নেমন্তন্ন

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

আমরা বাঙাল। যদিও স্বাধীনতার কিছু আগেই আমার দাদুরা সেই চাঁদপুর আর মেঘনার পাশের বহরিয়া গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল জামশেদপুরে, তাও কথাবার্তার টান আর খাওয়াদাওয়ার ধরনের জন্য সবাই আমাদের বাঙাল বলত!

নঙ্গী-বাটানগরের সর্দারপাড়ায় আমাদের বাড়িটাকে সবাই আড়ালে বাঙাল বাড়ি বলে ডাকত। বাড়িতে দাদুরা, বাবা-কাকারা আর অন্য সিনিয়রেরা দেখেছি নিজেদের মধ্যে বাঙাল ভাষাতেই কথা বলত। দেখাদেখি আমিও চেষ্টা করতাম। কিন্তু নিজেই বুঝতাম সেই টান আসছে না! সেজ ঠাকুরদা, মানে আমাদের কুট্টিদাদু বলত, ‘প্যাটে ম্যাঘনার জল না পড়লে অমন ভাষা বাইরইবো না!’

বাটানগরে আমাদের দাদু, কাকাদের পরিচিতি ছিল খুব। সেজকাকা মানে ভাইপো তো ছিল ওই অঞ্চলের শাহরুখ খান। হেন লোক নেই যে নিজে থেকে এসে ভাইপোর সঙ্গে কথা বলত না! সবার কাছে ভাইপো ছিল, ‘স্বপনদা' বা ‘রেফারি’! তাই এত পরিচিতির জন্যই আমাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন আসত দেদার!

তখনকার দিনের, মানে সেই আশির প্রথমদিকে নেমন্তন্ন বাড়ির কিছু নির্দিষ্ট ব্যাপার ছিল। তখন নেমন্তন্ন বাড়িতে এখনকার মতো এমন নানান রকম গেট বানানো হত না। বরং সব শুভকাজের বাড়ির গেট ছিল দু'রকম রঙের কাপড় দিয়ে আয়তাকার করে বানানো। আর শ্রাদ্ধবাড়ির গেট ছিল আয়তাকার আর সাদা কাপড়ের। বিয়েবাড়ির গেটের পাশে চলত সানাইয়ের ক্যাসেট। সেখানে একজন ক্লান্ত মুখের মানুষ বসে থাকত। সেই মাঝে মাঝে ক্যাসেটের 'এ' পিঠ আর 'বি' পিঠ পালটে পালটে দিত। আর মাঝে মাঝে সেই বাজনা থামিয়ে চালাত কিশোর, আশা বা রফির গান!

তখন বিয়েবাড়িতে গেলে প্রথমে ওই ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক বা স্টার্টার আসত না। গিফট দিয়ে লোকজন অপেক্ষা করত কখন তার খেতে যাওয়ার ডাক আসবে!

বিয়েতে গিফট বলতে হয় বেড কভার, শাড়ি নয়তো বই। খুব কাছের লোক ছাড়া সোনার জিনিস দেওয়া হত না। আর খুব কশ্চিৎ লোকে ফুল নিয়ে যেত। পৈতে বাড়িতে দেওয়া হত জামার পিস। বই। পেন। ফ্লাস্ক। ঘড়িও পাওয়া যেত কারও কারও কাছ থেকে। তবে সেই সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত মধ্যবিত্তের যে ব্র্যান্ড ছিল. এইচএমটি সেই ব্র্যান্ডের ঘড়িই পাওয়া যেত মূলত। খামে করে টাকা দেওয়ার চল তখনও খুব একটা হয়নি। কেউ কেউ সেটাকে ‘অপমান করা হচ্ছে’ মনে করত।

উপহার নিয়ে লোকে তাই খুব একটা উৎসাহিত ছিল না। উৎসাহ ছিল খাবারের ব্যাপারে। আমার মনে আছে সন্ধেবেলা নেমন্তন্ন থাকলেই অনেকেই বলত, ‘দুপুরে অল্প করে খাব। পেটে জায়গা রাখব।’ ছোটরাও সব উৎসাহিত থাকত! হিসেব চলত কে ক'টা পান খাবে, তার! দিদি কাকিমাদেরও মধ্যেও দেখতাম সাজো সাজো একটা রব!

