স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
সবাই মফস্সল থেকে কলকাতার স্কুলে পড়তে যেত। কিন্তু আমি কলকাতা থেকে পড়তে যেতাম মফস্সলে!
বাটানগরে থাকার সময়ই আমি নঙ্গী হাই স্কুলে ভর্তি হই। সেটা ছিল সাতাশি সাল। নঙ্গী স্কুল আমাদের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার খুব নামকরা স্কুল ছিল। এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য যে এন্ট্রান্স পরীক্ষাটা নেওয়া হত তা সিলেকশন টেস্ট ছিল না, ছিল এলিমিনেশন টেস্ট!
আমার মা চেয়েছিল আমি কলকাতার কোনও স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু সেভাবে কেউ ছিল না যে উদ্যোগ নিয়ে আমাকে কলকাতার স্কুলে ভর্তি করবে। আমার ছোট পিসেমশাই নঙ্গী স্কুলের কমার্সের টিচার ছিল। আমি তাকে পিসাই বলতাম। মনে আছে নঙ্গী স্কুলে ভর্তির পরীক্ষার আগেরদিন পিসাই আমার জন্য অ্যাডমিট কার্ড এনে দেয়। আর হাতে থাকা একমাত্র সন্ধেবেলা মা আমায় যতটা সম্ভব পড়ায়!
ক্লাস ফোর অবধি আমি যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছি তাই বাংলা মাধ্যমের স্কুলের সিলেবাস সেভাবে জানতাম না। বিশেষ কবে বাংলা বইটা তো সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। আর সেটা আমি পড়েও যাইনি। তাও পরীক্ষা দিয়ে এসেছিলাম। কেমন দিয়েছিলাম কে জানে! শুধু মনে আছে বাংলায় প্রশ্ন হলেও অঙ্ক করে এসেছিলাম ইংলিশে !
মেরিট লিস্টে শেষের দিকে নাম থাকলেও স্কুলে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম আমি। ক্লাস ফাইভ। সেকশন বি। রোল নাম্বার বিয়াল্লিশ।
অর্থাৎ আমি ছোট স্কুল টপকে হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। এখানে একটা কথা বলি। আমাদের বাড়ির সবাই খুবই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল! নানানরকম পুজো-আচ্চাও হত বছরভর। কিন্তু আমি যেই কলকাতার কোনও স্কুলে ভর্তি হতে পারলাম না, অমনি আমার মা বাড়িতে সরস্বতীপুজো বন্ধ করে দিয়েছিল! আমার মায়ের মধ্যে একটি ছোট্ট বালিকা ছিল আজীবন। যে সারাক্ষণ কোনও না কোনও কারণে অভিমান করত! এখন লিখে একটু পরিচিতি হয়েছে দেখলে মা কি আবার সরস্বতীপুজো শুরু করত! কে জানে!
আমাদের নার্সারি দারুণ স্কুলে ডিসিপ্লিন ছিল খুব। শু পরে যেতে হবে। জামাকাপড় পরিষ্কার ও ভাল করে প্রেস করা থাকতে হবে। সবাইকে চিরুনি নিয়ে যেতে হবে। নখ কাটা থাকতে হবে। টিফিন বক্সের সঙ্গে কোলে পাতার তোয়ালে নিয়ে যেতে হবে! ইত্যাদি ইত্যাদি!
আর সেখান থেকে হাই স্কুলে এসে প্রথমেই কালচারাল শক লেগেছিল আমার। নঙ্গী স্কুল ওই পরগনার সবচেয়ে নামকরা স্কুল হলেও, সেখানের অধিকাংশ ছাত্র আসে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। তাদের জীবনযাপনের মধ্যে অমন ডিসিপ্লিন নেই! অমন সফিস্টিকেশন নেই! দেখতাম অধিকাংশ ছেলেরা হাওয়াই চটি পরে স্কুলে আসছে। আমাদের সাদা জামা কালো প্যান্ট ড্রেসের সেভাবে কোনও পরিচ্ছন্নতা নেই সবার! অনেকেই নখ কাটে না। নখের তলায় ময়লা। টিফিনে লাইন করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে নিয়ে যায় না কেউ। বরং বলা যায় কেউ হাতই ধোয় না।
রাস্তার যে জিনিস খেতে আমার বাড়ি থেকে বারণ করত, দেখতাম স্কুলের মেন গেটের বাইরে সেসবই বসে। সেই আইসক্রিম, কুলফি, মশলা মুড়ি, বাদাম মাখা, কুলের আচার! আর সবটা যে হাইজিনিক উপায়ে বানানো তাও নয়!
মানে আমিও বাড়ি থেকে কিনে দিলে এসব খেতাম। তবে কম! কিন্তু এখানে দেখতাম কিছু ছাত্র রোজ এসব খাচ্ছে! দেখতাম অবলীলায় একে অপরের টিফিন বক্সের মধ্যে না-ধোওয়া হাত ডুবিয়ে খাবার তুলে নিচ্ছে! ক্লাস ফাইভের বাচ্চা হয়েও ‘এই শালা’ বলে কথা বলছে!
স্যারেরাও কেমন যেন এলোমেলো! চেঁচিয়ে বকছেন! কঞ্চি দিয়ে বেধড়ক মারছেন! চড় থাবড়াও দিচ্ছেন পড়া না পারলে৷ তার সঙ্গে এটাও দেখলাম যে আমাদের স্কুলে পাখা নেই!
জানুয়ারিতে ভর্তি হয়েছিলাম বলে বুঝতে পারিনি, কিন্তু মার্চ আসতে আসতে পাখার অভাব বুঝতে পেরেছিলাম। তার সঙ্গে এখানে কেমন যেন টানা বেঞ্চ! তাতে খোদাই করে কত কী লেখা! ক্লাসের চুনকাম করা দেওয়ালগুলো ড্যাম্প পরে নীল হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝেই প্লাস্টার খসে পড়ছে। চারিদিক অপরিচ্ছন্ন! তার সঙ্গে এত স্টুডেন্ট। হই হট্টগোল! বড় দাদারা পাত্তা দেয় না!
ঝকঝকে, সুন্দর ছবির মতো একটা স্কুল থেকে এ কোথায় এলাম রে বাবা! প্রথম কিছুদিন, আমি যেন মাঝসমুদ্রে গিয়ে পড়েছি এমন মনে হয়েছিল।
তারপর আমরা কলকাতা চলে এলাম। ট্রেনে করে আমার স্কুলে যাওয়া শুরু হল। দেখতে দেখতে গরমের ছুটি পড়ে গেল। আর তারপর স্কুল খোলার পরে দেখলাম প্রতিটা ক্লাসে ফ্যান লাগানো হয়েছে! স্কুলের মধ্যে হোয়াইট-ওয়াশ করা হয়েছে।
তারপর জীবনের নিয়ম অনুযায়ী ও মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার বলে আমারও আস্তে আস্তে স্কুলের সবকিছু কেমন যেন স্বাভাবিক মনে হতে লাগল। পরীক্ষার রেজাল্ট ভাল হতে লাগল। আর দেখেছিলাম পুজো আসতে আসতে স্কুলের সঙ্গে কোথায় যেন আমি জড়িয়ে গিয়েছি আমি! অয়নাংশু, সুদীপ্ত, শোভন, তমালরা যেন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে! সেই যে অংশ হয়ে ওঠা তা আজও ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে বয়ে চলেছে আমার!
এখন ভাবি সেই সময়কার স্কুল কী যে অন্যরকম ছিল! স্যারেরা যথেষ্ট মারতেন। কিন্তু আবার ভালওবাসতেন খুব। বকতেন, আবার প্রশ্রয়ও দিতেন। যা আসলে এলোমেলো আর আগোছালো লেগেছিল তা আসলে জীবনের স্বাভাবিকতা! আরোপ না করার প্রক্রিয়া!
পরে আরও ভাল করে বুঝেছি ব্যাপারটা। দরিদ্র বাড়ির থেকে অনেক ছাত্ররা আসত আমাদের স্কুলে। এমনকী এমনও কয়েকজন ছিল যাদের জুতো পরে আসার মতো অবস্থাও ছিল না। ভাল জামাকাপড় বা টিফিন তো দূরের কথা! তাই স্কুলে এমন একটা পরিবেশ রাখা হত যাতে ছাত্ররা কেবল বন্ধুত্বটুকুই বোঝে। সামাজিক বৈষম্য বা অহংবোধ যেন মনে না আসে!
তাই যে আমি-টা, কেউ আমার টিফিন বক্সে হাত না ধুয়ে খাবার ধরলে, মনে মনে বিরক্ত হতাম, সেই আমিটাই পরে নিজের টিফিনের গোটাটাই তুলে দিতাম বন্ধুদের হাতে! ওরাই নিজেরা যেটুকু ইচ্ছে হত মুখে গুঁজে দিত আমায়। আবার নিজেদের টিফিনের থেকেও এটা ওটা খাইয়ে দিত পালটা! ক্লাস সিক্স-সেভেনে উঠতে উঠতে কোনটা আমার আর কোনটা অন্যের সেই বোধটাই চলে গিয়েছিল আমাদের। কেউ আমরা নিজেদের পেন-এ লিখতাম না। সবাই এ ওর পেন পাল্টাপাল্টি করে লিখতাম!
এমনও হয়েছে এক বন্ধু পড়া পারেনি বলে আমরাও পড়া জানা সত্ত্বেও পড়া না বলে একসঙ্গে শাস্তি নিয়েছি! সেটা বেঞ্চে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ক্লাসের বাইরে বের করে দেওয়া বা হাত পেতে বেতের বাড়ি খাওয়া! পরেরদিকে স্যাররাও বুঝতেন! তাই তাঁরাও হাসতেন! আর কিছু বলতেন না!
ক্লাস সেভেনে আরও কিছু নতুন ছেলে এসে যোগ দিয়েছিল আমাদের সঙ্গে। তার মধ্যে আমার পুরনো বন্ধু অমর্ত্য ছিল। ফলে দ্রুত সেও হয়ে গিয়েছিল আমাদের গ্যাঙের মেম্বার!
স্কুলের একটা মজার জিনিস ছিল লাইব্রেরি। আমাদের যেই ঘরটায় লাইব্রেরি ছিল সেটাতে নাকি ভূত আছে বলে কেউ কেউ বলত! আমরা একা একা কেউ যেতামই না ওই ঘরে!
আর ছিল ওয়াটার ফাইট! স্কুলে একটা বড় গোল জল ট্যাঙ্কি ছিল। অনেকগুলো ট্যাপ লাগানো ছিল সেখানে। আমরা অনেক সময় জল খাবার ফাঁকে একে অন্যকে জল ছুড়ে ভেজাবার খেলা খেলতাম!
আমাদের মধ্যেকার ইউনিটিও ছিল সাংঘাতিক! মনে আছে ক্লাস টেন-এ পড়ার সময় একজন নতুন টিচার ক্লাস টেন বি-র একটা ছেলেকে মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছিলেন। তাতে আমাদের দুটো সেকশনই আর ক্লাস করবে না বলে বয়কট করেছিল টিফিনের পরের পিরিয়ড! ক্লাসের দরজা টেনে দিয়ে সবাই বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মূল অভিযোগ ছিল, এই স্যারটি কারণ ছাড়া এমন করে প্রায়ই কাউকে না কাউকে পেটান! এটা চলতে দেওয়া যায় না!
সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড! সারা স্কুলে বিশাল অশান্তি হয়েছিল সেদিন। শেষে সেই টিচার এসে নিজের ভুল মেনে নেওয়ায় ঝামেলা মিটেছিল। তারপরে সেই টিচারটিও আর বেশিদিন এই স্কুলে থাকেননি। কিন্তু যাই হোক না কেন অন্যান্য স্যারদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তাতে একটুও খারাপ হয়নি।
স্যারেরা আমাদের গুরুজন, আমরা জানতাম। তাও আড়ালে আবডালে স্যারদের নকল করা ছিল আমাদের একটা অবশ্য কর্তব্য! আনন্দ বলে একটা ছেলে ছিল, সে এমন নকল করতে পারত যে স্যারেরাও মাঝে মাঝে তার থেকে দেখতে চাইতেন কোন স্যার কেমন করে পড়া বোঝান বা সবাইকে চুপ করতে বলেন! আর একটা ব্যাপার ছিল। সব স্যারের একটা করে ডাকনাম ছিল। এটা বোধহয় সব স্কুলেই থাকে!
যে স্যারদের আমরা ভয় পেতাম, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখেছি তাঁদের সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল আমাদের! যাঁদের মনে হত খুব রাগী ও রসকষহীন, পরে তাঁদের সঙ্গে মিশে দেখেছি, এক একজন বিপুল আনন্দের উৎস। তাঁদের মনে যেমন নতুনের প্রতি আগ্রহ তেমনই আমাদের উৎসাহ দেওয়ার ইচ্ছে! সামান্য ভাল করলেই তাঁরা আমাদের এত প্রশংসা করতেন যে এমনিতেই মনোবল বেড়ে যেত!
স্কুল থেকে আমাদের নানান ট্যুরেও নিয়ে যাওয়া হত। সেখানেও কোনও স্টুডেন্ট যদি টাকার অভাবে যেতে না পারত, সবাই মিলে তার টাকাটা দিয়ে দেওয়া হত। আর সেই স্কুলের ট্যুরগুলো ছিল ঐতিহাসিক।
ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় আমরা একবার ম্যাসাঞ্জোর যাচ্ছি। বাসে হুল্লোড় হচ্ছে। হিন্দি গান চলছে তারস্বরে। নাচ চলছে টানা। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমাদের একজন স্যার আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে বলেছিলেন, 'বাবু, তোমরা কী করছ! তোমরা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্রিম স্টুডেন্ট। সেখানে এমন সব বাজে গান শুনছ! রুচি উন্নত করো!”
সবাই বকাটকা খেয়ে চুপ করে তখনকার মতো বসে পড়েছিল। কিন্তু আসল ঘটনাটা ঘটল পরেরদিন। ম্যাসাঞ্জোরের ইউথ হোস্টেলে আমরা ছিলাম। সেখানে স্যারেরা পরেরদিন ব্রেকফাস্টে লুচি-তরকারি বানিয়েছিলেন। স্যারদের তো আর এসব বানাবার অভ্যেস নেই। ফলে লুচিগুলো ভয়ানক আকার ধারণ করেছিল।
খেতে বসে আমাদের মধ্যে থেকে বিশ্বজিৎ লুচি হাতে নিয়ে বলে উঠেছিল, 'স্যার এগুলো কী?'
স্যার বলেছিলেন, 'লুচি! '
বিশ্বজিৎ বলেছিল, ‘এগুলো লুচি! লুচি উন্নত করুন!’
সবাই থমকে গিয়েছিল এক সেকেন্ডের জন্য, তারপর সবাই একসঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়েছিল। স্যারেরাও যোগ দিয়েছিলেন সেই হাসিতে! এমন নানান কাণ্ড সারাক্ষণই প্রায় ঘটত।
আমার মজা লাগত টিফিন আওয়ারে। ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় আমরা এই ব্রেকের সময় পুরনো নঙ্গী অঞ্চল এক্সপ্লোর করতে বেরোতাম। পুরনো পাড়া, পুরনো বাড়িঘর। পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ি। পাঁচিল ঘেরা বাগান! কী যে খুঁজতাম কে জানে! তাও এই পুরনোর সন্ধান ছিল এক রোমাঞ্চ!
ইলেভেন-টুয়েলভে আমার টিফিনটা অনেক সময়ই কাটত ছোটদের সঙ্গে। এক প্যাকেট বাদাম হাতে নিয়ে আমি চলে যেতাম স্কুলের পাশের মাঠে। সেখানে ফাইভসিক্সের ছেলেরা ক্রিকেট খেলত। আমি ছিলাম ওদের আম্পায়ার! আমার বাদামের ঠোঙার থেকে তিন-চারটের বেশি বাদাম আমার জুটত না। কারণ ওই ছোটরাই নিজেদের মধ্যে সবটা ভাগ করে নিত।
সেই খেলাটা কিন্তু দারুণ হত। স্যারেরাও খাবার হাতে নিয়ে এসে দাঁড়াতেন মাঠে। আর দর্শকরা যেমন করে তেমন নানান আওয়াজ দিতেন ও মন্তব্য করতেন! এমনকী আমি কাউকে লেগ বিফোর দিলে, ডিপ স্কোয়্যার লেগে দাঁড়ানো কোনও স্যার নির্দ্বিধায় বলে দিতেন ‘এটা আউট ছিল না!’
এখনও সেইসব ছোট ভাইদের উজ্জ্বল মুখগুলো মনে পড়ে। মনে পড়ে কোনওদিন টিফিনে ওদের কাছে না গেলে আমাদের ক্লাস টুয়েলভের দরজায় এসে দাঁড়ানো সেই ছোট্ট চঞ্চল মুখগুলোকে! বড় দাদাদের ক্লাসের ভেতরে আসতে ভয় পাওয়া মুখগুলো দূর থেকেই জিজ্ঞেস করত, ‘দাদা তুমি আসবে না?
শুধু নিচু ক্লাসের ছাত্র বা বন্ধুই নয়, স্যারদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলোও ছিল দারুণ মজার। আমরা সায়েন্সের স্টুডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও সবার সাহিত্যের প্রীতি ছিল খুব বেশি। জীবনানন্দ, সুনীল, শীর্ষেন্দু, শক্তি, সঞ্জীব, ভাস্কর, জয়, মৃদুল, সুবোধ, মল্লিকাসহ আরও অনেকের লেখার ভক্ত ছিলাম আমরা। নিজেদের মধ্যে বই দেওয়া-নেওয়া করেও পড়তাম। এমনকী এতে আমাদের স্যারেরাও যোগ দিতেন। বিশেষ করে দিলীপ পাল স্যার আর অজিত বরণ সিংহ রায় স্যার। আমাদের সাহিত্য পড়ার ব্যাপারে তাঁদের নিরন্তর উৎসাহ ভোলার নয় ৷
আমি এই দুই স্যারের কাছে প্রাইভেটেও পড়তাম। কিন্তু দু'জনের কেউই টাকাপয়সার দিক থেকে একদম প্রফেশনাল ছিলেন না। পড়াতে বসলে সময়ের ঠিক থাকত না। এমনকী টাকা না নিয়েও অনেককে পড়াতেন! আমি শনিবার করে দিলীপবাবুর বাড়িতে সকাল সাতটায় যেতাম। এমন বহুদিন হয়েছে যে আমি স্যারের বাড়িতে সারাদিন কাটিয়েছি। সেখানেই দুপুরে খেয়েছি। স্যারের পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলেছি। আবার সন্ধেবেলা ফিরে এসেছি।
আর শুধু আমিই না। আমাদের বন্ধুদের গ্রুপটার সঙ্গেই স্যারদের একটা অদ্ভুত ভাল সম্পর্ক ছিল। তাই স্কুল পাশ করে বেরবার পরেও দীর্ঘদিন আমরা স্যারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। একসঙ্গে আড্ডা হত। খাওয়াদাওয়া হত।
স্কুলের বন্ধুরাই ছিল আমাদের সবসময়ের বন্ধু। আমি কলকাতায় থাকতাম বলে ওদের সঙ্গে স্কুলের পরেও সেভাবে যোগাযোগ থাকত না। তখনও সবার বাড়িতে ফোন নেই। আর আমাদের যে ক'জনের বাড়িতে ফোন ছিল তাদের ফোন করার পারমিশন ও ছিল না সবসময়। আমাদের সময় বাবা-মায়েরা বাবা-মা-ই ছিল। এখনকার বাবা-মায়েদের মধ্যে সন্তানদের বন্ধু হওয়ার ধুম পড়েনি তখনও।
এখনও বাটানগরে গেলে আমাদের স্কুল বিল্ডিংটার সামনে দিয়ে একবার হলেও যাই। হলুদ স্কুলবাড়ি আরও বড় হয়েছে এখন। চারিদিকে গাছ লাগানো হয়েছে! নতুন বিল্ডিং হয়েছে। স্কুলের পাশের মাঠটা এখন স্কুলের সম্পত্তি! সেটা পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। দেখি, সাদা জামা কালো প্যান্ট পরা কত নতুন মুখ। বুকে ব্যাজ। তাতে লেখা— ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়'! শুনি সেই পেটা লোহার গোল থালার মতো পাতে লোহার লাঠি দিয়ে ঘণ্টা বাজানো হচ্ছে! অবিকল সেই আওয়াজ! শুনলেই মনে হয় আমাকেও যেতে হবে! সেই সেকেন্ড বেঞ্চের কোনায় বসতে হবে! কারণ ক্লাস শুরু হয়ে যাবে যে!
বহুদিন আগে স্কুল ছেড়ে দিয়েছি আমি। তাও এখনও বুঝি স্কুল আমায় কোনওদিন ছেড়ে যায়নি কোথাও! বুঝি সেইসব বন্ধু, শিক্ষক বা অনুজপ্রতিমদের কাছ থেকে পাওয়া এমন নিঃশর্ত ভালবাসার তুলনা এ জীবনে আর পেলাম না। এবং জানি আর কোনওদিন পাবও না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন