অষ্টবিংশ অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

কারাডং ধ্বংসাবশেষে অভিযান

২৬ ফেব্রুয়ারি এন্ডারের স্তূপের ধ্বংসাবশেষ ছেড়ে দ্রুত রওনা দিয়েছিলাম নিয়ার পথে। এন্ডারে থেকে দশ মাইলমতো দক্ষিণ-পশ্চিমে যাবার পর নিয়া নদীর পুরোনো স্রোতের ধারে পৌঁছই। গত কয়েকদিনে তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় নদীর কম গভীর অংশের বরফ খানিক গলে গেছিল। কিন্তু মূল স্রোতের ওপর প্রায় ১৫ গজ জায়গা জুড়ে পুরু বরফ জমে ছিল যা আমাদের ভার বহন করতে পারবে বলে মনে হয়েছিল। প্রথমে নদীর জমা বরফের ওপর দিয়ে একটা উটকে পার করানো হয়েছিল, তারপরে একে একে সবগুলো উটকে কোনো অঘটন ছাড়াই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বরফের ওপর দিয়ে। মরুর মধ্যে দিয়ে ইয়ারতুঙ্গাজ নদীর দিকে যাবার আগে আমাদের জলের ট্যাঙ্কগুলো এখানে ভরে নেওয়া হল। এন্ডারে নদীর প্রায় মজে যাওয়া এক নদীপথ ধরে দক্ষিণের দিকে প্রায় দশ মাইল তোঘরাক গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পৌঁছই ‘টোকুজ-কোল’-এর রাখালদের খালি কুঁড়েতে। টোকুজ-কোল শব্দের অর্থ ‘নয়টি হ্রদ’। যদিও কোনো ‘হ্রদে’ই জল ছিল না।

কেরিয়ায় ফিরতি যাত্রা

২৭ তারিখ সকালে দক্ষিণের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম কুমুশ গাছে ছাওয়া সমতল দিয়ে। অল্প সময়ের জন্য আসল মরুর সব চিহ্ন যেন হারিয়ে গেল। পরিষ্কার সকালে অনেক দূরের কুয়েন-লুয়েনের পর্বতমালার দৃশ্য মন ভালো করে দিয়েছিল। এখান থেকে নয় নয় করেও প্রায় ৬০ থেকে ৮০ মাইল দূর পাহাড়ের উঁচু চূড়া আর হিমবাহগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। কম সময়ে যতটা সম্ভব সার্ভের প্লেন টেবিলে এগুলো তুলে নেওয়া হল।

দুপুরবেলা চেরচেনের দিকে এগোতে শুরু হয়েছিল ধুলোঝড়। মনোরম পাহাড়ের দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে। এন্ডারে থেকে আসা রাখাল গাইডকে এখানেই ছেড়ে দিতে হয়েছিল। ওর বাচ্চাদের জন্য আমার স্যাডেল ব্যাগে থাকা সামান্য চকোলেট উপহার পাঠিয়েছিলাম, আশা করি রাশিয়ান চকোলেটের টুকরো বাচ্চাগুলোর ভালো লেগেছিল।

মরুর মধ্যে দিয়ে চিনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী চেরচেন রোড অন্য সময় ব্যস্ত থাকলেও শীতের সময় জনশূন্য। কুড়ি মাইলেরও বেশি নির্জন, শক্ত বালিদানার মরুপথ ধরে ইয়ক-টোঘরাক পৌঁছেছিলাম বেলাশেষে। পথে বালিয়াড়ি ও গাছপালা প্রায় ছিলই না। ইয়ক-টোঘরাকে সামান্য তামারিস্ক ও তোঘরাকের শুকনো ডালপালা জুটে গেছিল আগুন জ্বালানোর জন্য। একটা ৬ ফুট গভীর কুয়ো থেকে খানিক নোনতা জলও পাওয়া গেছিল। মালপত্র নিয়ে উটগুলো পৌঁছেছিল মাঝরাত পেরিয়ে। রাতের খাবার খেতে খেতে প্রায় সকাল হয়ে গেছিল।

পরদিনের ইয়ারতুঙ্গাজ নদীর কিনারা পর্যন্ত যাত্রাপথ তুলনায় সহজ ছিল। রাস্তাতেই দেখা হয়ে গেল দলের বিশ্বস্ত টাট্টুঘোড়া-চালক তিলা বাইয়ের সঙ্গে। সে আমার জন্য খোটান থেকে চিঠিপত্রের বোঝা নিয়ে আসছিল। অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়ির চিঠি পেয়ে খুব ভালো লাগল। পথের ধারে বসেই চিঠির বস্তা খুলে বসেছিলাম। চিঠির সঙ্গে একটা মাস তিনেক পুরোনো ‘উইকলি টাইমস’-এর কপিও এসেছিল যা আমাকে পশ্চিম-দুনিয়ার স্বাদ এনে দিল।

এরপরে দু-খেপ টানা হেঁটে পৌঁছলাম নিয়ায়। নিয়া নদীর পুবদিকে বালিয়াড়ির সার। অনেকদিন পর ছোটো ছোটো জলাশয় আর খাগড়াভরা জলাভূমি দেখে মন ভরে গেছিল। দিন কয়েক আগে থেকে নদীর বরফ গলতে শুরু হওয়ায় নদীর ছোটো ছোটো ঝোরা বেয়ে আবার জলে ভরে যেতে শুরু করেছে জলাভূমি আর হ্রদগুলো। একটি ছোটো জলধারা, উপহ্রদ শিতলা দরিয়াকে কয়েক মাইল দূরের নিয়া নদীর সঙ্গে জুড়েছে। জলধারার দু-পাশে ঘন জঙ্গল। জলধারাটি গিয়েছে শিতলা পাদশাহিম মাজারের পাশ দিয়ে। মাজার ঘিরে লাঠির ডগায় বাঁধা ইয়াকের লেজ আর রঙবেরঙের কাপড়ের টুকরো উড়তে দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম যে মরূদ্যান শহরে পৌঁছে গেছি। দিনের শেষের নিভু নিভু আলোয় আবার ফিরে এলাম সভ্যতার মাঝে। গত ২৩ জানুয়ারি নিয়া থেকে অভিযান শুরু করার পর ৩০০ মাইলের বেশি পথ উপবৃত্তাকারে ঘুরে এসেছি।

ক্যারাভান পেছনে ফেলে আমি দারোগা ইব্রাহিমকে নিয়ে ছুট লাগালাম। প্রায় ৮০ মাইল পথ দু-দিনে পার করে পৌঁছলাম কেরিয়াতে। আগে এলাম কারণ, নানা রিপোর্ট পাঠানো বাকি। এছাড়া আগামী অভিযানের প্রস্তুতি শেষ করতে হবে তাড়াতাড়ি। নদীর বরফ গলে গিয়ে গরমের সংকেত আসতে শুরু করেছে। শীতের অতিরিক্ত গরম পোশাকের বোঝা কমিয়ে পরিকল্পনামাফিক কেরিয়া নদীর স্রোত ধরে এগোতে হবে। খোঁড়াখুঁড়ির জন্য নতুন করে মজুর জোগাড় করা থেকে শুরু করে মানুষের ও পশুর খাবার জোগাড় করতে গিয়ে নিজের ও বিশ্বস্ত দারোগা ইব্রাহিমের বিশ্রামের কথা মাথায় আনতেও পারিনি। সময়… সময় যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে পদে পদে।

কেরিয়ার আম্বান হুয়াং-দালোই আমি কেরিয়া পৌঁছনোর দিন শহরে ছিলেন না। একটি অপরাধের তদন্ত সেরে একদিন পর ফিরে এলেন। আমি ওঁকে সবরকম সাহায্য করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে গেছিলাম। দূর থেকে ওঁর সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া আমার অভিযান এতটা সফল হত না। খোটান থেকে এখানে এসে পৌঁছানো আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে থেকে বেছে কয়েকটি টিনজাত খাবার আমি ওঁর জন্য নিয়ে গেছিলাম। উপহার খুব সামান্য হলেও উনি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন। বিনিময়ে উনি প্রচুর পশুখাদ্য, ভেড়া ইত্যাদি দিলেন যা আমার কাছে খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। ওঁর সঙ্গে দেখা করে আসার খানিক পরেই উনি আমার ক্যাম্পে এসেছিলেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া প্রাচীন নথি ও কাঠের ফলকগুলো হাতে নিয়ে উনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন; ওঁর অনেক কৌতূহল মিটেছিল।

শিক্ষিত চিনাদের কাছে এইসব প্রত্নসামগ্রীর ঐতিহাসিক মূল্য বিলক্ষণ জানা। উনি কাঠের ফলকগুলো হাতে নিয়ে বলেছিলেন যে ঠিক এর পরপরই চিনে কাগজের আবিষ্কার হয়। কাগজ আবিষ্কারের আগে চিনে চেরা বাঁশ লেখার কাজে ব্যবহার করা হত। কাঠের ফলকগুলি সেই চেরা বাঁশে লেখার যুগের সমসাময়িক।

এদিকে খোটান-সহ দূরদূরান্তে রটে গেছিল যে আমি ধ্বংসস্তূপ থেকে তাল তাল সোনা পেয়েছি। কিন্তু হুয়াং-দালোইয়ের চোখ দেখে আমি টের পেয়েছিলাম, উনি জানেন আমি যা খুঁজছিলাম তা পেয়েছি…এই প্রত্নতত্ত্বের মূল্য সোনার চেয়েও বহুগুণ বেশি। উনি বন্ধুর মতো আবার সবরকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওঁর সক্রিয় সহায়তায় ৭ মার্চ দলবল-সহ কেরিয়ার প্রায় ১৫০ মাইল উত্তরে মরুভূমির মাঝে অবস্থিত কারাডং ধ্বংসস্তূপের দিকে রওনা হয়েছিলাম। ১৮৯৬ সালে ডঃ হেডিন কেরিয়া দরিয়াতে তাঁর স্মরণীয় পদযাত্রার সময়ে খুব স্বল্প সময়ের জন্য হলেও কারাডং ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করেছিলেন।

কেরিয়া নদীপথ ধরে

ধনসন্ধানী তুর্দি আমায় জানিয়েছিল যে সে দু-বার ওই ধ্বংসস্তূপে হানা দিয়েছিল। প্রাচীন সেই শহর, যাকে সে ‘আকতিকেন’ বলছিল, তার ধ্বংসস্তূপে আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই, সব লুট হয়ে গেছে। তবুও আমি ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলাম। সময় বাঁচাতে দ্রুত চলার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

মালপত্রের ভার কমে যাওয়ায় ও আরও কিছু নতুন উট ভাড়া করায় দলের পশুগুলো খানিক আরাম পেয়েছিল। ফলে মাত্র তিনদিনে দান্দান-উইলিক থেকে কেরিয়া আসার পথে যেখানে কেরিয়া দরিয়ার প্রথম দেখা পেয়েছিলাম সেই জায়গায় পৌঁছে গেলাম। জায়গাটা দু-মাস আগের মতোই নির্জন, শুধু নদীর বরফ গলে গিয়ে কাদাজল বইছে। এই কাদাজলেই ভরে উঠেছে কেরিয়ার আশেপাশের সব পুকুর আর জলাগুলো। এই জলে যখন নদীর ধারা পুষ্ট হয় তখন তাকে বলে ‘কারা-সু’, কালো জলের নদী। আর কিছুদিন পর পাহাড় থেকে হিমবাহ গলা জল নামতে শুরু করলেই জলের রঙ বদলে যাবে, নদী হয়ে উঠবে ‘আক-সু’, সাদা জলের নদী।

বুরহানুদ্দিন মাজারে পৌঁছতে আগের বারের মতোই শেখরা আমাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। মসজিদ লাগোয়া বিশ্রামাগারে কয়েক ঘণ্টা বসে আরাম করে আমার কিছু রিপোর্ট লেখার কাজ শেষ করে এগিয়ে যাওয়া ক্যারাভান ধরব বলে ছুট লাগাতে যেতেই বয়স্ক সৌম্যদর্শন গাজি শেখ আমার সঙ্গে মরু অভিযানে যাবার জন্য জেদ ধরে কোনো সময় নষ্ট না করেই আমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলেন। বৃদ্ধ মানুষটি শুধু মিষ্টি স্বভাবেরই নন, এই অঞ্চলে ওঁর প্রতিপত্তি অনেক। চারণদাররা ওঁর কয়েক হাজার ভেড়া নদীর ধারের নানা চারণভূমিতে চরিয়ে বেড়ায়। তিনি এই অঞ্চলের প্রতিটি চারণভূমি ও চারণদারদের বিশদে জানেন। ফলে আমাদের দারোগার পক্ষে কেরিয়া থেকে কিছু মজুর নিয়ে আসার পরেও এই চারণদারদের মধ্যে থেকে নতুন মজুর জোগাড় করা সহজ হয়ে গেছিল। গাজি শেখের এক হাঁকে অনেক মজুর জুটে গেছিল। ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক পরে আর পায়ে চামড়া জড়ানো জুতো লাগিয়ে নতুন যোগ দেওয়া মজুরদের অনেকটা আদিম মানুষদের মতো দেখতে লাগছিল। সামান্য নগদের আশায় ওরা দলের সঙ্গে রওনা দিয়েছিল সোল্লাসে। হাতে অর্থ এসেই ওরা ছুটবে কেরিয়ার বাজারে। সে যাই হোক, আমাদের দলটা তখন বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল।

কোচকার ওঘিল থেকে যে রাস্তা দিয়ে তিনদিন ধরে আমরা যাচ্ছিলাম, সে সম্পর্কে আমার বিশেষ কিছু ধারণা ছিল না। এতক্ষণ পাশে চলা যে নদী সরু হয়ে বইছিল তা হঠাৎ করেই সহসা চওড়া হয়ে উঠেছে। এখন এখানে জলে ভরা অংশটা ৮০ থেকে ১০০ গজ মতো চওড়া হলেও গরমকালে বন্যা হলে যে সে আধা মাইলেরও বেশি চওড়া হয়ে ওঠে তা নদীখাত দেখেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মরুভূমির মধ্যে নদীর দু-পাশের জঙ্গলের বিস্তৃতিও এতক্ষণ নদীর ধার ধরেই চলছিল। কিন্তু এখানে টগরাক আর কুমুশ গাছের উচ্চতা আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার ধরন দেখে পরিষ্কার বোঝা গেল যে মরুভূমির বালি এই অঞ্চলের নদী থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্রতা পায়।

১২ মার্চ ‘ইয়োঘান-কুম' (উঁচু বালি) নামের একটি দাওয়ান পার হলাম। বালির পাহাড়টা সরাসরি নদীর বুক থেকে উঠেছিল। নদীর ঠিক উলটোদিকে একইরকম আর একটি বালির পাহাড় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। দাওয়ান পার হতেই সামনে এসেছিল চওড়া নদী। ইয়োগান-কুমের মাথা থেকে দেখতে পেয়েছিলাম, মূল নদী থেকে আরও তিনটে শুকনো নদীখাত মরুভূমির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আমরা মাঝের শুকনো চওড়া সমতল নদীখাত দিয়ে এগোলাম। নদীখাত ভরে ছিল হলুদ কুমুশ ফুলে। হওয়ায় দুলতে থাকা কুমুশ ফুল দেখে মনে হচ্ছিল যেন পাকা ভুট্টার খেত।

নদীখাত দিয়ে অনেকটা পথ যাওয়ার পর আবার পৌঁছলাম আসল নদী কিনারার ধারে এক পশুচারণভূমি টঙ্গুজ-বাস্তেতে। এখানে গাজি শেখের ভেড়ার পাল ছিল, ফলে রাতে দলের সবার প্রচুর পরিমাণে ভেড়ার দুধ আর মাংস জুটেছিল আতিথেয়তা হিসেবে। একটি শুকনো নদীখাতের শেষ প্রান্তে বর্তমানে বহতা নদীর জল প্রবেশ করে তাকে একটি উপহ্রদ বানিয়ে তুলেছে। কাদা মাখামাখি কালো জলের মাঝে সেখানের জল অনেকটাই পরিষ্কার। উপহ্রদে এক ঝাঁক বুনোহাঁস খেলে বেড়াচ্ছিল। আমাদের শিবির থেকে হাঁসেদের অবস্থান প্রায় ২০০ গজ হওয়ায় ওদের বিরক্ত হবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। নিস্তব্ধ মরুভূমির মাঝে ভেসে আসা হাঁসের ডাক ভীষণ ভূতুড়ে শোনাচ্ছিল।

ডঃ হেডিনের অভিযানের বিবরণ থেকে জানতাম যে মরুভূমির মাঝে যে ধ্বংসস্তূপের সন্ধানে এসেছি তা টঙ্গুজ-বাস্তে থেকে উত্তর-পশ্চিমে একদিনের হাঁটাপথ। মোল্লা শাহ্ নামের যে মেষপালকের এখান থেকে আমাদের কারাডং ধ্বংসাবশেষ পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার কথা ছিল সে এসে পৌঁছল অনেক রাতে। প্রথমে স্বীকার না করলেও চাপের মুখে স্বীকার করেছিল যে সে এর আগে দু-বার কারাডং-এ খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। মোল্লা শাহের সঙ্গে সহকারী হিসেবে এসেছিল আরেকজন মেষপালক, মুহম্মদ শাহ্। সে আবার শিকারি( মেরঘেন)। সেও এর আগে একবার কারাডং-এ খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল বলে জানিয়েছিল।

প্রথম মরুঝড়

অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক সঙ্গে থাকলেও মরুভূমির মধ্যিখান দিয়ে কারাডং পর্যন্ত যাওয়াটা সহজ হয়নি। সকাল থেকেই ঝাপসা হয়েছিল চারদিক। জলের ট্যাঙ্ক-ভরতি করে অপ্রয়োজনীয় বোঝা হ্রদের ধারে রেখে রওনা হবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বইতে শুরু হয়েছিল উত্তরের প্রবল হাওয়া, খানিক বাদেই যা পরিণত হয়েছিল ঋতুর প্রথম ‘বুরান’ বা মরুঝড়ে। মোল্লা শাহ্ এক মরা নদীর খাত ধরে আমাদের সাত মাইল নিয়ে যাবার পর আবার জলভরা নদীর স্রোতের সঙ্গে দেখা হয়। তোলদাম নামের একটা ছোটো হ্রদও ছিল সেখানে। হ্রদের ধার থেকে আমরা গাইডের নির্দেশমতো হাঁটতে শুরু করেছিলাম উত্তর-পশ্চিমদিকে।

এতক্ষণ বালিঝড়কে সঙ্গী করে হাঁটলেও এখান থেকে ঝড়ের বেগ এত বেড়ে গেছিল যে বাতাসে উড়তে থাকা মিহি বালি খুব বেশি দূর পর্যন্ত দেখতে দিচ্ছিল না। প্রবল ঝড়ে চারপাশের কিছু প্রায় না দেখা গেলেও মোল্লা শাহ্ ও তার শাগরেদ আমাদের প্রবল আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল নদীর ধার ঘেঁষে। চোখে গগলস থাকা সত্ত্বেও চোখের কোলে পুরু হয়ে বালি জমে গেছিল, বালি ঢুকে গেছিল মুখের ভেতর। আশেপাশের কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। কয়েক মাইল ঝড় ঠেলে এগোবার পর লক্ষ করলাম যে চারপাশের বালির টিলার উচ্চতা এখানে অনেক বেশি আর ইতিউতি তোঘরাক গাছ বালির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে।

ঘণ্টা খানেক ধরে কয়েকটা বালির টিলা পার হবার পর আমাদের গাইড অনেকগুলো তামারিস্ক গাছের ঝোপ দেখে জানিয়েছিল যে আমরা প্রায় কারাডং (কালো পাহাড়) পৌঁছে গেছি। কিন্তু চোখ অন্ধ করে দেওয়া বালি-কণায় কারাডং ধ্বংসস্তূপ যে ঠিক কোনখানে তা ঠাহর করতে পারছিল না। এরপরে গাইড দুজন আমাদের তামারিস্ক ঝোপের আড়ালে অপেক্ষা করতে বলে এগিয়ে গেছিল জায়গাটা খুঁজতে। তামারিস্ক ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ করছিলাম কীভাবে পাতার ওপর ক্রমশ পুরু হচ্ছে বালির স্তর। আধঘণ্টার মধ্যেই মোল্লা শাহ্ হাতে একটা ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো নিয়ে এসে বলেছিল ধ্বংসস্তূপে পৌঁছতে সামান্য পশ্চিমে যেতে হবে। ঝড়ের তেজ অনেকটাই কমে এসেছিল। উঁচু বালির টিলা বেয়ে প্রায় আড়াই মাইল পথ পার হয়ে আমরা অবশেষে ধ্বংসাবশেষে পৌঁছেছিলাম।

সুরক্ষিত প্রাচীন চৌকি

কারাডং ধ্বংসাবশেষের মূল অংশটি ২৩৫ ফুটের বর্গক্ষেত্রে উঁচু মাটির পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল। আর এই ঘেরা অংশে ছিল সার সার কাঠের তৈরি ঘর। এই ঘেরা জায়গার মধ্যেই জমিতল থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু দুটো বালিয়াড়ি গড়ে উঠছিল। বালির স্তূপ ফুঁড়ে বার হয়ে ছিল কিছু কাঠের কাঠামোর খুঁটির অংশ। পাঁচিলের মধ্যে একসময় এই কাঠামোগুলোই ঘরবাড়ি রূপে ছিল। পাঁচিল-সহ পুরো ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ বালি-পাহাড় সরিয়ে বের করা সম্ভব নয়। বালির ওপর ছড়িয়ে থাকা হাঁড়ি-পাতিল, কাচ, ধাতুর টুকরো ও চামড়ার অংশ জানান দিচ্ছিল এখানে একসময় বসবাসকারীদের জীবনযাত্রার হদিস।

হিউয়েন-সাঙ তাঁর ভ্রমণ বিবরণে পি-মো শহরে বসে খোটানের উত্তরে এক বালি চাপা শহর হো-লো-লো-কিয়ার কথা শুনেছিলেন বলে বলেছিলেন। উপকথা বলে, এক পুণ্যাত্মা আগন্তুক ভবিষৎবাণী করেছিলেন যে এই জায়গাটা এক সপ্তাহের মধ্যে বালির তলায় চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু রাজা সেই আগন্তুকের কথা উড়িয়ে দেন। ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো শহরটি বালিতে ঢাকা পড়ে যায়। রাজার অবজ্ঞায় বহু মানুষের জীবনহানি হয়।

হিউয়েন সাঙ আরও শুনেছিলেন যে, শুধুমাত্র একজন ধার্মিক ব্যক্তি ওই আগন্তুকের কথা শুনে একটি ভূগর্ভস্থ পথ দিয়ে পি-মোতে পালিয়ে যায়। ঠিক তার সাতদিন পর অঝোরে বালি-বর্ষণ শুরু হয় ও পুরো শহর তলিয়ে যায় বালির তলায়। সেই জায়গাটা হয়ে যায় বালির স্তূপ হো-লো-লো-কিয়া। বলা হয় যে পরে অনেক রাজা ওই অঞ্চলের দখল নেবার ও বালির স্তূপ সরিয়ে ধনসম্পত্তি লুঠ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওই অঞ্চলের ধারে কাছে পৌঁছলেই প্রতিবার বালি-ঝড় তাঁদের ওপর আক্রমণ শানিয়েছে। মরুভূমিতে পথ হারিয়ে কেউ পৌঁছতেই পারেনি ওই ধ্বংসস্তূপের কাছে। যেভাবে বালি-ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে এখানে পৌঁছেছিলাম তাতে নিশ্চিত এই শহরই উপকথার সেই হো-লো-লো-কিয়া।

আমি কারাডং-এর দখল বা এখানকার ধনসম্পত্তি লুঠ করার জন্য আসিনি। তাই হয়তো ‘বুরান’ আঘাত হানলেও পথ ভুলিয়ে আমাদের পৌঁছতে বাধা দেয়নি। যদিও এখানে যা খুঁজে পেয়েছিলাম তা ঐতিহাসিক দিক থেকে অতি মূল্যবান! আমি খানিক হাঁটাহাঁটি করে বুঝে গেছিলাম, বিশাল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপে খুব বেশি কিছু খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মাটির পাত্রের টুকরো ও অন্যান্য জিনিষপত্র বালি সমুদ্রের মাঝে একটা ছোটো জায়গাতেই শুধু নজরে এসেছিল। এই অঞ্চলের লোকেরা এই জায়গাটাকে ‘কোন-শহর’ বা ধ্বংসস্তূপ বলতেই পারে, কিন্তু ‘প্রাচীন-শহর’ বলে একে প্রমাণ করতে যা প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা দরকার তা খুঁজে পাওয়াটাই কঠিন পরীক্ষা। শুধুমাত্র কল্পনা ও উপকথা ইতিহাসের ভিত্তি হতে পারে না।

দু-দিন ধরে খননকারীরা ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করলেও বালি খুঁড়ে উল্লেখযোগ্য কিছু পায়নি। বাড়িগুলো সম্ভবত বর্তমান বালির স্তরের তলায় চাপা পড়ার আগেই ক্ষয়ে গেছিল। দেওয়ালের পলেস্তারা পুরোপুরি মিশে গেছিল বালির সঙ্গে, ঘরের কাঠের কাঠামোও আলগা হয়ে ভেঙে পড়েছিল। তবে ভাঙা কাঠামো থেকে এখানকার একসময়কার বাড়িগুলোর বিন্যাসের খানিক আভাস পাওয়া সম্ভব হয়েছিল।

ঘর নির্মাণে এখানে সম্ভবত শুধুমাত্র তোঘরাক কাঠই ব্যবহার করা হয়েছিল। মরুভূমির নদীর কিনারায় পপলার গোত্রীয় তোঘরাক গাছ প্রচুর জন্মায়। কিন্তু এর গাঁটওয়ালা কাণ্ড ও গুঁড়ি কোনোভাবেই তেরেক বা সাদা পপলার ও জিগড়ার মতো নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ভালো নয়। দান্দান-উইলিক-সহ ইমাম জাফর সাদিক মাজার পার হয়ে পৌঁছানো প্রাচীন জনপদের ধ্বংসস্তূপে সাদা পপলার বা তেরেক ব্যবহার করা হয়েছিল বলেই মনে হয়। ফলে সেগুলো বহুবছর পেরিয়েও কারাডং-এর কাঠের থেকে ভালো অবস্থায় টিকে ছিল। ওইসব জায়গায় তেরেক বা সাদা পপলার যে রীতিমতো রোপণ করা হত, তার প্রমাণ ওইসব গাছের মৃত শুকনো কাণ্ড ও শেকড় থেকে ইতিমধ্যে আমরা পেয়েছি। কিন্তু কারাডং-এ তোঘরাক ছাড়া অন্য ধরনের গাছের কোনো অস্তিত্ব নজরে আসেনি। বালির তলা থেকে এখানে প্রচুর মৃত গাছের গুঁড়ি আর শেকড় বার হয়ে আছে, কিন্তু সেগুলো সবই তোঘরাকের। এমনকি এখানে আসার পথে যত বড়ো গাছ নজরে পড়েছে সবই তোঘরাক।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, মরুর এই অঞ্চলে তোঘরাক ছাড়া অন্য কোনো গাছের অস্তিত্ব নেই কেন, জেনেবুঝেই কি এই ধরনের গাছ এখানে লাগানো হয়নি? মরুতে তো অন্য জাতের পপলার গাছ হয়। এই অদ্ভুত পরিকল্পনার পেছনে হয়তো কোনো বিশেষ কারণ ছিল।

মুঘল নেতা ও ইতিহাসবিদ মির্জা হায়দারের মতে, তারিম বেসিনে কেরিয়া নদীর বর্তমান প্রবহমানতা শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে। মরুভূমি জুড়ে এর পুরোনো খাত ধরে এখনও অনায়াসে খোটান থেকে কুচা এবং আরও উত্তর-পূর্বের প্রাচীন বসতিগুলিতে পৌঁছানো সম্ভব। কারাডং-এর অবস্থান তারিম বেসিনের খোটান থেকে পূর্বদিকে প্রসারিত মরূদ্যান রেখার প্রায় মাঝামাঝি অংশে।

আমার ধারণা, উত্তর অঞ্চলের পথ পাহারা দেবার জন্য এখানে এই জনপদটি হয়তো ছোটো সামরিক চৌকি হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে উত্তর অঞ্চল থেকে আক্রমণ বা অনুপ্রবেশ রুখে দেওয়া যায়। আবার এই পথে যাত্রাকারীদের আশ্রয় দেবার জন্য এটি কোনো বড়ো সরাইখানাও হতে পারে। তবে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোর মধ্যে থেকে পাওয়া হান রাজবংশের ছাপ দেওয়া তামার টুকরো থেকে এই জনপদের বয়স যে অতি প্রাচীন তা সহজেই অনুমান করা যায়।

পুরাকালের দানাশস্য উদ্ধার

খননের ফলে পাওয়া পাঁচিলঘেরা এই সরাইখানা অথবা সামরিক ঘাঁটির সবচাইতে ভালোভাবে পাওয়া অংশটি ছিল এর প্রবেশদ্বার। বাইশ বর্গফুট মাপের দরজাটি পাঁচিলের মাথা পর্যন্ত উঁচু ও অটুট ছিল। পুরু কাঠের পাটাতন দিয়ে বানানো দরজাটিতে দুটো পাল্লা ছিল। প্রতিটি পাল্লার মধ্যে ছিল একটা করে ছোটো দরজা, যেগুলো দিয়ে প্রধান প্রবেশদ্বার না খুলেও জনপদে ঢোকা ও বেরোনো যায়। আমি আজ পর্যন্ত যতগুলো ইয়ামেন পরিদর্শন করেছি তার সবগুলোর দরজাই ঠিক এই ধরনের। মাটি থেকে প্রায় ১৪ ফুট পুরু বালিতে ঢাকা পড়ে থাকা এই দরজা খুঁড়ে বের করতে আমাদের পাক্কা দু-দিন লেগে গেছিল। গেটের ঠিক ওপরে আর একটি তলা ছিল যার মেঝে তৈরি হয়েছিল কাঠের ওপর মাটি ফেলে। ধ্বংসস্তূপের একটি ঘরের ভেতরের থেকে পোঁটলা-ভরতি কয়েক পাউন্ড ‘তারিঘ’ (একধরনের ডাল যা কেরিয়ার নানা অংশে চাষ হয়) খুব ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছিল। সঙ্গে পাওয়া গেছিল অল্প পরিমাণে চাল, ডাল, কিশমিশ, ওটস, নানাধরনের শেকড় যা সম্ভবত মশলা হিসেবে ব্যবহার করা হত। সম্ভবত এটি কোনো দোকান ছিল, আবার চৌকি বা সরাইয়ের ভাঁড়ারও হতে পারে। আমি খানিক ‘তারিঘ’ জলে সেদ্ধ করে ঘন করে তা খাম বন্ধ করার কাজে লাগিয়েছিলাম।

খননের কাজ চলতে-চলতেই বুরান বা বালি-ঝড় হানা দিয়েছিল। এবার বালি-ঝড় বইছিল দক্ষিণ-পশ্চিমদিক থেকে এবং ঝড়ের গতিও খানিক কম ছিল। উড়ন্ত বালি তাঁবুর ভেতর-বাইরে সব জায়গাতেই আমাদের নাজেহাল করে দিচ্ছিল। সঙ্গে আনা জলও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। তাই ১৭ মার্চ সন্ধেবেলা এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ হতে পাততাড়ি গোটাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

পরদিন সকালে যখন কারাডং ছাড়লাম তখন চারপাশ উড়ন্ত বালিতে ঘোলাটে হয়ে ছিল। খানিক এগোতেই এক বার্তাবাহক সমরখন্দ ও ওশ হয়ে বাড়ি থেকে আসা একটি ছোটো চিঠি আর রাশিয়ান গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মিঃ ম্যাকার্টনির পাঠানো খবর নিয়ে এসেছিল। মিঃ ম্যাকার্টনি জানিয়েছিলেন, আমাদের মহারানী মারা গিয়েছেন। আমার দুই ভারতীয় অনুসারীকে খবরটা জানাতে ওরাও আমার মতো ব্যথিত হয়েছিল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%