাকে গৌরবোজ্জল যুগের ইরানের মাটি ছোঁয়ার সুযোগ দিয়েছিল। গোক-টেপের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে রেলপথ নিয়ে যায় ক্রাসনোডস্কে। সেখান থেকে কাস্পিয়ান পার হয়ে বাকুতে যাই। তারপর পেত্রোভস্ক, রোস্তফ, পোডভোলোকজিস্কা, ক্রাকাও, বার্লিন হয়ে দীর্ঘ ক্লান্তিকর রেলযাত্রার শেষে ১৯০১ সালের ২ জুলাই লন্ডনে পৌঁছই।
মরুভূমির বালির তলা থেকে উদ্ধার করা পুরাকীর্তিগুলিকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে জমা করে খুব তৃপ্তি পেয়েছিলাম। কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কার ছিল এই মানসিক তৃপ্তি। পুরাকীর্তি ও আমার তোলা প্রায় আটশো ছবির নেগেটিভ ও প্লেটগুলো দীর্ঘযাত্রাতেও অটুট ছিল।
***
এই পুরাকীর্তিগুলো ঠিকমতো সাজিয়ে তার ক্যাটালগ তৈরি করাটা ছিল কঠিন কাজ। ভারত সরকার এই কাজের জন্য আমাকে এক বছরের জন্য ইংল্যান্ডে ডেপুটেশন দিয়েছিল। কিন্তু এই সময়ে কাজ না শেষ হাওয়ায় সেক্রেটারি ফর স্টেটস (ইন্ডিয়া) তা আরও ছ’সপ্তাহের জন্য বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার বন্ধু মিঃ এফ. এইচ. অ্যান্ড্রুজের একান্ত সহযোগিতা আর পরিশ্রমে এই সময়ের মধ্যে ‘প্রাথমিক প্রতিবেদন’ (Preliminary Report) তৈরি করতে পেরেছিলাম।
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ভারতে পাঞ্জাবে স্কুল পরিদর্শকের কাজে ফিরে আসার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেও অধিকাংশ সময়টা কাটাতাম ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বেসমেন্টে আমার সংগ্রহ করে আনা পুরাতত্ত্বগুলোর মাঝে। আর খালি মনে হত, আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম মরুভূমির মাঝে অপার শান্তির ভূমিতে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন