ত্রয়োবিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

প্রথম খরোষ্ঠী-ফলক খনন

২৮ জানুয়ারি আমার প্রথম কাজ ছিল দারোগা ইব্রাহিম আখুন আর রাম সিংকে পশ্চিমের দিকে পথ সমীক্ষার জন্য পাঠানো। ওদের কাজ হবে উটের জন্য কতটা খাবার আর জ্বালানি সামনের রাস্তায় পাওয়া যাবে তা দেখে আসা। পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল এখানের কাজ শেষ হলে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে সরাসরি আক্তিকেন বা কারাডং-এ ধ্বংসস্তূপে পৌঁছানো সম্ভব কি না তা দেখা। এই অঞ্চলগুলো কেরিয়া দরিয়ার নীচু অংশে রয়েছে। যদি সব ঠিকঠাক থাকে তবে নিয়া আর কেরিয়া হয়ে চক্কর কাটতে কাটতে যাবার বদলে পঞ্চাশ মাইল মরুভূমির মধ্যে দিয়ে গেলে অনেক সময় বাঁচানো যাবে।

রাম সিং আর ইব্রাহিমকে পর্যাপ্ত বরফ আর খাবার দিয়ে রওনা করিয়ে ছুটেছিলাম ভাঙা বাড়িঘরের দিকে। গতবছর ওখান থেকেই নিয়ার ইব্রাহিম খরোষ্ঠী লিপি খোদাই করা কাঠের ফলক খুঁজে পেয়েছিল। নিয়াতেই সে বলেছিল, ধ্বংসস্তূপে এরকম অনেক খোদাই করা ফলক পড়ে আছে। এই পচা কাঠের গুরুত্ব ও টের পেয়েছিল আমার সঙ্গে কথা বলার পর এবং সেগুলো সঙ্গে নিয়ে না আসার আক্ষেপ করেছিল অনেকবার। আসার পথে ওর ছটফটানি লক্ষ করেছিলাম, তাই যাতে আগেভাগে পৌঁছে এগুলো নিয়ে টানাটানি করে নষ্ট না করে ফেলে তাই ওকে আটকানো খুব দরকার ছিল। অবশ্য এইসব পচা-ভাঙা জিনিসের মূল্য শুধু যে ঐতিহাসিক, এটা ওর মাথায় ঢোকার পর এই অভিযানে অংশ নেবার আনন্দটা ও বুঝতে পেরেছিল।

প্রথম প্রত্ন-ভূমির সন্ধানে

ক্যাম্প থেকে মাইল খানেক পুবে নিয়ে গেছিল ইব্রাহিম। প্রবল বাতাসে উড়ে আসা মিহি বালি জমে টিলা হয়ে গিয়েছিল জায়গাটায়। বালির ঢাল বেয়ে উঠতে-উঠতেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া মোটা কাঠের গুঁড়ির বাড়ির কাঠামো বোঝাই বালির ফাঁকে তিনটে খোদাই করা কাঠের ফলক পেয়েছিলাম কোনোরকম খোঁড়াখুঁড়ি না করেই। বালির স্তূপের মাথায় উঠতেই একটা ভাঙা ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে এরকম আরও বেশ কিছু কাঠের ফলক দেখতে পেয়েছিলাম।

মাত্র একবছর আগে ইব্রাহিম এখানে কাঠের টুকরোগুলো নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করে তাদের গুরুত্ব না বুঝেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। তারপরে সামান্যই উড়ন্ত বালির স্তর জমেছে এগুলোর ওপর। কিছুদিন আগে হওয়া প্রবল তুষারপাতের ফলে বরফের আস্তরণ এখনও বালি-মাটির ওপর জমে রয়েছে।

এটি সম্ভবত একটি বড়ো বাড়ির উত্তর দিকের কোনো ছোটো ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ছিল। একটি ফুট চারেক খুপরির মতো ইটে তৈরি ফায়ার-প্লেসের ভেতর থেকে হাত দিয়ে বালি খুঁড়ে স্তূপাকৃতি খোদাই করা কাঠের পাটাতন থেকে অনেকগুলো ফলকই টেনে বের করেছিল সে। তবে যে গুপ্তধনের আশা সে করেছিল, তার কোনো চিহ্ন সে পায়নি। প্রাচীন কাঠে খোদাই করা ফলকগুলো সে পাশে একজায়গায় জড়ো করে রেখেছিল। আমার সৌভাগ্য, তার ফেলে দেওয়া পচা কাঠই আমাকে এই ধ্বংসস্তূপের সন্ধান দিয়েছিল। যদিও দীর্ঘদিন বালির আবরণে ঢেকে থাকা কাঠের ফলকে একবছর ধরে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় সূর্যের তাপ, উড়ন্ত বালির ঘষা, তুষারপাত ইত্যাদির প্রভাবে ওপরের দিকে থাকা লিপি আংশিকভাবে মুছে গেছিল।

প্রত্ন-সামগ্রীর আকর

ইব্রাহিমের খোঁড়াখুঁড়ি করা জায়গা ছেড়ে ঘরের অন্য অংশ পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়েছিল। আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল ওই জায়গাটার সুরক্ষার ব্যবস্থা করা, যাতে টানাটানি করতে গিয়ে ভঙ্গুর বস্তুগুলোর বড়ো কোনো ক্ষতি না হয়। যে ভাঙা ঘরে প্রথম পা রেখেছিলাম, সেই ঘরটাই পরিষ্কার করতে শুরু করেছিল আমার লোকেরা। ঘরটা ১৪ ফুট লম্বা আর ১৬ ফুট চওড়া। ঘরের মেঝের উত্তরদিকে ফুট দু-এক মতো বালি জমে থাকলেও দক্ষিণের দেওয়ালের কাছে সেই বালির গভীরতা ছিল চার ফুট। ঘরের মেঝে থেকে যখন বালি সরানো হচ্ছিল তখন আমি ভালো করে কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরের কাঠামোটা দেখছিলাম। এখানে যে একসময় প্রচুর গাছ ছিল তার প্রমাণ আগেই পেয়েছি। ঘরের মূল খুঁটিগুলো ছিল মোটা ‘তেরেক’ অর্থাৎ সাদা পপলার গাছের। ঘরের কড়িকাঠ নিখুঁত চার ইঞ্চি বর্গঘন কাঠের বাটাম থেকে তৈরি। একই মাপের কাঠের বাটাম ঘরের ছাদ ধরে রাখতে আর দেওয়াল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এক বাটামের থেকে আর এক বাটামের দূরত্ব ঠিক এক ফুট করে আর নির্দিষ্ট দূরত্ব বরাবর একটি করে কাঠ আড়াআড়ি করে সাজানো। দেওয়ালে শুকনো তামারিস্কের শেকড় ও ডালপালার বুননের ওপর পুরু সাদা রঙ করা মাটির পলেস্তারা। যেখানে বালি জমেনি সেখানকার দেওয়ালগুলো পুরো নষ্ট হয়ে গেলেও এত বছর পরেও ঘরের কাঠামো প্রায় অটুট।

ধীরে ধীরে ঘরটা পরিষ্কার করার সময় ঘরের নানা জায়গা থেকে মোট ৮৫টা কাঠের ফলক বা ট্যাবলেট পাওয়া গেছিল। একটা ঘর থেকে এতগুলো ট্যাবলেট আমি আশা করিনি। কয়েকটা ফলক বাদ দিলে প্রায় সবক’টাই আয়তাকার কীলক আকৃতির; ৭ থেকে ১৫ ইঞ্চি লম্বা, আড়াই ইঞ্চি চওড়া এবং জোড়ায়-জোড়ায় রাখা। তক্তার বাঁদিকের কোণে ছিদ্র দিয়ে জোড়া করে দড়ি দিয়ে বাঁধা। অনেকগুলো জোড়া-তক্তার দড়ি ছিঁড়ে আলাদা হয়ে গেলেও অধিকাংশরই বাঁধন অটুট ছিল। আবার কিছু তক্তার দড়ির বাঁধনের ওপর মাটির খোল (সকেট) ব্যবহার করা হয়েছিল সিল করার কাজে, যাতে বাঁধন খুলে নথি আলাদা করা না যায়।
কাঠের ওপর সব ফলকই খরোষ্ঠী লিপিতে ডানদিক থেকে বাঁদিকে সমান্তরালভাবে লেখা। দুই কাঠের টুকরো মুখোমুখি দড়ি দিয়ে জোড়া করে বাঁধা। দড়ির ওপর মাটির সিলমোহর দেখে মনে হয় এগুলো কোনো দলিল হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হত। বালির গভীর থেকে তোলা কাঠের টুকরোগুলো পরীক্ষা করে দেখছিলাম বালির শুষ্কতায় অধিকাংশই এত ভালোভাবে সংরক্ষিত রয়েছে যে মনে হয় সদ্য লেখা হয়েছে। যদিও যেগুলো বালির ওপরের অংশে ছিল সেগুলো প্রায় সবই নষ্ট হয়ে গেছিল, লেখা বিবর্ণ হয়ে কাঠ পচে গেছিল।