তখন সব নেমন্তন্নতেই তথাকথিত বাঙালি খাবারই পরিবেশন করা হত। ভাত, ডাল, আলু বা বোঁটাওলা লম্বাটে বেগুনভাজা, তোপসে মাছ ভাজা, একটা তরকারি, কাতলা মাছের কালিয়া, পাঁঠার মাংস সঙ্গে চাটনি, পাপড়, দই, মিষ্টি আর পান।

মাঝে মাঝে আচমকা কোনও বাড়িতে পাওয়া যেত ফিস ফ্রাই! দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ আর চপচপে তেল দেওয়া অদ্ভুত স্বাদের ফ্রায়েড রাইস। তবে দেখতাম বয়স্ক লোকজন সাদা ভাত হলেই খুশি হত।

তখন আমাদের জীবন এখনকার মতো বিচিত্র খাবারদাবারে ভর্তি ছিল না। চপ, মুড়ি, শিঙাড়া, চানাচুর, বাদাম ছিল স্ট্যান্ডার্ড মুখরোচক খাবার। এগরোল বা চিকেন রোল ছিল দু' মাস-তিন মাসে পাওয়া যায় এমন খাবার। আর মোগলাই পরোটা ছিল সারা বছরে একবার-দু'বার পাওয়ার মতো মহার্ঘ জিনিস! তাই নেমন্তন্ন বাড়িতেও সেভাবে নতুন নতুন খাবারের চল ছিল না। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়িতে আমরা যা খাই, সেটাকেই আরও তেলমশলা দিয়ে বানিয়ে লোকজনকে দেওয়া হত।

তবে এর বাইরে যে খাবার হত না তা নয়। হত। কিন্তু সেটা খুবই কম। আর তাও যাদের অনেক টাকাপয়সা মানে তখন যাদের বড়লোক বলে জানতাম, তাদের বাড়ির নেমন্তন্নে হত সেসব খাবার।

একবার মনে আছে একটা এমনই বাড়িতে আঠাশ রকম পদ করা হয়েছিল। ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেনের পাশাপাশি ফিস মুনিয়া, চিকেন লাসানিয়া আর রাশিয়ান স্যালাড— এই তিনটে নতুন রকম খাবারের কথা এখনও মনে আছে। তখন আমি ক্লাস টু-তে পড়ি। তাই এত কিছু খাবার দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। আর সত্যি বলতে কী, সব খেতে ভালও লাগেনি। স্যালাডের যে আবার দেশ হয় সেটা ভেবে ভড়কে গিয়েছিলাম খুব। আর স্যালাডে অমন সাদা সাদা কী দিয়েছে রে বাবা! তখন স্যালাড ড্রেসিং বা মেয়োনিজ-এর নামও শুনিনি! জানিও না সেগুলো খায় না মাথা দেয়! মনে আছে বাটানগরের সাহেব কলোনির মধ্যে সেই নেমন্তন্ন বাড়িতে গিয়ে একদম ভাল লাগেনি আমার। দেখেছিলাম সবাই নিজের মতো খাবার তুলে তুলে নিচ্ছে! ভাইপো বলেছিল একে ‘বুফে' বলে!

এ আবার কী! নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে এখানে নিজেকে নিয়ে খেতে হবে! না, এ মোটেই ভাল কথা নয়! বাড়িতে এসে আমি মায়ের কাছে অভিযোগ করেছিলাম! অত ভারী চিনেমাটির প্লেট হাতে ধরে খাওয়া যায় নাকি! সামান্য কয়েকটা টেবিল পাতা! তাতে বসার জায়গা নেই! সেই নেমন্তন্ন বাড়িটা আমার আর আমার খুড়তুতো পিসতুতো ভাইবোনেদের কী যে খারাপ লেগেছিল! পাঠার মাংসই করেনি! সেই পাইপের মতো একটা হাড় হয় না, সেটা মুখে দিয়ে সুরুৎ করে টেনে তার ভেতরের অমৃতটা খাওয়াই হল না! এ কেমন নেমন্তন্ন বাড়ি বাবা! তখনও বুঝিনি আর কিছু বছরের মধ্যেই অধিকাংশ বাড়িতেই নেমন্তন্ন গিয়ে নিজেকে নিজের খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে হবে!

তখন লোকজনের লাজলজ্জাও মনে হয় একটু কম ছিল। বিয়েবাড়ি বা আনন্দ-অনুষ্ঠানের অন্যান্য নেমন্তন্ন বাড়িতে গিয়ে কেউ কেউ তো খাওয়ার কম্পিটিশন লাগিয়ে দিত। কে কত মাংস খেতে পারে! কে কত হাঁড়ি দই খেতে পারে! ক'টা রসগোল্লা খেতে পারে! মানে হিসেবের বালাই ছিল না তাদের। সবকিছুরই যে হিসেব থাকে। সবটাই যে মাপা জিনিস সেই বোধ থাকত না অনেকেরই!

আমার এক কাকা ছিল এরকম। এক মুখেভাতের নেমন্তন্নে দুপুরবেলা লুচি হয়েছিল। কাকা চুয়াল্লিশটা লুচি আর দেড় কেজি মতো পাঁঠার মাংস শেষ করে চল্লিশটার ওপর রসগোল্লা খেয়ে এবার যখন ক'টা কাঁচাগোল্লা খাবে ভাবছে, তখন আমার ছোটদাদু সেই কাকাকে সবার মধ্যে থেকে প্রায় কান ধরে টেনে তুলেছিল।

কাকা নির্বিকার মুখে বলেছিল, 'আরে কাল প্রায় খায়ইনি আজ ভাল করে খাব বলে!’ তখন এসব মজা লাগলেও এখন কেমন যেন লজ্জা হয়। মনে হয় আমরা কি বেশি হ্যাংলা ছিলাম?

সেই সময় সবার উপার্জনই বেশ কম ছিল। তাও যৌথ পরিবার থাকার ফলে মিলেমিশে হয়ে যেত আর কি। জিনিসপত্রের দামও কম ছিল। তাও দেখতাম রবিবার একবেলা মাংস পেতাম। দু' পিস। আর রাতে স্রেফ আলু আর ঝোল! আর সপ্তাহের অন্যান্য দিন খুবই সাধারণ ভাবে খাওয়াদাওয়া হত!

তাই হয়তো একটা নেমন্তন্ন বাড়ি পেলে লোকজন খাওয়ার ওপর অমন ঝাঁপিয়ে পড়ত!

শ্রাদ্ধ বাড়িতে এখন অনেকেই খায় না। তখন কিন্তু তা হত না। লোকে শ্রাদ্ধ বাড়িতে গিয়েও ভর পেট খেয়ে আসত। নিরামিষ রান্না হলেও খাবারের পরিমাণের ব্যাপারে কিন্তু কোনও ত্রুটি রাখত না।

খাবার দেওয়ার ব্যাপারটাও ছিল অন্যরকম। দুটো ইংরেজির ‘এ’ আকৃতির স্ট্যান্ডের ওপর পাতা হত একটা লম্বা কাঠের তক্তা। সেটাই টেবিল। তাতে সামান্য জল ছিটিয়ে পেতে দেওয়া হত রোল করা একটা সাদা কাগজ। এর ওপর পড়ত কলাপাতা। পরের দিকে শালপাতার থালাও দেখেছি। এই পাতার পাশে রাখা হত মাটির খুরি। এতে জল দেওয়া হত।

এবার কলাপাতার কোণে দিয়ে যাওয়া হত, নুন আর লেবু! বাড়ির বাচ্চারাই প্রধানত নুন আর লেবু দিত প্রথম দু'-একটা ব্যাচে। তারপর তাদের আর উৎসাহ থাকত না। আসলে এই নুন লেবু দেওয়ার কাজটার মধ্যে দিয়ে বাচ্চারাও নিজেদের উপযোগী করে তুলত। আমরাও এমন নুন আর লেবু দেওয়ার কাজ করেছি অনেক নেমন্তন্ন বাড়িতে।

তখন এক ধরনের কাঠের ভাঁজ-করা চেয়ার পাওয়া যেত। বেশ ভারী ছিল সেই চেয়ারগুলো। বসার জায়গায় মোটা প্লাইউডের বোর্ড লাগানো থাকত। সেই চেয়ারে বসেই খাওয়াদাওয়া হত। আর মাঝে মাঝেই কেউ না কেউ সেই চেয়ার উলটে পড়ে যেত। বিশেষ করে ছোটরা তো পড়তই!

আমাদের মফস্সলে মাঠের অভাব ছিল না। তাই বাড়ি ভাড়া করে অনুষ্ঠান করার কোনও ব্যাপারই ছিল না। সব ওই মাঠেই প্যান্ডাল হত। কার্পেট-টার্পেটও পাতাও হত না বিশেষ। সবটাই ছিল আটপৌরে একটা ব্যাপার। মাঠের মধ্যে চেয়ার পেতে খেতে বসে অনেক সময়ই অসুবিধে হত। তবে খেতে বসার আনন্দে সেসব নিয়ে কেউ বিশেষ ভাবত না!

আর ছিল মিষ্টি পান নেওয়ার হিড়িক। খাবারের পর কে ক'টা অতিরিক্ত পান নেবে সেটা নিয়ে ছোটদের মধ্যেও কম্পিটিশন হত। বড়রা বকত আমাদের। পরে দেখতাম সেই বড়রাই বাড়ি ফেরার পথে আমাদের থেকে ওই পান চেয়ে খেত!

নেমন্তন্ন বাড়িতে দু'-চারজন অনিমন্ত্রিত অতিথিও যে আসত না তা নয়। সব পাড়াতেই কয়েকজন ছিল যারা নেমন্তন্ন হলেই চলে আসত। তাদের কারও সামাজিক অবস্থা ভাল ছিল না। কারও আবার মানসিক স্থিতিশীলতা ছিল না বিশেষ। তাই যে কোনও বাড়িতে নেমন্তন্ন হলেই ধরে নেওয়া হত যে এমন কয়েকজন আসবেই।

তখন লোকজনের জন্মদিন নিয়ে ঘটা হত না। আমার পাঁচ বছরের জন্মদিনে বাবা-মা আত্মীয়স্বজনদের ডেকে বাড়িতেই খাইয়েছিল। তারপর আর মনে পড়ে না যে কোনও দিন আমার জন্মদিন হয়েছে বলে।

আমার এক বন্ধুর জন্মদিনে আমরা গিয়েছি দু'-একবার। ব্যাস, আর কিছু না। আর কোনও দিন সেভাবে জন্মদিনের নেমন্তন্ন পাইনি আমি।

তখন জন্মদিন হলে বাড়িতে পায়েস হত। সেটাই বাবা চামচে করে খাইয়ে দিত। ব্যাস আর কিছু হত না। এই সব কেক কাটার ব্যাপারই ছিল না কোনও। আশপাশেও সেরকম কিছু দেখতাম না! আসলে মনে হয় সেই সময়ের লোকজন এখনকার মতো দেখনদারিতে বিশ্বাস করত না! এখন যে লোকজন সামান্য থেকে সামান্য কিছু হলেই সবাইকে জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেটা সেই সময়ে একদমই ছিল না! সবাই কেমন যেন একট সিম্পল লিভিং-এর পক্ষপাতী ছিল।

তবে নেমন্তন্ন মানে কি শুধু এসবই! আমাদের সেই ক্লাস টু-থ্রি সময়কার মফস্সলে অনেক কাকিমা-জেঠিমারাই সন্তোষীমার ব্রত রাখত। মনে আছে সেটা শুক্রবার করেই হত। তাই মাঝে মাঝেই এই শুক্রবার করে আমাদের ছোটদের কোনও না কোনও বাড়িতে রাতের নেমন্তন্ন থাকত। এই ঠাকুরের ব্রত রাখার পর নাকি ছোটদের খাওয়াতে হয়!

একদিন আগেই আমাদের কাছে চলে আসত এই নেমন্তন্ন। কোনও কাকিমা বা জেঠিমা আসত মায়ের কাছে। বলত, ‘তোমাদের বাড়ির চারটেকে পাঠিয়ে দেবে আমাদের ওখানে। রাতে খেয়ে আসবে। আর হ্যাঁ কাল যেন সারাদিন ওরা টক না খায়!”

এই একটা ব্যাপার ছিল। সন্তোষীমার ব্রতের নেমন্তন্ন খেতে গেলে কিন্তু টক খাওয়া চলবে না। মনে আছে, সেই নেমন্তন্নে বসার আগে আমাদের জিজ্ঞেস করা হত, ‘তোরা কেউ টক খাসনি তো? খেলে এখনও বল, না হলে কিন্তু ঠাকুর পাপ দেবেন!’

পাপ দেওয়া একটা সাংঘাতিক ব্যাপার ছিল। ছোটবেলায় অনেক কিছু করা থেকে আমাদের বিরত করা হত ‘পাপ দেওয়া হবে' এই ভয় দেখিয়ে।

আমার মনে আছে কোনও কোনও অমন সন্তোষীমায়ের ব্রতের নেমন্তন্নে দু'-একজন বাচ্চা খাবার পাত থেকেও সরে দাঁড়াত এই বলে যে তারা ভুল করে টক খেয়ে ফেলেছে! আর ছিল ভাইফোঁটার নেমন্তন্ন! পিসি আর দিদিরা আমার বাবা-কাকাদের আর আমাদের ফোঁটা দিত। আর সেদিন দুপুরে হত ভাইফোঁটার খাওয়া! আর তাতে করা হত লুচি!

লুচি আমার চিরকালের প্রিয়! আমাদের বাড়িতে বলা হয়, আমি বাঙাল হলেও আমার কোনও কোনও খাওয়া নাকি ঘটিদের মতো!

আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়িতে লুচি হত না বললেই চলে। অত লোক! কে তাদের জন্য গন্ডা গন্ডা লুচি বেলবে আর ভাজবে? ঠাম্মা মাঝে মাঝে রাগ করে নাকি বলত, ‘এই রাবণের গুষ্টির লগে কে ভাজবো অত লুচি।’

তাই সারা বছরের মধ্যে মনের সুখে লুচি খাওয়ার সময় ছিল ভাইফোঁটার সেই দিনগুলোই! লুচির সঙ্গে বেগুনভাজা, আলুর দম আর পাঁঠার মাংস। পিসিরা যৌথভাবে আয়োজন করত সব। তবে আলুর দম আর পাঁঠার মাংস রান্না করত মা! মা মারা গিয়েছে সেই দু’হাজার দুই সালে। তাও আজও বাড়ির সবাই বলে অমন রান্না আর কেউ পারল না!

আর একটা ছোট্ট নেমন্তন্ন ছিল। হরির লুঠ! অনেকেই তখন ভগবানের কাছে নানান কিছু মানত করত। আর সেটা সফল হলেই বাড়িতে নেমন্তন্ন চলে আসত, ‘ছোটদের পাঠিয়ে দেবে হরির লুঠে!’

সে ছিল এক দারুণ ব্যাপার! বাতাসা, নকুলদানা আর কাগজে মোড়া লজেন্স মুঠো মুঠো করে ‘বলো হরি, হরি বোল' বলে আকাশের দিকে ছুড়ে লুঠ দেওয়া হত। আর তারপর গোল করে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের মধ্যে চলত গুঁতোগুঁতি করে মাটি থেকে বাতাসা লজেন্স কুড়োনোর পালা! সে এক দারুণ মজার হুড়োহুড়ি হত! এখন তো আর কোথাও হরির লুঠ হচ্ছে বলে শুনিও না!

আজকাল অনেক কিছুই শুনি না। দেখিও না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেমন্তন্ন বাড়িতে যাওয়া আমি প্রায় বন্ধ করেই দিয়েছি। কেন কে জানে অত অচেনা মানুষের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি লাগে আমার। সবার সামনে খেতেও খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করি না। নিয়মরক্ষার মতো সামান্য কিছু মুখে দিয়ে চলে আসি। নেমন্তন্ন মানে যে খাওয়ার ব্যাপার আছে সেটাই আর মনে থাকে না। ইচ্ছেও করে না খেতে। সেটা কি সারাক্ষণ এখন বাইরের খাবার খেতে হয় বলেই! কে জানে!

তবে মনে হয় সবটা নয়। সেই যে ছোটবেলায় বাড়ির সবার সঙ্গে নেমন্তন্নতে যেতাম। ভাইবোনেদের সঙ্গে, দাদু, কাকা-কাকিমাদের সঙ্গে খেতে বসতাম! অন্যান্য নানা মজার লোকজন খেতে বসে ইয়ার্কি করত, কম্পিটিশন দিয়ে খেত— সেইসব হারিয়ে গিয়েছে বলেও বোধহয় কোথায় একটা মনখারাপ কাজ করে। আসলে, আনন্দ তখনই আনন্দ যখন তা আমরা প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি!

প্রিয়জনেরা এখন সবাই দূরে দূরে! ছোটবেলার সেই খেলা ভেঙে গিয়েছে কবে। নেমন্তন্ন বাড়ি তাই আর টানে না আমায়। আনন্দ-উৎসব এখন নীরস সামাজিকতা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%