স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
সমাজের কাছে, এক গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষদের কাছে অন্য কোনও মানুষ বা অন্য কিছু মানুষ কি অতিরিক্ত হয়?
প্রয়োজনীয় তো হয় জিনিসপত্র। কিন্তু মানুষ? তাকেও কি প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মতো দু'ভাগে ভাগ করা যায়? ছোটবেলায় আমাদের মফস্সলের একজন মানুষ ছিল যে সবকিছুকেই প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন হিসেবে ভাগ করে নিত। ধরে নেওয়া যাক, তার নাম ছিল সমীর।
এই সমীরকাকা ছিল চলন্ত লাল কালির পেন। সারাক্ষণ সবাইকে যেন মনে মনে নাম্বার দিত আর বাতিল বা অপ্রয়োজনীয় বলে দেগে দিত। সমীরকাকার ভাষায় ছিল, ‘সব ফালতু এরা। সব আব্বুলিশ!’
সমীরকাকার দিক থেকে দেখলে বেশ কিছু আব্বুলিশ মানুষ ছিল আমাদের ছোট্ট মফস্সলে। তাদের মধ্যে একজন ছিল ছারপোকা!
না, এটা তার আসল নাম নয়। আসল নাম যে কী কেউ জানে। কেউ জানতে চেষ্টাও করেনি কোনওদিন! সবাই তাকে ছারপোকা বলেই ডাকত।
লোকটা ছিল বেশ বেঁটে। রোগা। এক গাল কাঁচা-পাকা দাড়ি। মাথায় সামান্য উস্কোখুস্কো চুল। আর শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সবসময় লোকটার পরনে থাকত একটা বেঢপ সাইজের মেরুন সোয়েটার। হাতে থাকত কাঠের বাঁকানো বাঁটওলা একটা ছাতা! নিজের মনে একা একা সমগ্র নঙ্গী আর বাটানগর জুড়ে ঘুরে বেড়াত লোকটা। কারও সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলত না।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপারটা হল এই যে লোকটাকে কেন কে জানে ছারপোকা বললেই প্রচণ্ড রেগে যেত! আর যে যত রাগে তাকে ততই বেশি রাগানো হয়! সবাই জানে এটাই নিউটনের চতুর্থ সূত্র! ফলে নানান ক্লাবের ওপাড়ার-বেপাড়ার ছেলেরা মজা পাওয়ার জন্য লোকটাকে দেখলেই সুর করে চেঁচাত, ‘ছাআআর-পোকাআআ!”
ব্যাস, এই একটা শব্দই ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটিয়ে দিত। সেই শান্ত নরম নিরীহ মানুষটার মধ্যে থেকে যেন একটা দৈত্য বেরিয়ে আসত নিমেষে। তারপর কী গালাগালি! কী গালাগালি!
সেই ছোট বয়সে শালা, বাঞ্চোত আর শুয়োরের বাচ্চা ছিল আমাদের খারাপ কথা বোঝার স্টক। সেখানে সেই ছারপোকা বাবা মা ভাই বোন ছেলে মেয়ে সবাইকে জড়িয়ে নিয়ে কী যে সব গালি দিত কিচ্ছু বুঝতে পারতাম না। কিন্তু সেই ছারপোকা, কাঠের হাতলওলা ছাতাটা ঘোরাতে ঘোরাতে, চিৎকার করতে করতে সেইসব ছেলেপিলেদের এমন গালি দিত আর হাত-পা ছুড়ত যে তাতে আশপাশের সবার খুব আমোদ হত! মিথ্যে বলব না, আমরাও না-বুঝে কতবার ওই মানুষটাকে দেখে হেসেছি! সামান্য ‘ছারপোকা’ শব্দের মধ্যে কী ছিল কে জানে! কিন্তু শব্দটা শুনলেই লোকটার হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হয়ে যেত যেন! সমীরকাকা এক চোট হেসে বলত, ‘আব্বুলিশ মাল যত!’
আরেকজন ছিল ‘চিনিচোর’। বয়স্ক দিদিমা। আমাদের সর্দারপাড়ার থেকে একটু দূরের সানিপাড়া বলে একটা জায়গায় থাকত। দিদিমা ছিল বেঁটেখাটো। খুব ফর্সা। মুখে অসংখ্য হিজিবিজি দোমড়ানো কাগজের মতো দাগ। দেখতাম, দিদিমা মলিন সাদা শাড়ি পরে খালি পায়ে হাতে একটা ছোট্ট শিশি নিয়ে মনীন্দ্রদার মুদির দোকানে আসত তেল নিতে। রোজকার তেল রোজ নিত। হতদরিদ্র ছিল সেই দিদিমা! আমার মাকে দেখতাম মাঝে মাঝে দিদিমাকে কিছু না কিছু রান্না করে দিত। চাল, চিনি, চায়ের পাতা, মুড়ি, বিস্কুটও দিত সুযোগমতো। তবে সবটাই খবর কাগজে মুড়ে। যাতে পাড়ার কেউ দেখতে না পায়। সেই দিদিমাকেও পাড়ার বেপাড়ার ছেলেরা কোনও কারণ ছাড়াই ঠিক একই রকম সুর করে বলত, ‘চিনিইই-চোওওর’! ব্যাস, এখানেও আগুন লেগে যেত৷ ওই শান্ত দিদিমার মধ্যে থেকেও অচেনা একটা মানুষ বেরিয়ে আসত। তারপর কী গালাগালি কী গালাগালি! সমীরকাকার ভাষায় এও ছিল এক আব্বুলিশ!
আরেকজন ছিল যোগেন সর্দার। আমাদের যে সর্দারপাড়া সেটা নাকি এই যোগেন সর্দারদের কোনও এক পূর্বপুরুষের নামে। কলকাতা থেকে নঙ্গী, বজবজসহ সব জায়গাই নাকি এক সময় রাজা বসন্ত রায় ও পরে মহারাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের মধ্যে ছিল। এই অঞ্চলে শুনেছি তাঁদেরই সৈন্যবাহিনীর সর্দারদের গ্রাম ছিল। সত্যি মিথ্যে জানি না, কিন্তু ছোটবেলায় এসবই শুনেছি লোকমুখে।
সেই সর্দারবাড়ির লোক ছিলেন যোগেন সর্দার। বেঁটে, মাথায় কদম ছাঁট দেওয়া পাকা চুল। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মানুষটি ছিলেন খুব চুপচাপ। আমাদের বাড়িতে আসতেন মাঝে মাঝে। মিষ্টিদাদুর সঙ্গে কথা বলতেন। মা চা করে দিলে খেতেন। আর বিকেলবেলা গিয়ে আমাদের দাদুর দোকানে বসতেন। সেই যে তাস খেলা হত, তার নীরব দর্শক হয়ে থাকতেন। তবে মাঝে মাঝে তাঁকেও আমি খেলতেও দেখেছি। মানে রোজকার কোনও খেলোয়াড় না এলে যোগেন সর্দারকে তাদের জায়গায় খেলতে বসতে দেওয়া হত। আবার এমনও দেখেছি, যে খেলোয়াড় আগে আসেননি সে মাঝপথে এসে হাজির হয়েছেন আর যোগেন সর্দার অম্লান মুখে তাঁকে জায়গা ছেড়ে আবার খেলোয়াড় থেকে দর্শক হয়ে গিয়েছেন! কোনওদিন তাঁকে আমি রাগ করতে দেখিনি। কাউকে কটু কথা বলতে দেখিনি।
আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল যোগেন সর্দারদের বাড়ি। অনেকটা জায়গার ওপর বেশ অনেক ক'টা বাড়ি! অধিকাংশই ইটের বাড়ি, মাথায় টালি দেওয়া। অনেক ছেলেমেয়ে ছিল ওঁর। কেউই খুব একটা পড়াশুনো করত না। আর মাঝে মাঝেই জগা নামে তাঁর এক ছেলে মদ খেয়ে ভীষণ গোলমাল করত! যাকে পারত তাকে পেটাত। অশ্রাব্য গালিগালাজ করত! জিনিসপত্র নিয়ে এসে ছুঁড়ে ফেলত ওই সবুজ জলের পুকুরে! আর আমি দেখতাম পাশের বাঁশবনে গিয়ে যোগেন সর্দার চুপ করে বসে আছেন।
আমি বালকোচিত কৌতূহলে পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘দাদু তুমি বাঁশবনে বসে থাকো কেন গো?'
যোগেনদাদু উত্তর দিতেন, ‘হাওয়ার শব্দটা ভাল লাগে। সূর্যের ছোট ছোট আলোর টুকরোগুলো মাটিতে পড়ে। ভাল লাগে!’
এখন বুঝি ওই কুৎসিত পরিস্থিতি থেকে একরকম পালাবার জন্যই যোগেনদাদু ওই বাঁশবনে গিয়ে বসে থাকতেন। সমীরকাকা তো একবার যোগেনদাদুকে বলেওছিল, *আমার অমন ছেলে থাকলে পেছনে লাথি মেরে কবে বের করে দিতাম! আপনি পারেন না! কীসের সর্দার আপনি? ফালতু যত্তসব আব্বুলিশ লোকজন!’
আরেকজন এমন মানুষ ছিলেন। সারা নঙ্গী-বাটানগর তাকে মাস্টার বলে ডাকত। মাস্টাররা কয়েক ভাই ছিল। তাদের খাটাল ছিল একটা। সেখান থেকে গরু-মোষের দুধ নিত লোকজন। এ ছাড়াও তারা সাইকেলে করে ওই দুধ বাড়ি বাড়ি দিত। মাস্টারকেও দেখতাম মাঝে মাঝে সেই দুধ দিতে বেরতে।
মাস্টারকে সবাই পেছনে পাগল বলে ডাকত। বড় বড় চোখদুটো খুব মোটা কাচের চশমার আড়ালে সারাক্ষণ যেন কীসের একটা আগ্রহে উদগ্রীব হয়ে থাকত। কদম ছাঁট চুলে খড়কুটো, পাতা, ধুলোবালি লেগে থাকত। ঘিয়ে রঙের একটা পাঞ্জাবি আর আধময়লা ধুতি পরত মাস্টার। ঠোঁটের কোণদুটো থুতুতে সাদা হতে থাকত। পায়ে থাকত প্লাস্টিকের পাম শু। গায়ে কেমন একটা টক দইয়ের মতো গন্ধ! স্নান করত না ভাল করে। কিন্তু এই লোকটাই অঙ্ক অঙ্ক করে পাগল হয়ে থাকত সারাক্ষণ।
নানান বাড়িতে গিয়ে জানলা দিয়ে ডেকে বলত, কারও কোনও অঙ্ক বাকি আছে কি না! কেউ কোনও অঙ্ক কি পারছে না? তা হলে সে অঙ্ক করে দিয়ে যাবে! আমি কতবার দেখেছি মাস্টারকে দিয়ে কত্ত ছেলেমেয়েরা নিজের অঙ্ক করিয়ে নিচ্ছে!
‘দি লাইফ’-এর ওষুধের দোকানের বাঁধানো সিঁড়িতে, আশা-লতার বাবার চপের দোকানের সামনের বেঞ্চিতে, বা যুগলের সেলুনের সামনে সাইকেলের সিটে খাতা রেখে কতবার দেখেছি মাস্টার কোনও ছেলে বা মেয়েকে অঙ্ক করে দিচ্ছে! না, এর বিনিময়ে মাস্টার কোনও টাকা নিত না বা কারও থেকে কোনও কিছু খেতও না! মানে কেউ প্রতিদানে কিছু দিতে চাইলে নিত না কিচ্ছু। বরং তাকে বলতে শুনেছি, ‘বিদ্যা বিক্রি করি না!’
পাড়া-বেপাড়ার ছেলেরা তার থেকে উপকার নিলেও, পরে তাকেও কিন্তু রেয়াত করত না। সেই একই ভাবে সুর করে ‘পাগলা' বলে ডাকত। কিন্তু মাস্টার কিছুই বলত না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। নাক থেকে পিছলে পড়া মোটা কাচের চশমা ঠেলে তুলত। তারপর নীল বেড কভারের মতো আকাশের দিকে হাত তুলে আবার নিজের মতো আঁকিবুকি কাটত! এও ছিল সমীরকাকার মতে আব্বুলিশ মানুষ !
আমাদের ছোট মফস্সলে এমন ‘আব্বুলিশ' মানুষ কত যে ছিল তার ঠিক নেই! সঞ্জীব পাগলা, যে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবর শুনে রাস্তার মধ্যে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিল! চাঁপাজেঠি, জেঠু মারা যাওয়ার পরে যে আর কারও সঙ্গে কথা বলত না কখনও! বিউটিপিসির বাবা, যে গভীর রাতে আকণ্ঠ মদ খেয়ে অদৃশ্য কার সঙ্গে যেন রোজ ইংরেজিতে ঝগড়া করতে করতে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যেত! আশিসদার কাকা যে সারাদিন সিঁড়ির ঘরের তলায় বসে এক মনে ঠোঙা বানাত! পলতাজেঠু, যে স্টেশনের সামনের চায়ের দোকানগুলোয় ঘুরঘুর করত কেউ যদি একটু চা খাওয়ায় এই আশায়! বিনিপিসি যে অনেক বয়স অবধি বিকেল হলেই স্নান সেরে, মুখে সাদা করে পাউডার মেখে, লাল ফিতে দিয়ে চুল বেঁধে বারান্দায় এসে দাঁড়াত এই ভেবে যে কোনও দিন তার বর আসবে তাকে নিতে!
এমন যে কত্ত আব্বুলিশ মানুষ ছিল! তারা কোনও কাজে লাগত না। পাড়ায় ড্রেন কাটা হল, সবাই হাত লাগাল, তারা লাগাল না। বন্যার সময় গঙ্গার পাশে বাঁধ দিতে ভিড় হল! তারা গেল না! মিতালি সঙ্ঘের খেলার মাঠের মারামারিতে অনেকে আহত হল, তাদের নিয়ে সাজ সাজ রব উঠল! এই অ্যাম্বুলেন্স এল! পুলিশের গাড়ি এল! কত মানুষ ভেঙে পড়ল! তারা গেল না!
আমাদের স্কুলের এক আন্টির স্বামী আর ছেলে এক রবিবার বাটার রাস্তায় বাসের ধাক্কায় মারা গেল। সারা বাটানগর ভেঙে পড়ল। রাস্তায় লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত দেখে কতজন ভয় পেয়ে গেলাম! কিন্তু এই সব মানুষগুলো এই সমস্ত কিছুর থেকে দূরে নিজের মতো থাকল!
সমীরকাকার মতো সবাই যা তা বলত এদের! বলত, কোনও কাজে লাগে না। বলত, এগুলোকে পাড়া থেকে বের করে দিতে! সেই বলার মধ্যে কী যে তাচ্ছিল্য থাকত, অবজ্ঞা থাকত, সেই আট-নয় বছর বয়সের আমিও বুঝতে পারতাম! সেই বয়সে কিছু না বুঝে ঝাঁকের সঙ্গেই চলতাম। সেটাকেই সুরক্ষিত মনে হত। তাই এই লোকগুলোকে মাঝে মাঝে আমিও ব্যঙ্গ করতাম। দেখে হাসতাম! রাগ করতাম। শুধু মা বলত, ‘এমন করতে নেই!’ বলত, ‘এই পৃথিবীতে সবাই একরকম নয়। সবার অনুভূতি আর তার প্রকাশ একরকম নয়!’ বলত, ‘ওদের দেখে হাসবি না একদম! সব মানুষের একটা সম্মান আছে। সব জীবনের দাম আছে! কেউ অপ্রয়োজনীয় নয়। সবাই ভালবাসা চায়! একটু ভাল কথা শুনতে চায়!’
এখন এই মধ্য বয়সে এসে সেইসব আব্বুলিশ মানুষদের কথা খুব মনে পড়ে আমার।
মনে হয় আমি বা আমরাও কি জীবনের নানান ক্ষেত্রে এমন আব্বুলিশ নই! নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদে কিছু নির্দিষ্ট কাজ রুটিনমাফিক করে যাওয়া ছাড়া আর কীই-বা করি আমরা! কেউ কেউ আমাদেরও তো অমন অনর্থক খারাপ কথা বলে। অপমান করে। দুয়ো দেয়! ক্ষমতার সামনে, মারমুখী জোটের সামনে, আমরাও কি নিরুপায় হয়ে তাকিয়ে থাকি না! মাথা নামিয়ে নিই না! বা মাঝে মাঝে অক্ষম আক্রোশে কেবল মনে মনেই নিষ্ফল প্রতিবাদ জানাই না? জীবনের কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমরাও কি আব্বুলিশ নই!
বহুদিন হল মফস্সল শহর ছেড়ে চলে এসেছি আমি। কিন্তু সেই অসহায় মানুষগুলোর মুখ আমার আজও মনে পড়ে! না, আর হাসি পায় না। বরং একসময়, অবুঝ বয়সে হাসতাম বলে আজ গ্লানি হয়। মনখারাপ লাগে! চারিদিকের হিংসা আর অনাবশ্যক অপমানের মধ্যে আমিও মনে মনে একটা বাঁশবাগান খুঁজি! যেখানে আজও সারাদিন সুন্দর হাওয়া বয়! যেখানে সূর্যের ছোট ছোট আলোর টুকরো রাংতার মতো ছড়িয়ে থাকে মাটিতে! যেখানে কেউ এসে আর অকারণে ক্ষতবিক্ষত করে না আমাদের। চিনিচোর বলে না। ছারপোকা বলে না। বলে না পাগলা মাস্টার বা আব্বুলিশ!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন