মার্ক অরেল স্টাইন

এখান থেকে আধমাইল মতো উত্তর-পশ্চিমে বালির ওপর অনেকটা জায়গা জুড়ে ধ্বংসস্তূপের নিশানা দেখে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দিলাম। প্রায় পাঁচশো বর্গ ফুট জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে একটি প্রাচীন বাসস্থানের কাঠের কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ। এখানে বালিয়াড়ির উচ্চতা মাত্র ফুট কয়েক। জোরালো বাতাস এখানকার বালিকে অন্য কোথাও উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বাড়িটার কাঠামোকে বালির ওপর জাগিয়ে তুলেছে। দেওয়ালের অংশ বলতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। চরম আবহাওয়া সবকিছুই ক্ষইয়ে দিয়েছে। ধৈর্য ধরে ফুট খানেক বালি সরিয়ে একটি ঘরের অংশ থেকে পাওয়া গেল কাঠের ওপরে লেখা অনেকগুলো ফলক।
বালির আস্তরণ সরে যাওয়াও বায়ুমণ্ডলীয় (তুষার, ঝড়, বৃষ্টি, তাপ ইত্যাদি) প্রভাবের কারণ। আবহাওয়ার বিরূপতার কারণে এদের রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও উদ্ধার করা লেখা কাঠের মধ্যে প্রায় ৫০টার লেখা অতি বিবর্ণ হয়ে গেলেও সেগুলো যে খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। আয়তাকার ট্যাবলেটগুলোর মধ্যে যেগুলোর লেখা হালকা হয়ে গেলেও খানিক বোঝা যাচ্ছিল, সেগুলো ক্ষুদে অক্ষরে ঘেঁষাঘেঁষি কলামের মধ্যে লেখা হয়েছিল যা দেখে মনে হল যে এগুলো হয়তো অফিস-সংক্রান্ত কোনো রেকর্ড ছিল। এখানে যে অফিস-সংক্রান্ত কাজ যথেষ্ট পরিমাণে হত তা কয়েকটা কাঠের ট্যাবলেটের মাপ দেখে বোঝা গেছিল। যদিও ৭ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা, ৪.৫ ইঞ্চি চওড়া কাঠে লেখাগুলো প্রায় মুছে গিয়েছে।
বালির গভীরতা কম থাকায় দু-দিনেই বেশ কিছু বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। প্রায় সব চিহ্নই নষ্ট হয়ে গেলেও বাড়িতে ঘর ছাড়াও আলাদা করে গোয়াল যে ছিল তা পরিষ্কার। একটি বাড়ির মধ্যে আইস-পিট থাকার নিশান ছিল। একটি ঘর পরিষ্কার করার পর একটি গর্তের মধ্যে গাছের ডালপালা ও পপলার পাতা বিছানো দেখে কেরিয়া থেকে আসা গাইড আবদুল্লাহ্ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেছিল এটি ‘মুজ-খানা’ – বরফ জমিয়ে রাখার জায়গা। বরফ যাতে মাটির স্পর্শে এসে গলে না যায় তাই এই ব্যবস্থা। এখনও এই অঞ্চলের অবস্থাপণ্ণ লোকের বাড়িতে গরমকালের জন্য এই পদ্ধতিতে বরফ জমিয়ে রাখে।