হাতের লেখার ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে এগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা, লেখার ধাঁচ অনেকটা ভারতের কুষাণ যুগের ও ইন্দো-সিথিয়ান শিলালিপির মতো। খ্রিস্ট পরবর্তী প্রায় প্রথম তিন শতাব্দী এই রাজারা পাঞ্জাব এবং সিন্ধু নদের পশ্চিম অঞ্চলগুলো শাসন করেছিলেন। দুত্রেউই দ্য হ্রা কর্তৃক আবিষ্কৃত মধ্য এশিয়ায় বার্চ গাছের বাকল ও খোটানের প্রাচীন মুদ্রায় লেখা খরোষ্ঠী লিপি এবং সদ্য আবিষ্কৃত কাঠের ওপরকার লিপির সময়কাল একই ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না। এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো যে অতি প্রাচীন এবং দুর্মূল্য, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রথম লিপি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা

সারাদিনের চরম খাটুনির শেষে পড়ন্ত আলোয় ক্লান্ত শরীরে তাঁবুতে ফেরার সময় একটা কথা ভাবছিলাম, যা আমার প্রত্নবিদের বিবেককে অতি সাফল্যের গর্ব থেকে আটকাচ্ছিল। প্রথম দিনেই উদ্ধার করা এই একশোর ওপর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন লেবেল করে ও অতি সযত্নে গুছিয়ে মনে হল এখনও পর্যন্ত ভারত ও তার বাইরে আবিষ্কৃত খরোষ্ঠী লিপির মোট যা নিদর্শন পাওয়া গেছে বিশ্লেষণের জন্য, এগুলো তার চাইতে বেশি বই কম হবে না। অল্প সময়ে দেখা এই নথিগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত মিল ছিল। প্রায় প্রতিটা নথিই একই ধাঁচের। তবে কি এগুলো ভিন্ন হাতে লেখা একই লেখার প্রতিলিপি? কোনো প্রার্থনা বা বৌদ্ধ স্তোত্র যা বিভিন্ন জায়গাতে পাঠানোর জন্য লেখা হয়েছিল? পাশাপাশি যেভাবে প্রতিটি ফলক সিল করা হয়েছিল, তাতে এও হতে পারে যে প্রতিটি ফলক আসলে সরকারি চিঠি যা আলাদা আলাদা জায়গায় যাবার জন্য তৈরি হয়েছিল। আমার ধারণা সঠিক কি না এই নথিগুলোর পাঠোদ্ধার করা গেলে তবেই জানা সম্ভব। তাঁবুতে পৌঁছে এই নথিতে কী লেখা থাকা সম্ভব তার আন্দাজ পেতে কয়েকটা কাঠের টুকরো খুলে বসেছিলাম, কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি আর ঠান্ডা আমাকে বিছানায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। এর মধ্যে রাতের তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল ৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।

কাঠের ফলকগুলো দেখে আমার ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে মনে হয়েছিল এগুলো প্রাচীন ভারতীয় প্রাকৃত ভাষা, যা প্রাচীন খোটান মুদ্রায় খোদিত ও দুত্রে দ্য হ্রা আবিষ্কৃত উপভাষার সমগোত্রের। বেশ কয়েকটা নথি বিশ্লেষণ করে এটা নিশ্চিন্ত হলাম যে অধিকাংশ নথির প্রাথমিক অংশ বাদ দিলে বাকি অংশের বিষয়বস্তু এক নয়। তা আলাদাই। কিছুদিন চেষ্টা করে সেই প্রাথমিক লেখার ভাষা উদ্ধার করতে পারলাম। কথাগুলো এরকম... “মহনুয়াভ মহারায় লিখতি” বা “হিজ হাইনেস দা মহারাজ রাইট্‌স...” পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে এই বিশেষ ফলকগুলো আসলে সরকারি আদেশপত্র। তবে কয়েকদিন ধরে এইসব লিপির বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করে আর এছাড়াও ফলকে লেখা সংখ্যার চিহ্ন দেখেও নিঃসন্দেহ হলাম যে এগুলো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত একই পবিত্র মন্ত্র/প্রার্থনা নকল করার নথি।

যদিও আমার পক্ষে নথিগুলোর বিষয়বস্তু অনুমান করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু এতে ভুল নেই এটি ভারতের উত্তর-পশ্চিমের খরোষ্ঠী লিপি যা প্রাচীন খোটান অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এবং এক প্রাচীন ভারতীয় ভাষার সঙ্গে সঙ্গে সেই লিপিও এসেছিল উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকেই। তবে এ’সম্পর্কে সুদূর প্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে বিস্তারিত গবেষণার পরেই কেবল এর ব্যাখ্যা করা সম্ভব হতে পারে। এদের ফের একবার পাদপ্রদীপের আলোয় ফিরিয়ে আনবার সম্ভাবনা আমাকে যথেষ্ট উত্তেজিত করে তুলেছিল।

আরও নথি আবিষ্কার

পরদিন সকালে আগের দিন খোদাই করা বাড়ির ধ্বংসাবশেষের দক্ষিণ অংশ পরিষ্কার করা শুরু করা হল। যে-ঘরটি খোঁড়া হচ্ছিল, সেই ঘরের পুবদিকের কোনায় একটি ছোটো দরজা ছিল, বালি সরিয়ে সেই দরজা খুলে ভেতরে একটা দশ ফুট বর্গাকার ঘর পাওয়া গেল। ছোটো ঘরটা সম্ভবত বড়ো ঘরের পার্শ্বকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হত। ঘরের একপাশে মেঝে থেকে তিন ফুট উঁচুতে ঘরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত প্লাস্টার করা একটা চওড়া মাচা ছিল। আধুনিক তুর্কিস্তানে প্রায় প্রতি ধনীর বাড়িতে পরিচারকদের থাকার জন্য এই ধরনের পার্শ্বকক্ষ দেখা যায়। এই ঘরেতেও দান্দান-উইলিকের মতো ‘তখতা’ বা লেখার কাঠের স্লেট মিলেছিল।

প্রতিটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধরে ধরে পরীক্ষা করার মতো সময় ছিল না। বালি সরিয়ে দক্ষিণদিকের আরও একটি বড়ো ঘর পরিষ্কার করা শুরু করা হল। বালি সরানো শুরু হতেই অপ্রত্যাশিত সংখ্যায় নানা আকারের কাঠের ওপর লেখা ফলক পাওয়া যাচ্ছিল। ঘরটি ছিল ২৬ ফুট বর্গাকার। তিনদিকের দেওয়াল প্লাস্টার করা ঘরটিতে উঁচু মাচা করা ছিল দেওয়াল ঘেঁষে। আটটি উঁচু খুঁটি ছিল ঘরের চারপাশ জুড়ে। সম্ভবত ঘরটার ছাদ অনেক উঁচুতে ছিল যাতে পর্যাপ্ত হাওয়া-বাতাস ঘরে খেলতে পারে। এখনও তুর্কিস্তানের অনেক ধনীদের বাড়িতে এই ধরনের উঁচু হলঘর দেখা যায়। দেওয়াল ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরে মাত্র ফুট দু-এক বালিস্তর জমে ছিল, ফলে বাতাস আর উত্তাপের কাছাকাছি থাকা প্রায় সব ফলক বিবর্ণ হয়ে নষ্ট হয়ে গেছিল। মরুভূমির ধ্বংসস্তূপে সবকিছু টিকিয়ে রাখার মূলে বালি; যেখানে বালির স্তর পুরু সেখানে সবকিছু রয়ে গেছে অনেকটাই অবিকৃত অবস্থায়।

ঘরের দক্ষিণদিকের দেওয়াল ঘেঁষে মাচার ওপর রাখা প্রায় তিরিশটি ফলক, অস্পষ্ট হয়ে গেলেও পড়ার মতো অবস্থায় ছিল। ঘরের ঠিক মাঝখানে প্লাস্টার করা মেঝের ওপর গুচ্ছ গুচ্ছ ফলক ডাঁই করে রাখা, সম্ভবত ঘরের বাসিন্দারা চলে যাবার আগে এইভাবেই ফেলে গেছিল। কিছু আবার মেঝের ওপর এমনভাবে পড়েছিল যেগুলোর অবস্থান দেখে মনে হয় যেন ঘর ছেড়ে চলে যাবার পর আবার কেউ ফিরে এসে কাঠে লেখা ফলকগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে সেগুলো এদিক-ওদিক ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। দক্ষিণ-পূর্বদিকের মাচার ঠিক সামনের মেঝে থেকে ২০টা ফলক ছাড়াও ঘরের দক্ষিণদিক থেকে আমি নিজে দু-ডজন মতো কাঠের ফলক তুলেছিলাম।

সবগুলো কাঠের ফলকের ওপরের বালি সরানোর পর দেখা গেল সেগুলো রাখা ছিল একটা চারকোনা মোটা কাপড় পেতে। কড়িবরগার একটা অংশ পড়ে ছিল কাঠের স্তূপের ওপর জমা বালির ওপর। এগুলো সম্ভবত ছাদের ভেঙে পড়া টুকরো এবং যা ভেঙে পড়েছিল এই বসতি পরিত্যক্ত হবার অনেক পর। কিন্তু যেভাবে ফলকগুলো কাপড়ের ওপর বাতিল আবর্জনার স্তূপের মতো ছড়িয়ে পড়ে ছিল তা দেখে মনে হয় জায়গাটা ছেড়ে যাবার পরে কেউ কোনো বিশেষ কিছু খুঁজতে ঢুকেছিল, না পেয়ে (অথবা পেয়ে) বাকিগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। ঠিক যেমনভাবে ইব্রাহিম প্রাচীন নথির গুরুত্ব না বুঝে বালির ওপর ছুঁড়ে ফেলেছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই, ইব্রাহিমের আবিষ্কারই আমায় এই ধ্বংসস্তূপ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

মেঝের ম্যাটিং এর নীচে আরও কিছু ফলক পেয়েছিলাম বেশ ভালো অবস্থায়। কাছেই ছিল একটি ছোটো ডিম্বাকৃতি ধার-উঁচু প্লাস্টার করা মঞ্চ। সম্ভবত এটি ফায়ার-প্লেস হিসেবেও ব্যবহার করা হত। আমাকে সবচাইতে ধন্দে ফেলেছিল বাড়ির গঠন নয়; নানা আকার আর আকৃতির এপিগ্রাফিক্যাল আবিষ্কারগুলো। (এপিগ্রাফি হল শক্ত ধাতু, কাঠ, পাথর বা কোনো মজবুত বস্তুর ওপর খোদাই বা লেখার পদ্ধতি)। নানা মাপের শঙ্কু আকৃতির ট্যাবলেট প্রচুর সংখ্যায় পাওয়া যেতে শুরু করেছিল। নিঃসন্দেহে দু-পাশে খরোষ্ঠী অক্ষরে লেখা পঞ্চভুজ বা গোলাকৃতি হাতল দেওয়া কাঠের ট্যাবলেটগুলো ভারতীয় কাঠের তক্তা বা স্লেটের পরিপূরক।

কিছু কাঠের নথি ছিল ৩০ ইঞ্চি লম্বা কিন্তু সরু যা প্রাচীন ভারতীয় তালপাতায় লেখা পাণ্ডুলিপির গড়ন মনে করিয়ে দেয়। তালপাতার পাণ্ডুলিপির মতো এগুলোও একপ্রান্তে ছ্যাঁদার মধ্যে দিয়ে দড়ি পার করিয়ে পুথির আকারে বাঁধা। এই বিশাল আকৃতির ট্যাবলেটগুলোর, যার বেশ কয়েকটি প্রায় তিরিশটি কাঠের টুকরো একসঙ্গে বেঁধে তৈরি, লেখার অনিয়মিত বিন্যাস, নানা হস্তাক্ষর, মুছে ফেলার চিহ্ন, বন্ধনী ও অন্যান্য অজস্র বৈশিষ্ঠ্য দেখে মনে হয়েছে এগুলো হিসেব ও অন্যান্য নিত্যনৈমিত্তিক রেকর্ড।

দিনতারিখ-যুক্ত নথি

দুই শ্রেণির কিছু আয়তাকার ট্যাবলেট পাওয়া গেছিল যেগুলো লম্বায় ৪ থেকে ১৬ ইঞ্চি। চারপাশে একরকম মার্জিন ছেড়ে লম্বার দিকে ৫ থেকে ১৩ লাইন খুব সুপটু হাতে লেখা এবং প্রতি লেখার শুরুতে একটি করে খরোষ্ঠী লিপিতে শব্দ ও তারপর সংখ্যার সূচক। শব্দটি আমার ‘সমবৎসর’ বলে মনে হয়েছে। সংস্কৃত বা প্রাকৃতে এগুলো লেখা হত ‘এই বছরের’, ‘এই মাসের’, ‘এই দিনের’ হিসেবে। অর্থাৎ নিঃসন্দেহে এগুলো তারিখযুক্ত নথি।

একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই ধ্বংসাবশেষের পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মধ্যে একটিও কাগজে লেখা নথি পাওয়া যায়নি। এ থেকে প্রমাণিত হয় চিনে কাগজের ওপর লেখার প্রচলন যতই প্রাচীন হোক না কেন, কাঠে লেখার থেকে তা সহজ হলেও সে-সময় পূর্ব তুর্কিস্তানে তা প্রচলিত হয়নি। কাঠের ওপর লেখার প্রচলন প্রাচীন ভারতে, বিশেষ করে বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানে ছিল। হতে পারে সেই পদ্ধতিও এখানে প্রচলিত হয়। কারণ তালপাতা বা ভূর্জপত্র পূর্ব তুর্কিস্তানে জন্মায় না। সে যাই হোক, আমার মনে গভীর সুখানুভূতি হল এই ভেবে যে প্রাচীন খোটান রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে বালির তলায় চাপা পড়া কাঠের ওপরে খোদাই করা ভারতীয় রেকর্ডের প্রথম নমুনা আমিই প্রথম খুঁড়ে বের করতে পেরেছি।

বাতাসের ক্ষয়কারী ক্ষমতা

সারাদিন ধরে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস বইছিল উত্তর-পূর্বদিক থেকে। শুকনো বালির পাতলা প্রলেপ জমা হচ্ছিল চারদিকে। উদ্ধার করে একজায়গায় জড়ো করে রাখা কাঠের ফলকগুলোর গায়ে ঠান্ডায় প্রায় নিঃসাড় হয়ে যাওয়া আঙুল দিয়ে পেন্সিলের সাহায্যে তাদের ক্রমানুকরণ করেছিলাম। বাতাসে বয়ে আসা বালি যেন সেই লেখাগুলো মুছে দেবার হুমকি দিচ্ছিল। বালি বয়ে নিয়ে আসা মরুর প্রবল ঠান্ডা বাতাস তার ক্ষয়শীল শক্তিকে টের পাইয়ে দিচ্ছিল পদে পদে। বাতাসবাহিত উড়ন্ত বালিই যে এই জনপদ ধ্বংস হয়ে যাবার অন্যতম কারণ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একসময় নিয়া নদীর জলে পুষ্ট এই পরিত্যক্ত জনপদের মধ্যেকার গর্তগুলো বোজানোর বা ধ্বংসাবশেষকে রক্ষা করার পক্ষে বাতাস-বাহিত বালি এখন এখানে যথেষ্ট পরিমাণে নেই। অনেক জায়গাতে চওড়া বালিখাত, পনের থেকে তিরিশ ফুটগভীর তো হবেই, সেখানে বাতাসের কামড় ঝুরঝুরে মাটির ওপরে গভীর চিহ্ন রেখে গেছে। আমি আমার শিবিরের কাছাকাছি অনেক জায়গায় এলোমেলো ভাঙ্গাচোরা খুঁটি ও কড়িবরগার অংশ দেখেছি যা প্রাচীন সৌধের একমাত্র অবশিষ্ট চিহ্ন। কাঠের জিনিষপত্র দীর্ঘদিন বাইরে পড়ে থাকাতে রোদে, জলে, বরফের প্রভাবে শেষপর্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে যায়, ছোটো ছোটো টুকরো আকারে বাতাস-বাহিত হয়ে অনায়াসে এদিকসেদিক চলে যায়। একমাত্র পোড়ামাটির টুকরোটাকরা, পাথর বা ধাতুর টুকরো পড়ে থেকে যায় আর সেখানকার প্রাচীন জনপদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%