দ্বিতীয় অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

অ্যাস্টর ও গিলগিটের পথে

সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি আমার নৌকা উলার হ্রদের এক খাঁড়িতে ঢুকছে। উত্তরের দিকে বরফঢাকা পাহাড়ের মাথায় মেঘের সমারোহ বুঝিয়ে দিচ্ছিল গত কয়েকদিনের বৃষ্টি গিরিপথগুলোতে নতুন করে বরফ ঝরিয়েছে। আর ওই পথ দিয়েই আমাদের যেতে হবে। খানিক বাদেই বান্দিপুর গ্রামে পৌঁছেছিলাম। এখান থেকেই শুরু হল গিলগিটের পথে যাত্রা।

গিলগিটের নতুন পথে

শুরুর পথটা চেনা ছিল। ১৮৮৯ সালে এই পথ দিয়েই স্কার্দু উপত্যকায় গিয়েছিলাম। কিন্তু পথের বদল খুব নজরে আসছিল, বিশেষ করে পরিবহণ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। গিলগিটে একটি ইম্পেরিয়াল গ্যারিসন-এর পত্তনের পর নবনির্মিত ‘গিলগিট ট্রান্সপোর্ট রোড’ এখন অনেক উন্নত। ইন্ডিয়ান কমিসারিয়েট বিভাগ এখন এই রাস্তায় যানবাহনের দায়িত্বে।

ক্যাপ্টেন ব্রেথারটন আমার তরফে আগেভাগেই সব ব্যবস্থা করে রাখায় ভীষণ সুবিধা হয়েছিল। আমাদের দলের জন্য কুলি আর মালবাহী টাট্টুঘোড়া পেতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে বিষয়টা সেখানকার একজন ওয়ারেন্ট অফিসার নিশ্চিন্ত করছিলেন। এ-পথে কুলি আর টাট্টুঘোড়ার সরবরাহ সচল রাখা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। গিলগিট সেনা ছাউনিতে নিয়মিত মালপত্রের সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য এই পথে পর্যটকদের যাত্রা ও সংখ্যা প্রায়শই নিয়ন্ত্রিত হয়।

আমার মনে আছে, একটা সময় ছিল যখন এই পথে কুলি পেতে নাজেহাল হতে হত। সেনাবাহিনীর মালপত্র টানতে কুলির এত চাহিদা হত যে, জোগান দিতে গিয়ে কাশ্মীরের গ্রামে গ্রামে আতঙ্কের ছায়া নেমে আসত। হাজার হাজার চাষিকে এই কাজে জোর করে টেনে নেওয়া হত। এদের অনেকেরই আর গ্রামে ফেরা হত না। অপর্যাপ্ত শীতের পোশাক আর অনাহার অথবা মহামারীর কবলে পড়ে অধিকাংশই মারা যেত। ব্রিটিশ শাসন এই এলাকায় কায়েম হবার ফলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছিল। গিলগিট রোড নতুন করে তৈরি হবার পর এই পথ উট ও অন্যান্য ভারবাহী পশু চলাচলের উপযুক্ত হয়ে উঠেছিল। ফলে গ্রীষ্মের তিন মাসে মানবশ্রমের ব্যবহার আর খুব দরকার হত না।

৩১ মে সকালে আমাদের তাঁবু, খাবারদাবার-সহ অন্যান্য বোঝা বইবার জন্য ষোলোটা টাট্টুঘোড়া এসে গেল। আমার কাছে এই লটবহর খুব বেশিই মনে হচ্ছিল। কারণ, আমি এতদিন খুব কম মালপত্র নিয়েই কাশ্মীরের আনাচ-কানাচ ঘুরে বেড়িয়েছি। তবে যেটা দেখে ভালো লাগছিল তা হল এতসব লটবহরের মধ্যে আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের পুঁটলিটাই সবচাইতে ছোটো।

মালবাহী পশু, উপ-জরিপকার আর পরিচারকের দল রওনা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেও খানিক অপেক্ষা করতে হল কমিসারিয়েটের করণিকের তৈরি একগুচ্ছ কাগজপত্রে সই করে টাকাপয়সা মেটানোর জন্য। এই অফিসের ছাড়পত্র ছাড়া কারো এই পথ ধরে এগোনোর অনুমতি নেই। যদিও বিষয়টা দক্ষতার সঙ্গেই সামলায় ওরা, তবুও আমার মনে হয় এটা ব্রিটিশ অফিসারদের অযাচিত খবরদারি। কাশ্মীরের প্রাচীন উপত্যকায় ঢোকার সব রাস্তাকে ওরা কড়া নজরদারিতে রাখতে চায়।

বান্দিপুর বাজারের ভেতরের একসার কাঠের কুঁড়ের ধার দিয়ে মাইল চারেক যাবার পর মধুমতী ঝোরার পাশের খোলা জায়গায় পৌঁছলাম। মধুমতীর দু-পাশের রৌদ্রোজ্জ্বল চাষের খেতে সবুজ ধানগাছে সবে ছড়া এসেছে। খেত ছাড়িয়ে চিনার আর আখরোট গাছের ছায়ার আধো অন্ধকারে ঢেকে একের পর এক গ্রাম। আর দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়শ্রেণি। বসন্তের এই দৃশ্য একান্তই কাশ্মীরের। আর এসব ছেড়ে আমি চলেছি অনেক অনেক দূরের অজানা এক সাম্রাজ্যের খোঁজে। মাতারগম গ্রামের কাছ থেকে উত্তরের দিকে এঁকে-বেঁকে চড়াই পথের শুরু হয়েছিল। কিষাণগঙ্গা আর কাশ্মীর উপত্যকার জলবিভাজিকার রূপ এখানে স্পষ্ট। প্রবল বেগে হাওয়া বইতে থাকা চড়াইয়ের এক বাঁকের মুখ থেকে উলার হ্রদকে সামনে রেখে তুষারঘেরা পাহাড়শ্রেণির মধ্যে বরফঢাকা উত্তুঙ্গ হারমুখ শৃঙ্গের অসাধারণ দৃশ্য আমাকে মোহিত করে দিয়েছিল। নয় হাজার ফুট উঁচু পাইনের বনের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে ট্রাগবল নামের এক জায়গায় পৌঁছানোর পর চোখের সামনে থেকে সব বরফ উধাও হয়ে গিয়ে এসেছিল স্যাঁতস্যেঁতে জমিতে কার্পেট হয়ে থাকা পাহাড়ি ফুলের সাম্রাজ্য।

একটা ভাঙাচোরা ছাতা পড়া কাঠের গেস্ট হাউস নজরে পড়তে ওখানেই প্রথম রাতের আস্তানা গেড়েছিলাম আমরা। ভালোই হয়েছিল, অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল ঝড়। ঝড়ের সঙ্গে যা অবধারিত, সেই তুষারপাত শুরু হয়ে গিয়েছিল অচিরেই।

ট্রাগবল গিরিপথের চুড়োয়

সদ্য ঝরা তুষারে আমাদের চলার পথ হয়ে উঠেছিল ভয়াবহ। সামনে কম করেও হাজার দু-এক ফুটের চড়াই। তারপর বেশ কয়েক মাইল খাড়া পাহাড়ের ন্যাড়া মাথা ধরে প্রবল হাওয়ার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে যাত্রা। সদ্য তুষারপাতে রাস্তার চিহ্ন বলে কিছু ছিল না। ভারী ভারী মেঘে চারদিক ঢেকে সূর্যের রশ্মিকে আটকে দিয়েছিল। ফলে পায়ের তলার তুষার জমে শক্ত হয়ে গেছিল। খানিক পরেই আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল নতুন করে জোরকদমে তুষার ঝরা। প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে আমরা ছুটেছিলাম সামনের ডাকবাহকদের আস্তানার দিকে। খানিক বাদেই তুষারপাত বন্ধ হয়ে গেলেও সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১১,৯০০ ফুট উচ্চতার ট্রাগবল গিরিপথের কুখ্যাতির নমুনা আমার মনে চিরকালের জন্য গেঁথে গিয়েছিল।

