সপ্তম অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

গেজ গিরিখাত হয়ে কাশগরের পথে

২৩ জুলাই সকালে একদিকে আমি আমার কাশগর যাত্রার জন্য তৈরি হয়েছিলাম, আর অন্যদিকে একটা ছোট্ট তাঁবু নিয়ে রাম সিং তৈরি হচ্ছিলেন বুলুনকুলের দিকে কারাতাস গিরিপথ পর্যন্ত তাঁর জরিপের কাজ শেষ করতে। দুজন যাব দু-দিকে। আমি যাব উত্তরে আর তিনি যাবেন উত্তর-পূর্বে। সপ্তাহ খানেক পর অবশ্য তিনি কাশগরের পথ ধরে আমাদের দলে যোগ দেবেন আবার। যাতে কোনোভাবেই রাম সিংয়ের এতদিনকার কাজ নষ্ট না হয় বা হারিয়ে না যায় তাই আমি ওঁর জরিপ করা প্রতিটি নকশার ছবি তুলে নিয়েছিলাম। দুর্ঘটনা বা চিনা হস্তক্ষেপের ব্যাপারে কিছুই বলা যায় না। এখান থেকেই আমার দুই হুনজা পরিচারক ও আজব খান বিদায় নিয়ে ফিরে গেল নিজের বাসস্থানে। যথেষ্ট পরিমাণে মজুরি ও বকশিস পেয়ে তারা বেজায় খুশি হয়েছিল। এখান থেকে বিদায় নিয়েছিল করম শাহ্ বেগও।

যাত্রা শুরুর আগেই আমার মন খুশিতে ভরে উঠেছিল ভারত থেকে সারিকোল হয়ে আসা আমার চিঠিপত্রের গাঁটরি পেয়ে। এতে শুধু চিঠিপত্রই ছিল না, গিলগিট থেকে ছয় সপ্তাহ আগে লাহোরে অর্ডার করা কিছু ছোটোখাটো অথচ জরুরি জিনিসপত্রও ছিল। কিছু সরঞ্জাম যেগুলোর অভাব অভিযান শুরু হবার খানিক পরপরই টের পেয়েছিলাম।

রাম সিংয়ের মালপত্র বুলুনকুলের দিকে রওনা দিতে না দিতেই আমি কারাকুলের পশ্চিমে হাজার দেড়েক ফুট উঁচু এক পাহাড়ের মাথায় চড়ে ফটো-থিওডোলাইট নিয়ে আমার কিছু অসমাপ্ত জরিপের কাজ শেষ করতে লেগে পড়লাম। অভিযানের মালপত্র নিয়ে আমার দলবল রওনা হয়ে গেছিল। কোক-তুমশুক পাহাড়ের মাথা থেকে চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিলাম। পাহাড়ের তলদেশের হ্রদের পান্না-সবুজ জলের ঢেউয়ের শীর্ষভাগ সূর্যের আলো পড়ে অভ্রের মতো ঝকঝক করছিল। টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে হ্রদের ঠিক উলটোদিকে নজর করতেই দেখি রাম সিং থিওডোলাইট যন্ত্র নিয়ে কাজ করে চলেছেন। উত্তরের দিকে বাসিককুলের ছোটো ছোটো হ্রদগুলোর গভীর সবুজ জল পরিষ্কার আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল হ্রদের কিনারার কালচে পাথরের স্তূপগুলোকে। উপত্যকার হ্রদগুলোকে ঘিরে প্রাকৃতিক ক্ষয়ে গড়ে ওঠা বৃত্তাকার পাথুরে খাড়া দেওয়ালগুলো তুলনায় কম জনশূন্য আর ঊষর।

বিকেল তিনটে নাগাদ আমি ছবি তোলা শেষ করে দ্রুত পাহাড়-চুড়ো থেকে নেমে এসেছিলাম কারাকুল থেকে জন্মানো এক ছোটো পরিষ্কার জলের স্রোতের পাশে। তারপর ‘নীচের বাসিককুল’ হ্রদের পূর্ব কিনারা ধরে কারাকুলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে এই প্রথম অনুভব করেছিলাম কেন কার্পেথিয়ান এলাকার বিশিষ্ট হ্রদগুলোকে ‘ আই অফ দ্য সি’ অর্থাৎ ‘সমুদ্রের চক্ষু’ বলা হয়। গ্রীষ্মের শান্ত পড়ন্ত বেলায় হ্রদের কিনারার সবুজ ঘাসের গালিচা খানিক বিশ্রামের জন্য টানছিল। কিন্তু আমার কাছে সামান্য বিশ্রাম করার ফুরসতও ছিল না। নতুন পাওয়া প্রকৃতির মোহের সব টান ছিঁড়ে ফেলে এগিয়ে আমাকে যেতে হয়েছিল।

খানিক পরেই গাছপালার অস্তিত্ব সরে গিয়ে এসেছিল পাথুরে মরু অঞ্চল, ‘দশ্ত’। উপত্যকার পাথুরে মরু-ঢাল বেয়ে আমি এগোচ্ছিলাম। কাছের দক্ষিণ-পশ্চিম হিমবাহ থেকে নেমে আসা ‘এক্কিবেল-সু’ নদী বয়ে চলেছে উপত্যকার বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই ভরা চওড়া অংশ জুড়ে। কারাকুল থেকে মাইল চারেক যাবার পর খানিক কসরত করে নদী পার হতে হয়েছিল। নদীর গভীরতা ছিল চার থেকে পাঁচ ফুট। নদী পার হয়ে হিমবাহের সামনে ছড়িয়ে থাকা পলি-পাথরভরা জমির ওপর দিয়ে এগিয়ে চলছিলাম। এই পাথরের টুকরোগুলো একসময় পূর্বদিকের বিশাল হিমবাহে মিশে নেমে এসেছিল। বরফ গলে যেতে শুধু পাথরগুলোই পড়ে আছে। নদীর পাড়ের ঘাস আর গুল্মগুলো কাঁটার মতো ধারালো। ছোটো ভেষজ গুল্মগুলো কমবেশি কারাকুলের মতো হলেও এর গন্ধ অনেক বেশি জোরালো।

বুলুনকুলে বিপত্তি

রাত আটটা নাগাদ আমি বুলুনকুলের চিনা পোস্টের কাছে নদীর এক বাঁকে ঘাসে ভরা জলাভূমির পাশে খাটানো আমার শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম। এই অঞ্চলের আম্বান বা সামরিক অধিকর্তা রাং-কুল এবং রাশিয়ান পামির-সংলগ্ন গিরিপথগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। শিবিরে পৌঁছে যা খবর পেলাম তাতে মনে হল আম্বান আমার আগামী যাত্রাপথে সাহায্য করবেন বলে মনে হচ্ছে না। যদিও তিনি খানিক জ্বালানি আর একটা ভেড়া উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। এই অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা এক প্রভাবশালী কিরঘিজ পশুচারক ওসমান বেগের কথা তাশকুরঘান থেকেই জেনে এসেছিলাম। সে এই অঞ্চলে খুবই প্রভাবশালী। আমাকে বলা হয়েছিল ওর সঙ্গে রাতের অন্ধকারে গোপনে দেখা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পরদিন সকালে আম্বানের মনের ভাব পরিষ্কার হয়ে গেছিল। টের পেয়েছিলাম, করম শাহ্ বেগের দলবল, যারা কারাকুল থেকে আমার মালপত্র এখানে বয়ে নিয়ে এসেছিল, তারা তাদের টাট্টুঘোড়াসহ পালিয়ে গেছে। কাশগর থেকে আসা কয়েকটামাত্র ঘোড়াতে এত লটবহর চাপিয়ে এগোনো অসম্ভব। এছাড়া কাশগর থেকে আসা পশুদলের একটা বড়ো অংশ রাম সিংয়ের সঙ্গে ছিল। উপায়ান্তর না দেখে আমি আম্বানের কাছে সাহায্য চেয়ে লোক পাঠালাম। তিনি ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে জানিয়ে দিলেন যে তিনি কিছু করবেন না। বুঝে গেছিলাম যা করার আমাকেই করতে হবে। ডক্টর সোয়েন হেডিনের কথা মনে পড়েছিল। বুলুনকুলে উনি আরও খারাপ ব্যবহার পেয়েছিলেন। ‘এখানকার কঠিন আবহাওয়া ওদের লিভার গড়বড় করে দেয়’ এই বলে আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম।

আমার সৌভাগ্য বলতে হবে, আম্বান আমাকে কোনো সাহায্য না করলেও কোনো বাধাও দেননি। ওঁর দোভাষীকে (তোল-মাচ) দিয়ে ওঁকে বোঝাতে কালঘাম ছুটে গেছিল যে আমার যাত্রার পরিবহণের ব্যবস্থা করে দেওয়া ওঁর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

উনি কী বুঝছিলেন জানি না। কিন্তু বেলা ১১টা নাগাদ ডাক পাঠানোর জন্য টাট্টুঘোড়া আর কিরঘিজ পশুগুলোর পিঠে খানিক বেশি বোঝা চাপিয়ে আমার এগোনোর জন্য কাজ চালানো গোছের একটা ব্যবস্থা করে নেওয়া গেছিল। সে যাই হোক, আমি যাত্রা শুরুর আগে আগের রাতে আম্বান উপহার-স্বরূপ যে ভেড়াটি আমাকে পাঠিয়েছিলেন সেটা ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। এতসব কাণ্ডের পর সৌজন্য উপহার স্বীকার করা সম্ভব ছিল না। যে কিরঘিজকে দিয়ে উপহারটি ফেরত পাঠিয়েছিলাম, সে সব বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছিল আর কী!

আবহাওয়া দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল আকাশ। ঠান্ডাটা জাঁকিয়ে চেপে বসছিল শরীরে। তারপর দেখতে দেখতে মেঘে ছেয়ে গেল পাহাড়-চূড়া থেকে উপত্যকার নীচ পর্যন্ত, যেখানে নদী বয়ে চলেছে তার অজস্র চওড়া শাখাপ্রশাখা দিয়ে, যেন হেমন্তের এক উষর তৃণভূমি। বুলুনকুলের প্রায় পাঁচ মাইল উত্তরে গিয়ে হিমবাহের ঘোলা জলের ধারা সংকীর্ণ হয়ে হঠাৎ এসে পূর্বদিকে তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়ে গেজ-দাররা নামে এক সুদীর্ঘ গিরিখাতে গিয়ে ঢুকছে। এই গিরিখাতের প্রবেশ পথেই এক লম্বা, নিঃসঙ্গ কারাউল এর পাশ দিয়ে এলাম, সেখানে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা চারকোনা সৈন্যাবাসে ডজন খানেক চিনা সৈন্য ছিল। ‘ম্যাচলক’ বন্দুকের যুগেও এদের ভরসায় কতটা কী প্রতিরক্ষা হয়, তা অনুমান করা মুশকিল। বাকি পথ আমরা নদীর ডান ধার ধরে এগিয়ে গেলাম। গিরিসংকটটি এখানে খুবই সংকীর্ণ। আর হাঁটতে হচ্ছিল ছোটো ছোটো আলগা পাথরের ওপর দিয়ে।

বিকেল সাড়ে ছ’টা নাগাদ জাঙ্গুরুক গিরিখাত ধরে এইদিনের হাঁটার সবচাইতে বিপদজনক অংশটি পার হয়েছিলাম। দু-পাশের পাহাড়-চূড়াগুলো থেকে কয়েক হাজার ফুট খাড়াই পাথরের দেওয়াল নেমে এসেছে সোজা গিরিখাতের মাঝে। সরু গিরিখাতে জমে থাকা এবড়ো-খেবড়ো পাথরের স্তূপগুলো প্রচণ্ড ধারালো। একটা পাথরের গা বেয়ে চলার রাস্তা আচমকা বাঁক নিয়েছে। মনে পড়ে যাচ্ছিল হুনজার সেই বিপদজনক জায়গা রাফিকের কথা, যেখানে একবার পা হড়কালেই সোজা স্থান হত অনেক নীচের নদীর বুকে। তুলনায় এখানে খাড়া পাথরের মাঝে বাঁকটা নিরাপদে পার হবার জন্য ফুট চারেক মতো চওড়া করে গড়ে তোলা হয়েছে। পথের এই ভয়াবহ অংশটা যখন আমরা পা টিপে টিপে পার হচ্ছিলাম, তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।

নিরাপদে এই অংশটা পার হওয়ার পরপরই খানিক সমতল জায়গা পেয়েই আমরা রাত কাটানোর জন্য তাঁবু খাটাতে শুরু করে দিলাম। এখানে বসে গুরুগম্ভীর তুষারমৌলী পর্বতমালা আর দুধারের খাদের একদম মাথায় দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়-চূড়াগুলো দেখতে দেখতে ভাবছিলাম পুবের ওধারে সম্পূর্ণ ভিন্ন অঞ্চলে আমার জন্য কী না কী অপেক্ষা করে আছে! হলুদ রঙ-এর মেঘে ঢাকা থাকায় আকাশ সামান্যই দেখা যাচ্ছে। খানিক সময়ের মধ্যেই উপত্যকার পুবদিকের সমভূমি থেকে একটা ধুলোর ঝড় ধেয়ে এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। রাতে এই উচ্চতাতে বসেও গরমও লাগছিল বেশ।

কোকসেল হিমবাহ অতিক্রম

২৫ জুলাই সকালে আগের রাতের আস্তানা থেকে খানিক দূরে গিয়ে খরস্রোতা নদীটিকে পার হয়ে ওর বামদিকে যেতে হল। জায়গাটার নাম ইলেগোরাম। দু-পাশের খাড়াই পাথরের দেওয়ালের ফুট পঁয়তাল্লিশ ফাঁকের মধ্যে দিয়ে দুরন্ত নদী বয়ে চলেছে। এই প্রবল-স্রোতা নদী পারাপার করার জন্য জলতল থেকে খানিক ওপরে ফুট ছয়েক চওড়া এক কাঠের সেতু। ফলে নদী পার হতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। সেতুর দু-পাশ রেলিং দিয়ে ঘেরা ছিল। শুধু তাই নয়, পুরো সেতুটি উজ্জ্বল হলুদ রঙ করা ছিল। চিনা ইঞ্জিনিয়ারদের দক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন। এই ব্রিজ না থাকলে মানুষ বা পশু কারও পক্ষেই এখানে নদী পারাপার করা সম্ভব হত না। মাইল তিনেক গিয়ে আবার একইরকম একটা সেতু পার হয়ে নদীর ডানদিকে যেতে হয়েছিল আমাদের। ফের খানিক এগিয়ে দক্ষিণদিকের এক হিমবাহ থেকে নেমে আসা অন্য একটি জলের ধারার ওপরে অনুরূপ একটি সেতু ছিল। কিন্তু সেতুটা ইতিমধ্যে নদীর জলের তোড়ে ভেসে না গেলে আমরা নদীর বাম তীর ধরেই স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যেতে পারতাম। ওইখানে নদীর যা ভয়াল রূপ, তাতে নদী পার হওয়া অসম্ভব ছিল। ফলে আমাদের তিন মাইল মতো পথ এগিয়ে গিয়ে বিশাল কোকসেল হিমবাহের ওপর চড়তে হল। কোকসেল হিমবাহ থেকেই নদীটির জন্ম।

এই ঘুরপথটা বড়োই কঠিন ছিল কারণ পুরো উপত্যকাটি হিমবাহ-বাহিত বিশাল বিশাল প্রাচীন ‘টার্মিনাল মোরেন’-এ বোঝাই। ফলে আমাদের পাথরের ফাঁক দিয়ে চক্কর কাটতে কাটতেই এগোতে হচ্ছিল। ভীষণ ক্লান্তিকর ছিল এই যাত্রাপথ। অবশেষে হিমবাহের প্রান্তে নদীর মুখের কাছে পৌঁছে নদীতল থেকে প্রায় শ-দেড়েক ফুট উঁচুতে বরফের স্তূপের ওপর ঘোড়াগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে তুলতে হল। আমাদের ভাগ্য ভালো বলতে হবে, এখানে বরফের ওপর পুরু হয়ে কাদামাটি (glacier mud) আর ছোটো ছোটো পাথরের টুকরো বোঝাই ছিল। ফলে পা ফেলার ধাপ বানাতে অসুবিধা হয়নি। আধঘণ্টার চেষ্টায় আমরা প্রথম টাট্টুঘোড়াটাকে হিমবাহের ওপরে তুলে নিরাপদে নদীর উলটোদিকে নামাতে পেরেছিলাম। পরে জরিপে এই সুবিশাল পর্বতের শীর্ষদেশের সঙ্গে কোকসেল বা সারগুলুক গিরিশৃঙ্গের (উচ্চতা ২৩,৪৭০ ফুট) অবস্থান মিলে গেছিল। মুজতাঘ আতার উত্তরে যে সুবিশাল পর্বতশ্রেণি, তার পেছন দিক থেকে এই বিরাট শৃঙ্গ তার মাথাকাটা শঙ্কু আকৃতির চূড়াকে কাশগর থেকেও দেখা যায়।

চক্কর কাটতে কাটতে এগোতে হচ্ছিল বলে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছিল। ছোট্ট কারাউলে আমাদের মালপত্রগুলো যখন পৌঁছতে শুরু করল, তখন বিকেল হয়ে গেছে। এখান থেকেই গেজ উপত্যকার শুরু। ক্লান্ত ঘোড়াগুলো বদলে এখান থেকেই নতুন টাট্টুঘোড়া নেওয়ার কথা। কিন্তু ওখানকার লোকেরা জানিয়েছিল যে পশুর দল এখনও চারণভূমি থেকে ফেরেনি। কী আর করা! ওখানেই নদীর ধারের অসাধারণ সুন্দর ছোটো ছোটো নুড়িভরা এলাকায় আমরা তাঁবু খাটালাম।

সন্ধেবেলা প্রবল ধুলোর ঝড় শুরু হল। ধুলোয় ঢেকে গেল চারদিক। জায়গাটার উচ্চতা ছিল আট হাজার ফুট। তবুও খুব গরম লাগছিল।

২৬ জুলাই ঘুম থেকে উঠে শুনলাম, যে-পশুর দলের আসার কথা ছিল তারা আসেনি। শুধু তাই নয়, বুলুনকুল থেকে আসা লোকগুলো আমার মালপত্র ফেলে রেখে পশুর দল নিয়ে পালিয়ে গেছে, আর কারাকুল থেকে চিনা ডাক নিয়ে এগোনো কিরঘিজ লোকগুলোও কোন অজানা কারণে উধাও হয়ে গেছে।

এরকম নির্জন জায়গায় আমাদের যে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটকে পড়তে হবে, এ-কথা ভাবিনি। ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় ছিল না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বালি আর পাথর পাল্লা দিয়ে গরম বেড়ে উঠছিল। সাতিপ আলদি নামের এক কিরঘিজকে আমি কারাকুল থেকে দলে নিয়েছিলাম। কোনো উপায় না থাকায় কোকসেল উপত্যকার খানিক উঁচু অংশে গিয়ে চারণদারদের সঙ্গে কথা বলে পশুর দলের ব্যবস্থা করার জন্য ওকেই পাঠালাম। যদিও জানতাম, ও কোনোভাবেই আগামীকাল সকালের আগে কোনো ব্যবস্থা করতে পারবে না। দুপুর দুটো নাগাদ দূর থেকে একদল ব্যবসায়ীকে চারটে টাট্টুঘোড়ার সঙ্গে এগিয়ে আসতে দেখে খানিক স্বস্তি এল। কারাকুল ছাড়ার পর এই প্রথম কোনো ভ্রমণকারীর দেখা পেলাম। ওদের টাট্টুঘোড়ার পিঠে আমাদের মালপত্রগুলো চাপিয়ে এর পরের সামরিক ঘাঁটি কৌরুক-কুরঘানে পৌঁছে দিতে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওদের রাজি করালাম।

ঘোড়ার পিঠ থেকে ওদের মালপত্র নামিয়ে আমাদের মালপত্র চাপিয়ে হাঁটা শুরু করেছিলাম আমরা। অনেকটাই বেশি মালপত্র চাপাতে হয়েছিল। কিন্তু হাঁটার পথটা ছিল খুব ভালো। প্রায় দশ মাইল রাস্তা ধীরে ধীরে নেমে চলা। উপত্যকা যতই চওড়া হতে শুরু করল, ততই দৃশ্য মনোরম হচ্ছিল। আমরা কোক-মৈনাকের নদীর ডানদিকে আসার পর প্রথমবার এই অঞ্চলের চাষজমির দেখা পেলাম। কৌরুক-কুরঘানে যে অভ্যর্থনা পেয়েছিলাম তাতে মন ভরে গেছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত এই অঞ্চলে পেয়ে আসা ব্যবহারের ঠিক উলটো। কয়েকজন কিরঘিজ বৃদ্ধ রঙচঙে সুন্দর কোট পরে আমাদের স্বাগত জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন। আমাদের আগামী দু-দিনের যাত্রাপথের জন্য সঙ্গে সঙ্গে পশুদলের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আগামী যাত্রাপথ খুব একটা সহজ নয় বলে কয়েকজন পুরুষকে সঙ্গে যাবার হুকুম দিয়েছিলেন। সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত টাট্টুঘোড়া নিতেও বলেছিলেন।

কৌরুক-কুরঘান, গেজের চাইতে অনেক ঠান্ডা। সন্ধেবেলা হালকা বৃষ্টিতে মাটি ভিজে যাবার পর একটা সুন্দর গন্ধ ভেসে উঠেছিল গুল্মে ভরা আমার তাঁবুর চারপাশ থেকে। মন আর শরীর দুটোই চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল।

নয়টি গিরিপথে

কৌরুক-কুরগান থেকে সমভূমির নীচের দিকে যাবার পথ অন্য সময়ে নদীর ধার ধরে হলেও গরমকালের এই সময় বন্যার কারণে সে-পথ চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়। তখন পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরে ঘুরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এই পথ টোকুজ-দাওয়ান নামে পরিচিত। যার অর্থ ‘নয় গিরিপথ’। এই গিরিপথের প্রথমটি এল বেশ কয়েক মাইল খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে চলার পর। পাহাড়ের গায়ে অজস্র ঝোপঝাড় আমাকে সিন্ধুনদের পূর্ব দিকের বুনের আর হাজারার দৃশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছিল। গিরিপথের মাথায় পৌঁছানোর পর আমার জন্য এক মিঠে চমক অপেক্ষায় ছিল। অদ্ভুতভাবে পথটি গিয়ে পড়েছে গাছে ছাওয়া ওট খেতে ভরা খোলা মাঠের মধ্যে। জায়গাটির উচ্চতা ন’হাজার ফুটের ওপর। কৌরুক-বেল নামের জায়গাটিকে গেজের রুক্ষ পাথরের সাম্রাজ্যের মাঝে মরূদ্যান মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এটি এই অঞ্চলের একটা আরামদায়ক ‘হিল স্টেশন’ হতে পারে। কয়েক মাইল পথ ধীরে ধীরে নামতে নামতে একটা বাঁক নিয়ে উপত্যকার উত্তর-পূর্বদিকে মোড় নিয়েছিলাম।

আশেপাশের দৃশ্য আমূল বদলে গেছিল। গিরিখাতের পাথরভরা বুক থেকে সবুজের ছোঁয়া হারিয়ে গেছে। গিরিখাতের দু-পাশের খাড়া পাথরগুলোর রঙ ধূসর-লালচে। পাথরগুলো চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষয়ে ক্ষয়ে অসাধারণ সব আকার পেয়েছে। বৃষ্টি, জমে ওঠা বরফ ধীরে ধীরে গলে যাওয়ার কারণে আমাদের চলার পথও বৈচিত্র্যময় ছিল। প্রায়শই আমাদের নীচের দিক ক্ষয়ে থাকা ঝুলন্ত পাথরের ওপর দিয়ে চলতে হচ্ছিল। একজায়গায় এসে পথ থমকে দাঁড়াল একটা খাড়া পাথরের তলায়। একটা সরু সুতোর মতো জলধারা থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ে পাথরের পায়ের কাছে বালির মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আট থেকে দশ ফুট উঁচু এই পাথর না চড়তে পারলে কোনোভাবেই আর এগোনো সম্ভব ছিল না। এই বিশাল পাথরের নীচের অংশটা এত খাড়া ছিল যে মালপত্রসহ টাট্টুঘোড়াকে টেনে তোলা অসম্ভব ছিল। কাজেই ঘোড়ার পিঠ থেকে মালপত্র নামিয়ে সেগুলো সঙ্গের লোকজনেরা পিঠে করে তুলেছিল পাথরের মাথায়। এই পাথরের ওপর ঘোড়াগুলোকে টেনে তোলা অসম্ভব বুঝে দলের লোকজনরা খানিক দূরের কতগুলো পাথরের খোঁচ খুঁজে বের করেছিল, যেগুলো মারাত্মক বিপদজনক ও খাড়া হলেও পাথরের উচ্চতাগুলো কম হওয়ায় পাহাড়ি টাট্টুঘোড়াগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে কোনোক্রমে ওপরে তোলা গেছিল।

অনেক কসরতের পর আমরা কোনো অঘটন ছাড়াই পৌঁছতে পেরেছিলাম দ্বিতীয় গিরিপথের শীর্ষে। ওখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বহু দূরের বরফ-ঢাকা শৃঙ্গগুলো দেখা যাচ্ছিল। প্রায় সাড়ে দশ হাজার ফুট উচ্চতার খুশ-কিশ্লাক উপত্যকার উচ্চতম বিন্দু। রুক্ষ, শুকনো বালি-পাথরের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে প্রায় মাইল তিনেক যাবার পর আমরা একটা ঝরনা পেলাম। পরিষ্কার জল। সারাবছর জল থাকে এই ঝোরায়। গরমে দীর্ঘ পথ পার হয়ে এসে সবাই এখানে খানিক বিশ্রাম পেল। টাট্টুঘোড়াসুদ্ধু আমরা সবাই হাঁফ ছেড়েছিলাম পানীয় জলের ছোঁয়া পেয়ে।

তাশমালিক মরূদ্যানে

২৮ জুলাই হেঁটে আমরা গেজ গিরিসংকটের শুরুতে অবস্থিত তাশমালিকের বিশাল মরূদ্যানে পৌঁছলাম। খুব সকালে হাঁটা শুরু করে আমরা একদিনে দু-দিনের রাস্তা পার হয়েছিলাম। ভোরবেলার খানিক সময়ের জোরালো হাওয়া চারপাশের গুমোট ভাব আর মেঘগুলোকে সরিয়ে দিয়েছিল। আকটিকেন-বেল গিরিপথের মাথায় পৌঁছে আশেপাশের দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলাম। স্বর্গ বোধহয় একেই বলে! সুদূর পশ্চিমে মুজতাঘ-আতা আর গেজ-দার্রার বরফ-শৃঙ্গের মধ্যের আকাশ জুড়ে একের পর এক পাহাড়-চূড়া। এর মধ্যে সরগুলুকের চকচকে শঙ্কু আকারের চূড়াকে তার আকৃতির জন্য স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল। পুবে ইয়াঙ্গি-হিসার, ওপাল এবং তাশমালিক সমভূমির সেচের আয়ত্তে আসা সবুজে ছাওয়া চাষের খেত কার্পেটের মতো বিছিয়ে। সব ছাড়িয়ে দিগন্তের হালকা হলদে আভা বুঝিয়ে দিচ্ছিল মরুভূমির খুব কাছে পৌঁছে গেছি আমরা। যদিও সে-সময় আমাদের সামনে ছিল নানা রঙে রাঙানো পাথুরে সাম্রাজ্যের গোলকধাঁধা। নীলাভ-ধূসর থেকে টেরাকোটা। প্রখর সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল বর্ণালীর সব ক’টি রঙ। এই দৃশ্য আমার স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে তালান্তিক, সারভাই-বেল এবং টোপালু-বেল গিরিপথ একের পর পার হবার সময়ও প্রকৃতির এই শোভা নানাভাবে আমাদের চোখের সামনে বিরাজমান ছিল। এই গিরিপথগুলো মোটের ওপর ছিল সমতল আর যাত্রাপথও ছিল মসৃণ। ধীরে ধীরে নামতে নামতে আমরা অবশেষে পৌঁছলাম কিজিল জিলগায়। কিজিল জিলগা যার অর্থ ‘লাল-উপত্যকা’। সার্থক নামকরণ। চতুর্দিক ঘিরে লালচে-বাদামি পাহাড়।

একটা শুকিয়ে যাওয়া নালার ওপর দিয়ে প্রায় ছয় মাইল পথ হেঁটে আবার পৌঁছলাম গেজ নদীর ধারে। প্রায় মাইল খানেক চওড়া গেজ নদী এখানে অজস্র ধারায় ভাগ হয়ে দুরন্ত গতিতে বয়ে চলেছে।

নদীর ধার ধরে মাত্র মাইল দেড়েক অংশ যাকে খানিক রাস্তা বলা যায়। তারপর নদীর স্রোতে ভেসে এসে জড়ো হওয়া নুড়ি-পাথরের স্তূপের ওপর দিয়ে আমাদের এগোতে হচ্ছিল। আলগা তীক্ষ্ণ পাথরের ওপর দিয়ে চলা ভীষণ কঠিন, মানুষ-পশু সবার কাছেই। গরমটাও ছিল অস্বস্তিকর। ছায়াতেও থার্মোমিটারে তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল ৮৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট। গিরিখাতের শেষ প্রান্ত থেকে যে-রাস্তাটা সামনের দিকে এগিয়েছিল, সেটা ছিল খুব খাড়াই। ৩০ ডিগ্রিরও বেশি চড়াই। এখানে পশুদের মালপত্রের বোঝা ছাড়াই উঠতে কষ্ট হয়। আর আমাদের সঙ্গের ঘোড়াগুলোর পিঠ তো মালপত্রে বোঝাই। শাগিলদিক দাওয়ান গিরিপথের শীর্ষে উঠে আমরা আবার নীচের দিকে নামতে নামতে পৌঁছেছিলাম মূল উপত্যকায়। কিন্তু উপত্যকায় পৌঁছেই টের পেয়েছিলাম সে-পথ কম ভয়াবহ নয়। বড়ো বড়ো পাথরে ভরতি উপত্যকার তলদেশ। আশা ছিল এই পথ হয়তো সমতল হবে। আমি সময় নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। পাথরের মাঝ দিয়ে চক্কর কাটতে কাটতে অনেক সময় চলে যাচ্ছিল। কারাকুল থেকে সঙ্গে আসা টাট্টুঘোড়াগুলো দীর্ঘ ক্লান্তিকর দুর্গম যাত্রার পর একের পর এক ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল।

কৌরুক-কুরঘানের মানুষ ও তাদের দেওয়া গাইডের অভিজ্ঞতার তুলনা নেই। ওরাই সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত টাট্টুঘোড়া নিয়ে এসেছিল। সেই অতিরিক্ত ঘোড়াগুলোর পিঠে ক্লান্ত ঘোড়াগুলোর মালপত্র সরানোর পর আমরা এগোতে পেরেছিলাম। সামনেই ছিল ইয়ামালা বা কেপেক গিরিপথ। এই গিরিপথের শীর্ষে পৌঁছতে আমাদের দু-হাজার ফুটেরও বেশি চড়াই ভাঙতে হয়েছিল। গিরিপথের মাথায় পৌঁছে আমি দলের অনেক আগে চলতে শুরু করলাম। কারণ, আলো থাকতে থাকতে তাশমালিকে পৌঁছে আশপাশটা একটু বুঝে নিতে চাইছিলাম।

সন্ধে সাড়ে ছ’টা নাগাদ যেখানে পৌঁছলাম, সেটা সমতল হলেও পাথরে ভরা। খানিক নদীর পাড় ধরে হেঁটে একটা খালের পাশ দিয়ে খানিক এগোতেই পৌঁছে গেলাম বিস্তৃত এক চাষজমিতে। যেদিকে চোখ যাচ্ছিল সেদিকেই দেখি সবুজ চাষজমি। ফসলে বোঝাই। হিমবাহ থেকে নেমে আসা জল নালা কেটে জমিতে সেচের কাজ হয়েছে, জমির উর্বরতা বাড়ানো হয়েছে। তখনও অনেক লোক কাজ করছিল জমিতে। দিনের পর দিন পাথরের মরুভূমি পার হয়ে এসে জীবনের সতেজ চিহ্ন দেখে মনটা ভরে গেল।

যখন তাশমালিকের প্রথম বাড়িটার কাছে পৌঁছলাম তখন আলো পড়ে এসেছে। মাটির দেওয়াল দেওয়া বাড়ির উঠোনজোড়া বাগান নিভু নিভু আলোতে দারুণ সুন্দর লাগছিল। গ্রামের রাস্তার দু-ধারে উইলো আর পপলার গাছের সারি। আমি বেগের বাড়ির খোঁজ করছিলাম। একেই আগে খবর পাঠিয়েছিলাম যাতে আমাদের জন্য নতুন টাট্টুঘোড়ার দলের ব্যবস্থা করে রাখে। গাধার পিঠে চেপে একজন বয়স্ক ‘দিহকান’ (চাষি) যাচ্ছিল। তাকে বেগের কথা জিজ্ঞেস করতে সানন্দে আমাকে বেগের বাড়ি নিয়ে চলল। একের পর এক বাড়ি আর বাগানের পার হয়ে যায়, বেগের বাড়ি আর আসে না। মাইলের পর মাইল রাস্তা পার হয়ে যায়। খুব ক্লান্ত লাগলেও ধৈর্য ধরা ছাড়া আমার উপায় ছিল না। আমার মনে ছিল না যে পূর্ব তুর্কিস্তানে অনেকগুলো ছোটো ছোটো গ্রাম আর বিস্তৃত চাষের জমি নিয়ে একটা অঞ্চল হয়, আর সেই পুরো অঞ্চলের নাম একটাই হয়। বাস্তবে এটি একটা ছোটো জেলা। আর এই জেলার অধীনের সব জায়গার নাম ওই একটাই হয়।

প্রায় ঘণ্টা চোদ্দ ধরে নাগাড়ে টাট্টুঘোড়ার পিঠে চেপে আর পায়ে হেঁটে আমার তখন সঙ্গিন অবস্থা। অবশেষে বেগের বাড়ি পৌঁছে শুনলাম সে এখন এখানে নেই, কাশগরে গেছে। বুঝলাম, আমাদের ক্লান্ত ঘোড়ার দল নিয়েই এগোতে হবে। বৃদ্ধ অন্ধকারে কয়েক মাইল পথ তার নিজের গাধার পিঠে চেপে এসে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেছিল যেখানে শিবির পেতেছিল আমার লোকেরা। সব মালপত্র নিরাপদেই পৌঁছলেও সবক’টা টাট্টুঘোড়া ক্লান্তিতে ধুঁকছিল।

আমার তাঁবু খাটানো হয়েছিল সদ্য কাটা ‘বেদা’ গুল্মের ঝোপের পাশে। এই লুসার্ন বা বেদা গুল্ম মূলত পশুকে খাওয়ানো হয়। এর ঔষধিগুণও প্রচুর। সুন্দর গন্ধ এই গাছের। যখন হাত-মুখ ধুয়ে একটু পরিষ্কার হবার সুযোগ পেলাম তখন রাত দশটা বেজে গেছে। মাঝরাতে খাওয়া সেরে তাঁবুতে ঢুকে বিশ্রাম নিতে পেরেছিলাম খানিক।

২৯ জুলাই ভোর হতে না হতেই সবাই উঠে পড়েছিল। কাশগর পৌঁছানোর জন্য সবাই তখন ব্যস্ত। এখান থেকে কাশগর আর মাইল পঞ্চাশ দূরে। আমি চাইছিলাম পারলে সেইদিনই কাশগর পৌঁছে যেতে। এদিকে সমস্যা শুরু হল টাট্টুঘোড়া নিয়ে। কৌরুক-কুরঘান থেকে আসা ঘোড়ার সঙ্গের লোকেরা কাশগর যাবার জন্য রাজি হচ্ছিল না। স্বাভাবিক, কারণ তাদের আমাদের এই পর্যন্ত পৌঁছে দেবার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের সমস্যার কথা জানতে পেরে অযাচিতভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন চিনা পোস্টের ডাক বিভাগের দায়িত্বে থাকা ‘ডাকচি’ আলিয়া বেগ। ভোর ছ’টার মধ্যে তিনি বেশ কয়েকটা চাঙ্গা টাট্টুঘোড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ঘোড়ার ব্যবস্থা হয়ে যেতে আমাদের সব মালপত্র চাপানো হয়ে গেলে, আমি এগিয়ে চললাম কয়েকটা ঘোড়াকে সঙ্গে করে। আমার মন খুশিতে ভরে ছিল, কারণ, জানতাম কাশগরে আমার জন্য ছাদওয়ালা ঘর অপেক্ষা করছে।

ধূসর কুয়াশায় আকাশ ঢেকে থাকলেও পশ্চিমের উঁচু পাহাড়গুলোর আভাস হালকা টের পাওয়া যাচ্ছিল। ওই পাহাড়ের কাছেই ওপাল। আমাদের প্রাথমিক গন্তব্য বিস্তীর্ণ চাষের খেত-সমৃদ্ধ অঞ্চল, যেখানে পৌঁছতে সবার আগে পার হতে হবে গেজের এক উপনদী। এখানে ওই নদীর নাম ইয়ামানিয়ার। এই অঞ্চলের সেচের জলের প্রধান উৎস। সমতল জুড়ে অগুনতি ধারায় ছড়িয়ে এই নদী। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা নদীর জল অধিকাংশ জায়গায় চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর। এই নদী পার হবার জন্য বিশেষ সতর্কতা না থাকলেই বিপদ ঘটে যেতে পারে মুহূর্তে। নদী পার করাবার জন্য পথের নির্দিষ্ট জায়গায় আছে প্রশিক্ষিত গাইড। এরা জানে কোথায় নদীর জল কম আর কী করে নিরাপদে পার হওয়া যায়।

ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর এদের সাহায্যেই মালপত্রসহ হাঁটু-জল পার হয়ে নদী টপকে অন্য পাড়ে পৌঁছাই। তারপর সবুজ খেতের মধ্যে দিয়ে মাইলের পর মাইল এগিয়ে চলি তরতরিয়ে। একটি ছোটো চিনা সেনা আবাসের কাছে পৌঁছে আমার ডাকের টাট্টুঘোড়া পালটাতে হয়েছিল। কিন্তু এখানে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেল ডাকবাহকদের নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটিতে। কারা আমাকে নিয়ে কাশগর যাবে এই নিয়ে চলছিল ঝগড়া। খানিক পর দেখলাম আমার মালপত্র চারটে ভাগে ভাগ করে, চারটে টাট্টুঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে একজন করে ঘোড়সওয়ার তার ওপর চেপে বসেছে। আমার মনে হয়েছিল ব্যবস্থাটা ভালোই, ফলে আমি কোনো আপত্তি করিনি। এতে লাভই হয়েছিল, কাশগর পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত আর বিশেষ কোথাও থামতে হয়নি।

ওপাল মরূদ্যানে

ওপাল হল অনেকগুলো গ্রাম নিয়ে একটি সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চল। বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, চাষের খেত আর ফলের বাগানের মধ্যে ছোটো ছোটো গ্রাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। পথের দু-পাশে সার দেওয়া পপলার আর উইলো গাছের সারি। সবুজে ছাওয়া চারদিক। পেছনে ফেলে আসা নির্জন রুক্ষ-শুষ্ক বরফ, বালি-পাথরের ঠিক বিপরীত। মনমাতানো দৃশ্য। জমিতে তরমুজ পেকেছে। বাড়ির সামনের বাগানগুলো ভরে আছে নানা সবজিতে। ছোটো ছোটো নালা দিয়ে লালচে পলিসহ জল পৌঁছচ্ছে চাষের খেতের প্রতিটি কোনায়। পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনার ছাপ চারদিকে। রাস্তার ধারের দোকান থেকে কয়েকটা আপেল আর খানিক খেজুর কিনেছিলাম। একজায়গায় দাঁড়িয়ে ওগুলো দিয়ে জলখাবার সারলাম। বেশ কয়েকমাস পর ফলের আস্বাদ…।

আরও ঘণ্টা দেড়েক পরে আমরা ওপালের শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম। ওপালের উর্বর মরূদ্যান ছেড়ে পূর্বদিকে মোড় নিয়ে শুরু হয়েছিল তুর্কিস্তান মরুভূমির ঊষর পথে যাত্রা। বরফের রাজ্য ছেড়ে বালির সাম্রাজ্যে। জনশূন্য গিরিখাত ছোটো ছোটো তামারিস্ক ও ওই জাতীয় গুল্মে ভরা। ভরদুপুরেও এমন কিছু গরম লাগছিল না বলে অবাক হচ্ছিলাম। তাপমাত্রা ৯৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট। পুবদিক থেকে বয়ে আসা হাওয়া শরীরের ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছিল। কিন্তু সূর্যের আলো এত জ্বলজ্বল করছিল যে রোদচশমা না পরে থাকতে পারিনি। একের পর এক বালির টিলা আসা শুরু হতেই আমার সঙ্গের টাট্টুঘোড়াওয়ালারা এক অদ্ভুত সুরে সবাই মিলে গান গাইতে শুরু করল। ওই নির্জন বালির রাজ্যে ওই গানের সুর যেন এক আনন্দময় প্রাণের সঞ্চার করল।

বিকেল তিনটে নাগাদ মরুভূমির রাস্তা ছেড়ে টোকুজাক মরূদ্যানে পৌঁছলাম। সাইবাগ নামের একটি জায়গায় রাস্তার ধারের ছোট্ট সরাইখানার পাশে পপলার গাছের একটি বনের পাশে টাট্টুঘোড়া আর টাট্টুঘোড়ার গাড়ি রেখে বেশ কিছু পর্যটক বিশ্রাম নিচ্ছিল। সরাইখানায় দেখলাম স্তূপীকৃত তরমুজ আর জালাভরতি জল।

খানিক আগে পেছনে ফেলে আসা পথের দৃশ্য আমার মন জুড়ে ছিল। একের পর এক সবুজে মেখে থাকা ছোটো ছোটো গ্রাম। রাস্তার দু-পাশে সার দেওয়া পপলার, মালবেরি, অ্যাপ্রিকট আর নানা ফলের গাছ। বাদামি মাটির দেওয়াল দেওয়া বাড়ির নিকোনো উঠোন জুড়ে সবজি আর ফলের বাগান। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোদে পোড়া ইটের সমাধিসৌধ, ভাঙা মসজিদ—এক-একটি নির্ভেজাল গ্রাম। মাঝে-মাঝেই গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে আমার ঘোড়াওয়ালারা যখন এগোচ্ছিল, বাড়ি থেকে শিশু আর মহিলারা বেরিয়ে এসে বাড়ির দরজায় দাঁড়াচ্ছিল। প্রাপ্তবয়স্ক কোনো লোককেই টোকুজাকের এই সরাইখানা তথা বাজারের আগে পর্যন্ত বসে থাকতে দেখিনি। যে কয়েকজনকে দেখেছি তারাও সবাই চাষের জমির কাজে ব্যস্ত ছিল।

এখনও পর্যন্ত রাস্তায় সেরকম কোনো ধুলো না পেলেও এবার সেটা নজরে আসছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা যে-পথ দিয়ে এসেছি সেগুলো ছিল গ্রামের পথ। কিন্তু এখন এসে পৌঁছেছি হাই-রোডে। রাস্তা এখানে যথেষ্ট চওড়া। টাট্টুঘোড়া আর গাধায় টানা উঁচু আর ভারী ঠেলাগাড়ি ‘আরাবাস’ থেকে ওঠা ধুলো মেঘের মতো ঢেকে রেখেছিল চারধার। আমি তাড়াতাড়ি কাশগর পৌঁছতে চাইছিলাম।

বিকেল পাঁচটার সময় সাদাক আখুন আমাকে বলেছিল যে কাশগর আর খুব বেশি দূর নয়।

কাশগর সন্নিকটে

আমি জানতাম কাশগর পৌঁছতে একটা নদী পেরোতে হয়। কিন্তু ঘণ্টা খানেক ঘোড়া ছোটানোর পরেও কোনো নদীর দেখা না পাওয়ায় খানিক হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। খানিক এগিয়ে রাস্তার এক বাঁক পার হতে একটা নদী এসেছিল। সামান্য জল ছিল তাতে। কিন্তু কোনো বড়ো দেওয়াল বা মিনার নজরে না আসাতে বুঝেছিলাম এটা সেই নদী নয়, যা শহরের পাশ দিয়ে গেছে। এটা ছিল অন্য একটা নদী, আক-সু (শ্বেত নদী)। কাশগরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীরই একটা শাখা। এই নদীকে তেলউইচুকও বলে। দু-পাশে ধানের খেত।

পড়ন্ত আলোয় আর ছুটতে না চাওয়া বে-দম হয়ে যাওয়া টাট্টুঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হয়ে আরও মাইল তিনেক যাবার পর এসেছিল কিজিল-সু (লোহিত নদী) যার প্রতীক্ষায় ছিলাম এতক্ষণ। সত্যিকারের লালচে জলের ধারা পার হয়ে কাশগর শহরে প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে গলির মধ্যে মহিলারা অদ্ভুত উঁচু গড়নের টুপি পরে দল বেঁধে আড্ডায় মশগুল।

মূল শহরের বিশাল উঁচু মাটির পাঁচিল যখন দেখা দিল তখন রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। এই পাঁচিল আমাকে ভ্রমণ-সংক্রান্ত নানা বইতে দেখা মধ্যযুগীয় পুরোনো দুর্গের ছবি আর যুদ্ধের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। পাঁচিলের বাইরে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। নিস্তব্ধ চারদিক। শহরে প্রবেশের দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে। সাদাক আখুন আমাকে নিয়ে পাঁচিলের ধার ঘেঁষে বাঁদিকে পপলার গাছে ছাওয়া একটা রাস্তা দিয়ে টিমটিমে আলো জ্বলতে থাকা একটা বাড়ির গেটের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। ওটাই মিঃ ম্যাকার্টনির বাড়ি, আমার আগামী কয়েকদিনের আস্তানা। অনেক রাত হলেও আমার পৌঁছানোটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। আমি দরজা খুলে চওড়া পাথর বিছানো রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে যেতেই মিঃ এবং মিসেস ম্যাকার্টনি আমাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন। নিয়ে গিয়ে তুলেছিলেন ওঁদের দারুণভাবে সাজানো অতিথিশালায়। পরিষ্কার হয়ে পোশাক পালটে ডাইনিং রুমে পৌঁছোলাম। সেখানে ছোটো ছোটো সুপরিচিত আরামের উপকরণগুলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এশিয়ার গভীরে নয়, ইংল্যান্ডের কোনো গৃহস্থবাড়িতে আছি যেন।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%