অষ্টম অধ্যায়

মার্ক অরেল স্টাইন

কাশগরের দিনগুলি

মিঃ ম্যাকার্টনির চিনি-বাগের বাড়িতে আসার প্রথম সন্ধেতেই আভাস পেয়েছিলাম যে কাশগরে আগামী দিনগুলো চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যে হলেও আনন্দেই কাটবে। চিনা তুর্কিস্তানের রাজধানীর দিকে রওনা হবার আগে অনেক জরুরি কাজ শেষ করার আছে। আমার মূল অভিযান শুরু হবে তুর্কিস্তানের রাজধানী থেকেই। প্রায় প্রতিটি কাজের জন্য মিঃ ম্যাকার্টনির অভিজ্ঞতা আর সক্রিয় সাহায্যের দরকার হয়ে পড়ছিল। মিঃ ম্যাকার্টনির স্থানীয় রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক জ্ঞান আর তার সঙ্গে ওঁর পদাধিকারজনিত ক্ষমতা আমাকে কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করছিল ভীষণভাবে। যদিও প্রথম দিন থেকেই উনি ব্যক্তিগতভাবে আমার স্বাচ্ছন্দ্য আর কাজের দিকেও নজর রাখছিলেন। অভিযান নিয়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত।

প্রায় দু-মাস ধরে লাগাতার দুর্গম পাহাড়ি পথে যাত্রার পর খানিক বিশ্রাম অবশ্যই দরকার ছিল। মিঃ ম্যাকার্টনির দৌলতে কাজ আর বিশ্রাম দুটোই সমান তালে হচ্ছিল। মিঃ ম্যাকার্টনি দশ বছর হল ভারতের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে এখানে আছেন। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ফলের বাগানের মধ্যে ওঁর সাধাসিধা বাগানবাড়ি চিনি-বাগ।

পাঁচিল ঘেরা শহরের বাইরে যত হোমরাচোমরা লোকেদের বাড়ি আছে, তার সবক’টিতে মনোরম বাগান রয়েছে। পাথরের ওপর মাটির প্রলেপ দেওয়া বাড়িগুলোয় ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা আছে। মিঃ ম্যাকার্টনির বাগানবাড়ির সুসজ্জিত ঘরগুলো যেকোনো ইংলিশ হোমের মতো আরামদায়ক, আউট-হাউসসহ বিরাট কম্পাউন্ড যে-কোনো ভারতীয় বাংলোর মতোই সুযোগসুবিধা যুক্ত। তুমেন-দরিয়া নদীর বিস্তৃত ধারার কিনারা থেকে সোজা উঠে আসা পাহাড়ের ঢালে মিঃ ম্যাকার্টনির বাংলো থেকে শহরের উত্তরদিকের সবুজে ছাওয়া চাষের খেত, ফলের বাগান আর গ্রামের দৃশ্য মন ভরিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের তুর্কিস্তানে সবসময় বয়ে যাওয়া মিহি ধুলোর পর্দা সরিয়ে দেখা দেয় দূরের নীচু পাহাড়শ্রেণির ছবির মতন হালকা রূপরেখা। নিমেষে হারিয়ে গিয়ে আবার চোখের সামনে ফুটে ওঠে অপরূপ দৃশ্যাবলি। আর বৃষ্টি হলে ধূলিকণা সরে যেতে দেখা যায় মুজতাঘ-আতার উত্তর আর উত্তর-পূর্বের বিশাল বিশাল বরফে ঢাকা চূড়াগুলো। দেখা যায় অনেক অনেক দূরের তিয়েন-শান পর্বতমালার তুষারময় শৃঙ্গরাজি।

বিগত দু-মাসের রোজদিনকার তাড়াহুড়োর জীবনের পর বন্ধুর বাড়ির দিন কয়েকের স্বাচ্ছন্দ্য আয়েশ করে উপভোগ করছিলাম। প্রতিদিনকার খুচখাচ সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে না। আমি লোকজনের সঙ্গে মিশতে পারছিলাম মন খুলে, ভাবনাগুলোকে শান দিতে পারছিলাম নিশ্চিন্তে। এই শান্তিময় লম্বা বিশ্রামটা আমার খুব দরকার ছিল। আগামী দিনগুলো যে অসম্ভব পরিশ্রম-সাপেক্ষ হতে চলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ক্যারাভানের জোগাড়যন্ত্র

প্রথম যে দরকারি কাজটা প্রয়োজন ছিল তা হল আমার পরবর্তী যাত্রার জন্য একটা দল ঠিক করা। সেই দল আমার সঙ্গে মরুভূমির মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের কাজ করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে সাফল্য পাওয়ার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে দলের সদস্যদের কর্মদক্ষতার ওপর। শুধু মানুষজন নয়, মরুভূমিতে আমাদের যে পশুর দল নিয়ে যাবে সেইসব পশু নির্বাচনও করতে হবে অতি সতর্কতার সঙ্গে। আগামী আট মাস মরুবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থেকে খাবারদাবার, পোশাক-আশাক, তাঁবু, ওষুধপত্র সব এমনভাবে নিতে হবে শুধুই যেটুকু দরকার। অতিরিক্ত জিনিস নেওয়াও যেমন যাবে না, তেমনি কোনো জরুরি সরঞ্জাম যেন বাদ না যায় সেটাও দেখে নিতে হচ্ছিল। জেনে নিতে হচ্ছিল মরুপ্রদেশের জলবায়ুর খোঁজ। হিসেব করে দেখেছিলাম, আটটা উট আর বারোটা টাট্টুঘোড়া হলেই চলে যাবে। বছরের এই সময়টা মোটেই উট কেনার উপযুক্ত সময় নয়। কারণ, এই সময় বেশিরভাগ পশু ব্যবসায়ীরাই ব্যস্ত থাকে পশুর পিঠে মালপত্র চাপিয়ে রাশিয়ার ব্যবসায়িক শহর আন্দিজান এবং আলমাটির দিকে আনা-নেওয়া করতে। কাজেই এই সময় সহজে কেউ ভারবাহী পশু হাতছাড়া করতে চায় না। অনেক টানাপোড়েন, আলোচনা ও দর কষাকষির পর মিঃ ম্যাকার্টনির মুন্সি বাহাদুর শাহ্ ও অভিজ্ঞ কর্মচারীদের সাহায্যে আগামী অভিযানের জন্য পশুর দল-সহ জিনিস জোগাড় করা গেছিল। অভিজ্ঞ মানুষগুলোর বিবেচনাবোধ যে কী ভীষণভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল, মূল অভিযানের সময় তা টের পেয়েছিলাম। কাশগর থেকে সংগ্রহ করা এই পশুর দল মরু অভিযানে হাজার মাইলেরও বেশি পথ চলে এক ফোঁটাও বিগড়ায়নি। এক-একটি উটের জন্য গড় দাম দিতে হয়েছিল ৬২৪ তাঙ্গা যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯১ টাকা মতো আর টাট্টুঘোড়াগুলোর জন্য দিতে হয়েছিল ২৬০ তাঙ্গা, মানে ৩৮ টাকা মতো।

অভিযাত্রী দলে লোকজন নিয়োগের বিষয়েও বিশেষ সতর্কতা নিতে হয়েছিল, যাতে করে অনাবশ্যক খরচও না বাড়ে আর খাবারদাবারের ভাঁড়ারেও চাপ না পড়ে।

ঠিকঠাক লোক জোগাড় করাটাও সহজ কাজ নয়। পাহাড়ি পথে চলার সময় টের পেয়েছিলাম যে আমার ব্যক্তিগত পরিচারক পেশোয়ারি মির্জা আলিম দুর্গম অভিযানের জন্য যথেষ্ট শক্তপোক্ত নয়। মির্জার এক বিকল্প হিসেবে খুঁজে পেয়েছিলাম মহম্মদ জু’কে…আধা ইয়ারখন্দি, আধা কাশ্মীরি এক শক্তিমান ‘কিরাকাশ’। কারাকোরামের বাণিজ্য পথে ঘুরে ঘুরে সে টাট্টুঘোড়া সম্পর্কে দক্ষ হয়ে উঠেছিল। ক্যাপ্টেন ডিজির অভিযান সেরে ভারতে ফেরার পথেও সে সঙ্গী ছিল। ‘সাহেব’দের জিনিসপত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও খাবারদাবারের বিষয়েও ওর জ্ঞান ছিল অসাধারণ।

অনেক খোঁজাখুঁজির পরে নিয়াজ আখুন নামের কাশগরের এক চিনাভাষীকে দলে নেওয়া হয়েছিল। মিঃ ম্যাকার্টনির সাহায্যে ওকে ‘তুংচি’ (চিনা দোভাষী) হিসেবে পাওয়া গেছিল। শুধু তাই নয়, দুর্গম অঞ্চলে আমাদের টাট্টুঘোড়ার দলের দেখভাল করার দায়িত্বও ও নিয়েছিল। নিয়াজ, মিঃ এবং মিসেস লিটলডেলের তিব্বত ও চিন অভিযানে যাত্রাসঙ্গী ছিল। ও ছাড়া আমার দলের বাকি তুর্কি সদস্যদের কেউই ‘বাজিন’ বা পিকিং শহর দেখেনি। চিনি-বাগের বাংলোয় বসে অবশ্য ওর কয়েকটা ব্যক্তিগত বদভ্যাসের কথা টের পাইনি। পরে পেয়েছিলাম। তা হল আফিম আর জুয়ায় প্রতি অত্যধিক আসক্তি। এর ফলে ও মাঝেমধ্যেই হাতাহাতি কিংবা ছোটোখাটো লুটপাটে জড়িয়ে পড়ত। এতে পরবর্তী সময়ে আমাদের বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যদিও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে সততার সঙ্গে ও সারা অভিযানে দোভাষীর কাজটা করেছিল ঠিকঠাক।

দুজন ‘তুগাচি’ যুবক অর্থাৎ উটচালক আমার দলে যোগ দিয়েছিল। যারা আমাকে উট বিক্রি করেছিল তারাই এই দুইজনকে জুটিয়ে দিয়েছিল। রোজা আখুন ও হাসান আখুন নামের এই দু-জন কেউই উত্তরের ক্যারাভান পথের বাইরের কিছু দেখেনি, ফলে কিছুই জানত না। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই উটকে কীভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে হয় সে-বিষয়ে ওস্তাদ হয়ে উঠেছিল। কম বয়সের উৎসাহ আর অ্যাডভেঞ্চারের টানে মরুভূমি যাত্রার কষ্ট ও ঝুঁকি সহ্য করে আমার অভিযানে যোগ দিতে তারা সোৎসাহে রাজি হয়েছিল।

কাশগরি কারিগর

কাশ্মীর থেকে এতদিনের টানা যাত্রার পর তাঁবু-টাবু-সহ ক্যাম্পিংয়ের অনেক জিনিস মেরামত করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেগুলো খুঁটিয়ে দেখে ঠিকঠাক মেরামত করাতেও অনেক সময় লেগে গেল। দীর্ঘ যাত্রায় টাট্টুঘোড়া, ইয়াক আর মানুষের পিঠে চেপে এসে সরঞ্জাম বোঝাই বাক্সগুলোও অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সবকিছুই মেরামত করতে হল। মরুযাত্রার জন্য কিনতে হল আরও অনেক কিছু। ভারতীয় কারিগরদের মতো দক্ষতা কাশগরিদের না থাকলেও প্রয়োজনীয় মেরামত করাতে খুব বেশি সময় লাগেনি। মিঃ ম্যাকার্টনির বাংলোর চৌহদ্দি জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাশগরের জনাকয়েক ‘মাস্টার’ কারিগর দিয়ে মেরামতির কাজগুলো দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছিলাম।

সবচাইতে ঝামেলার কাজ ছিল মরুযাত্রার জন্য কিছু অতিরিক্ত জলের ট্যাঙ্ক তৈরি করা। কলকাতায় তৈরি গ্যালভানাইজড লোহার জলের ট্যাঙ্কগুলো নিরাপদে পৌঁছলেও আরও কিছু জলের ট্যাঙ্ক সঙ্গে রাখা উচিত বলে আমার মনে হয়েছিল। উটের পিঠে নেবার জন্য যে ট্যাঙ্কগুলো তৈরি করা হয়েছিল সেগুলো এক-একটা মাত্র ১৭ গ্যালন মানে সাতাত্তর লিটার জল ধরতে পারে। মরুভূমির বুকে বালিচাপা পড়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক খননের একটা বিশাল দলের জন্য সঙ্গে আনা জলের ট্যাঙ্ক যথেষ্ট ছিল না। তাই সঙ্গে অন্তত আরও চারটে ট্যাঙ্ক নেওয়া খুব দরকার ছিল। কিন্তু সমস্যাটা হয়েছিল ট্যাঙ্ক বানানো নিয়ে। ট্যাঙ্ক বানানোর জন্য যা পাওয়া যাচ্ছিল তা হল ট্রান্স-কাস্পিয়ান রেলপথ থেকে তুর্কিস্তানে কেরোসিন তেল নিয়ে আসা কিছু তোবড়ানো টিনের কৌটো। কামার আর ছুতোর মিস্তিরি দিয়ে কাঠের বাক্সের মধ্যে টিনের পাত্র বসিয়ে জলের ট্যাঙ্ক বানাতেই এক সপ্তাহের ওপর লেগে গেছিল। জল নেবার পাত্রগুলো শক্তপোক্ত করে তৈরি না করালে বিপদে পড়তে হত।

যদিও এইসব কাজ করাতে গিয়ে অবশ্য আমার অন্য কাজগুলো পণ্ড হয়নি। মিঃ ম্যাকার্টনির বাংলোর পপলার গাছের ছায়ায় বসে মেরামতির দেখভালের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে ফেলছিলাম একের পর এক বই। পূর্ব তুর্কিস্তানের পুরোনো বিবরণ, চিনা ইতিহাসের নানা ঘটনা, চিনা তীর্থযাত্রীদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা আর কিছু প্রাচীন ইউরোপিয় পর্যটকদের পূর্ব তুর্কিস্তানে ভ্রমণের কথা। যত পড়ছিলাম ততই এই অঞ্চল সম্পর্কে আমার জ্ঞান বেড়ে যাচ্ছিল। পড়তে পড়তে আমি মোহিত হয়ে যাচ্ছিলাম। আরও ভালো লাগছিল কারণ, আমি যে-জায়গায় বসে পড়ছিলাম, বইগুলো সে জায়গা আর তার আশেপাশের ইতিহাস নিয়েই লেখা। চিনি-বাগে বসে আমি আমার প্রিয় কাজটাকেই ভীষণ, ভীষণভাবে উপভোগ করছিলাম। দীর্ঘদিন এখানে বসবাসের সুবাদে মিঃ ম্যাকার্টনি যেসব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেছিলেন, তা উজাড় করে আমাকে জানিয়ে যাচ্ছিলেন। আধুনিক তুর্কিস্তানের আর্থ-সামাজিক বিষয় না জানলে অতীত আর বর্তমানটাকে চিনতে পারা দুঃসাধ্য। মাঝেমধ্যেই চিনের প্রথাগত বিষয় নিয়ে বুঝতে অসুবিধা হত। তখন মিঃ ম্যাকার্টনি ডেকে আনাতেন সান-সু-ইয়েহকে, ওঁর চিনা মুন্সিকে। সান-সু-ইয়েহ সাহিত্যরসিক মানুষ। চিনের ধ্রুপদি সাহিত্যে নিবিড় পান্ডিত্য। এরই পাশাপাশি আধুনিক দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়েও গভীর আগ্রহ তাঁর। আমি মুগ্ধ হয়ে ওঁর প্রাণোচ্ছল বক্তব্যগুলো শুনতাম। এই সময় মিঃ ম্যাকার্টনি দোভাষীর কাজটা করতেন। আমার কাশ্মীরি বন্ধু পণ্ডিত গোবিন্দ কাউলের কথা বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘদিন ওঁর সঙ্গে সরাসরি সংস্কৃত ভাষায় আমি নানা প্রাচীন সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছি। এখানে সেটা সম্ভব হচ্ছে না চিনা ভাষা জানা নেই বলে।

চিনা আধিকারিকদের সঙ্গে মোলাকাত

কাশগরে বেশি সময় ধরে থাকার আরও একটা উদ্দেশ্য ছিল। তা হল চিনা প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের আস্থা অর্জন করা। আমার অভিযানের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব পরিষ্কারভাবে বোঝানো। আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলাম, এই কাজটা ঠিকঠাক না হলে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালানো মুশকিল হবে। মিঃ ম্যাকার্টনি বিচক্ষণ অভিজ্ঞ মানুষ। উনি ঠিক ঠিক লোকের সঙ্গেই আমার আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে পুরো বিষয়টা সামলাতে অসুবিধা হয়নি। উনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর ও সরকারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে। যেখানেই নিয়ে গেছেন সেখানেই সুন্দর আর মনোগ্রাহী আলোচনা হয়েছে। শিখতে আর জানতে পেরেছিলাম অনেক কিছুই। শিখেছিলাম চিনা শিষ্টাচার, যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের লোকেরা এই শিষ্টাচারকে ভদ্রতার অপরিহার্য অঙ্গ বলে মনে করে। মিঃ ম্যাকার্টনির উপদেশমতো এই কাজটা না করলে পরে বিপদ হত। মিঃ ম্যাকার্টনি এতদিনের অভিজ্ঞতায় চিনাদের মনোভাব ভালোভাবেই জেনে গেছিলেন।

এই অঞ্চলের মুখ্য সামরিক অধিকর্তা তাও-তাই খোটানের আম্বানকে লিখিতভাবে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যাতে আমাকে খাবারদাবার-সহ লোকজন যা যা লাগবে তা পেতে যেন সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা হয়; পাশাপাশি তিনি আমাকে এই অঞ্চল জুড়ে ঘোরাঘুরির পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাও-তাইয়ের এই হুকুমনামাটা খুব খুব জরুরি ছিল। মাত্র আঠারো মাস আগে এই অঞ্চলে জরিপের কাজে এসে ক্যাপ্টেন ডিজি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিশেষ করে আমি যে-অঞ্চলে যাচ্ছি সেই দক্ষিণ খোটানে। উচ্চপদস্থ চিনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিঃ ম্যাকার্টনির ব্যক্তিগত সদ্ভাব ও প্রভাবের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। তাও-তাইয়ের সঙ্গে পরপর বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার ও অনেক চিঠিপত্রের আদানপ্রদানের পরই উনি হুকুমনামা জারি করেছিলেন। একের পর এক তথ্য তুলে ধরে তাও-তাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম আমার প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের উদ্দেশ্য, মধ্য এশিয়ার সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের ঐতিহাসিক সংযোগের কথা। উনি নিশ্চিন্ত হতে চাইছিলেন আমার উদ্দেশ্য নিয়ে; ওঁর সমস্ত সন্দেহ দূর করতে পেরেছিলাম মিঃ ম্যাকার্টনির সক্রিয় সহযোগিতায়।

তাও-তাইয়ের সঙ্গে আলোচনার সময় হিউয়েন-সাঙয়ের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত ‘সি-ইউ-কি’র প্রসঙ্গ বার বার ঘুরে ফিরে এসেছিল। প্রায় প্রত্যেক শিক্ষিত চিনা সরকারি আধিকারিকরা হয় এই বইটি পড়েছেন নতুবা এই বরেণ্য চৈনিক পরিব্রাজকের ‘পশ্চিমের দেশ’ ভ্রমণের নানা ঘটনার কথা শুনেছেন। আর আমি সেই ‘তাং যুগের মহান সন্ন্যাসী’র (তাং সেং) পদচিহ্নের হদিস তুর্কিস্তানের মাটিতে করতে চলেছি আর ঠিক একই ধরনের অন্বেষণ এর আগেও আমি ভারত-ভূমিতে করেছি জানার পর সহযোগিতার হাত এগিয়ে এসেছিল।

প্রায় প্রতিদিনই বন্ধুভাবাপন্ন বৃদ্ধ তাও-তাই বা তাঁর অধীনস্থ সিহ-তাই (সামরিক বাহিনীর জেনারেল) বা স্থানীয় ম্যান্ডারিনদের সঙ্গে অভিযান নিয়ে আমার সৌজন্যমূলক আলোচনা চলছিল। ওদিকে আমি মনে মনে তখন ভাবছিলাম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পূর্বকোণে ইতিমধ্যে না জানি কী রাজনৈতিক ডামাডোল শুরু হয়েছে।

চিনদেশীয় যুদ্ধের অশান্তি

গিলগিট থেকেই জেনে এসেছিলাম বিশ্বের নানা প্রান্তে শুরু হওয়া যুদ্ধের খবর। চিনদেশের ইউরোপিয়ান বসতিগুলো বিপদের আশঙ্কায় ছিল। উরুমচি থেকে কাশগর পর্যন্ত টেলিগ্রাম লাইন ছিল। চিনা কর্মকর্তারাও প্রতিনিয়ত যুদ্ধের খবর পাচ্ছিলেন। এদিকে ইউরোপে পিকিংয়ে গণহত্যা হয়েছে বলে একটা মিথ্যে খবর পৌঁছেছিল, সেই খবরটা আমাদের কাছে এসেছিল ইয়েমেনের মাধ্যমে (দূতাবাস- মিঃ ম্যাকার্টনির অফিস)। বার বার টেলিগ্রাম করে জানতে চাওয়া হচ্ছিল পরিস্থিতি। দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছিল পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও দূতাবাসের সবাই নিরাপদে আছে।

আমি কাশগরে পৌঁছনোর সপ্তাহ খানেক আগেই ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল এই অঞ্চল জুড়ে। মুসলিম ও চিনা গ্যারিসনের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়ে সংঘর্ষ বেঁধে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হতে বসেছিল নতুন গড়ে ওঠা ইয়াঙ্গি-শহরে (নতুন শহর)। পুরোনো শহর কাশগরে চিনা সামরিক অধিকর্তার আকস্মিক উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে খানিক জটিল করে তুলেছিল। তাও-তাইয়ের নিরাপত্তার জন্য সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত তৎপর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু উনি এক তাস খেলার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছেন এ-কথা জানার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছিল। ‘নতুন ডমিনিয়ন’ এলাকায় চিনা শাসনের বিরুদ্ধে গত মহাবিদ্রোহের (১৮৬৩-৭৭) স্মৃতি এখনো অটুট। তবে মরূদ্যানের কৃষক আর ছোটো ব্যবসায়ীরা মূলত নিরীহ ও শান্তিকামী। ইসলামের নামে ‘আন্দিজানি’দের তৈরি করা অশান্তির দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনবার ব্যাপারে তাদের কোনো উৎসাহ ছিল না।

চিনি-বাগে যেমনটা ছিলাম

স্যার ডগলাস ফোরসাইথ-এর পর থেকে অনেক ইউরোপিয়ান পর্যটক এই কাশগর অঞ্চলে ঘুরে গেছেন, তাই শহরের খুঁটিনাটি বিবরণ দেবার চেষ্টা করছি না। আমার দিনগুলো চিনি-বাগের ঘেরাটোপে চূড়ান্ত ব্যস্ততায় কাটছিল। বাইরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ কমই হচ্ছিল। যদিও তুর্কিস্তানের সমভূমির চূড়ান্ত গরমের সময়টা পার হয়ে গেছে, কিন্তু দুপুরের গরমটা ছিল দুঃসহ। তাই যতটা পারতাম সকালেই কাজগুলো এগিয়ে রাখতাম। খুব ভোরে উঠে বাগানের পপলার গাছের নীচে কাগজ আর বইপত্র নিয়ে বসে যেতাম পড়াশুনার কাজে।

এখানে এখন ফলের ভরা মরশুম। বাগানের ঢালে অ্যাপ্রিকট, পিচ আর আলুবোখারার গাছগুলো ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। বাগানের গাছের ছায়ায় বসে কাজ করতে করতে দেখতাম চাষি পরিবারের নারী-পুরুষরা দলে দলে টাট্টুঘোড়ার গাড়িতে ফলের ঝুড়ি চাপিয়ে গান করতে করতে শহরের বাজারের দিকে চলেছে। শুধুমাত্র ভিক্ষুকদের দেখতাম পায়ে হেঁটে যেতে। কখনো-কখনো অবশ্য ওদেরও দেখতাম গাধার পিঠে চেপে চলাফেরা করতে। সৌভাগ্য যে এখানে কোনো প্রাত্যহিক খবরের কাগজের বালাই নেই, নেই রোজকার চিঠিপত্রের আসা-যাওয়া। তাই কারিগরদের দিয়ে নিশ্চিন্তে কাজ করিয়ে নিতাম দিনভর। অনেক কাজই শেষ হয়ে এসেছিল।

প্রতিদিন প্রাতরাশের পর মিঃ ম্যাকার্টনি আমার সঙ্গে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে কাজ কতটা এগোলো দেখতেন, প্রয়োজনে নানা উপদেশ দিতেন। তারপর উনি চলে যেতেন ওঁর দফতরে। সেখানে বসে নানা রিপোর্ট লিখে পাঠাতে হত ভারত সরকারের অফিসে। ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রতিদিন অনেক লোক আসে। পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী, শিকারপুর থেকে এখানে এসে আস্তানা পাতা হিন্দু মহাজন, লাদাখি মালবাহক, রাসকামের কনজুটি বসবাসকারী… ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘মুল্কি সাহেব’( পলিটিকাল অফিসার) তুর্কিস্তানের রাজধানীতে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তা আর দেখভাল করার জন্যই তো আছেন।

আমি প্রতিদিন এক-দু’ঘণ্টা কাশগরের প্রধান মাদ্রাসায় গিয়ে তুর্কি ভাষা নিয়ে পড়াশুনা করতাম। প্রাচীন শাসন ব্যবস্থা ও ধর্মতাত্ত্বিক জীবন নিয়ে মাদ্রাসার পণ্ডিতরা উৎসাহ নিয়ে আলোচনা করতেন। দুপুরের খানিক আগের সময়টা আমি ব্যস্ত থাকতাম হসপিটালের এক সহকারীর খালি কোয়ার্টারে। ওর একটা ঘরকে আমি ফটোগ্রাফিক প্রসেস রুম বানিয়ে নিয়েছিলাম। এতদিন পর্যন্ত তোলা ছবিগুলোকে প্রসেস করে রাখাটা খুব দরকার ছিল। বিকেলে মিঃ ম্যাকার্টনি, ওঁর স্ত্রী বা অন্য কারও সঙ্গে গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে বেড়াতাম। কখনো-বা সদ্য কেনা টাট্টুঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াতাম। তবে সবচাইতে ভালো লাগত সন্ধেতে ছাদে বসে আড্ডা। ছাদে বসে প্রায়ই দেখতাম পরিবার নিয়ে কাশগরিরা পিকনিক সেরে ফিরছে। ফলের মরশুমে বাগানভরতি ফলের মাঝে দিন কাটিয়ে মহিলা, শিশু আর পুরুষদের টাট্টুঘোড়ার পিঠে বা গাড়িতে চেপে গান করতে করতে ফেরার দৃশ্য আমাকে অনেকদিন আগে শোনা হাঙ্গেরির নদীর ধারের রাস্তার কথা মনে করিয়ে দিত।

সন্ধেবেলা আধ-মাইল দূরের রাশিয়ান কনসুলেটের কসাক গার্ডরা একযোগে গান গাইত। বাতাসের ভেসে সে গানের ছেঁড়া ছেঁড়া সুর আমাদের কানে এসে পৌঁছোত, যেন সে আমাদের পশ্চিমের কথা মনে করিয়ে দিতে চায়। যখন প্রায়শই রাস্তা দিয়ে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের যেতে দেখতাম, কিন্তু তাদের ‘সাহেব’দের (বড়োকর্তাদের) সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ মেলেনি। যেমন কাশগরে নিয়োজিত রাশিয়ার ইম্পেরিয়াল কনসাল-জেনারেল এম. পেত্রোভস্কি। তিনি প্রাচীন ইতিহাসের একজন মহা পণ্ডিত। নৃতত্ত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ অসীম। নিজেও একজন পুরাকীর্তির সংগ্রাহক। আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য খুব উৎসুক ছিলাম। কিন্তু উনি অসুস্থ থাকায় সেই সুযোগ মেলেনি। মিলেছিল নয় মাস পরে খোটান অভিযান সেরে ফেরার সময়।

কনসুলেটের কল্যাণে সেখানে একটা ছোটোখাটো রাশিয়ান উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। রাশিয়ানরা ছাড়া কাশগরে যেসব ইউরোপিয়ানরা ছিলেন, তাঁরা হলেন ফাদার হেনড্রিকস এবং সুইডিশ ধর্মপ্রচারক, মিঃ জি. রাকুয়েট ও তাঁর স্ত্রী। এঁদের সঙ্গে প্রায়শই দেখা হত। ফাদার হেনড্রিকসকে অনেক বছর আগে তাঁর জন্মভূমি হল্যান্ড থেকে মঙ্গোলিয়াতে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে এখন তাঁর ঠাঁই হয়েছে কাশগরে। আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যের আদর্শ বজায় রাখতে চিনি-বাগে তাঁর সশরীরে ঘন ঘন আগমন ঘটত। মিঃ ম্যাকার্টনির বাড়িতে এঁরা ছাড়াও রাশিয়ান কনসুলেটের লোকজন আর কিছু চিনা উঁচু পদের কর্তাব্যক্তি প্রায়শই আড্ডা দিতে আসতেন। বসত সত্যিকারের আন্তর্জাতিক আসর। সহৃদয় ধর্মপ্রচারক নিজে পক্ষপাতশূণ্যভাবে নানা পরস্পরবিরোধী সূত্র থেকে সংগ্রহ করা খবর আর গুজব ঝাঁপি ভর্তি করে নিয়ে আসতেন চিনি বাগে। সংবাদপত্রের খামতি মিটিয়ে দিত এঁদের কাছ থেকে পাওয়া নানা খবর।

এখানে আসার পর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে যে প্রাচীন কাঠামোর ধ্বংসাবশেষগুলো আমি প্রথমেই দেখেছিলাম সেগুলো নিয়ে বলা যাক। কাশগর প্রাচীন সাম্রাজ্য ‘কি-শা’র রাজধানী ছিল বলে অনুমান করা হয়। হিউয়েন-সাঙ এই স্থানকে সহস্র বৌদ্ধমঠের অবস্থান বলে বর্ণনা করেছেন। প্রাক-মহম্মদ যুগের নানা সামগ্রীর নমুনা, কম হলেও, এখানকার মাটির ওপর এখনও বর্তমান। সবচাইতে সুস্পষ্ট চিহ্ন হল এক সূর্যের আলোয় শুকোনো ইটের গাঁথুনির ঢিবির ধ্বংসাবশেষ, যা ভেঙেচুরে গেলেও মাটির ওপর মাথা তুলে আছে। চিনি-বাগ থেকে উত্তর-পশ্চিমে মাইল দেড়েক দূরে তুমেন-দরিয়া নদীর তীরে এই ধ্বংসাবশেষ দেখলে বোঝা যায় যে স্তূপখানা কতখানি বিশাল।

তুমেন-দরিয়া নদীতীরের ঢিবির বর্তমান উচ্চতা ৮৫ ফুট আর পুব থেকে পশ্চিমে ভিতের ব্যাস ১৬০ ফুট। কিন্তু সঠিকভাবে জরিপ না করে এই স্তূপ অতীতে কীরূপ ছিল বা এর কেন্দ্রবিন্দু কোথায় ছিল, তা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। এর গাঁথুনির নরম ইট বহুলাংশে খসে গেছে। আমার মনে হয় এর ভিত কম করেও মাটির নীচে ১৫ ফুট গভীরে আছে। এখন এর চারপাশে গড়ে উঠেছে চাষের খেত। মূলত নদীর পলি জমে জমে নদীখাতের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়াতে স্তূপের অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই, এই স্তূপ প্রাচীন খোটানের রাজধানীর অন্তর্গত ছিল।

শহরের দক্ষিণে এর চাইতে ছোটো এইরকম আরও একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেয়েছি। সেই স্তূপ নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখছি না। আধুনিক শহরের আশেপাশে এরকম অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে আমার দেখা নতুন এলাকাগুলোর বিবরণ আমি আর দিচ্ছি না। শুধু ‘নতুন শহর’ অর্থাৎ কাশগরের চিনা সেনানিবাস এলাকায় যাবার পথে চারপাশে নজরে আসা আমার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কথা আমার ডায়েরিতে নথিভুক্ত করে রাখছি।

লিউ-কিন-তাং মন্দির পরিদর্শন

মিঃ ম্যাকার্টনির চু-কুয়ানস বা সহকারী শহর-প্রধানের সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন ছিল। আমিও খানিক চিনা জিনিস ‘কেনাকাটা’র জন্য ওঁর সঙ্গ নিয়েছিলাম। অন্যদিনের তুলনায় রোদ ঝলমলে দিনটা খানিক ঠান্ডা-ঠান্ডাই ছিল। নতুন আর প্রাচীন কাশগরের মধ্যে একটা মাইল আটেক চওড়া গাছে ছাওয়া রাস্তা আছে। এই রাস্তা ধরে টাট্টুঘোড়ার গাড়ি চেপে যেতে যেতে দু-পাশের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। প্রায় মাঝপথে কিজিল-সু নদীর এক শাখা অতিক্রম করেছিলাম। নদী লালচে-বাদামি জলে কানায় কানায় ভরা। নদীর জলই বলে দিচ্ছিল দূর পাহাড়ে প্রবল বর্ষার কথা।

‘নতুন শহর’-এর উত্তর-পশ্চিম সীমার কাছাকাছি আসতেই নতুন নতুন রাজসিক বাড়িঘর একের পর এক দেখা দিতে শুরু করেছিল। প্রথমেই যে দ্রষ্টব্য স্থান এসেছিল সেটি হল প্রসিদ্ধ চিনা সেনাপতি লিউ-কিন-তাং-এর স্মৃতিতে গড়া চিনা মন্দির। ১৮৭৭ সালে ইয়াকুব বেগের মৃত্যুর পর সেনাপতি লিউ-কিন-তাং তুর্কিস্তান পুনরুদ্ধার করেন। আমরা মন্দিরটি দেখতে ঢুকেছিলাম।

পপলার গাছে ছাওয়া একটা বিশাল মাঠের মাঝখানে মন্দিরটি। একটা সুন্দর কারুকার্য করা বড়ো গেটের মধ্যে দিয়ে আমরা মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিলাম। প্রাঙ্গণটি বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ভালো রক্ষণাবেক্ষণের পরিচায়ক। গেটের খানিক দূরেই মাটি থেকে প্রায় ফুট আটেক উঁচু কাঠের মঞ্চ। মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে উঠে মন্দিরের ভেতরে ঢোকার মুখে একটা সাজঘর ধরণের ঘরে প্রথমেই নজর কেড়েছিল দেওয়ালময় কাঠকয়লায় আঁকা ইউরোপিয়ানদের ছবি।

মূল মন্দিরটি এক বিশাল হলঘর। সেখানে ঢোকার মুখের দরজার ওপরে লালের ওপর জ্বলজ্বলে সোনার অক্ষরে লেখা একটি বোর্ড। স্মৃতি মন্দিরের ভেতরের সুপরিকল্পিত অঙ্গসজ্জা প্রশংসার যোগ্য। হলের ডান আর বাঁ-পাশের দেওয়ালগুলোতে পরপর লিউ-কিন-তাং-এর জয়গাথা, প্রশাসনিক কার্যকলাপ আর ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনা-সহ বড়ো বড়ো দেওয়াল চিত্র। রয়েছে বিদ্রোহ দমনকালের নানা যুদ্ধ ও অবরোধের ছবি। বিদ্রোহে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া আন্দিজানি ও উরুমচি এবং ঘন চামড়ার তাতার জনগণের ছবিও বিশ্বস্ততার সঙ্গে আঁকা হয়েছে। দেখলাম জেনারেল সভায় বসে আছেন, অপরাধীদের বিচার করছেন, প্রভিনশিয়াল গভর্নর হিসাবে রাজ্যের সমস্ত প্রধান অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন এরকম ছবির পাশাপাশি জেনারেলের পৈতৃক বাড়িতে ফিরে যাবার দৃশ্য, বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে দেখা করবার ছবি, ইত্যাদি। লিউ-কিন-তাংকে একজন সাধক হিসেবেও দেখা হয়। নিঃসন্দেহে এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের মহৎ জীবনের অসামান্য চিত্রভাষ্য। এদেরকে তুলে নিয়ে ঠিকঠাক সাজালে তা ইউরোপের যে কোনো নৃতাত্বিক জাদুঘরের সম্পদ হতে পারত।

যা দেখে সবচেয়ে মজা লাগল, তা হল- হলের ঠিক মাঝখানে সোনার গিলটি করা বেদীর ওপরে আধুনিক পাশ্চাত্যরীতিতে ফ্রেমে বাঁধানো জেনারেলের এক বিরাট ফোটোগ্রাফ রাখা রয়েছে।

মন্দিরের মধ্যে এই জায়গার পরলোকগত নায়কের আশেপাশে কোনো চিনা দেবদেবীর প্রতিকৃতি নেই। হলঘরের বেদী এলাকা বাদ দিলে, দেওয়াল জুড়ে দুটো বিশাল আকারের পৌরাণিক ড্রাগনের ছবি আঁকা রয়েছে। বাঁদিকেরটি ঝড় সৃষ্টি করতে পারা ড্রাগন। যিনি এঁকেছেন সেই শিল্পীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেই হয়। ছবিতে ড্রাগনের মুখ থেকে বেরোনো আগুনের ঝলকানিতে তৈরি হওয়া ধোঁয়ার মেঘের অপূর্ব ছবি দেখে হিউয়েন-সাঙ বর্ণিত ভয়ংকর ‘নাগ’দের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল যিনি বরফ ঝরিয়ে আর হাওয়া বইয়ে পামিরের উচ্চতা রক্ষা করেন। চিনা দৃষ্টিতে যে অতীতের মতো এখনও প্রাকৃতিক শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হল, তা বোঝা গেল। উল্টোদিকে আর একটি ছবি ছিল। অর্ধেক মানব আর অর্ধেক বাঘ। ড্রাগনের চোখে-মুখে যেমন উগ্রতা, ঠিক তার বিপরীত ভাব বাঘ-মানুষের মধ্যে। এক চরম হতাশা ছেয়ে। শিল্পী বা শিল্পীরা কেন যে এদের এমন দু-রকম অভিব্যক্তির ছবি এঁকেছিলেন কে জানে?

মন্দিরের পুরোহিত মিঃ ম্যাকার্টনির দিকে এগিয়ে এসে বিনয়ের সঙ্গে লাজুক মুখে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করলেন। মিঃ ম্যাকার্টনির এখানে চিনা ভাষায় পরিচয় ‘মা-শাও-ইয়েহ’ নামে। মন্দিরের পুরোহিত ছোটোখাটো চেহারার লামা, কাছের এক ছোট্ট মঠ থেকে এখানে আসেন। কিন্তু যখন ছবি তোলার প্রসঙ্গ এল তখন পুরোহিত মশাই একদম কাঁচুমাচু মুখ করে ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। ভয়ংকর কিছু হতে যাচ্ছে ভেবে নিজেকে শক্ত করছিলেন উনি। ছবি তোলার কাজটি সারা হয়ে যাওয়ার পর স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন।

চিনা ক্যান্টনমেন্ট

ছোটো শহরতলির মধ্যে দিয়ে নতুন শহর ইয়াঙ্গি-শহরের উত্তরদিকের প্রবেশদ্বার পার হতেই পুরো চিনা বসতির রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। ছোটো ব্যবসায়ীরাও প্রায় সবাই চিনা। রাস্তার দু-পাশে সার সার চিনা খাবারের দোকান। সর্বত্র চিনা সৈন্যদের উপস্থিতি। ঠিক দুর্গ শহরের পরিবেশ। নানা সরকারি অফিস ভবনের ঠিক পেছনেই সেনা ছাউনির প্রধান বাজার।

পুরোনো শহরের থেকে নতুন শহরে অনেক অনেক বেশি চিনা দোকান। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দরভাবে সাজানো। দেখলেই মনে হবে একবার ঢুকে দেখি। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘শপিং’ খুব একটা পছন্দ করি না, কিন্তু উপহার হিসেবে বন্ধুবান্ধব ও বাড়িতে পাঠানোর জন্য জন্য সিল্কের পোশাক আর বিচিত্র ধরনের বাসনপত্র না ঘেঁটে পারলাম না। যদিও ভালো করে দেখার মতো সময় প্রায় ছিলই না।

এক শিল্পী প্রশাসক

কয়েকটা দোকান ঘুরে আমরা মিঃ ম্যাকার্টনির চিনা বন্ধু লিউ-লাই-চিনের বাড়িতে পৌঁছেছিলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর করে সাজানো বাড়িটি শহর-প্রধানের বাড়ির কাছেই। মিঃ লিউ-লাই-চিন শুধু একজন সুদক্ষ প্রশাসকই নন, একজন গুণী শিল্পীও। মিসেস ম্যাকার্টনিকে উপহার দেওয়া ওঁর আঁকা ছবি আমি আগেই মিঃ ম্যাকার্টনির বাড়িতে দেখেছি। বিশাল সুসজ্জিত ড্রয়িং-রুমটি একাধারে পড়ার ঘর, তথা অফিস। আবার ছবি আঁকার স্টুডিও বটে। দেওয়ালে ঝোলানো তুলির সূক্ষ্ম কাজগুলো দেখতে দেখতে মনটা আনন্দে ভরে গেছিল। আমার অভিযান নিয়ে ওঁর উৎসাহ উনি আকার-ইঙ্গিতে প্রকাশ করছিলেন। পুরাকীর্তি নিয়ে ওঁর জ্ঞান যথেষ্ট। হিউয়েন-সাঙ কথিত ‘নতুন সাম্রাজ্য’-এর প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। যদিও আলোচনার খুবই সামান্যই আমার বোধগম্য হচ্ছিল, তাও মিঃ ম্যাকার্টনি খানিক তর্জমা করে দেওয়ায়।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%