ট্রাগবল গিরিপথ থেকে নামার সময় আমাকে টাট্টুঘোড়ার দলের মালিক ‘শীতকালীন’ রাস্তা ধরে চলার কথা বলে। এই পথ বেয়ে খাড়া নামলে নাকি বরফঢাকা নালার কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায়। রাস্তাটা নরম তুষারে ছেয়ে থাকলেও টাট্টুঘোড়ার দল কোনো অঘটন না ঘটিয়েই দ্রুত পৌঁছে গিয়েছিল নালার কাছে।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছিল কিষাণগঙ্গা উপত্যকার দিকে বয়ে যাওয়া নালার ওপরে জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করায়। এমন একটা জায়গাও আমরা পাচ্ছিলাম না যেখানকার শক্ত বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে অনায়াসে নালা পার হওয়া যায়। নালার ধার ধরে লটবহর পিঠে চাপানো পশুর দল নিয়ে হেঁটে সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে নালা পার করার চেষ্টা একদম অবাস্তব ছিল। একটাই উপায় ছিল, যে ঢালু পথ দিয়ে নেমে এসেছিলাম সে-পথ বেয়ে আবার উঠে মূল রাস্তায় ফিরে সাপের মতো আঁকাবাঁকা অনেকটা রাস্তা পার হয়ে নদী পেরোনো। ওঠা মানেই ফের খাড়াই ভাঙা। সময় আর শক্তির চূড়ান্ত অপব্যবহার।

দর্দ জনজাতির মাঝে

টাট্টুঘোড়ার মালিক আর তার দলবল ছিল কাশ্মীরের কঠোর পরিশ্রমী আধা-কাশ্মীরি, আধা-দর্দ জনজাতির মানুষ। ওরা তখন ঠিক করল যে, যেখানে বরফের ফাটল তুলনায় কম চওড়া আর বরফের স্তর অনেকটাই পুরু, সেখান দিয়ে একবার নালা পার হবার চেষ্টা করে দেখবে। তখন তিনজনে মিলে পাশাপাশি ধরে একটা টাট্টুঘোড়াকে নালা পার করাতে যেতেই সে-ব্যাটা পা হড়কে গিয়ে জলে পড়ল। আবার জন্তুটাকে বাঁচাতে গিয়ে সাদাক আখুনও ছিটকে পড়ে গেল বরফ-ঠান্ডা নালায়। ভাগ্য ভালো টাট্টুঘোড়াটা বা সাদাক কারো কোনো চোট লাগেনি সেদিন আর ভেসে যাওয়া মালপত্রও উদ্ধার করা গিয়েছিল দ্রুত।

এরপর আরও সতর্কতার সঙ্গে পার হবার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। তবে এবার আর বরফের চাঙড়ের ওপর দিয়ে নয়, নালার বিপদজনক জায়গায় বড়ো বড়ো পাথর ফেলে নালা পার হবার মতো খানিক পথ তৈরি করে নেবার পরে। যা হোক করে এক-একটা টাট্টুঘোড়াকে মালপত্র-সহ খুব সাবধানে নালা পার করানো হল। আমার ভয় ছিল সঙ্গের যন্ত্রপাতিগুলোকে নিয়ে। সার্ভে আর অন্য কাজের জন্য আনা সরঞ্জামগুলো ভিজে গেলেই হয়েছিল আর কী! এর মধ্যে আবার শুরু হয়ে গিয়েছিল অঝোর বৃষ্টি। অবশেষে শেষ টাট্টুঘোড়াটাকে নালা পার করিয়ে বাকিরা সবাই নিরাপদে অন্য পাড়ে পৌঁছোলাম। ততক্ষণে অবশ্য সবাই বৃষ্টিতে ভিজে ঢোল হয়ে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছি।

একটা নাগাদ আমরা গিয়ে পৌঁছেছিলাম গোড়াই রেস্ট হাউসে। পুরো উপত্যকাই তখন সাদা বরফের চাদরে মুড়ে গিয়েছিল। পাক্কা সাত ঘণ্টা লেগেছিল মাত্র এগারো মাইল রাস্তা পার হতে। ছোট্ট গেস্ট হাউসটা মেঘলা দিনের আধো অন্ধকারে খুব ম্যাড়ম্যাড়ে দেখাচ্ছিল। আগে থেকেই আরও তিন ‘সাহেব’ গেস্ট হাউসে থাকছিলেন। ওরা নালাগুলোর আশেপাশে শিকার করে কাশ্মীরে ফিরছিলেন। ওরা আমাকে যথেষ্ট খাতিরযত্ন করলেও আমি ঠিক করেছিলাম আরও এগিয়ে যাব। সামনেই গুরেজ বলে একটা জায়গা আসার কথা। ওখানে অনেক থাকার জায়গা আছে। তাছাড়া প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসও ওখানে পাওয়া যায়।

খানিক বকশিস আর এর থেকে শুকনো জায়গার যাবার লোভ দেখিয়ে টাট্টুঘোড়ার মালিক আর তার দলবলকে গুরেজ গ্রামে যাবার জন্য রাজি করালাম। আমাদের ছোট্ট ক্যারাভান উতরাই বেয়ে চলতে শুরু করল। মাইল চারেকের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম কিষাণগঙ্গার মূল উপত্যকায়। এটাই ছিল প্রথম দর্দ গ্রাম। তারপর আরও মাইল দশেক হেঁটে আমরা পৌঁছলাম গুরেজ উপত্যকায়।

মাইল খানেক চওড়া সমতল জায়গা জুড়ে অনেকগুলো ছোটো ছোটো মহল্লা নিয়ে এলাকাটা। পাহাড়ের ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া পাইনবনের জঙ্গলের মাঝে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে অন্ধকারে ঢাকা বৃষ্টিস্নাত গ্রামগুলোকে অসহায় দেখাচ্ছিল। কাঠের গুঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের ধাপ আর নদীর কালচে বালির ধারে খাপছাড়াভাবে তৈরি অপরিচ্ছন্ন বাড়িগুলোর জন্য পরিবেশটা আরও করুণ হয়ে গেছিল। এই কালচে বালির জন্য এই নদীর নাম ‘কালো গঙ্গা’, সংস্কৃতে ‘কৃষ্ণগঙ্গা’। আশেপাশের গাছপালার রূপ বলে দিচ্ছিল সমুদ্রতল থেকে আট হাজার ফুট উঁচুতে বসন্তের পা পড়েছে। গ্রীষ্মের স্বল্প উপস্থিতি আর প্রখর রোদের অভাবে এখানে শুধুমাত্র খানিক বার্লি আর ‘ত্রুম্বা’ নামের একধরনের ফসল ফলে। গ্রামে লোকজনও খুব কম।

কাশ্মীর-গামী এই পর্বতশ্রেণি আসলে একটি পরিষ্কার নৃতাত্ত্বিক সীমারেখা। এরপর থেকে যত উত্তরে যাওয়া যাবে একদম হিন্দুকুশ পর্যন্ত, ততই এইসব উপত্যকার বাসিন্দা দর্দ জনজাতির লোকজনের সঙ্গে কাশ্মীরের লোকদের ফারাক চোখে পড়বে। ভাষা আর চেহারার অমিল পরিষ্কার বোঝা যাবে। দর্দ জনজাতির ভাষা আর ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত বিভিন্ন ইন্দো-আর্য ভাষার মধ্যে কোনো সম্পর্ক এখনো পর্যন্ত বের করা যায়নি। কিন্তু ভাষা ও জাতিত্তত্বগত বৈশিষ্ট্য যাই হোক না কেন, সন্দেহ নেই যে আমাদের ইতিহাসের জ্ঞান যদ্দুর যেতে পারে সেই আদিকাল থেকে দর্দ জনজাতির লোকেরা এই উপত্যকায় রয়েছে।

হেরোডোটাসও (খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর গ্রিক ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক) এদের কথা শুনেছিলেন। এরা তাঁর বর্ণিত সেই জায়গাতেই এখনও বসবাস করে। তাঁর বর্ণনা করা এই জনজাতির লোকেরা সেই একইরকমভাবে এখনও সিন্ধু আর কৃষ্ণগঙ্গার মাঝামাঝি অঞ্চলের জল চেলে সোনা বের করে।

আমাদের টাট্টুঘোড়ার দলের দর্দ মালিকের মধ্যে সহানুভূতি জাতীয় ব্যাপার-স্যাপারগুলো একটু কম। বুদ্ধি, রসবোধ আর চেহারার ঔজ্জ্বল্যে কাশ্মীরিদের তুলনায়ও অনেক পিছিয়ে। তবে সাহসের তুলনা নেই। পাঠানদের মতোই লড়াকু ও স্বাধীনচেতা। দর্দ জনজাতির লোকেরা হাজার হাজার বছর ধরে কঠোর জলবায়ুর মধ্যে অনুর্বর জমিকে সঙ্গী করে টিকে আছে। এরা অনেকটাই আফ্রিদি জনজাতির( বর্তমান পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের খাইবার-পাখতুনওয়া এলাকার বাসিন্দা) মানুষদের মতো। হেরোডোটাস তাদের কথাও বলে গেছিলেন। যুগে যুগে ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে সমস্ত আক্রমণ-প্রবাহের মধ্যে দিয়ে এরা টিকে রয়েছে, পাহাড়ের মতোই অটল থেকেছে। গুরেজ একসময় ছিল দর্দ জনজাতির প্রধান কেন্দ্র, সে-সময় এরা কাশ্মীরি শাসকদের জেরবার করে ছেড়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, দ্বিগুণ রাস্তা পার করে আমাদের দল যখন ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত, তখন এদের কাছ থেকে ভীষণ সহযোগিতা পেয়েছিলাম। এমনকি আমাদের থাকার জন্য মিঃ মিশেলের নতুন বাংলোও খুলে দিয়েছিল।

পরদিন আমরা ওখানেই থেকে গিয়েছিলাম। বিশ্রাম নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সঙ্গের জিনিসপত্র শুকনো করে নতুনভাবে বাঁধাছাঁদা করারও প্রয়োজন ছিল। এখান থেকে মালপত্র পরিবহনের জন্য নতুন করে ব্যবস্থা করার কথা ছিল। শ্রীনগরেই জেনেছিলাম যে অ্যাস্টর পৌঁছতে বুরজিল (Burzil) গিরিপথ অতিক্রম করার জন্য আমাদের কুলি নিতে হবে। এখানে এত বরফ জমে থাকে যে শুধুমাত্র কুলিরাই পারে পিঠে করে মাল বয়ে নিয়ে এই পথে পাড়ি দিতে। কিন্তু পথে দেখা হওয়া কিছু দর্দ দলের কাছে শুনলাম, ওরা নিরাপদে টাট্টুঘোড়ার পিঠে মাল চাপিয়ে অ্যাস্টর থেকে মাল খালাস করে ফিরছে। দিন কয়েক আগেই গুরেজ গ্রামের প্রায় সব পুরুষ আমাদের আগে আগে চলা এক ব্রিটিশ সার্ভে দলের মালপত্র নিয়ে গেছে। কাজেই টাট্টুঘোড়ার পিঠে মালপত্র চাপিয়ে রওনা হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না। ৩ জুন আমরা রওনা হয়েছিলাম। শুধু ছবি তোলা আর সার্ভের যন্ত্রপাতি, যেমন থিওডোলাইট ইত্যাদি জনাকয়েক কুলি জুটিয়ে তাদের পিঠে তুলে দিয়েছিলাম।

বুরজিল গিরিপথ অতিক্রম

আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে গেছে। গুরেজ ছেড়ে বুরজিল থেকে নেমে আসা নালার পাশ দিয়ে হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল। আমাদের পশ্চিমে বরফঢাকা পাহাড়, যা কৃষ্ণগঙ্গা উপত্যকাকে কাশ্মীর থেকে আলাদা করেছে আর ডানদিকে পাহাড়ের গায়ে পাইনের সবুজ-রঙা ঢাল চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। পথের জায়গায় জায়গায় বেশ কিছু তুষারধ্বস আমাদের পেরিয়ে যেতে হচ্ছিল। কয়েকদিন আগের অভিজ্ঞতায় আমি খাদের গা ঘেঁষে পিচ্ছিল জায়গাটা দিয়ে টাট্টুঘোড়া নিয়ে পার হবার ঝুঁকি নিতে চাইনি, তাই পুসওয়ারি গ্রামে থেকে গিয়েছিলাম। পরদিন ভোরে যাত্রা শুরু করে একইরকম প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে করতে মিনিমার্গ পৌঁছোলাম।

জায়গাটা সমুদ্রতল থেকে দশ হাজার ফুট উঁচুতে। গবাদি পশুর পাল নিয়ে বেশ কিছু পশুপালক গুজ্জরের দল এখানে আগে থেকেই ঘাঁটি গেড়েছিল। ছোটো ছোটো কুঁড়ে বানিয়ে তারা পুরো গ্রীষ্মটা এখানে কাটাবে। দিন দশেক আগেই এখানকার বরফ গলে গিয়েছিল। কচি কচি সবুজ ঘাসে পুরো উপত্যকা ছেয়ে গিয়েছে। ঘাসের মাঝে মাথা তুলে থাকা ছোটো ছোটো রঙিন পাহাড়ি গুল্ম আমাকে কাশ্মীরের মোহন্দ মার্গের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। এই গিরিপথ ও উপত্যকার সব খবরাখবর দেওয়া-নেওয়া করা টেলিগ্রাফ অফিসটাকে দেখে এখানকার শীতকালীন অবস্থার আভাস টের পেলাম। জমি থেকে অনেক ওপরে চতুর্দিকে পালিশ করা শক্তপোক্ত কাঠের ছাউনি দেওয়া বারান্দাঘেরা অফিসটাকে ছোটোখাটো দুর্গ বলে ভুল হতে পারে। এখানকার সুদীর্ঘ শীতে প্রবল তুষারপাতের মধ্যে অফিসটাকে মানুষের বাসযোগ্য ও কর্মক্ষম রাখতে এইরকম মজবুত গড়ন অবশ্যই দরকার ছিল।

মিনিমার্গ থেকে উত্তর-পশ্চিমদিকে বাঁক নিয়ে প্রায় পাঁচ মাইল পথ চড়াই ভেঙে বুরজিল গিরিপথের তলায় রেস্টহাউসে পৌঁছোলাম। ঝলমলে মিনিমার্গ পার হবার পর থেকেই ইতিউতি জমাট বরফের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল। আর যেখানে পৌঁছেছিলাম সেটা তো ছিল পুরোটাই বরফে ঢাকা। এই বরফই জানান দিচ্ছিল শীতে কী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে এই অঞ্চল! সে যাই হোক, ঝকঝকে পরিষ্কার নীল আকাশ দেখে আমি মনে মনে নিশ্চিন্ত হয়ে ছিলাম যে ভারী মাল পিঠে টাট্টুঘোড়াগুলো এই গিরিপথ নির্ঝঞ্ঝাটে পার হয়ে যেতে পারবে।

শুধু জানতাম যাত্রা শুরু করতে হবে মাঝ রাত্তিরে। সূর্য উঠে বরফ গলিয়ে নরম করার আগেই বরফে ঢাকা গিরিপথটা পার হতে হবে। রাত একটার মধ্যেই তৈরি হয়ে নিলাম। তার ঠিক একঘণ্টা পর আমাদের ক্যারাভান বরফঢাকা পথ ধরে যাত্রা শুরু করল। রাস্তা বলে কোনো কিছুর হদিস নেই। ঘণ্টা দু-এক ক্রমাগত চড়াই ভেঙে আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছোলাম যেখানে বুরজিল গিরিপথের সঙ্গে উত্তর-পূর্বদিকের দেওসাই নামের উঁচু মালভূমি থেকে একটা রাস্তা এসে মিশেছিল। এখানে ফুট তিরিশ উঁচু খুঁটির মাথায় কাঠের তৈরি একটা টেলিগ্রাফ অফিসের কুঁড়েঘর রয়েছে। খুঁটির মাথার ওই কুঁড়েটাই শীতে ডাকবাহকদের আশ্রয়। আবার গিলগিটের পথের নিশানা দেখানোর কাজও করে। আমরা যখন দেখেছি, তখন ওই ঘরের উঁচু খুঁটিগুলোও ফুট দশেক বরফের তলায় ডুবে বসেছিল।

আমাদের সৌভাগ্য যে ঠান্ডা খুব বেশি থাকায় আর বরফ যথেষ্ট শক্ত থাকায় টাট্টুঘোড়াগুলোর চলতে অসুবিধা হচ্ছিল না। সূর্যের প্রথম আলো দেখা দেবার আগেই আমরা গিরিপথের সর্বোচ্চ অংশ ১৩,৫০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। ছ’ মাইল রাস্তা পেরোতে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। খুব দূরের কিছুই নজরে আসছিল না। চারদিকে বরফের চাদর, তার ওপরে নতুন করে পড়া বরফের আস্তরণ পাহাড়ের শরীরকে যেন দাগহীন করে দিয়েছিল। এ দৃশ্য ভোলা যাবে না কোনোদিন!

ডাকহরকরাদের কুঁড়েতে বসে ঝটপট প্রাতরাশ সেরে নিয়েছিলাম। গিরিপথের উত্তরদিকের উতরাই বেয়ে নামতে অনেক সময় লেগে গেল। তাছাড়া ব্যাপারটা খুব ক্লান্তিকর! পুরো রাস্তাটাই বরফে ঢাকা। সূর্য যত মাথার ওপর উঠছিল, পিঠের বোঝা ততই ভারী লাগতে শুরু করেছিল। বরফের রাজ্যে শুধু একটাই জীবিত বস্তু চোখে পড়েছিল... বড়ো বড়ো পাহাড়ি কাঠবেড়াল, যাকে বলে মারমট। গর্ত থেকে বেরিয়ে রোদ পোয়াতে পোয়াতে তীক্ষ্ণ ‘কিইইই’ শব্দে ডাক ছাড়ছিল ওরা। কোনো বিপদের আভাস পেলে বিদ্যুতের গতিতে গর্তে সেঁধিয়ে যায় এই মারমট। আমার সঙ্গী ‘ইয়োলচি বেগ’ ( তুর্কি ভাষায় “পরিব্রাজক মশাই”) নামের ফক্স টেরিয়ার কুকুরটার মারমটের গতিবিধি টের পেতে খানিক সময় লেগেছিল। বাতাসে গন্ধ পেতেই ওদের ধরার জন্য ছুটোছুটি শুরু করে দিয়েছিল সে। কুকুরটা এই দীর্ঘ পথ বরফের ওপর দিয়ে অক্লেশে হেঁটে এসেছে। এর আগে পাঞ্জাবের শুকনো সমতল বা সিকিমের স্যাঁতসেঁতে জঙ্গলে একইভাবে আমার সঙ্গে হেঁটেছে। তুর্কি পরিচারকরা আমার এই বিশ্বস্ত সঙ্গীটাকে প্রাণ দিয়ে দেখভাল করত আর ভালোবাসত খুব।

দুপুর একটার সময় আমরা চিলাম চৌকিতে পৌঁছলাম। অ্যাস্টরের দিকে এটাই প্রথম রেস্ট হাউস। মাইল দু-এক পেছনে বরফের রাজত্ব ফেলে এসেছি। সব ক’টা টাট্টুঘোড়াই ঠিকঠাক এসেছিল, একটা ছাড়া। একটা ঘোড়া যে পৌঁছায়নি সেটা আমরা টের পেয়েছিলাম ব্রেকফাস্ট করার সময়। কারণ সে আমাদের রান্নাঘরের জিনিষপত্র বইছিল। ঘণ্টাখানেক উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করার পর দলের সার্ভেয়ার, যিনি দলের পেছনে পেছনে আসছিলেন, তিনি এসে খবর দিলেন নরম তুষারে একটা টাট্টুঘোড়া গেঁথে গেছে। মালপত্র আর ঘোড়াটাকে উদ্ধারের জন্য আমি সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন কুলিকে পাঠিয়ে দিলাম। সন্ধে ছ’টা নাগাদ মির্জা ঘোড়াসমেত সবকিছু নিয়ে ফেরত এল।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই খানিক মানসিক তৃপ্তি দিয়েছিলেন একজন রোড ইঞ্জিনিয়ার। তিনি শিকার করতে এসে এই রেস্ট হাউসেই উঠেছিলেন। তিনিই জানিয়েছিলেন, প্রিটোরিয়া দখল (দক্ষিণ আফ্রিকাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বারা: সম্পা) করা সম্ভব হয়েছে। টেলিগ্রাফের তার বেয়ে খবর দ্রুত ছোটে। যদিও গিলগিটের রাজনৈতিক এজেন্ট ছাড়া বুরজিলের এ-পাশে খবর দেওয়া-নেওয়ার মতো কোনো গ্রাহক ছিল না। কিন্তু অ্যাস্টরের টেলিগ্রাফ মাস্টার আর তাঁর বন্ধুরা সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকাতে কী কী ঘটে চলেছে তার খবর ভালোই জানতেন।

যে টাট্টুঘোড়ার দলটায় গুরেজ থেকে মালপত্র চাপিয়ে নিয়ে এসেছিলাম, সেগুলোই ছিল এ-বছর বুরজিল গিরিপথ পার করে আসা প্রথম টাট্টুঘোড়া বাহিনী। ওই ঘোড়াগুলো বদলে অ্যাস্টর থেকে পাঠানো অন্য এক ঘোড়ার দলের পিঠে লটবহর চাপিয়ে ৬ জুন চিলাম চৌকি থেকে অ্যাস্টরের দিকে রওনা হলাম আমরা। এতদিন যে কঠিন পথ পার হয়ে এসেছি, সেই পথের তুলনায় এই পথ অনেক আরামদায়ক। ঝকঝকে নীল আকাশ, ঝোরার জলের পাশে ইতিউতি জমে থাকা বরফের চাঙড় আর উপত্যকার অনেক নীচ দিয়ে সবুজ গাছপালার বুক চিরে বয়ে চলা ফেনিল নদী। ঝিলম আর সিন্ধুর জল বিভাজিকার মাঝে এ যেন এক অন্যরকম কঠোর প্রকৃতি। কাশ্মীর বা কিষণগঙ্গা উপত্যকার মতো এখানকার পাহাড়ের গা সবুজে মোড়া নয়। ন্যাড়া পাহাড়ের পাথরের ঢালে কয়েকটা জুনিপারের কল্যাণে খানিক সবুজের ছোঁয়ামাত্র চোখে পড়েছিল। প্রতিকূল মাটি আর কঠোর আবহাওয়ার দৌলতে চাষবাস এখানে নামমাত্র হয়। খুব আনন্দ হয়েছিল পথের পাশে সযত্নে তৈরি একখণ্ড মাঠ দেখে। পাথরের ওপর বড়ো বড়ো করে লেখা ছিল ‘পোলো খেলার মাঠ’। দর্দ উপজাতির জাতীয় খেলা হল পোলো। হতদরিদ্র গ্রামবাসীর এই একখণ্ড জমির প্রতি মমত্ব প্রমাণ করে খেলাটার প্রতি তাদের ভালোবাসা। এই পোলো খেলাই তাদের অন্যতম বিনোদন।

প্রায় সতেরো মাইল হেঁটে গাধোই পৌঁছে বেশ গরম লাগছিল। কাশ্মীর ছাড়ার পর এই প্রথম এত গরম লাগল। যদিও অ্যানেরয়েড যন্ত্র উচ্চতা দেখাচ্ছিল প্রায় ৯,০০০ ফুট।

অ্যাস্টর

সাতই জুন ভোর হতে না হতেই আমরা রওনা হলাম অ্যাস্টরের উদ্দেশে। অ্যাস্টর ছিল এই পাহাড়ি জেলার প্রধান-স্থল যার প্রসিদ্ধি অনেক প্রাচীন। গাধোই থেকে খানিক নামতেই ন্যাড়া পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ঝিকমিকিয়ে উঠেছিল বরফের মুকুট পরা নাঙ্গা পর্বত। কাশ্মীরের মোহন্দ মার্গে মেঘের পর্দা সরিয়ে বহুবার দেখা দিয়েছে ২৬,৬০০ ফুট উঁচু পিরামিড সদৃশ এই মহান গিরিশৃঙ্গ। এমনকি রাওয়ালপিন্ডির মুরি থেকেও অনেকবার দেখেছি একে। কিন্তু এখান থেকে দেখছি যেন হাতের তালুর মতো। ওর আশেপাশে প্রহরীর মতো দাঁড়ানো আঠারো থেকে তেইশ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়গুলোও প্রায় হাতের মুঠোয়। পাখির মতো উড়ে যেতে পারলে ওই মহান পর্বতমালা থেকে আমাদের দূরত্ব হবে মাইল দশেক। মাথা নত হয়ে এসেছিল। আমি পাহাড়ের গায়ের হিমবাহগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলাম।

যত নীচের দিকে নামছিলাম ততই গরম বাড়ছিল। গুরিকোট থেকে খানিক এগিয়ে যেখানে অ্যাস্টর নদীর দুটো শাখা এসে মিশেছে, সেখান থেকে ধুলো বোঝাই রাস্তার শুরু হয়েছিল। বাঁদিকে উপত্যকার খাড়া পাহাড় ছাড়াতেই গ্রামের পর গ্রামের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু অ্যাস্টরের ছোঁয়া টের পেতেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল।

ওখান থেকে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল তাতে এই অঞ্চলের রুক্ষতা টের পেলাম। উপত্যকার উত্তরে এক বিশাল পাথুরে দেওয়াল দাঁড়িয়ে। তার দুপাশে পলিসমৃদ্ধ মালভূমির বুকে পাহাড়ি জলধারারা খোদাই করে তুলেছে অজস্র ফাটল। সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্যের সমাহার।

তিনটের সময় অ্যাস্টরের বাংলোতে পৌঁছলাম। গাছের ছায়াঘেরা বাংলোটা অ্যাস্টরের প্রভাবশালী অঞ্চলের একদম মাঝামাঝি অবস্থান করছে। বাংলো থেকে খানিক নীচে শিখদের একটি দুর্গ। বর্তমানে ওটি কাশ্মীর ইম্পিরিয়াল বাহিনীর ছাউনি। বাংলোর দক্ষিণে বাগানভরা জায়গাটা অ্যাস্টরের রাজাদের সম্পত্তি। এ অঞ্চলে শিখদের আগ্রাসনের পর অ্যাস্টরের রাজারা তাঁদের ক্ষমতা হারান। উপস্থিত এ-চত্বরে তাঁদের দায়িত্বগুলো পালনের ভার রয়েছে কাশ্মীর প্রশাসনের এক খুদে তহশিলদারের হাতে। এই পার্বত্য অঞ্চলে শিখদের শাসনে দয়ামায়ার কোনো লেশমাত্র ছিল না। ফলে এখানকার গদিচ্যূত পাহাড়ি রাজাদের হাতে উপস্থিত নিজেদের বংশগৌরবটুকু কোনোমতে ধরে রাখবার সামর্থ্যও অবশিষ্ট নেই।

অ্যাস্টরের উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে ৭,৭০০ ফুট। সন্ধেবেলা প্রবল ঝড়জল বয়ে গিয়েছিল উপত্যকা জুড়ে। পরদিন ৮ জুন তারিখেও আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। কিন্তু আমি দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ধীরে ধীরে নামতে নামতে সিন্ধুনদের দিকে এগোচ্ছিলাম আমরা। যতই নীচের দিকে নামছিলাম ততই চারপাশের উজ্জ্বলতা চলে যাচ্ছিল। পাথরের গায়ে লাল, হলুদ আর কালচে রঙের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছিল। পাথরের রঙ-বৈচিত্র গাছপালার অভাব পুষিয়ে দিয়েছে খানিকটা। অনুর্বর মাটিতে ইতিউতি গজিয়ে ওঠা বুনো গোলাপের ঝাড়ে ফুল ফুটেছে অল্পস্বল্প। রুক্ষ পাথুরে মাটিতে গোলাপের বেগুনি রঙে তাই সহজেই চোখ আটকে গেল।

অ্যাস্টর থেকে প্রায় মাইল পনেরো পথ হেঁটে দাসকিন গ্রামের কাছে পৌঁছে প্রথম নজরে এসেছিল পাহাড়ের বুকে খানিকটা সবুজ চাষের মাঠ। টের পেয়েছিলাম দুয়ানের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা। ওখানে ক্যাপ্টেন জে. ম্যানার্স স্মিথের সঙ্গে দেখা করার জন্য মুখিয়ে ছিলাম, তাই রাত কাটাতে কোথাও না থেমে সামনে এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। যদিও ভারী মাল নিয়ে আমাদের টাট্টুঘোড়াগুলোর গতি খুব কমে এসেছিল। ঘোড়ার মালিকও গাঁইগুঁই করা শুরু করেছিল। নাহলে বাকি বারো মাইল পথ খুব আরামদায়কই ছিল।

সগর্জনে বয়ে চলা নদীর বুক থেকে ধীরে ধীরে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঠে গেছে আমাদের চলার পথ। সেখানের পাইনের বনের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে অস্তমিত সূর্যের আলো-আঁধারিতে অপূর্ব লাগছিল। সবুজ হয়ে থাকা পাহাড়ের ঢালের মাথায় যদিও এখন বরফ জমে আছে। ক’দিন পর পাইন বনের চারপাশে ছুটে নামা ছোটো ছোটো ঝর্ণার পাশে মস আর ফার্ণের সবুজের ঢল দেখে মনে মনে খানিক শান্তি পেয়েছিলাম। অবশেষে একটা বাঁক পেরোতেই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল!

অ্যাস্টরকে ঘিরে থাকা পাহাড়শ্রেণির ফাঁক দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধুনদ। পাহাড়ের ঢাল নদীর দু-পাশ দিয়ে ঢেউয়ের মতো ক্রমশ উত্তরের দিকে এগিয়ে গেছে। দূরের পাহাড়ের মাথায় ঝুলে আছে হালকা মেঘ। তারই মাঝে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বরফাবৃত মাউন্ট রাকাপোশিকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। সিন্ধুদেব আমাকে যেন অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন পুরোনো বন্ধুর মতো। এই নদীর ধারাকে আমি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জায়গায় বিভিন্ন রূপে দেখেছি। বাল্টিস্তানের পাথুরে বুক চিরে এগোতে দেখেছি। ইউসুফজাইর সমতলে ও পাঞ্জাবের আটকেও দেখেছি। কিন্তু পাহাড়ের উঁচু দু-দেওয়ালের মধ্যে বয়ে যাওয়া এখানকার মতো উচ্ছল মনোমুগ্ধকর রূপ আর কোথাও দেখিনি। সূর্যের কিরণ পড়ে ঝলসে উঠছিল জলের কণা। দ্রুত ঘনিয়ে আসা আঁধার গিরিখাত ধরে প্রবহমান নদীটির উজ্জ্বল অস্তিত্ব আমার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দিল। অবশ্য ততক্ষণে ক্লান্ত শরীরে দু-গুণ হেঁটে আমরাও পৌঁছে গিয়েছিলাম আমাদের লক্ষ্যে।

দুয়ানে সাময়িক অবস্থান

দুয়ান বাস আমার খুব কাজের ও মজার হয়েছিল। জুনের ৯ তারিখ গিলগিট ও সংলগ্ন অঞ্চলের পলিটিক্যাল এজেন্ট ক্যাপ্টেন জে. ম্যানার্স স্মিথ শিকার ভ্রমণ সেরে ফেরার পথে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে আমাকে ওঁর তাঁবুতে একটা দিন কাটিয়ে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পাহাড়ি পথে লম্বা সফরের মাঝে আমি ওই বিশিষ্ট অফিসারের আমন্ত্রণ খুব খুশি মনে গ্রহণ করেছিলাম। আমি আমার দলবলকে রওনা করিয়ে দিয়ে ওঁরই পাঠানো একটা টাট্টুঘোড়াতে চেপে উপস্থিত হয়েছিলাম ওঁর তাঁবুতে।

রাস্তা থেকে হাজার দেড়েক ফুট উঁচুতে ফার গাছে ছাওয়া যে পাহাড়ি ঢালের মাথায় ওঁর শিবির ছিল, সেটি একটি অসাধারণ জায়গা। অজস্র ছোটো ছোটো পাহাড়ি ফুল কার্পেটের মতো ফুটে ছিল ঢাল জুড়ে। ছবির মতো তো বটেই, মহা পরাক্রমশালী পলিটিক্যাল এজেন্টের শিবিরস্থলকে মনোরম করতে ওই ফুলের ঝাড়গুলো গিলগিট, হুনজা আর চিলাসের বিভিন্ন জায়গা থেকে আনানো হয়েছিল। এছাড়া ঢালের বুক বেয়ে চলা ছোট্ট একটা পাহাড়ি ঝরনা ছিল জায়গাটার মুখ্য আকর্ষণ।

মিঃ ও মিসেস স্মিথের বন্ধুত্বপূর্ণ আতিথ্য আমার অনেকদিন মনে থাকবে। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অখ্যাততম কোণে থেকেও সুভদ্র জীবনযাপনের কায়দাটা ভালোভাবেই জানেন। এখানে প্রকৃতিও ওঁদের শিবিরকে ঢেলে সাজিয়েছে।

এরকম সুন্দর একটা জায়গায় তাই সময়টা ঝড়ের গতিতে উড়ে গেল। ক্যাপ্টেন স্মিথ এই অঞ্চলের ব্রিটিশরাজের পলিটিক্যাল এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন বারো বছরেরও বেশি সময় ধরে। ভিক্টোরিয়া ক্রস প্রাপ্ত ক্যাপ্টেন স্মিথের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে হুনজাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভূত পরিবর্তন নিয়ে আসার জন্য। নিঃসন্দেহে এই পার্বত্য জাতি ও এই অঞ্চলকে সম্ভবত আর কোনো ইউরোপিয়ান ওঁর থেকে ভালো জানে না। এই পার্বত্য জাতি ও তাদের রীতিনীতি সম্পর্কে ওঁর উৎসাহ এসেছিল ওঁর শিবিরে কাজ করা বিভিন্ন পাহাড়ি মানুষগুলোর কাছ থেকে। চিলাসের দিকের পুনিয়াল গ্রামের প্রধান আমাকে এই অঞ্চলের প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা নানা সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থার কথা শুনিয়েছিলেন। বলতে গেলে ইসলাম ধর্ম অল্প কিছুদিন আগেই এখানে খানিক প্রভাব ফেলেছে, কিন্তু প্রাচীন ঐতিহ্য আর পূজা-আর্চার রীতি উপত্যকার অধিকাংশ জায়গায় এখনও প্রবলভাবে রয়ে গেছে। গোর গ্রামের পাকা দাড়িওয়ালা মোড়ল তো পুরোনো দিনের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছিল।

তার গ্রামের বাড়ির কাছে আছে এক প্রাচীন কবরস্থান। মহম্মদের জন্মের আগেই প্রাচীনকাল থেকে তাদের পূর্বপুরুষদের মৃতদেহ আগুনে পুড়িয়ে ওখানে মাটির তলায় পোঁতা হত। সবাই ওই জায়গাটাকে এড়িয়ে চলে। বলতে গেলে ওই জায়গাটা ছিল এক নিষিদ্ধ অঞ্চল। গোর গ্রামের সেই বুড়ো মোড়ল তার ছোটোবেলায় একবার ওই জায়গায় গিয়ে খানিক খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল। তারপর বাড়িতে এসে সে-কথা গর্ব করে বলার পর তার মা তাকে বেদম পিটিয়েছিল ‘ওঁদের’ বিরক্ত করার জন্য। কোনো সন্দেহ নেই, শুধু এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলেই নয়, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই মহিলারাই রক্ষা করে চলেছেন প্রাচীন গাথা, রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে।

আধুনিক টেলিগ্রাম যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে সুদূর পশ্চিমের সব রাজনৈতিক তাজা খবরাখবর স্মিথের টেবিলে হাজির। মনে হচ্ছিল যেন কোনো নির্জন দুর্গম উপত্যকায় নয়, বসে আছি লাহোরের এক ক্লাবে। আমার নিমন্ত্রণ-কর্তার বাচ্চারা বাক্যালাপে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে সুউচ্চ পর্বতমালা পেরিয়ে ইউরোপের প্রভাব ধীরে ধীরে অনেকটাই চলে এসেছে এই অঞ্চলে।

উজ্জ্বল গোলাপি গালের ব্রিটিশ শিশুরা যেন এই ভারতীয় সীমান্তে আধুনিক সভ্যতার পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বীকার করতে কোনো সংশয় নেই, আমি অনেক অদ্ভুত জায়গায় গিয়েছি, আর সব জায়গাতেই দেখেছি এই শিশুদের।

ব্রিটিশ শিশুরা ভারতেও ব্রিটিশ সেনাদলের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এইসব এলাকায় তাদের অনুসরণ করেছে। অনেকে তো শুরুর দিকের যুদ্ধগুলোরও সাক্ষী থেকেছে। যেমন ব্রিটিশদের সঙ্গে শিখদের ফোর্ট লকহার্ট যুদ্ধ কিংবা মালাকান্দের অ্যাংলো-আফগান লড়াই। সামগ্রিকভাবে কোনো এলাকায় ব্রিটিশ শিশুদের আবির্ভাবই সে এলাকায় ‘প্যাক্স ব্রিটানিকা’ প্রতিষ্ঠার চিহ্ন। বেড়ে ওঠবার জন্য যে শান্তি ও নিরাপত্তার আবহ কাশ্মীরকে ঘিরে থাকা পাহাড়ি এলাকাগুলোয় এই শান্তির দূতেরা পেয়ে চলেছে ইদানীং, সে তাদের প্রাপ্য।

দুপুরের পর ক্যাপ্টেন স্মিথ আমাকে শিবিরের থেকে খানিক ওপরের এক অসাধারণ সমতল জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এখানে চা পানের ব্যবস্থা ছিল। ওখান থেকে সিন্ধু উপত্যকার চমৎকার দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। পাথর আর বালির বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছাড়িয়ে দূরবর্তী চিলাস আর দারেলের দিকে এগিয়ে গেছে সিন্ধু। হয়তো সে-দিন আবার আসবে যখন নদীর পাশ ঘেঁষে ভারতীয় সমভূমিতে যাবার সেই পুরোনো দিনের আদি যাত্রার প্রাকৃতিক পথ খুলে যাবে। সে পথ এখন বন্ধ। এত বাধাবিপত্তির রাস্তা দিয়ে কঠিন গিরিপথ পার না হয়েও নদীর ধারার পাশ দিয়ে অক্লেশে মালপত্র আনা-নেওয়া করা যাবে। ভারী বিপদের মুখোমুখি হতে হবে না।

সিন্ধুর অববাহিকায়

জুনের ১০ তারিখ সকালে ক্যাপ্টেন স্মিথ ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি অ্যাস্টর নদীর কোল ঘেঁষে দ্রুত চলা শুরু করেছিলাম বুঞ্জি অভিমুখে। ওখানেই আমার দলের শিবির থাকার কথা। দ্রুত গরম বাড়ছিল। ‘হাতু পির’ নামের এই পথ যে ভয়াবহ, সে-খবর আগে থেকে জানতাম। খাওয়ার জলও পাওয়া যায় না এ-পথে। কোনো সবুজের ছোঁয়া নেই। দিনের বেলায় সূর্যের প্রখর তাপ লেপটে থাকে সবসময়। সেই এলাকা দিয়ে এগারো মাইল হাঁটার পর আমি সিন্ধু ও অ্যাস্টর নদীর সঙ্গমের কাছাকাছি পৌঁছলাম। সারা পথে একজনের দেখাও পাইনি। বুঝতে পারছিলাম, এ-পথে কুলিদের মাল বয়ে নিয়ে যেতে কী হাল হয়!

রোদের তাপে ঝলসে বুঞ্জি বাংলোতে যখন পৌঁছেছি তখন দুপুর একটা। বাংলোর পাশের দুর্গে কাশ্মীরি বাহিনীর কিছু সৈন্য ছিল। নতুন রাস্তা তৈরির পর সিন্ধুনদের ব্যস্ত জলপথ আর ব্যবহার হয় না বললেই চলে। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে তারপর আমি আর বাংলোর বাইরে বেরোইনি। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে আকাশের ক্যানভাস জুড়ে থাকে নাঙ্গা পর্বত। কিন্তু তখন চারদিকে ছড়িয়ে থাকা একটা ধোঁয়াশার আড়ালে নাঙ্গা পর্বত লুকিয়ে পড়েছিল। প্রবল হাওয়ায় নদীতটের শুকনো বালি উপত্যকা জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল। ঘর বন্ধ থাকলেও উড়ন্ত বালি থেকে রেহাই নেই। এহেন বুঞ্জিতে বেশি সময় থাকার কোনো মানে নেই। গ্রীষ্মের জম্মুর নীচু পাহাড়ি অঞ্চলের কথা মনে পড়ছিল।

বুঞ্জিতে পশুখাদ্য অমিল। এখান থেকে এগিয়ে আমার ক্যাম্পে যাবার জন্য একটা টাট্টুঘোড়া ভাড়া পেতে নাজেহাল হয়ে গিয়েছিলাম। শেষে এক তহশিলদার যখন তার টাট্টুঘোড়া আমাকে দিল তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। বালিময় সমতল উপত্যকায় সিন্ধুনদের ওপরকার ঝুলন্ত সেতু যখন একাএকা পার হচ্ছি, ততক্ষণে হালকা মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা চাঁদের নরম আলো আমার সঙ্গী হয়ে গেছে। পাথরের বুক বেয়ে এগিয়ে চলা নদীটিকে অসাধারণ লাগছিল। সেদিন চাঁদের আলোয় রুক্ষ পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে গিলগিট নদীর সিন্ধুনদে মেশার দৃশ্য ভোলার নয়।

ধীরে ধীরে ওপর পানে উঠতে থাকা পাহাড়ি নদীর কোল ঘেঁষা পথের খোঁচা পাথর এড়িয়ে, আবছায়া আলোয় ঘোড়ার চেপে চলা খুব একটা সুখের অভিজ্ঞতা ছিল না। এবড়ো-খেবড়ো বিপদজনক পথের চৌহদ্দি পেরিয়ে গিলগিট উপত্যকার নিরাপদ অংশে পা রাখতে না রাখতেই চারদিক অন্ধকার করে শুরু হয়ে গিয়েছিল বৃষ্টি।

এরপর মাইলের পর মাইল পার হয়েও রেস্ট হাউসের খোঁজ পেলাম না। সেখানে আমার দলের সঙ্গীরা আছে। হিসেবমতো এতক্ষণ লাগার কথা নয়। তবে কি আমি অন্ধকারে বুঝতে না পেরে রেস্ট হাউস পার হয়ে এসেছি? শঙ্কাটা মনের মধ্যে চেপে বসেছিল। আমার সামনে দুটো পথ খোলা ছিল—হয় আরও এগিয়ে গিলগিটে চলে যাওয়া, অথবা পিছিয়ে গিয়ে বাংলোটাকে খুঁজে বের করা। ঘন অন্ধকারে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি বাংলোটা খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছিলাম। পেছন দিকে চলতে শুরু করে খানিক পরেই মূল রাস্তা থেকে একটা সরু পথ নজরে এসেছিল। সেই পথ ধরে আধ মাইলটাক এগিয়ে শেষমেশ পৌঁছেছিলাম রেস্ট হাউসে। যখন ডিনার শুরু করলাম তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। যদিও আমার পরিচারকরা আমার খাবার তৈরি করেই রেখেছিল, কিন্তু এটা ভাবেনি যে ডিনার খেতে আমি মাঝরাতে হাজির হব!

পারি, যেখানকার বাংলোয় বাকি রাতটুকু কাটিয়েছিলাম, ভোরের আলো ফুটতেই টের পেলাম নদীর বালুতীরে নিঝুম জায়গাটা আসলে লালচে-বাদামি পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার। একটা ইজেলের ওপরে যেন কোনো চিত্রকরের আঁকা।

পরবর্তী নয় মাইল পথ আমরা পার হয়েছিলাম এই অপরূপ চিত্রপটের মধ্যে দিয়ে। অবশ্য একটা বাঁকের পর ফের আমরা গিয়ে পড়েছিলাম এক রুক্ষ পাথুরে অঞ্চলে। ওখান থেকে পুরো গিলগিট উপত্যকার ছবি ধরা দিয়েছিল চোখে। মিনাউর ছিল গিলগিট উপত্যকায় আমাদের পথে পড়া প্রথম চাষের জমিওয়ালা গ্রাম। নদীর বাঁ-পাশে জমা হওয়া পলিময় অংশে খুব যত্নের সঙ্গে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা খণ্ড জমিতে জলসিঞ্চন করে কৃষিকাজ, চোখ ঠান্ডা করা সবুজের সমারোহ।

মাইল কয়েক যেতেই উত্তরের দিক থেকে আসা হুনজা নদীর উপত্যকার দেখা মিলল। এল একের পর এক গ্রাম। ফসলে ভরে থাকা চাষজমি আর ফলের বাগান। সদ্য পার হয়ে আসা রুক্ষ, ফ্যাকাসে, সবুজহীন দৃশ্যের ঠিক বিপরীত ছবি। টাট্টুঘোড়ার পিঠে চেপে যেতে-যেতেই হাতে এসেছিল এজেন্সির প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন বার্ডেনের লেখা একটা আমন্ত্রণ পত্র। এর আগে ক্যাপ্টেন স্মিথের আতিথ্যই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল সদয় আতিথেয়তা কাকে বলে।

গিলগিট এজেন্সিতে

খানিক সময়ের মধ্যেই একটা আরামদায়ক বাংলোয় আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, গিলগিটে এজেন্সির কর্মকর্তাদের কেউই আতিথ্যে খুঁত রাখতে চান না। অফিসারেরা সংখ্যায় কম হলেও তাদের সঙ্গ কম আকর্ষনীয় আর কম আন্তরিক ছিল না! এদের প্রত্যেকেই, তিনি ‘কাশ্মীর ইম্পিরিয়াল সার্ভিস ট্রুপ’-এর দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সৈন্য জোগানদারই হোন অথবা ‘পাবলিক ওয়ার্ক’ বিভাগ বা হাসপাতালের কর্তা—নিঃসন্দেহে এই পর্বতাঞ্চল সম্পর্কে এদের জ্ঞান ও ভালোবাসা ছিল নিখাদ। সুদূর সীমান্তে ‘রাজনৈতিক’ পরিচালনা ব্যবস্থার অধীনে থেকে প্রায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারায় নিজ নিজ ক্ষেত্র পরিচালনায় এঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলি ছিল পরিপূর্ণ। রাজনৈতিক কারণে গিলগিটের সুরক্ষার জন্য যে সেনা ছাউনি এরা বানিয়েছিল, তা এ এলাকার উন্নয়নের কতটা ভূমিকা নিয়েছিল, তা এখানে এক চক্কর ঘুরলেই টের পাওয়া যায়। ছোটো সেনা ছাউনির জন্য যা প্রয়োজন—যেমন স্কুল, হাসপাতাল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গোছানো নানা দপ্তর, বাজার, এমনকি মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র হাসপাতাল ও স্কুলও এঁরা এখানে বানিয়েছেন। ইউরোপিয় অফিসারদের জন্য এখানকার পাহাড়ের ঢালে আছে ছোটো ছোটো আরামদায়ক বাংলো, আছে লাইব্রেরি-সহ ক্লাব। মাত্র এগারো বছর আগে গিলগিটে তৈরি হওয়া সেনা ছাউনিকে ভিত্তি করে এই উন্নতি দেখে এর আগের অবস্থার কথা কল্পনা না করাই ভালো।

কাঠের কাঠামোর ওপর গড়ে তোলা শিখ ঘরানার দুর্গটি বর্তমানে ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। এই কাঠামোটি আগের সময়কার গিলগিটের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যখন সৈনিকের শুধু খুব কম বেতনই পেত না, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা নামক বস্তুর অভাব ছিল প্রকট। সদিচ্ছার অভাবে উর্বর জমি পতিত হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে শান্তিতে থাকা দর্দরা তখন কথায় কথায় ভয়ংকর সহিংস বিদ্রোহ শুরু করে দিত।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গিলগিটে একদিন থাকার কথাই ছিল। আসলে দলের সঙ্গীদের বিশ্রাম ও সঙ্গের জিনিসপত্র টুকটাক মেরামতের জন্য দিনটা প্রয়োজন ছিল। ঘোড়া ও কুলি বাহিনী পালটে নতুন ঘোড়া আর কুলি জোগাড় করে হুনজার দিকে চলা শুরু করতে গিয়ে তিনদিন সময় লেগে গেল।

যথেষ্ট কাজের চাপ আর আতিথ্যের বাহুল্যে যে অভিযান শুরু করতে দেরি হয়ে যাচ্ছে সেটা খানিক ভুলে গিয়েছিলাম। সরকারি পরিবহণের সবকিছু দূরবর্তী শিবিরগুলোতে ব্যস্ত ছিল। আর স্থানীয় টাট্টুঘোড়ার দলকেও অনেক দূরের তৃণভূমিতে চরাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সৈন্যশিবিরের এক চটপটে অফিসার ক্যাপ্টেন হাওয়েল তৃতীয় দিন আমাদের জন্য একটা প্রশিক্ষিত টাট্টুঘোড়া বাহিনী জোগাড় করে দিয়েছিলেন, যাদের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে চোখ বুঁজে হুনজা পৌঁছানোর ভরসা করা যায়। যাত্রাপথে আমার পোশাক খানিক ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেগুলো গিলগিটের সহৃদয় লোকজনের সাহায্যে দ্রুত মেরামত হয়ে গিয়েছিল। কমিশারিয়েটের স্টোর্স থেকে আমার লোকেদের জন্য গরম পোশাক আর পথের জন্য পর্যাপ্ত খাবার দিয়ে দিয়েছিল। আমার স্টকে ফোটো-থিওডোলাইট যন্ত্রের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় সূক্ষ্ম সুতো প্রায় নেই জেনে এই স্টেশনে অবস্থানকারী একমাত্র মহিলা, মিসেস ডাবলিউ ওঁর মাথার সোনালি লম্বা চুল যন্ত্রের সুতো হিসেবে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন। আমি পরে কতবার যে পাহাড়ের মাথায় ঝড়ের বেগে বয়ে চলা বাতাসের মধ্যে আমার অবশ হয়ে যাওয়া আঙুল দিয়ে সেই সূক্ষ্ম যন্ত্রটা ব্যবহার করতে গিয়ে ওঁর কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছি তার হিসেব নেই।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%