৩০ জানুয়ারি দারোগা ইব্রাহিম আখুন মরুপথের খোঁজ সেরে ফিরে এল। পশ্চিমদিকে দিন তিনেক হাঁটার পর সে বালির সাম্রাজ্যে প্রচুর কুমুশ আর তামারিস্কের দেখা পেয়েছিল যেখান থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যেতে পারে। মরুভূমির মধ্যে দিয়ে কেরিয়া নদীর কাছে পৌঁছতে পারলে অনেকটাই সময় ও এনার্জি বাঁচবে। যদিও ইব্রাহিম আখুনের মতে, কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া প্রবল তুষারপাতের ফলে ওখানে বালির ওপর যে বিঘত খানেক পুরু বরফ জমে ছিল, এই ক’দিনে তা গলে গেছে।
মরুভূমির শীত যে আমাদের খুব বেশিদিন সঙ্গ দেবে না তা টের পেয়ে গেছিলাম। ৩০ জানুয়ারি রাতের তাপমাত্রা ছিল -৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) আর দিনে ৪২ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস), তাও ছায়াতে। আমি এই তাপমাত্রার ওঠানামায় অনেকটাই ধাতস্থ হয়ে যাওয়ার ফলে ২৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-৩.৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় দিব্যি লেখার কাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছিলাম। দিনের বেলায় ধ্বংসাবশেষের মধ্যে হাঁটার সময় বেশ গরম লাগত। মার্চ পেরিয়ে গেলে মরুভূমির মাঝে যে আমাদের কী হাল হবে ভাবতেও চাইছিলাম না।
এর পরের খনন কাজের জন্য বেছে নিয়েছিলাম এইখানে আসার পথে ফেলে আসা মাইল দু-এক দক্ষিণের দুটি সুবিশাল বসতবাড়ির ধ্বংসস্তূপকে। মজে যাওয়া নদীখাতের চিহ্নের পাশে সার দিয়ে পড়ে থাকা মৃত পপলারের সার ও বালির ওপর জেগে থাকা খুঁটির সংখ্যা দেখে মনে হয়েছিল এই বসতবাড়ি দুটি এলাকার একটেরেতে হলেও বাগান ও গাছে-ছায়া রাস্তা নিয়ে বেশ বৈশিষ্ঠ্যযুক্ত। এর মধ্যে পুবেরটি, তার বড়ো আকার, অজস্র কক্ষ দেখে মনে হয়েছিল যে এটি কোনো উচ্চ মর্যাদার মানুষের বসতবাড়ি হতে পারে, আবার বালির বেশ গভীরে ডুবে থাকার জন্য তার ভেতরের জিনিসপত্র ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পরে তার প্রমাণও পেয়েছিলাম হাতেহাতে। আমার পুরো দলকে লাগিয়ে দিয়েছিলাম বালি সরিয়ে বাড়ির কাঠামোকে বালি মুক্ত করতে। ইমাম জাফর সাদিক থেকে যেসব মজুরেরা যোগ দিয়েছিল, তারা এ কাজে যথেষ্ট দক্ষ বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
চারদিন লেগেছিল বালি পরিষ্কার করে বিশাল বাড়ির পুরো কাঠামো চোখের সামনে আনতে। সবচাইতে আকর্ষণীয় ছিল বাড়ির মাঝখানের বিশাল ঘরখানা। ৪০ ফুট লম্বা ২৬ ফুট চওড়া। সম্ভবত ঘরটি রিসেপশন হল হিসেবে ব্যবহার করা হত। চারটে ৪০ ফুট লম্বা প্রকান্ড পপলার গাছের গুড়ি ছাদকে ধরে রেখেছিল। ঘরের মাঝামাঝি থাকা দুটো সেন্ট্রাল বিমকে ধরে রাখা দুই করবেল (corbel - a structural piece of stone, wood or metal jutting from a wall to carry a super incumbent weight, a type of bracket) ছিল ৮ ফুট লম্বা ১০ ইঞ্চি মোটা কাঠের কারুকাজ করা। যে স্তম্ভ করবেলগুলো ধরে রেখেছিল, সেগুলো ভেঙে পড়ে গেলেও সেন্ট্রাল বিমগুলো ঘরে জমে ওঠা মরুভূমির বালিতে ভর করে ঠিক জায়গায় থেকে গিয়েছিল। বালি পরিষ্কার হয়ে যাবার পর সাদা প্লাস্টার করা দেওয়ালের ওপর কালো আর লাল রঙের ফ্রেস্কোর দেখা মিলল। দেওয়ালের অন্য অংশে এক বিশাল পদ্মফুল থেকে নেমে আসা লতার নীচের অংশে পদ্মের ফুটন্ত কুঁড়ি। বালি পরিষ্কার করার সময় দেওয়াল যাতে ধ্বসে না পড়ে যায় তা নিশ্চিত করা এক কঠিন কাজ ছিল। ঘরের দেওয়ালে একটা দরজা ছিল যা দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়া যেত। সেই দরজার ওপর একটি কাঠের বড়ো পাটা ছিল যা হুড়কো হিসেবে দরজা বন্ধ করার কাজে লাগত। সেটি কব্জা থেকে এমনভাবে দরজার ওপর ঝুলছিল, যেন সদ্য দরজা বন্ধ করা হয়েছে। মরুর পুরু বালির স্তর ঘরের অনেক কিছুই অবিকৃত অবস্থায় রেখে দিয়েছিল। হল-ঘরের মেঝের মাঝখানে একটা উঁচু বেদির ওপর পড়ে ছিল কিছু আধপোড়া কয়লার টুকরো। এটি ফায়ার-প্লেস হিসেবে ব্যবহার করা হত বলে মনে হয়। একসময় সজীব থাকা জনপদের অন্যতম সাক্ষী।
সম্ভবত এই বাড়ির শেষ বাসিন্দারা চলে যাবার আগে সব জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে গেছিল, তাই ব্যবহার্য কোনো বস্তু বাড়ির মধ্যে পাওয়া যায়নি। বড়ো হল-ঘরে কিছু না পাওয়া গেলেও সঙ্গের ছোটো ঘরে পাওয়া গেছিল বেশ কিছু শিল্পকর্মের নিদর্শন। বিশেষ করে বুনন শিল্পের। চামড়া আর সুতির তৈরি রঙিন কার্পেট মোটেই এই অঞ্চলে বর্তমান চলতি কার্পেট ‘খাম’-এর মতো নয়, বরং অনেকটাই ভারতীয় ‘দারি’-র মতো। অসাধারণ এর জ্যামিতিক গড়ন আর রঙের ব্যবহার। খানিক ব্রাশ করে পরিষ্কার করতেই রঙের উজ্জ্বলতা ফিরে এসেছিল। প্রাচীনকালের মধ্য এশিয়ার হস্তশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন।
ওই ঘরে পাওয়া গেছিল হাতির দাঁতের তৈরি ছোটো ছোটো শিল্পকর্মের নমুনা। তার মধ্যে ছিল হাতির দাঁতের হাতল দেওয়া ছড়ি, যা শিল্পীর সূক্ষ্ম খোদাই কাজের নিদর্শন। খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা বেশ কিছু কাঠের ট্যাবলেট স্তূপ করে রাখা ছিল একটি ঘরে। ঘরটি সম্ভবত রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হত। ঘরটিতে বর্তমান কালের তুর্কিস্তানের মতো জল ও রান্নার সরঞ্জাম রাখার উঁচু মাটির জায়গা ছিল। তার ওপর একটা চওড়া কাঠের পাটাতন রাখা ছিল। বাড়িটিতে আরও কিছু কিছু ছোটো ছোটো ঘর ছিল যা মালপত্র রাখার জায়গা হিসেবেই ব্যবহার করা হত বলে আমার বিশ্বাস। একটি ঘরে তামারিস্ক কাঠে তৈরি একটি ধনুক পেয়েছিলাম যা এখনও ব্যবহারযোগ্য। পাওয়া গেছিল হালকা পপলার কাঠের একটি লম্বা ভাঙা লাঠি যা ভাঙা অবস্থাতেই ছ’ফুট লম্বা ছিল। সম্ভবত এই লাঠি বল্লমের হাতল ছিল। ওই ঘরেই ছিল উইলো কাঠের ঢালের অংশ যা লম্বায় ৩ ফুট ৬ ইঞ্চি। পাওয়া গেছিল তুলো পাকিয়ে সুতো বানানোর তকলি, একটি হাঁটার ছড়ি। সব কাঠে তৈরি।
বাড়িটা থেকে কাঠে তৈরি যত জিনিষপত্র পাওয়া গেছিল তার মধ্যে সবচাইতে আকর্ষণীয় ছিল বড়ো ঘরে পাওয়া একটি চেয়ার। যেমনি তার অঙ্গসজ্জা তেমনি গড়ন। যদিও চেয়ারের পায়া আর হাতল খুলে গেছিল, কিন্তু অনায়াসে সেগুলো জুড়ে এখনো তাকে ব্যবহার করা যেতে পারে। মরুভূমির বালি কাঠখোদাইকে ঢেকে দিলেও নষ্ট হতে দেয়নি। চেয়ারে খোদিত এই বিশিষ্ঠ্য রিলিভোর কাজ একদা প্রাচীন গান্ধার এলাকার ইউসুফজাই এবং সোয়াতের বৌদ্ধ বিহারগুলিকে শোভিত করত। আমি খুশি হয়েছিলাম খরোষ্ঠী লিপি আর সমসাময়িক ভাস্কর্যের কালানুক্রমিক মিল দেখে। আমার লোকেরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল আসবাবের সূক্ষ্ম কারুকাজের দিকে।
বাড়ির ধ্বংসস্তূপের বিশাল আয়তন লম্বায় ১০০ ফুট আর চওড়ায় ৮০ ফুট। বোঝা যাচ্ছিল যে এটি কোনো বিত্তশালী ও কর্তৃত্বসম্পন্ন মানুষের বাড়ি ছিল। আমার দলের লোকেরা এটাকে কোনো আম্বানের বাসস্থান বা ইয়ামেন বলে দাবি করেছিল। অনেক আশা নিয়ে আমার লোকেরা বাড়ির মধ্যে রূপোর তৈরি ‘টাট্টু ঘোড়ার নাল’ খুঁজছিল, যা সৌভাগ্য এনে দেবে বলে লোকেরা ঘরে টাঙিয়ে রাখে। নাল না পেলেও বালি ঘেঁটে অনেক চৈনিক প্রাচীন তামার মুদ্রা পাওয়া গেল। এই মুদ্রাগুলো ছিল দ্বিতীয় হান রাজবংশের সময়কার যা ফলকগুলোর প্যালিওগ্রাফিক (সময়) সম্বন্ধে আমার ধারণাকে জোরদার করছিল।
আরও একটি প্রাপ্তি ঘটেছিল এই বাড়িটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ৩০০ গজ দূরে অন্য একটি বাড়ি খনন করার পর। ৪ ও ৫ ফেরুয়ারি দু-দিন লেগেছিল বালি পরিষ্কার করে বাড়িটার পুরো কাঠামো দেখতে। আধুনিক খোটানে এইরকম লাগোয়া বাগানসহ বাড়ি বর্তমানে যথেষ্ট দেখা যায়। একটা ঘরে কাঠে লেখা ফলক ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে আয়তাকার ফাঁকা কাঠের টুকরো পড়ে ছিল, যা দেখে মনে হয়, এই ঘর লেখালেখি ছাড়াও লেখার সরঞ্জাম মজুদ করার কাজে ব্যবহার করা হত। কাঠের টুকরো ছাড়াও ঘরে পাওয়া গেছিল তামারিস্ক কাঠের কলম, কাঠের ‘খাওয়ার কাঠি’ (চপস্টিক) যা চিনারা এখনও ব্যবহার করে।
তামারিস্ক গাছের বাকলের আঁশ থেকে তৈরি বিশাল শোবার তোশকও পাওয়া গেল। ঘরের এককোণে পাওয়া গেল একটি বাদ্যযন্ত্রের ওপরের অংশ। তুর্কিস্তানের সর্বত্র ‘রবাব’ নামে পরিচিত এই ধরনের বাদ্যযন্ত্র এখনো জনপ্রিয়। পাওয়া গেল রবাবের খানিক তারও। এছাড়াও ছিল কার্পেট বোনার কিছু কাঁচামাল।
তবে অবাক হয়ে গেছিলাম ঘরে পাওয়া বিশাল মাপের এক ভাঙা আরাম-চেয়ার দেখে। চেয়ারের পায়াগুলো ছিল দাঁড়িয়ে থাকা সিংহের চারটে পায়ের মতো। হুবহু ভারতীয় সিংহাসন। কাঠের কাজের মধ্যে লাল আর কালো রঙের ছোঁয়া পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। চেয়ারের দুই হাতলে পুরুষ ও মহিলা ‘অসুরের’ খোদাই করা দেহ। যাদের শরীর ও মাথা মানুষের আর কোমরের নীচের অংশ পাখির মতো আর পা দুটো টাট্টুঘোড়ার। মূল টেরাকোটা- রঙ এখনো অক্ষত। তার ওপর কোথাও কোথাও কালো রঙ ও নীল রঙ বুলিয়ে স্পষ্ট করা হয়েছিল পাখির পালক আর টাট্টুঘোড়ার খুরগুলোকে। এইসব আশ্চর্য প্রাণীদের দেখে ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনির ‘কিন্নর’-দের কথা মনে করিয়ে দেয়। নাকি আরও দূরের দেশ গ্রিসের পৌরাণিক দো-আঁশলা চরিত্র সেন্টর (Centaur)?
বসতবাড়িটার বিন্যাস দেখাবার মতো। বসত-সংলগ্ন বালি পরিষ্কার হতে নির্দিষ্ট দূরত্বে পরিকল্পিতভাবে বসানো মৃত পপলার গাছের ৮-১০ ফুট কাণ্ড মূল ভূমি থেকে জেগে উঠল। কাশগর থেকে কেরিয়ার সব ‘বোস্তান’-এ গাছের এইরকম বিন্যাস দেখা যায়। বালির তলায় চাপা পড়ে থাকা বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় দিয়ে তৈরি বেড়া এখনও অক্ষত। বেড়ার চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে এক অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করেছিল। মনে হচ্ছিল, আমি ১,৬০০ বছর আগের কোনো সজীব ও জমজমাট জনপদে ঘুরে বেড়াচ্ছি!
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রবল বাতাস এখানকার বালি উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ায় বালির নীচ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল অজস্র মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো, আধপোড়া কাঠ আর শুকনো পাতায় ঢাকা রাস্তা। এখানকার শেষ বাসিন্দারা এই পাতা ঢাকা রাস্তা দিয়েই ছেড়ে গিয়েছিল এই জনপদ। এখানেই পাওয়া হাঁটার ছড়িটা দিয়ে পাতার স্তূপ সরিয়ে ফলদায়ী গাছের মরা পাতা বের করেছিলাম। এই গাছগুলোর পুরোনো শেকড় থেকেই বালির ওপরে কয়েক জায়গায় জেগে উঠেছে গাছের ছোটো ছোটো কাণ্ড-সহ কোঁচকানো পাতা। আমার সঙ্গের স্থানীয় লোকেরা গাছের কাণ্ড আর শুকনো পাতা দেখে অনেকগুলো গাছ চিনতে পেরেছিল যেমন পিচ, মালবেরি, অ্যাপ্রিকট, প্লাম ইত্যাদি। কারণ, এই গাছগুলো তাদের নিজেদের বাড়িতেও আছে।

সমস্যার শুরু হয়েছিল আমার চিনা দোভাষী নিয়াজ আখুনকে দিয়ে। মরুভূমিতে এরকম কঠোর পরিশ্রম করার ইচ্ছে যে ওর ছিল না তা টের পেয়ে ওকে অন্য কাজ দিয়েছিলাম। এবারও ওকে মরুভূমিতে টেনে না নিয়ে এসে তুলকুচ-কোল নামের জলাভূমির প্রান্তে নুরুল্লার খামারে রেখে এসেছিলাম টাট্টুঘোড়াদের দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে। নিয়াজ আখুনের জুয়াখেলা-সহ অনেক বদ দোষ ছিল। জলার প্রান্তে জুয়াখেলার মতো বা লড়াই-ঝগড়া করার মতো কোনো চিনা ছিল না ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলাম। কিন্তু আমাদের জন্য বরফ নিয়ে আসা লোকেদের কাছ থেকে নিয়াজ আখুনের নতুন কীর্তিকলাপ শুনে চমকে উঠলাম।
ওর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে খাবার রেখে আসা হয়েছিল, তারপরেও ইমাম জাফর সাদিকের লোকেদের বলে এসেছিলাম যদি ওর কিছু লাগে তা যেন দিয়ে দেয়। কিন্তু নিয়াজ খাবার না নিয়ে সেই জায়গায় অন্য কিছু নিয়ে ইমাম জাফর সাদিকে উপস্থিত মহিলাদের উত্যক্ত করতে শুরু করেছিল। এসব কাজকর্ম ইমাম জাফর সাদিক অঞ্চলের লোকেদের সমাজে নীতিবিরুদ্ধ। ইমাম জাফর সাদিকের আধা চিনা কর্মচারীরা তাই আমার কাছে করুণভাবে আবেদন পাঠিয়েছিল যাতে নিয়াজ আখুনকে সরিয়ে দেই। খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজনকে তুলকুচ-কোলে টাট্টুঘোড়াদের দায়িত্বে পাঠিয়ে নিয়াজকে আমার কাছে চলে আসার হুকুম দিয়েছিলাম। দু-দিন মরুভূমির মধ্যে থেকে শরীর খারাপের বাহানা দিতে শুরু করেছিল নিয়াজ। ও বার বার বলছিল যে, সে চক্রান্তের শিকার। আমার দলের মধ্যেই বেশ কয়েকজন তার শত্রু, তারাই ঘোঁট পাকিয়ে ইমাম জাফর সাদিকের নির্লজ্জ ভিখিরিদের দিয়ে তার নামে বদনাম রটিয়েছে। তার মা কয়েকদিন আগে মারা গেছে বলে শোকের কারণে কোটের ওপরে সাদা চাদর জড়িয়ে এসেছিল। কিন্তু সুদূর আকসু থেকে মায়ের মৃত্যুর খবরটা সে কীভাবে পেল সেই উত্তর দিতে পারেনি। সে যে নির্দোষ তা প্রমাণ করার জন্য বার বার আত্মহত্যা করার কথা বলেছিল। বলেছিল, সে মরে গেলে আমাকে আর তাকে নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে না। যাই হোক, তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করা গেছিল।
নিয়াজ আখুনের সব রাগ গিয়ে পড়েছিল দলের এক উটচালক হাসান আখুনের ওপর। কারণ, ও-ই ইমাম জাফর সাদিকে নিয়াজের কীর্তিকলাপ ফাঁস করে দিয়েছিল আমার কাছে। হাসান আবার বরফ আনতে ইমাম জাফর সাদিকে ফিরে যেতে নিয়াজ এসে জানাল যে, ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া একটা সোনার আংটি সাদিক লুকিয়ে নিয়ে গেছে। ওকে জরিমানা করতে হবে, কারণ আমি যাত্রা শুরুর আগেই বলে দিয়েছিলাম যে ধ্বংসস্তূপ থেকে যা পাওয়া যাবে তা জমা করতে হবে, কেউ ব্যক্তিগতভাবে কিছু নিতে পারবে না। সাদিক আবার বরফ নিয়ে ফিরে আসার পর ওকে আংটির কথা জিজ্ঞেস করাতে সে সঙ্গে সঙ্গে সেটি বের করে দেখিয়েছিল। আংটিটি ছিল পেতলের।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল। আমার দলের মুসলমানেরা নিয়াজের ওপর খাপ্পা ছিল। এক সন্ধেবেলা ছোটোখাটো চেহারার উটচালক হাসান হাতাহাতি শুরু করে দেয় নিয়াজের সঙ্গে। অনেকেই নিয়াজকে টিটকিরি দিতে দিতে লড়াইয়ের মজা নিচ্ছিল। কিন্তু আমি চুপ করে বসে থাকতে পারিনি, কারণ আমার দোভাষীর বদমেজাজ আর আরও কিছু বদস্বভাবের কথা আমি জেনে গেছিলাম। বার বার অপমানিত হয়ে আধা উন্মাদ নিয়াজ ছুরি বের করে হাসানকে আঘাত করার আগেই আমি আর রাম সিং মিলে ওদের দুজনকে দুজনের কাছ থেকে সময়ে সরিয়ে দিতে পেরেছিলাম। এরই মধ্যে আমার রাঁধুনি সাদাক আখুন ওর তলোয়ার নিয়ে ছুটে এসেছিল নিয়াজকে মারবে বলে। আমি ঘাবড়ে গেছিলাম, কারণ জানতে পেরেছিলাম সাদাকের ‘চরস’-এ খুব আসক্তি। আর শীতের মরুর মাঝে এসে তার নেশার পরিমাণ আরও বেড়ে গেছিল। ভাগ্য ভালো ইসলাম বিরোধী আচরণের জন্য নিয়াজ আখুনের ওপর খানিক হম্বিতম্বি করে সে রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। এদিকে আমরা যখন সাদাক আখুনকে সরাতে ব্যস্ত ছিলাম, তখন সে কোমরে প্যাঁচানো কাপড় খুলে গলায় জড়িয়ে টেনে ধরেছিল আত্মহত্যা করবে বলে। সবাই মিলে তার হাত সরিয়ে গলার কাপড়ের ফাঁস আলগা করার পর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে টের পেয়েছিলাম এটা ছিল ওর নাটক। আমাদের ভয় দেখাতে চেয়েছিল।
এটা স্পষ্ট হয়ে গেছিল, মারামারি থেকে বাঁচতে বাকি মুসলমানদের থেকে নিয়াজকে আলাদা করে রাখতে হবে। আমার দুই হিন্দু সহযোগী রাম সিং আর যশবন্ত সিং ওঁদের তাঁবুতে নিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন নিয়াজকে। এতে ওর ওপর নজরও রাখাও সম্ভব হয়েছিল। সব মিটে যেতে কেরিয়া থেকে আসা ইব্রাহিম দারোগা হাসান নিয়াজ আখুনকে আগে আক্রমণ করার জন্য কয়েক ঘা চাবুকের দণ্ড দিয়েছিল। পরদিন সকালে শাস্তি দিয়েছিল দারোগা নিজেই। শুধু সাদাক আখুনের অবাধ্যতার জন্য কোনো শাস্তি দিতে পারিনি আমি। সে চলে যেতে চাইছিল, কিন্তু তাকে ছাড়তে পারিনি, কারণ সে ছাড়া বেড়াত যে কোনো এক রাতে সে পালিয়ে যাবে। কিন্তু মরুভূমিতে পথ দলে কেউ ইউরোপিয় খাবার রান্না করতে জানত না। সে সবাইকে বলে হারানোর ভয়ে আর খোটান কিংবা কেরিয়ার আম্বানের শাস্তির কথা মনে করে মুখে বললেও সেই চেষ্টা সে করেনি। অভিযান শেষ করে তাকে শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে কাশগর ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম। মরুভূমি থেকে তার পুরানো বাজারি জীবনে ফিরে গিয়ে অনেক বদলে গিয়েছিল সাদাক। আমায় বলেছিল যে মরুভূমিতে তার অস্বাভাবিক আচরণের জন্য চরস নয়… দায়ী আসলে মরুভূমির অশুভ জিনরা। আশা করি পরেও সে জিনেদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন