দ্বাবিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

নিয়া ও ইমাম জাফর সাদিকের পথে

কয়েকদিন ধরে মেঘলা আকাশ দেখার পর ১৮ জানুয়ারি কেরিয়া থেকে রওনা দেবার সময় রোদ ঝলমলে দিন দিয়ে শুরুটা ভালোই হয়েছিল। শুধু বিশ্রাম নেবার চক্করে রওনা হতে দেরি হয়ে গেল। দেরির ফলে পুরোনো কেরিয়ার অর্ধেক লোক আমাদের ক্যারাভানের শহর ছেড়ে যাবার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছিল। লম্বা গাছের ডাল, বাড়ির ছাদ—যে যেখানে পেরেছিল উঠে বসেছিল। আমাকে বিদায় জানাতে কেরিয়া আর নিয়ার পেটমোটা আমুদে বেগের দল এসেছিল। সিকি মাইল চওড়া শুকনো নদী পেরিয়ে বেশ-তোঘরাক এবং ঘাড়ঘং গ্রাম ছাড়িয়ে মাইল দু-এক যাবার পর আবার পৌঁছেছিলাম মরুভূমির উপকণ্ঠে। সেখান থেকে বালি আর নুড়ির ওপর দিয়ে দক্ষিণদিকে হাঁটতে হাঁটতে উপস্থিত হলাম সটান উঠে যাওয়া এক পাহাড়ের পাঁচিলের নীচে। এটি পোলুর পূর্বে কুয়েন-লুন পর্বতমালার বাইরের অংশ। এই পাহাড় সর্বক্ষণ কুয়াশার মোড়কে ঢেকে থাকার ফলে সাধারণত প্রাচীন লোপ-নর এলাকার ভ্রমণকারীদের চোখের আড়ালে থাকে আর শুধুমাত্র ক্যাথে বা চীনেই আবদ্ধ থেকে যায়। সবে হওয়া তুষারপাতে এই বাইরের অংশ সাদা বরফের চাদরে ঢেকে যাওয়াতে তাদের আরো ভাবগম্ভীর দেখাচ্ছিল। পোলু ছাড়িয়ে ওপরের আর পেছনের ২১,০০০ ফুটের তুষারাবৃত চূড়াগুলো দূর থেকে হালকা চকচক করছিল।

তারপর অনায়াস পথ বেয়ে পৌঁছেছিলাম উই-তোঘরাক নামের এক মরূদ্যানে। গাছের নীচের ছায়ায় জমে আছে বরফ। সারাদিন সূচ ফোটানো ঠান্ডায় কাটিয়ে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে আমার জন্য তৈরি করা আস্তানায় ঢুকে অবাক হয়ে গেছিলাম। মাটির দেওয়াল হলেও ঘরের ভেতরটা রঙিন পুরু খোটানি কার্পেটে মোড়া। শীত মোকাবিলা করার জন্য একেবারে আদর্শ। সন্ধেবেলা থেকে আকাশ মেঘে ঢেকে যাওয়ায় তারা দেখে আর অক্ষাংশ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

ইয়েসইয়ুলঘুন ও ওভরাজ

১৯ জানুয়ারি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি তুমুল তুষারপাত চলছে। গাছপালা-সহ সব বরফে ঢেকে যাওয়ায় একদম ইউরোপের মতো দেখতে লাগছিল। আটটার সময় তাপমাত্রা মেপে দেখি ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। যদিও আমাদের ক্যারাভান রওনা হবার সময় বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গেছিল, কিন্তু সারাটা দিন আশপাশ মেঘে ঢেকে ছিল। নুড়িভরা মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে বাঁদিকে উত্তরের দিকে চলে যাওয়া বিশাল বিশাল বালি পাহাড়ের ঢাল হালকাভাবে হলেও বোঝা যাচ্ছিল।

প্রায় ষোলো মাইল মতো হেঁটে একটা চওড়া শুকনো নদীখাত পার হয়ে ইয়েসইয়ুলঘুন নামের এক ছোট্ট মরূদ্যানে পৌঁছলাম। এখানে নিয়া আর সুরঘাকে সোনা খুঁজতে আসা ভ্রমণকারীদের অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে ডজন খানেক মাটির ঘর আছে। কিন্তু গ্রীষ্মে চাষবাস করে যা সামান্য ফসল ওঠে, তা দিয়ে এখানকার বাসিন্দাদের নিজেদের খাবার জুটিয়ে অতিথি সামলানো সম্ভব হয় না, তাই ভ্রমণকারীদের নিজের রেশন সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হয়।

গ্রামের লোকেরা জল সংগ্রহ করে এক গভীর কুয়ো থেকে। একটি মাত্র কুয়ো থেকে জল পাওয়ার জন্য গ্রামের গঠন বদলে গিয়েছে। সাধারণত তুর্কিস্তানের গ্রামের বাড়িগুলো মাঠ বা বাগানের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু ইয়েসইয়ুলঘুনের বাড়িগুলো কুয়োকে ঘিরে গোল হয়ে গড়ে উঠেছে। আর তাকে ঘিরে গোল করে লাগানো প্রাচীন পপলার গাছের সার জায়গাটাকে একটা ছবির মতো চেহারা দিয়েছে।

রাতে মেঘ পরিষ্কার হয়ে গেলেও সকালে তাপমাত্রা ছিল -১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১৮ সেলসিয়াস)। দক্ষিণদিকের পাহাড়গুলো আবার চোখে পড়ছিল। সামনেই সুরঘাকের স্বর্ণ উপত্যকা। এগারো মাইল নুড়ি-পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে পৌঁছেছিলাম ওভরাজ লঙ্গর-এ। এখানে এক ‘লঙ্গরচি’ কয়েকটা মাটির ঘর নিয়ে ভাড়া খাটায়। এখানে থাকার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু পথপ্রদর্শক দারোগার কথা মেনে নিতে হয়েছিল। নিয়া এখান থেকে আরও চব্বিশ মাইল পথ, যা উটগুলো একদিনে পার হতে পারবে না। আর এই দূরত্বের মাঝে জল বা থাকার জায়গা নেই। উই-তোঘরাক থেকে আমরা সঙ্গে করে বরফ নিয়ে এসেছিলাম, কাজেই জলের সমস্যা ওভরাজ লঙ্গরে হয়নি। কিন্তু মাটির ঘরগুলো ছিল খুবই নীচু, ফায়ার-প্লেস থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, তবুও তাঁবুর বদলে এই আবদ্ধ ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল পুবদিক থেকে প্রবল গতিতে হাওয়া বওয়ায়।

পরদিন সকালে ওভরাজ লঙ্গর থেকে যাত্রা শুরুর আগেই আমার জন্য একগুচ্ছ চিঠিপত্র আর টাট্টুঘোড়া নিয়ে এসে পৌঁছল নিয়াজ আখুন। আমার বাড়ির চিঠিগুলো এসেছিল ফারঘনা, কাশগর হয়ে চিনা পোস্টের মাধ্যমে। তার মধ্যে একটা ছিল ভাইয়ের পাঠানো চিঠি, ৭ ডিসেম্বর তারিখের। অন্য চিঠিগুলো এসেছিল গিলগিট হয়ে। সবচাইতে শেষের তারিখ ছিল অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। অস্বীকার করার উপায় নেই, ট্রান্স-কাস্পিয়ান রেলের সুবাদে ইউরোপের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দূরত্ব অনেক কমে গেছে। যদিও আমার মনে হয়েছে যে ভারতীয় পোস্ট অফিস থেকে হুনজা হয়ে আসা ডাকব্যবস্থা অনেক নিরাপদ।
ওভরাজ লঙ্গর থেকে পুরো চব্বিশ মাইল পথ আমাদের যেতে হয়েছিল পাথরভরা ঢাল বেয়ে। পাহাড়ের দক্ষিণ অংশ থেকে বৃষ্টির জলের তোড়ে নেমে আসা পাথর স্তূপ হয়ে জমে রয়েছে। সঙ্গে মরুভূমি থেকে উড়ে আসা বালিতে ইতিউতি গড়ে উঠেছে বালি-পাহাড়। নিয়া মরূদ্যানের কাছাকাছি পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত সবুজের চিহ্নমাত্র চোখে পড়ল না। তামারিস্ক আর কুমুশ ঝাড়ের দেখা পেতে বুঝে গেছিলাম গন্তব্য এসে গেছে। অনেকগুলো ছোটো ছোটো গ্রাম নিয়ে নিয়া মরূদ্যান। সুরঘাক উপত্যকা থেকে বেরিয়ে আসা নদীর ধারে ধারে গড়ে উঠেছে গ্রামগুলো। ওপরের দিকে এই নদীই আবারুলুঘ সাই উপত্যকার ‘দরিয়া’ নামে পরিচিত।

বিকেল তিনটের পর কাং-সারিঘের কৃষিক্ষেত্রের পাশে পৌঁছই। সেখান থেকে আরও দু-এক মাইল চলার পর নিয়ার বাজারে পৌঁছলে স্থানীয় বেগের সহকারী আমাকে স্বাগত জানাল। বাজারের কাছে এই ব্যবসায়ীর বাড়িতে আমার জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দিনটি ছিল নিয়ার সাপ্তাহিক বাজারের। অন্ধকার ঘনিয়ে এলেও বাজারের সরু গলিতে ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত ছিল শুকনো ফল, কিশমিশ, চা, মশলা নিয়ে। বাজার ভর্তি ছিল স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন চমৎকার আখরোট আর তাজা লালচে আঙুরে। রমজান মাসের শেষে সমাগত ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সরগরম পুরো চত্বর।

আমার সঙ্গের লোকেরা রমজান পালন না করলেও ঈদ ভালোভাবে উপভোগ করতে চেয়ে ২২ জানুয়ারি এখানে থেকে বাড়ি যেতে চেয়েছিল, আমি ওদের অনুরোধ ফেলতে পারিনি। এতদিন মরুভূমিতে কাটানোর পর আবার একটা মরুযাত্রার আগে এটা ওদের প্রাপ্য। তাছাড়া মরুভূমিতে ঢোকার আগে আগে শ্রমিক-সহ খাবারদাবারও জোগাড় করতে হবে। উৎসবের আমেজে মেতে থাকা নিয়ার মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর আমার ঘর থেকে ভালোভাবে শোনা যাচ্ছিল। আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম, ভারত ও বাড়িতে পাঠানোর জন্য চিঠি লেখার পাশাপাশি দিনটা স্থানীয় মানুষদের ছবি তুলে কাটাব। বাচ্চা থেকে বুড়ো, ছবির বিষয়বস্তুর অভাব ছিল না। খানিক মিষ্টি হাতে তুলে দিতেই সুন্দর পোশাক পরা বাচ্চারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সুঠাম চেহারার পুরুষ কিংবা রঙবেরঙের তাপ্পি মারা জোব্বা পরা ভিখিরি— কেউই ক্যামেরার সামনে থেকে সরে দাঁড়ায়নি। স্থানীয়দের চেহারা খোটান-বাসীদের মতোই ককেশিয় আদলের।

নিয়া একটি প্রাচীন জনপদ। হিউয়েন-সাঙ লোপ-নর হ্রদ হয়ে চিনের পথে যাওয়ার সময় এই নি-জাং শহর অর্থাৎ নিয়ার কথা উল্লেখ করেন। এই শহরটি ছিল খোটানের রাজার পূর্ব সীমানার পাহারার এক ঘাঁটি। নিয়া আগে খোটান জেলার একটা ছোটো মরূদ্যান শহর হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে কেরিয়া জেলার এক প্রশাসনিক কেন্দ্র।

একটি উজ্জ্বল আবিষ্কার

বিকেলবেলা যে ধ্বংসাবশেষের পথে চলেছি, সেখানকার বালির নীচ থেকে পাওয়া প্রায় ফুট তিনেক ব্যাসের এক মাটির পাত্রের সন্ধান পেয়েছিলাম। এখনও পর্যন্ত নিয়ায় পাওয়া একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁজ। একটু পরেই আমার কৌতূহলী তরুণ উটচালক হাসান আখুন একজনকে ধরে নিয়ে এসেছিল। ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে দুটো খোদাই করা প্রাচীন কাঠের টুকরো নিয়ে এসেছিল লোকটা। কাঠের টুকরো দুটো পরীক্ষা করেই টের পাই তাতে যে-লিপি খোদাই করা আছে তা খরোষ্ঠী। এই লিপি প্রাচীন ভারতের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে প্রচলিত ছিল, খ্রিস্টাব্দের প্রথম শতকে কুষাণ যুগে এর বহুল ব্যবহার ছিল।

খানিক পর জানতে পারি হাসান আখুন যাকে নিয়ে এসেছিল সে এগুলো ইমাম জাফর মাজারের পথ থেকে তুলে নিয়ে এলেও বালির তলা থেকে খুঁড়ে বের করেনি, করেছিল ইব্রাহিম নামের গ্রামের অন্য একজন। একবছর আগে সেই ইব্রাহিম ‘পুরোনো শহর’-এর ধ্বংসাবশেষে হানা দিয়েছিল গুপ্তধন খুঁজে পাবার আশায়। সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে খানকয়েক খোদাই করা পচা কাঠের টুকরো খুঁজে পেয়েছিল। ফেরার পথে চারটে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল আর দুটো নিয়ে এসে বাচ্চাদের খেলার জন্য দিয়েছিল। বাচ্চারা কাঠের টুকরোগুলো খেলে নষ্ট করে ফেললেও দুটো রয়ে গেছিল ইব্রাহিম যাকে আগে নিয়ে এসেছিল।

কাঠের টুকরোগুলো কিনে নিতে ইব্রাহিম এর গুরুত্ব বুঝতে না পারার জন্য হাত কামড়াচ্ছিল। আমি আবিষ্কারের উত্তেজনা চেপে রেখে ইব্রাহিমকে দলের সঙ্গে মজুরির বিনিময়ে গাইড হিসেবে যাবার জন্য প্রস্তাব দিলাম।

একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় খরোষ্ঠী লিপির ব্যবহার যে হত, তা ১৮৯২ সালে ফরাসি পর্যটক এম দুত্রেই দ্য হ্রা সংগৃহীত খোটান মুদ্রা ও বার্চ গাছের ছালে লেখার টুকরো থেকে জানা গেছিল। সন্ধেতে আলো ফিকে হয়ে যাওয়া টানা লেখায় কাঠের ওপর কী খোদাই করা আছে বোঝার চেষ্টা করেও বিন্দুমাত্র সফল হইনি।

কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দেখে আমার মনে হচ্ছিল যে আমার হাতে ধরা এই প্রাচীন নথি এক প্রাচীন ভারতীয় লিপিতে লেখা। আর আশা করছিলাম যে এই লিপিই আমাকে সামনেই আর এক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসস্তূপের সন্ধান পাইয়ে দেবে।

নিয়া নদীর পাশ দিয়ে

তিনদিন চলার পর আমরা পৌঁছলাম ইমাম জাফর সাদিক মাজারে। এখান থেকেই আবার মরুভূমি অভিযান শুরু হবে। আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে ছিল। রোদ ঝলমলে দিন হলেও বেদম ঠান্ডা। রাতের তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) আর দিনের তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ওপরে উঠছেই না।

আমাদের পথ ছিল নিয়া নদীর ধার ঘেঁষে। নদীখাত যেখানে বালির বুকে হারিয়ে গেছে, সেটাই আমাদের গন্তব্য। আর একটা ‘পুরোনো শহর’। নিয়া নদী কেরিয়া দরিয়ার মতো চওড়া হলেও গভীরতা কম। কেরিয়া নদীর মতোই অনেক ছোটো ছোটো ঝোরার জল এসে মিশেছে নিয়াতে। শহরের ঠিক বাইরে এক জলাভূমিও মিশেছে নদীতে। নদীর উচ্চ খাত থেকে সেচ খালের মাধ্যমে জল টেনে নেওয়া হয়েছে। কৃষি অঞ্চল শেষ হতে কুমুশ আর বনজ গাছপালায় ভরা এক জঙ্গল শুরু হয়েছিল। প্রতিবছর শরৎকালে বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রী ইমাম জাফরের মাজারে আসে, তাই রাস্তাটি প্রায় হাই-রোডের মতো হয়ে আছে। নদীর ধার ঘেঁষে পথ গিয়েছে। তবে নদীর বুকে জল নেই, তার বদলে জমে আছে বরফ। নদী কোনোখানেই তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ ফুটের বেশি চওড়া নয়। বরফের ফাঁক দিয়ে মেপে দেখেছি, নদী ফুট তিনেকের বেশি গভীর নয়। অন্তত পাড়ের কাছে। বরফ-গলার সময়ে জল যে প্রায়শই দু-পাড়ে উঠে আসে, তাতে সন্দেহ নেই। নদীর দু-ধারের সবুজ জঙ্গলই তার প্রমাণ। এর পরেই নিয়ার মেষপালকদের চারণভূমির শুরু। এখানে গোটা দশেক চারণভূমি আছে। মেষপালকদের পরিচালনা করে নিয়ার ব্যবসায়ীরা।

রাতের শিবির পাতা হল নিয়া বাজার থেকে উনিশ মাইল দূরের নাগারা-খানা নামের চারণভূমির মেষপালকদের থাকার কুঁড়ের কাছে এক খালের ধারে। দু-এক বছর সবে হল আম্বানের নির্দেশে এখানে নদী থেকে সেচ খাল কাটা শুরু হয়েছে। নদীবাহিত পলি বালির ওপর পুরু স্তর তৈরি করে মরুভূমিকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। বোঝা যাচ্ছিল যে এই উর্বর চারণভূমিগুলো খুব তাড়াতাড়ি চাষের খেতে পরিণত হবে।

ছয় থেকে আট ফুট চওড়া এই সেচ খালের পাশ দিয়ে চলতে চলতে ভাবছিলাম প্রশাসনিক সুচিন্তিত পরিকল্পনা সে ইউরোপেই হোক বা প্রাচ্যেই হোক, চাইলে রুক্ষ মরুতেও প্রাণের ছোঁয়া আনতে পারে। নতুন সেচ খাল যে এই নিঃসঙ্গ চারণভূমিতে নতুন জীবনের স্পন্দন আনবে তাতে সন্দেহ নেই। প্রাচীনকালে মরুর বুকে হয়তো একের পর এক জনপদ গড়ে উঠেছিল এইরকম সেচ ব্যবস্থার হাত ধরে। পরিমিত জলের ব্যবহার ও তা সঞ্চয়ের ব্যবস্থা চাষকে সুরক্ষিত করেছিল। যদিও নদীর চলার পথ পরিবর্তন ও আগ্রাসী বালির কাছে হার মানতে হয়েছিল বহু জনপদকে।

প্রাচ্য বা প্রতীচ্য যে কোনো ঘরানারই একটা শক্তিশালী ও যোগ্য প্রশাসন যদি এ অঞ্চলের দায়িত্ব নেয়, তবে যে কোনোদিনই তা ফের একবার মরুভূমির সঙ্গে এ-অঞ্চলের পুরোনো লড়াইটা শুরু করে মনুষ্যবসতির সীমা বাড়িয়ে নিতে পারবে। এর প্রমাণ হল তুর্কমান স্তেপ বা পাঞ্জাবের দোয়াব অঞ্চল। সে এলাকাগুলো এ জায়গার চেয়ে কম শুকনো নয়, কিন্তু সেখানে ইদানীং সফলভাবে বসতি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

নদীতীরের বনপথে

নাগারা-খানা থেকে আট মাইল পথ পার হয়ে আসার পর যেখানে জঙ্গল পাতলা সেখানেই নিয়ার দক্ষিণের সুদূর বরফ-ঢাকা পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। বায়ুমণ্ডল এত পরিষ্কার ছিল যে দূরের ওট্রা লঙ্গর পর্যন্ত নজরে আসছিল। নজরে আসছিল রাস্তার মধ্যে মধ্যে তীর্থযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য খাগড়ায় তৈরি কুঁড়েঘরগুলো। প্লেন টেবিলে এগুলোর সঠিক অবস্থান তুলে নিতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছিল না।

একটু পরেই শুরু হয়েছিল পপলার আর তামারিস্কের ঘন জঙ্গল। বরফ-পাহাড়সহ দূরবর্তী সবকিছু চলে গেছিল চোখের আড়ালে। জঙ্গলের বিস্তার দেখে মনে হয় নদীপথের পরিবর্তনের ফলেই এ সম্ভব হয়েছে। না-হলে মরু অঞ্চলে এত বিস্তৃত জমির উর্বরতা সম্ভব হত না। আমাদের মেষপালক গাইড জানিয়েছিল, জঙ্গল এখানে আট থেকে দশ মাইল চওড়া। জরিপের জন্য একটু উঁচু জায়গা থেকে নেওয়া মাপ মেষপালকের অনুমানকে স্বীকৃতি দিল। গাছের নীচে অনেক জায়গায় পাতলা বরফের স্তর জমে আছে। গত সপ্তাহের তুষারপাতের ফল। আবছায়ায় জমে থাকা চাপ চাপ সাদা বরফ ইউরোপের শীতকালের দৃশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাইল বারো পথ পার হবার সময় একবারের জন্যও নদীর দেখা পাইনি, নজরে আসেনি মেষপালকদের কুঁড়ের কোনো চিহ্ন। সন্ধে নামার আগে আগে পৌঁছেছিলাম মেষপালকদের ক’ঘর কুঁড়ে-সম্বল দোবে-বোস্তানে। আমাদের দ্বিতীয় শিবির। মাইল খানেক পুবে উপস্থিত নিয়া নদী আর পশ্চিমে মরুর বালির পাহাড়ের হালকা অবয়ব। উটের পিঠে চেপে মালপত্র পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে সাতটা বেজে গেল। তার আগেই আমার লোকজন শুকনো কাঠ জোগাড় করে আগুনের কুণ্ড বানিয়ে দিয়েছিল। আগুনের তাপে প্রবল ঠান্ডার অনুভূতি ছাড়াই রাতের পরিষ্কার আকাশ দেখতে পাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত তাঁবু যখন খাটানো হল তখন তাপমাত্রা মেপে দেখেছিলাম ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)!

ইমাম জাফরের মাজার

২৬ জানুয়ারি মাত্র তেরো মাইল রাস্তা পার হয়ে ফের পৌঁছলাম মরুযাত্রা শুরুর আগের শেষ জনপদ ইমাম জাফর সাদিক মাজারে। নদী এখানে মাত্র ফুট কুড়ি মতো চওড়া। নদীর জল জমে বরফ হয়ে আছে। সরু নদী থেকেও কয়েকটা ধারা বেরিয়ে একটু এগিয়ে বালির বুকে মিলিয়ে গেছে। মাজার ঘিরে বড়ো বড়ো গাছ ও ঝোপ। যতই মাজারের দিকে এগোচ্ছিলাম, এই শীতের রিক্ততা সত্ত্বেও চারদিকের নিসর্গ ভারী সুন্দর লাগছিল। বড়ো বড়ো পপলারের উপবনের মাঝে তীর্থযাত্রীদের জন্য এলোমেলো কুঁড়েঘর, পশ্চিমে একটি প্রকান্ড বালিটিলার মতন দেখতে শৈলশিরার ওপর অজস্র পোঁতা খুঁটি আর নানা ধরণের কাপড়ের টুকরো। ওখানেই চির-বিশ্রামে আছেন শহীদ রাজপুত্র ইমাম জাফর সাদিক, যার স্মরণে এই পবিত্র স্থান। মাজার ঘিরে মসজিদ, মাদ্রাসা ও বংশানুক্রমিক সেবকদের থাকার জায়গা। গত দু মাস ধরে মরুভূমিতে ঘুরে ঘুরে কেরিয়া আর নিয়ার ধারের কুঁড়েঘর দেখবার পর এই মাজার এলাকা আমাদের চোখে বেশ জমকালো লাগছিল। ইতিউতি তীর্থযাত্রীদের থাকার ঘর ঘিরে গাছের ঝোপ। তার মাঝে ছোটো ছোটো জলাশয়।

ভবনগুলোয় দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলাম। এদের মধ্যে শুধু নিয়াজ হাকিম দ্বারা নির্মিত চতুর্ভুজাকার বিশাল মাদ্রাসাটি পোড়া ইটের। বাকি সব মাটি আর কাঠের। বরফ হয়ে থাকা উত্তরের জলাশয় পার হয়ে উল্টোদিকের পাহাড়ের দিকে গেলাম। টিলার পাদদেশে ছোটো ছোটো গাছপালা দিয়ে ঘেরা প্রার্থনার জন্য একটি বড়ো মঞ্চ আর ছোটো ছোটো সরাই। সবই তীর্থযাত্রী আর মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য পুণ্যলোভী দাতাদের দানে বানানো।

সব গাছেই ছোটো ছোটো পতাকা বাঁধা। ইয়াকের লেজ, ন্যাকড়া ঝুলছে প্রায় সব গাছ থেকেই—তীর্থযাত্রীদের অর্ঘ্য। টিলার মাথায় পৌঁছনোর রাস্তায় একের পর কাঠের খিলান। সবেতেই তীর্থযাত্রীদের ভক্তির স্মারক বাঁধা। প্রথম খিলানটিতেই সবচাইতে বেশি কাপড়ের টুকরো আটকানো। যা গুনে শেষ করা অসম্ভব। কী নেই? ভারতীয় মসলিন থেকে শুরু করে বার্মিংহাম কটন প্রিন্ট, চিনা সিল্ক, রাশিয়ান চিন্টজ, দেশজ মোটা ‘খাম’ কাপড়। চেনা প্রায় সব রঙই উপস্থিত। তীর্থযাত্রীদের ভক্তির এই প্রথা বা নিদর্শন সারা ভারতের সমস্ত মুসলমান ও হিন্দু তীর্থস্থানগুলিতে একইভাবে দেখা যায়। ভাবছিলাম, এই কাপড়ের টুকরোগুলোকে যদি বালির তলায় পুঁতে দেওয়া হয় এবং বেশ কয়েক শতাব্দী পর তা যদি কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বেরিয়ে আসে তবে কী প্রতিক্রিয়া হবে!

পথটি ঘুরে ঘুরে টিলার মাথায় উঠেছে। পথের দু-পাশে উঁচু মাটির স্তূপ—কোনো না কোনো ‘শহিদের’ বিশ্রাম স্থান—‘তাসকিরাহ্’ বা কিংবদন্তি বলে, এরা ইমাম জাফর সাদিকের নেতৃত্বে ‘চিন ও মাচিন’ অর্থাৎ খোটানের কাফেরদের সঙ্গে ভূমি রক্ষার লড়াই করতে গিয়ে এখানে প্রাণ দেন। আমার কাছে যা সবচাইতে চিত্তাকর্ষক লাগল, উপকথা যাই বলুক, জলাশয় থেকে প্রায় ১৭০ ফুট উঁচু টিলাটি কিন্তু বালি-পাথরের নয়, এটি একটি লবণ পাহাড়—রিফস অফ সল্ট। বেশ কিছু জায়গায় ধূসর-সাদা রঙ পরিষ্কার বেরিয়ে আছে। পাথুরে-লবণ শুধু টিলার গায়েই নয়, আশেপাশের নুড়িতেও প্রচুর মিশে আছে। অথচ নদীর দু-পাড়ে বালি ছাড়া আর কিছু নেই। এই পাহাড়ের পবিত্রতা এই বিশেষত্বের জন্যেই যথেষ্ট। টিলার চূড়া থেকে দূরে মরুভূমি দেখা যাচ্ছিল। উত্তর-পশ্চিমে ছ’-সাত মাইল গিয়েই বালির বুকে নদীর স্রোত হারিয়ে গেছে। শুরু হয়েছে বালি সাম্রাজ্য। প্রাচীন-শহর যাবার জন্য আমাদের ওইদিকেই যেতে হবে বলে জানাল গাইড।

প্রাচীন শহরের পথে যাত্রা শুরু

সবাই চাইছিল যাত্রা শুরুর আগে টিলার মাথায় গিয়ে পীরের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসতে, তাই মরুযাত্রা শুরু করতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। আরও দেরি হয়েছিল জল নিতে গিয়ে। জানতে পেরেছিলাম যে যেখানে যাচ্ছি সেখানে বালি খুঁড়ে জল পাওয়া যাবে না। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া জলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে। কলকাতা থেকে নিয়ে আসা গ্যালভানাইজড লোহায় তৈরি জলের ট্যাঙ্ক দুটো দান্দান-উইলিকের ঠান্ডায় এর মধ্যে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গরম কলকাতায় না আমার, না প্রস্তুতকারক মেসার্স থমসন—কারোরই মাথায় আসেনি মরুভূমির ঠান্ডার কথা। গতকাল রাতের তাপমাত্রা নেমে গেছিল -১২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস); এখনও পর্যন্ত মরুতে পাওয়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। অনান্য ট্যাঙ্কগুলোতেও ঠান্ডা-গরমে প্রসারণের ফলে সূক্ষ্ম ছিদ্র তৈরি হয়ে ট্যাঙ্কে ভরা বরফ গলে গলে জল বের হয়ে আসছিল। আমাদের সৌভাগ্য, প্রচণ্ড ঠান্ডার ফলে সঙ্গে বস্তায় পেঁচিয়ে বরফ নিয়ে যাবার পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। দলে লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়, প্রায় পঞ্চাশ এবং সবাইকেই থাকতে হবে অনেক দূর মরুভূমির বুকে।

সূর্যের আলো ঝকঝক করছিল। বনভূমির মধ্যে দিয়ে মাইল তিনেক যেতে শীতকালীন নদী হারিয়ে গেছিল তুলকুচ-কোল নামের জলাভূমি আর বালির গর্ভে। শুকনো নদীখাত বলে দিচ্ছিল যে গরমকালে নদীর জল আরও খানিক দূরত্ব পর্যন্ত বয়ে যায়। এই জলাভূমির কিনারে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকে মাজারের ভেড়ার পালের রক্ষক নুরুল্লা। হাজার চারেক ভেড়া আছে ওর জিম্মায়। নুরুল্লাকে সাধারণ মেষপালক ‘কোইচি’-দের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। জলাভূমির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিতে গিয়ে নুরুল্লা জানিয়েছিল, শুধু সে ভেড়াদের দেখাশোনাই করে না, নিজের পরিবারের জন্য জলাভূমির মাঝে ভুট্টা আর গম ফলায়। মরুভূমিতে প্রবেশের আগে আমাদের টাট্টুঘোড়াগুলো নুরুল্লার খামারে রেখে যাওয়া হয়েছিল।

জলাভূমিতে গাছপালা এত ঘন যে সেই জঙ্গল সাফ করার পরেই উটগুলো এগোতে পারছিল। জলাভূমিতে হরিণ, খরগোশ ও অনান্য কিছু জন্তুর উপস্থিতিও ছিল। যত এগোচ্ছিলাম ততই বন পাতলা হচ্ছিল। মরে যাওয়া শুকনো গাছ দেখা যেতে শুরু করেছিল। মাজার থেকে আট মাইল মতো এগোনোর পর জলা শেষ হয়ে শুরু হয়েছিল মরুভূমি। ছোটো বালির টিলার ওপর তামারিস্ক আর শক্ত গুল্মের অঞ্চল আক-টিকেন। বালির মাঝে জেগে থাকা মৃত পপলার আর অন্যান্য গাছের গুঁড়ি ও শিকড় বলে দিচ্ছিল এইখানে কোনো এক সময় নদীর জল পৌঁছত। প্রাণ ছিল এখানে।

শুকনো নদীপথ অনুসরণ করেই যে ‘প্রাচীন শহর’-এ পৌঁছনো যাবে, আমার এই অনুমান ২৭ জানুয়ারি যাত্রার শেষে প্রমাণিত হয়েছিল। পাশাপাশি এটাও প্রমাণিত হয়েছিল যে, স্থানীয় গাইডরা মরুভূমির দূরত্ব সম্পর্কে যা বলে তা অতিরঞ্জিত। আমাকে বলা হয়েছিল যে ইমাম জাফরের মাজার থেকে প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষে পৌঁছতে কম করে তিনদিন হাঁটতে হবে। কিন্তু সেটা আমরা দু-দিনেই পাড়ি দিয়েছিলাম। গতকাল আমার শিবিরের কাছের এক বালি টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে শুকিয়ে যাওয়া নদীর গতিপথ এগিয়ে যেতে দেখলাম। নদীপথের ধার ঘেঁষা প্রথম পাঁচ মাইল বা তারও বেশি পথ মৃত গাছ আর শেকড়ে ভরা। ভারী মাল পিঠে উটকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের এগুলো সরিয়ে পথ তৈরি করতে হল। মরে যাওয়া গাছের শিকড়ের ফাঁকে গজিয়ে শক্ত গুল্মের ঝোপ। অনেক মৃত গাছ এখনও ডালপালা ধরে রেখেছে। ফুট চারেক গভীর এক শুকনো খাত মৃত বনভূমির পাশ দিয়ে চলে গেছে। স্থানীয় গাইড বলেছিল এটি পুরোনো শহরের ‘উস্তাং’ বা খাল। কিন্তু খালের কৃত্রিমতার কোনো নিদর্শন আমি দেখতে পাইনি।

আরও এগিয়ে ১৫ থেকে ৩০ ফুট সার সার শঙ্কু আকৃতির বালির পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়েছিল। সবক’টি বালি-পাহাড়ের মাথাতেই মৃত তামারিস্কের ঝাড় নজরে এসেছিল। বালি-পাহাড়ের পুবদিকের ঢালে এখনও সপ্তাহ খানেক আগে হওয়া তুষারপাতের বরফ ইঞ্চি খানেক পুরু হয়ে জমে আছে। প্রায় মাইল তিনেক পরিধি নিয়ে এইরকম পুরো অঞ্চলটা। তারই মাঝে অনেকটা জায়গা জুড়ে গাছের শুকনো শেকড়ের ফাঁকে ছড়িয়ে ছিল ভাঙা মাটির পাত্র। সঙ্গের লোকেরা এই শেকড়গুলো দেখে এগুলোকে ফল আর পপলার গাছ বলে শনাক্ত করেছিল। সম্ভবত এই অঞ্চলটিতে কোনো খামার ছিল। এরপর বালি-পাহাড়ের উচ্চতা কমে গেলেও সেগুলো পুরো ন্যাড়া ছিল। যদিও দু-এক জায়গায় শুকনো তামারিস্কের ঝোপ দেখেছিলাম। বালির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা মাটির পাত্র আর ধাতুর দলা দেখিয়ে আমাদের গাইড ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবার সংকেত দিয়েছিল।

সামান্য পরেই বালি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ঘরের কাঠামো দেখতে পেলাম। দান্দান-উইলিকের থেকে অনেক উঁচু কাঠের খুঁটি বালির ওপর দাঁড়িয়ে। প্রাথমিকভাবে যা বুঝেছিলাম, দুই ধ্বংসাবশেষের নির্মাণ পদ্ধতি ও নির্মাণ সামগ্রী একই ধরনের। কিন্তু এখানে কাঠের কাঠামোর বিস্তৃতি অনেক বড়ো ও শক্তপোক্ত। এই ধ্বংসাবশেষের প্রাচীনত্ব যে অনেক বেশি তা বুঝতে পেরেছিলাম বালির ওপর পড়ে থাকা সূক্ষ্ম কাজ করা কাঠের এক টুকরো দেখে। কাঠের ওপরের চিত্রিত অলংকারের ধরন গান্ধার শিল্পের মতো। এখান থেকে আরও মাইল দু-এক উত্তর দিকে এগিয়ে উঁচু বালির টিলার মাঝে রোদে শুকনো ইটের ভেঙে পড়া বাড়ির কাঠামোর কাছে পৌঁছেছিলাম। কেরিয়ার সম্পন্ন চাষি আবদুল্লাহ্ এই ‘পোতাই’ বা ধ্বংসাবশেষই দেখেছিল। যেরকমটি আশা করেছিলাম, এটি একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ এবং বালির মাঝে তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে আছে।

ধ্বংসাবশেষে পৌঁছে

ধ্বংসাবশেষের কেন্দ্রীয় অবস্থানে তাঁবু খাটালাম। জায়গাটা সেরকমভাবে বালি-চাপা পড়েনি। ভূমিক্ষয় যে এখানে ভীষণভাবে হয়েছে তার প্রমাণ বালির ওপর জেগে থাকা বড়ো বড়ো মাটির পাত্রের টুকরো, বড়ো বড়ো পাথর আর বিশাল জায়গা জুড়ে বিছিয়ে শুকনো গাছের শেকড় আর কাটা গুঁড়ি। এটি সম্ভবত কোনো বাগান ছিল। না-হলে এত গাছের শেকড় একজায়গায় গজাত না। কিন্তু শেকড়গুলোয় হাত দিতেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল সঙ্গে সঙ্গে। বড়ো পাথরের টুকরোগুলো সম্ভবত বাড়ি তৈরির কাজে নদীগর্ভ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। মরুর প্রবল বাতাস আর চরম জলবায়ু সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রাচীন শহরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রথম রাতে ভাবছিলাম না জানি কী অপেক্ষা করছে বালির তলায়!

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%