মার্ক অরেল স্টাইন
আমাদের এই জরিপের ফলে, বিশেষ করে ইউরুং-কাশ গিরিখাত এলাকায় অভিযানের ফলে খোটান নদীর আসল উৎস ও তার স্রোতপ্রবাহের অন্যতম উৎস প্রধান উপনদীটি নির্ণয় হয়ে গেছিল। এর পরের আকর্ষণীয় ছিল কাজ ছিল কুয়েন-লুন রেঞ্জের দক্ষিণ ও কারাংঘু-তাঘের দক্ষিণ-পশ্চিমদিকের প্রধান জলস্রোতগুলোর উৎস খুঁজে একটা জলবণ্টনের নকশা তৈরি করা,
ওমশা উপত্যকার পশুচারকদের সহযোগিতায় ইউরুং-কাশ নদীতে মেশা উপনদীর সন্ধান করতে করতে আরও অনেক হিমবাহের দেখা পাব এই ভেবে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিলাম। আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম পথ যতই দুর্গম হোক, ইয়াক বাহিনীর পিঠে মালপত্র চাপিয়ে সে-পথে আমরা যেতে পারব। জানতে পেরেছিলাম, কাশ উপত্যকা থেকে কারা-কাশ নদীর ওপরের দিকের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিস্সা উপত্যকা হয়ে কুয়েন-লুন রেঞ্জে পৌঁছনো সম্ভব। ওমশা পশুচারকদের থেকে পাওয়া পথের সন্ধান আমাকে খানিক নিশ্চিন্ত করেছিল। যদিও কারাংঘু-তাঘের লোকেরা আমার কাছে এই তথ্যটা গোপন করেছিল।
৩০ অক্টোবর নিস্সা উপত্যকার দিকে রওনা হবার আগে সবচাইতে বড়ো বাধা এসেছিল কারাংঘু-তাঘের ইউজবাশির থেকে। একটাও ইয়াকও সে জোগাড় করে দেয়নি। আমরা যাতে আর না এগোই তা যে লোকটা প্রতি পদে পদে মনেপ্রাণে চাইছে সেটা আগেই টের পেয়েছিলাম। ও এই পথের খোঁজ শুধুমাত্র নিজের লোকেদের মধ্যেই লুকিয়ে রাখতে চায়। তাই আম্বানের আদেশ পাওয়ার পরেও আবার চরম অসহযোগিতা শুরু করেছিল। শেষমেশ চিনা দোভাষী নিয়াজ আর ইসলাম বেগের হুমকিতে তড়িঘড়ি লোক পাঠিয়ে উপত্যকার নানাদিক থেকে ইয়াক এনে হাজির করা শুরু করল। এতে আমাদের দু’ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
দশটার সময় আমরা কাশ নদীর ধার ধরে যাত্রা শুরু করলাম এবং মাইল দু-এক যাবার পর পৌঁছই গেজ জিলগা নামের এক সরু উপত্যকায়। সেখান থেকে টানা তিন ঘণ্টা কঠিন চড়াই ভেঙে ১২,৪০০ ফুট উঁচু পম-তাঘ গিরিপথে পৌঁছই। এক অনন্যসাধারণ দৃশ্য তখন সামনে দাঁড়িয়ে। পূর্বদিকের মুজতাঘ থেকে শুরু করে আরও বেশ কিছু তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গের ঢালে জমে থাকা হিমবাহের বরফ সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে। পম-তাঘের শীর্ষ থেকে দেখতে পাচ্ছি নীচের কারাংঘু-তাঘ উপত্যকা। চোখে দেখে যা বুঝতে পারছিলাম, দিগন্ত পর্যন্ত ছুঁয়ে থাকা কোনো শৃঙ্গই ২০,০০০ ফুটের কম উচ্চতার নয়। এদের মধ্যে বেশ কিছু শৃঙ্গের উচ্চতা ২২ থেকে ২৩ হাজার ফুট হবে। এই অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়গুলোর মাঝে নিস্সার চারণভূমি। কোনো সন্দেহ নেই, ওমাশার পশুচারণকারীরা আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছিল।
এরপরে আমি পম-তাঘ গিরিপথের উত্তরে একটা শ-চারেক ফুট উঁচু গোলাকার টিলার উপর চড়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য প্লেন টেবিল আর ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। জরিপের জন্য দিনটা ছিল আদর্শ। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। তাপমাত্রা একদম কাজের উপযোগী, ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।
এক ভীষণ খাড়াই পাথুরে শৈলশিরা বেয়ে আমাদের মাল বোঝাই টাট্টুঘোড়াগুলো টুকটুক করে এগোচ্ছিল। এ-পথে দ্রুত এগোনোর চিন্তা কেউ যেন ভুলেও মাথায় না আনে। প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে এগোনো মানেই যেচে বিপদ ডেকে আনা।
বিকেল সাড়ে চারটের সময় আলগা পাথরে ভরা পথ বেয়ে প্রায় হাজার তিনেক ফুট টানা নামার পর আমরা পৌঁছলাম কারাগাজ গিরিসংকটে। পাহাড়ের মাথায় রোদ্দুর থাকলেও গিরিসংকটের ভেতরে অন্ধকার নেমে এসেছিল। সংকীর্ণ গিরিসংকট ধরে মাইল দু-এক যাওয়ার পর পৌঁছেছিলাম কারাজাগ আর নিস্সার গিরিসংকটের মিলন বিন্দুতে। সূর্যের আভা পুরোপুরি নিভে গেলেও পাহাড়ের ওপরের অংশ খানিক লালচে হয়ে ছিল তখনও।
নিস্সা গিরিসংকটও খুব সংকীর্ণ। দীর্ঘপথ চলে আসার পর অবসন্ন টাট্টুঘোড়াদের নিয়ে অন্ধকারে নদীতীরের পাথর আর ঝোপঝাড়ের ফাঁক বুঝে পথ চলা অসম্ভব ক্লান্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নদীর বাঁকে বাঁকে চোখ সয়ে যাওয়া অন্ধকারের চাপা আলোয় দেখতে পাচ্ছিলাম ছোটো ছোটো পরিত্যক্ত চাষের খেত আর মাটির কুঁড়েঘর। শুধুমাত্র গরমের সময় এখানে লোক বসবাস করে। কারাংঘু-তাঘের ইউজবাশি বদমাইশি করে সময় নষ্ট না করালে রাতের অন্ধকারের দুর্ভোগ পোয়াতে হত না। এদিকে তখন ঘাড়ের ওপর শ্বাস ছাড়ছিল মাল-পিঠে ইয়াকের দল। গন্তব্য এখনও অনেক দূর।
অবশেষে অনেক রাতে নিস্সা পৌঁছতে ওখানকার এক মেষপালক আমাকে সাদরে তার মাটির কুঁড়েতে নিয়ে বসিয়েছিল। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় কয়েকটা ইয়াক আর ভেড়ার মালিকের কুঁড়ের ভেতরে জ্বলতে থাকা কাঠের আগুনের তাপে আরাম মিলেছিল সঙ্গে সঙ্গে। আতিথ্যের আন্তরিকতায় ক্লান্তি দূর হয়ে গেছিল নিমেষে।
৩১ অক্টোবর নিস্সাতে থেকে গিয়েছিলাম আমরা। দলের লোকজন আর পশুদের বিশ্রামের প্রয়োজন তো ছিলই, পাশাপাশি রাম সিং জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত কিছু পর্যবেক্ষণের জন্যও সময় চেয়েছিলেন। আমিও খানিক ঘোরাঘুরি করে কারা-কাশ উপত্যকা হয়ে খোটানে পৌঁছবার পথের হদিস পেতে চাইছিলাম। কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম, তথ্য পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব। কোনো দুর্বোধ্য কারণে তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে চাইছিল না এখানকার পাহাড়িরাও।
নিস্সাতে প্রায় কুড়িটি ঘর। শীতকালে যারা এখানে বসবাস করে তাদের অনেকেই এখনও দূর পাহাড়ে ইয়াক আর ভেড়ার পাল চরিয়ে বেড়াচ্ছে। যদিও তাদের প্রায় সবারই ঘরে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। ভরা শীতের আর বেশি দেরি নেই। খানকতক উইলো গাছ আর কয়েকটি তুষারশৃঙ্গ ছাড়া একচিলতে ধূসর পাথুরে সমভূমিতে কিছুই দেখার নেই। কিন্তু আকাশ এখানে বিশুদ্ধ নীল। সূর্যের উষ্ণতা ক্লান্তি ভোলানো।
ইতিহাসের ভাগ্য ভালো যে নিস্সা নামটা আরো পশ্চিমের কোনো জায়গার নয়। সেটা হলে এতদিনে শখের পুরাকীর্তিওয়ালারা তাকে ‘নাইসা’ বলে দেগে দিত। নাইসা হল গ্রীক পুরাণের চরিত্র ডায়োনিস্সাসের কিংবদন্তীর বাসস্থান; সেটা যে আসলে কোন জায়গার কথা ভেবে তা কিন্তু কেউ জানে না। তবে ‘ভারতীয় ককেশাস এলাকায়’ যখন আলেকজান্ডারের পা পড়েছিল, তখন সেখানের স্থানীয়রা তাঁকে তা ‘ডায়োনিস্সাসের বাসস্থান’ বলে ব্যাখ্যা করেছিল। নাইসা ছিল দ্রাক্ষাকুঞ্জে ছাওয়া ঈশ্বরপুত্রের আবাস। এই ন্যাড়া, রুখু, পাথুরে নিস্সাকে সেই নাইসা বলে ভুল করতে গেলে যে কী ভীষণ কল্পনাশক্তির দরকার সেইটে ভেবেই আমার হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। (১। প্রাচীন ইন্দো-গ্রিক যোগাযোগ সূত্রে হিন্দুকুশকে কোথাও কোথাও ‘ভারতীয় ককেশাস’ বলে চিহ্নিত করা হত। (২) ডায়োনিস্সাস- জিউসের অনেক পুত্রের মধ্যে একজন। সুরা ও আয়েসের দেবতা। আলেকজান্ডারও নিজেকে জিউসের পুত্র বলে ভাবতেন- সম্পাদক)
১ নভেম্বর সকালে ব্রিনজাক গিরিপথের দিকে রওনা হলাম। এই গিরিপথ নিস্সা উপত্যকা থেকে উত্তরের দিকের পাহাড়গুলোর দিকে যাবার পথ। এই গিরিপথের মাথা থেকে ইউরুং-কাশের উৎসের একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া সম্ভব, তাই সকাল থেকেই জরিপের প্রয়োজনে এই গিরিপথের সর্বোচ্চ অংশে যতটা বেশি সময় সম্ভব কাটানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলাম। চাইছিলাম ব্রিনজাক গিরিপথের শীর্ষের কাছাকাছি তাঁবু খাটাতে।
কিন্তু যা চাইছিলাম তা হয়ে ওঠেনি। যে গিরিখাত বেয়ে আমাদের এগোতে হচ্ছিল তা যেমনি সরু তেমনি খাড়া তার চড়াই। চলতে চলতে আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছিলাম যেখানে মাত্র অল্প কয়েকটা তাঁবু খাটানো সম্ভব। অ্যানেরয়েড ব্যারোমিটার বলছিল, জায়গাটার উচ্চতা ১২,৮০০ ফুট। আমি ওখানে তাঁবু খাটাতে হুকুম দিয়ে গিরিখাতের দক্ষিণের খাড়া অংশ বেয়ে উঠতে শুরু করেছিলাম। আমার মন বলছিল যে গিরিখাতের উত্তর-পূর্বদিকে বেয়ে উঠলে জরিপের উপযুক্ত খানিক জায়গা পাওয়া যাবে। কিন্তু ঝোড়ো ঠান্ডা বাতাসে শরীরে কাঁপুনি লাগায় নেমে আসতে বাধ্য হলাম। তাঁবুর ভেতরেও স্বস্তি মিলছিল না। তাঁবুগুলো ২৫ ডিগ্রি কোণে হেলে ছিল। না যাচ্ছিল ভালো করে বসা, না যাচ্ছিল বিছানা পাতা। রাতটা প্রায় জেগেই কাটল আমাদের।

পরদিন সকাল সাতটায় তাপমাত্রা ছিল ২১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-৬.১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। আমাদের তাঁবুর কাছ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট জলের স্রোতটা জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল।
এদিন ঘণ্টাখানেক খাড়া চড়াই ভেঙে পৌঁছেছিলাম ব্রিনজাক গিরিপথের মাথায়। অ্যানেরয়েডে জায়গাটার উচ্চতা দেখাচ্ছিল প্রায় ১৪,০০০ ফুট। পাহাড়ের যে অংশটাকে দূর থেকে জরিপের কাজে সবচাইতে উপযুক্ত বলে মনে হয়েছিল, সেখানে পৌঁছনোই শেষে কঠিন হয়ে দাঁড়াল। বড়ো বড়ো খোঁচাওয়ালা পাথর স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে গিরিপথের মাথায়। ইয়াকের পিঠে জরিপের প্রয়োজনীয় মালপত্র চাপিয়ে কয়েকশো মিটার এগোনোর পর দেখা গেল ইয়াকদের নিয়ে আর এগোনো সম্ভব নয়। পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে লেগে যন্ত্রপাতি সব ভেঙে যাবার অবস্থা। অভিযানের সঙ্গী এক তাঘলিক অনেক কষ্টে পাথরের ফাঁক দিয়ে কোনোক্রমে পাথরের ছোঁয়া বাঁচিয়ে ফটো-থিওডোলাইট যন্ত্রটি নিয়ে এগোতে পেরেছিল। শৈলশিরাটি ক্রমেই সরু হতে হতে খাড়া উঠে গেছে।
ঘণ্টা দেড়েক চলে শৈলশিরার মাথায় পৌঁছলাম। জায়গাটিতে পাথরের ফাটলের মধ্যে মধ্যে বরফ জমে শক্ত হয়েছিল।
উত্তর-পূর্ব কোণে খাড়া উঠে আছে মুদাচে-তাঘ। এর আগেই আমরা এই চূড়ার দেখা পেয়েছি পম-তাঘ গিরিপথ থেকে। হাতে অনেক সময় থাকলেও এই চূড়ায় ওঠা সম্ভব হবে না। একমাত্র দক্ষ পর্বতারোহীদের পক্ষেই এর চূড়ায় আরোহণ করা সম্ভব। ১৭,২২০ ফুট উঁচু এই শৃঙ্গ পেছনের দৃশ্যকে আড়াল করে রেখেছিল। আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার। মুজতাঘ পর্বত স্বমহিমায় প্রকাশিত। দক্ষিণ-পশ্চিমে অনেক তুষারাবৃত শৈলশিরা দেখা যাচ্ছিল যা এর আগে আমরা দেখতে পাইনি। এই শৈলশিরাগুলোয় ইউরুং-কাশের উৎসের দিকটা ঢেকে রেখেছে। সুদূর দক্ষিণে দিগন্তে মেশা আকাশ জুড়ে অজস্র হিমবাহ আর তুষার-ঢাকা শিখরের পটচিত্র।
নিস্সা উপত্যকার প্রান্তে আমাদের সবচাইতে কাছে শঙ্কুর মতো দেখতে যে চূড়াটি মাথা তুলে আছে তা আমাদের কষা হিসেবে ২৩,০৭০ ফুট উঁচু। পশ্চিম আর দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশজোড়া চানকুল সহ আরও কয়েকটি শৃঙ্গ দূরের দৃশ্যকে আমাদের চোখের আড়াল করে রেখেছিল। প্রতিটি পাহাড়ই তাজা তুষারে ঢাকা। সম্ভবত ইসিক-বুলাকে থাকাকালীন এই তুষারপাত আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু এসব চূড়া দিয়ে ঘেরা নীচের ইস্কুরাম উপত্যকার গিরিখাতে জমে থাকা বরফের গদিকে অনেক পুরোনো লাগছিল, অনেকটা নতুন সৃষ্ট হিমবাহের মতো।
নীলকান্তমণির মতো উজ্জ্বল আকাশ চকচকে হিমবাহের নান্দনিক মাধুর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। দুপুর হয়ে গেলেও সূর্যের তাপ যথেষ্ট ছিল না, ২৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-৩.৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। আমাদের ভাগ্য ভালো যে বাতাসের তেজ ছিল না। ঘণ্টা দেড়েক এখানে থাকার পর আঙুলের সাড় খানিক ফিরে পাওয়ায় ফোটো-থিওডোলাইট নিয়ে কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি। অ্যানেরয়েড যন্ত্র দিয়ে জায়গাটার উচ্চতা মেপে দেখেছিলাম ১৫,৩০০ ফুট।
দেড়টা নাগাদ আমাদের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাম সিং গত দশ দিন ধরে প্লেন টেবিলে যে কাজগুলো করেছিলেন সেগুলো একবার যাচাই করে নিতে পেরেছিলেন।
গিরিপথে ফিরে উত্তরের দিকে নামার জন্য আমাদের ইয়াকগুলো আবার ব্যবহার করতে শুরু করলাম। কিন্তু নামার পথে এক অপ্রত্যাশিত অসুবিধার সামনে পড়তে হল। গিরিপথ থেকে মাইল খানেক যাবার পর আমাদের নামতে হচ্ছিল এক সরু গিরিসংকটের ভেতরে। সে-পথের ওপরের অংশে ধুলো আর পাথর থাকলেও নীচের অংশ জমে বরফ হয়ে গেছিল। সকালের তাজা তুষার দিনের তাপে গলে ভূ-ত্বকে প্রবেশ করে আবার জমে শক্ত বরফ হয়ে গিয়েছিল, যা ওপর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। এধরনের প্রকৃতিতে অভ্যস্ত ইয়াকগুলোরও পা পর্যন্ত পিছলে যাচ্ছিল। আর ঢালটাও অসম্ভব খাড়াই। একবার পা পিছলে গেলে সোজা গিয়ে পড়তে হবে গিরিসংকটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত জলস্রোতে।
বরফ আর ধুলোর সহাবস্থান খোটান অঞ্চলের কঠোর পার্বত্যভূমির এক বৈশিষ্ট্য। প্রায় একঘণ্টা ধরে অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে চলে আমরা বরফ-মাটির জায়গাটা পার হতে পেরেছিলাম নিরাপদেই। গিরিসংকট এখানে বেশ চওড়া। ভাগ্য ভালো রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই আমরা ‘চাশ’ নামের চারণভূমিতে পৌঁছলাম। এই উপত্যকার নামও চাশ। আমার লোকেরা আমার ছোটো তাঁবুটা শুকনো ঘাসের ওপর খাটিয়েছিল। তার খানিক দূরে বেশ কিছু বড়ো বড়ো পাথরের মাঝে বাকি লোকেদের তাঁবু। সামান্য এগিয়ে কিছু পাহাড়ি খোঁদলের গা ঘেঁষে নজরে এসেছিল কয়েকটি চামড়ার তাঁবু, তাতে অল্প কয়েকটি ভেড়া সম্বল করে গুটিকয় তাঘলিক পরিবার সারাবছর বাস করে। এরা মূলত গ্রীষ্মে এখানে ভেড়ার পাল চরাতে নিয়ে আসা বোরাজান ক্যান্টনের মেষপালকদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। প্রায় ১০,৫০০ ফুট উচ্চতায় জন্মানো নানা ভেষজ এই দরিদ্র তাঘলিকদের কঠোর শীত সহ্য করার অন্যতম চাবিকাঠি।
ইসলাম বেগ কয়েকজনকে কাছাকাছি গ্রামের খোঁজে পাঠিয়েছিল, কারণ নিস্সা থেকে নিয়ে আসা পশুদের খাবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সন্ধের খানিক আগে চারজন তাঘলিক এসে উপস্থিত হয়েছিল মিতাজ গ্রাম থেকে। ওরা এসেই জানিয়েছিল যে বেগের কথামতো পশুখাদ্য আসছে। পশুখাদ্যের ব্যবস্থা পাহাড়ি তাঘলিকরা করে দিলেও কিছুতেই এই অঞ্চলের অন্য লোকেদের মতো ওদের কাছ থেকেও পাহাড় পেরিয়ে কারা-কাশ উপত্যকায় যাওয়ার হদিস বের করতে পারিনি। বার বার করে একটা কথাই আমার মনে হয়েছে, কোনো দুর্বোধ্য কারণে এরা বাইরের লোকজনকে অবিশ্বাস করে, চায় না এই অঞ্চলে বাইরের লোকেরা এখানে আসা-যাওয়া করুক। পথের খোঁজ চাইতে একটাই উত্তর মিলেছে, ‘বিলমাইদিম’– (“আমি জানি না”)। আমাদের সঙ্গে আসা নিস্সার পশুপালকেরা পর্যন্ত ওদের এই না জানার ভান দেখে হেসে ফেলেছিল। তবে এখানকার লোকেরা যে ভীষণ অতিথিপরায়ণ, তাতে কোনো ভুল নেই।
দলের লোকেরা খুব পরিশ্রান্ত থাকায় ৩ নভেম্বর কিছুটা দেরি করে যাত্রা শুরু করেছিলাম, ঠান্ডার ভাব কমে গিয়ে রোদ ঝলমলে হয়ে যাবার পর। মাইল তিনেক হাঁটার পর আমরা পৌঁছেছিলাম চাশ উপত্যকায়। এখানে ইউরুং-কাশ বয়ে চলেছে পূর্বদিকে বাঁক নেওয়া এক গিরিসংকটের মধ্যে দিয়ে। এখানে পৌঁছে প্রথমেই দলের পশুগুলোকে ঠেসে জল খাওয়ানো হয়েছিল, কারণ এরপর উপত্যকার ওপরের যে-অংশ দিয়ে যেতে হবে তা প্রায় জলশূন্য। আমরা আগেই জেনে গিয়েছিলাম যে কিছু ঝরনা সেখানে থাকলেও তার জল এত লবণাক্ত যে পানের অযোগ্য। আরও আট মাইল চলার পর পৌঁছেছিলাম ইয়াগান-দাওয়ানের পাদদেশে। সঙ্গে চাশ থেকে তিন বস্তা বরফ বয়ে নিয়ে এসেছিলাম পানীয় জল পাওয়ার জন্য।
ঢালু জমিতে রাতটা তুলনামূলক আরামেই কেটেছিল। সকালে তাঁবু গুটিয়ে দলের লোকেরা রওনা দেবার আগেই আমি আর রাম সিং গিরিপথের মাথার দিকে উঠতে শুরু করে দিলাম। নিস্সা থেকে আসা লোকেদের বেশ কয়েকজন আর আগে যেতে না চাওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কারণ, ইয়াকের সঙ্গে কাউকে না কাউকে থাকতে হয়, গুঁতো না মারলে এই প্রাণীগুলো এগোতেই চায় না। তাই দলের অবশিষ্ট লোকেদের এক-একজনকে তিনটে বা চারটে ইয়াকের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল।
কাজটা সহজ ছিল না মোটেই। ইয়াগান-দাওয়ান গিরিপথের মাথায় চড়াটা খুবই কঠিন । দুই খাড়া পাহাড়ের মাঝে গিরিপথের শীর্ষবিন্দু। এখান থেকে এই অঞ্চলের পুরো দৃশ্যটা দেখা যাবে মনে করে আমরা পশ্চিমদিকের গিরিশিরা ধরে এগিয়েছিলাম।
প্রায় ১২,০০০ ফুট উচ্চতায় একটা চমৎকার সার্ভে করার জায়গা খুঁজে পেলাম। পাথুরে শৈলশিরার মাঝে গভীর গিরিখাতগুলো দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। ইউরুং-কাশ এবং কারা-কাশে এসে মেশা নানা জলধারা বয়ে চলেছে সেইসব খাত বেয়ে। আমরা দুই নদীর জলবিভাজিকার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে। কিন্তু নিস্সা থেকে যে সুউচ্চ পাহাড় অতিক্রম করে এখানে এসে পৌঁছেছিলাম তা আমাদের দক্ষিণের দৃশ্যকে পুরোপুরি আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি মুজতাঘ পর্বতের উত্তরের খানিকটা হিমবাহের ঢাল ছাড়া আর কিছু নজরে আসছিল না।
কিন্তু পশ্চিমদিকে ক্রমে সমতলের দিকে মেশা দৃশ্যটি আমি কখনও ভুলব না। একের পর এক পাথুরে ঢালের ঢেউ পরপর এগিয়ে গেছে, জানা নেই কোন ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে ওই ঢেউয়ের উলটোদিকে। দূরে, বহুদূরে দিগন্তের হলদেটে আভা জানান দিচ্ছিল আর এক জনহীন প্রান্তরের – কোনো হলদে বালির সমুদ্রের কথা।
তিন ঘণ্টা পর কাজ সেরে গিরিপথের মাথা থেকে উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে চলা গিরিসংকটের নীচে নেমে এসেছিলাম। কিন্তু মাথা থেকে কিছুতেই সেই অসাধারণ দৃশ্যচিত্র যাচ্ছিল না! সেই গিরিসংকটের ভেতরের বর্ণনা দেওয়া আমার সাধ্যের বাইরে। একের পর শিলাস্তম্ভ উঠে গেছে গিরিসংকটের তলা থেকে। শিলাস্তম্ভের এইরকম গঠন আমি আগে কখনও দেখিনি। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দু-পাশের খাড়া পাথরের দেওয়ালের মধ্যে হাজার ফুট পর্যন্ত সোজা উঠে যাওয়া নানা আকৃতির শিলাস্তম্ভের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। ভূতত্ত্বে আমার বেশ ভালোরকম প্রশিক্ষণ আছে। সেই জ্ঞান থেকেই বুঝতে পারছিলাম, পাথরের এইরকম আকার এখানকার অদ্ভুত জলবায়ুর কারণে সৃষ্ট। জল ও বাতাসের ঘর্ষণে তৈরি প্রকৃতির এ এক অসাধারণ শিল্পকলা! আমার নজর বার বার চলে যাচ্ছিল ঝুলন্ত পাথরের খোঁচ আর শিলাস্তম্ভের দিকে। কোনো সন্দেহ নেই, প্রকৃতির এই ভাস্কর্যের পেছনে আছে জলেরই হাত। অথচ গিরিসংকটের তলায় জলের চিহ্নমাত্র নেই। গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে আছে ধুলোর স্তর।
গিরিসংকটের মধ্যে নেমে আসার পর থেকে প্রথম চার-পাঁচ মাইলের মধ্যে একটা সবুজের কণাও নজরে আসেনি। এরকম অনুর্বর গিরিখাত আগে কখনও দেখিনি। কোনো প্রাণী এখানে বেঁচে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। জলের অভাব আমার ওপর সেরকম কোনো প্রভাব না ফেলতে পারলেও দলের টাট্টুঘোড়া আর ইয়াকগুলোকে কাহিল করে তুলেছিল। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা এক ফোঁটা জল পায়নি বেচারারা।
মাথার ওপরকার আকাশ উজ্জ্বল নীল, আশেপাশের পাহাড় ঝকঝক করছিল সূর্যের আলোয়। শুধু গিরিখাতের তলদেশ অদ্ভুতরকম প্রাণশূন্য। দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের লটবহর পাথরের দেওয়ালে ঘষা খেতে খেতে এগোচ্ছে। টাট্টুঘোড়া আর চমরিগুলো ওদের পিঠের বাঁধন প্রবল আক্রোশে পাথরের গায়ে ঘষে ছিঁড়ে ফেলে দিতে চাইছিল। এক-একজন মানুষের পক্ষে তিন-চারটে করে প্রাণীকে তাড়িয়ে নিয়ে চলা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছিল।
মাইল আটেক চলার পর পৌঁছেছিলাম অপেক্ষাকৃত এক খোলা উপত্যকায়। উপত্যকার নাম মিতাজ। উপত্যকায় তাপ ছিল যথেষ্ট। তার থেকেও আনন্দের কথা, উপত্যকার মুখেই আমরা দেখা পেয়েছিলাম এক জলস্রোতের। টাট্টুঘোড়া আর চমরিগুলো সশব্দে জল খেয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে। একটা প্রাণহীন অঞ্চল পার হয়ে আসার পর জলের শব্দ আর পাথরে ধাক্কা খেয়ে শূন্যে ছিটকে ওঠা জলের বিন্দুগুলো আমাদের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল।
লটবহর নিয়ে দলের সবার পৌঁছতে এখনও অনেক দেরি। অতএব আমি আমার কাঁধের ঝোলা থেকে হোরাসের কবিতার বই- এর একটা ছোটো, সপ্তদশ শতাব্দীর সংস্করণ খুলে পড়তে বসলাম। এই বই সবসময় আমার কাঁধের ব্যাগেই থাকে। সুদূর পশ্চিমের অন্য এক পাহাড়ের যে ঝর্ণাদের রূপ কবিকে মুগ্ধ করত, তাদের বর্ণনা আমাকেও সেই মুগ্ধতার ভাগ দিচ্ছিল। আর তারপর, একটা প্রশ্ন জাগল আমার মনে- কবির কাছে তাঁর সেই সাবাইন পাহাড় তো একটা গভীর মানবিক অনুভূতির উৎস ছিল! মানুষের অনুভূতির দুনিয়ায় এই বিপুল পর্বতশ্রেণির তেমন কোনো কোনো প্রভাব থাকতে পারে কি? এর তো কোনো অতীত গরিমা নেই! ভবিষ্যৎটাও আর কতদূরই বা উজ্জ্বল হবে? অবশ্য ভবিতব্য যদি খোটানের স্বর্ণবাহী নদীদের এ চত্বরে আরেকটা ক্লনডাইক জমিয়ে রেখে থাকে তো আলাদা কথা।
৫ নভেম্বর নিস্সা থেকে দলে যোগ দেওয়া লোকজনের সমস্ত হিসেব চুকিয়ে ছেড়ে দিতে গিয়ে যাত্রা শুরু করতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকে মিতাজ গ্রামের লোকেরা তাদের পশুদের দিয়ে আমাদের মাল পরিবহণের দায়িত্ব নেবে। মিতাজ একটা খুব ছোটো গ্রাম, আট-ন’টি পরিবার উপত্যকার ওপরের অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।
আমাদের আগের যাত্রাপথের তুলনায় সামনের পথটিকে অনেক বেশি সহজ মনে হচ্ছিল। নদীর ধার বরাবর গিয়েছে এ পথ। স্বচ্ছ নদীর জল দু-ফুটের বেশি গভীর নয়। চলার পথে বার বার নদী এপার-ওপার করতে হচ্ছিল। নদীর তলদেশে খোঁচা খোঁচা পাথর থাকলেও সহজেই সেই বাধা অতিক্রম করা যাচ্ছিল। শুধু বিরক্ত হচ্ছিল আমার টেরিয়ার কুকুর ইওলচি বেগ, কেননা নদী পার হবার সময় প্রত্যেকবার ওকে টাট্টুঘোড়ার পিঠে তুলে দেওয়া হচ্ছিল।
নদীর পাশ দিয়ে প্রায় মাইল ষোলো পথ পার হয়ে যাবার পরও একটি গুহাবাসী মেষপালক পরিবারের চারটি শিশু ছাড়া কোনো মানুষজনের দেখা পাইনি। শিশুদের বড়োটির বয়স সাত। বসন্ত রোগে ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিল। কিন্তু উপত্যকার খুঁটিনাটি ওর নখদর্পণে। ছেলেটি আমাদের আগামী পথের দিশা দিয়ে দিয়েছিল। বলে দিয়েছিল সামনের গ্রামের নাম। আমার কাছে একটা রুপোর পাত ছিল, সেটা ওকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম। ও কথা দিয়েছিল যে রুপোর পাতটি ও ওর মায়ের জিম্মায় রেখে দেবে।
বাচ্চাগুলোর সান্নিধ্য ছেড়ে খানিক এগিয়ে মিতাজ উপত্যকা পার হয়ে সমতলের দিকে যাবার এক বিকল্প পথ কুনাট গিরিপথের মুখে আমাদের ক্যাম্প করেছিলাম। যদিও জেনেছিলাম, দূরত্ব কম হলেও এই পথ খুবই দুর্গম। গিরিখাত সরু ও পাথরে ভরা, টাট্টুঘোড়া নিয়ে চলার জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।
হিপসোমিটার বলছিল, জায়গাটার উচ্চতা ৬,৮৯০ ফুট। সকাল সাতটায় তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্ক বিন্দুতে। সমভূমির গন্ধ পেতে শুরু করেছিলাম।
৭ নভেম্বর মিতাজ নদীর পাশ দিয়ে মাইল আটেক যাবার পর ডানদিকে এক বালি-পাথরের ঢাল নজরে এসেছিল। ঢালটি ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে একটি শৈলশিরায় মিশেছে। আশেপাশের পাহাড়ের অন্য ঢালের সঙ্গে কোনো মিল নেই এই ঢালটার। কোনো পাথরের খোঁচ নেই, একটা ঢাল ধীরে ধীরে উঠে গেছে ওপরপানে। সে কারণেই বাস্তবের তুলনায় অনেক কম উঁচু মনে হচ্ছিল ঢালটিকে। এমনকি রাম সিংয়ের মতো অভিজ্ঞ মানুষও ঢালটির উচ্চতা খুব বেশি হলে ১,০০০ ফুট মতো হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন।
ফলে আমরা ঢাল বেয়ে ওঠা শুরু করবার আগে বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে! আড়াই ঘণ্টা ধরে আমাদের টাট্টুঘোড়াগুলো ২৫ ডিগ্রি ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার জন্য লড়ে গিয়েছিল। পুরো ঢালটাই ছিল আলগা মাটি আর নুড়িতে বোঝাই। আর তার ওপর পুরু হয়ে জমে ছিল ধুলো। কিন্তু ওপরে পৌঁছতে যত দেরি হবে ততই আলোর অভাবে চারপাশের দৃশ্য দেখার সম্ভাবনা কমে যাবে। লাদাখের দিকের ত্রিভুজের মতো চূড়াগুলোর রেখা দেখা পাবার কোনো আশাই থাকবে না। এটাই আমাদের ভারতীয় ত্রিকোণমিতিক সমীক্ষার (The Great Trigonometrical Survey of India, 1802 -1871) সঙ্গে খোটানের অবস্থান নির্ভুলভাবে যুক্ত করার শেষ সুযোগ। মুজতাঘ পর্বত যে বার বার আমাদের নানা সময় নানা কোণ থেকে ধরা দিয়েছে, শুধুমাত্র তার অবস্থান দেখানো এই জরিপ বা সমীক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যান্য পর্বতমালাদেরও ধরতে হবে।

চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছিলাম। লম্বা ঢালের মাথায় উলুঘাট-দাওয়ান গিরিপথের শীর্ষ ছাড়িয়ে উঁচু পাহাড়ের মাথা দেখা যাচ্ছিল। যত ওপরের দিকে উঠছিলাম ঢালের খাড়াই তত কমে আসছিল। কিন্তু একটা বিশাল পাথরের দেওয়াল বাঁদিকের দৃশ্যকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। ফলে গিরিপথের শীর্ষে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমার উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছিল। শুধুমাত্র রাম সিংকে সঙ্গী করে দলবলের থেকে অনেক আগে ছুটছিলাম আমি। অবশেষে দুই পাহাড়ের ঢালের মাঝে খানিক সমতল ‘স্যাডেল’-এ পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে দক্ষিণের দিকে একটা চওড়া টিলা দেখে তার মাথায় চড়ে দেখে নিতে চাইছিলাম আমাদের মনস্কামনা পূরণ হবার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।
টাট্টুঘোড়া ছেড়ে একরকম ছুটতে শুরু করেছিলাম দুজন। টিলার মাথায় পৌঁছে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম সামনের দৃশ্য দেখে। গত তিন সপ্তাহ ধরে যেসব অঞ্চল চষে এসেছি, সেই প্রায় পুরো অঞ্চলটাই আমাদের চোখের সামনে। শুধু তাই নয়, অর্ধবৃত্তাকার আকারে সামনে দাঁড়িয়ে সেইসব তুষারমৌলী পর্বতশিখর যা বিভিন্ন সময়ে নানা পাহাড়ের ঢাকা পড়ে থাকার কারণে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে ছিল।
মুজতাঘ ছাড়িয়ে ইউরুং-কাশের উৎসের দিকের ঝকঝকে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কার। ইস্সিক-বুলাক আর নিস্সা উপত্যকার মাঝে যেসব হিমবাহগুলো আমরা ছুঁয়ে এসেছিলাম, সেগুলো নিজেদের মেলে ধরেছিল গম্বুজ, পিরামিড, শঙ্কু আকৃতির নানারূপ সুউচ্চ বরফ চূড়ার ফাঁক দিয়ে।
পশ্চিমে কারা-কাশ নদীর জলের স্রোতকে বেড় দিয়ে উঠে গেছে একের পর এক বরফে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল। উত্তরের দিকে পাথুরে শৈলশিরাগুলো ক্রমশ উচ্চতা হারিয়ে খোটান মরূদ্যানের সমতলে মিশেছে। এর আগে দক্ষিণ থেকে কোনো ইউরোপিয়ানের চোখ এই দৃশ্য কখনও দেখেনি!
চারিদিকে ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ, কিন্তু সমতলভূমির ওপরে একটা ধুলোর ধোঁয়াশা ঝুলে আছে যেন। যেখানে এই ধোঁয়াশা দিগন্ত ছুঁয়েছে, সুদূর তাকলামাকান মরুভূমিতে, সেখানে দিগন্তরেখা এক উজ্জ্বল হালকা সবুজ রঙ ধরেছে।
বিকেল তিনটে বেজে গিয়েছিল টিলার মাথায় পৌঁছতে। আমাদের হাতে থিওডোলাইট নিয়ে কাজ করার মতো আর সময় ছিল না।
এইখানে প্রকৃতি নিজেই যেন আমাদের কাজের জায়গা ঠিক করে দিয়েছিল। যেন বলে দিয়েছিল, ওটাই হবে আমাদের রাতের আস্তানা। সেইমতো টিলা থেকে আমরা শৈলশিরার মাথায় নেমে এসেছিলাম। তাঁবু খাটানোর জন্য জায়গা থাকলেও সেখানে জল ছিল না। এইরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে আশঙ্কা করে আমি ইসলাম বেগকে দলের অনেক আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কারা-কাশের এক গ্রাম পুজিয়াতে। ওকে বলে দিয়েছিলাম নতুন করে টাট্টুঘোড়া জোগাড় করে সঙ্গে জল নিয়ে শৈলশিরার মাথায় আসতে।
সূর্যাস্তের আগে আমাদের দল শৈলশিরার মাথায় পৌঁছনোর আগেই সেকশন শিটে দেখানো পয়েন্টগুলো নিয়ে আমরা কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম যেন আবহাওয়া আমায় হতাশ না করে। প্লেন টেবিলে আমাদের স্থান সঠিক নিরূপণ করে নেবার পর এত এত চূড়ার ভিড়ে সহজেই কুয়েন-লুন পিক-১ নির্দিষ্ট করে ফেলা গিয়েছিল। ইতিপূর্বে ভারতীয় জরিপ দল কাশ উপত্যকার হিমবাহের ওপরে ২১,৭৫০ ফুট উচ্চতায় পিরামিড আকৃতির এই শৃঙ্গের মাপ নিয়েছিল। এর অবস্থান আমাদের মানচিত্রের নির্দেশিত দিকনির্দেশের সঙ্গে সঠিকভাবে মিলে গিয়েছিল। পুবদিকে আর একটি চূড়াকে ‘টার্টারি পিক নং ২’ হিসেবে চিহ্নিত করা গিয়েছিল অনায়াসে। ইস্কুরাম পর্বতশ্রেণির ফাঁক দিয়ে একটা বহুদূরের বরফ চূড়া দেখা যাচ্ছিল। আমাদের সার্ভে টেবিলে অজানা পর্বতটিকে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘কারা-কাশ পিক নং ২’ বলে। আমাদের হিসেবে পর্বতশৃঙ্গটির উচ্চতা ২২,০০০ ফুটের কাছাকাছি।
দক্ষিণের বরফ-ঢাকা পাহাড়ের ঢালে সূর্যাস্তের দৃশ্য ছিল অতুলনীয়। মধ্যবর্তী পাহাড়গুলো কালচে নীলাভ আলোয় ডুব দিয়েছিল, কিন্তু ইউরুং-কাশের হিমবাহ ছাড়িয়ে বরফ-পাহাড়ের মাথায় তখনও জ্বলজ্বল করছিল অস্তমিত সূর্যের আভা।
ধীরে ধীরে আলোর রঙ বদলাতে শুরু করেছিল। প্রথমে গোলাপি আভা ছেয়ে গিয়েছিল বরফে, তারপর লাল থেকে আরও ঘন লাল হতে হতে সে-আভা হঠাৎ অন্ধকারে বদলে গেল। শুধু মুজতাঘ পর্বতের গম্বুজ চূড়া আর আমাদের সদ্য আবিষ্কৃত আর এক চূড়া ‘কুয়েন-লুন পিক ১’-এর মাথাটুকু লাল আলো ধরে রেখেছিল অনেকক্ষণ।
সমতলের দিকে হলদে কুয়াশায় রঙের খেলাও ছিল দেখার মতো। কিন্তু বেড়ে চলা হাওয়ার গতি আর প্রচণ্ড ঠান্ডা আমাদের বাধ্য করেছিল তাঁবুর ভেতরে ঢুকে যেতে। এই ঠান্ডায় আমার জলের বোতলে যতটুকু জল ছিল তা দিয়ে মাত্র এক কাপ কফি হয়েছিল। সেটাই ক্লান্তি দূর করে দেবার জন্য যথেষ্ট। ইসলাম বেগ বা জল বা টাট্টুঘোড়া কোনো কিছুই এসে পৌঁছয়নি। তবে আজকের দিনের কাজের সফলতা আমার খিদে, ক্লান্তি সব ভুলিয়ে রেখেছিল।
পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উঠে আসা চাঁদ আমাকে এরপর আবার তাঁবুর বাইরে টেনে আনল। এই উচ্চতায় ঝকঝকে চাঁদের আলো আগেও আমি ভারতে থাকতে উপভোগ করেছি।
পুবদিকের শৈলশিরাগুলো চাঁদের নরম আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সমতলভূমি থেকে ধুলোর কুয়াশার মধ্যে দিয়ে যখন চাঁদ নিজেকে প্রকাশ করল তখন মনে হচ্ছিল যেন সমুদ্রের বুক থেকে মাঝ আকাশের দিকে সে যাত্রা করছে। কিন্তু সমতল থেকে যত উপরে উঠছিল, তার আলোর তেজ যেন খানিক করে কমে যাচ্ছিল।
এরপর শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাধ্য হয়ে ফিরে গেলাম তাঁবুর ভেতরে, এক প্রাণহীন শীতল মরুভূমি থেকে বন্ধুদের ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা পত্র লিখতে বসে গেলাম। যদিও জানি না এ-চিঠি কবে তাদের হাতে পৌঁছবে। শুধু জানি হয়তো ইহজীবনে এমন চাঁদের দৃশ্য আর একবারও দেখা হবে না।
রাত দশটা নাগাদ তাঁবুর বাইরে হইচই শুরু হয়ে গেল। ইসলাম বেগ হাজির হয়েছে জলভরতি কিছু পাত্র নিয়ে। যদিও জল খুব কমই ছিল, কিন্তু দলের সবার কয়েক কাপ করে চা হয়ে গিয়েছিল। এমনকি সাদাক আখুন আমার জন্য খানিক খাবারও বানিয়ে দিয়েছিল ওই রাতে। সেই খাবার খেয়ে মাঝরাতের পর তাঁবুতে শুয়ে খানিক ঘুমিয়ে নিয়েছিলাম।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্য সবে পুব আকাশের এক শৈলশিরার মাথা টপকে অর্ধেক দেখা দিয়েছে। আকাশ হালকা মেঘে ঢাকা। আমাদের সৌভাগ্য যে পাহাড়ের দক্ষিণ দিগন্তরেখা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আমরা আর সময় নষ্ট না করে আগের দিন ঠিক করে রাখা কাজের জায়গায় পৌঁছে কাজ শুরু করে দিলাম। বিস্তৃত জায়গাজোড়া অজস্র পাহাড়-চূড়া নির্দিষ্টকরণের কাজটা মোটেই সহজ নয়। শুধু তাই নয়, অন্য জায়গায় পৌঁছে এগুলোকে অন্য কোণ থেকে আবার নির্দিষ্টকরণ করতে হবে।
পাঁচ ঘণ্টা টানা কাজ করে আমরা ২৬টা বিশিষ্ট বিন্দু নির্দিষ্ট করতে পেরেছিলাম। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড হাওয়ায় মেঘ সরে গেলেও ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল আমাদের। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলাম তার উচ্চতা ছিল ৯,৮৯০ ফুট।
আমি ফটো-থিওডোলাইট দিয়ে দেখে প্রত্যেকটা বিন্দু এমনভাবে চিহ্নিত করেছিলাম যাতে পরবর্তীকালে ‘ট্রায়াঙ্গুলেশন স্টেশন’ হিসেবে এই বিন্দুগুলো শনাক্ত করতে কোনো অসুবিধা না হয়। যেখানে কাজ করছিলাম তা চিহ্নিত করে রাখার জন্য পাথরের টুকরোর দরকার ছিল। কিন্তু জায়গাটা এমন ছিল যে আশেপাশে অনেক খুঁজেও পাথরের টুকরো পাওয়া যায়নি। পুজিয়া থেকে যে লোকগুলো ইসলাম বেগের সঙ্গে জল নিয়ে এসেছিল তারা একটা উপায় করেছিল। বালি-মাটির সঙ্গে ঘাস আর আর লতাপাতা ছিঁড়ে মণ্ড তৈরি করে একটা ঢিবিমতো বানিয়ে দিয়েছিল।
ক্যাম্পে ফিরে খুব খুশি হয়েছিলাম এক কাপ চা পেয়ে। আমাকে অবাক করে আমার হাত-মুখ ধোবার জলও হাজির করা হয়েছিল। কারা-কাশ নদীর পাড়ের এক গ্রাম পপুনা থেকে আমাদের জন্য অনেকটা জল পাঠানো হয়েছিল। জনমানবহীন শুকনো পাহাড়ের উচ্চতায় মুখ গোমড়া করে বসে থাকা আমার লোকেদের মনে হাসি ফুটেছিল এই অযাচিত আতিথেয়তা পেয়ে। তারা বুঝে গিয়েছিল, সমতলে পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই।
৮ নভেম্বর সকালে যখন উলুঘাট-দাওয়ান ছেড়ে রওনা দিলাম, তখন আকাশ ঝকঝকে নীল। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের খানিক ওপরে। আসন্ন শীতকালেও এই উচ্চতায় এমন বেশি তাপমাত্রা প্রতিবেশী সমভূমির বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাবে হয়।
প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে একটি গিরিখাতের সামনে পৌঁছলাম। পুরো পথটাই ছিল বালিময়। মরু থেকে উড়ে আসা বালি পাহাড়ের পাথুরে শরীরকে ঢেকে রেখেছে। গিরিখাতে পৌঁছে পাথরের গায়ে অভ্রের ঝিলিক দেখতে পেয়েছিলাম। গিরিখাতটি খুবই সরু। দুই থেকে তিন গজ চওড়া এক জলের ধারা বয়ে গেছে গিরিখাত বেয়ে। কিন্তু সেই জল এতই লবণাক্ত যে তৃষ্ণার্ত টাট্টুঘোড়াগুলো পর্যন্ত সেই জলে মুখ ছোঁয়াল না। মাইল দু-এক প্রবাহিত হয়ে সেই জলের ধারাও উধাও হয়ে গেল গিরিখাতের বুকে।
প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে দু-পাশে স্লেট পাথরের খাড়া পাহাড়ের মাঝের গিরিখাত ধরে চলে পৌঁছেছিলাম পপুনা গ্রামের কাছে কারা-কাশের এক খোলা উপত্যকায়। এর আগের দিন এই পপুনা গ্রাম থেকেই আমাদের জন্য জল পাঠানো হয়েছিল।
সমতলের সবুজ গাছের সারি দেখে আনন্দে মেতে উঠেছিল সবাই। উপত্যকাটি আধমাইল মতো চওড়া আর দু-পাশের ২০০ ফুটের মতো উঁচু নুড়ি-পাথরের স্তূপ ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে মিশে গেছে সমতলে। কারা-কাশ নদী এখানে ৪০ গজের মতো চওড়া আর ফুট তিনেক গভীর। স্বচ্ছ সবুজ জলের কারা-কাশকে দু-বার এ-পার ও-পার করতে হয়েছিল আমাদের এগিয়ে যেতে।
মাইল তিনেক চলে আমরা পৌঁছেছিলাম লাংরু নামের এক গ্রামে। প্রায় ষাটটি পরিবারের এই ছোটো গ্রামকেই দীর্ঘদিন দুর্গম পাহাড়ের কাটিয়ে আসার পর আমাদের বিশাল জনপদ বলে মনে হয়েছিল। অনেকদিন পর আমাদের দলের লোকেদের হুল্লোড় করার জন্য একটি রাত মিলেছিল।
এই সময়টা খানিক আশঙ্কায় ভুগছিলাম আমি। কারণ, জানতাম বাতাসে কুয়াশা বেড়ে গেলে জরিপের কাজ পণ্ড হয়ে যাবে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উলুঘাট-দাওয়ান গিরিপথের সঙ্গে যুক্ত কৌরুক-কুজের শীর্ষে পৌঁছতে চাইছিলাম। এটাই কাছাকাছির মধ্যে একমাত্র উঁচু পাহাড় যেখানে যন্ত্রপাতি নিয়ে পৌঁছানো সম্ভব।
৯ নভেম্বর খুব ভোরে যাত্রা শুরু করেছিলাম কুনাত গিরিপথের দিকে। শুরু থেকে যাত্রাপথ যতটা কষ্টকর হবে ভেবেছিলাম তা হয়নি। প্রথম মাইল ন’য়েক পথ ছিল চওড়া গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু কুচকাচ-বুলাকি নামের এক জায়গা থেকে খাত সরু হয়ে গিয়েছিল। একটা নোনা জলের স্রোত বইছিল সেখানে। নুন জমে জমে স্রোতের তলদেশ এতটাই সাদা হয়ে গিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল পুরু বরফের ওপর দিয়ে জল বইছে। যতই এগোচ্ছিলাম ততই দু-পাশের পাহাড় উঁচু আর ভয়ংকর হতে শুরু করেছিল। আমার মনে সন্দেহ হতে শুরু করেছিল, উলুঘাট থেকে দেখা যে-পাহাড়ের শীর্ষে আমাদের জরিপের কাজ করব বলে ঠিক করেছিলাম, আদপেই কি সেখানে এই পাথরের গোলকধাঁধার জট ছাড়িয়ে পৌঁছতে পারব?
বিকেল চারটে নাগাদ অন্ধকার হতে শুরু করে দিল। আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম যেখান পর্যন্তই টাট্টুঘোড়া যেতে পারে। ওখান থেকে বাঁদিকে একটা খাড়া ঢাল উঠে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল ওই ঢাল বেয়ে উঠলেই পৌঁছানো যাবে কৌরুক-কুজের মাথায়। আমরা যেখান পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম সেখানেই তাঁবু ফেলার হুকুম দিলাম। অ্যানেরয়েড ব্যারোমিটার জায়গাটার উচ্চতা দেখাচ্ছিল প্রায় ৮,০০০ ফুট। আমাদের ভাগ্য খুব ভালো ছিল, আমরা যেখানে তাঁবু ফেলেছিলাম তার কাছেই নিস্সার একটি ছোটো দল চারটে ইয়াক নিয়ে কুনাত-গিরিপথ পার হয়ে এসে অপেক্ষা করছিল খোটান থেকে কিছু আটা এসে পৌঁছানোর জন্যে। ওদের ইয়াকগুলো গত দু-দিনে এক ফোঁটাও জল পায়নি, তবুও ওরা ইয়াক নিয়ে আমাদের সঙ্গে খানিক পথ যাবার জন্য রাজি ছিল।
পরের দিনের পাহাড়ের চড়াটা যথেষ্ট কঠিন ছিল। যে জায়গাতে যাবার কথা ভেবে রেখেছিলাম তা আমাদের ক্যাম্প থেকে নয় নয় করেও হাজার তিনেক ফুট উঁচুতে। আর পাহাড়ের ঢাল ভীষণ খাড়া। প্রায় ঘণ্টা তিনেকের চেষ্টায় ইয়াকে চেপে আমরা চূড়ায় পৌঁছেছিলাম।
চূড়ায় পৌঁছে আমি আর রাম সিং সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে পড়লাম। এখান থেকে উলুঘাটের চাইতেও বেশি বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। আকাশ অবশ্য খুব একটা পরিষ্কার ছিল না। সকাল থেকেই কুয়াশা লক্ষ করেছিলাম। খানিক বাদে প্রবল বাতাসে দিগন্তের কুয়াশা এসে ঢেকে দিয়েছিল আশেপাশের দৃশ্য। একই সঙ্গে মরুভূমির ধুলোও আমাদের নাজেহাল করে দিচ্ছিল। তবে আমাদের সৌভাগ্য, ধুলো আর কুয়াশার হানাদারি ভালোভাবে শুরু হবার আগেই আগে হয়ে যাওয়া জরিপগুলোর ফলগুলো আমরা দ্রুত মিলিয়ে নিতে পেরেছিলাম। ধুলো আর কুয়াশায় সব ঢেকে যাবার আগেই খুব দ্রুত ফটো-থিওডোলাইট দিয়ে দেখার কাজটাও নির্ভুলভাবে শেষ করা গিয়েছিল। কিন্তু খোটান ঘেঁষা পাহাড়ের দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের কাজটা শেষ করা যায়নি সব কুয়াশার মোড়কে চলে যাওয়ায়। ২৬টার মধ্যে ২৩টা চূড়া বিন্দু নির্দিষ্টকরণের কাজ শেষ করতে পেরে দু-ঘণ্টা পরে যখন আমরা নেমে আসছিলাম তখন ভাবছিলাম আজ যদি সামান্যতম দেরি হত তাহলে জরিপের কাজ পুরোটাই অসমাপ্ত থেকে যেত। যেখানে বসে জরিপ কাজের সমাপ্তি টেনেছিলাম তার উচ্চতা ১০,৮২০ ফুট।
খাড়া ঢাল বেয়ে হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে যেখানে আমাদের টাট্টুঘোড়াগুলো অপেক্ষা করছিল, সেখানে নামতে ঘণ্টা খানেক লেগে গিয়েছিল। যেহেতু এখানে জল পাওয়া যাবে না আগেই জানতাম তাই লাংরু থেকে গাধার পিঠে চাপিয়ে জল নিয়ে আসা হয়েছিল। আমি সকালেই আমাদের দলের অধিকাংশ লোকেদের লাংরু গ্রামের দিকে নামার হুকুম দিয়েছিলাম মূলত এখানে জল নেই বলে। যে টাট্টুঘোড়াগুলো আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল সেগুলো তেষ্টায় কষ্ট পাচ্ছিল টের পাচ্ছিলাম।
যতটা সম্ভব দ্রুত নামছিলাম আমরা। কিন্তু অন্ধকার নেমে যাওয়ায় আমাদের চলার গতি কমে গিয়েছিল। তার ওপর অন্ধকারে আমাদের গাইডের পথ গুলিয়ে যাচ্ছিল। যাতে কোনোভাবেই পুরো ভুল দিকে না চলে যাই তাই শুকনো নদীখাত ছাড়িনি আমরা। অন্ধকারে পাথরের মধ্যে দিয়ে টাট্টুঘোড়াদের নিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে পথ চলা একটা অসম্ভব ঝুঁকির ব্যাপার।
ওদিকে আমাদের আসবার দেরি দেখে গ্রামের লোকেরা আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। বহুদূর থেকে সেই আলো আমাদের চোখে পড়েছিল। সেই আলো লক্ষ করে গভীর রাতে লাংরু পৌঁছেছিলাম আমরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন